গোটা ঐতিহাসিক কালব্যাপী সব জাতির মধ্যেই দেখা যায়, মানুষের জীবনের সঙ্গে ভাষার কিংবা ভাষার সঙ্গে মানুষের জীবনের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। দেখা যায়, জীবন যেখানে উন্নত ভাষাও সেখানে উন্নত এবং ভাষা যেখানে উন্নত জীবনও সেখানে উন্নত। ভাষাকে উন্নত না করে কোনো ব্যক্তি বা জাতি উন্নতি করতে পারে না। আরও দেখা যায়, ভাষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান আর জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ভাষা অবিচ্ছেদ্য। সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্পকলা ইত্যাদি সৃষ্টির পেছনেও কাজ করে চিন্তা বা ভাষা। সব মানবীয় কর্মকাণ্ডেরই মর্মে কাজ করে চিন্তা বা ভাষা। চিন্তা ও ভাষা অভিন্ন। জাতি ও রাষ্ট্রের উন্নতির সঙ্গে ভাষার উন্নতি কিংবা ভাষার উন্নতির সঙ্গে জাতি ও রাষ্ট্রের উন্নতিও অবিচ্ছেদ্য। কোনো জাতির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উন্নতির সঙ্গেও ভাষার উন্নতি অবিচ্ছেদ্য। মানুষের জীবন ও পরিবেশ বিকাশশীল, ভাষাও বিকাশশীল। ভাষা ও মানুষের জীবন এবং মানুষের জীবন ও ভাষা নিয়ে যতই চিন্তা করা যায়, তথ্যসন্ধান ও বিচার-বিশ্লেষণ করা যায়, ততই দুয়ের উন্নতির অবিচ্ছেদ্যতা সম্পর্কে ধারণা গভীর ও ব্যাপক হয়।
আমাদের উপলব্ধি করা দরকার যে, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও উন্নতির জন্য রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাভাষার অস্তিত্ব ও উন্নতি অপরিহার্য। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা না থাকলে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশও টিকবে না। দেশ থাকবে, কিন্তু রাষ্ট্র থাকবে না।
মানুষ ভাষা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে না, ভাষা আয়ত্ত করে। ভাষা আয়ত্ত করার এবং ভাষাকে বিকশিত করার সামর্থ্য মানুষের আছে। আদিতে মানুষের ভাষা ছিল না, ভাষা মানুষেই সৃষ্টি করেছে। আদিম মানুষেরা নিজেদের প্রয়োজনে, নিজেদের জৈবিক সামর্থ্যরে বলে, যৌথ জীবনযাত্রার মধ্য দিয়ে, নিজেদের ভাষা সৃষ্টি করেছে, এবং প্রয়োজনের তাগিদেই তারা তাদের ভাষাকে বিকশিত ও উন্নত করে চলেছে। ব্যক্তিগত ও যৌথ জীবনপ্রয়াসে মানুষের চিন্তাশক্তি ও শ্রমশক্তি একসঙ্গে কাজ করেছে ভাষাসৃষ্টিতে। ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, রুশ, চীনা, জাপানি, সংস্কৃত, হিব্রু, লাতিন, বাংলা, উর্দু, ফারসি, আরবি প্রভৃতি ভাষার ইতিহাস সন্ধান করলে এটা বোঝা যায়।
২.
দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয় এমন মাত্র দুশো ভাষা দুনিয়ায় আছে। এসব ভাষা বিকাশশীল। এগুলোর মধ্যে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্যের দিক দিয়ে বাংলা ভাষার স্থান এখনো উপরের দিকেই আছে। এগুলো ছাড়া বিভিন্ন মহাদেশে কয়েক হাজার ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী আছে; তাদেরও আলাদা আলাদা ভাষা আছে; তাদের ভাষা বিলীয়মান। বাংলাদেশে পঁয়তাল্লিশটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর পঁয়তাল্লিশটি বিলীয়মান মাতৃভাষা আছে। এই পঁয়তাল্লিশটি জনগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যা বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক শতাংশের সামান্য বেশি। এরা জন্মের পর থেকেই নিজেদের ভাষার মতো বাংলা ভাষাও শেখে। বাংলা ভাষাকেই তারা উন্নতির অবলম্বন মনে করে। বিভিন্ন দেশের এবং বাংলাদেশেরও বিলীয়মান মাতৃভাষাগুলোকে রক্ষা করার চেষ্টা বাস্তবসম্মত নয়। এক্ষেত্রে ইউনেস্কোর কাজ বাস্তবতা-বিরোধী। ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর লোকেরা জীবনযাত্রার ও উন্নতির প্রয়োজনে নিজেদের ভাষার সঙ্গে রাষ্ট্রভাষাও শিখছে। বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী সমূহের উন্নতির ও মানবজাতির মূল ধারায় আসার সুযোগ, তাদের রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার মধ্যে, বাড়াতে হবে।
সা¤্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো এবং জাতিসঙ্ঘ, ইউনেস্কো, সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন ও এনজিওরা ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী সমূহের উন্নয়নের জন্য যে পথ প্রদর্শন করে, যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করে, কার্যক্রম চালায়, অনেক সময় সেগুলো তাদের উন্নতির সহায়ক হয় না। ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী সমূহকে নিজেদের উন্নতির জন্য পার্শ্ববর্তী বৃহৎ জাতির সঙ্গে মিলে রাষ্ট্র গঠন করতে হয় এবং রাষ্ট্রভাষা শিখতে হয়। তারা যদি বাইর থেকে কিছুই গ্রহণ না করে এবং কেবল নিজেদের মাতৃভাষা ও নিজেদের অভ্যস্ত জীবনযাত্রা নিয়ে চলে, তাহলে তারা উন্নতি করতে পারবে না। যে কোনো জনগোষ্ঠীর জন্যই না নিয়ে, না দিয়ে নিজেদেরকে নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে রাখার ফল খারাপ হয়। আত্মবিকাশের ও উন্নতির জন্য ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীসমূহকে বাইর থেকে ভালো জিনিস গ্রহণ করতে হবে। বাস্তব অবস্থা এমন যে, নিজেদের উন্নতির প্রয়োজনে রাষ্ট্রভাষাকেও মাতৃভাষার মতোই তাদের আয়ত্ত করা ও বিকশিত করে চলা সমীচীন।
মনে রাখতে হবে রাষ্ট্রভাষার ধারণাটি দেখা দিয়েছে পাকিস্তানের এবং বাংলাদেশের বিশেষ বাস্তবতায়। এর দ্বারা কেবল ড়ভভরপরধষ ষধহমঁধমব বুঝায় না, বুঝায় তার সঙ্গে আরো অনেক কিছু। রাষ্ট্রভাষার মধ্যে আছে ড়ভভরপরধষ ষধহমঁধমব, সেই সঙ্গে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্য চর্চার ভাষা- কোনো জাতির আর্থ-সামাজিক-রাষ্ট্রিক সার্বিক উন্নতির ভাষা।
৩.
বাংলাভাষাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা রূপে প্রতিষ্ঠা করার ও উন্নত করার প্রশ্ন বিবেচনা করার সময় মানুষের ভাষা ও জীবন সম্পর্কে পরিচ্ছন্ন ধারণা অবলম্বন করা দরকার। তা ছাড়া মানুষের জীবনের ও ভাষার উন্নতির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তিও অবশ্য বিবেচ্য। কোনো ভাষার অর্থনৈতিক ভিত্তি বিকাশশীল থাকলেই সে ভাষা বিকাশশীল থাকে।
ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা এবং ভূ-রাজনৈতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া লক্ষ করে, ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিক থেকেই কোনো কোনো চিন্তাশীল ব্যক্তি বলে আসছেন যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার মতো নয়। তাঁদের যুক্তি ও মত কখনো আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। তাঁরা অনেকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় নাগরিকত্ব নিয়েছেন এবং প্রায় সকলেই তাঁদের সন্তানদের ওইসব রাষ্ট্রে নাগরিক করেছেন। আমরা সব সময় মনে করেছি এবং এখনো মনে করি, বাংলাদেশকে অবশ্যই বাংলাদেশের জনগণের প্রগতিশীল রাষ্ট্ররূপে গড়ে তোলা যাবে। সে লক্ষ্যেই আমাদের চিন্তা ও কাজ।
কিছু ঘটনা আমাদের মর্মাহত করে। সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশনগুলোর বুদ্ধিজীবীরা বাংলাদেশের রাজনীতিকে বৃহৎ শক্তিবর্গের স্থানীয় দূতাবাসমুখী করেছেন। বাংলাদেশের সব প্রচারমাধ্যম ১৯৮০-র ও ’৯০-এর দশকে বিবিসি রেডিওর অন্ধ অনুসারী হয়ে কাজ করেছে। ক্ষমতার বাইরে থাকা কালে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি নিয়ে ক্রমাগত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার, এবং ভারতেরও, স্থানীয় দূতাবাসগুলোতে ধরনা দেন। তাঁরা চলে যান যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টেট ডিপার্টমেন্টের নির্দিষ্ট ডেস্কে। সা¤্রাজ্যবাদী অর্থসংস্থাগুলো দাতা-সংস্থা ও উন্নয়ন-সহযোগী হয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ করে। শাসক শ্রেণির লোকেরা (সরকারি ও সরকার-বিরোধী সব মহলের) তাঁদের ছেলেমেয়েদের যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্রের নাগরিক করে চলছেন। মন্ত্রিপরিষদ, জাতীয় সংসদ, প্রশাসনব্যবস্থার উচ্চপর্যায়, বিচারব্যবস্থার উচ্চপর্যায়, শিক্ষাব্যবস্থার উচ্চপর্যায় লক্ষ করলেই এটা দেখা যায়। এই ব্যক্তিরাই বাংলাদেশে রাষ্ট্রব্যবস্থার ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কর্তৃত্বে আছেন। বাংলাদেশে একদিকে আছে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ব্রিটিশ কাউন্সিল ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত ও লেভেল, এ লেভেল এবং অপরদিকে আছে বাংলাদেশ সরকারের ইংলিশ ভার্সন। আরো কোনো কোনো বিদেশি শক্তি দ্বারা পরিচালিত প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে আছে। এসব ব্যাপার বাংলাদেশের ভূভাগে জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
৪.
আমরা মনে করি, এসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নতুন রেনেসাঁস ও তার ধারাবাহিকতায় নতুন গণজাগরণ সৃষ্টি করে, সেই সঙ্গে উন্নত-চরিত্রের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সৃষ্টি করে অবশ্যই বাংলাদেশকে বাংলাদেশের জনগণের প্রগতিশীল-রাষ্ট্ররূপে গড়ে তোলা যাবে। অভীষ্ট নেতৃত্বের জন্য অবশ্যই উন্নত-চরিত্রের রাজনৈতিক দল লাগবে। রাজনৈতিক দল ছাড়া জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব হয় না। রাষ্ট্রগঠনের ও রাষ্ট্রীয় উন্নতির সঙ্গে রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত, উন্নত ও সমৃদ্ধ করার ব্যাপারটি অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কে যুক্ত। বাংলাদেশে রাজনীতির উন্নতির জন্য বাংলা ভাষায় উন্নত রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনৈতিক দলে তার অনুশীলন দরকার। বাংলা উন্নত ভাষা। ইংরেজি কিংবা অন্য কোনো বিদেশি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করে বাংলাদেশে জনগণের রাষ্ট্রগঠন সম্ভব হবে না। বাংলাদেশের উন্নতির জন্য ইংরেজি ও আরও কয়েকটি বিদেশী ভাষা শেখার ভালো ব্যবস্থা অবশ্যই বাংলাদেশে করতে হবে। কিন্তু তার জন্য বাংলাদেশে বাংলাভাষার স্থানকে ছোট করা যাবে না। ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষার মাধ্যমে জ্ঞান আহরণ করে তা দিয়ে বাংলা ভাষার জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করতে হবে। যাঁরা জন্মগতভাবে বাংলাদেশের নাগরিক এবং পছন্দগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্রের নাগরিক তাঁদের নেতৃত্বে ও পরিচালনায় বাংলাদেশ রাষ্ট্র রূপে গড়ে উঠবে না। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাববার সময় চলে যাচ্ছে। সময় থাকতে চিন্তা ও কাজ করতে হয়, সময় চলে গেলে ফলপ্রসূ কিছুই করা যায় না।
বাংলাদেশকে বাংলাদেশের জনগণের রাষ্ট্র রূপে গড়ে তোলার এবং বাংলাভাষাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা রূপে প্রতিষ্ঠা করার পথে বিরাজিত অন্তরায়গুলো একে একে দূর করতে হবে। তার জন্য সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা দরকার। যাঁরা দ্বৈত নাগরিক, যাঁদের স্ত্রী অথবা স্বামী অথবা সন্তান দ্বৈত নাগরিক কিংবা বিদেশি নাগরিক, তাঁরা যাতে বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি, উপমন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রী, উপসচিব থেকে সচিব, জজকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ইত্যাদি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হতে না পারেন, সংবিধানে তার স্পষ্ট বিধান রাখতে হবে। বিধান এমন হবে যে, অন্য রাষ্ট্রে গিয়ে নাগরিকত্ব গ্রহণে কারও ওপর কোনো বিধি-নিষেধ থাকবে না; কিন্তু অন্য রাষ্ট্রে নাগরিক হলে (দ্বৈত নাগরিক) কিংবা স্ত্রী বা স্বামী অন্য রাষ্ট্রের নাগরিক বা দ্বৈত নাগরিক হলে কিংবা সন্তান (২১ বছর বয়স পর্যন্ত) অন্যরাষ্ট্রে নাগরিক হলে কেউ বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় উচ্চ পদে থাকতে পারবেন না। যাঁরা তাঁদের সন্তানদের বিদেশে নাগরিক করার জন্য কিংবা বড় চাকরির জন্য আলাদাভাবে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা দিতে চান, তাঁদের জন্য ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক ব্রিটিশ কাউন্সিলের মাধ্যমে ও-লেভেল, এ-লেভেল ইত্যাদি পড়ার সুযোগ অব্যাহত থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র ও আরো কোনো কোনো রাষ্ট্র বাংলাদেশে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজি মাধ্যমের যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালাচ্ছে সেগুলোও চলবে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের ইংলিশ ভার্সন বিলুপ্ত করতে হবে।
‘আদিবাসী’দের চিরকালের জন্য ‘আদিবাসী’ রূপে রাখার সা¤্রাজ্যবাদী নীতি পরিহার্য। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় রেড ইন্ডিয়ানদের এবং অস্ট্রেলিয়ায় আদিবাসীদের যেভাবে রাখা হয়েছে তা অন্যায় এবং তা গোটা পৃথিবীর জন্য গ্রহণীয় নীতি হতে পারে না। বাংলাদেশে পঁয়তাল্লিশটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর পঁয়তাল্লিশটি বিলীয়মান মাতৃভাষার উন্নতি সাধনের জন্য সরকার ও এনজিওরা যে চেষ্টা চালাচ্ছে, তা সফল হবে না। বাংলাদেশের রাষ্ট্রসত্তার মধ্যে এইসব জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক উন্নতির আরো ভালো পরিকল্পনা ও কার্যক্রম দরকার। তাদের সন্তানদের জন্য বাংলা ও ইংরেজি শেখার এবং রাষ্ট্রীয় শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে। তারা যদি চায়, কেবল তা হলেই তাদের-মাতৃভাষার মাধ্যমে তাদের শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে তারা অন্য নাগরিকদের মতো রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করবে। বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় তারা স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় অনাস্থা ও অবিশ্বাস দূর করে অবস্থাকে স্বাভাবিক করতে হবে।
বিদেশী দূতাবাসমুখী রাজনীতির এবং ওয়াশিংটনমুখী ও দিল্লিমুখী রাজনীতির, অবসান ঘটাতে হবে। কথিত উদার গণতন্ত্রের, পরিবর্তে সর্বজনীন গণতন্ত্রের ধারণা উদ্ভাবন করে তা বাস্তবায়নের পথে চলতে হবে। সর্বজনীন গণতন্ত্রে দলভিত্তিক আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের সরকার গঠনের ব্যবস্থা থাকবে। সংবিধানে সর্বজনীন কল্যাণে উন্নত-চরিত্রের রাজনৈতিক দল গঠনের কিছু নীতি নির্দেশিত থাকবে।
রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন পর্যায়ে এবং বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরে প্রথম দুই দশকে বাংলা ভাষার উন্নতি এবং রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলা ভাষার প্রচলন অনেকটুকু হয়েছে। কিন্তু ১৯৯১ সাল থেকে রাজনীতি যে রূপ লাভ করেছে, তাতে রাষ্ট্রব্যবস্থায় বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়নি। বাংলাদেশকে রাষ্ট্র রূপে এবং বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা রূপে প্রতিষ্ঠা করার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এবং সিলিভ সোসাইটি অর্গনাইজেশনগুলোর মধ্যে মনোভাব এখন শিথিল। চলমান বাস্তবতায় নিম্নোক্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে দেশবাসীকে অত্যন্ত সতর্ক থেকে চিন্তা ও কাজ করতে হবে:
-রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার এবং রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলাভাষাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য দরকার নবচেতনা ও নবজাগরণ। এ কাজে প্রগতিকামী গবেষক-লেখক-শিল্পীদের অগ্রযাত্রীর ভূমিকা পালন করতে হবে।
-নির্বাচন উপলক্ষে প্রতিবার যে হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়, তা বন্ধ করতে হবে। রাজনীতির উন্নতির জন্য দরকার উন্নত-চরিত্রের রাজনৈতিক দল। জনগণকে গণবিরোধী রাজনীতি পরিহার করে নিজেদের রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে।
-সর্বজনীন গণতন্ত্রের আদর্শ এবং দলভিত্তিক আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের সরকার গঠনের পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে হবে। উদ্ভাবিত আদর্শ বাস্তবায়নের ও পদ্ধতি কার্যকর করার জন্য কাজ করতে হবে।
-জনগণের পক্ষ থেকে পর্যায়ক্রমিক জাতীয়-ভাষানীতি প্রণয়ন ও তা অবলম্বনের জন্য প্রচার-আন্দোলন চালাতে হবে।
-বিচার-ব্যবস্থায় বাংলা চালু করার জন্য প্রচার-আন্দোলন চালাতে হবে। বাংলাদেশের বিচার-ব্যবস্থার অভ্যন্তরে এমন কিছু ব্যক্তি আছেন যাঁরা এ-কাজে অগ্রযাত্রীর ভূমিকা গ্রহণ করতে পারেন। সহযোগীর ভূমিকা সকলেই পালন করবেন।
-ব্যাংকের কাজে বাংলা প্রচলন করতে হবে। তার জন্য প্রচার-আন্দোলন চালাতে হবে। রাষ্ট্র, জাতি ও জনগণের কল্যাণে সকল প্রচার-আন্দোলনে প্রচারমাধ্যমের সহায়তা কাম্য।
-উচ্চশিক্ষায় ও গবেষণায় বাংলার ব্যবহার ক্রমবর্ধমান রাখতে হবে।
-স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে বাংলাদেশ ও বাংলাভাষার অনুকূলে নবচেতনা দরকার।
-বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য ও জাতীয় সংস্কৃতির উন্নয়নে বাংলা একাডেমির কার্যকলাপের প্রতি প্রচারমাধ্যমের বিচারমূলক সক্রিয়তা দরকার।
ষ অবিলম্বে ১৯৭২ সালে বিলুপ্ত-করা বাংলা উন্নয়ন বোর্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।
ষ জাতীয় অনুবাদ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
ষ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোসহ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলাদেশবিদ্যা বিভাগ (উবঢ়ধৎঃসবহঃ ড়ভ ইধহমষধফবংয ঝঃঁফরবং) প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এতে বাংলাদেশ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়ের সঙ্গে গ্রেকো-রোমান-ইউরো-আমেরিকান প্রগতিশীল রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি ও মনোবিজ্ঞান অন্তর্ভুক্ত রাখতে হবে।
রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের এবং রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার বিবেচনা বাদ দিয়ে বাংলাভাষা নিয়ে যে প্রচারকার্য দেখা যায়, তা গাছের গোড়া কেটে আগায় পানি ঢালার মতো ব্যাপার। দরকার নতুন রেনেসাঁস ও নতুন গণজাগরণ। এর জন্য চিন্তা ও আন্দোলনের মর্মে দরকার উন্নত চরিত্রবল ও প্রগতিচেতনা। জ্ঞানের সঙ্গে উন্নত চরিত্রবল ও কর্মমুখিতা না থাকলে রেনেসাঁস ও গণজাগরণ হয় না।
আগেকার রেনেসাঁসের লক্ষ্য ছিল মধ্যযুগের গর্ভ থেকে আধুনিক যুগকে মুক্ত করা ও বিকশিত করে চলা; নতুন রেনেসাঁসের লক্ষ্য হবে আধুনিক যুগের ভ্রান্তি ও অনাচার থেকে মুক্তি এবং সভ্যতা ও প্রগতির ধারায় এগিয়ে চলা। নতুন রেনেসাঁসের অভাবে দেখা দিয়েছে ইতিহাসের পশ্চাৎগতি। এটা সাময়িক। সভ্যতা ও প্রগতির জন্য চাই নতুন রেনেসাঁস ও নতুন গণজাগরণ।