নাদের নাদেরপুর একজন ইরানি-মার্কিন কবি ছিলেন। ইরানের রাজধানী তেহরানে ১৯২৯ সালের ৬ জুন সংস্কৃতির লালনকারী পরিবার তাকি মির্জা ও খানম মির্জা এর কোলজুড়ে পৃথিবীর আলো দেখেন নাদেরপুর। ইরান শাহর স্কুলে হাতেখড়ি নেয়ার পর নাদেরপুর ফ্রান্সের প্যারিসের সোরবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যের ওপর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে তিনি ইতালির রোমে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতালিয়ান ভাষা ও সাহিত্যের ওপর গবেষণা করেন। তিনি নব্যরীতির ফারসি কবিতার রূপ দেন ও আন্দোলন করেন। ১৯৮৭ সালে ফ্রান্স ছেড়ে আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। আমেরিকায় জীবনের বাকি দিনগুলোতে তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএলএ এবং ইউসি বেরকেলেতে অনেকগুলো লেকচার দিয়েছেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ১৯৪০ সালে প্রকাশিত হয়। সাহিত্যের জন্য নোবেলে মনোনীত এ উত্তর-আধুনিক কবির মোট এগারটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে, ‘চেশমহ ভা দাশ্তহ’ অর্থাৎ চোখ ও হাতগুলো (১৯৫৪), ‘দোখতারে জম’ অর্থাৎ পেয়ালার তনয়া (১৯৫৫), ‘শেরে আঙুর’ অর্থাৎ আঙুর কবিতা (১৯৫৮), ‘শুরমেইয়ে খুরশিদ’ অর্থাৎ আদিত্যের শুরমা (১৯৬০), ‘গিয়াহ ও সাঙ্গ না, অতাশ’ অর্থাৎ চারা ও পাথর নয়, কিন্তু অগ্নি (১৯৭৮), ‘আজ অসেমন ত রিসমন’ অর্থাৎ ঊর্ধ্ব থেকে অধঃ (১৯৭৮), ‘শমে বঝপাসিন’ অর্থাৎ শেষ নৈশভোজ (১৯৭৮), ‘সোবহে দুরগিন’ অর্থাৎ মিথ্যে উদয় (১৯৮২), ‘খোন ভা খকেস্তার’ অর্থাৎ রক্ত ও ভস্ম (১৯৮৯), ‘জমিন ভা জামন’ অর্থাৎ ভূমি ও কাল (১৯৯৬) এবং সঞ্চিত কবিতাগ্রন্থ (২০০৩)। তার কবিতাগুলো ইংরেজি, ফরাসি, পর্তুগিজ, জার্মানি ও ইতালিয়ানসহ বিশ্বের অনেক শক্তিশালী ভাষায় অনূদিত হয়েছে। এ ছাড়াও তিনি ক্ল্যাসিক ও নব্যরীতির ফারসি কবিতার উপর অসংখ্য গবেষণা প্রবন্ধ লিখেছেন। তার কাব্যের ভাব ও ভাষা খুবই প্রাঞ্জল। তিনি পূর্ব প্রতিষ্ঠিত একঘেয়েমি রীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি প্রকৃতি, প্রেম, রাজনীতি, মানবতা ইত্যাদি নিয়ে কবিতা লিখতেন। অনেকে তাকে অন্তর্জগতের কবি বলেছেন। তবে তার রোমান্টিক কবিতাগুলো পাঠ করলে আরব্য ইমরুল কায়েসের কিছুটা স্বাদ আস্বাদন করা যায়। নিজদেশ হতে নির্বাসিত লেখকদের জন্য প্রচলিত সম্মানজনক পুরস্কার “ঐঁসধহ জরমযঃং ডধঃপয ঐবষষসধহ-ঐধসসবঃঃ” এ ভূষিত হন শক্তিমান এ কবি। ইরানের ইমরুল কায়েসখ্যাত নাদের নাদেরপুর ২০০০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি হার্টঅ্যাটাক করে মৃত্যুবরণ করেন। তাকে লস এঞ্জেল এলাকার ওয়েস্টউড মেমোরিয়াল ভিলেজ পার্কে সমাহিত করা হয়।
আঁধারের আলাপন
মধ্যরাতে, যখন আমি রুগ্ণ ও নিদ্রাহীন
যখন কোনো আলো দেখা যাচ্ছিল না এমনকি একটি পিনের ছিদ্র থেকেও
আর তোমার গভীর নিঃশ্বাসের মোলায়েম গীত
আমার হৃদ আত্মার সুরকে সঙ্গ দিচ্ছিল
ঘড়ির টিকির টিকির ধ্বনির বিপরীতে
অতঃপর আমি দেখলাম আমার মগ্নতা কখনো যদি একক হয়,
আমার অন্তর আর আমার বক্ষের অভ্যন্তরে থাকে না।
মৃদুভাবে আমি আমার শিরকে কাতকরে তোমার শয্যার ওপর রাখি
ঘুমের আচ্ছন্নে বুজা অক্ষিপাতায় মৃদু চুমু দেই।
তুমি আঁখিতে চুমুর ভারত্ব বুঝে মুচকি হাসো।
তোমার উষ্ণ চিবুকে চুমু দেই
তোমার হাস্যব্যঞ্জনার প্রতিধ্বনি আমার কানে বাজে,
রাতের নিকষ কালো তরঙ্গে,
তোমার হাস্যরতা বদন প্রতিভাত হয় না।
নীরবেই একটি দেয়াশলাই জ্বালাই
তোমার বদনকে উদ্ভাসিত করতে,
কিন্তু সহসাই দু’ফোঁটা লাল গন্ধক
জ্বলে উঠে আমার কালো দু’আঙুলে পড়ল,
পাকে নাশ হলো ও এর নৃত্য শুরু করল
আর পুনরায় গভীর আঁধার
ছেয়ে গেল আমাদের ক্ষুদ্র সুখশয্যাকে।
আমি স্বগতোক্তি করলাম: এই ঝটতি সংক্ষেপ ব্যতীত
তোমার প্রিয় বদনটি এক ঝলক দেখার সেই মুহূর্তটি
আমার আঁখির আর সৌভাগ্য হবে না।
শিশুর জন্য ভীতিকর আঁধারের ন্যায়,
আমি খুঁজব তোমার আলিঙ্গনের পথ
আমি যেগুলোর নাম বলতে পারি না এ রকম কিছু সংরক্ষণ করব,
তোমার কানের এই ফিসফিস আমি চুরি করবো:
সমগ্র ধরার মমতাময় সৃষ্টির থেকেও মমতাময়!
হায় বন্ধু, প্রিয়া, জননী, এই যাত্রার সঙ্গী!
এমন উচ্চস্বরে আহাজারি করব যে পাথর হৃদয়েরও নাশ হবে
আমাদের পৃথক করিওনা সেই ওয়াদাকৃত মুহূর্তে!
আমাদের উভয়ের জ্ঞাত সেই বিশৃঙ্খলে,
জনতার পিলপিল করে হাঁটার সেই জগতে,
আর সীমাহীন সেই দিগন্তে যা কিছু সহজলভ্য,
আমাদের যদি কোনো অদৃষ্ট থাকে সেটি হলো আমাদের নিঃসঙ্গতা।
আর নৌকোর থেকে ক্ষুদ্র এই বাড়িটি আমাদের নিয়ে যাচ্ছে-
নির্বাসনের সাগরের অন্ধকারাচ্ছন্নতার দিকে।
কিন্তু পাথালের ভীতিকর দিগন্তে
নিশী জয়ী হলো
আর আঁধার কোনো পথ দেখালো না
আগামীকালের জন্য।
কায়সার আমিনপুর শামসি ১৩৩৮ সালের ২ই উরদিবেহেস্তে ইরানের দঝফউল এ জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের ওপর স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। কাব্যগ্রন্থ: তাঁর প্রথম কব্যগ্রন্থ ‘অয়েনেহয়ি নগ্বাহান’ (অপ্রত্যাশিত দর্পণগুলো)। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থটি হচ্ছে ‘তানাফ্ফুসে সুবহ’ (প্রাতুষ্কালের প্রশ্বাসগুলো) ও তৃতীয় কাব্যগ্রন্থটি হচ্ছে ‘তঝে হ’ (সাম্প্রতিকগুলো)।
বর্ণহীন
যদি বর্ণ নাই থাকল
দৃষ্টির দৃশ্যমানগুলো যদি নাই রইলো
তবে কোন কণ্টক রইলো না?
পানির প্রতিফলনে কী আলো ছিল না?
কোন ক্রিমের স্তূপে ছিল যে
পবনের চিকুরে প্রসূন প্রতিভাত হয়নি?
কোন কণ্টক, সবজি ও তৃণাদি হলুদ ছিল?
যে আদিত্য
প্রদক্ষিণ করছিল না?
কোন শিশিরকণা ও কোন ফোঁটাটি
কোন ছায়া ও মরীচিকা
যে আদিত্যও চির সত্য ছিল না?
কোন প্রসূন
সেটি কী মোহাম্মদী প্রসূন ছিল না?
মীম আজাদ ইরানের রাজধানী তেহরানে শামসি ১৩১২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা তেহরানে শেষ করে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের ওপর শামসি ১৩৩৬ সালে সফলতার সাথে সম্মান শেষ করেন। তিনি শিক্ষকতা করেছেন প্রায় দশ বছর। মূলত মীম আজাদ একজন শিশুসাহিত্যিক। তিনি ইংরেজি ভাষা ভালো জানেন এবং বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার কবিতা তিনি অনুবাদ করে শিশুদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন। তার কিছু শিশুতোষ এবং অন্যান্য গল্প সঙ্কলন প্রকাশ হয়েছে।
পত্র
আমি আকাশ থেকেও কঠিন নিরাশ হব
হে বন্ধু,
নৈরাশ্য, নৈরাশ্য
তুমি কি জানো?
এখানে মেঘ কোনো বর্ষণ করেনা
সূর্য আলো দেয় না
নতুন কোনো চারাগাছ রোপিত হয় না
ভূমি ফাঁপা ও ফাঁকা
একটি শুষ্ক তৃণও নেই
নিরাপত্তায়
লাঙ্গলের ফলার কোনো চিহ্ন নেই
আমি আকাশ থেকেও কঠিন নিরাশ
হ্যাঁ!
এই নিস্তব্ধ মরুভূমিতে
একজনকে স্মরণ করি।
কী নির্মল লাবণ্যময়ী প্রসূন!
কী মুক্ত সারভ!
কী দ্রাক্ষালতা!
কী চপল সমীরণ!
কী সূর্যহীন উইলো গাছ!
কী উন্মাদ হরিণা যে ঝোপে নিদ্রাচ্ছন্ন!
কী চমৎকার!
এই নিস্তব্ধ মরুভূমিতে স্মরণ রেখেছি
যে বিহগেরা ভ্রমণগীত সাজাচ্ছিল
পরিবেশ গভীর আঁধার ও নিঠুর হলো
তুমি বললে যে মরুভূমির নিনাদ গগনে হলো।
সেখানকার কথাও স্মরণ আছে
শরৎ হলো
ফুলগুলো অনাবৃত হয়ে মাটি ফোড়ে অঙ্কুরিত হলো
নাম না জানা ফুলগুলো!
ভূমিতে
উৎগত হলো না
অন্য সারভগুলো চিহ্ন হয়ে রইল
অন্যদের জন্য
আসমানের থেকে জাঁকজমকপূর্ণ নির্মল নয়
আবারো আমি আকাশ থেকে কঠোর নিরাশ হব
নৈরাশ্য, নৈরাশ্য
হে বন্ধু।
বেহরুজ জামশিদি ইরানের তৎকালীন বখতিয়ার প্রদেশে ১৯৭২ সালের ২৩ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন বিখ্যাত মুষ্টিযোদ্ধা। তিনি অলিম্পিকে খেলে কিছু পদক জিতেছেন। মুষ্টিযুদ্ধ থেকে অবসরে থাকা জামশিদি কিছু ফারসি রোমান্টিক ও বেদনাত্মক কবিতা লিখেছেন। ‘বিলাপ’ কবিতাটি তাঁর অগ্রন্থিত কবিতার একটি। এই কবিতাটি ‘শেরেনু’ ওয়েবসাইটে প্রকাশ হয়েছে। উক্ত কবিতায় কবি প্রেমবঞ্চিতের মনোবেদনা তুলে ধরেছেন। ]
বিলাপ
আমার বিলাপ হয়ো না, আরোগ্য খুঁজছি
তোমার হাতে ঔষধি চাই না,
আমাকে আমার মতো থাকতে দাও
বাঘ যেমন নীরব নিস্তব্ধ স্থানে থাকে।
আর কিছুই চাই না
সকল ব্যথা ও আপদের প্রতিকার ছাড়া,
নিজ মার্গের পানশালায় গমন করব
সকল ধর্ম ও প্রভু থেকে বিচ্ছিন্ন হব।
আমাকে খুশি ও প্রফুল করো
শোকসভার পুনরাবৃত্তি চাই না,
আমি কোনো নামি-দামি ব্যক্তি নই
যারা নিত্য নতুন পরিধেয় পরে।
তুমি যখন প্রশান্তি অনুভব করো
যখন ভগ্নহৃদ ও নিঃস্ব ভাবো,
বিলাপ যখন সেখানে পৌঁছায়
বলি যে, বিলাপ লজ্জাহীন।
প্রভু জানেন যে সময় হয়েছে
তাই ধরাতে প্রেরণ করেন ঐশী বাণী,
জীবনকে বিমূর্ত করতে চাই না
না মোহরেমের হাতে ভিক্ষাবৃত্তি করবো।
এটা নির্দয়তা যে একজন কবির প্রয়াণের পর
সবাই বলবে, কী নির্মল কাব্য!
আমার চিকিৎসক প্রয়োজন
হ্যাঁ! সেটাই উচিত।
উৎস : শেরে নু সাইট