কোম্পানি আমলে ঢাকার কালেক্টর হিসেবে কর্মরত ছিলেন চার্লস ড’য়লি (১৭৮১-১৮৪৫)। প্রশাসনিক পদের পাশাপাশি তাঁর সখ ছিল চিত্রাঙ্কন করা। তিনি ঢাকার বিভিন্ন বিষয়বস্তু বিশেষ করে জরাজীর্ণ পুরাতন ইমারত নিয়ে বহু চিত্র অঙ্কন করেছেন। পেশাগতভাবে না হলেও চার্লস ড’য়লি একজন উঁচু মাপের শিল্পী ছিলেন। কাজের অবসরে ছবি আঁকানো তার নেশায় পরিণত হয়। তিনি তার আঁকা ছবিগুলো নিয়ে বেশ ক’টি গ্রন্থ রচনা করছেন। তন্মধ্যে ‘অহঃরয়ঁরঃরবং ড়ভ উধপপধ’ (১৮১৪-২৭) অন্যতম। ঢাকার প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী সম্পর্কে জানার জন্য তার চিত্রগুলো বিশেষভাবে সমাদৃত হয়। ড’য়লি ১৮০৮ থেকে ১৮১৭ সন পর্যন্ত সুদীর্ঘকালব্যাপী ঢাকার কালেক্টর পদে নিয়োজিত থাকার সুবাদে ঢাকার বিভিন্ন বিষয়ে, বিশেষ করে মোগলদের নির্মিত ধ্বংসপ্রাপ্ত ইমারতগুলো নিয়ে বহু চিত্র অঙ্কন করেছেন। ঢাকা বিষয়ক এই ছবিগুলো তিনি ফোলিও আকারে প্রকাশের উদ্যোগ নেন। চিত্রগুলো এনগ্রেভিং বা এচিং (প্রিন্ট আকারে প্রকাশের জন্য খোদাইকরণ পদ্ধতি হলো এনগ্রেভিং এবং এ্যাসিড দিয়ে ধাতব শিটে কিংবা কাচে দাগ কেটে নকশা করার পদ্ধতি হলো এচিং) করার পর ১৮২৩ সন থেকে লন্ডনে ফোলিও আকারে প্রকাশিত হতে থাকে। প্রতিটি ফোলিওতে ৪/৫টি করে ছবি এবং তার সাথে প্রাসঙ্গিক ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত বিবরণ সংযুক্ত রয়েছে। প্রথম ফোলিও প্রকাশিত হয় ১৮১৪ সনে (চিত্র সংখ্যা ৪), দ্বিতীয়টি ১৮১৭ (চিত্র সংখ্যা ৪), তৃতীয়টি ১৮২৬ (চিত্র সংখ্যা ৫, এর একটি চিত্র জর্জ চিনারীর এবং আরেকটি জেমস অ্যাটকিনসনের অঙ্কিত) এবং চতুর্থটি ১৮২৭ সনে (চিত্র সংখ্যা ৫)। এই ফোলিওগুলোই অহঃরয়ঁরঃরবং ড়ভ উধপপধ শিরোনামে পরিচিত। এর সাথে আছে ঝড়সব অপপড়ঁহঃ ড়ভ ঃযব ঈরঃু ড়ভ উধপপধ নামে ঢাকার ইতিহাস সম্পর্কিত বিবরণ। এ কারণে অহঃরয়ঁরঃরবং ড়ভ উধপপধ কে অনেক সময় গ্রন্থ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। মূলত অহঃরয়ঁরঃরবং ড়ভ উধপপধ চার ব্যক্তির পরিশ্রমের ফসল। এর চিত্রগুলোর স্কেচ এঁকেছেন স্বয়ং চার্লস ড’য়লি, প্রাসঙ্গিক ঐতিহাসিক বিবরণ লেখেছেন জেমস অ্যাটকিনসন ও জর্জ চিনারি এবং এনগ্রেভিং (বহমৎধারহম) বা এচিং (বঃপযরহম) করেছেন জন ল্যা-শিয়ার। তারা সকলেই ছিলেন ড’য়লির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ড’য়লির প্রকাশিত অহঃরয়ঁরঃরবং ড়ভ উধপপধ ঢাকা শহরের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত। উল্লেখ্য যে, ছবিগুলো প্রায় সবই এচিং পদ্ধতির মাধ্যমে সাদাকালোতে প্রকাশিত। নিম্নে তাঁর চিত্রিত ঢাকার ম-ইমারত বিষয়ক উল্লেখযোগ্য ছবিগুলোর বিবরণ দেয়া হলো।
প্রথম ফোলিওতে প্রকাশিত চিত্র
১. গঙ্গার বুড়িগঙ্গা শাখা নদীর তীরে অবস্থিত মসজিদের দৃশ্য
১৮১৪ সনে চার্লস ড’য়লির অঙ্কিত এই চিত্রটি মূলত বর্তমান মোহাম্মদপুর এলাকায় অবস্থিত সাত গম্বুজ বা সাত মসজিদের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের পার্শ্বচিত্র যা উনিশ শতকের প্রথম দিকের অবস্থা। তখন বুড়িগঙ্গার নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থিত এই মসজিদটি জীর্ণাবস্থায় বিদ্যমান ছিল। জেমস অ্যাটকিনসন এটির সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে মসজিদটিকে ভেনিসের নয়নাভিরাম ইমারতাদির সাথে তুলনা করেছেন। ইট ও চুনসুরকি দিয়ে আয়তাকার ভূমি নকশায় নির্মিত এই মসজিদটি বাহ্যিক দিক থেকে দৈর্ঘ্যে ৫৮ ফুট এবং প্রস্থে ২৭ ফুট। চিত্রে মসজিদটির নির্মাণশৈলী, জীর্ণাবস্থা, পদ্ম ও কলস শীর্ষদণ্ড সংবলিত গম্বুজ, চতুর্কেন্দ্রিক খাঁজখিলানপথ, গম্বুজাবৃত চারকোনার চারটি দ্বিতল বিশিষ্ট ফাঁপা অষ্টকোণ বিশিষ্ট কোণস্থিত বুরুজ, পলেস্তারা খুলে পড়া ক্ষতবিক্ষত দেয়ালগাত্র, গম্বুজের পিপার গাত্রালংকারে, কার্নিশের নিচের পাড়নকশায় ও মসজিদের ভিত্তিস্থলের পাড় নকশায় মার্লন বা পত্র নকশা ইত্যাদির এক বাস্তবরূপ ফুটে উঠেছে। এছাড়া গম্বুজগাত্র, ইমারতের উপরে ও ভিত্তিমূলে জন্মানো আগাছাও চিত্রকরের দৃষ্টি এড়ায়নি। নদীতে চারজন মাঝিমাল্লাসহ ভাসমান দুটি ও ডান দিকে তীরে বাঁধা দুটি নৌকা, নৌকার ছইয়ের ভেতরে উপবিষ্ট মানব প্রতিকৃতি, পানির ঢেউয়ে প্রতিবিম্বিত মসজিদ ও মাঝিমাল্লাসহ নৌকার প্রতিচ্ছবি, ডান দিকে মসজিদ সংলগ্ন অন্য ইমারতের ছাদপাঁচিলে শুকানোর নিমিত্তে ঝুলানো সাদা রঙের কাপড় ও ছাদে দণ্ডায়মান দুজন মানব প্রতিকৃতি, আকাশে ভাসমান কুণ্ডলাকৃতি সাদাকালো মেঘের সমারোহ ইত্যাদি বাস্তবধর্মী প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি চিত্রকর অত্যন্ত দক্ষতার সাথে উপস্থাপন করেছেন। চিত্রটির প্রেক্ষিত, গভীরতা, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মাপযোখ প্রভৃতি অতুলনীয়। মসজিদটি ষোড়শ শতকের শেষের দিকে নওয়াব শায়েস্তা খান কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়। বর্তমানে মসজিদটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকায় এটি সংস্কারকৃত ও সুরক্ষিত অবস্থায় বিদ্যমান।
২. সাইউফ খানের মসজিদ
বর্তমানে মসজিদটি সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত। প্রকৃতপক্ষে প্রথমে ইমারতটি একটি হিন্দু মন্দির হিসেবে নির্মিত হলেও পরবর্তীকালে মসজিদ হিসেবে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় এবং মসজিদ হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। মসজিদটি তিন গম্বুজবিশিষ্ট ছিল। অযত্ন অবহেলায় ১৮১১ সনের বর্ষায় ইমারতটির গম্বুজসমূহ ভেঙে পড়ে। ১৮১৪ সনে চিত্রিত এই ছবিটিতে মসজিদটির সম্মুখদৃশ্য প্রদর্শিত হয়েছে। ফাসাদে খাঁজবিশিষ্ট চতুর্ভুজা তিনটি খিলানপথ, কেন্দ্রীয় খিলানপথটি পাশের দুটির চেয়ে অপেক্ষাকৃত বড় এবং উদগত করে নির্মিত ও প্রবেশপথের উভয় পাশে অষ্টকোনা আলংকারিক সরু বুরুজসহ কোণস্থিত অষ্টকোণ বিশিষ্ট বুরুজ দৃশ্যমান যা মোগল স্থাপত্যের এক অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কেন্দ্রীয় প্রবেশপথ আয়তাকার কাঠামো বেষ্টিত এবং দেয়ালগাত্র প্রবেশপথের উপরে অনুভূমিকভাবে দুই সারি ও প্রবেশপথের উভয় পাশে উল্লম্বাকারে কুলঙ্গি বা প্যানেল নকশা চমৎকারভাবে চিত্রায়িত হয়েছে। মসজিদটি একটি বটগাছ বা পাকইড় গাছের শিকড়, লতা ও পাতা দ্বারা আচ্ছাদিত। দেয়ালগাত্রের পলেস্তারা খসে পড়ছে। মসজিদের সম্মুখে ঝোপঝাড়, কেন্দ্রীয় প্রবেশপথের সামনে ছত্রি হাতে তিনজন ইংরেজের প্রতিকৃতি, আকাশে ভাসমান কুণ্ডলাকৃতির সাদাকালো মেঘের উপস্থিতি, আলোছায়ার চাতুর্যপূর্ণ ব্যবহার ইত্যাদির চিত্রায়ণ ছবিটিকে জীবন্তভাব প্রদান করেছে।
৩. তাঁতী বাজারের নিকটস্থ সেতুর ধ্বংসাবশেষ
ঢাকার তাঁতী বাজারের নিকটে একটি খালের ওপর নির্মিত মোগল আমলের এই সেতুটি বর্তমানে বিলুপ্ত। ড’য়লি এই চিত্রটিতে তাঁর দেখা সেতুটির ধ্বংসাবশেষ অতি চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। চিত্রে সেতুটি চতুর্কেন্দ্রিক খিলানের উপরে নির্মিত দেখা যায়। সেতুর উপরে রেলিংএ উপবিষ্ট চারজন মানব প্রতিকৃতি, নিচে একটি নৌকায় কর্মরত তিনজন মৎস্যজীবী অথবা বালি বহনকারী, সেতুর দুই পাশে ডালপালাসহ বিভিন্ন বৃক্ষাদি, পানিতে ভাসমান কচুরিপানা ও মৃদু ঢেউ, দূরে পালতোলা নৌকা ও গাছাগাছড়ার অন্তরালে দিগন্ত রেখা, খালের তীরে কুঁড়েঘর, আকাশে ভাসমান সাদাকালো মেঘের সমারোহ ইত্যাদি চিত্রায়নে মোহনীয় দৃশ্যের অবতারণা করা হয়েছে।
৪. ঢাকা শহরের ভেতরের কিয়দংশ
ড’য়লির চিত্রিত এই ছবিটির ইমারত সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত। সুতরাং এর ইতিহাস জানার একমাত্র উৎস এই ছবিটি। বলা হয় ইটের নির্মিত চার স্তরবিশিষ্ট এই ইমারতটি সেসময় ঢাকা শহরের ভেতরে বর্ষা মৌসুমে পানির উচ্চতা পরিমাপের জন্য একটি জলাশয়ের কেন্দ্রস্থলে স্থাপিত ছিল। ইমারতটি একটি উঁচু মঞ্চের ওপর বর্গাকারে নির্মিত এবং এর তিন দিক ইটের উঁচু চত্বরে ঘেরা ও অন্যদিক পানির প্রবাহ আসার জন্য উন্মুক্ত ছিল। জলাশয়ে ঝড়ের সময় ছোট ছোট নৌকা আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ইমারতটির সম্মুখে একটি পায়ে চলা সেতু (ফুটব্রিজ) সংযুক্ত ছিল যার ভগ্নাবশেষ চিত্রটিতে প্রদর্শিত হয়েছে। ইতিহাস বর্ণনাকারী অ্যাটকিনসন অবশ্য পানির উচ্চতা পরিমাপক হিসেবে ইমারতটির ব্যবহার নিয়ে কিছুটা সন্ধিহান ছিলেন। যা’হোক চিত্রে প্রদর্শিত চারতলা বা চার স্তরবিশিষ্ট ইমারতটি ও তার চারপাশের অন্যান্য চিত্রসমূহ ড’য়লি অত্যন্ত বাস্তবধর্মী করে উপস্থাপন করেছেন। ইমারতটির ভগ্নদশা লক্ষণীয়। ইমারতের প্রতিটি স্তর খাঁজখিলানে উন্মুক্ত এবং সর্বোচ্চ স্তরটি গম্বুজে আবৃত। জলাশয়ে জেলেদের মাছ ধরার জন্য জালসহ ভাসমান নৌকা, পাড়ে আগাছায় আচ্ছাদিত একটি পরিত্যক্ত একগম্বুজ ইমারত, তারপরে দালানকোঠা ও গাছপালা এবং ডানদিকে একটি কুঁড়েঘর, আকাশে ভাসমান সাদাকালো মেঘপুঞ্জ, মাঝে মধ্যে উড়ন্ত পাখি, পানির চকচকে ঢেউ, দিগন্ত রেখা, আলোছায়া ইত্যাদি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে উপস্থাপিত হয়েছে। ইমারত গাত্রের প্যানেল নকশা এবং জন্মানো আগাছাও দৃশ্যমান।
দ্বিতীয় ফোলিওতে প্রকাশিত চিত্র
১. মসজিদসহ ছোট কাটরার দৃশ্য
কাটরা অর্থাৎ সরাইখানা। এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য উপলক্ষে আগত অতিথি, পরিব্রাজকদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। ঢাকার বড় কাটরা থেকে ৪৪০ গজ (কোয়ার্টার মাইল) পূর্ব দিকে ছোট কাটরা অবস্থিত। এটির ভূমি নকশা ও নির্মাণ পরিকল্পনা বড় কাটরার মতই, শুধু আয়তনে ছোট বিধায় ছোট কাটরা নামে পরিচিত। ১৬৬৩-৬৪ সনে সুবাদার শায়েস্তা খান এই ইমারত কমপ্লেক্সটি নির্মাণ করেন। এটি দেখতে আয়তাকার। উন্মুক্ত অঙ্গনকে কেন্দ্র করে কাটরার কক্ষগুলো বিন্যস্ত। কাটরায় প্রবেশের জন্য উত্তর ও দক্ষিণ প্রাচীরে দুটি তোরণপথ রয়েছে। কাটরাটি বহু সংস্কার, সংযোজন ও বিয়োজনের মাধ্যমে জীর্ণাবস্থায় এখনো টিকে রয়েছে। বলা হয় যে, শায়েস্তা খানের কিছু কর্মকর্তা ও বর্ধিত পরিবারের বসবাসের প্রয়োজনে এটি নির্মিত হয়েছিল। তবে ড’য়লির চিত্রের বিষয়বস্তু হলো কাটরা প্রাঙ্গণ ও এর অভ্যন্তরীণ মসজিদ। ঐতিহাসিক অ্যাটকিনসন মসজিদটির একটি চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন। চিত্রে কাটরা ইমারত ও প্রাচীর, তোরণপথ ও মসজিদ গাত্রে জন্মানো আগাছা, নারিকেল গাছের ডাল, পলেস্তারা খসে পড়া ইমারতগাত্র, ছোট ছোট ঝোপঝাড় সংবলিত অঙ্গন, অঙ্গনে মসজিদের সামনে দিয়ে বর্ষার পানি বয়ে যাওয়ার চিহ্ন (স্তরীভূত উঠান), মসজিদের সম্মুখস্থ উন্মুক্ত মঞ্চ বা বারান্দায় দণ্ডায়মান একজন ও উপবিষ্ট দুজন মানব প্রতিকিৃতি এবং উপবিষ্ট একটি ছাগল, অঙ্গনে ও তোরণপথের নিচে এবং দূরে দণ্ডায়মান কিছু মানব প্রতিকৃতি, উপরে হালকা সাদাকালো মেঘের সাথে উড়ন্ত পাখি ও নীলাকাশ ইত্যাদি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও দক্ষতার সাথে উপস্থাপিত হয়েছে। ক্ষুদ্রাকৃতির বর্গাকার ইমারতটির উপরিস্থিত শীর্ষদণ্ডসহ শিরালো গম্বুজ, চারকোনায় শীর্ষদণ্ডসহ গুলদাস্তা সংবলিত পঞ্চ অথবা অষ্টতল বা অষ্টকোণ বিশিষ্ট সরু কোণস্থিত বুরুজ, পলেস্তারায় নির্মিত জাফরি দিয়ে আবদ্ধ চতুর্কেন্দ্রিক খিলানপথ। খিলানপথের ডান দিকে কলস ভিত্তিমূলের উপর নির্মিত অর্ধগোলায়িত বুরুজ (খিলানপথের উভয় পাশেই থাকার কথা), আয়তাকার কাঠামো বেষ্টিত খিলানপথের উপরে প্যানেল নকশা, ডান দিকে ইমারতের নিচে চতুর্কেন্দ্রিক খিলান বিশিষ্ট তোরণপথ প্রভৃতি স্পষ্টভাবে চিত্রটিতে প্রদর্শিত হয়েছে। মোটকথা স্থাপত্যশৈলীসহ চিত্রটিতে প্রকৃতির পারিপার্শ্বিক অবস্থার একটি জীবন্ত রূপ ফুটে উঠেছে। তবে ইমারতটি সম্পর্কে ড’য়লি ভুল তথ্য দিয়েছেন। এটি কোনো মসজিদ নয় বরং এটি বিবি চম্পার সমাধি। যতদূর জানা যায় বিবি চম্পা ছিলেন শায়েস্তা খানের বাঙালি পত্নী।
২. পাগলা পুল ও দূরে অবস্থিত ঢাকা শহরের একাংশের দৃশ্য
সতের শতকের কোনো এক সময়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জে মধ্যবর্তী কদমতলীর কাছে নির্মিত পাগলা পুল (সেতু) মোগল আমলের একটি বিখ্যাত স্থাপনা ছিল। ড’য়লি যখন চিত্রটি ধারণ করেন তখন এর অবস্থা ধ্বংসপ্রায়। অ্যাটকিনসন চিত্রকরের ধারণকৃত দৃশ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, হালকা আলো-আঁধারির মাঝে দূর থেকে আংশিক ঢাকা শহর দৃষ্টিগোচর হয়। সূর্যালোকের আংশিক কিরণ যখন উদ্দীপ্ত, বি¯তৃত প্রান্তর ও পুরোভাগের অন্ধকারময় বৃক্ষরাজি এবং সেতুর রোমান্টিক ধ্বংসাবশেষের বিপরীতে ইউরোপীয় অধিবাসীদের সাদা রঙের ঘরগুলো জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। সুবাদার মীর জুমলার নির্দেশে আনুমানিক ১৬৬০ সনে পাগলা নদীর উপরে এই সেতুটি নির্মিত হয়েছিল। ফরাসি পর্যটক ট্যাভার্নিয়ার ১৬৬৬ সনে এটি পরিদর্শন করেন এবং সেতুটিকে ইটের নির্মিত একটি সুন্দর স্থাপনা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে সেতুটি ‘পাগালু’ নদীর উপর নির্মিত। এই নদী বর্তমানে কদমতলী খাল নামে পরিচিত। এটি বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তর শাখা। এই নদীই একসময় ধোলাইখাল নামে পরিচিত ছিল। সেতুটি তিনটি চতুর্কেন্দ্রিক উল্লম্ব খিলানের ওপর নির্মিত। খিলানসমূহের স্প্যান্ড্রেলে একটি করে গোলাপ নকশা বিদ্যমান। সেতুটির মূল আকর্ষণ এর দুই প্রান্তের চারকোনায় নির্মিত অষ্টকোনাকৃতির চারটি বুরুজ (নধংঃরড়হ)। বুরুজগুলো খাঁজখিলান সংবলিত এবং এদের শীর্ষাংশ নিরেট গম্বুজ সংবলিত।
ড’য়লির চিত্রে সেতুটির জরাজীর্ণ ধ্বংসাবস্থা দৃশ্যমান। সেতুর মাঝের অংশ নদীতে ভেঙে পড়েছে। নদীর পাড় ভাঙন, সেতুর ওপরে আগাছার শিকড়ের আচ্ছাদন, ডালপালাসহ বৃক্ষরাজি, ধ্বংসপ্রাপ্ত সেতুর দুই প্রান্তের গম্বুজাবৃত বুরুজ (পঁঢ়ড়ষধ), সেতুর মাঝের খিলানস্তম্ভের ফাঁকে দুজন মানুষসহ ভাসমান নৌকা, আকাশে সাদাকালো মেঘের দৃশ্যায়ন, দূরে পালতোলা নৌকা ও তারপরে ঢাকা শহরের একাংশে ইউরোপীয়দের সাদা ঘরবাড়ি অতীব চমৎকার ও প্রাণবন্তভাবে চিত্রায়িত হয়েছে। ফলে চিত্রটির মধ্যে পরশ পাওয়া যায় এক ধরনের প্রাণস্পর্শী রোমান্টিকতা।
৩. ঢাকার দুর্গ ও বড় কাটরার উত্তর ফটক
ঐতিহাসিক অ্যাটকিনসন চিত্রটির ইতিহাস বর্ণনায় লিখেছেন, দুর্গটি ১৬৯০ সনে পঞ্চম মোগল সুবাদার ইব্রাহীম খান নির্মাণ করেছিলেন। দুর্গের ভেতরে একসময় অনেক দালান ছিল, কিন্তু এখন সেখানে দুর্গপ্রাচীরের অবশিষ্টাংশটুকুই কেবল বিদ্যমান রয়েছে। ঢাকা শহরের কারাগার এখানেই অবস্থিত। মোগল আমলে এই দুর্গের ভেতরে একটি টাঁকশাল ছিল যেটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৯৭ সনে বিলুপ্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ব্যবহার করেছিল। চিত্রের বাম দিকে মোগল স্থাপত্যের অসাধারণ নিদর্শন বড় কাটরার উত্তর তোরণপথ দণ্ডায়মান যা সরাইখানা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। অন্যদিকে ডানে হুসেনি দালান মসজিদের দুটি গম্বুজ দৃশ্যমান।
মূলত এটি ছিল ঢাকার পুরাতন দুর্গ কিল্লা মুবারকবাদ যেখানে লালবাগ দুর্গ নির্মাণের পূর্বে মোগল সুবাদাররা বসবাস করতেন। চিত্রটির বিষয়বস্তু, পারিপার্শ্বিকতা অপূর্ব। ধ্বংসপ্রাপ্ত দুর্গপ্রাচীরের অবশিষ্টাংশের দেয়ালগাত্রে জন্মানো আগাছা, গাছপালা, প্রাচীরগাত্রে উল্লম্ব প্যানেল, সম্মুখে ভূমিতে রাখা ছত্রির নিচে পালকি ও বিশ্রামরত তিনজন বহরা (দুজন দণ্ডায়মান, একজন উপবিষ্ট) শ্রমিক, কোচওয়ান ও লম্ফ উদ্যত অশ্ব, দুটি কুকুর, মাটিতে ঘাস ও ছোট ছোট ঝোপঝাড়, কাটরা ফটকের সম্মুখে মাহুতসহ দণ্ডায়মান হাতি, একটি উঁচু ঢিবিতে উপবিষ্ট শ্রমিক (সম্ভবত মাহুতের সাথে কথোপকথনরত), হুসেনি দালান মসজিদের শীর্ষদণ্ড সংবলিত গম্বুজ, কোণস্থিত সরু বুরুজ, গম্বুজের পিপা ও কার্নিশে মার্লন নকশা, দেয়ালগাত্রে প্যানেল নকশা, আকাশে ভাসমান সাদাকালো মেঘের সমাহার ইত্যাদি চিত্রটিতে জীবন্তভাবে প্রতিভাত হয়েছে। ছবিটি রঙিন না হলেও রঙের কোনো অভাব বোধ হয় না।
৪. ঢাকার লালবাগ দুর্গের প্রতিরক্ষা বুরুজ
লালবাগ দুর্গ সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র যুবরাজ আজম ১৬৭৮ সনে নির্মাণ করেন। কিন্তু তিনি নির্মাণকাজ সম্পন্ন না করেই পিতার ডাকে ঢাকা ত্যাগ করে দিল্লি যান। পরবর্তী শাসক সুবাদার শায়েস্তা খান ১৬৮৮ সন পর্যন্ত এই দুর্গে অবস্থান করেন এবং ধারণা করা হয় তাঁর কন্যা পরী বিবির মৃত্যুতে তিনি এই দুর্গ ছেড়ে চলে যান। ঘটনাটি মোগল সম্রাট আকবরের আগ্রা দুর্গ পরিত্যাগের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। এই দুর্গটি দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকার পর সম্প্রতি প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর পুনঃসংস্কার করে হারানো সৌন্দর্য ফিরে আনার চেষ্টা করেছে। দুর্গটি ঢাকার মোগল স্থাপত্যের প্রধান আকর্ষণ। আনুমানিক আঠারো একর জমির ওপর এই দুর্গটি অবস্থিত। আয়তাকার পরিকল্পনায় নির্মিত এই দুর্গের ভেতরে রয়েছে তিনটি স্থাপনা, যথা- পূর্বদিকে অবস্থিত দিওয়ানখানা, পশ্চিম দিকে অবস্থিত তিন গম্বুজবিশিষ্ট দুর্গ মসজিদ এবং এ-দুটির মধ্যস্থলে রয়েছে পরী বিবির সমাধিসৌধ। এছাড়াও ছিল আস্তাবল, হাম্মামখানা, রন্ধনশালা, পানি সরবরাহ ও ফোয়ারা এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য ইমারত। দুর্গের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে রয়েছে বৃহৎ দুটি প্রতিরক্ষা বুরুজ। এদের একটি দক্ষিণ-পূর্ব বহিঃপ্রাচীরের সাথে এবং অন্যটি দক্ষিণ-পশ্চিম কর্নার প্রাচীরে সংযুক্ত। প্রথমোক্ত বুরুজটি সর্ববৃহৎ এবং এটি ভূগর্ভস্থ একটি কক্ষের সাথে সংযুক্ত যার ভেতর দিয়ে প্রায় ১৮ কিলোমিটার একটি রাস্তা টঙ্গী নদীর সাথে সংযুক্ত ছিল। অন্যদিকে দ্বিতীয় বুরুজটি দ্বিতল বিশিষ্ট। এর উপরিভাগে অর্থাৎ দ্বিতলে পানির আধার দেখে এটিকে ‘হাওয়াখানা’ হিসেবেও ধারণা করা হয়।
ড’য়লির চিত্রে লালবাগ দুর্গের দক্ষিণ-পশ্চিম কর্নার প্রাচীরের দ্বিতল বিশিষ্ট পর্যবেক্ষণ বুরুজটি দৃশ্যমান। ছবিতে দুর্গের দক্ষিণ প্রাচীর ঘেঁষে বুড়িগঙ্গা নদীর প্রবাহ পরিলক্ষিত হয়। যদিও বর্তমানে নদীর প্রবাহ প্রায় এক মাইল দূরে অবস্থান করছে। চিত্রে বুরুজের সম্মুখে দুটি অষ্টকোণ বিশিষ্ট স্তম্ভ, প্রাচীরের ফোকর, স্তম্ভ ও বুরুজের উপরে জন্মানো ঝুলন্ত শিকড়সহ আগাছা, বুরুজের প্রশস্ত অফসেটে দণ্ডায়মান ও উপবিষ্ট কতকগুলো নর-নারীর চিত্র, বুরুজের নিচে নদীর ধারে দণ্ডায়মান একজন মহিলা ও ডান ধারে একটি উপবিষ্ট বলদ গরু, নদীর পানির চকচকে মৃদু ঢেউয়ের মাঝে স্তম্ভ ও বুরুজের প্রতিচ্ছবি, দূর আকাশে উড়ন্ত পাখি ও সাদাকালো মেঘের ফাঁকে নীল আকাশের লুকোচুরির দৃশ্য অত্যন্ত বাস্তবানুগভাবে ফুটে উঠেছে। চিত্রের নর-নারীর মাঝে কর্মচঞ্চলতা লক্ষণীয়।