ইতিহাস বিজ্ঞানেরই একটি শাখা এবং মানব চরিত্র অধ্যয়নোপযোগী একটি বিদ্যা-এ মতবাদে বিশ্বাসী ইতিহাসবিদ দ্য ক্যুলাঁজ, হার্নশ, হেনরি পিরেন প্রমুখ। হেনরি পিরেন মনে করেন: অতীতের যে সব চিহ্ন অবশিষ্ট আছে শুধু তাদের মাধ্যমে ঐতিহাসিক ঘটনাবলী ইন্দ্রিয়গোচর হয়। অন্যদিকে অধ্যাপক ড. অজয় রায় বলেন, ‘ঐতিহাসিকের পুনর্গঠিত ঘটনাবলি কোনোক্রমে বাস্তব অতীতের প্রতিচ্ছবি নয়, হতে পারে না। শুধু বলতে পারি ইতিহাসবিদের দৃষ্টিতে লেখা একটি দৃষ্টিভাস, যা ঘটলেও ঘটতে পারে একটি সম্ভাবনার ইঙ্গিত মাত্র।’ [অজয় রায়, ঢকা: ২০১৪] এ কারণে তিনি ইতিহাসশাস্ত্রকে বিজ্ঞান বলতে নারাজ। কাজেই আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বলতে পারি: ‘তাহারা দুই বিপরীত সত্য। আর এই দুই বিপরীত সত্য মিলনে তবে সম্পূর্ণ সত্যটা দেখতে পাওয়া যায়।’ সম্পূর্ণ সত্যের সন্ধানে আধুনিক ঐতিহাসিককেও তাই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তকে বিশ্লেষণ করতে হয়। তাঁরা কখনো বলেন না সত্যি বলছি, তবে পূর্বে প্রাপ্ত সত্য বা প্রচলিত সত্যের ত্রুটি দেখিয়ে নতুন সত্যের সন্ধান দেন। এ ধারার এক তরুণ ইতিহাস গবেষক মাসুম খান (১৯৭৫-)। তাঁর ব্যতিক্রমী ইতিহাস গবেষণার স্বাক্ষর বৈদিক ভারত (২০১৮)। গ্রন্থের প্রবন্ধগুলো পাঠে পাঠকের মনে প্রচলিত অনেক সত্য যেমন ভেঙে পড়ে, অন্য দিকে তেমনি গ্রন্থাকারের যৌক্তিক উপস্থাপনা কৌশলে মুগ্ধ পাঠকের মনে-মননে মাতৃভূমির জন্য এক ধরনের গর্ববোধ ও দেশপ্রেম জেগে ওঠে অনায়াসে।
গ্রন্থের ভূমিকায় অধ্যাপক ড. রফিকউল্লাহ খান যথার্থই বলেন, ‘মধ্যযুগের ভারতবর্ষের ইতিহাসের উপকরণ হিসেবে কিছু নবাবি-জমিদারি দলিলাদির সন্ধান পাওয়া গেলেও প্রাচীন ভারতের লিখিত কোনো ইতিহাসের সন্ধান পাওয়া যায়নি। ভারতীয় ইতিহাস-ঐতিহ্যের অনুসন্ধান ও রচনার সূত্রপাত মূলত ব্রিটিশ শাসনামলে আলেকজান্ডার কানিংহাম (১৮১৪-১৮৯৩), বুকানন হ্যামিলটন (১৭৬২-১৮২৯), উইলিয়াম জোনস্ প্রমুখ পণ্ডিত কর্তৃক ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত এশিয়াটিক সোসাইটির মধ্য দিয়ে হলেও প্রকৃতপক্ষে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জার্মান পণ্ডিত ম্যাক্স মুলারের (১৮২৩-১৯০০) হাতে প্রাচীন ভারতের ইতিহাসচর্চার সূত্রপাত। অধ্যাপক ম্যাক্স মুলার প্রয়াণের প্রায় বিশ বছর পরে প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। সিন্ধু অববাহিকায় হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো এবং আরো পরে বিশ শতকের ষাটের দশকে সরস্বতী অববাহিকায় রাখিগরহি, লোথাল, কালিবঙ্গানসহ প্রায় ২৬০০টি সভ্যতার প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনের সন্ধান পাওয়া যায় এবং এর মধ্যে ২০০০টি প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতা আবিষ্কার হয় শুধু মাত্র সরস্বতীর অববাহিকায়। এইসব নতুন আবিষ্কার ও সেখান থেকে প্রাপ্ত উপকরণ ও তথ্যাদি গবেষকদের জন্য ইতিহাস বিশ্লেষণের বহুমুখী সম্ভাবনার পথ খুলে দেয়।
প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার উল্লিখিত নির্দশনসমূহ আবিষ্কারের পরেও ভারতীয় সভ্যতার প্রাচীন ইতিহাস আলোচনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে ম্যাক্স মুলারকেই অনুসরণ করতে দেখা যায়। এর কারণ সম্ভবত প্রতিষ্ঠিত ও বহুচর্চিত পথের বাইরে যাওয়ার ঝুঁকি গবেষকগণ নিতে চান না। সিন্ধু ও সরস্বতী অববাহিকায় নতুন নতুন সভ্যতানিদর্শন আবিষ্কারের পর ম্যাক্স ম্যুলারের অভিমত ভারত-ইতিহাস আলোচনায় কতোটা গ্রহণযোগ্য থাকবে সেটা ইতিহাসবিদেরা বিবেচনা করবেন। অবশ্য এর বাইরেও আরো একটি ধারা লক্ষ করা যায়, যে ক্ষেত্রে প্রচলিত মতের বাইরে থেকে প্রাচীন ভারতীয় বৈদিক ও সংস্কৃত ভাষায় রচিত গ্রন্থসমূহের তথ্য-উপাত্ত গ্রহণ করে ভারত-ইতিহাসের একটি পাঠ নির্মাণ করা। বৈদিক ভারত রচনার ক্ষেত্রে মাসুম খান শেষোক্ত পন্থাকেই প্রধান অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করেছেন।’ গ্রন্থ পাঠের মধ্য দিয়ে পাঠক উপলব্ধি করতে পারবেন- লেখক নতুন পথে শুধু পা বাড়াননি, প্রচলিত পথ বর্জনের যৌক্তিকতা তুলে ধরার পাশাপাশি নতুন পথের ভিত্তি দৃঢ় করবারও প্রয়াস চালিয়েছেন বৈদিক সাহিত্য থেকে উদাহরণ-উদ্ধৃতি তুলে ধরে রচিত ছ’টি গবেষণা-প্রবন্ধের মাধ্যমে।
গ্রন্থের শুরুতে ‘ম্যাক্স মুলারের আর্যনীতি ভারতের প্রকৃত ইতিহাস অনুসন্ধানের অন্তরায়’ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক দেখান যে, সিন্ধুর ‘স’ মেসোপটেমীয় উচ্চারণে ‘হ’ হয়ে ‘হিন্দু’ হয়েছে। ফলে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠীর ‘স’ ব্যবহারকারী জনগোষ্ঠী প্রাচীন এবং ‘হ’ ব্যবহারকারী গোষ্ঠী পরবর্তী সময়ের। তাই তিনি দাবি তুলেন: ‘বৈদিক ভাষায় ঋগে¦দ রচনার করা হয়েছিল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৭০০০ অব্দ কালের পূর্বে। … এ সময়েই সিন্ধুর তীরে প্রথম বসতির সূচনা হয় এবং তারও পরে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ অব্দ নাগাদ সময়ে মেসোপটেমিয়া সভ্যতার সুমেরে প্রথম মানুষের পদচারণা দেখা যায়।’(পৃ. ১৪)। মাসুম খানের অভ্রান্ত অবলোকন: ‘ম্যাক্স মুলার দেহত্যাগ করেন ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের ২৮ অক্টোবর অক্সফোর্ড শহরে। ম্যাক্স মুলারের দেহ ত্যাগের ২০ বছর পর ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে সিন্ধুনদের তীরে হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো আবিষ্কৃত হয় এবং ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে এখানে প্রথম খননকাজ শুরু হয়। সুতরাং ম্যাক্স মুলার প্রাচীন ভারতের ইতিহাস ঐতিহ্যের কোনো ধারণাই রাখতেন না।’(পৃ. ১৫)। আমাদের মানতে হয় বর্তমানে ম্যাক্স মুলারেরর নীতি বর্তমানে আর গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। খাইবার গিরিপথ আর্য প্রভৃতি প্রাচীন নৃগোষ্ঠীর ভারতে প্রবেশপথ হতে পারে না। বরং, গবেষক বর্তমান গবেষণায় সরস্বতী, সিন্ধু, সুমেরীয়, ব্যাবিলনীয় প্রভৃতি সভ্যতার ধারাবাহিক সময়ের আলোকে প্রমাণ করেন যে, বৈদিকভাষী আর্যরা খাইবার গিরিপথ দিয়েই বহির্গমন করেছিলেন।
‘ভারতের প্রাচীন বসতি : প্রসঙ্গ নৃ-গোষ্ঠী’ প্রবন্ধে মাসুম খান মনে করেন যে, নেগ্রোয়েডদের প্রাচীনতম নিদর্শন যেহেতু ভারতে পাওয়া যায়, তাই তাদের প্রাচীনতম বসবাসের জায়গা ভারত। এ গোষ্ঠী যে ভারতের দিক থেকেই আফ্রিকার দিকে এগিয়ে গেছে তারও যথেষ্ট সাক্ষ্য প্রমাণ প্রাবন্ধিক তুলে ধরেন পূর্ববর্তী বিভিন্ন গবেষকগণের আলোচনার মধ্য থেকে। এতে করে পাঠকের প্রতীতি জন্মে যে, অতীতে এশিয়া-আফ্রিকা যখন এক ভূখণ্ড ছিল তখন-অস্ট্রেলিয়েডদের বসবাস ছিল মধ্যভারতের উচ্চভূমিতে এবং সেখান থেকে ধীরে ধীরে নেমে আসে দাক্ষিণাত্যের সমভূমির দিকে। এমনি একটি বড় দল পৌঁছে যায় অস্ট্রেলিয়ায়। প্রত্যক্ষ প্রমাণ, অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসীদের ভাষাগত বৈশিষ্ট্য আজও দাক্ষিণাত্যের ভাষায় প্রবহমান। এভাবে ভাষাতত্ত্ব ও নৃতত্ত্বগত আলোচনায় গবেষক সিদ্ধান্তে উপনীত হন: ‘পৃথিবীর মানব বসতি ও মানবের বিকশিত হওয়ার ইতিহাস ভারতবর্ষ কেন্দ্রিক। যেখানে মানব বা মানব প্রজাতি আবির্ভূত হওয়ার পর থেকে মানবের বসবাস ও নানা ভাবে বিকশিত হওয়ার উপযোগী প্রাকৃতিক পরিবেশ ছিল, যা ভারত ব্যতীত আর কোনো মহাদেশে ছিলো না এবং বৈদিকভাষী আর্যদের তপোবন (মধ্য ভারতের উচ্চভূমি) কেন্দ্রিক বৈদিক সভ্যতাই পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতা। এ তপোবনকেন্দ্রিক গ্রাম্য সমাজে প্রথম কৃষির উদ্ভব খ্রিস্টপূর্ব ১০,০০০ অব্দ নাগাদ সময়ে। এ সভ্যতা টিকে ছিল খ্রিস্টপূর্ব ৮,০০০ অব্দের ভয়াবহ ভূমিকম্প পর্যন্ত। পরবর্তী খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ অব্দে কৃষিভিত্তিক গ্রাম্য সভ্যতার দেখা আমরা পাই মেসোপটেমিয়ায়।’ (পৃ. ২৮) সুতরাং, মানবসভ্যতার সূতিকাগার প্রাচীন ভারত।
‘সোমরস তত্ত্বের ভিত্তিতে বৈদিক জনবসতি বিন্যাস’ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক প্রমাণ করেন যে, সোমচাষী অরণ্যপ্রধান জাতিসমূহের মধ্যে সম্ভবত গন্ধর্বেরাই উৎকৃষ্টমানের সোমলতার চাষ করতেন এবং এর রস প্রস্তুত প্রণালীও জানতেন।
গন্ধর্বজাতি হল প্রাচীন গান্ধারের অধিবাসী। বৈদিক যুগেই গান্ধার বৈদিক আর্যদের দখলে আসে এবং এ সময়েই তাঁদের একটি দল গান্ধারের ভিতর দিয়ে খাইবার গিরিপথ ধরে অপর পাশে চলে গিয়ে খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ হাজার বছর নাগাদ সময়ে জরাভশান উপত্যকায় প্রথম বসতি স্থাপন করে। এই চলে যাওয়ার দল ইন্দ্র কর্তৃক বিতাড়িত হওয়ায়, তাঁরা সুর (ইন্দ্র) বিরোধী এবং নেতা অসুর (অহুর) পূজারি। তাই তিনি সগর্বে ঘোষণা করেন: ‘ফলে ভারতবর্ষই যে, মানুষের আদি বসবাসরত পরমানন্দদায়ক স্বর্গীয় ভূমি তাতে কোনো সন্দেহ থাকে না।’ (পৃ. ৩৯)। একইভাবে ‘সূর্যদেবতার উৎস, বিকাশ ও পরিণতি’ প্রবন্ধেও তিনি প্রমাণ করেন যে, প্রাচীন ভারতের বিন্ধ্যপর্বতের ভিমভেটকা গুহামানবেরাই সরস্বতী অববাহিকা ছেড়ে সিন্ধু হয়ে মেসোপটেমিয়ার পথ ধরে সূর্যদেবকে মিশর সহ পৃথিবীব্যাপী পৌঁছে দিয়েছিলেন। এতেকরে প্রচলিত বিপরীত মতবাদটি ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়।
‘ভারতে আর্য বসতি’ প্রবন্ধে লেখক ঋগে¦দের সূক্ত পর্যালোচনা করে মন্তব্য করেন: ‘ঋক রচনার ভৌগোলিক অঞ্চল যেহেতু ভারত, তাই ইন্দ্রপক্ষের বৈদিক আর্যরা ভারতেই থেকে গেছে এবং অসুরপন্থী আর্যরা ভারত থেকে ইরানের দিকে গেছে বলে মনে করা যায়। ভাগ হয়ে যাওয়া দু’দলের মধ্যে একদল ভারতে এলেন বলে যে মতামত প্রচলিত তা-ঠিক বলে মনে করি না।’ (পৃ. ৫২)। এখানে তিনি প্রমাণ দেখান যে, ঋগে¦দীয় সভ্যতা বা বৈদিক সভ্যতা ঋষিদের তপোবন কেন্দ্রিক গ্রামীণ সভ্যতা। উৎপাদিত শস্য দিয়ে জীবন চলছে, বিক্রি বা বিনিময় করার সময় তখনো আসেনি। অথচ সিন্ধু সভ্যতার পত্তন হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে। সুতরা, বৈদিক সভ্যতা হরপ্পা-মহঞ্জোদারো ও সিন্ধু সভ্যতার পূর্ববর্তী। বৈদিকভাষী আর্যগণেরে ‘মেহেরগড়ীয় সভ্যতা’ বা ‘সরস্বতী সভ্যতা’ নামে অভিহিত করে লেখক দৃঢ়চিত্তে ঘোষণা করেন : ‘এশিয়া মহাদেশের মধ্যে প্রাচীনতম সভ্যতা মেসোপটেমিয়া নয়, সে দাবিদার-প্রাক্-হরপ্পীয় সরস্বতী সভ্যতা।’ (পৃ. ৫৯)। কেননা মেসোপটেমিয়ার লিপিগত দলিল আহুর-মাজদায় ভারতের তথ্য রয়েছে। সুতরাং, তাঁদের ভারত সম্বন্ধে জ্ঞানই প্রমাণ করে, তাঁরাই সুদূর অতীতের কোনো এক সময়ে ভারত থেকে বেরিয়ে পড়েছিলেন অজানার উদ্দেশে। অর্থাৎ ভারতই তাঁদের আদি নিবাস।
‘ভূমি আগ্রাসনের নিমিত্তে বৈদিক সমাজে অবৈদিক প্রাকৃতজনের ধর্ম সংস্কার গ্রহণ’ প্রবন্ধে লেখক দক্ষিণ-পূর্ব ভারতের ‘বৃহৎবঙ্গ’ অঞ্চলের অবৈদিক প্রাকৃতজনের সামাজিক আচার আচরণ, ধর্মীয় সংস্কার কিভাবে পশ্চিম ভারত থেতে আগত বৈদিক আর্যগোষ্ঠী দুই ধর্মের মিশ্রণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গ্রহণ করেছে এবং তাঁদের শক্তিশালী বৈদিকধর্মের মূল কাঠামো ত্যাগ করেছে; সে সঙ্গে অবৈদিক প্রাকৃতজনের ভূমি দখল করেছে তার সংক্ষিপ্ত আলোচনা করার প্রয়াস চালিয়েছেন। প্রাবন্ধিক বলেন: ‘ প্রচলিত মতের বাইরে থেকে প্রাচীন ভারতীয় বৈদিক ও সংস্কৃত ভাষায় রচিত গ্রন্থসমূহের তথ্য-উপাত্ত গ্রহণ করে আলোচ্য প্রবন্ধটি নির্মাণ করা হয়েছে।’ (পৃ. ৬৪)। ফলে তিনি দেখাতে পারেন যে-ঋক্, যজু, সাম যেখানে ঈশ্বরোপাসনার মন্ত্র, পদ্ধতি আলোচনা করে, অথর্ব সেখানে ঐন্দ্রজালিক শক্তি প্রকাশ করে রোগহরণের পথ দেখায়। যা কিনা তান্ত্রিক সাধকদের পক্ষে সম্ভবপর কাজ। এ থেকে তিনি আরোহ অনুমান করেন যে, শাক্তপ্রধান পূর্ব ভারতে অনুপ্রবেশের প্রয়োজনে বৈদিক শাসক শ্রেণি শাক্তদের ধর্মগ্রন্থ অথর্ববেদ নামে গ্রহণ করলেও ব্রাহ্মণ শ্রেণি এ গ্রন্থকে আজো গ্রহণ করেনি। এভাবে লেখক ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত সত্যকে সরলভাবে উপস্থাপন করেন: ‘মধ্য ভারত থেকে সমগ্র উত্তর ভারত বৈদিক আর্যদের দখলে চলে এলে দক্ষিণ ভারতের দ্রাবিড় গোষ্ঠীদের সঙ্গে তাঁদের সামাজিক ও রাজনৈতিক সমঝোতা হয়। কিন্তু পূর্ব ভারতের বঙ্গদেশে তাঁদের প্রবেশ করতে অনেক বেগ পেতে হয়েছে এবং বহুদিন অপেক্ষা করতে হয়েছে। সেই অপেক্ষার দিন তাঁদের শেষ হয়েছে পৌরাণিক যুগে; যখন তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছে জনপদগুলোর আচার আচরণ ও ধর্মমত গ্রহণ করে প্রবেশের। এই সময়ে বৈদিক আর্যজনগোষ্ঠী রাষ্ট্রক্ষমতা বিস্তারের মানসিকতায় ‘বঙ্গ’ অঞ্চলে প্রবেশের পূর্বশর্ত হিসেবে এই অঞ্চলের প্রকৃতি কেন্দ্রিক দেবীদের আর্যীয়করণ করে, ফলে এদেশে তাঁরা প্রবেশাধিকার লাভ করে।’ (পৃ. ৭৫)। অর্থাৎ প্রাচীন বাঙালি তার আবহমান কালের আচার-আচরণ ও ধর্ম-সংস্কৃতি জলাঞ্জলি না দিয়ে আর্য-সংস্কৃতি গ্রহণ করেছে। ফলে এ ইতিহাস বাঙালিরও গর্বের ইতিহাস।
প্রবন্ধগুলো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে পঠিত-আলোচিত হয়েছে এবং বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে-সে তথ্য গ্রন্থে দেয়া যেত। পাঁচ পৃষ্ঠাব্যাপী প্রাসঙ্গিক চৌদ্দটি প্রতœ-চিত্র ও মানচিত্র গ্রন্থটির মান ও উপযোগিতা বাড়িয়েছে তবে গবেষণা-গ্রন্থে নির্ঘণ্ট সংযুক্তকরণ ও বানান সম্পর্কে আরও সতর্কতা প্রত্যাশিত। গবেষক বর্তমান গ্রন্থে প্রাচীন ভারতের ঐতিহাসিক উপাদান নিয়ে পূর্বসূরিগণ যে বিশ্লেষণ করে গেছেন তা নিয়ে যেমন বিস্তৃত আলোচনা করেছেন, তেমনি বৈদিক-সংস্কৃত সাহিত্য ও ভাষাতাত্ত্বিক-নৃতাত্ত্বিক-প্রতœতাত্ত্বিক তথ্যের ভিত্তিতে নিজস্ব বিশ্লেষণ ও মতামতও ব্যক্ত করতে চেষ্টা করেছেন সুচারুভাবেই। তাঁর এই উদ্যম প্রশংসনীয় এবং যথার্থ পরিশ্রম-ঋদ্ধ। ইতিহাসের নানা খুঁটিনাটি বিবরণে এবং তত্ত্বীয় আলোচনাতে তাঁর আগ্রহ ও আন্তরিকতা আমাদের মনোযোগ দাবি রাখে। আলোচনাটি পদ্ধতিসিদ্ধ বা মেথডিক্যাল ও যথাবিস্তৃত। লেখকের ভাষা সহজ ও যুক্তিনির্ভর। ভারতের প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে ইতঃপূর্বে যারা আলোচনা করেছেন, তার মধ্যে এই আলোচনাটিও যে পণ্ডিতমহলে আদরণীয় হবে তা নিঃসন্দেহ বলা যায়।