রিজিয়া রহমান (জন্ম: ১৯৩৯) স্বাধীনতা-উত্তর কালের বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান কথাশিল্পী। ষাটের দশক থেকে গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, রম্যরচনা ও শিশুসাহিত্যে তাঁর বিচরণ। তাঁর প্রকাশিত প্রথম প্রন্থ ‘অগ্নি স্বাক্ষর’। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলো হলো ‘ঘর ভাঙা ঘর’, ‘উত্তর পুরুষ’, ‘রক্তের অক্ষর’, ‘বং থেকে বাংলা’। লিখেছেন ‘অভিবাসী আমি’ ও ‘নদী নিরবধি’ নামে দুটি আত্মজীবনী। উপন্যাসে অবদানের জন্য তিনি ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ ‘অগ্নিস্বাক্ষর’, ‘নির্বাচিত গল্প’, ‘চার দশকের গল্প’, ‘দূরে কোথাও’। সম্প্রতি ‘নতুন এক মাত্রা’র পক্ষ থেকে তাঁর জীবন ও সাহিত্য ভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন
কবি ফজলুল হক তুহিন ও কবি শাফিক আফতাব
নতুন এক মাত্রা : দীর্ঘ সাহিত্য জীবনের এ-পর্যায়ে এসে সাহিত্য ও জীবন সম্পর্কে আপনার উপলব্ধি কী?
রিজিয়া রহমান : দীর্ঘ সাহিত্য মানে ৫০-৬০ বছর হতে চললো। জীবনের এ পর্যায়ে এসে সবারই জীবনকে ফিরে দেখার বা জীবন সম্পর্কে মূল্যায়ন থাকে। তবে জীবন আমার একটা প্রশ্ন? যার উত্তর আমি আজও পাইনি। আর সাহিত্য তো হচ্ছে জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। যে যত বেশি জীবনঘনিষ্ঠ বা বাস্তবসম্মত লেখা লিখতে পারে, সেই লেখা তত বেশি স্থায়ী হয়। জীবন ছাড়া সাহিত্য হয় না।
নতুন এক মাত্রা : আপনার সাহিত্যজীবনের সূচনা কিভাবে হলো?
রিজিয়া রহমান : ছোটবেলায় খুব রোগাটোগা ছিলাম। সে সময় প্রচুর বইপত্র পড়তাম। এক সময় ৮ কিংবা ৯ বছর বয়সে একটা কবিতা লিখে ফেললাম। পাঠকেরা পছন্দ করলো। এরপর ছোটবেলায় ছোটদের পাতায় লিখতাম- বড় হয়ে বড়দের পাতায় লিখতাম। এভাবেই আর কী?
নতুন এক মাত্রা : আপনার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ প্রকাশের অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু বলুন।
রিজিয়া রহমান : আমার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ‘অগ্নিস্বাক্ষর’। এটা একটি গল্পগ্রন্থ। এটি প্রকাশিত ১৯৬৭ সালে। তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ ক্লাসের ছাত্র। তখন ওটা যেমনি উপলব্ধি করি- এখন মনে হয়, মানুষের প্রথম প্রকাশিত বই, মানুষের প্রথম সন্তানের মতো। দারুণ এক অনুভূতি, দারুণ ভালো লাগার একটা ব্যাপার।
নতুন এক মাত্রা : প্রথম প্রকাশিত আপনার উপন্যাস কোনটি? এর প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানতে চাই।
রিজিয়া রহমান : আমার প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘ঘরভাঙা ঘর’। ১৯৬৮ সালে এটি সাপ্তাহিক ‘ললনা’ পত্রিকাতে ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয়। এরপর তো মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। মুক্তিযুদ্ধের পর এটি ১৯৭৪ সালে বই আকারে প্রকাশিত হয়। এ উপন্যাসটি ঢাকা শহরের একটি বস্তির ঘটনা নিয়ে লেখা হয়। আইউব খান তখন ক্ষমতায়- যিনি তার ক্ষমতা গ্রহণের দশ বছর পূর্তির খুশিতে সারাদেশে জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন এবং তিনি বলে বেড়াচ্ছেন দেশে প্রচুর উন্নতি হয়েছে। অথচ বস্তির মানুষগুলোকে যখন আমি দেখতাম, আমার খুব অবাক লাগতো। এখানে এসে জড়ো হচ্ছে নদী ভাঙা মানুষ, তারা ভাবছে নদীতে চর জাগছে তারা আবার ফিরে যাবে। তাদের ফেরা হচ্ছে না। অভাবী মানুষ, কাজের খোঁজে আসা মানুষÑ তাদের আবার স্বপ্নের মধ্যে গ্রাম। তারা কিছু টাকা হলেই আবার গ্রামে ফিরে যেতে চায়, কিন্তু পারে না। কেউ কেউ ফিরে যেতে যাবে, এই প্রেক্ষাপটেই মূলত আমার সেই উপন্যাসটি লেখা। এটি পাঠকের বেশ প্রশংসা পেয়েছিল।
নতুন এক মাত্রা : আপনার উপন্যাস সাহিত্যে আঞ্চলিক জীবনধারা বহুল পরিমাণে চিত্রায়িত। এই আঞ্চলিক জীবনধারা ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবন রূপায়ণের কারণ কী?
রিজিয়া রহমান : আমি মনে করি বাংলাদেশে কয়েকটি অঞ্চলের সমষ্টি। আর আমরা যখন লেখা শুরু করি, তখন বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল কৃষিনির্ভর। তখন নাগরিক সমাজ এরকমভাবে গড়ে ওঠেনি। আমি যদি বাংলাদেশের কথা বলতে যাই, তাহলে আমি কাদের কথা বলবো। আমি সাহিত্যের আঞ্চলিকতা স্বীকার করি না। এক সময় এসব নিয়ে একটা লেখা হয়েছিল। নদী-নালা, খাল-বিল-হাওর এসব নিয়েই তো বাংলাদেশ, তাই নয় কি?
নতুন এক মাত্রা : শ্রমজীবী মানুষ ও সমাজের তলানিতে বাস করা মানুষের জীবন নিয়ে আপনার বেশ কিছু নির্মাণ আছে। এইসব জীবন নিয়ে উপন্যাস চিন্তা মাথায় কেন ও কিভাবে এলো?
রিজিয়া রহমান : এটা প্রথমেই বলেছি, ‘ঘর ভাঙা ঘর’ আমার প্রথম উপন্যাসের প্রেক্ষাপটেই আমি এর উত্তর দিয়েছি।
নতুন এক মাত্রা : আপনার আর একটি আলোচিত উপন্যাস ‘বং থেকে বাংলা’ এখানে আমরা জাতিসত্তার বিকাশ দেখি। আমাদের ভূখণ্ড, ভাষা ও জাতিসত্তার কাজ করার অভিপ্রায় কেন হলো?
রিজিয়া রহমান : আমাদের বাঙালি হওয়ার লড়াইটা অনেক দিন আগের। এটা শুধু ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের পর আমরা বাঙালি হলাম অথবা পাকিস্তানের ২৪ বছর পর আমরা বাঙালি হলাম- তা নয় কিন্তু। একটি জাতির স্বাধীনতার গল্পটা অনেক লম্বা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে তারা স্বাধীনতার প্রত্যাশা করে। যেমন- বীজ থেকে ফুল-ফল হতে সময় লাগে। আর আমরা বাংলাদেশের অধিবাসীরা কিন্তু পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের। বিভিন্ন জাতির- আমরা এখানে এসে একত্রিত হয়েছি। কিন্তু কেন? এর নৃতাত্ত্বিক অনুসন্ধান করি- যেখানে আমি দেখেছি এ জাতি অনেক ছোট ছোট আন্দোলন, সংগ্রাম করে-নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করে এ পর্যায়ে এসেছে আর আমরা বাঙালি হলাম তা এ বাংলা ভাষার জন্য।
নতুন এক মাত্রা : ‘একাল চিরকাল’ উপন্যাসে আপনি সাঁওতালদের জীবনচিত্র এঁকেছেন। এটিও কি আপনি তাদের সম্পর্কে তথ্য জেনে লিখেছেন, নাকি আপনি সাঁওতালদের জীবন কাছে থেকে দেখেছেন?
রিজিয়া রহমান : দেখুন আমি তাদের যতই কাছ থেকে দেখি, একটা ভিন্ন নৃগোষ্ঠী ভিন্ন ভাষার মানুষের সম্পর্কে লিখতে গেলে আমাকে অবশ্যই পড়াশোনা করতে হয়েছে। তবে তাদের সম্পর্কে আমি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার প্রভাব নিয়েছি। আমার স্বামী একজন খনিজ ও ভূতত্ত্ববিদ তার সাথে বড়পুকুরিয়া, ফুলবাড়ি, মিঠাপুকুরে থাকার সময় আমি সাঁওতালদের গ্রামগুলো ঘুরে ঘুরে দেখেছি। তবে এতো পুরনো একটা জনগোষ্ঠী সম্পর্কে লেখার সময় আমাকে অবশ্যই তথ্য সংগ্রহ করতে হয়েছে।
নতুন এক মাত্রা : জীবনে বঞ্চনার অবসান হয়তো হয় না, কিন্তু কখনো কখনো সাধারণ মানুষ জেগে তো ওঠে, বিপ্লব ঘটায়, শোষণ থেকে মুক্তির জীবন দেখে- সে রকম বিষয়গুলো আপনার লেখায় কিভাবে এনেছেন?
রিজিয়া রহমান : মানবজাতির ইতিহাস খুঁজলে দেখা যায় অত্যাচার নির্যাতন-নিপীড়নে মানুষের পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকে গেছে তখন মানুষ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবীর সব বিপ্লবের ইতিহাস একই-আপনি ফ্রান্স বিপ্লব- অথবা রুশ বিপ্লব যেটার কথা বলুন- মানুষ শোষিত হতে হতে শেষ পর্যায়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আর এটা মানুষের জীবনের বড় একটা মানুষের কথা লিখতে গেলে এটা বাদ দিলে চলে না।
নতুন এক মাত্রা : নারী সাহিত্যিক হিসেবে সাহিত্য চর্চার বাধার মুখোমুখি কি হয়েছেন- হয়ে থাকলে মোকাবেলা করেছেন কিভাবে?
রিজিয়া রহমান : না, সে রকম কোন বাধার মুখোমুখি হয়নি।
নতুন এক মাত্রা : উপন্যাস জীবন ও শিল্পের জটিল একটা বিষয়। আপনি উপন্যাস নির্মাণ করেন কোন প্রক্রিয়ায়?
রিজিয়া রহমান : আমি বাংলা সাহিত্যের ছাত্র না। লেখার তাত্ত্বিক বিষয়গুলো আমি জানি না। আমার বিষয় ছিল অর্থনীতি। তবে শিল্পী যিনি হোন, তিনি লিখতে পারেন।
নতুন এক মাত্রা : গল্পের আঙ্গিক নিয়ে এখন প্রচুর নিরীক্ষা চলছে। দেখা যাচ্ছে গল্পহীন বা আখ্যাহীন গল্প, তত্ত্ববাজি, পরীক্ষা-নিরীক্ষার কারণে এখনকার গল্প বেশ জটিল ও দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছে। এগুলো কিভাবে দেখছেন। আবার অনেকে বলছেন, এখন ভালো গল্পের আকাল চলছে।
রিজিয়া রহমান : না, ভালো গল্পের আকাল চলছে- এটা আমি মানতে রাজি না। তরুণদের গল্প আমি পড়ি। তাদের ভাষাজ্ঞান ধারণ, সূক্ষ্ম বিষয় উপস্থাপনা- সব মিলিয়ে আমি আশাবাদী, বেশ আশাবাদী। তবে তরুণদের পড়াশোনা করতে হবে।
নতুন এক মাত্রা : সাতচল্লিশ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত আমাদের জীবন, প্রকৃত ও আর্থ- সামাজিক বাস্তবতা আমাদের কথাসাহিত্যে কতটা প্রতিনিধিত্ব করেছে? আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।
রিজিয়া রহমান : এ প্রশ্নের উত্তর আমার ‘বং থেকে বাংলা’ উপন্যাসের বিষয়ে বলার সময় দিয়েছি।
নতুন এক মাত্রা : স্বাধীনতা পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী বাংলাদেশের কথাসাহিত্যিকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?
রিজিয়া রহমান : বাংলার ভূখন্ড ভাগ হয়েছে। বাংলার ভাষা তো ভাগ হয়নি। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী অর্থাৎ আপনি যদি আদিম সাল পর্যন্ত দেখেন, দেখছেন একটা সময়-মাত্র একটা সময়ের উত্তরাধিকার ভোগ করছে- তবে ৭১ পরবর্তী সময়েও আমাদের শক্তিমান কিছু লেখক আবির্ভূত হয়েছেন।
নতুন এক মাত্রা : কলকাতার সাহিত্যের সঙ্গে বাংলাদেশের সাহিত্যের পার্থক্য কী?
রিজিয়া রহমান : কলকাতার সাহিত্য বলে কিছু নেই। কাজী নজরুলকে, মীর মোশারফ হোসেন আপনি কলকাতার বলবেন? তবে সে সময় কলকাতা বাংলার প্রতিনিধিত্ব করেছে- এটা ঠিক। তারা এখনও সেই ধ্যান-ধারণাই বহন করে। তারা বিশ্বাস করতে চায় নাÑ বাংলাদেশ শিল্প-সাহিত্যে আজ অনেক দূর এগিয়েছে।
নতুন এক মাত্রা : আমরা মনে করি- আমাদের নিজস্ব সাহিত্যধারা সৃষ্টি হয়েছে। সে ক্ষেত্রে আমরা কি কথাসাহিত্যের ভাষায় নতুন কোন মাত্রা যোগ করতে পেরেছি?
রিজিয়া রহমান : আমরা যারা ষাটের দশকে লেখালেখি শুরু করি। তাদের হাত ধরে একটা নতুন ধারায় সৃষ্টি হয়েছে বলতে- আমরা চেষ্টা করেছি। তবে তার আগে কি ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ লিখেননি: মানিক বন্দোপাধ্যায়। মূল পার্থক্যটা ভূখণ্ডের- আমাদের ভাষা তো একই।
নতুন এক মাত্রা: চলমান আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে কতটা অনুকূল?
রিজিয়া রহমান : আমি তো মনে করি- যথেষ্ট অনুকূল। কারণ সামরিক শাসন আমলে আমি একটি উপন্যাস লিখেছিলাম- ‘সতীপাহাড়ে আগুন’। সেটা আমাকে সে সময় ছাপতে দেয়া হয়নি। সেটা বহুবার কাটতে হয়েছে। সেই হিসেবে লেখকেরা এখন যথেষ্ট বাক্ স্বাধীনতা ভোগ করছেন। আর আর্থ- সামাজিক অবস্থা বাংলাদেশে এখন আর কেউ শবেবরাতের ভাত চাইতে আসে না।
নতুন এক মাত্রা : সমকালীন সাহিত্যপত্র ও দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকী সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।
রিজিয়া রহমান : আমি সব পত্রিকা পড়ি না। তবে অনেক কাগজ বের হচ্ছে। এর মধ্যে ভালো-মন্দ দুই-ই বের হচ্ছে। একেবারে না বেরুনোর থেকে বের হোক- এর মধ্যেই হয়তো ভাল কিছু বের হবে।
নতুন এক মাত্রা : জীবনের এই পর্যায়ে এসে আপনার জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে কিছু বলুন।
রিজিয়া রহমান : সবাই তো তার নিজ নিজ সময়কে ভালো বলে। আমার সময়ে আমরা আমাদের প্রকৃতির নির্মলতা-বিশুদ্ধতা-উদারতার সাথে মিলেমিশে বড় হয়েছি। আর এখন দেখুন পায়রার খোপের মতো একটা খোপে আটকে আছি। আকাশে মেঘ করেছে, না রোদ উঠেছে তা দেখার উপায় নাই। এখনকার মানুষের মধ্যে হিংশ্রতা বাড়ছে- এর কারণ হয়তো এই প্রকৃতি বিচ্ছিন্নতা। মানুষকে শেষ পর্যন্ত প্রকৃতির কাছে ফিরতে হবে এবং তাকে ফিরতে দেয়া উচিত।
শ্রুতি লিখন : মনির বেলাল