এগারোটার বেশি রাত জাগে না এবং টানা ঘুম হয়। কথাটা বোধহয় গতকাল পর্যন্ত বন্ধুদের উদ্দেশে তৃপ্তির সঙ্গে উচ্চারণ করেছে সোবহান লতিফ, পরানপুর গার্মেন্টস লিমিটেডের ডাকসাইটে এমডি। টানা ছয় দশকের তৃপ্ত উচ্চারণ, অথচ লোকটা আজ বিছানাতেই যেতে পারছে না। বারান্দায় পায়চারি করছে। ঘড়িতে বারোটা ষোলো। সেলফোন কানে লাগিয়ে কাকে জানি জিজ্ঞেস করছে, গাড়ি অখন কোন জায়গায় আইছে?
ব্যাপারটা প্রথম চোখে পড়ে টিয়ার, টিভি মিউট করে দিয়ে সে বারান্দায় যায়।
তোমার আজ কী হয়েছে বলো তো?
স্বাভাবিক গলায় সোবহান বলল, কী হবে। কিছুই হয়নি।
টিয়ার কপাল কুঁচকে গেল, কেন লায়ার বানাচ্ছো নিজেকে? নিশ্চয় কিছু হয়েছে। রাত জাগি বলে সারা জনম আমাকে বকাবকি করলে, অথচ আজ সাড়ে বারোটা বেজে গেল, এখনো ঘুমালে না…। কী হয়েছে বলো তো? পিজ..।
হাসবার চেষ্টা করলো সে, আরে টেক ইট ইজি। ব্যতিক্রম তো একদিন হতেই পারে।
ট্রেসে আছো মনে হয়?
হু, লিটল বিট। সোবহান লতিফ স্বীকার করলো, তোমাকে বলেছিলাম না, গ্রামের সেই বংশীবাদকটা স্ত্রীসহ আসছে।
টিয়ার মনে পড়ল, হ্যাঁ। কিন্তু ওরা তো কাল সকালে ঢাকায় এসে পৌঁছবে। এখন কী হলো?
সে বিড়বিড়িয়ে বলল, একদম বোকাসোকা মানুষ তো। পরানপুর থেকে মাত্র নয় কিলোমিটার দূরের ছাতক শহরটা পর্যন্ত জীবনে দেখেনি। এই প্রথম শহরে আসছে, তাও চারশ’ কিলোমিটার দূরের গোলমেলে একটা শহরে।
লেখাপড়া জানে না?
সোবহান লতিফ আধো অন্ধকারে হাসল, সামান্য। ক্লাস থ্রি-ফোর হবে বোধহয়। কিন্তু অসম্ভব সুন্দর গান বাঁধতে পারে। নিজের সুরে নিজেই গায়। গলাও ভালো।
টিয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে যেন ব্যঙ্গ করলো, ওরে বাবা, এত দেখছি সাক্ষাৎ দুখু মিয়া…। বাঁশি বাজায়, আবার গান লিখে, গায়। … এরকম প্রতিভা তোমাদের গ্রামে থাকে কী করে?
সেজন্যই তো ওকে নিয়ে আসছি।
বেশি দূর যেতে পারবে বলে মনে হয় না। টিয়া মন্তব্য করলো, এখন আর গোবিন্দ-দুখু মিয়াদের যুগ নেই। কিছু এলেম পেটে না থাকতে হয় নইলে কেউ পাত্তা দেয় না।
এসব কথা সোবহান লতিফের কানে যায় বলে মনে হয় না, সে বিড়বিড়িয়ে বলতে থাকে, ভাবছি নিউ টিভি’র আগামী ট্যালেন্ট হান্ট প্রতিযোগিতায় ওকে পাঠাবো। আমি শিওর, একটা পুরস্কার তুকাই আনবেই।
কী নাম বললে?
তুকাই।
হোয়াট? টিনার গলার স্বর চিরে যায়, এটা আবার কী ধরনের নাম?
হ্যাঁ নামই তো, অর্থপূর্ণ নাম। আঞ্চলিক ভাষায় এর অর্থ খুঁজি। আমি অবশ্য ওর নামের পেছনে বংশী লাগিয়ে দিয়েছি। তুকাই বংশী। লোকে মনে করবে, এথনিক। আরো জমবে।
রাবিশ। টিয়া নিচু গলায় গজগজ করতে থাকল, এক জীবনে কত পাগলামি দেখলাম তোমার। কত জনকে ব্রেক দিলে। তাতে তোমার কী লাভ হয়েছে শুনি? এই যে টপ সিঙ্গার আফজাল করিম, কত দিন এ বাসায় থেকেছে খেয়েছে। কোনো খোঁজ নেয় এখন?
ডাকসাইটে ব্যবসায়ীর মুখটা মুহূর্তে কাচুমাচু হয়ে যায়, আরে ওর কথা ছাড়ো। ব্যস্ত মানুষ, আজ কলকাতা তো কাল কানাডায়, স্টেজ করে বেড়াচ্ছে। তারপরও ফোন-টোন করে। … কিন্তু তুকাই’র ব্যাপারটা আলাদা। ও হচ্ছে আমার পিতৃভূমির ছেলে। গোবরে পদ্মফুল ফোটা মানুষ। সো… ভেরি স্পেশাল ফর মি।
ফোড়নের যথাযথ সুযোগটা নিতে ছাড়ে না টিয়া, সেজন্যেই কি পুরো একটা ফ্ল্যাট ওদের জন্য ছেড়ে দিলে?
পুরো ফ্ল্যাট কোথায়? দুই রুমের একটা চিলেকোঠা, তাও ছয়তলার টপ ফ্লোরে। উঠতে নামতেই ওদের জীবন বেরিয়ে যাবে।
টিয়া মনে করিয়ে দিল, ওই দুই রুমের জন্যই কিন্তু মাসে পাঁচটা হাজার টাকা আসতো।
সোবহান লতিফ হার মানল, ঠিক আছে, আগামী মাস থেকে তোমার হাতখরচা বাবদ এক্সট্রা পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে দেবো।
টিয়া হেসে ফেলল, আই লাইক ইউ…। বিকজ, তুমি খুব তাড়াতাড়ি সারেন্ডার করো। … চলো সোনা, ঘুমাতে যাই।
এক মিনিট। সে বলল, বোধহয় এতক্ষণে মাধবপুরে চলে এসেছে। তুকাইকে শেষ বারের মতো সাবধান করে দেই।
কিসের জন্য সাবধান করবে?
বাস থেকে যেন না নামে, কোথাও যেন খাওয়া-দাওয়া না করে, এমনকি পানিও না।
টিয়া স্বামীর পাগলামিতে হেসে ফেলল, কী যে ছেলেমানুষি কথা বলো? হাইওয়ে রেস্তোরাঁতে দুনিয়ার মানুষ খাচ্ছে-দাচ্ছে, সমস্যা কী। ও তো আর ছেলেমানুষ না।
আরে তারচেয়েও অধম। সেলফোন পর্যন্ত ভালো মতোন ব্যবহার করতে জানে না। তারপরও একটা কিনে দিয়েছি। আমাদের গ্রামের চটপটে সিএনজি ড্রাইভার আলিমকে বলে দিয়েছি, ছাতকে এনে ওদের বাসে তুলে দিতে। আর আমার বাসার ঠিকানা দুইটা কাগজে লিখে দুইজনের কাছে জমা রাখতে। যত ভোরেই মহাখালি বাসস্ট্যান্ডে ওরা পৌঁছাক, আমি না যাওয়া পর্যন্ত যেন টার্মিনাল ছাড়ে না।
ওরে বাব্বা, এ তো দেখছি ভিআইপি সাজেশন!
সোবহান লতিফ বিড়িবিড়িয়ে বলল, এখন মানলেই হয়। বউটা অবশ্য বুদ্ধিমতি, লেখাপড়াও তুকাই’র চাইতে বেশি। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে মেয়েটা অসম্ভব সুন্দরী। … সেজন্য রাতে আসতে নিষেধ করেছিলাম আমি। মমতাজও দিনে আসার কথা বলেছিল।
ওরা সেকথা শুনল না কেন?
দোষটা অবশ্য তুকাই’র না, আলিমের। বেশি স্মার্ট তো। রাতের গাড়িতে নাকি ভাড়া কম, সিটও সুবিধামতো জায়গায় পাওয়া যায়। এসব হাংকি-পাংকি।
থাক এ নিয়ে আর চিন্তা করো না। সকালে ওরা ঠিকমতোই আসবে। ইনশালাহ। চলো ঘুমোবে।
বারান্দা ছেড়ে ঘরে আসতে আসতে আরেকবার রিং করলো, হ্যালো, তুকাই কইরায় নি? … আইচ্ছা আইচ্ছা… কও। বাসটা মাধবপুর ছাড়ি দিছেনি? গুড। আইচ্ছা, কাইল দেখা অইবো।
স্বামীর এ ভাষাটা খুব কম শোনে টিয়া, কিন্তু যেদিনই শোনে, তার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। ভাষার কী ছিরি!
দুই.
বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়ার পরও ঘুম এলো না, দু’বার ফোন করলো তুকাইকে। রিং হচ্ছে, ধরছে না। বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। টিয়ার চোখ দুটিও খোলা। হঠাৎ সে গায়ে ধাক্কা দিয়ে বলল, আচ্ছা মেয়েটা কি খুব সুন্দরী?
কোন মেয়েটা?
আরে তোমার ওই বংশীবাদকের বউয়ের কথা বলছি।
সোবহান লতিফ বলল, হ্যাঁ, গোরিয়াস। আমি জীবনে এরকম সুন্দরী দেখিনি কেন বল তো?
আমার চাইতেও…?
সে অবলীলায় বলে ফেলল, হ্যাঁ টিয়া, তোমার চাইতেও…। মুহূর্তের মধ্যে সামলে নিল নিজেকে, বাট তোমার সঙ্গে কারো তুলনা চলে না। তুমি আমার জন্য সেরা।
থাক থাক, আর বলতে হবে না। টিয়ার কথায় স্পষ্ট অভিমান। ডান হাতে সামান্য আকর্ষণ করলো সে, একটা ঝটকা ফেরত পেল। সোবহান হেসে বলল, দাদিজি, এই বয়সে এত অভিমান ভালো না।
আমাদের আবার অভিমান!
তুকাইকে আমার ভালো লাগে কেন জানো?
টিয়া পাশ না ফিরেই অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করে, কেন?
সোবহান লতিফের চোখ ও মন স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ে, ছেলেটা আমার মতোই বউকে অসম্ভব ভালোবাসে।
হেসে ফেলে টিয়া, তুমি আবার বউকে কখন ভালোবাসলে?
সে তুমি আমার চাইতে ভালো জানো। তবে আমার মনে হয়, তুকাই বোধহয় আমার চাইতেও বেশি ভালোবাসতে জানে। অভাব সেখানে কোনো বাধা নয়।
কী করে বুঝলে?
গত মাসে একদিন বিনা নোটিশে ওর বাড়িতে গেলাম, দুপুরই হবে বোধহয়, ঠিক মনে নেই। দূর থেকে দেখতে পাই, ও মমতাজকে মুখে তুলে ভাত খাওয়াচ্ছে।
টিয়ার গলা ঝাঁঝালো শোনায়, খালি মুখে তুলে ভাত খাওয়ালেই বেশি ভালোবাসা হয় না। খোঁজ নিয়ে দেখো, উল্টাপাল্টা হলেই বউকে ধরে গুমুর-গুমুর কিলায়।
সোবহান লতিফ সজোরে মাথা ঝাঁকায়, না, না। ওর বেলা এরকম হতেই পারে না। মমতাজের সামান্য জ্বর হলেই তুকাই অস্থির হয়ে যায়, পাগলের মতো ছোটাছুটি করে, ডাক্তার নিয়ে আসে। ডাক্তারও হাসে। আর তুকাই নাকি তখন ফিসফিসিয়ে বলে, ও সাব দুনিয়ার সবচে’ সুন্দর ফুল শিউলি আর বকুল, বেশিক্ষণ গাছে থাকে না। আন্ধার হলে লজ্জাবতীর পাতাও কুঁকড়ে যায়। আসলে ভালোবাসতে জানা মানুষগুলো অন্যরকম।
সোবহান বলল, তুকাই শাজাহানের চাইতে বেশি ভালোবাসে মমতাজকে।
টিয়া ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, আদিখ্যেতা।
তিন.
পরানপুরে তার অসম্ভব জনপ্রিয়তা। দু’একবার ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী করার জন্য লোকজন জোরাজুরি করেছে, সে রাজি হয়নি। গান বানিয়েছে তখন মুখে মুখে : আমার ধরন-ধারণ খুব সাধারণ/ছোট্ট একটা মন/আমি চাই না কোনো আকাশবাড়ি/সোনালি কাঞ্চন…।
সে যখন সস্ত্রীক ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়, ম্যালা লোক তাদের বিদায় জানাতে একেবারে দুয়ালিবাজার পর্যন্ত এসেছিল। ভিড়ের ভেতর থেকে এক তরুণ চেঁচিয়ে উঠেছিল, তুকাই ভাই, তুমি তো ঢাকাতে গিয়া গানের বাদশাহ অয় যাইবাই…। আমরারে ভুইলো না কইলাম।
গলা বাড়িয়ে সে বলেছিল, দোয়া কইরো। আমি দুনিয়াদারির বাদশাহ অইতে চাই না, মানুষের মনের বাদশাহ অইলে ভালা। বোকা-সোকা এ মানুষটি এত সুন্দর সুন্দর কথা কিভাবে বলে, এই প্রশ্ন হরেক বার উদয় হয়েছে সোবহান লতিফের মনে। বোধহয় একেই বলে গড গিফটেড। অসাধারণ কথামালা থাকে ওর গানে। বাঁশি বাজালে দুপুরের ঘুঘু ডাকতে ভুলে যায়। গত মাসে ওর আরেকটি গুণের খোঁজ পেয়েছিল সে, বালু দিয়ে চমৎকার ভাস্কর্য বানাতে পারে তুকাই। সেবার ওকে নিয়ে গিয়েছিল হরিণাপাটি, ফুপুর বাড়িতে। বিকেল বেলা ওই কাণ্ডটি করলো। সুরমা নদীর তীরে শাদা বালুর চর, সেখানে গড়ে তুলল তাজমহল। ছোটখাটো, কিন্তু অসাধারণ।
এ ধরনের কাজ সে দেখেছে ভারতে। কয়েকজন তো বিখ্যাতই হয়ে গেছে বালুর এই অস্থায়ী শিল্পকর্মের জন্য। সৈকত শহর গোয়াতে গিয়ে টিয়া একবার এক শিল্পীর কাছে আবদার ধরেছিল, ওর ভাস্কর্য করে দিতে হবে। লোকটার নাম বোধহয় জিতেন্দ্র আগারকার, পাঁচশ’ ডলার দাবি করে বসল। শেষে দুইশ’ ডলারে রফা। নোটগুলো গুনতে সেদিন খুব কষ্ট হয়েছিল সোবহানের। কিন্তু বালুর টিয়াকে দেখতে যখন গোয়া সৈকতে মানুষের ভিড় জমেছিল, হাসিতে ভরে গিয়েছিল তার মুখ। হরিণাপাটিতে ভিড় বরং গোয়ার চাইতে অনেক বেশি। ভিড় সামলাতে শেষে ফাঁড়ির পুলিশকে আসতে হলো। মহা বিরক্ত ওরা, কিন্তু তাজমহল দেখে সবার চোখ ছানাবড়া, ব্যারিকেড তৈরি করলো মুরুব্বিদের নিয়ে হাতে হাতে। খরবদার, সাবধান, অত সুন্দর জিনিসটা যেন না ভাঙে। বার বার বলছিল ওরা।
ফাঁক বুঝে তুকাইকে নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে কেটে পড়েছিল সোবহান। আর তখনই আশ্বিনের বেরসিক বৃষ্টির উৎপাত শুরু। সে চোখ বুজেই যেন দেখতে পাচ্ছিল তাজমহল গলে যাচ্ছে! হঠাৎ কানে ভেসে আসে চীৎকার-চেঁচামেচি আর ছোটাছুটির শব্দ। বৃষ্টি একেবারে ঝাঁপিয়ে নেমেছে। ফোঁটাগুলো আগের চাইতে বড় বড়। তুকাই’র হাত ধরে সেও ছুটতে শুরু করে।
গাতক ধীর গলায় বলে, মুরুব্বি দৌড়াইয়া লাভ নাই। কষ্ট অয়বো জানের। ভিজতেই অইবো যখন, ভিজি…। তুকাই নির্বিকার উদাসিনতায় গাইতে থাকে। ওর বাঁধা গান।
সোবহান লতিফের বয়সও যেন আকস্মিকভাবে কমে যায়। সত্য যে ফুপুর বাড়িটা এখান থেকে অনেক দূরে, ধারেকাছে কোনো দোকানপাটও নেই যে আশ্রয় নেবে। দৌড়ে কী লাভ? ভবিতব্যে আছে তাই ভিজি, তিন বেলাই ভিজি…। ভিজতে ভিজতে অনেক কিছুই ভালোবাসা যায়। সে পুরোদস্তুর ভিজে গেল। আনন্দই হচ্ছে, বহুদিন পর বৃষ্টির অবিরল ধারায় ভিজল। সে ভুলেই গেল যে এ জীবনটা ছয় দশকের বেশি সিঁড়ি পেরুনো, এমন এক অবস্থানে এখন তার বসবাস, যেখানে হাসতেও হয় মাপা। সোবহান লতিফ পুরোটা রাস্তা বৃষ্টিতে ভিজল গানের ছন্দে ছন্দে। বৃষ্টির মতো লাফানো সে-সুর। শীতের ছোঁয়া লাগা বড় বড় ফোঁটার অন্যরকম এক আশ্বিনি গান!
এ বৃষ্টি না থামলেও কোনো অসুবিধা নেই।
চার.
ঘুম ভাঙতেই তড়াক করে উঠে বসে সে। বেলা বোধহয় অনেক। মুঠোফোনটা চোখের সামনে আনার পর ধড়াস করে উঠল বুক। তড়িঘড়ি রিং করলো ড্রাইভারকে, ইদ্রিস কই তুমি?
স্যার, আমি রেডি। নিচেই আছি।
সোবহান লতিফ আর খাবার টেবিলের সামনে গেল না, মহাখালি থেকে ওদের নিয়ে আসার পর নাস্তা করবে। কোনোমতে গায়ে শার্ট গলিয়ে হন্তদন্ত বেরিয়ে গেল। অনেক দেরি হয়ে গেছে। মুঠোফোনের কললিস্টটা চেক করলো আরেকবার। না, তুকাই’র কোনো রিং নেই।
গাড়িতে উঠে ওর নাম্বারে একটা কল দিল। মুঠোফোন বাজছে। কেউ ধরছে না। … আরেক বার এবং পর পর কয়েক বার। আশ্চর্য, তুকাই ধরছে না কেন?
মহানগর প্রজেক্টে তার বাসা; সেখান থেকে বেরিয়ে হাতিরঝিল হয়ে গাড়ি ছুটে চলেছে তেজগাঁওয়ের দিকে, শর্টকাট একটা রাস্তা আছে, তারপরই মহাখালি। ইদ্রিস ড্রাইভারের সব রাস্তাঘাট মুখস্ত। সে আরেকবার তুকাই’র মুঠোফোনে রিং দিল। ক্রমাগত বাজতে বাজতে এক সময় বন্ধ হয়ে গেল। মহাখালি বাস টার্মিনালে ঢোকার আগে শেষ বারের মতো রিং দিলে মহিলা কণ্ঠ জানাল, স্যরি, দি নাম্বার ইউ ডায়ালড ইজ কারেন্টলি আনরিচেবল। তার মানে বন্ধ করে দিয়েছে মুঠোফোনটা কিংবা চার্জ নেই।
চার্জ না থাকার কথা নয়। গতকালই কথাটা মনে করিয়ে দিয়েছিল সোবহান এবং সে অনুযায়ী পরানপুর থেকে বিদায় নেওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত জেঠাশ সুলতানা রিজিয়ার বাড়িতে চার্জার লাগিয়ে রেখেছিল তুকাই। সে খবরও সোবহানের জানা। মুঠোফোনটি যেহেতু তারই দেওয়া, এর চার্জ-ক্ষমতা সম্পর্কেও তাই সে ওয়াকিবহাল। দামি সেট।
মহাখালি বাস টার্মিনালে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে পড়ল সোবহান লতিফ। কোথাও ওদের দেখা নেই। শেষে ড্রাইভার ইদ্রিসকে রিং করলো, গাড়িটা পার্ক করে টার্মিনালে আসো তো।
দুজনের চারটি চোখকে ফাঁকি দেওয়া খুব সহজ কথা নয়। বাসটার্মিনালে এ সময় ভিড়-ভাট্টাও থাকে কম। বেশিরভাগ বাস চলে যায় সকাল দশটার আগে আগে, বারোটায় থাকে একটি কী দুটি। তারপর রাত ন’টা থেকে আবার শুরু হয় ঢাকা ত্যাগের পালা। রাত সাড়ে বারোটা পর্যন্ত দূরপালার বাস ছোটে।
অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরির পর দুজনই ঘেমে উঠলে ইদ্রিস একটা বুদ্ধি দেয়, স্যার, ওদের বাড়িতে খবর নেন। কে জানে ওইখানে ফিরা গেছে কি-না।
বাজে বুদ্ধি মনে হলো। তারপরও ফোন করলো সে, প্রথমেই ড্রাইভার আলিমকে। সব শুনে সে তাজ্জব, ওর জেঠাশ সুলতানা রিজিয়ার টেলিফোন নাম্বার আছে কি-না জিজ্ঞেস করলো।
খবরটা শোনার পর সুলতানার কান্না শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যে তা আহাজারির পর্যায়ে পৌঁছে গেলে মুঠোফোনের লাইনটা কেটে দেয় সোবহান। সে এখন কী করবে, কী করা উচিত, ভাবতে ভাবতে টিয়ার মুখটা ভেসে উঠল চোখের সামনে।
রিং করে সব জানাল সে।
টিয়া বলল, তুমি থানায় একটা ডায়েরি করে রাখো। তার আগে সিলভার এ্যারো ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির অফিসে যাও, ওদের বাসেই এসেছিল তো। খোঁজ নাও।
ওর কথা অনুযায়ী তা-ই করলো সোবহান। সিলভার এ্যারো ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির কাউন্টার থেকে জানানো হলো, ছাতক থেকে রাত সোয়া ন’টায় ছেড়ে আসা ওদের বাসটি ঢাকায় পৌঁছে সকাল পৌনে ছ’টায়। তাও এক ঘণ্টা দেরি হয় ঘোড়াশালে। বাসটায় গোলযোগ দেখা দিয়েছিল। সে-বাসটাই আবার আজ সকাল আটটায় চলে গেছে সুনামগঞ্জের উদ্দেশে। তা না হলে বাসের ড্রাইভার ও কন্ডাকটারের কাছ থেকে বিশদ জানা যেত।
সোবহান লতিফ বাসের নাম্বারটা তবু লিখে নিল। তারপর ছুটল থানায়।
পাঁচ.
প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে অবরুদ্ধ দীর্ঘশ্বাসের ভেতরে, হা করলেও হাই ওঠে না, বুক খুলে শ্বাস বেরোয় না, ভীষণ একটা ভারী পাথর পুরো শরীরকে যেন চাপা দিয়ে রেখেছে। রাতে ঘুম হয় না। বন্ধুদেরও দরাজ গলায় আর বলতে পারে না, এগারোটার আগে শুয়ে পড়ি এবং টানা ঘুম হয় আমার। বরং কোনো কোনো রাতে ঘুম ভেঙে গেলে টিয়া দেখতে পায়, ড্রয়িংরুমে বসে আছে সোবহান। একদিন আবিস্কার করলো ভোর পৌনে ছ’টায়, তার মানে সারারাত ঘুমোয়নি। শব্দহীন পায়ে টিয়া গিয়ে বসল ওর পাশে। আলতো মমতায় ডান হাতে মাথার চুলগুলো নেড়ে দিতে দিতে অস্ফুট গলায় বলল, তুমি না-হয় এখানেই ঘুমাও। আমি তোমার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছি।
দু’গাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল লোকটার এবং মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই নাক ডাকাতে শুরু করলো।
হকারের ডোরবেল বাজানোর শব্দ শোনা গেল আরো দেড় ঘণ্টা পর। টিয়া কোল থেকে মাথাটা খুব সাবধানে সরাতে গিয়েও পারল না। ওর দু’পা ততক্ষণে অবশ অবশ, সোবহানের ঘুমও ভেঙে গেছে।
টলমল পায়ে সে উঠে দাঁড়াল, দরোজা খুলে হকারের কাছ থেকে পত্রিকাটি নিয়ে শোবার ঘরে যাওয়ার পথে তাল সামলাতে পারল না। টিয়ার একটা আর্তচিৎকার মিনিট খানেক প্রতিধ্বনির মতো ভাসল চারপাশে। আর কিছু মনে নেই।
তারপর হাসপাতালে…।
ডাক্তার বললেন, যাক অল্পের ওপর দিয়ে গেছে। আপনি যে পুরো একটা দিন সেন্সলেস ছিলেন, তা কিন্তু এখন মোটেও বোঝা যাচ্ছে না। বেশ ফ্রেস লাগছে। হেলথ কন্ডিশনও ভালো, প্রেসার নেই, ইউরিনে সুগারও পাওয়া যায়নি। তবে খুব সাবধানে চলতে হবে, বাছাই খাবার খেতে হবে, আর হাঁটতে হবে দু’বেলা।
সোবহান লতিফ মাথা নেড়ে ¤ান হাসল।
স্মোক করেন না তো?
না।
লিকার?
সে ক্ষীণ গলায় বলল, এক সময় অভ্যাস ছিল, এখন নেই।
ডাক্তার বললেন, গুড, এসবের ধারে কাছে যাবেন না। মন খুলে হাসবেন। বিজনেসের জন্য কি বেশি ট্রেসে থাকেন?
সোবহান লতিফ মাথা নাড়ল, না, বিশ্বস্ত লোকের ওপর সব ছেড়ে দিয়েছি।
ডাক্তার বললেন, দেখুন, দুশ্চিন্তা করে কোনো লাভ হয় না। একটা সময়ে এসে সব মানুষের উপলব্ধি করা উচিত, যা ঘটার ঘটবেই।
সোবহান শুধু বলল, রাইট।
আমরা আপনার সব কিছু পরীক্ষা করে দেখেছি। মেজর কোনো কমপেক্স নেই। আপাতত ফুল রেস্টে থাকুন। ওষুধ দিয়েছি তিনটা। নিয়মিত খান এবং সম্পূর্ণ দুশ্চিন্তাবিহীন থাকুন। ঠিক আছে?
সে ¤ান হেসে বলল, ঠিক আছে।
চিন্তা করবেন না, কালই আপনাকে ছেড়ে দেব। হাসপাতাল আপনার জন্য নয়।
হাসপাতালে যাওয়ার নেপথ্য ঘটনাটি প্রথম জানে টিয়া, কিন্তু প্রবাসী দুই ছেলের কাউকে এখনো বলেনি সে। ওদের মন খারাপ হয়ে যাবে। সুদূর কানাডা থেকে ছুটে এসেছে বাপের জন্য, ঘটনা শুনলে আরো চিন্তায় পড়বে। দেশের পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে বলে দুই ভাই বাপকে কানাডায় যাওয়ার জন্য ফের চাপ দেবে এবং সোবহান যথারীতি যেতে চাইবে না। এই নিয়ে বাপ-বেটাদের মন কষাকষি হবে।
চিন্তা করাই স্বাভাবিক। এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা কানাডায় ঘটে না, ঘটলেও দ্রুত বিচার হয়, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায় অপরাধীরা। এখানে ঠিক তার উল্টো। সিলভার এ্যারো ট্রান্সপোর্ট লিমিটেডের মালিকানা নাকি একজন প্রভাবশালীর, সুতরাং ধর্ষকরা ধরা পড়লেও ওদের বিচার হবে কি-না সন্দেহ। অথচ ময়না তদন্তের রিপোর্টে পরিষ্কার বলা হয়েছে, মমতাজ গ্যাং-রেপের শিকার। ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করা হয়েছে। তারপর লাশ ফেলে দেওয়া হয়েছে ঘোড়াশালের একটি কলাবাগানে। এই ঘটনায় ধৃত তিনজন প্রায় একই রকমের জবানবন্দি দিয়েছে। এর মধ্যে একজন ওই বাসের ড্রাইভার এবং একজন হেলপার। আরেকজন ওদের পূর্ব পরিচিত, বাসযাত্রী। বাকিরা ওঠে ভৈরবের ব্রিজ থেকে। দৈনিকে খবরটি ফলাও করে ছাপা হয়েছিল, সঙ্গে মমতাজের ছবি।
খবরটি কি দেখেছিল সোবহান লতিফ, নাকি দেখেনি, মনে নেই। টিয়ার মনে প্রশ্ন জাগে তুকাইকে কি মেরে ফেলা হয়েছিল? পুলিশ কোনো হদিশই দিতে পারে না। মামলার অবস্থা জানতে চাইলে বলে, তদন্ত ঠিক গতিতে এগুচ্ছে।
দিন গড়িয়ে যায়। সোবহান লতিফও সুস্থ হয়। সকাল-বিকাল নিয়ম করে হাঁটে। হাঁটা-চলার জায়গা হিসেবে সে বেছে নিয়েছে টার্মিনাল, ওভারব্রিজ, মাজার, রেলস্টেশন, বড় সড়কের ফুটপাত ও রেললাইনের ধার-ঘেঁষা বস্তি। কে জানি তাকে বলেছিল, পাগল ও ভবঘুরে মানুষের জন্য এসব জায়গাই হচ্ছে আদর্শ।