সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম (জন্ম: ১৯৫১) বাংলাদেশের অন্যতম কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক। ‘স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠ গল্প’, ‘থাকা না থাকার গল্প’, ‘কাচ ভাঙ্গা রাতের গল্প’, ‘অন্ধকার ও আলো দেখার গল্প’, ‘প্রেম ও প্রার্থনার গল্প’, ‘সুখদুঃখের গল্প’, ‘বেলা অবেলার গল্প’ তাঁর গল্পগ্রন্থ। উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হলো: ‘আধখানা মানুষ্য’, ‘দিনরাত্রিগুলি’, ‘আজগুবি রাত’, ‘তিন পর্বের জীবন’, ‘কানাগলির মানুষেরা’। প্রবন্ধ ও গবেষণার মধ্যে অন্যতম: ‘নন্দনতত্ত্ব’, ‘কতিপয় প্রবন্ধ’, ‘অলস দিনের হাওয়া’, ‘রবীন্দ্রনাথের জ্যামিতি ও অন্যান্য শিল্পপ্রসঙ্গ’। ১৯৯৬ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ২০১৮ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। সম্প্রতি ‘নতুন এক মাত্রা’র পক্ষ থেকে তাঁর জীবন ও সাহিত্য নিয়ে একান্ত সাক্ষাৎকার নিয়েছেন
কবি ফজলুল হক তুহিননতুন এক মাত্রা: আপনি সাহিত্যকে কোন দৃষ্টিতে দেখেন?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : দু’টো দৃষ্টিভঙ্গি আমার আছে। প্রথমত একজন পাঠক হিসেবে। স্কুল থেকেই তো সাহিত্যপাঠ আমাদের শুরু। আর আমি যে শহরে বড়ো হয়েছি, সিলেট শহরে; সেখানে চারটি গ্রন্থাগার ছিলো। যেটাকে পাবলিক লাইব্রেরী বলা হয়। যেখানে সবার জন্যই দ্বার উন্মুক্ত থাকে। সেগুলোতে যেতাম, বই পড়তাম আর আমি যখন বড়ো হয়েছি, তখন বই পড়ার সংস্কৃতি প্রবল ছিল। বিনোদনের তো অন্য মাধ্যম ছিল না। এজন্য সবাই বইয়ের ভেতর বিনোদন খুঁজে নিতেন। এবং সাহিত্য তো শুধু বিনোদন দেয় না, সাহিত্য জীবনকে নতুন করে দেখার, জীবন নিয়ে ভাবার সূত্রগুলি আমাদের উপহার দেয়। আর যখন লিখতে শুরু করি, (স্মিত হেসে) তিনভাবে বলি আমি- যখন অধ্যাপনা শুরু করলাম, তখন সাহিত্যকে অনেকটা সেই ডাক্তারের ছুরির নিচে যেভাবে শোয়ানো হয় রোগীকে, সেইভাবে দেখা শিখলাম। সেটি আমাকে উপকার দিয়েছে অনেক। কারণ সাহিত্যের অনেক খুঁটিনাটি বুঝতে পেরেছি। তো সেইভাবে সাহিত্যকে যখন পড়ছি, সাহিত্যের শক্তি-দুর্বলতাগুলো আমার চোখে ধরা পড়েছে। চারটা বলি (স্মিত হেসে), আরেকটা হচ্ছে অনুবাদক হিসেবে। অনুবাদ যখন করি, তখন দুর্বলতাগুলো খুব সহজে চোখে পড়ে। তখন আমিও বাংলাদেশের অনেক কবির অনেক কবিতা অনুবাদ করেছি। অনুবাদ করতে গিয়ে দেখেছি, ছন্দ খুবই দুর্বল, শব্দের গাঁথুনি ঠিক নেই এবং জমাটবাঁধা রক্তের মতো খলখল করে যাচ্ছে ধ্বনি ও উৎপ্রেক্ষা- এরকম আমি পেয়েছি। তাতেও আমার এক ধরনের সাহিত্য পাঠের সম্ভারটা বেড়েছে। আর বিদেশী সাহিত্য যখন অনুবাদ করতে গিয়েছি, খুব বেশি নয়; তখনও দেখতে পেয়েছি, সাংস্কৃতিকভাবে যে ঐতিহ্য তারা ধারণ করছে, সেটি আমাদের এখানে অনুবাদের জন্য, আমাদের কী প্রয়োজন করার, সে সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পেয়েছি। এভাবে আমার সাহিত্য পাঠ সমৃদ্ধ হয়েছে। আর চার নম্বর হচ্ছে, লেখক হিসেবে। তো আমি লিখছি, আমার নিজের সাহিত্য নিয়ে আমার বড়ো কিছু বলার নেই (সামান্য হেসে)। কিন্তু সাহিত্যিকদের আসরে নিজের নামটা লেখাতে পেরেছি। এটি আমার কাছে বড়ো একটি পাওয়া যে, বাংলাদেশে যারা গল্প-কবিতা লেখেন তাদের আসরে একেবারে শেষের দিকে হলেও নামটা তো লিখিয়েছি। হা হা হা, তো ওই সাহিত্য সম্ভারের ভেতর আমার একটা প্রবেশাধিকার তৈরি হয়েছে। এটা এক ধরনের ক্লাবের সদস্যপদের মতো। তো আমি যখন তাদের সঙ্গে কথা বলেছি, সৈয়দ শামসুল হক, শামসুর রাহমান; ক্রমাগত নিজেকে ঋদ্ধ করেছি।নতুন এক মাত্রা: আপনার সাহিত্যচর্চার সূচনাটা কিভাবে ছিলো এবং কারণ কী সাহিত্যচর্চার?
সৈয়দ মনজুরুল হক : প্রথমত, আদিষ্ট হয়ে লিখেছি। আমার বাবা ছিলেন শিক্ষা কর্মকর্তা। ময়মনসিংহে যখন তিনি ছিলেন, সেখানে প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের একটা কেন্দ্র ছিলো। তাদের একটা ম্যাগাজিন বেরোতো। নাম ছিলো, শিক্ষক সমাচার। তো তাদের একটা শিশু অংশ ছিলো। আমি ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় বাবা আমাকে আদেশ দিলেন যে, একটা গল্প লিখে দাও। তো আদিষ্ট হয়ে আমার গল্প শুরু হলো। যার জন্য গল্পের প্রতি আমার কোনো আকর্ষণ ছিলো না। বাবাকে খুশি করতে পেরেছি, এটাই ছিলো আমার সবচেয়ে সৌভাগ্য। এবং বিনিময়ে আমি কিছু বই উপহার পেয়েছিলাম। এখনো মনে আছে, শিবরাম চক্রবর্তীর ‘মহাকাশের ঠিকানা’, অমলদাশ গুপ্ত’র ‘পৃথিবীর ঠিকানা’। এগুলো পড়ে আমার মনে হলো যে, গল্প লেখা খুবই অর্থকরী একটা কাজ। তারপর আমি যখন বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ি, আমার বন্ধু রেজাউল করিম, সে তখন বিচিত্রায় প্রদায়ক ছিলো। সে একদিন এসে জোর করে বললো যে, ‘বিচিত্রায় গল্প লিখতেই হবে। আমাকে শাহাদাত ভাই বলে দিয়েছেন।’ শাহাদাত চৌধুরী তো বিখ্যাত সম্পাদক ছিলেন। শাহাদাত ভাই বলে দিয়েছেন যে, যেভাবেই পারো তুমি আমাকে দু’টো গল্প উপহার দিবে। তো আমি একটা লিখলাম, আরেকটা আমি ভুলে গেছি। শামসুদ্দিন বোধহয়, আমাদের এক বন্ধু ছিলো। তো আমার গল্পটা ছাপানো হলো অক্টোবর উনিশশো তিয়াত্তর সালে। নাম ছিলো- ‘বিশাল মৃত্যু’। আমার এক বন্ধুর বাবা মারা যাচ্ছিলেন, আজিমপুরে তার বাড়িতে শুয়ে। তো বিছানার উপর দেয়ালে ঘড়ি ছিলো, ঘড়িটা খুব শব্দ করতো। ঘড়িটা সরিয়েছিলো, গোল ঘড়ি। তার দাগ ছিলো দেয়ালে। তো আমার খুব চিন্তা হলো যে, ওদিকে তাকিয়ে আছেন তিনি। আসলে তিনি কী ভাবছেন? চাঁদ নিয়ে নিজেদের বালুকাবেলা ভাবছেন সমুদ্রের নিচে…। তো এটা আবার পিয়াস মজিদ, বাংলা একাডেমিতে কাজ করছে যে। ও উদ্ধার করে আমাকে দিয়েছে। এটা একটা বইতে গিয়েছে। আর শেষ যেটা আমার হলো, সেটা উনিশশো ঊননব্বই সালে। আফসান চৌধুরী, ‘বিশ^াসঘাতকগণ’ নামে একটি উপন্যাস আছে তার। বিখ্যাত উপন্যাস। আমাকে অনুরোধ করলো সে, ‘বিচিন্তা’ পত্রিকার জন্য একটা গল্প দিতে। ওই যে গল্পটা ছাপলাম, তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে পারিনি। কারণ ততোদিনে সাহিত্য পত্রিকাগুলো এসে গেছে। ‘ভোরের কাগজ’ শুরু হয়েছে। তার একটা সাহিত্য সংখ্যা আছে। যখন সবাই দেখলো যে, আমি গল্প লিখতে শুরু করছি। তখন সবাই অনুরোধ করলো। পশ্চিমবঙ্গে আমার একজন বন্ধু আছে শুভজিৎ ঘোষ। মারা গেছেন। ‘বরেন্দ্র পুরস্কার’ পাওয়া কবি। তার অনুরোধে আমি তার ‘প্রমা’ পত্রিকায় লিখেছি, যেগুলো নিয়ে সে একটা বই করেছিলো। তো, ওইই আমার যাত্রা এবং এখন পর্যন্ত গল্প লিখছি। তবে বছরে পাঁচ-ছ’টার বেশি গল্প আমি লিখতে চাই না। মৌলিক গল্প পাঁচ-ছ’টা তো যথেষ্ট। এর বেশি লিখার আমার কোনো আগ্রহ নেই, আর পারবোও না।
নতুন এক মাত্রা : আপনার প্রথম বই প্রকাশের অভিজ্ঞতা জানতে চাই।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : প্রথম বই ছিলো বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত ‘নন্দনতত্ত্ব’। তার আগে ছিলো ‘সাহিত্যের পরিভাষা’। সেটা তেমন বড়ো কোনো কাজ না। তো, ‘নন্দনতত্ত্ব’র কাজটা করে আমি খুব আনন্দ পেয়েছিলাম। পরে সেটা বেরিয়েছে ‘সন্দেশ’ থেকে। তারপর আবার জসিম করলো, কথাপ্রকাশের। ও একটা সুলভ সংস্করণ করেছে। তাতে করে অনেক মানুষ পড়তে পারছে। তো, এই বইটি লিখে আমি খুব আনন্দ পেয়েছি। তখন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক ছিলেন মনজুরে মওলা। উনি একশো বই দিয়ে ‘ভাষা সাহিত্য’ নামে একটা সিরিজ করেছেন। একই রকম আঁকা, একই রকম প্রচ্ছদ। তো, বাংলাদেশি নন্দনতত্ত্বের ওপর সেটি প্রথম কাজ ছিলো। কাজটি করে আমি খুব আনন্দ পেয়েছি। বিষয়টি আমার খুব প্রিয় ছিলো।
নতুন এক মাত্রা : সাতচল্লিশ পরবর্তী, স্বাধীনতা-উত্তর ও সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের কবিতা, কথাসাহিত্য ও প্রবন্ধসাহিত্যকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : সাতচল্লিশের আগে আমাদের সাহিত্য তেমন শক্তিশালী ছিলো না, এটা স্বীকার করতেই হবে। মানে, ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্য, ঢাকাকেন্দ্রিক শিল্পকলা- এগুলির চর্চা কিন্তু আমরা তেমন পাইনি। ঢাকাকেন্দ্রিক নাটক তো ছিলোই না। সেজন্য ওই সময়ে খুব বেশি সংগ্রহ আমাদের নেই। তবু যারা ছিলেন, তারা তো পথিকৃৎ এর ভূমিকা পালন করেছেন। এবং তাঁদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করাই উচিৎ। তবে সাতচল্লিশের পর পালাবদল ঘটলো। ঢাকাকেন্দ্রিক সবকিছুর আত্মপ্রকাশ ঘটলো। একটি প্রাদেশিক রাজধানীর মর্যাদা পাওয়ায়, আর পশ্চিমবঙ্গের সাথে আমাদের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হওয়ায়, আমাদের ধারণা হলো- ঢাকাকে কেন্দ্র করে আমাদের সাহিত্য রচনা করতে হবে। আপনি খেয়াল করে দেখুন, ঢাকাকেন্দ্রিক শিল্পকলা উনিশশো আটচল্লিশ থেকে শুরু হলো মাত্র। দশ বছরেই এশিয়ার ভেতরে স্থান করে নিলো। আমাদের সাহিত্য সেরকম এগোলো না। সাহিত্যের এই যে আধুনিকতা যেটা বলি আমরা, সেই ঢেউটা এসে লাগলো বায়ান্ন পরবর্তিতে। আর বায়ান্ন’র আমাদের যেটা হলো, আমাদের সংস্কৃতির শিকড় সন্ধানটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো। এর আগে পাকিস্তানপন্থী সাহিত্য রচিত হয়েছে কিছু। কিন্তু পাশাপাশি খুবই মৌলিক ও আধুনিক সাহিত্য হয়েছে। সেই আধুনিক সাহিত্যের রচয়িতা আবুল হোসেন থেকে শুরু করে শামসুর রাহমান এবং সম্পাদকরাও ছিলেন সেই সময়; যেমন- আবদুল কাদির এবং অনেকেরই নাম বলা যায়। নাম বললে তো শেষ করা যাবে না। কিন্তু আমি মোটা দাগে যেটা বলি, এই যে স্বাধীনতা-স্বাধীনতাই আমাদের আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। পাশাপাশি আমরা ধারণা করেছিলাম যে, আমরা বুঝি এখন নিজস্ব ঐতিহ্য নিয়ে আমরা তৈরি হবো। যেখানে শুধু মুসলমান নয়; হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবারই অংশগ্রহণ ছিলো এবং এখনো আছে। পাকিস্তানের সাথে কিছুদিন সংসার করে আমরা টের পেলাম যে, আমাদের সেই ঐতিহ্যে হাত দিতে চাচ্ছে পাকিস্তান। ভাষার উপর যখন আক্রমণ শুরু হলো, তখন ভাষাকেন্দ্রিক যে সংস্কৃতি তার প্রতি আমাদের স্থিরচিত্ততা তৈরি হলো। যার ফলে আমরা ঐতিহ্যের কাছে গেলাম এবং গ্রামকে আমরা কখনোই অবহেলা করিনি। আমাদের আধুনিকতার ভেতর গ্রাম কিন্তু উপস্থিত। এটি আমি মনে করি, পশ্চিমবঙ্গ থেকে বা পশ্চিম থেকে আমাদের আলাদা করেছে। আমাদের জীবনযাত্রা যেভাবে চলছিলো, সেভাবেই আমরা তুলে ধরেছি। আমরা কোনো মেকি আধুনিকতা নিয়ে আসিনি। শুধু আধুনিকতার কিছু রীতিবদ্ধতা আছে, সেগুলো আমরা প্রথমত গ্রহণ করেছি। তারপর সেগুলো নিয়ে আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি। চেতনাপ্রবাহের ঐতিহ্য; যেমন সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ করেছেন। কিন্তু নিজের মতো করেছেন। একেবারে গ্রামে স্থাপন করে অথবা সেটাকে শহর থেকে দূরে নিয়ে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে তার চর্চা তিনি শুরু করলেন।
নতুন এক মাত্রা : শওকত ওসমান, শওকত আলী…।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : শওকত ওসমান, শওকত আলী; নাম বলে আমি শেষ করতে পারবো না। প্রত্যেকেই অসাধারণ শক্তিশালী লেখক। ফলে আমাদের ভিত্তিটা তৈরি হয়ে গেলো। পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে গেলাম আমরা। সকল মতের, সকল সংস্কৃতির যৌথ সম্মিলন ধারণ করতে থাকলাম আমাদের সাহিত্যে। একই সঙ্গে আমাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষাও চললো। আধুুনিকতার যতোগুলি সূত্র, আমরা সেগুলি ব্যবহার করলাম। সেই অর্থে, আমাদের সাহিত্য প্রকৃত আধুনিক হলো। কিন্তু এই আধুনিকতা পশ্চিম থেকে পৃথক, এমনকি পশ্চিমবঙ্গ থেকেও পৃথক। এখানে গণমানুষের যে চিন্তা, গণমানুষের বিশ^াস-আদর্শ এবং গণমানুষের যেই সংগ্রাম, সেগুলো প্রতিফলিত হলো। আর তারুণ্যের শক্তি থাকায় আমাদের সাহিত্য খুবই তারুণ্যমণ্ডিত হলো। এর পর যেটা হলো- স্বাধীনতার পর; বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর, তখন তো আমরা একেবারেই স্বাধীন জাতি। আমাদের বৈশি^ক দৃষ্টি একটা তৈরি হয়ে গেলো। ফলে আমরা বিশে^র নিরিখে নিজেদের বিচার করতে পারি। যদিও ইতিমধ্যেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে গেছে, আমাদের ভাষার চিন্তাটাও দুর্বল হয়েছে। আমাদের প্রকাশের শক্তি আমরা কোথায় যেন খর্ব করছি নিজেরাই। এখন আমি প্রচুর ভালো লেখা পাচ্ছি, কিন্তু প্রচুর দুর্বল লেখাও পাচ্ছি। যারা দুর্বল লিখছেন, তাদের ভাষাচিন্তাটাও ভালো হতো, ভাষা নিয়ে তাদেও স্বচ্ছতাটা থাকতো, তাহলে হয়তো আমরা আরো কিছুও পেতাম। কারণ সাহিত্য শুধু বিষয়বস্তু দিয়েইতো হয় না। প্রকাশভঙ্গিটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। একই জিনিস দু’জন মানুষ দু’ভাবে প্রকাশ করতে পারবে। একটি হয়তো খুব আকর্ষণীয় হবে না, আরেকটি খুবই আকর্ষণীয় হবে। তো, এই আধুনিকতাটা আমাদের চালু থাকতে হবে। আমাদের সাহিত্যে রাজনীতি খুব গুরুত্বপূর্ণ, সমাজচিন্তা খুবই গুরুত্বপূর্র্ণ। আর নারীদের অংশগ্রহণ আমাদের সাহিত্যকে অনেক বিশাল একটা মর্যাদা দিয়েছে। আমাদের তো ইতিহাস আছে, রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন তো শুরু করেছিলেন। আমি মনে করি, শুধু উপমহাদেশ নয়; বিশে^রই একজন বড়ো এবং প্রথম নারীবাদি লেখক তিনি। এবং তিনি যেখানে বাংলা সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন- তাঁর হাত ধরে তো অনেকেই লিখছেন। তো, নারীরা যে লিখছেন- বিশেষ করে আমাদের তরুণরা যে লিখছেন…।নতুন এক মাত্রা : বিপুল সংখ্যক।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : হ্যাঁ, বিপুল সংখ্যক। সেটি আমাকে খুবই অনুপ্রাণিত করেছে। এবং নারী চিন্তার বাইরে গিয়েও তারা অনেক বড়ো মাপের সাহিত্য সৃষ্টি করছেন। ফলে ওই নারী চিন্তার যে একটা সীমাবদ্ধতা আছে- সেখান থেকে কোনো দুর্ভোগ; যা আমাদের নারীদের কখনোই পোহাতে হয়নি। আমাদের যারাই লিখেছেন- নারী হিসেবে লিখেননি, লিখেছেন লেখক হিসেবে। কিন্তু নারীর অবস্থান থেকে বিষয়কে দেখার কারণে, তারা অনেক নতুন নতুন চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন করতে পেরেছেন।নতুন এক মাত্রা : আপনি একদিতে অধ্যাপক, অন্যদিকে প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও কথাসাহিত্য সৃষ্টি করেছেন; এই যে বহুমাত্রিকতা, এ সম্পর্কে কিছু বলবেন?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : আমি মনে করি, বাংলাদেশে যিনি অধ্যাপক- সাহিত্যে; তাকে কোনো না কোনোভাবে বহুমাত্রিক হতে হয়। তিনি শ্রেণীকক্ষে পড়াচ্ছেন, কিন্তু সেই পঠন-পাঠন যখন তিনি নিজের লেখার ভেতর নিয়ে আসেন, তখন তো তিনি একজন প্রাবন্ধিক অথবা তিনি একজন গবেষক এবং সৃষ্টিশীল চিন্তার মানুষ; মননশীল লেখা তিনি লিখছেন। আবার তিনি যখন সৃজনশীল সাত্যি প্রকাশ করেন, তখন তার কর্মকাণ্ডের এলাকাটা অনেক বড়ো হয়ে যায়। আর আমাদের দেশে একটা… একদিকে সংকট বলবো আবার এটাকে সম্ভাবনা বলবো। প্রচুর পত্র-পত্রিকা আছে। যেগুলো তেকে ক্রমাগত দাবি উঠতে তাকে; একজন সাহিত্যের অধ্যাপকের পাওয়া খুব সহজ। কারণ তার দরজাটা অবারিত। তার ঘরে ঢুকে, তার সঙ্গে আলাপ করে, তাকে জিজ্ঞেস করে- অনেকভাবে তাকে বলে, এমনকি বুঝিয়ে-শুনিয়েও লেখানো হয়। এইভাবে যাকে বলে অনুরুদ্ধ হয়ে লেখা- সেভাবেও অনেক লিখেছি। শিল্পকলার প্রতি আমার আগ্রহটা একেবারে প্রথম থেকেই ছিলো। ফলে যখন চারুকলা ইনস্টিটিউটে জয়নুল আবেদীনের মতো মানুষজন চলাফেরা করতেন। আমি বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন সেখানে গিয়েও আড্ডা দিতাম। আমার বন্ধু ছিলেন মারুফ, ইব্রাহীম এবং শাহাবুদ্দীনের সঙ্গে তখন বন্ধুত্ব হয়েছিলো। এদের সঙ্গে ওঠাবসা করে, চারুকলায় গিয়ে বড়ো বড়ো পথিকৃৎ চিত্রকরদের সংস্পর্শে এসে শিল্পচিন্তাটা আমার অনেক বিকশিত হয়েছে। কারণ একজন শিক্ষক ছাড়া এই শিল্পচিন্তা বিকশিত হওয়া খুব কঠিন। পড়ে পড়ে শুধু হয় না। হাতে-কলমে দেখে শিখতে হয়। যেহেতেু এটি প্রায়োগিক একটা শিক্ষা। তো, সেইভাবে আমার শিল্পকলার উপর লেখালেখি হয়েছে। আর লিখতে লিখতে যা হয়- একটা অবস্থান তৈরি হয়ে গেলে সেই অবস্থানের কারণেই হোক- আপনাকে আরো বেশি লিখতে হবে। আর শামসুর রাহমানের মতো একজন গুণী লেখক যখন ‘অধুনা’ নামে একটি ম্যাগাজিনের সম্পাদক, অথবা আবুল হাসনাতের মতো একজন খুব নীরবে থাকা একজন মানুষ, আড়ালে থাকা একজন মানুষ, তিনি যখন বলতে থাকেন লিখতে হবে। সন্তোষ গুপ্তের মতো একজন শিল্প-সমালোচক যখন বলেন- লিখেন; তখন আর না করা যায় না। ফলে ওই একটা আবর্তনে পৌঁছে গিয়ে আমি আর পেছন ফিরে তাকাতে পারিনি।নতুন এক মাত্রা : বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষকদের সৃজনশীল কাজে খুব একটা দেখা যায় না। বিশেষ করে গল্প-উপন্যাসের ক্ষেত্রে, এ-ব্যাপারে আপনার বক্তব্য?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : না, সৃজনশীল লেখাটা আসলে সবারই আসে না- এটাও ঠিক। মানে অনেকেই তো কবি হতে চায়। কিন্তু জীবনানন্দ দাশ তো বলেছেনই যে, কেউ কেউ কবি। তো, আমি বড়ো ছোটো বিভাজনে যাচ্ছি না। কিন্তু যারা বেশি লিখেন ভালো লিখেন, আর যারা কম লিখেন ভালো লিখেন- সবাই সৃজনশীল। কিন্তু যিনি লিখছেন এবং তার লেখা হচ্ছে না, তাকে তো সেইভাবে সৃজনশীল বলা যাবে না। এই ধরণের লেখা প্রচুর আছে বাংলাদেশে। সেগুলো দাঁড়ায় না। পাঠকের হাতে যখন একটা লেখা পৌঁছে যায়- পাঠকই লেখার শেষ বিচারক। তো, সেই হিসেবে সবাই যে খুব সৃজনশীল লিখতে পারবেন, তা মনে হয় না।
নতুন এক মাত্রা : এই ফাঁকে একটু জানতে চাই- আপনি বলেছেন, বাংলাদেশে শিল্পকলার তুলনায় সাহিত্যটা খুব বেশি এগোয়নি। এই বিষয়টা যদি বলতেন।সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : শিল্পকলার সমালোচনাটা এগোয়নি, তা ঠিক। একসময় তো আমার মনে হয়েছিলো, শিল্পকলার সমালোচনার ক্ষেত্রে বিশাল একটা বিপ্লবই ঘটতে যাচ্ছে। আমরা যখন লিখতে শুরু করি- আমি প্রথম লিখেছি আমার তেইশ বছর বয়সে। পিকাসোর উপর, তাঁর মৃত্যুর পর।
বাংলাদেশ অবজারভার পত্রিকায় ইংরেজিতে লিখেছিলাম। তারপর তো আমার বন্ধুদের যখন প্রদর্শনী শুরু হলো- উনিশশো চুয়াত্তর সালে হলো শাহাবুদ্দীন, মারুফ এবং ইব্রাহীমের একসঙ্গে যৌথ প্রদর্শনী। তাদের উপর লিখতে হলো। শাহতাব নামের একজন শিল্পী ছিলো, ময়মনসিংহে পড়াতেন- তার প্রদর্শনী লিখতে হলো। তখন আমাদের বয়স কুড়ির নিচে। আমরা ক’য়েকজন ছিলাম- মুনতাসির মামুন, রবিউল হোসাইন… নাম বলে শেষ করা যাবে না। আমাদের থেকে আরেকটু সিনিয়র ছিলেন বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ছিলেন, সন্তোষ গুপ্ত তো ছিলেনই; নজরুল ইসলাম ছিলেন, হাসনাত আবদুল হাই…।
ভেবে দেখুন, কতো শিল্প-সমালোচক ছিলেন। যাদের বয়স হচ্ছে চল্লিশের নিচে। কিন্তু তাতে হলো কি, একটা ধারণা হয়েছিলো- এখন ক্রমাগত নিচ থেকে উঠে আসবেন শিল্প-সমালোচক। এখন আপনি দেখুন, কুড়ি থেকে ত্রিশের ভেতরে একজনের নাম বলতে পারেন কিনা- যিনি খুব ভালো লিখছেন। এখন শিল্পকলার চর্চা হচ্ছে বেশি, কিন্তু শিল্প-সমালোচনার ধারাটাই আমাদের নষ্ট হয়ে গেছে।
নতুন মাত্রা : আমাদের সমালোচনা সাহিত্যের এই দৈন্যদশার কারণ কী কী হতে পারে?সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : সমালোচনা সাহিত্যের জন্য সেই পরিমাণ পড়াশোনা থাকতে হয়; সমালোচককে প্রথমত হতে হয় একজন অনুসন্ধানী এবং তার তীক্ষè একটা দৃষ্টি থাকতে হবে, তার কোনো ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ থাকলে চলবে না। আর তার ব্যক্তিগত পড়াশোনার মাত্রাটা অনেক বেশি হতে হবে। বিচার-বুদ্ধি খুব তীক্ষè ও প্রখর হতে হবে। সত্যকে সত্য বলতে হবে এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলতে হবে। এই বিষয়গুলো যদি থাকে কারো, তিনি একজন ভালো শিল্প-সমালোচক হতে পারবেন। তাছাড়া আপনি যেটা বললেন- সৃজনশীল। লেখালেখি একদিকে সৃজনশীল হলেও মননশীলও বটে। একটা শিল্প-সমালোচনা যদি আপনি পড়েন, দেখবেন মাঝে মাঝে খুব ভালো লেখকদের- সন্তোষ গুপ্তের কথা যদি বলি, বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর; তাদের একটা সৃজনশীল মাত্রা আপনা থেকেই দাঁড়িয়ে যায়। পড়তে ইচ্ছে করবে আপনার। টানে, লেখাটা আপনাকে টানে। তো, এইটা যদি না থাকে, তাহলে শিল্প-সমালোচনাটা অনেকটা শুকনো হয়ে যায়, অনেকটা রীতিবদ্ধ হয়ে যায়।
নতুন মাত্রা : আপনি যে শর্তগুলোর কথা বললেন- আমাদের লেখকদের মধ্যে কি তা নেই তাহলে?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : না, আমাদের লেখকদের- যারা সমালোচনা করছেন, তাদের অনেকের ভেতরই অনুপস্থিত। অনেকে আবার ভালো লিখছেনও বটে। আমি তো খুবই আনন্দিত যে, তরুণ সমালোচকদের ভেতর আমি পাই সেটা। কিন্তু তাদের সংখ্যা এমন নয় যে, অন্যদের বাদ দিয়ে তাদেরকে নিলেই আমার এই ক্ষেত্রটিকে পরিপূর্ণ মনে হবে। ধরুন, যতো থাকার কথা ছিলো, সেই পরিমাণ নেই। অনেক লিটল ম্যাগাজিনে ভালো ভালো কাজ হয়। আমাদের চোখের আড়ালে অনেক সমালোচক আছেন; জেলা শহরগুলোতে অনেক আছেন। কিন্তু তাদেরকে জাতীয়ভাবে ডাকা হয় না। সেভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় না। তো, এখানে আমাদের অনেক কাজ করার বাকি। সেজন্য প্রথমত, যেটি করতে হবে- আমাদের শিল্প-সমালোচনাকে এবং সাহিত্য সমালোচনাকে সৃষ্টিশীল একটি ধারা হিসেবে স্বীকার করতে হবে। সেজন্য প্রয়োজনীয় উৎসাহ থাকা উচিত। এবং যারা লিখবেন, তাদের সম্মানীটাও বাড়াতে হবে। ধরুন, একটি প্রদর্শনী করে একজন শিল্পী যদি তিন লাখ টাকা পান- একজন শিল্প-সমালোচক সেখানে যদি কুড়ি হাজার টাকাও পান লিখে; তাহলে তারও একটা আকর্ষণ বাড়বে লিখতে। বিদেশে তো তাই হচ্ছে। এটি আমাদের করতে হবে। সাহিত্য-সমালোচকদের সাহিত্যিকিদের মতোই যদি আমরা সম্মান দিতে পারি, তাহলে সেটা একটা পরিপুষ্ট ধারা হবে। আমাদের মেধার কমতি নেই, কিন্তু মেধার পরিচর্যা হচ্ছে না।
নতুন এক মাত্রা : এটি কেন হচ্ছে না বলে আপনি মনে করেন? যেমন, একজন তরুণ কণ্ঠশিল্পী গান গেয়ে একদিনে এক-দুই লক্ষ টাকা পেয়ে যান। যেটা তাকে এ পথে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করে। কিন্তু লেখক-সমালোচকদের ক্ষেত্রে এটা হচ্ছে না কেন?সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : লেখালেখির একটা বাজার থাকে। সবকিছুরই। শিল্পের একটা বাজার তৈরি হয়। এটা আমরা যতই অস্বীকার করি, কিন্তু এটি আসলে বাস্তব সত্য। এই যে, শিল্পীকে এক দু’লাখ টাকা দেন; নিশ্চয় সেই পরিমাণ অর্থ বা তার চেয়ে বেশি অর্থ আয়োজকরা পান। সেজন্য তারা দিতে পারেন। কিন্তু একজন প্রকাশক তো দীর্ঘস্থায়ী বিনিয়োগ করেন। তিনি আজকে যদি দু’লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করেন, সেই বিনিয়োগ তার দশ বছর পরে ফেরত পাবেন। তার পক্ষে লেখককে অনেকে আবার সম্মানী দিয়ে… বা একটি পত্রিকা যখন চলছে, তখন তার সাংবাদিক থেকে শুরু করে সবাইকে বেতন দিতে হয়। সাহিত্য-সমালোচকদের যদি তারা ভালো টাকা দিতে থাকেন; দেখা যাচ্ছে যে ওইখানে ঘাটতি পড়তে পারে। তো, এটিরও একটি উপায় আছে। আমি মনে করি, ওই বাজারটাকে যদি আমরা সম্প্রসারিত করতে পারি। তরুণদেরকে আমরা উদ্বুদ্ধ করতে পারি বই পড়তে। এবং আপনার যে ‘নতুন এক মাত্রা’- এই নতুন মাত্রার কথাই বলি। যদি বাংলাদেশে একলক্ষ কপি আপনি বিক্রি করতে পারতেন; আপানি তো যে কোনো সমালোচককে কুড়ি হাজার টাকা দিতে পারতেন। কিন্তু এটি মানুষ কিনবে অনেক সময় অন্য সবকিছু কেনা হয়ে যাবার পরে। অথবা তারা চাইবে, এটি আপনি সৌজন্য সংখ্যা হিসেবে দিয়ে দেন। তাছাড়া বড়ো জিনিস হচ্ছে- একটা সম্মিলনের মুহূর্ত থাকে। সবকিছুর একটা মুহূর্ত তৈরি হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতির মুহূর্ত কিন্তু তৈরি হয়ে গেছে। বহির্বিশে^ বাংলাদেশের যে একটা ভাবমূর্তি সেটা তৈরি হয়েছে? আমাদের শিল্পকলার মুহূর্ত তৈরি হয়ে গেছে। আমাদের সাহিত্যেরও মুহূর্তটি তৈরি হয়েছে। এখন সাহিত্যের পরিব্যাপ্ত বিকাশ এবং সবার হাতে পৌঁছে দেবার জন্য যে বাজার-ব্যবস্থা, সেটির মুহূর্ত যেদিন তৈরি হয়ে যাবে- সেদিন খুব বেশি দেরি নেই কিন্তু। প্রতি বইমেলাতেই আমি অনুভব করি যে, বাজারটা তৈরি হচ্ছে।
নতুন এক মাত্রা : বাংলাদেশের কবিতা ও নাটকের সতন্ত্র এবং সমৃদ্ধ একটা জগৎ আছে, সে তুলনায় আমাদের উপন্যাস ও প্রবন্ধ-সাহিত্য অপেক্ষাকৃত কম বিকশিত। এটা কি আপনি মনে করেন?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : না, আমি উপন্যাসের ক্ষেত্রে সেটা বলবো না। সত্যিকার অর্থে, উপন্যাসটা হচ্ছে আমাদের শক্তিশালী জায়গা। বাংলাদেশের ঔপন্যাসিকদের যদি আমি এক জায়গায় রাখি, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ থেকে শুরু করে এই সময়ের উপন্যাস লিখছেন; ধরুন, মামুন হোসাইন, ইমতিয়ার শামীম, ওয়াসি আহমেদ। আমি মনে করি, পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় আমাদের উপন্যাস সাহিত্য অনেক এগিয়ে। পশ্চিমবঙ্গে একধরনের বিনোদনের সাহিত্য তৈরি হচ্ছে। শীর্ষেন্দু বলুন বা সমরেশ মজুমদার বলুন। সুনীলের আবার সমাজ চিন্তাটা আছে। আমি জানি সেগুলো ভালো সাহিত্য। কিন্তু সেগুলো বিশ^মানের সাহিত্য নয়। আমাদের যে তরুণরা লিখছেন তাদের উপন্যাসের মানটা যথেষ্ট ভালো।
ছোটগল্পে আমি একটা আকাল দেখতে পাই। ছোটগল্পে সেই পরিমান বিনিয়োগ আমি দেখি না। তরুণরা ছোটগল্প লেখার চেয়ে উপন্যাস লেখা বেশি পছন্দ করে। আর ছোটগল্পের পাঠকও সেই পরিমান নেই, সেটাও একটা কারণ হতে পারে। তবে প্রবন্ধ সাহিত্য আপনি ঠিকই বলেছেন- আমাদের প্রবন্ধ সাহিত্য অনেক দৈন্য- আমি দেখতে পাই। ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের দিক থেকে তার জন্য প্রচুর পঠন পাঠন থাকতে হয়। আমাদের দেশে যা হয়, এটি বলার জন্য হয়তো আমার উপর বিরক্ত হবেন অনেকে। সাহিত্যের ছাত্র হওয়ার জন্য তারাই তৈরি থাকেন যাদের এর প্রতি প্রচন্ড আগ্রহ আছে। তাদের সংখ্যা খুব কম। আর বেশিরভাগ সাহিত্যে আসেন যারা অন্য বিষয়ে ভর্তি হতে না পারেন। আপনি দেখুন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ইংরেজি পড়তে আসে বেশিরভাগ শিক্ষক হওয়ার জন্য বা সরকারী কর্মকর্তা হওয়ার জন্য। সাহিত্যের সমালোচনার জন্য কেউ এখানে আসেন না। বাংলা বিভাগও তেমন পাবেন। একসময় বাংলা বিভাগে ঢুকতেনই হুমায়ুন আজাদের মতো মানুষ। যারা লেখক হওযার জন্য কিছু দেয়ার জন্য আসতেন। তো হুমায়ুন আজাদের দিন তো শেষ হয়ে গেছে। এখনও কিছু কিছু আছেন সেটা অবশ্য সত্য। কিন্তু যে পরিমান সমালোচক বাংলা বিভাগ থেকে বের হওয়ার কথা ছিল সে পরিমান নেই। তার কারণটা হচ্ছে সাহিত্য পাঠে অনাগ্রহ। অনেকে সাহিত্য পাঠ করতে চান না। আমি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যদি লিখি তাহলে তো তার লেখা আমার পড়া থাকতে হবে।
আর একটা কথা হচ্ছে একজনকে দেখে কিন্তু আর একজন শেখে। শ্রেণিকক্ষে হুমায়ুন আজাদ ও আহমদ শরীফ যখন পড়াতেন তখন তাদের অনুপ্রেরণায় অনেকে তৈরি হয়েছেন। মনির চৌধুরীর ক্লাসে আমরাও যেতাম। কিন্তু এই অনুপ্রেরণা দান করার মতো এখনের সেমিস্টার পদ্ধতিতে কোন সুযোগ নেই। সেমিস্টার পদ্ধতি আমাদের পড়ালেখাকে নষ্ট করে দিচ্ছে। সাহিত্য পাঠকে অত্যন্ত খন্ডিত করছে। সাহিত্য পাঠকে শুধু বাজারের জন্য তৈরি করছে। এটি করে আমি চাকরি পাবো কিন্তু সাহিত্য সাধনা ও সমালোচনা এতে হচ্ছে না। সাহিত্য সমালোচনা যারা করছে তারা নিজের পড়াশোনা থেকে করছে। এক ধরণের আত্মঅনুসন্ধান থেকে তারা তা করছে।
নতুন এক মাত্রা : মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য সম্পর্কে আপনার সামগ্রিক মূল্যায়ন কী?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : একটা কথা বলা হয় যে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যতখানি লেখা উচিত ছিল ততখানি লেখা হয়নি। আমি মনেকরি তা ঠিক নয়। মুক্তিযুদ্ধ এমনই এক বিষয় এটা অনন্তকাল ধরে আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করবে। ফলে সব লেখা আজকেই লিখে ফেলতে হবে তাতো কোন কথা নয়। ইতিহাস ভিত্তিক লেখা এক জিনিস আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে লেখা আর এক জিনিস। মুক্তিযুদ্ধের সময় সকল মানুষ এক হয়েছিল। এখন নেই। মুক্তিযুদ্ধে কোন বিভাজন ছিল না। কিছু সংখ্যাক মানুষ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সবাই সমর্থক ছিলেন। এখন মুক্তিযুদ্ধের সমর্থকদের ভেতরেও কেউ কেউ উগ্র পন্থায় বিশ^াসী হয়ে গেছে। ফলে অখন্ডতা আর নেই।
সমাজতান্ত্রিক একটা চিন্তা ছিল। ফলে গ্রামের কৃষক তার দরজা খুলে দিয়েছিল। ৭৪ সালে যখন দুর্ভিক্ষ দেখা দিল তখন গ্রাম থেকে যারা এলেন তাদের উপর ঢাকাবাসী দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। তখনই আমার মনে হয়েছিল সমাজতান্ত্রিক চিন্তাটা আমাদের অলীক স্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারী পুরুষের ভেদাভেদ ছিল না। আপনি দেখবেন অপারাজেয় বাংলায় একজন নারী মূর্তি আছে। কিন্তু সেটি আবার অনেকে গ্রহণ করতে যাচ্ছেন না। নারী বিদ্বেষী একটা মহল দাঁড়িয়ে গেছে আমাদের দেশে। তারাও এই মুক্তিযুদ্ধের চিন্তার বিপরীতে গেছে। পিতৃতান্ত্রিকতা মুক্তিযুদ্ধের বিপরীতে গেছে। পিতা ছেলের হাতে বন্দুক তুলে দিয়েছে ছেলেকে সংরক্ষণ করার জন্য নয়, দেশটা সংরক্ষণ করার জন্য। সেটি আবার এখন অনুপস্থিত। একটা সময় হয়তো আসবে যখন সেগুলো আবার পুনরুদ্ধার করবে বাংলাদেশ। তখন মুক্তিযুদ্ধ অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। যেটুকু সাহিত্য হয়েছে অনেক বড় সাহিত্যই তৈরি হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাস ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’ বিশ^মানের উপন্যাস। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিশ^মানের উপন্যাস কয়জন লিখেছে? পৃথিবীর ইতিহাসে বলেন? ভারতে যে মুক্তিযুদ্ধ হলো তা নিয়ে বা কয়জন লিখেছেন? ফলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এ পর্যন্ত যা হয়েছে, হুমায়ুন আহমেদের কয়েকটি গল্প-উপন্যাস আছে: ‘জোৎ¯œা ও জননীর গল্প’ অন্যতম। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের বিনিয়োগ অনেক হয়েছে। হ্যাঁ, আবেগের বিনিয়োগের তুলনায় হয়তো কম। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শুধু আবেগের বিষয় নয়। এটি ইতিহাসের বীক্ষণে পড়াশোনার বিষয়। এটি একটি ক্রমাগত ঘটে যাওয়া ঘটনা। একটা খন্ড দেখে মন্তব্য করা ঠিক নয়।
নতুন এক মাত্রা : দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ নিয়ে তো এখনও সাহিত্য রচনা হচ্ছে।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : হ্যাঁ হচ্ছে। চিত্রকলাও হচ্ছে। সবই হচ্ছে। কিন্তু সেটি হচ্ছে অনেকগুলো দেশে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শুধু আমাদের। শিক্ষিত মানুষ কয়জন ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে? এখনও আমাদের ত্রিশ ভাগ মানুষ অক্ষর জ্ঞানহীন। ঐ মানুষগুলো যখন অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন হবে, তাদের সন্তানরা যখন সুশিক্ষিত হবে তখন দেখা যাবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমরা অনেক কিছু করেছি। সীমিত সম্পদ, সীমিত শিক্ষাগত যোগ্যতা! সব মানুষই যদি শিক্ষিত হতো তবে অন্য রকম হতে পারতো। তাতেও আমরা অনেক কিছু পেয়েছি। আমাদের নাটক হয়েছে, চিত্রকলা হয়েছে। আমাদের চিত্রকলা খুব সমৃদ্ধ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। অসাধারণ অনেকগুলো কবিতা লেখা হয়েছে।
আমাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি খুবই দুর্বল। অর্থনীতি সাহিত্যকে অনেক মর্যাদা দেয়। আপনি বিদেশি সাহিত্য কেন পড়ছেন? কারণ অর্থনীতি মজবুত বলে। আমেরিকার কোন কোন লেখকের লেখা চার পৃষ্ঠা পাঁচ পৃষ্ঠা পড়ে আমি ছুড়ে ফেলে দেই। সেটি আমাদের সাহিত্যের মতোও নয়। কিন্তু সেটা বিক্রি হচ্ছে। কারণ তার অর্থনীতি মজবুত। বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন মজবুত হবে তখন প্রচুর মানুষ আমাদের সাহিত্য পড়বে। বিদেশে বাজার সৃষ্টি হবে। আমি এ ব্যাপারে বেশ আশাবাদী। কেন সেটা বলি। আমেরিকাতে অনেক বাঙালির সন্তান আছে যারা ঐদেশে জন্ম নিয়েছে। ইংরেজি শিখেছে, বাংলা হয়তো জানে না। তাদের দুজনকে আমি জানি। একটি মেয়ে আর একটি ছেলে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখেছে। একজন দাদার কাছ থেকে গল্প শুনে আর একজন গ্রামে এসে ঘুরে গিয়ে। অসাধারণ দুটি লেখা। এ দুটি যদি বের হয় দেখা যাবে যে ঐ একটা ধারা আমরা সৃষ্টি করে ফেলেছি। যারা অনাবাসিক বাঙালি তারাও বাংলাদেশে বিনিয়োগ করছে। এটি বিদেশে খুব বেশি হয় নাই। এটি আমাকে খুব আশান্বিত করে।
নতুন এক মাত্রা : আপনার ছোটগল্প: ‘থাকা না থাকার গল্প’ (১৯৯৫), ‘কাচ ভাঙ্গা রাতের গল্প’ (১৯৯৮), ‘অন্ধকার ও আলো দেখার গল্প’ (২০০১), ‘প্রেম ও প্রার্থনার গল্প’ (২০০৫), ‘সুখ দুঃখের গল্প’, ‘বেলা অবেলার গল্প’- নাগরিক মধ্যবিত্ত ও নি¤œবিত্ত মানুষের জীবনের বহুস্তর বিন্যাস এবং আঙ্গিকের সহজতা লক্ষ করা যায়; নিরীক্ষার নামে দুর্বোধ্য ও জটিল রসায়ন নেই; আপনার গল্প নিয়ে আপনার নিজের বিচার কেমন?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : তিনটা কথা বলি। খুব বেশি বলার নেই। নিজের সম্পর্কে বেশি বলা ঠিক নয়। একটি হচ্ছে আমাদের দেশে গল্প বলার ঐতিহ্য হাজার বছরের। গল্প লেখার ঐতিহ্য খুব বেশি দিনের নয়। পশ্চিমেরও নয়, আমাদেরও নয়। পশ্চিমের হয়তো তিনশো বা চারশো বছর। আমাদের হয়তো দুশো বছর। যখন লিখতে শুরু করি তখন আমি গল্প বলার ঐতিহ্যে চলে গেছি। ছোটবেলায় দুইজন মানুষ আমার বলার ধারা তৈরি করে দিয়েছেন। একজন আমাদের বাসায় কাজ করতেন। হাবিব ভাই ছিল উনার নাম। খুব সুঠামদেহি মানুষ। লম্বা। ছোটবেলা আমার অসুস্থতা ছিল। আমার স্কুলে যেতে দেরি হয়েছে। মা শিক্ষক ছিলেন। সকাল বেলা চলে যেতেন। হাবিব ভাইয়ের জিম্মায় আমাদের দুই ভাইকে রেখে যেতেন। মাঝে মাঝে তার কাঁধে চড়ে আমি ঘুরতাম। তিনি হাছন রাজার গান করতেন। হাসান রাজার গান প্রথম তার মুখে শুনি। গল্প বলতেন। সেই গল্পের ভেতর গান আছে, অভিনয় আছে। এই আকর্ষণটা আমার মধ্যে তৈরি হয়। গল্প তো গান হয়, অভিনয়ও হয়। আর গল্প তো সহজবোধ্য জিনিস। তিনি যা বলতেন তাতে কোন রকমের দূর্বধ্যতা ছিল না। দ্বিতীয় ছিলেন একজন হিন্দু বিধবা নারী যাকে আমরা দিদা ডাকতাম। তিনি আমাদের নিয়ে মাঝেমাঝে বসতেন আর গল্প করতেন। চমৎকার সব গল্প। তিনি গল্প বলতে বলতে হঠাৎ করে থেমে যেতেন। আমরা খুব ব্যস্ত হয়ে যেতাম। কী দিদা, গল্পটা? তিনি বলতেন, গল্প তো হারিয়ে যায়নি। তিনি সুপারি কাটছেন, পান বানাচ্ছেন। তার গল্প কিন্তু থেমে রয়েছে। মাঝেমাঝে আমাদের বলতেন, গল্পটা শেষ কর। আমি মাঝেমাঝে ঠাট্টা করে রাজপুত্রকে মেরে ফেলতাম। আমার উপরে সব বন্ধুরা চড়াও হতো। কিন্তু উনি বলতেন, জীবনের রাজপুত্র কি মরে না রে? রাজকন্যাও মরে, রাজপুত্রও মরে। ঐযে একটা বাস্তবতা আমাদের শিক্ষা দিলেন। ঐযে গল্প বলার সহজতা। তারপর যে পুথিপাঠক। আমি কতদিন যে স্কুলে দেরি করে যাওয়ার জন্য মার খেয়েছি। স্কুলে যাওয়ার পথে যে পুলটা ছিল তার নিচে একজন পুথিপাঠক কি কারণে জানি না স্কুলে যাওয়ার সময় হাজির হতেন। হয়তো আমার মতো কয়েকজনকে মার খাওয়ানোর জন্য। পুথিপাঠক সহজভাবে বলতেন। তার মধ্যে হাসি আছে, কান্না আছে। এগুলো নিয়ে কোথায় যে আধা ঘন্টা চলে যেত। এই হচ্ছে আমার প্রথম পাঠ। সেখানে জটিলতা নেই, প্রকাশের একটা বৈচিত্র আছে।
দ্বিতীয়ত আমার যে পঠন পাঠন, বিশেষ করে ল্যাটিন আমেরিকার পাঠ। আমি যখন বিদেশে পিএইচডি করতে গিয়েছি তখন পড়েছি। পড়তে পড়তে মনে হলো এই দেশ তো আমারই। এ ঐতিহ্য তো আমারও। জাদুগ্রস্তের মতো অবস্থা। এটি আমার দেশে সবখানে আছে। ঐ সাহিত্য আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে। যার জন্য দুই বছর আমি স্প্যানিশ শিখলাম। মূল ভাষায় পড়ার পর দেখলাম কত সুন্দর সেই সাহিত্য।
তৃতীয়ত আমি যখন গল্প লিখতে বসেছি। আমার মনে হলো আমি যে গল্প লিখছি তাতে আমার স্বাক্ষর থাকতে হবে। তার আগে তিনটা কবিতা আমার ছাপা হয়েছিল। তিনটা খুব বিখ্যাত সাময়িকীতে। একটা ‘কণ্ঠস্বরে’, আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ ভাই কবিতা পড়ে খুশি হয়ে ছেপেছিলেন। ‘পরিক্রমা’য় যেটার সম্পাদক ছিলেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। ‘সমকাল’ যেখানে লেখা ছাপা হলে কবিরা মিষ্টি বিতরণ করতেন। ‘পরিক্রমা’য় ছাপা হলেও আমার মনে হলো না এই কবিতা দাঁড়াবে। আমি বুঝলাম কবিতা আমার কাজ না। আমি কবিতা বিসর্জন দিলাম। এই চিন্তাটা আমার মাথায় ছিল। গল্প যদি লিখি আমি থাকার জন্য লিখবো। আমার স্বাক্ষরটা যেন থাকে। ঐ চিন্তা করতে গিয়ে আমি জটিলতা পরিহার করি।
নতুন এক মাত্রা : আপনার একটা গল্প ‘থাকা না থাকার গল্প’-
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : ঐটা ছিল, এক ধরনের অস্তিত্ববাদী সংকট থাকে না মানুষের? একজন শিক্ষক আমাকে হিস্ট্রি পড়াতেন। তার স্ত্রী মারা গিয়েছিল। তার একমাত্র কন্যা তার সাথে থাকতো। জামাইটা খুব বদ ছিল। যার জন্য তিনি তার নাতিটাকে খুব ভালোবাসতেন। নাতিটাকে হারিয়ে তিনি খুব সংকটে পড়লেন। দুটা গল্প জোড়া দিয়েছি। ৭১ সালে দাঁড়ি কামাতে গিয়ে টিটেনাস হয়েছিল। তিনি তাতে মারা গিয়েছিলেন। উনার জীবনটা আমার কাছে অদ্ভুত মনে হতো। এত বড় একজন রসায়নবিদ তার জীবনে এই পরিণতি কেন? সেই হিসেবে আমি যখন লিখতে শুরু করলাম আমি তাকে বানালাম অংকের অধ্যাপক। তাকে নিয়ে আসলাম অন্য একটি জায়গায়। তার শেষটাও আমি সেভাবে দিলাম। এই করতে গিয়ে অস্তিত্ববাদী চিন্তা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল। কিন্তু অস্তিত্ববাদ নিয়ে আমি জটিলতায় যাইনি। একটু পড়লেই যে কেউ বুঝবেন তার অস্তিত্বের সংকটটা কোথায়। আর গল্পের শেষে আমি গল্প জুড়ে দেই যাতে মানুষ বুঝতে পারে এটা গল্প। শুধু একটি গল্পে গল্প আসেনি। সেটা হচ্ছে ‘শিকারী’।নতুন এক মাত্রা : আপনার ‘আধখানা মানুষ্য’ (২০০৬), ‘দিনরাত্রিগুলি’, ‘আজগুবি রাত’, ‘তিন পর্বের জীবন’, ‘কানাগলির মানুষেরা’-উপন্যাসগুলোয় মানবজীবনকে কোন কোন দৃষ্টিতে দেখতে চেয়েছেন এবং বাংলাদেশের উপন্যাসে আপনার উপন্যাসের অবস্থানগত মূল্যায়ন কীভাবে করবেন?
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : আমার অনেক উপন্যাসে আমি নিজেই চলে যাই। রূপকথার যারা বর্ণনাকারী ছিলেন প্রত্যেক বর্ণনায় আলাদা একটা গল্প দাঁড়াতো। কিন্তু বর্ণনাকারী গল্পের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। আমি সে ভূমিকা নিয়েছি। আমি মনে করি খুব কম সংখ্যক লেখকই তাই করেন।
নতুন এক মাত্রা : মান্নান সৈয়দ তো এমন করেছেন।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : মান্নান ভাই বেশ কাজ করেছেন। মান্নান ভাই প্রথম আমার বইয়ের সমালোচনা লিখেছিলেন। এত পছন্দ করে সমালোচনা লিখেছিলেন আমাকে না জানিয়ে। তিনি যে খুব বেশি বইয়ের সমালোচনা লিখেছেন তা কিন্তু না। মান্নান ভাই প্রথম আলো বর্ষ সেরা বইয়ের বিচারক ছিলেন। আমি মনে করি মান্নান ভাই আমার মানস গঠনে একটা ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর মতো মেধাবী প্রাবন্ধিক যদি ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ লিখতে পারেন, ‘সত্যের মতো বদমাশ’ লিখতে পারেন তাহলে আমাদের ঐতিহ্যের কোন ঘাটতি নেই বলে আমি মনে করি। কিন্তু সেটা আমরা ধরে রাখতে পারছি না। মান্নান সৈয়দের মতো এত নিবিষ্ট গবেষক আমরা দেখতে পাই না।
[ দ্বিতীয় পর্ব আগামী সংখ্যায়]
শ্রুতি লিখন : মোস্তফা মাহাথির