আমি ঢাকা শহরের মাথায় মুততে চাই- ছবির হাটে জাকিরের চায়ের দোকানের বাদাম গাছটার গায়ে পিঠ ঠেকিয়ে গুড়ের চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ভাবে কামরুল আহসান। চায়ে চুমুক দিয়ে সিগারেটে টান দেয় কামরুল- আচ্ছা, ঢাকা শহরের মাথায় মুতবো ভালো কথা, ঢাকা শহরের মাথাখান কোথায়? এতো মহা যাতনায় পড়া গেলো। কার কাছে জানা যাইতে পারে- ঢাকা শহরের মাথাখান কোথায়?
চায়ের শেষ তলানিটুকু গিলে কামরুল সিদ্ধান্ত নেয়, ঢাকা শহর বিশেষজ্ঞ প্রফেসর মুনতাসীর মামুনের কাছে যামু। হের কাছে গেলেই ঢাকা শহরের কেবল মাথা না, পাও দুইখানেরও হদিস জানা যাবে। চায়ের খালি কাপটা রেখে সিগারেটে ধুমাইয়া টান দেয় একটা। এক টানে সিগারেটের আগুন দাগ চলে আসে। আঙুলে ছ্যাঁক লাগার সঙ্গে সঙ্গে কামরুল সিগারেটটা ফেলে দেয়।
চিন্তাটা ঠিক তখনই ভাঁজ খাইয়া গেলো। হালায় যদি মুততে অয়, তাইলে ঢাকা শহরের মাথায় ক্যান? সমগ্র দ্যাশের মাথায় মোতাই ভালো। একটা আলাদা উত্তেজনা আছে, আছে মর্যাদারও একটা চুলকানি। এই জটিল সিদ্ধান্তে আসার সঙ্গে সঙ্গে কামরুল আবার ভাবতে বসে- তাইলে দ্যাশের মাথা কোথায়? টেকনাফে না তেঁতুলিয়ায়? শালা- মাথায় আগুন লাগে কামরুলের। না শালা দেশে কোনো সহজ সিদ্ধান্ত নেয়া যাইতেছে না। এখনকার কাছে গেলে দ্যাশের মাথা পাওয়া যাইবে?
ভূগোলবিদ আছে কেঠায়? ঝামেলাতো আরও বাড়লো। এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে খুঁজতে হবে ভূগোল বিভাগ। সেখানের কোনো বুজুর্গ প্রফেসরের সঙ্গে কথা বলতে হবে। আজকাল প্রফেসররা তো খালি প্রফেসার না- তারা রাজনীতিবিদও। তাকায় মোবাইলের দিকে- বিকেল সাড়ে পাঁচটা। এখন কোনো সোনার চান প্রফেসররে পাওয়া যাইবে না ক্লাসে। তাইলে? উপায়ডা কী?
জাকির আর একটা সিগারেট দেতো।
পকেটে আছে একুনে ত্রিশ টাকা। এক কাপ চা আর একটা সিগারেট খাওয়া শেষ। আর একটা সিগারেট ধরালে বাসায় যাওয়ার ভাড়া থাকবেতো? যা শালা- ভাড়া না থাকুক আজ হাঁইটা যামু বাসায়, ভেতরে ভেতরে তেতে ওঠে। আর না যাইতে পারলে এই পার্কের একটা বেঞ্চে হুইত্তা থাকুম- মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় কামরুল।
নেন, জাকির আট টাকা দামের একখান সিগারেট ধরে মুখের সামনে। কামরুল সিগারেটা মুখের দুই পাটি দাঁতের মধ্যে রেখে অগ্নিসংযোগ করে ফুটপাথের ক্রিমিনাল রাজা বাদশার মতো। মুখের ভেতরের সিগারেটের ধোঁয়া নাক দিয়ে বাতাসে উড়িয়ে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে করোটিতে নতুন একটা আইডিয়া ধাক্কা মারে- লা লা লা.. মুততেই যদি হয়, তাহলে ঢাকা শহরের মাথায় না, দ্যাশের মাথায় না পৃথিবীর মাথায় মোতাই ভালো। দুনিয়ার কতো রকমের খেলা হয়- এইটাও একটা খেলা। কিন্তু কথা হলো-আগেরই মতো, এতো বড় একখান এই পৃথিবীর মাথাখান কোথায়? এইটা কোন ভূগোলবিদ বলবে? সিগারেট টানতে টানতে কামরুল মাথা ঝাঁকায়। শালার ঝামেলা একের এক বাড়ছে। আর এভাবে ঝামেলা বাড়লে মোতা যাবেনা নে।
আচ্ছা, পৃথিবীর আব্বা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করলে কেমন হয়? ওরা যেভাবে দুনিয়ার কোন লোকটা হাগে মোতে স্ত্রীর সঙ্গে বিছানায় কী করে, তাহাদের নিরাপত্তা বলে কথা- স্যাটেলাইটে প্রতি মুহূর্তে সেইসব দেখে, দুনিয়া জাহানের নিরাপত্তা দেয়, সেই দেশের প্রেসিডেন্টকে জিজ্ঞেস করলে কেমন হয়? জিজ্ঞেস করলেতো ভালো হয় কিন্তু সমস্যা পিছু ছাড়ছে না। ওই ব্যাটার ঠিকানা বা ফোন নাম্বার কোথায় পাবে কোথায় নাট্যকার গল্পকার কামরুল আহসান? আর ফোন নাম্বার পেলে ফোন করলেই যে মি ফারাক ফোন রিসিভ করবে, তার নিশ্চয়তা কী? ধরলো না হয় হেই ব্যাটা ফোন- কিন্তু ও কি বাংলা জানে? ও কী জানে উনিশশো বায়ান্নো সাল, একুশে ফেব্রুয়ারি- আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে….ধুশ, শালা ঝামেলাতো দেখি একের পর এক প্যাঁচ খাইয়া যাইতেছে।
সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার সময়ে পকেটে ছিল তিনশত টাকা। কেবল প্যান্ট পরেছে। চেয়ারে বসে পুরনো জুতোয় ফিতা বাঁধছে।
কামরুল? পেছনে মা এসে দাঁড়ায়।
মা?
ডাইল আর তেল লাগবে।
ফিতা বাঁধা শেষ। মায়ের মুখের দিকে তাকায়। মাকে মনে হয়- অনেক আগে দেখা একটি পুতুলের মুখের মতো। নরম। মিষ্টি। সবুজ ঘাসের ঘ্রাণে ভরা মায়ের মুখ। কামরুলের আরও মনে হয়- মা যখন সংসারের কোনো কিছু চাইতে আসে ওর কাছে, মায়ের মুখের ওপর অপরাধবোধের অথবা অক্ষমতার একটা ভারী পাথর চাপা থাকে। মাকে এই গানি থেকে মুক্তি দিতে চায় কামরুল। কিন্তু কিভাবে, কোন পথে- জানে না। আহারে আমার মায়ের চিরদুঃখী মুখ!
আমি দিয়া যাইতেছি।
মা নিঃশব্দে চলে যায়। কামরুল দোকানে এসে এক কেজি ডাল আর আধা লিটার তেল কিনে মায়ের হাতে দিয়ে এসেছে। আবার ফুটানি করে বাসা থেকে বাসস্টপিজে এসেছে রিকশায়। এমনিতে পকেটে টাকা কম। তার ওপর ফুটানি। অনেক সময় খালি পকেটে ফুটানি মারাতে ভালোই লাগে। বাস আসতে দেরি দেখে ফুটের দোকান থেকে এক কাপ চা সঙ্গে আট টাকা দামের একখান সিগারেট ধরায়। চা সিগারেট শেষ করে বাসে ওঠার সময়ে পকেটে হাত দিয়ে দেখে আছে একষট্টি টাকা। মনটা দমে যায়। দুপুরে খাবার, বাস ভাড়া- চা সিগারেট খাওয়া- কিভাবে হবে? একমাত্র ভরসা বদি ভাই। এই লোকটা একটা হাড়ে হারামজাদা। খুব অপছন্দ করে কামরুল লোকটাকে, বদের হাড্ডি এই বদি, তারপরও মাঝে মধ্যে বদিকে হেংলার মতো তেলাতে হয়। বলতে হয়, বদি ভাই আপনার মতো মারদাঙ্গা প্রডিউসার কয়টা আছে বাংলাদেশে? আপনে আছেন বইলাতো আমরা কইরা কাইটা খাই।
বদি ডান চোখ বাঁকা করে কামরুলের কথা শোনে। কামরুলের কথা শেষ হলে এবং কথা পছন্দ হলে লোকটা পা দুটোকে সোজা করে শরীরটাকে ছেড়ে দেয় রিভলবিং চেয়ারের ওপর- এই কতাটা এক মাত্র তুমিই কও। আর কোনো পোলা কয় না। আবার টেহার দরকার অইলে কুত্তার নাহান লৌড় পাইরা এই আমার কাছে আহে। টাকা লইয়া দরজার ওপারে যাওনের লগে লগে আবার আমারে গালি দেয়- হালায় একটা জাউরা। বোঝো তহন কেমন লাগে? মনে লয় না হালারে ধইরা মারি? এইসব দেইখা মাঝে মাঝে মনে লয়- এই লাইনডা ছাইরা দিই।
বদি ভাই!
কামরুল আঁতকে ওঠে। বদি হারামজাদা নাটক প্রোডিউস করা ছাইড়া দিলে কামরুল আহসান বাঁচবে কেমনে? বদির প্রোডাকশন হাউজ ‘ওলটপালট মিডিয়া’ থেকে এখন কামরুলের দুটি নাটক যাচ্ছে। দুটোই ধারাবাহিক। একটার নাম ‘অচেনা মানুষ’। আর একটা ‘জমিদারের মাইয়া’। দুটোই হিট। আরও একটা নাটক লিখতে বলতাছে বদি ভাই। হেই বদি ভাই যদি নাটক প্রোডিউস করা ছাইড়া দেয়, তাইলে তাল তলায় ছালা বিছাইয়া বইতে অইবে। হালায় অইতে পারে খবিস, তৃতীয় গ্রেডের নায়িকাদের নিয়ে তার লটর পটর আছে, থাউক। এই লাইনে কোন হালায় হাজী সাব?
আরে মিয়া হোনো, হাত তুলে কামরুলকে থামিয়ে দেয় বদিউর বদি। মিয়া, দিলে শিল্প সাহিত্যের জন্য দরদ আছে। সাচ্চা দরদ। ছোটবেলায় আমি গল্প লিখতাম। দুই একটা কবিতাও ছাপা অইচে ম্যাগজিনে।
তাই নাকি? কামরুলকে একটু অবাক হতে হয়। কন নাইতো কোনোদিন।
আরে মিয়া সব জিনিস কী সব জায়গায় কওয়া যায়? আইজ কতা আইলো তাই কইলাম। আর হোনো নায়ক নায়িকাগো লগে থাকতে থাকতে একটা ইশক পয়দা অইচে এই দিলে। তার লাইগা লাইগা আছি। তোমার ভাবিতো আমারে এই লাইন ছাইড়া দিতে কইতাছে। পত্রিকায় ছবি আইচে- নায়িকা রেশমির লগে। আমিও কইছি- বেশি তেড়িবেড়ি করলে রেশমিরে বিয়া করুম।
আবার অবাক হতে হয় কামরুলকে- হাচাই?
কী হাচাই?
আপনে রেশমিরে বিয়া করবেন?
আরে তোমার মাতা খারাপ? ওর নাহান একটা ধমুসিরে আমি ক্যান বিয়া করুম? আমি এহন কতা কই বিজলির লগে।
বিজলির লগে!
আরে কামরুল তুমি আতকাইয়া গেলা যে! জানো, ফি রাইতে বিজলি আমারে ফোন দেয়।
ক্যান ফোন দেয়?
রহস্যের হাসি বদিউর বদির ঠোঁটে- ওইসব তুমি বোঝবা না।
কামরুল আহসান বাথরুমে ঢোকে। প্যান্টের জিপার খুলে কাজ সারে কমোডে। আহ কী আরাম! প্রস্রাব করতে করতে হো হো করে হাসে কামরুল। মাস তিনেক আগে এক শুটিংয়ের সময়ে রেমশি যে প্যাদানি দিছে বদিরে… আহারে বদি মনে করছে কামরুল কিছু জানে না। আসলে কামরুল আহসান সব জানে। শুটিংটা ছিল ঢাকার বাইরে। কামরুল গিয়েছিল শুটিংয়ে। রাত এগারোটার দিকে নিজের রুমে যাচ্ছে। যেতে যেতে পড়ে রেশমির রুম। রেশমির রুমের সামনে আসতেই শোনে চাপা গলা-আপনি আমার রুমে এতো রাতে কেনো এসেছেন?
ক্যান আইচি তুমি বোঝো না সোনা? অনুনয় করে বদি।
এখানে বোঝাবুঝির কী আছে? কেউ যদি দেখে- আপনি আমার রুমে ঢুকেছেন, আমার সম্মান থাকবে? আর আপনি জানেন আমার স্বামী আছে। আপনার নাটকে কাজ করি টাকা নিই। আপিন আমাকে ডিসটার্ব করেন কেনো? আপিন আমাকে কী মনে করেন?
রেশমি, তুমি চেতে যাইতেছো কেনো?
চেতে যাবো না কী করবো? আপনি আমাকে আজে বাজে মেসেস পাঠান কেনো? তোমারে ছাড়া বাঁচমু না মার্কা মেসেস যদি আমার জামাই দেখে-সংসার টিকবে?
রেশমি, আমি তোমারে বিয়া করুম।
আপনে আমারে বিয়া করবেন? বাসায় আপনার বৌ আছে না? শুনেছি- আপনার ছেলেমেয়েও আছে। করতেন ইট সিমেন্ট রডের ব্যবসা। আপনি শিল্পী আর শিল্পের বোঝেন কোনডা? হাতে কাঁচা পয়সা অইচে, আইচেন শিল্প মারাইতে। শিল্প অতো সোজা না। আপনি এখন যান, আর আমাকে ডিসটার্ব করবেন না।
রেশমি!
আপনি যান তো। সারাদিন শুটিংয়ের ধকল গেছে। এখন ঘুমাবো।
কামরুল রুমের সামনে থেকে দৌড়ে চলে আসে। সেই রেশমি আপা বদি মিয়ারে করবে বিয়া? বিয়া বুঝি আমলকী। গাছ থেকে পারলেই হয়। শালা বাইনচোদ, আবার গল্প ফুটায় বিজলি ওকে রাতে ফোন দেয়! বিজলি এই সময়ের ব্যস্ত একখান নায়িকা। বিজলি যে নাটকে থাকে সেই নাটক হিট…। আর বিজলি….।
এই বদি মিয়ার কাছে আসার জন্য বাসা থেকে বের হয়েছে কামরুল। শনিরআখড়া থেকে পল্টন। শালা নাম একখান রাখছে শনিরআখড়া! শনি এখানে পায়ে পায়ে। অনেক লোকরে জিগাইচে কামরুল- ভাই এই জাগার নাম শনিরআখড়া রাখছে কেনো?
কেউ কিছু বলতে পারে না। দুই একজন বলেছে- এইখানে প্রায়ই এক্সিডেন্ট অইয়া মানুষ মরতো হের লাইগা শনিরআখড়া রাখছে।
কামরুল হাসে, আরে ব্যাডা এক্সিডেন্ডে তো এখনও এখানে মানুষ মরে, মইরা ছাতু অইয়া যায়। আর কী এখানে মরে? মরেতো সারা বাংলাদেশে। মনে হয় বাংলাদেশ বিষাদ মৃত্যু উপত্যকা। এখানে মরাটাই স্বাভাবিক। বেঁচে থাকাটা অপরাধ। যাহ শালা মাথার মধ্যে দেহি জ্ঞানী মানুষের কথাবার্তা আসতেছে। লক্ষণতো খারাপ। ছত্রিশ সিটের মিনি বাসের মধ্যে কমপক্ষে ষাটজন যাত্রী বিষাক্ত নিশ্বাসের মতো একে অপরের গায়ে লেপ্টে রয়েছে। বসার যাত্রীদের চেয়ে রডের যাত্রী অনেক বেশি। কামরুল চাপতে চাপতে বাসের শেষ সীমায় চলে এসেছে। আরও চাপতে হলে বাসের দেয়াল ভেঙে বাইরে পড়তে হবে। অবশ্য সে সাধ্য কামরুলের নাই। বাসের মধ্যে এতো চাপ আর তাপ- মনে হচ্ছে ভর্তা হয়ে যাবে। অন্যদিকে যাত্রাবাড়ীর মুখে এসে প্রায় শ’দুয়েক বাস ট্রাক রিকশার মাঝখানে কামরুলকে বহন করা বাসটাও দাঁড়িয়ে ঝিমাচ্ছে। যাত্রাবাড়ী এলে বোঝা যায়- জ্যাম কতো প্রকার ও কী কী? বাস এক মিনিট চলেতো আধাঘন্টা বিশ্রাম নেয়। বাসের বিশ্রাম আর কামরুলদের শ্রান্তি নিয়ে বাস চলতে চলতে মতিঝিল আসে সাড়ে বারোটায়। মতিঝিল নেমে হেঁটে যায় একটা সিনে পত্রিকা পাক্ষিক নয়নতারা’র অফিসে।
সিনে পত্রিকার সাংবাদিক আজহারউদ্দিন খুব পছন্দ করে কামরুলকে। গত সপ্তাহে আজহারউদ্দিন বলেছিল আসতে। একটা ইন্টারভিউ নেবে। এমনিতে কামরুল ইন্টারভিউটিউ দেয় না। নিজেরে একজন স্বাভাবিক মানুষ ভাবে। কিন্তু এক প্রযোজক বলেছে- পত্রিকায় ইন্টারভিউ দেবেন। পত্রিকায় ইন্টারভিই ছাপা হলে রাইটার হিসাবে ডিমান্ড বাড়ে। আমরাগোও সুবিধা। সে জন্য এসেছিল পাক্ষিক নয়নতারা অফিসে। কিন্তু আজহারউদ্দিন নাই। সেলে ফোন দিলে আজাহারউদ্দিন বলে- কামরুল ভাই আমি আইজ আপনার ইন্টারভিউ নিতে পারুম না। আপনি আর একদিন আসেন।
ক্যান পারবেন না?
আমি অফিসের বাইরে।
আমাকে তো আজ আসতে কইছিলেন।
কইছিলামতো ঠিকই। কিন্তু ভাই সম্পাদক আমারে এক অ্যাসাইন্টমেন্ট ধরাইয়া দিছে-
এখন আপনি কোথায়?
আমি এখন নায়িকা দিলরুবা কস্তুরীর বাসায়। অনেক দিন ঘোরাঘুরি করে আইজ নায়িকার শিডিউল পাইচিতো কামরুল ভাই। এইবার তারে লইয়া কভার স্টোরি করবো। মাইন্ড কইরেন না। আপনি আর একদিন আসেন। আমি আমাদের পত্রিকায় আপনার কালারফুল ছবিসহ খুব এক্সক্লুসিভ একটা ইন্টারভিউ করে ছাপিয়ে দেবো।
আইচ্ছা।
পাক্ষিক নয়নতারা অফিস থেকে বের হয়ে আবার হাঁটতে থাকে কামরুল। হাঁটতে হাঁটতেই ঢাকা শহরের অর্ধেক চিনেছে। এখনও হাঁটতে ভালো লাগে। মানুষের হাঁটা কি কেনোদিন শেষ হবে? এই মানুষগুলা এতো হাঁইটা যায় কই? পৃথিবীতে কতো মানুষ হাঁটে? প্রতিদিনের সব মানুষের হাঁটা যদি মাপা যায়- মাইগড কয়েক কোটি মাইল হবে নিশ্চয়ই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে মাপামাপি করবে কোন শালায়? দৈনিক বাংলার মোড়ে এসে মুড়ি বানানো খায় পাঁচ টাকার।
সেল বাজে। চোখের সামনে মেলে ধরে ডায়াল। যা ভেবেছে ঠিক তাই। বদিউর বদি ফোন দিছে। কানে ধরে সেল- বদি ভাই, আইতেছি। ধরেন পনেরো মিনিট।
ওকে।
বদি ফোন রাখে। কামরুল বায়তুল মোকাররমের সামনে দাঁড়াইয়া আকাশের দিকে তাকায়। না, কোথাও এক রত্তি আকাশ দেখা যায় না। কংক্রিটে কংক্রিটে আকাশ ঢেকে গেছে। মনটা খারাপ হয় কামরুলের। আরে- তোদের মতো আমার টাকা পয়সার আকাক্সক্ষকা নাই। আমার শখ একটু আকাশ দেখার। তোদের আগ্রাসী জিহ্বার কারণে তাও দেখতে পারুম না?
মুড়ি খাওয়া শেষ হলে ঠোঙাটা ফেলে দিয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মোছে কামরুল। মুখ মুছতে মুছতে হাঁটে। ঢোকে বদিউর বদির রুমে। বদি চেয়ারে বইসা পা দুইখান দুইদিকে ছেড়াইয়া দিয়া সিগারেট টানতেছে।
আসো মিয়া, তোমার লাইগা বইসা আছি। ইস্কিপ্ট আনছো?
হাতের প্যাকেটটা বের করে দেয়- নেন।
প্যাকেট হাতে নিয়ে খোলে। দেখে পান্ডুলিপি গভীর মনোযোগের সঙ্গে। টেবিলে রেখে তাকায় কামরুলের দিকে- নায়িকারে এইবার দৃশ্য বাড়াইয়া দিছোতো?
ঘাড় নাড়ে কামরুল- দিছি ভাই।
চা খাও? এ্যাই ফারুক- এদিকে আয়। কামরুলরে চা দে। আবার তাকায়- তোমারে আমার এই জন্য ভালোলাগে- তুমি শুটিংয়ের আগে আগে ইস্কিপ্ট দিয়া দাও। কথা চালাতে চালাতে টিভি ছাড়ে। ফক্স চ্যানেলে একটা ফাইটিং ছবি চলছে। বসে বসে দেখে কামরুলও। আড়াইটার দিকে কারেন্ট চলে যায়।
ধুশ শালা, একটা সিনেমা দেখুম তাও পারুম না। কামরুল? আমি যাই।
যাইবেন?
হ, তোমার ভাবী আইজ হের কোন বান্ধবীর বিবাহ বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যাবে। এগারো হাজার টাকার গিফট কিনছি। যাই। তুমি আগামী সপ্তাহে আইসো।
আপনি কইছিলেন আজ স্ক্রিপ্ট দিলে টাকা দিবেন।
কইছিলাম নাকি? বদির চোখেমুখে বিস্ময়।
হ্যাঁ বলেছিলেন। সে জন্য গত পাঁচদিন বাসা থেকে বের হইনি। দিনরাত লিখে আপনার স্ক্রিপ্ট নিয়ে এসেছি- পনেরো পর্ব। আজ আমারে অন্তত দশ পর্বের টাকা দেন।
দরজার দিকে যেতে যেতে বদি ফিরে তাকায়- কামরুল, আমি নাটকের প্রযোজক। নাটকের স্বার্থে আমাকে কতো কিছু বলতে হয়। তাই হয়তো বলেছি। না বললে তুমি ইস্কিপ্ট দিতা? আর তোমার টাকা মাইর যাবে না। তুমি আগামী সপ্তাহে এসে টাকা নিয়ে যেও। তোমার ভাবি ফোন দিতাছে। আমি যাই। হেলে দুলে চলে গেলো বদিউর বদি।
রুমের মধ্যে পাকা তালের মতো বসে আছে কামরুল। মাথাটা ঘুরছে ভনভন করে। ছোট ভাই রুমনের জন্য কমপক্ষে দশ হাজার টাকা দরকার- দুদিনের মধ্যে। আগামী পরশু কলেজে ভর্তির শেষ ডেট রুমনের। বাসায় বলেছে- টেনশন করার দরকার নাই। বদি ভাইতো বলেছে স্ক্রিপ্ট দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে টাকা দেবে। পঞ্চাশ হাজার টাকার মধ্যে পনেরো হাজারতো দেবেই। সেখানে একেবারে চিচিংফাঁক! এই মুহূর্তে কামরুল আহসান একটা ফাটা বেলুন। এতোক্ষণ কতো চিত্রকল্প ছিল- বদিকে স্ক্রিপ্ট দিলে বদি টাকা দেবে। টাকা নিয়ে সোজা চলে যাবে সাকুরায়। দুইটা বিয়ার আর অর্ধেক রোস্ট খাবে। খাওয়ার পর ছবির হাটে যাবে- পরিচিত কাউকে পাওয়া গেলে আড্ডা দেবে। অথচ মাউরা হারামজাদা- একেবারে গনেশ উল্টিয়ে দিলো? ভাবতে ভাবতে মনে পড়ে ইস্কাটনের একটা প্রোডাকশন হাউজেও টাকা পাবে। তাও মাস তিনেক আগের টাকা। পল্টন থেকে বের হয়ে একটা রিকশা নেয় ইস্কাটনে। ইস্কাটনে রিকশা থেকে নামার পর রিকশা ভাড়া দেয়ার পর পকেটে আছে উনিশ টাকা। রিকশা থেকে নেমে ছয়তলায় উঠে দেখতে পায় অফিস বন্ধ। মনে হলো মাথায় বাজ পড়েছে। স্থির হয়ে তালার দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে হচ্ছে তালাটা কামরুলের যাবতীয় প্রশ্নে উত্তর দেবে- ভাইজান, কোকিলা প্রোডাকশনের মালিক কাম ডিরেক্টর শেখ মাসুদ গেছে শুটিংয়ে- ধামরাইয়ে। আপনিতো জানেন নতুন নায়িকা সীমানাকে নিয়ে শেখ মাসুদ এখন ভীষণ ব্যস্ত। ডাইনে বায়ে তাকানোর সময় নাই তার। আপনি আরও কয়েকদিন পরে আসেন।
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে কামরুল। মাথা নাড়ায়- জি তালা সাহেব আপনি ঠিকই কইছেন। আমি এখন যাই। কয়েকদিন পরেই আসবো।
আপনের মুখ দেখে বুঝতে পারছি আপনি ঝামেলায় আছেন। আপনার উচিত ছিল আসার আগে একখান মবিল করা- তালার কথায় মনে পড়ে সত্যিইতো, একটা মোবাইল করলে ভালো হতো। মাঝখান থেকে রিকশাভাড়া ত্রিশ টাকা যেতো না। কিন্তু পকেটে যে একখান মবিল ফোন আছে সেইটাইতো মনে ছিল না। কেনো ছিল না? আসলে টাকা পাওয়ার একটা উত্তেজনা ভেতরে খুব কাজ করছিল। শালা কামরুল আহসান, হুমুন্দির পুত।
আইচ্ছা তালা সাহেব আসি। বাই। সিঁড়ির দিকে ঘুরে দাঁড়াতেই শুনলো কেউ একজন হাসছে। কে হাসছে? আবার ঘোরে তালার দিকে। আরে হালার তালাইতো হাসে- আবার আইসেন কামরুল ভাই।
আসবো- কামরুল আর দাঁড়ায় না। হনহন করে নিচে নেমে আসে তালাকে কোনো কথা বলার বা হাসার সুযোগ না দিয়ে। ইস্কাটন থেকে হেঁটে আসে শাহবাগ মোড়ে। বাস প্রাইভেট গাড়ি ট্রাক রিকশা মিলে এক মহা ভজঘট। তার মধ্যে নানান কিসিমের লোক-এদিক থেকে ওদিক, ওদিক থেকে এদিকে- যে যেভাবে পারছে ছুটছে। মনে হচ্ছে মানুষগুলো উড়ে যেতে চায়। শাহবাগের মোড়ে থাকতে চায় না। কামরুল একটা বাস চাপা পড়তে পড়তে কোনোভাবে বেঁচে জাদুঘরের সামনে খাড়ায়। যদি বাসের নিচে পড়তো- কী হতো? শরীর কাঁপছে থরথর করে। একেবারে থেঁতলে কিমা পরাটা হতো। কেউ কী মাকে বাবাকে খবরটা দিতো? হয়তো সেল ফোনে কেউ দিতো হয়তো দিতো না। অথবা সেল ফোনটাই মেরে দিতো। এই সেল ফোনটার প্রতি কামরুলের একটা দুর্বলতা আছে। অনেক টাকা দিয়ে কিনেছে-সাড়ে আট হাজার টাকা। জীবনের প্রথম শৌখিন একটা শখ পূরণ করেছে সে। কিন্তু মাকে বলেছে এক বন্ধু উপহার দিয়েছে। সাড়ে আট হাজার টাকায় মোবাইল সেট কিনেছে বললে মা কি কিছু বলতো? আচ্ছা কামরুল আহসান শাহবাগের মোড়ে বাসের নিচে পড়লে কে কে কষ্ট পেতো? দূর শালা এসব ভাবছি কেনো? কামরুল আহসান নিজের গালে নিজেই একটা চটকানা মারে- চল শালা ছবির হাটে।
ছবির হাটে অনেক লোক। কিন্তু জাকির ছাড়া কেউ তার পরিচিত নয়। জাকিরও ভালোভাবে চেনে না। মাঝে মাঝে এখানে বসে চা খায়, তাই মুখ চেনে। চা সিগারেট খাওয়ার পর কলরব মুখরিত সন্ধ্যাটা বসে বসে উপভোগ করে কামরুল সর্বহারা একজন নাগরিকের মতো। মানুষের, তরুণ তরুণীদের এই উৎসব আর মিছিলের মধ্যে থেকেও গল্পকার নাট্যকার কামরুল কোথাও নেই। কেমন একা একজন। উদাস চোখে সব দেখতে দেখতে ভাবে- জীবন থেকে প্রতিদিনের মতো আরও একটি দিন হারিয়ে গেলো। অথচ পকেট প্রায় শূন্য। আগামী পরশু কিভাবে রুমনের টাকা জোগাড় করবে? বাসা ভাড়ারও চাপ এসে যাচ্ছে। বিষন্ন ভাবনাকে বুক পকেটে ঝাপটে ধরে উঠে পড়ে। আবার হাঁটতে থাকে শাহবাগের মোড়ের দিকে। সেই যাত্রাবাড়ী শনিরআখড়ার বাসে উঠতে হবে।
অনেক ভিড়ে চিড়ে চ্যাপটা হয়ে একটা বাসে উঠে দাঁড়ায়। কন্টাকটর চিলায়- ভাই, আর একটু ভেতরে যান। ভেতরে যান। কামরুলের কোনো ইচ্ছা কাজ করে না, বিষাক্ত মনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে মানুষের ভেতরে এক টুকরো খড় কুটোর মতো। মানুষে ঠেসে ঠেসে উঠছে। কামরুলও চাপছে। বাস ছেড়ে দিয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, মৎস্য ভবন পার হয়ে বাস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছাড়াচ্ছে, কামরুল রডে ঝোলানো বাম হাতে পেলব নরম একটা স্পর্শ পায়। নিজের জগৎ থেকে ফিরে এসে তাকায়, পাশে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে। খুব সুন্দরী বলা যাবে না, আবার অসুন্দরও বলা যাবে না। চলন সই মেয়ে। গায়ের রঙ ফরসাই। চকচকে গাল। মাথায় বেশ চুল। কখন? কখন এই মেয়ে ভিড় ঠেলে এখানে এসে দাঁড়িয়েছে? মানুষের ধাক্কায় আবার মেয়েটির পেলব হাতের স্পর্শ লাগে কামরুলের বাম হাতে। মেয়েটি চকিতে এক পলক তাকায়। চোখে চোখ পড়ে কামরুলের। কালো এক জোড়া চোখ। সঙ্গে সঙ্গে কামরুলের ভেতরের সারা দিনের ক্ষোভ বেদনা হতাশা কোথায় হারিয়ে যায়। মন প্রাণ এক অনাবিল উচ্ছ্বাসে রবীন্দ্র সঙ্গীতের মতো নেচে ওঠে। মনে হলো- পৃথিবীটা কতো সুন্দর! বেঁচে থাকায় কতো আনন্দ!