নতুন হেডমাস্টারের আগমনের খবরটি পুরো স্কুলে ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগলো না। মহিলা শিক্ষকদের কমনরুমে বসে সেদিনের পাঠে শেষ দৃষ্টি বোলানোর সময়ই খবরটি তার কানে এসেছিল। তাকে এখন অন্য শিক্ষকদের সাথে যোগ দিয়ে নতুন হেডমাস্টারকে স্বাগত জানাতে হবে আবার হ্যান্ডশেকও করতে হবে। ভয়ে তার পুরো শরীর কেঁপে উঠল, কিন্তু এটা এড়ানোর কোন উপায় নেই।
“সবাই তার দক্ষতার প্রশংসা করে।” একজন সহকর্মী বলল, “আবার তার কঠোরতার কথাও বলে।”
এরকম হতে পারে সেই সম্ভাবনা সবসময়ই ছিল, আর শেষ পর্যন্ত হলও তাই। তার সুশ্রী মুখমণ্ডল বিবর্ণ হয়ে গেলো, টানা কালো চোখে নেমে এলো স্থবির ভাব।
যখন সময় হলো শিক্ষকগণকে তা দুরস্ত হয়ে সার বেঁধে হেডমাস্টারের খোলা রুমে প্রবেশ করলো। ডেস্কের পেছনে উঠে দাঁড়িয়ে নারী-পুরুষ সবাইকে তিনি সাদরে গ্রহণ করলেন। তার উচ্চতা মাঝারি, শরীর কিছুটা হৃষ্টপুষ্ট, মুখ গোলগাল, নাক বাঁকানো, আর চোখ ফোলা। প্রথম দেখায় তার যে জিনিসটা চোখে পড়ে তা হল ফুলে ওঠা ঘন গোঁফ, দেখলে মনে হয় ধনুকের মত বাঁকানো ফেনাযুক্ত ঢেউ। তার বুকের দিকে দৃষ্টি সমান্তরাল রেখে সে এগিয়ে গেলো। চোখের দিকে না তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো। কিছু কি বলার আছে? অন্যরা যা বলেছে তাই কি বলবে? যাই হোক, সে চুপ করে থাকলো, একটা শব্দও উচ্চারণ করলো না। শুধু হেডমাস্টারের চোখ কি বলছে তা দেখতে ইচ্ছা হল। খসখসে হাতে হেডমাস্টার করমর্দন করলেন আর বিষণ্ণ কণ্ঠে বললেন, ‘ধন্যবাদ’। মার্জিতভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে সে চলে এলো।
সারাদিনের কাজের ভিড়ে সব উদ্বেগ ভুলে থাকলেও তাকে দেখে মনে হচ্ছিলো সে ভালো নেই। কয়েকজন ছাত্রী তো বলেই ফেলল, “মিসের মেজাজ ভালো নেই।” এরপর কাজ শেষে পিরামিড রোডের শুরুতেই তাদের বাড়িতে ফিরে কাপড় ছেড়ে মায়ের সাথে খেতে বসলো। মা মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, “সব ঠিক আছে তো?”
“বদরান বাদাউইকে তোমার মনে আছে? আমাদের হেডমাস্টার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন তিনি।” সংক্ষিপ্তভাবে উত্তর দিলো সে।
“সত্যি!”
এরপর এক মুহূর্ত চুপ থেকে সে বলল, “তেমন কোন ব্যাপার না। সেই কত আগের কথা, প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম।”
খাওয়ার পর কিছু পরীক্ষার খাতা নিয়ে বসার আগে একটু বিশ্রাম নেয়ার জন্য পড়ার ঘরে গিয়ে ঢুকল সে। লোকটাকে তো প্রায় ভুলেই গিয়েছিল সে। না, ঠিক পুরোপুরি না। কিভাবে এতো তাড়াতাড়ি ভুলে যাওয়া যায়? যখন বাদাউই প্রথম তাকে গণিত প্রাইভেট পড়ানোর জন্য এসেছিল, তার নিজের বয়স ছিল মাত্র চৌদ্দ। আসলে পুরোপুরি চৌদ্দও না। বাদাউইর বয়স ছিল পঁচিশ, ঠিক তার বাবার সমান। “ দেখতে অগোছালো হলেও পড়া বুঝাতে পারে ভালোই,” তার মাকে সে বলেছিল। মা বলেছিল, “দেখতে যেমনি হোক, কেমন পড়ায় সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
বাদাউই ছিল চমৎকার একজন মানুষ আর জ্ঞান বিতরণের সাথে তাল রেখে তাদের সম্পর্কও ধীরে ধীরে ভালো হল। তাহলে ব্যাপারটা ঘটলো কিভাবে? তার নিজের সরলতার জন্য বাদাউইর আচরণের পরিবর্তনেও সে সাবধান হওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। তারপর একদিন তার বাবাকে ক্লিনিকে যেতে হয়েছিল কোন এক কারণে, আর বাড়িতে তার সাথে ছিল কেবল বাদাউই। বাদাউইর ব্যাপারে তার মনে কোন সন্দেহ তার ছিল না কারণ তাকে সে চাচার সমতুল্য মনে করতো। তাহলে কিভাবে ঘটলো সেটা? তার পক্ষ থেকে কোন প্রকার প্রেম বা আকাক্সক্ষা ছাড়াই ব্যাপারটা ঘটে গেলো। ঘটনার পরে আতঙ্কের সাথে সে জিজ্ঞেস করেছিল আসলে কি হয়ে গেলো আর বাদাউই উত্তর দিয়েছিলো, “ভয় বা দুঃখের কোন কারণ নেই। ব্যাপারটা নিজের ভেতর রেখো। তোমার যখন বয়স হবে আমি নিজেই প্রস্তাব নিয়ে আসব।”
বাদাউই তার কথা রেখেছিল এবং তাকে বিয়ে করার প্রস্তাবও নিয়ে এসেছিল। কিন্তু ইতোমধ্যে তার ভেতরে এক ধরনের পরিপূর্ণতা এসেছিল যার ফলে নিজের করুণ অবস্থা অনুধাবন করতে তার বেগ পেতে হয়নি। সে দেখতে পেল বাদাউইর জন্য সম্মান বা ভালোবাসা কোনটাই তার নেই, আর একজন আদর্শ ও নীতিবান ব্যক্তি সম্পর্কে যে ধারণা বা স্বপ্ন তার মনে ছিল বাদাউইর অবস্থান তার থেকে অনেক দূরে। তাহলে কি করার ছিল তার? দুই বছর আগেই তার বাবা মারা গিয়েছিলেন, আর তার মাও বাদাউইর ওরকম সরাসরি প্রস্তাবে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। যাইহোক, তারপরও মেয়েকে তিনি বলেছিলেন, “ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতি তোমার ঝোঁকের কথা আমি জানি, তাই সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব তোমার ওপরেই ছেড়ে দিলাম।”
নিজের এই জটিল পরিস্থিতির সম্পর্কে সেও সচেতন ছিল। হয় তার প্রস্তাব গ্রহণ করতে হবে নয়তো দরজা চিরতরে বন্ধ করে দিতে হবে। পরিস্থিতি এমন যে তাকে হয়তো নিজের অপছন্দের কিছু একটা বাধ্য হয়ে করতে হবে। সে নিজে যেমন সুন্দরী আর সম্পদশালী, তেমনি চারিত্রিক উৎকর্ষতার জন্যও তার একটা খ্যাতি আছে, কিন্তু তাকেই এখন এক শক্ত ফাঁদে আটকা পড়ে অসহায়ের মত লড়াই করতে হচ্ছেতাও আবার একজনের লোলুপ দৃষ্টির সামনে পড়ে। পবিত্রতা নষ্ট হওয়া এক জিনিস আর নিজের সামর্থের উপর নির্ভর করে তাকে টেক্কা দেয়া আর এক জিনিস। বাদাউই বলল, “তোমাকে ভালবাসি বলেই আমার দেয়া কথার সম্মান করতে আমি এসেছি। আমি জানি তুমি শিক্ষকতা পছন্দ কর, আর সেজন্য বিজ্ঞান কলেজে তোমার পড়াশুনাও তুমি শেষ করতে পারবে।”
এমন রাগ হল তার যা আগে কখনো হয়নি। কদর্যতার মত নিগ্রহকেও সে সবসময় প্রত্যাখ্যান করে এসেছে। তাই নিজের বিয়ের চিন্তাকে বিসর্জন দেয়াটা তার কাছে আসলে কিছুই না। আত্মনির্ভরশীলতাকেই সে সবসময় স্বাগত জানিয়েছে। মূলত একাকিত্ব এবং আত্মসম্মান যখন এক হয় তখন আর সেটা নিঃসঙ্গতার পর্যায়ে থাকে না। তার আরও সন্দেহ হল যে বাদাউই তার অর্থ-সম্পদের জন্যই বিয়েটা করতে চাচ্ছে। পরে মাকে একদম সরাসরিই না বলে দিলো সে। উত্তরে মা বললেন, “আমার অবাক লাগছে তুমি প্রথম থেকে কেন এই সিদ্ধান্ত নাওনি।”
বাইরে বাদাউই তার পথ রোধ করে জিজ্ঞেস করলো, “কি করে প্রত্যাখ্যান করলে তুমি? এর পরিণতি কি তুমি জান না?” রুক্ষস্বরে সে উত্তর দিলো, “আপনাকে বিয়ে করার চেয়ে, যেকোনো পরিণতি মেনে নেয়া ভালো।” তার এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ বাদাউইর কাছে ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত।
পড়াশুনা শেষ করার পর বাড়তি সময় কাটানোর জন্য সে চাইল কিছু একটা করতে। এর এ জন্যই শিক্ষকতার শুরু। এরপর বহুবার তার বিয়ের সুযোগ এসেছে, কিন্তু সবগুলোকেই সে ফিরিয়ে দিয়েছে।
“কাউকেই কি তোমার ভালো লাগে না?” মা ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করেছিল।
“আমি কি করছি তা আমি ভালো করেই জানি,” সেও নম্রভাবে উত্তর দিয়েছিলো।
“কিন্তু সময় যে বয়ে যাচ্ছে।”
“যদি যায় তবে যেতে দাও, আমার তো কোন সমস্যা হচ্ছে না।”
ধীরে ধীরে তার বয়স বাড়ল। প্রেম ভালোবাসাকে সে এড়িয়ে চলে, কারণ তার ভয় হয়। সমস্ত শক্তি দিয়ে সে প্রত্যাশা করে জীবনটা সুখের না হলেও, ধীরে সুস্থে পার হয়ে যাবে। সুখ ভালোবাসা বা মাতৃত্বে জীবন সীমাবদ্ধ নয়, নিজেকে এই বলে সে সান্ত্বনা দেয়। নিজের শক্ত মনোভাবের জন্য কখনো তার দুঃখবোধ হয়নি। কে জানে সামনে কী হবে? তার সব চেয়ে বেশি মন খারাপ হল এই ভেবে যে সেই একই ব্যক্তি আবার তার জীবনে ফিরে এসেছে। তার সাথেই এখন দিনের পর দিন কাটাতে হবে, আর তার মাধ্যমেই অতীত হবে জীবন্ত আর বর্তমান হবে বেদনাদায়ক।
এরপর দু’জন যখন একা কথা বলার সুযোগ পেল বাদাউইই প্রথম জিজ্ঞেস করলো, “কেমন আছ?”
“ভালো”, শীতলভাবে উত্তর দিলো সে।
কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বাদাউই প্রশ্ন করলো, “এখনো তুমি… মানে … বিয়ে করেছ?”
আলোচনা অতি দ্রুত শেষ করতে ইচ্ছুক এরকম স্বরে সে উত্তর দিলো, “আপনাকে তো আগেই বলেছি আমি ঠিক আছি।”