বুদ্ধদেব বসুর প্রেরণায় ১৯৫৪ তে, লোকনাথ বাবু র্যাঁবোকে বাঙালি পাঠকের সামনে আনেন। তাতে এই শিরোনামটি পেয়ে কবিতা নিয়ে কিসব আবোল-তাবোল ভাবছি যেন। অপার, অসম্ভব, বিস্ময়কর কেন কবিতার জগৎ; সে প্রশ্ন পাঠানুরাগীদের সাথে আমাকেও ভাবায়, চিত্তে রয়ে যায়, ধরে বসে। পাঠচিন্তায় আসে আরও নানাবিধ প্রশ্ন- কবিতার উৎস ও উৎপত্তি নিয়ে। কবিতার যে অদম্য ও অসীম শক্তি, যা চিরকাল করায়ত্ত করে চলেছে মানুষকে, কিংবা মানুষ তার কাছে গেছে অনিবার্যভাবে- এর কারণ কি? আর্য-পূর্বযুগে যা পাওয়া যায় অতঃপর ক্রম-সম্প্রসারিত মনুষ্যচিন্তা জগতে কবিতায় যা ঘটে তা কতো অতিক্রমী ও উদ্যমী- তেমনটা কে-না জানে! কিন্তু পুনর্প্রশ্ন কেন কবিতা? কবিতা-নন্দনে আরও একটি রহস্যঘেরা ব্যাপার আছে শিক্ষিত-অশিক্ষিত, জ্ঞাত-অজ্ঞাত নির্বিশেষে কবিতা-আকৃষ্ট করার বিষয়ে, শ্রেণি-বর্ণ নির্বিশেষে তার আভামণ্ডিত চৌম্বকদৃষ্টির অনিবার্য কৃত্য প্রসঙ্গে। সমাজসৃষ্ট প্রকৃতরূপ তো কবিতায় নেই! সমাজের চলনবলন, সংঘাত-দ্বন্দ্ব, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া তো ওভাবে থাকে না কবিতায়। থাকার কথাও নয়। থাকলে কবিতা অতো বেশি আকর্ষণীয় হতো না। রামায়ণ, মহাভারতে আমরা কি দেখি- মুগ্ধ মোহময়তাই ওর প্রধান উপজীব্য। নইলে কতোকালের ধারায় তা কেন এখনও বহমান! শুধু তাই নয়, তাতে এক ধরনের আচ্ছন্নতার ব্যাপারও রয়েছে, মহাভারত সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন : ‘কোনো কোনো কবি এই ইতিহাস পৃথিবীতে পূর্বে বলেছিলেন, কেউ কেউ সম্প্রতি বলছেন, ভবিষ্যতে অন্য কবিরাও বলবেন।’ এতেই এর দার্ঢ্যর প্রমাণ মেলে। আর সেটি তো কবিতা বটেই।
বস্তুজ্ঞান ধারণা থেকে মানুষের কল্পনাশক্তির আহরণ ঘটে। কল্পনার ভিত্তিও দ্বান্দ্বিক, আর দ্বন্দ্বটি আসে সমাজ থেকে, সমাজের প্রতিশ্রুত প্রণোদনা সেখানে গৃহীত। এরূপে অভিজ্ঞতার ভিত্তিটি কবি স্ব-উদ্যোগে গ্রহণ করেন। এ উদ্যোগটি তার প্রেরণা, ‘অন্তর হতে আহরি’- জীবনানন্দ দাশ বলেন, এমনটি সবার মধ্যে আসে না; কারো কারো মধ্যে তা বিরাজমান। উত্তর-প্রজন্ম তা নিজের মতো গ্রহণ করতে সক্ষম হয়, পায় তাতে নিজেদের কর্মপ্রেরণা। তবে আরও বলতে হয়, অদ্যকার সময়ে, জটিল বস্তু-অভিজ্ঞতা কবিতাকে দিয়েছে আরও অনন্য অভিপ্রেত-সংকেত। কিভাবে? আধুনিক জীবনের অনুসৃত কর্মকাণ্ডের অনিবার্য উপাদানসমূহ সমবায়ে গঠিত সংস্কৃতি কবিকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করে। সেখানে কবি গ্রহণ করেন নীরব বা সরব যাবতীয় সব আরাধ্য দান-প্রতিদান। কবি নিজেই সেখানে অদ্বিতীয় এবং অনিরুদ্ধ হয়ে ওঠেন। স্বীয় প্রণোদনায় প্রকাশ করেন সর্বার্থ ও ততোধিক শব্দ। সে শব্দে গৃহীত হয় তার যাবতীয় অহঙ্কার। এই অহঙ্কারই কবিব্যক্তিত্ব। যা পাঠক-গ্রহণে থাকে না কোনো দ্বিধা, সংশয়। সেটি শুধু কোনো বিশেষ কালে বা সময়ে নয়- চিরন্তন, চিরকালের। আবারও প্রশ্নটি আসে তা কেন? কারণ, জীবনের দুর্বিনীত ও সুখদ প্রত্যয়গুলো থাকে তার ভেতরে বা বাইরের কর্মকাণ্ডে বন্দী। কর্মকাণ্ডের বিনয়াবনত বা উদ্ধত সন্ধিৎসা তাকে সারাক্ষণ বিচিত্ররূপে আলোড়িত করে। করে তোলে অনন্তমুখী, দুরাভিসারী। উদাহরণে, এখনকার সবচেয়ে প্রভাবিত কবি জীবনানন্দ দাশ কিংবা আমাদের অন্যতম প্রধানকবি শামসুর রাহমান বা অন্য কেউ কিছু পঙক্তিমালায় এ শর্তে উঠে আসতে পারেন, যখন অদ্যকার সময়বৃত্ত আমাদের প্রতিপাদ্য :
ক. এখনও নদীর মানে স্নিদ্ধ শুশ্রুষার জল
নারী মানে তুমি
খ. তবুও নক্ষত্র শিশির আর নারীর প্রণয়
জানি সত্য নয়
গ. কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার
‘সংস্কারমুক্ত শুদ্ধ তর্কের ইঙ্গিত’ কবিতার অনিবার্য প্রসঙ্গ, জীবনের ভেতরের প্রবণতা ও প্রতিশ্রুতি এরূপে নির্ণীত। কবির যাবতীয় প্রণোদনাও তাতে গৃহীত, নিজের মতো করে কবির মধ্যে তার প্রস্তুতি থাকে। যেমনটি আগেই বলা গেছে, দ্বন্দ্বের ভেতরে যাবতীয় প্রস্তুতি তৈরি থাকে কবির। সেখানে তার রুচি-জিজ্ঞাসা যেমন নির্ণীত তেমনি বৃহত্তর পটে তার রাজনৈতিক-আর্থনীতিক বাস্তবতাও পরিচর্যা পায়। তবে সবকিছুই ঘটে উদ্ভূত সমাজবাস্তবতা থেকে। যেমনটি আগেই বলা গেছে, কবিতার ভেতর-সন্ধানী নানাবিধ প্রবণতার কথা। উপর্যুক্ত তিনটি পঙক্তিতে চলমান অভিজ্ঞতা দৃঢ়তর হয় আর তার অপরপৃষ্ঠে দীপ্যমান থাকে সর্বান্তঃকরণ দ্বিধাহীন সন্ধিৎসা। সে সন্ধিৎসায় কী থাকে? কী তার কর্ম্ম! কেমন তার উপভোগ? পরিস্রুত ওই পঙক্তিতে, ‘অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে’, প্রেম-প্রণয় ও অনিবার্য সর্বার্থ। বোধের কিনারে চিরজীবনের মায়া। বাঁচার অনন্ত তৃষা। কিভাবে তা উচ্চারিত? ‘a certain ordering of the experience বা It is nothing if not immediate এবং Poetry is a special use of word’ এমন সব তাত্ত্বিক অনুভবগ্রাহ্যতার ভেতরে কবিতা নিজেই নিজের হয়ে ওঠে, দুরূহতর বিষয়কে কিংবা দূরতর বিষয়কে একান্ত এবং অনিবার্য করে তোলে। কারণ, কবিতা এরূপেই জীবনের কেন্দ্রে পৌঁছায়, সর্বান্তঃকরণে তোলে আলোড়ন।
বক্তব্যে বিচ্ছিন্নতা মনে হলেও, এরূপ আলোচনায় কবিতা সম্পর্কে জীবনের বিবর্তন বা পরিবর্তনও কম চোখে পড়ে না। আবার উল্টোটিও বলা যায়, জীবনের পরিবর্তনগুলোও কবিতায় সহজাতরূপে গৃহীত হয়। সুতরাং কবিতা যে পরিপূরক-পরম্পরা সেটি অস্বীকার করা যায় না। সে কারণেই ওতপ্রোত শব্দসমূহ কবিতা ধারণ করে গ্রহণ করে অনিবার্যরূপে। আর জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে কবিতা তার আঙ্গিক বদলায়, সেটি করতেও বাধ্য। বস্তুত, শিল্পের সব আঙ্গিকের ক্ষেত্রেই সে বিষয়টি প্রযোজ্য। কবিতায় বারবার, পুনর্বার অবারিত ও অতিরিক্তভাবে জীবন ও মানুষের কাছে গেছে, কিভাবে? প্রকরণের ভেতর দিয়ে। প্রকরণটি আবার ভীষণভাবে নিজস্ব। নইলে সে দাঁড়াতে পারে না। এবং বলতেই হয় তা একজনের ক্ষেত্রে এক-একরকম। যে উদ্ধৃতিটি এখানে এসেছে তা তিন কবির। তিন রকম অভিজ্ঞতার, তিন রকম প্রয়োজনের। সেখানে প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বকীয়, টানার ক্ষেত্রে অদ্বিতীয়। সেখানে আছে বিচিত্রমুখী পদ্ধতি, বিবিধ ব্যবস্থাপনা। যেমন এলিম্নিশান, স্পেস-বয়ন, হাইপারবেট্ন, পারসোনিফিকেশন, আ্যম্বিগিউটি প্রভৃতি। এতে কবিতা পৌঁছায় বা পৌঁছাতে সমর্থ হয়, ওই আবেগের নিকট, নন্দিত মানসের নিকট, প্রণয়পিয়াসীর নিকট। পার্থিব জগতের সবকিছু দুলে ওঠে, প্রবাদপ্রতিম অর্থ খুঁজতে সক্ষম হয়; এক ধরনের বেষ্টনীতে আক্রান্ত হয়, পেয়ে বসে জীবনানুগ যাবতীয় অর্থ। কবিতা প্রণোদিত করে, সর্বকুলপ্লাবী হয়ে ওঠে- এবম্বিধ প্রয়াস-সকলের কারণে।
কবিতার অনুভেববেদ্য রূপটি বদলায়, কখনই তা এককরম থাকে না। কারণ, যেহেতু সমাজ পাল্টায়, জীবনের বৈচিত্র্যে তার রঙ বদলায় সেহেতু। কিন্তু যা কিছুই করুক তার প্রধান ক্ষেত্র তুলে ধরি অ্যামন্স-এর ভাষায় :
Now i am
into things
So small
When I
Say boo
I disappear
মুহূর্তের অনুভূতি কতো গভীর এবং উচ্চারণ কতো নির্ভার, তবুও যদি প্রশ্ন তুলি কেমন করে, আবার উদাহরণে যাই, শক্তি চট্টোপাধ্যায় থেকে তুলে আনি :
হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান ঘুরতে দেখেছি অনেকতাদের হলুদ ঝুলি ভরে গিয়েছিলো ঘাসে আবিল ভেড়ার পেটের মতোনকিংবা,আমাকে তুই আনলি কেন, ফিরিয়ে নে।ব্যাখ্যাতীত প্রণোদনা, তুমুল বিষাদ, পেগান উৎসবের মাতাল বারতা কবিতার ভঙ্গিকে পাল্টিয়ে দেয়, দান করে মত্ত আসক্তি। আমাদের এমনসব কর্মে মনে পড়ে আবার জীবনানন্দের কথা :শান্তি তবু গভীর সবুজ ঘাস ঘাসের ফড়িংআজ ঢেকে আছে তার চিন্তা আর জিজ্ঞাসার অন্ধকার স্বাদ
কবিতার মর্মদাহন কতো উত্তরোত্তর হতে পারে ‘অন্ধকার স্বাদ’ অনুধাবনে তা অনেককালের অনুষঙ্গী হয়ে যায়, জেনে যাওয়া যায়, সর্বোৎকৃষ্ট স্বতঃধার সম্পাত- যা পুণ্যময়ী প্রার্থিত, সক্কলের অক্ষয় জয়টিকা। জীবনানন্দ প্রভূত হয়ে ওঠেন, যখন পৌষসন্ধ্যায়, নরম ঘাসে কিংবা সমস্ত সময়ের বা ইতিহাসের অলখ সাক্ষ্য হয়ে যান বা করে তোলেন সবকিছুকে। কবিতার এ কারণসমূহ কোথায়? কবিব্যক্তিতে। কবিকারুণ্যে। এবং অবশ্যই স্বয়ম্প্রকাশিত মগ্ন-মত্ততা।
কবিতার ভেতরে যে উত্তর-ব্যক্তি সৃষ্টির কথা বলেছি, তা আসলে কি? উপর্যুক্ত প্রশ্নের মাঝে কি তার উত্তর আছে? যদি বলি ‘অনন্ত নক্ষত্রবীথি তুমি’ তবে তা কে? কোন্কালের কে? সে ইতিহাসের ভেতর দিয়ে জন্ম নেয়া ব্যক্তি, যে জীবন ভালবাসে, যে চৈত্র্যরাতের উদাসী, যে ওই স্থানের যেখানে এলে সবচেয়ে বেশি তার কথা মনে পড়ে। সুতরাং উত্তরব্যক্তি তো নির্ণীত, গ্রথিত, মন্দ্রিত। এমনসব আসে কোত্থেকে? ‘চোখের আলোয় দেখেছি চোখের বাহিরে’- স্পর্শে-অনুভবে-ইন্দ্রিয়জ্ঞানে ঠিকরে পড়ে কবির যাবতীয় অনুরাগ। ইন্দ্রিয় থেকে অতিন্দ্রীয় প্রেক্ষণে পৌঁছায়, দুর্মর পার্থিব-প্রতিবিম্বে। কল্পনার অমনিবাসে, সমস্ত জগৎ নিজের অভিনিবেশে কবির নিকট ধরা পড়ে। এমনটি তো সর্বত্র বা সবকালেই ছিল তা নয়, আধুনিককালে কবিকণ্ঠে দৃঢ়তর তার ভেতর-বাহির বা অন্তঃপুরের অপূর্ব সব স্বাদ কিন্তু প্লেটো-পরবর্তী যুগে দৃশ্যমান প্লট-পরিক্রমাই কবিতারূপে দাঁড়াতে সক্ষম হয়। জেনে যাই, কোলরিজ, ব্লেক-ব্রাউনিং কিংবা এক তুমুল নিশান ওড়ানো ওই রোমান্টিক কবিকুলের কথা-শেলি-কিটস-অর্ডসওয়ার্থ প্রমুখ- যারা কল্পনার আখরে ইন্দ্রিয়জ সমস্ত তাণ্ডবকে নিমিষে উত্তর-ব্যক্তিসান্নিধ্য পেয়ে দিয়েছিলেন। কবিতা তখন আরও নিশ্চিন্ততায় পৌঁছায়। যেমনটি আমাদের উদাহরণে মিলেছে। ‘অন্ধকার স্বাদ’ কিংবা ‘আত্মার লালিত স্বপ্ন’ কতোটা তার দৃষ্টিগ্রাহ্য রূপ? কী তার অমোঘ প্রণোদনা! এর আর নিশ্চয়ই আর উত্তর-ব্যক্তির প্রশ্নটি থাকে না। যেমনটি বলেছি, পরিবর্তন, রোমান্টিকতার উক্তিতে, ক্লাসিকপন্থার বিপরীতে অতঃপর একালে ওই আধুনিকবাদ যখন প্রলুব্ধ? তখন কবিতা আরও আমাদের, ওই কবিকণ্ঠের কারণে : আভরণহীনতা, সমকালমনস্কতা, পরা-পরিচ্ছদ ভাবালুতা। প্রতীকী-প্রতিমা যেখানে পরিস্রুত, আরও বিপুল আবহে বর্ণিল আত্মস্বাদসমূহ। এসেছে তাতে নানা রায়ত বা উত্থান-পতনের শব্দ। কেমন তা, কিভাবে তার উৎসারণ :
ক. জিরাফের মতো গলা অ্যমপ্লিফায়ারের একই প্রশ্ন
একই প্রশ্ন ময়দানের প্রতিটি ঘাসের
ইতিহাস কি যুবতীর প্রবৃদ্ধ নাগর?
খ. অনেকদিন আগের গল্প। তথাপি আমাদের শৈশব আর স্মৃতি
থেকে উঠে আসছে
নারী আর মাল্লাদের এই সব রূপকথা। আমার দেশ; এইসব
রূপকথা দিয়ে তৈরি
একটি বিশাল রূপময় গল্প।
গ. যে জীবন স্পন্দমান
তার শব্দ মাঝে মাঝে কানে ভাসে।
কবিতার ভেতর থেকে এরূপে উত্তর-ব্যক্তি সম্মাননার নানা প্রস্তুতি রচিত হয়। ‘আরেক আগের গল্প’- তারপরের সব রকম জীবনের প্রলুব্ধ উচ্চারণ যাতে পুনরাবিষ্কার-উন্মুখ- সর্বরকমের, সর্বকূলপ্লাবী চারণা; কারণ সমস্ত সত্যই তাতে তাড়িত। আবেগ-আনন্দ-বিশ্বাস গভীরে পৌঁছায়, অতীতানন্দ আসে চরিত্র হয়ে। আর তার ভেতরে সমস্ত আরাধ্য অনিবার্যতা গৃহীত হয়। কবিতা তাই সমস্ত সত্যাদর্শ, নিজের বা বাইরের সক্কলের; দূরদর্শিতার। জীবনের প্রবাহের ভেতরে যখন এরূপ যাবতীয়তার সর্বার্থ থাকে তখন সুকুমার সংক্ষুব্ধতা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। ইন্দ্রিয়ের-গ্রহণে লাগে অপরূপ মায়া, অতুল্য অপার মুগ্ধতা; বিষাদ-আনন্দ ছড়ায়, প্রণয়ের ব্যাকুলতায় মনোগ্রাহিতার অম্বর বেজে ওঠে। কবিতার এ অপার আকর্ষণের কারণ যেমন এমনিই তেমনি উত্তর-ব্যক্তির স্বরূপে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ব্যাপারটিও তাতেই গৃহীত।
এখন কবিতা কিরূপে হয়, সে কথাটি কবির ভেতরেই গৃহীত এবং উপর্যুক্ত আলোচনায় তা নির্ণীত, সংক্ষেপে তা আবার ধরিয়ে দিলে : ইন্দ্রিয়জ-গ্রহণ, ব্যক্তির অনুভবগ্রাহ্য প্রতিবেশ, পেরিয়ে আসা চরিত্রানুগ সময় আর প্রকৃতি-পরিচালিত প্রণোদনার বিশ্বাস- কবিতা তখন ব্যক্তি পেরিয়ে উত্তর-ব্যক্তি সৃজন-আনন্দে ব্যাপৃত। হ্যাঁ নিশ্চয়ই তাতে চলমান বাস্তবতার অনিবার্যতা আছে, সেখানে আন্দোলন-প্রতিরোধ, সম্মুখ-সংগ্রাম আছে, তা কবি নিঃশঙ্করূপে গ্রহণ করেন আর তা করতে অবশ্যই প্রণোদিত হবেন কিন্তু তা কালোত্তরের প্রতিশ্রুতিতে অবশ্যই প্রাপ্তব্য হয়ে চলবে; বস্তুত তাই কবিতা ও রূপান্তরিত কাব্য আর সে লক্ষ্যেই ঐরূপ উপর্যুক্ত পাঠটি গ্রহণ করবে। পরিষ্কার করে বললে, পাঠের মধ্যে এরূপ প্রতিশ্রুতির কথাই বলা আছে। তবে সেরূপেই সে এগোবে, পৌঁছাবে গহন-দপ্তরে, তাই তো ‘সোনালী ডানার চিল’ আকাশে ওড়ে, ‘বেতের ফলের মতো’ ম্লান চোখ মনে আসে কিংবা ‘অসহ্য সুন্দর হয়ে ওঠে’ চিল্কার সকাল। এরূপ কতো না দূর-পরিব্যাপ্ত আনন্দ তা অর্থে বোঝানো অসম্ভব। তবে এতে কি ওইসব চলমান বিষয় নেই! আছে, বেশি করেই আছে এবং তা পূর্ণাঙ্গরূপে আছে, সর্ব-করে; সবটুকু গ্রহণ করে। এ জন্যই এরূপে রচিত ওই উত্তর-ব্যক্তির রূপ আর তার রূপময় কাব্য। কবিতা বহুকালের বয়ে বেড়ানো এক বেদনার বাহন। তা রাষ্ট্র-ব্যবস্থা সৃষ্টিরও অনেক আগে, রেনেসাঁর আগে; তুমুল সব বৃষ্টিপাতের আগে, কিন্তু সবকিছুর ভেতর দিয়ে সবকালের সৃষ্টির মধ্যে তা চলমান। কার্যত, আমাদের যা কিছু আচ্ছন্ন বা যা কিছু বহমান তার উত্তর-পর্বই কবিতা। সেই আদি থেকে অনদ্যান্ত তা চলছে, সাড়া দিচ্ছে, কারণটি তার আন্ত-অনুপ্রেরণা আর সমস্ত কিছুর ঊর্ধ্বে ‘জীবনমন্থনবিষ’ পান করেই কবি কবিতা রচনা করেন, তার সংজ্ঞার্থ কে ঠিক করে দেবে! তাইতো শরীর-মন তাতে একীকৃত হয়, তার দাস স্বীকার করে নিয়েই- কবিকে গ্রহণ করেন আর কবিতা হয় সংক্রমিত; অনেকটা অ্যাডিকশনের মতো- বেশ রকমের ভাবায়, অস্তিত্বের সবটুকু মুছে নেয়- কবিতাশিল্প তবে এর চেয়ে আর কী!