ট্যাক্সিক্যাবের ভাড়া মিটিয়ে ব্যাগ টেনে টেনে গলির ভেতর ঢ়ুকে ঝন্টু একটু থামল। খবরটা ঠিক কি না- ভেবে নিয়ে এগোল। রাস্তার পুরনো আর নতুন ঢাকার মাঝ বরাবর- যেখানে রেললাইন ছিল, তার সমান্তরাল এই রাস্তা। অবশ্য মাঝ বরাবর বিবেচনাটা বৃটিশ আমলের শেষ আর পাকিস্তান আমলের শুরুর দিককার। রাস্তার বাতিতে যতটুকু দেখা যায়, এই ক’বছরে দু’চারটা সাইনবোর্ডের জৌলুস ছাড়া তেমন কোন পরিবর্তন নেই। রাস্তাটা খুব বেশি এগোয়নি- গলিটাও আগের মতই- গলির মুখেও দু’পাশে ক’টা চকচকে সাইনবোর্ড। তারপর যে দোকানটায় ফুলপুর কনফেশনারি, ওখানে দাঁড়িয়ে দেখল-একটা মিনি চাইনিজের সাইনবোর্ড ঝুলছে। আর সব আগের মতই আছে। বাড়ির গেটটা সেই রকমই নড়বড়ে- পকেট গেটটাও বাইরে থেকে আঙুল গলিয়ে খোলা গেল। গলির বাতির আলো এখানে পৌঁছে না- চিলতে বাগানটা কি অন্ধকারে কঁকিয়ে উঠল! মাঝরাতের আকাশে ম্লান আলো- নিচে নীলচে অন্ধকারে কাত হয়ে আছে বাড়ি- ঝন্টু একটু পেছনে সরে আবার তাকাল- ১৯৩৬ সালে নির্মিত কড়ি-বরগার বাড়ি- হতেও পারে!
ঝন্টু ভেতরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল- অন্ধকারে ঝিম মেরে আছে সেই পুরনো বাড়ি- রাতে সব বাড়িই এরকম ঝিম মেরে থাকে। তারপরও ফের প্রশ্ন জাগল, খবরটা কি ঠিক? বিশ্বস্ত সূত্রের খবর-তারা ফিরে এসেছে- ডেভেলপারের সাথে চুক্তি হয়নি- ওর মেজো ভাইয়ের চুক্তিতে সই না করাটা তাদের জন্য শাপে বর হয়েছে। এই বাড়িতে বড় হয়েছেন তার বাবা আর তিন ফুপু-জন্ম হয়েছে তাদের তিন ভাই-দুই বোনের। জজকোর্টের পেশকার তার দাদা বাড়িটা কিনেছিলেন বৃটিশ আমলের শেষদিকে বলতে গেলে পানির দামে।দ্বিধান্বিত আঙুলে কলামের ফোকরে বেল টিপতে গিয়ে থামল- হাত সরিয়ে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল ঝন্টু। মধ্যরাতে ওকে দেখে তারা আঁতকে উঠবে। মধ্যরাতে কেন-দিনের বেলা হলেও তাদের এই প্রতিক্রিয়াই স্বাভাবিক।
ঝন্টু আবার ঘুরে এগিয়ে গিয়ে কলিং বেল টিপল-বেল বাজতে থাকল…মিষ্টি দীর্ঘলয়ের শব্দে কলিং বেল বাজছে-সাবেরা কান খাড়া করল-তার ঘুম পাতলা-টুং করে শব্দ হলেও কান খাড়া হয়ে যায়। আবার বেল বাজছে-বেলের শব্দ এখন আর আগের মত লাগে না। এতদিন বেল বাজলে-কেউ এলে আনন্দময় অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ত চারপাশে-এখন-
সাবেরা হাত দিয়ে আলগোছে ধাক্কা দেয়, অ্যাই- কেউ এসছে, বেল বাজছে- হুম শব্দে সাড়া দিলেও ঘুম ভাঙে না পিন্টুর। সে কি সজাগ হয়েছে- বুঝতে পেরেছে? সাবেরার প্রশ্ন জাগলেও প্রশ্নের ফয়সালা করে ফেলতে চায় না- ফিসফিসিয়ে বলে, এ্যাই শুনছ-উঠ-অত রাতে কে এল?পিন্টুর কোন সাড়াশব্দ নেই- নাক ডাকছে ধীললয়ে।এবার জোরে ধাক্কা দেয় সাবেরা, অ্যাই উঠ না-বেল বাজছে তো-পিন্টুর জড়ান কণ্ঠ, ঘুমাও-সাবেরা উদ্বিগ্ন, না-এভাবে ঘুমান যায় না-উঠে পড়ে সাবেরা-শাড়ি ঠিকঠাক করে নিতে যায়, তখন আবার বেল বাজে-ওই মিষ্টি আওয়াজ এখন অস্বস্তিকর-দরজা ড্রয়িংরুমের দিকে পা বাড়াতে এগিয়ে যায়-বেলের শব্দে এবার কোণের কক্ষে ঘুম ভেঙে যায় নিনির- এ বাড়িতে সে সবার ছোট-কিছুতেই তার কিছু করার নেই- বালিশের তলায় মুখ গুঁজে থাকে-চোখ কচলাতে কচলাতে বুয়া ঢোকে বলল, আপামণি-বেইল বাজায়-কয়েকবার বলার পর নিনি বালিশের তলা থেকে মুখ না তুলে বলল, তুমি যাও ঘুমাওগে-বুয়ার কণ্ঠে অসহিষ্ণুতা, কয় কী-বেইল বাজাইতাছে না দরজায়-নিনি জিজ্ঞেস করল, কে?বুয়া বলল, কয় কী-দরজা না খুললে দেখবাম ক্যামনে!নিনি বলল, তুমি বেশি কথা বলছ- দরজা খুলতে হবে না তোমার, যাও-বুয়া ফ্লোরে বসে পড়ল, আর কইতাম না বেশি কতা-কাইল বিহানেই যাইবাম গা-নিনি বিরক্ত, তুমি না, বড় বেশি প্যাঁচাল পার-বুয়া উঠে গিয়ে ড্রয়িং রুমের দিকের দরজা ফাঁক করে দেখে ফিরে এসে বলল, আপামণি, ভাবীছাবে ডয়িংরুমে আন্ধারে হাঁটাচলা করতাচুইন-সাবেরা আগেই অন্ধকার ড্রয়িং রুমে ঢোকে বাতি জ্বালাতে গিয়েও জ্বালায় না-বাইরের দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে আবার পিছিয়ে আসে-তখন ফের বেল বাজে-নিনি বিছানা ছেড়ে উঠে ড্রইং রূমে ঢুকে চাপা স্বরে বলল, ভাবী অত রাতে কে বেল বাজায়?সাবেরা বলল, বুঝতে পারছি না কিছু-নিনি বলল, কি করবে এখন?সাবেরা সোফায় বসে শরীর ছেড়ে দেয়, তোমার ভাইয়া আসুক-নিনি দরজার কাছ থেকে ফিরে আসে, ভাইয়া সজাগ?সাবেরা হাই তালে, হ্যাঁ জাগিয়েছি-আচ্ছা নিনি এ কি নূরু দোকানদার হতে পারে?নিনি বলল, তার কথা মনে হলো কেন তোমার?সাবেরা বলল বিকেলে এসেছিল- বলে গেছে বেয়াদবি নিয়েন না-কম টাকার ব্যবসা-রাইতে যখন সাবে থাকেন-তখনই আসব-নিনি ঠোঁট উল্টায়, মনে হয় না। ক’মাস আগেও তো ভাইয়াই ওকে টাকা ধার দিয়েছে- অথচ এখন কতজন যে টাকা পায়!ওর কথা সন্ত্রস্ত সাবেরার কানে ঢোকে না-তার কণ্ঠে ভীতি, তাহলে কি আঙুলকাটা রেনু-ওই যে চাঁদা চেয়েছিল-পিন্টু এসে দরজার কাছে গিয়ে চোখ রেখে দেখার চেষ্টা করে।নিনি বলল, ও কি ঝন্টুভাইর কথা জানে না-নিশ্চয়ই জানে-পিন্টু বলল, আঙুলকাটাকে তো আমি বলেছি সব-ও আসবে কেন!সাবেরা উঠে দাঁড়ায়, ওদের কোন বুকপিঠ নেই- টাকার নেশা ওদের আর মানুষ রাখে না-ওরা যখন ফিসফিসিয়ে কথা বলছে, তখন ঘন ঘন কলিংবেলের শব্দে পিন্টুর মা’র রুমে লালির জেগে ওঠে-লালি দিদাকে ডাকে, দিদা বাইরে কেউ এসেছে মনে হয়, বেল বাজাচ্ছে-দিদা ঘুম জড়ান কণ্ঠে বললেন, ভুল শুনেছিস-অত রাতে কে আসবে-ঘুমা দেখি-লালি উঠে বসে, আসতে পারে দিদা, রাতেও কেউ আসতে পারে। ক’মাস ধরে তো কেউ বেল বাজায় না, তাই বেল বাজলেও সন্দেহ হয়, বেল আসলে বেজেছে কি?নিনি মা’র রুমে ঢুকে বলল, মা শুনছ বেল বাজাচ্ছে কেউ- এখন দরজা খুলবে কে-বড় ভাইয়া-ভাবী কেউ সাহস পাচ্ছে না-মা নির্বিকার, আমি কি করব?নিনি বলল, পরামর্শ দিতে পার তো- তুমি যাও ড্রয়িংরুমে-নিনি বেরিয়ে যাবার পর লালি বলল, দিদা, চল না যাই-মা ওর দিকে তাকিয়ে উঠে ড্রয়িংরুমের দিকে এগোলেন- পেছনে লালি। এসে দেখেন, ঘরজুড়ে কঠিন নিস্তব্ধতার ভেতর পিন্টু-সাবেরা-নিনি তিনজন স্তব্ধ। মা স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন, দরজা খুললেই তো হয়-পিন্টু আর সাবেরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করল- তখনই আবার বেল বাজে-মা বিরক্ত, কি বিচ্ছিরি আওয়াজ রে বাবা-লালি বলল, ঠিক বলেছ দিদা, কিন্তু ফুপি কি বলতো জান তো?সেই দৃশ্যটি মা ঠিক ঠিক দেখতে পেলেন-তিনি তখন প্যাসেজে-ওখান থেকে শুনলেন নিনি বলছে, আহ্ বেলের আওয়াজটা বকুল ফুলের মত গন্ধ ছড়ায়। জান ভাবী, বেলটা না বিদেশি-ইংল্যান্ডের।সাবেরা ফোড়ন কাটল, তোমাকে ঠকায়নি তো!
নিনি গ্রীবা বাঁকাল, অত সোজা! এ পর্যন্ত কত টাকার শপিং করেছি- ভ্যালুয়েবল কাস্টমার হারাবে নাকি! দোকানদার ইনট্যাক্ট প্যাকেট খুলে দিয়েছে। আহ্ কি মিষ্টি শব্দ- একেবারে বকুল ফুলের মত গন্ধ ছড়ায়, তাই না ভাবী?ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে মা বললেন, আওয়াজ আবার ফুলের মত গন্ধ ছড়ায় কি করে?নিনি মাথা ঝাঁকাল, ছড়ায় মা-ছড়ায়-মা অবাক, কই আমি তো গন্ধ-টন্ধ কিছু পাই না-নিনি ঠোঁট উল্টাল, তুমি পাও না, কারণ তোমার ভেতর গন্ধের অঙ্কুর গজায়নি-ভাবী পায়, জিজ্ঞেস করে দেখ-মা সাবেরার দিকে তাকালেন, কি বউমা, নিনি কি বলে এসব-পাগলের কথা-সাবেরা বলল, জি মা, আওয়াজটা মিষ্টি সুরেলা, এক রকম ভাললাগা আর কি-এবার মা ঠোঁট উল্টালেন, বুঝি না, আজকাল আর কিছু বোঝা যায় না- তোমাদের কাউকেও চেনা যায় না। কী অদ্ভুত অদ্ভুত কথা যে বলতে শুরু করেছ না-মা বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে আসেন। পেছনে বইতে থাকে নিনির প্রাণখোলা আনন্দঝরা হাসি।এই মধ্যরাতে মা ওই দৃশ্যটির মাঝ বরাবর দৃঢ় পায়ে হেঁটে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন-
তপুদের বাড়ির সামনে পায়েচলা রাস্তাটা ঠিক গলি নয়- গলির মত। এখনও মাঝে মধ্যে ফাঁকা জায়গা আছে- সেখানে দুয়েকটা গাছপালা থাকলেও তারা চিন্তিত, আর কতদিন আয়ু ধরে রাখতে পারবে! এখানে যারা টিনশেড বা আগে তৈরি একতলা-দোতলা বাড়িতে ভাড়া থাকেন, রাস্তা নিয়ে তাদের সবার তেমন ভাবনা নেই। ঘরবাড়ি যাদের তারাও সবাই চান না রাস্তাটা দ্রুত হয়ে যাক- তাদের অনেকের ঘরবাড়ি রাস্তার জায়গায় ঢুকে পড়েছে। তবে করপোরেশনের প্রান্ত ঘেঁষে অবহেলিত এলাকার হলেও সকালে অফিস-সময়ে এবং সন্ধ্যার পরপর এই পথে যে লোক-চলাচল থাকে দুপুর ও বিকেল শুরুর সময় তা মনেই হয় না। তপু যখন বাড়ি থেকে নিনিকে নিয়ে গলির মত পথটায় নামল, তখন পুরো রাস্তা নিবিড়-সুনসান।
তপুর ভেতরে একং কণ্ঠেও উৎসাহ থই থই করছে, নিনি, এক্সিলেন্ট করেছ-এতটা আমি আশা করিনি।নিনি হেসে উঠল, তাই!তপুর উৎসাহের কমতি নেই, শিওর-নিনি চোখ ফেরাল, তুমি কি মনে করেছিলে?তপু বলল, মনে করেছিলাম, ভাবী বলবে, আছে একমত-তা ভাবীকে তোমার কেমন লাগল?নিনি উদ্দীপ্ত, চমৎকার-ওয়েল লার্নেড। লেটেস্ট ইনফরমেশনগুলোর খোঁজ-খবর রাখেন। আবেগ এবং লজিকের মধ্যেও সমন্বয় আছে। এক কথায় এক্সিলেন্ট লেডি-তপুর কণ্ঠ ঝলমল করে উঠল, একদম রাইট তোমার ব্যাখ্যা!নিনি বলল, তোমাদের বাড়ির পরিবেশও ভাল, বেশ আলো-হাওয়া খেলছে।তপু একপাশের কাঁঠাল আরেক পাশের ঝাউগাছের মাঝখান আকাশের দিকে তাকাল, আমরা সবাই ওপেন মাইন্ডেড, অ্যাকোমোডেটিং-নিনি পথের সামনে-পেছনে চোখ বুলিয়ে তপুর কাছে ঘেঁষে এলো, তুমি আজ আমার হাতটা একবারও ধরলে না-
তপু হেসে উঠল, ওহো, নাও ধরলাম-নিনির কন্ঠ আপ্লুত, জান তপু, তোমার হাত আমাকে একটা স্বপ্নের ছোঁয়া দেয়-তপু হেসে ফেলল, আমি তো খুব বড় স্বপ্ন দেখি না-শুধু একটা ছোট্ট ঘর-ভরিয়ে রাখবে এক প্রশান্ত নারী-হাঁটায়-চলায়-বলায়, রাগেঅভিমানে, হাসি আর গানে-নিনি তপুর থুঁতনি নেড়ে দেয়, কিন্তু তপু মিয়া, পৃথিবী ছোট হয়ে যাচ্ছে-তোমার স্বপ্নটা আরও বড় কর-আরও বড়-তপু থমকে গেল, ইচ্ছে করলেই কি স্বপ্ন বড় করা যায়! বাস্তবের ছায়া ছাড়া কি স্বপ্ন বাঁচে?নিনি সটান, একটা কথা জিজ্ঞেস করি, কিছু মনে করবে না তো। তোমাদের ফ্যামিলির কে কে থাকে বাইরে?তপু অপ্রস্তুত, বাইরে-মানে?নিনি একটু সংকুচিত, মানে-এই ধর আমেরিকা-কানাডা-লন্ডন বা অস্ট্রেলিয়ায়-তপু চুপ করে থেকে কথাটা বোঝবার চেষ্টা করল-তারপর হেসে উঠল, অ, এই কথা! না, একজনও না-নিনি উৎসুক, মধ্যপ্রাচ্যেও না?তপু নির্বিকার, না-কেউ থাকে না, বাইরে কোথাও আমাদের কেউ নেই-নিনি অবাক, বল কি! তাহলে তোমাদের চলে কি করে? আজকাল বাংলাদেশের টাকায় কোন ফ্যামেলি চলে?হতাশ নিনি তপুর মুখটা দ্বিতীয়বার জরিপ করল- একটু থেমে বলল, ওমা! তোমরা তো চলতেই পারবে না-লাইফ এনজয় করবে কি করে!তপু অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল-নিনির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা অচেনা নারীর দিকে-সাবেরা আর নিনি শপিং করে ফিরেছে- সাবেরা চলে গেছে ভেতরে। নিনি সেন্টার টেবিলের উপর শপিংয়ের একগাদা জিনিসপত্র-ঠাসা পলি ব্যাগ ছড়িয়ে সোফায় গা ছেড়ে দিয়ে বসে থাকল-চোখমুখে ক্লান্তির ছায়া কাঁপছে। মিনিট কয়েক পর উঠে দুয়েকটা শো-পিস নাড়াচাড়া করল-ওড়নার আঁচল দিয়ে মুছলো।নান্টু ট্র্যাভেল ব্যাগ হাতে বাইরে থেকে ঘরে ঢোকে চারদিকে দৃষ্টি বুলিয়ে থমকে দাঁড়াল- নিনি না থাকলে তার মনে হতেই পারত, ভুল বাড়িতে-ভুল ঘরে ঢুকে পড়েছে!
নিনি অলস ভঙ্গিতে বলল, মেজোভাই তোমার না পরশু আসার কথা ছিল?
চমকেওঠা নান্টু নির্লিপ্ত, কাজ শেষ হয়নি-নান্টু ফের ড্রয়িংরুমের চারদিকে চোখ বুলিয়ে জিজ্ঞেস করল, কিরে ঘরে এত সব?নিনির চোখমুখে আনন্দ উপচে উঠল, দেখতেই পাচ্ছ-জান মেজোভাই আমি যে সোফাটা পছন্দ করেছিলাম-ওটা আরও সুন্দর ছিল। ভাবী ইতালিয়ান এই সেটটাই নিলেন। ভ্যান গগের ছবিটা অবশ্য আমার পছন্দেই কিনেছেন, ভাবীর তো আবার এসব ব্যাপারে কোন-বুঝতেই পারছ-নান্টু দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না-বসবার সাহসও পাচ্ছে না। অনেকটা নিজের মনেই বলল, এক সপ্তাহ বাইরে ছিলাম-এর মধ্যেই আজগুবি ঘটনা-নিনির কণ্ঠে আত্মগরিমা, এক সপ্তাহেই সব করেছি-তোমার ঘরটা শুধু বাকি-তোমার জন্য-নান্টু বিস্মিত, কিন্তু ব্যাপারটা কি?নিনি বলল, আহা বুঝতে পারছ না কেন-ভাইয়া আর ভাবী বাড়ির সব কিছুতে এলিগেন্সি আনছে-এত পুরনো বাড়ি বাইরে চট করে পাল্টান যাবে না,তাই ভেতরটা-ইনটেরিয়র ডিজাইনারের প্ল্যান-আমি আর ভাবী একটু এই উনিশ-বিশ করে নিয়েছি আর কী-নান্টু জানতে চাইল, পুরনো সেফাসেট কোথায়?নিনির নির্বিকার জবাব, ওটা তো ছাদের চিলেকোঠায়-নান্টু জিজ্ঞেস করল, চিলেকোঠায় কেন?
নিনি নিজেকে আলগোছে সরিয়ে নিতে চাইল, ভাবী-ভাইয়া-নান্টু কিছু বলার আগেই সাবেরা ঢোকে নান্টুকে জিজ্ঞেস করল, কখন এলে?নান্টু সাবেরার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে নিনিকে বলল, আমি জানতে চাইছি, আগের সোফাসেটটা চিলেকোঠায় কেন?সাবেরা ঢুকে পড়ল ওদের কথার মাঝখানে, অত দামি ইতালিয়ান সেটের পাশে ওটা কি মানায়, তুমিই বল?নান্টু বলল, তাহলে তো আমাকেও এ বাড়িতে আর মানায় না। ওই সোফাটা আমার চাকরির পর কয়েক মাসে টাকা জমিয়ে কিনেছিলাম। কারণ আব্বার আমলের সেটটা তখন জোড়াতালি দিয়ে চলছিল। ভাইয়া তো দশ বছরেও একটা সেট কিনতে পারেনি-সাবেরা ওকে থামাতে চাইল, আহা, নান্টু তুমি বুঝতে পারছ না-নান্টু সেন্টার টেবিল থেকে ব্যাগটা তুলে নিল, ঠিক- বুঝতে পারছি না- আমি তোমাদের বুঝতে পারছি না- তোমরা সাধারণের বোধের বাইরে চলে যাচ্ছ-কথা শেষ না করে নান্টু নিজের রুমে চলে গেল। নিনি-সাবেরা কেউ কারও দিকে তাকাতে পারছে না- অনেকক্ষণ অস্বস্তিকর নীরবতার মাঝখানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল তারা।নিনি এক সময় বলল, আমি আগেই তোমাকে বলেছিলাম ভাবী, মেজোভাইয়ের ওই সোফাসেট সরাবে না-সাবেরার কণ্ঠে উষ্ণতার আভাস, এটা ওর বাড়াবাড়ি। মানুষ উন্নতি চায় আর ও চায় দলামোচড়া হয়ে থাকতে-নিনি বলল, তুমি তো জান, মেজোভাই ওরকমই। বাদ দাও, এখন বল কেমন দেখলে গুলশান মার্কেট?নিনির প্রশ্নে সাবেরা স্বতঃস্ফূর্ততা ফিরে পায়, আমি তো অবাক, বাইরের সব সবকিছু পাওয়া যায় ওই মার্কেটে। নিনি, এখন থেকে আমরা আর অন্য কোনও মার্কেটে যাব না। অনেক দূর হয়ে যায়- এই যা অসুবিধা-নিজেদের একটা গাড়ি থাকলে-নিনি সোফায় বসে পড়ল, ঠিক বলেছ, ওই পেঁচামুখি ডোনার কেরদানি অসহ্য-বুঝলে গাড়িতে করে ক্লাসে আসে তো, ভাবখানা সে যেন ডোনা নয়, প্রিন্সেস ডায়না। ভাইয়াকে বল ছোটভাইকে বলুক, একটা গাড়ি আর কত লাগে। ছোটভাই আজ টেলিফোন করলে, আমাকে ডাকবে, আমিও বলব-সাবেরা বলল, আরে দূর-ঝন্টুকে আমি বললেই হবে-দেখ না, তোমার ভাইয়াকে টাকা পাঠাবার আগে ঝন্টু আমাকেই জিজ্ঞেস করে-
নিনি উৎসাহিত হয়ে ওঠে, রাইট-ছোটভাই তোমাকে সবচেয়ে বেশি ট্রাস্ট করে। এখন তো নিজেই রেস্টুরেন্ট দিয়েছে, খুব ভাল ইনকাম করছে- আমাদের গরিবি হালতটা তাড়াতাড়ি মিটিয়ে ফেলা দরকার-সাবেরার কণ্ঠে আস্থা আর স্বপ্নের মাখামাখি, আরে ভাবছ কেন, ইতোমধ্যে অনেক বদলে ফেলেছি না? আর কয়েকটা মাস অপেক্ষা কর, বাড়িটার ডিজাইনও বদলে ফেলব-চাই কী ডেভেলপারকে দিয়ে দেব-নিনি অবাক, ও মা এটা কি বললে, ডেভেলপারকে দেবে তাহলে ছোটভাই আমেরিকায় কেন বাড়ি করতে আর কত লাগবে! ওসব রাখ- এখন গাড়িটা আগে কেনার ব্যবস্থা কর তো ভাবী-সাবেরা ওকে থামিয়ে দেয়, আরে রাখ-কথাটা মাথায় ঢোকালে তো, কয়েকদিনের মধ্যে কাজটা করে ফেলব। তোমার মাথা তো আবার ভাল ভাল আইডিয়ায় ভর্তি- কখন কী করা দরকার, সাথে সাথে বলে ফেলবে-ম্যা-ফিনে কোণের টেবিলে বসে আছে নায়লা-তার ধীর-শান্ত ভঙ্গির অপেক্ষার ভেতর ঝিম মেরে আছে কোমল-মসৃণ-রঙিন-না যুতসই হচ্ছে না-শুধু শব্দ শুনছে সেই গোপন-মোহন ঝর্ণার গড়িয়ে চলার। এর নামও কী অপেক্ষা!-যা তার একদমই সয় না-বারবার ঘড়ি দেখে-আহ্-উহ্ শব্দে বিরক্তি হজম করে। আনমনা নায়লার ভেতর এই সব ¯্রােতের সুতা একে অন্যকে ছুঁয়েছেনে অলস ভঙ্গিতে প্রবহমান-এরই মাঝখানে তার পেছনে এসে দাঁড়ায় নাজমুল-আমাদের অল্প পরিচিত নান্টু। নায়লার চোখ দেয়ালের ছবিটায়-মাঁতিসের এই মিউজিক চিত্রকর্মের একটা ছোট প্রিন্ট আছে তার ঘরে বইয়ের তাকের ওপর। রঙের ঔজ্জ্বল্যে প্রাণবন্ত তার মনটা ফুরফুরে হয়ে ওঠে।
নান্টুর গলাখাঁকারিতে নায়লা চমকে পেছন ফিরল, কি ব্যাপার আসছি বলার পরও অত দেরি! এক নম্বর থেকে দু’নম্বর আসতে কত সময় লাগে?নান্টু বসতে বসতে বলল, অফিসে একটু দেরি হয়েছে-তারপর আবার হেঁটে এসেছি-নায়লা ঠোঁট উল্টাল, মানে-আমাকে এখানে বসিয়ে রেখে তুমি হেঁটে হেঁটে এসেছ, তুমি কী!নান্টু হাসল, আজ খুব মেজাজ খারাপ এক মানুষ। অফিস থেকে বেরিয়ে রিকশা নেব, এটা মনেই ছিল না।নায়লা ওর হাতে নাড়া দিল, অ্যাই মন খারাপ হয় কেন-মন খারাপের কি আছে? অফিসে কাজের চাপ না থাকলে প্রতিদিনই তো আমাদের দেখা হচ্ছে-নান্টু ওর হাতে আঙুল বুলাল, তোমার সঙ্গে দেখা হওয়া ছাড়াও তো জগৎ-সংসারে আরও বিষয়-আশয় আছে, না কী?
গম্ভীর নায়লা উঠে দাঁড়িয়ে চারপাশটা দেখে নিচ্ছে। অফিস ছুটির সময়টাতে যা হয়-তেমন ভিড় নেই। দরজার দিকটায় দু’চারজন কফির কাপে আঙুল বুলিয়ে সময় কাটাচ্ছে-নান্টু বলল, কি হল, উঠলে কেন? বস-নিশ্চুপ নায়লা টেবিলের উপর ব্যাগটায় হাত রাখল, কেন, তোমার তো জগৎ-সংসারে আরও অনেক বিষয়আশয় রয়েছে, আমি চলি-নান্টু টান দিয়ে ব্যাগ সরিয়ে বলল, আরে পাগলি, বস তো। আমার মন কেন খারাপ জান?বসতে বসতে নায়লা নান্টুর চোখে চোখ রাখল, না বললে জানব কি করে-নান্টু টেবিলে কাত হয়ে থাকা মেনুবুক তুলে নিল, রাখ, আগে অর্ডার দিয়ে নিই। কি খাবে সলিড না লাইট?দরজার দিকে দৃষ্টি মেলে দিয়ে নায়লা বলল, অর্ডার দিয়ে রেখেছি-আজ বিল আমি দেব-নান্টু হাসল, আজকের বিল তো আমার দেয়ার কথা-মেনুটা ওর হাত থেকে সরিয়ে নিয়ে নায়লা বলল, আমি দেব। একটা প্রোজেক্ট-প্রোফাইল করে দিয়েছিলাম, চেক দিয়ে গেছে-নান্টু হেসে উঠল, কত আর পেয়েছ-না হয় হাজার পাঁচেক-মন খুলে হাসল নায়লা, হল না-নান্টু বলল, দশ-
নায়লা বলল, এভাবে যদি বাড়াও তাহলে আরও চারবার তোমাকে বাড়াতে হবে, বুঝলে সাহেব-হেসে উঠল নান্টু, তার মানে পঞ্চাশ হাজার পেয়েছ-গুড, নিসারের শেষ দুই সেমিস্টারের টাকা তো এসে গেল।নায়লা বলল, আরও দশ যোগ করতে হবে-
নান্টু জিজ্ঞেস করল, আছে তো?আঙুলে নান্টুর হাতে টোকা মেরে নায়লা বলল, একটু বেশিই আছে। উত্তরখানে আমাদের যে প্লট-ওটার একটা ওয়াল বাকি ছিল, এবার করে ফেলব।নান্টু হাসল, হো- আমি তো এটাই বলেছিলাম। জগৎ-সংসারের এসব বিষয়-আশয় আমরা কি এড়িয়ে যেতে পারি? পারি না।সচকিত দৃষ্টিতে তাকায় নায়লা, তুমি কি আমার কথাটা ফিরিয়ে দিলে?নান্টু ওর হাতের উপর হাত রাখল, দূর পাগলি-এটা ফিরিয়ে দেয়া-নেয়ার কিছু নয়, এটাই স্বাভাবিক। এই যে দেখ, আমি সিলেট থেকে ফিরে এসে দেখলাম-ড্রয়িংরুমে সোফাসেটটা নেই-নিনি বলল ওটা চিলেকোঠায় রেখে দিয়েছে। চাকরির শুরুতেই সেলারি থেকে টাকা জমিয়ে কিনেছিলাম। বাড়িতে ঢোকে ওটার ওপর চোখ পড়লেই মনে হতো, আমি আছি-নায়লা জিজ্ঞেস করল, এখন ড্রয়িংরুম তো আর খালি নয়- নাকি?নান্টু বলল, আরে খালি থাকবে কেন-ইতালিয়ান দামি সোফাসেট-গগার চিত্রকর্ম-পোরসিলিনের দামি ফ্লাওয়ার ভ্যাস-আরও কত কিছু!
হাসল নায়লা, গুড, তোমাদের বাড়ির আপগ্রেডেশন হচ্ছে। মা সেদিন বলছিলেন, ঝন্টু নিজে রেস্টুরেন্ট দিয়েছে-সাবেরা বলেছে, হিউজ ইনকাম-ডলার আসছে। নান্টুদের তো এখন আর কোন সমস্যা নেই। তোরা তো এখন সিদ্ধান্ত নিতেই পারিস!নান্টু চোখে চোখ রাখল, তুমিও তাই মনে কর?নায়লা বলল, মানে?চোখ সরিয়ে নিল নান্টু, মানে, ঝন্টুর পাঠান ডলার আর আমাদের সিদ্ধান্তের মধ্যে সম্পর্ক-নির্লিপ্ত নায়লা, না-এখন পর্যন্ত তা মনে করছি না। তবে কোন দুর্বল মুহূর্তে মনে করব না-এটা কি অগ্রিম বলে দেয়া যায়!নান্টু উঠে দাঁড়ায়, চল উঠি, তোমাকে পৌঁছে দিয়ে তাড়াতাড়ি ফিরব বাসায়-নায়লা নান্টুর হাত ধরল, তুমি মাইন্ড করলে?নির্বিকার নান্টু, না, চল-নায়লা বলল, অর্ডার দেয়া আছে-ওদের বিলটা শোধ করে দিয়ে আসি-তুমি এগোও-রিকশায় উঠার পর নায়লা বুঝতে পারল, ঝন্টুর পাঠান ডলার-বাড়ির বিষয়-আশয় ঝড়ের বেগে বদলে ফেলায় ব্যয় হওয়ার প্রবণতা নান্টুকে বিব্রত করছে-কষ্ট দিচ্ছে। নান্টু অল্পে তুষ্ট মানুষ-বাসে তাড়াতাড়ি যাওয়া যায়-ভাড়াও কম। তারপরও সপ্তাহে একটা দিন ম্যা-ফিনে ব্ল্যাক কফি-ফিশ স্যান্ডউইচ খেয়ে ওরা রিকশা নেয়-আধঘণ্টা বা চল্লিশ মিনিটের এই সময়টা ওরা খুব উপভোগ করে-অনেক কথাই হয় রিকশায় যেতে যেতে। নায়লাকে খিলগাঁওয়ে বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে নান্টু গুলিস্থানের বাস ধরে।
ঝন্টু সপ্তাহে একদিন- আগে ছিল রোববার এখন বৃহস্পতিবার কথা বলে অনেকক্ষণ ধরে। সাধারণত ঢাকার সময় রাত ন’টার দিকে কথা বলে। অনেক সময় একাধিকবারও ফোন করে। প্রথম মা’র সঙ্গে পরে এক এক করে প্রায় সবার সঙ্গে এবং সবশেষে বড়ভাই পিন্টুর সঙ্গে। আজ কথা বলার লোক কম থাকায় পিন্টু খুশি-অনেকক্ষণ কথা বলতে পেরেছে। আজ পিন্টুর শেষ কথার বিষয় নতুন কেনা সোফাসেট।পিন্টুর কণ্ঠ সতেজ, হান্ড্রেড পার্সেন্ট ইতালিয়ান-অ্যামারাস থেকে কিনেছি-ওরাই ইমপোর্ট করে …. পাশের বাড়ির নাসির সাব আর তার মিসেস দেখে গেছেন-অতো দামি সেট তো আশপাশে কেউ কিনেনি কখনও-নাসির সাব বলছেন, মার্ভেলাস-ঝন্টুর টাকা একটা এলিগেন্ট ফার্নিচারে কাজে লেগেছে … আচ্ছা ঠিক আছে-আমি সব করছি-আর শোন একটা গাড়ি দেখছি, না তোর ভাবীর … নিনিরও অসুবিধা হচ্ছে … হ্যাঁ হ্যাঁ… তুই একদম চিন্তা করবি না … খোদা হাফেজ-ফোন ছাড়ার আগেই আমজাদ আর মিনি এসে ঢুকেছে। পিন্টুর মুখ খুশিতে উদ্ভাসিত। সারা সপ্তাহ ধরে মক্শ সে করে ঝন্টুকে কি কি বলবে-কিভাবে বললে ঝন্টু আর না-করতে পারবে না। সব কাগজে নোট করে ঝন্টুর ফোন আসার অপেক্ষায় থাকে। এক হাতে টেলিফোনের রিসিভার আরেক হাতে ওই নোট স্লিপ-পিন্টুর এই ছবি এখন সবার চোখে ভাসে।
পিন্টু ওদের চোখে চোখ রেখে বলল, দেশি কোন জিনিস আর বাসায় রাখা যাবে না-রাখব না। ঢাকায়ই যখন বিদেশি জিনিস সব পাওয়া যায়, অসুবিধা কোথায়-আমজাদ পিন্টুর কথায় একটুখানি ঘি ঢেলে দিল, ঠিক বলেছেন ভাইয়া, বিদেশি পাওয়া গেলে দেশি জিনিস কেনে কে- আর কিনবে তো ঝন্টুর টাকা দিয়ে- আমেরিকায় বাতাসে ডলার ভাসে-হাত বাড়িয়ে পকেটে ভরে নিলেই হয়। এ হলো মার্কিন ডলার, বিশ্বে সবচেয়ে তেজি টাকা-এ টাকা কাজে লাগাবার জন্য আপনার এই চিন্তা-ভাবনা একদম পারফেক্ট-পিন্টু হাসি আকর্ণ বিস্তৃত হলো, আরে বস-বস আমজাদ-মা জিজ্ঞেস করলেন, কিরে তোরা কেমন আছিস?মিনি এগিয়ে এল মা’র কাছে, ভালো মা-আমরা-আমজাদ বলল, ফুপুজান, এসে পড়লাম-এখন লোক দরকার, কখন কি লাগে বলা তো যায় না। এই তো সেদিন ভাইয়া ফার্নিচারের দোকানে যেতে বললেন, আমি গিয়ে দেখি ভাইয়া চলে এসেছেন। ভাইয়া ফোন করবেন, তারপর আসব-টাইম-টাইম ফ্যাক্টর- আমেরিকায় ওসব চলে না ফুপুজান-পিন্টু উৎফুল্ল মেজাজ নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর এ ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে।নান্টু তার ঘর থেকে বেরিয়ে নাশতার টেবিলে বসতে বসতে আমজাদকে বলল, এসে পড়লাম মানে?আমজাদ কাঁচুমাচু হয়ে উঠল, আরে বুঝলে না-
নান্টু নির্বিকার, না-বুঝলাম না।আমজাদ মিনিটখানেক চুপ করে থেকে বলল, বুঝলে না, ওই এক রুমের সাবলেট এখন আর মানায় না-ছেড়ে দিয়েছি।নান্টু জিজ্ঞেস করল, কেন মানায় না?আমজাদ শোকেসে ওপর সদ্যকেনা শোপিসে আঙুল বুলিয়ে বলল, আমেরিকায়- জান, ওখানে না-মা মুখ টিপে হেসে বেরিয়ে গেলেন-নান্টু বেসিনে হাত ধুতে ধুতে বলল, তুমি তো আমেরিকায় না, বাংলাদেশে-ঢাকায়, তোমার সাবলেটে কি হয়েছে?আমজাদ ঘুরে এসে সোফায় বসল, এই তো তুমি কথার আগা কাটছ আমাদের অফিসের আনিসের মত। ও বেটার সামনে কথাই বলা যায় না, কথায় কথায় প্যাচ ধরে-বেটা সবজান্তা। জান কাল বলে এসেছি, রাখ আমেরিকা থেকে একবার ঘুরে আসি, কসট্যাপ লাগিয়ে দেব মুখে-নিনি হেসে উঠল, দুলাভাই, বুঝলাম না- কসট্যাপ মানে কী?আমজাদ বলল, এই তো তুমিও নান্টুর মত, আরে কসট্যাপ মুখে লাগিয়ে দেব ও ব্যাটার।নান্টু মুচকি হাসল, দেখ আবার যেন আমেরিকার মুখে কসট্যাপ লাগাবার কাজটা করে ফেল না-কথা শেষ না করে অফিসের ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে গেল নান্টু-নিনি হেসে উঠল, আচ্ছা মিস্টার কসট্যাপ এখন যান, একটু ফ্রেশ হয়ে আসুন- বুয়াকে নাশতা দিতে বলছি।আমজাদ এদিক-ওদিক তাকাল, ভাবীকে দেখছি না-নিনি বলল, ভাবী শপিংয়ে।আমজাদ বলে উঠলো, শপিংয়ে-মানে- ঠিক বুঝলাম না-মিনি চাপাস্বওে, তোমার অত বুঝতে হবে না-এসব হল নতুন বিষয়, দুয়েকদিন না গেলে তুমি বুঝবে না-চল-আমজাদ মাথা ঝাঁকাল, বুঝেছি, ম্যারিকা-নিনি বুয়াকে বলল, উত্তরের কোণার রুমটা খুলে দাও-
বিকেল নিনি যখন বিশ্ববিদ্যালয় গেট দিয়ে বের হচ্ছে, তপু গেটের বাইরে থেকে এগিয়ে এল। নিনি দেখেও না দেখার ভান করে হাঁটতে থাকল। তপু মোটেই অবাক হল না-সেদিনের পর নিনির কোন কিছুতে আর অবাক হওয়ার কিছু আছে বলে মনে করে না সে।তবু ডাকল, এ্যাই নিনি, শোন-নিনি দাঁড়াল, কিন্তু তপুর দিকে তাকাল না। তার দৃষ্টি অন্যদিকে রেখেই প্রশ্ন করল, এখন এখানে? তোমার না কোথায় কাজ শুরু করার কথা-তপুর কণ্ঠ স্বাভাবিক, হয়নি-ওদের অত লেখাপড়া জানা লোক দরকার নেই-চল একটু হাঁটি।নিনি ওর দিকে না তাকিয়েই বলল, না, আমার সময় নেই।তপু নিনির দিকে আরেকটু এগিয়ে এল, তাহলে রিকশা নিই-নিনি এবার কণ্ঠ একটু নরম করল, আমার যে বাড়িতে একটু কাজ আছে। খুব জরুরি কোন বিষয় না হলে, আজ থাক। আরেকদিন-তপু হতাশা গোপন করতে পারল না, পুরো এক সপ্তাহ, তোমার সঙ্গে কোন কথা হয় না- ল্যান্ড ফোনে কথা বলতে চাও না, সেলফোনেও তোমাকেধরা যাচ্ছে না- কখনও পেলেও বল, ব্যস্ত আছি-পরে কথা হবে- নিনি তোমার কি কোন ঝামেলা হচ্ছে?নিনি সোজাসুজি বলল, তুমি অত ব্যস্ত হচ্ছ কেন? আমার একান্ত ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বলে কি কোন বিষয় থাকতে পারে না?তপু বলল, না, পারে না।নিনি জিজ্ঞেস করল, কেন পারে না?তপু বলল, কারণ- তুমিই বলেছিলে, আমাদের একান্ত বা ব্যক্তিগত বলে আর কিছু থাকল না-নিনি চুপ করে থাকল-
তপু হাসল, কি মনে করতে পারছ না? আরেকটু বলব- বলেছিলে, আর এভাবেই দু’টি আত্মা এক হয়ে যায়। আমি তো তোমার কথা বিশ্বাস করেছি। কারণ আমি মনে করি, তোমার কথাই সত্য।নিনি সামনের দিকে এক পা’ এগোল, তপু, থাম-থাম- আমাকে একটু সময় দাও, আমি পরে কথা বলব তোমার সঙ্গে-তপু নিনির মুখের দিকে শেষবারের মত তাকিয়ে ঘুরে হাঁটতে থাকল। দু’জন হাঁটছে সমান্তরাল দূরত্ব বজায় রেখে নিঃশব্দে। মোড়ে পৌঁছে নিনি একটা স্কুটারে উঠে পড়ল। নিনি স্কুটারের পেছনে ছোট্ট খিড়কি দিয়ে মাথা নিচু করে হাঁটতে থাকা তপুর তাকিয়ে নিঃশব্দে বলল, তপু তুমি যত রাগই কর, নিনি আর আগের নিনি নেই- তোমার রেঞ্জের বাইরে এখন নিনি।তপু মনের ভেতর চরম বিস্ময় নিয়ে স্বাভাবিক পা ফেলে হাঁটতে থাকল- হাঁটতে হাঁটতে মনে হল- এই পথ বুঝি আর ফুরাবে না।নিনির রুমে মিনি বিছানায় শুয়ে আর নিনি চেয়ারে বসে কাজু বাদাম চিবাচ্ছে। ভেতরে ভেতরে খুশি ধরে রাখতে পারছে না। এরকম সময় কাউকে খুশির খবরটা দিতে না পারলে তৃপ্তির পুরো আমেজ ভোগ করা যায় না-
বাদামের ডিব্বাটা ঠেলে দিয়ে বলল, আপু, কি যে মজা হবে না- দুয়েকদিনের মধ্যে গাড়ি আসছে-আচমকা উঠে পড়ে বলল, এ্যাই এক মিনিট এক মিনিট- আমি বড় ভাইয়াকে একটা কথা বলে আসি-মিনি বলল, অত তাড়াহুড়া কিসের-ভাইয়াকে কি বলবি?নিনি অস্থির, আরে আমাদের এখানে তো গাড়ি ঢুকবে না, নাসির সাবের গ্যারেজটা ঠিক করে রাখতে হবে। প্রিন্স অটোর মালিক ভূঁইয়া সাব বলেছেন, এই মাসের মধ্যেই গাড়ি ডেলিভারি দেবেন-নিনি হঠাৎ বলল, জানিস, গত মাসে ভাবীকে বলেছি, আপার তো বিয়ে হয়ে গেছে। আমিই এ বাড়ির একমাত্র রাজকন্যে। আমার একটা নিজস্ব ঘর, নিজস্ব কমপিউটার-টিভি-ডিভিডি আর নিজস্ব বুয়া থাকবে না কেন? ব্যস, ক’দিন পরই এই রুমটা রেনোভেট করে সব টিপটপ সাজান হয়ে গেল।মিনি এবার চারদিকে ভালো করে নজর বুলাল, খুব সুন্দর হয়েছে তোর রুম।নিনি আনমনা হয়ে উঠল, আমি তো আমেরিকা চলেই যাব, তখন আপু, তুই এলে এই রুম ব্যবহার করবি-মিনি কণ্ঠে বিস্ময় আর ক্ষোভ ঝরে পড়ল, তার মানে তুই-ই যাবি আমেরিকায়?
নিনির কণ্ঠে ঠাট্টার রেশ, কেন, তুইও যাবি নাকি!মিনি সতর্ক হয়ে ওঠে, তোর দুলাভাই কি বলল, শুনলি না। লোকজন তো এখন বলে, তোমার ভাই এখনও তোমাদের নিয়ে যায়নি? তুই অবাক হচ্ছিস কেন- ঝন্টু আমাকে নিয়ে গেলে তোর অসুবিধা কী?নিনি ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল, আমার অসুবিধা কী, তুই তো ইংরেজিতে লাড্ডাপাড্ডা-কলেজে ঢোকে আর এগোতেই পারলি না। এজন্য মা ভেবে-চিন্তে তার চাপাবাজ ভাইপো’র কাঁধে চাপিয়ে দিলেন।মিনি নিনির বাক্যবাণ উড়িয়ে দিল, ওসব কিছু না, তোর দুলাভাই বলে, আমেরিকার মাটিতে পা রাখার সাথে সাথে ইংরেজি ভর করে, তিন সপ্তাহ লাগে শিখতে-এবার নিনি জোরে হেসে উঠল, ঠিক আছে, তুই যেতে চাইলে ঝন্টুভাই কি আর তোকে নেবে না? অবশ্যই নেবে।মনে মনে বলল, আহ্ কি সখ- আমেরিকা যাবে! তোমার মত সেকেলে মেয়েমানুষের জন্য আমেরিকা নয়। স্বপ্ন যতই দেখ, ওটা হবে না আপু-
মিনি কৌতূহলী হয়ে ওঠে, আচ্ছা নিনি, তুই যে যাবি, তপুও কি যাচ্ছে আমেরিকা?একটু ভেবে নিয়ে নিনি ফুঁয়ে উড়িয়ে দিল, আরে দূর ও যাবে আমেরিকা, ও হল দেশের মাটি কামড়ে থাকা কচ্ছপ।মিনি জিজ্ঞেস করল, তপু কি করছে, চাকরি-টাকরি-নিনি নির্বিকার, জানি না, মাস্টার্স করেছে- এক বছর তো পার হয়ে গেল। ওটা হবে না আপু, দ্যাট চ্যাপ্টার ইজ ক্লোজড- ভাইয়াকে তো ঝন্টুভাই বলেছে, একটা ভালো এমবিএ করা ছেলে দেখতে-প্রথমে চমকে উঠলেও মিনি ঠিক বুঝতে পারল, নিনি আর এখন আগের সেই নিনি নেই- এদেশেও নেই।তারপরও বলল, এটা কি ঠিক হবে, এতদিনের একটা সম্পর্ক-ভেবে দেখ-
নিনি দৃঢ়, এখন ভাবাভাবি করতে গেল পিছিয়ে যেতে হবে-আমি পেছাব না, এগিয়ে যাব-মিনি বোঝাবার চেষ্টা করল, ছোটবেলা থেকে দেখেছি তো-ছেলেটা খুব ভালো। পয়সা কম- কিন্তু ফ্যামেলিও বেশ ভাল-বাবার সঙ্গে ওর বাবার পরিচয় ছিল- মা মেনে নেবেন না- নিনি খেঁকিয়ে উঠল, আরে রাখ তো আপু, এসব কথা। আর মা’র কথা বলছিস- কি বলবেন মা-যাদের কেউ বিদেশে নেই তারা উন্নয়নের মিছিলে নেই- তুমি এসব বুঝবে না- আমি ভাইয়াকে গ্যারেজের কথাটা বলে আসি-বিকেলে ড্রয়িংরুমে চায়ের আড্ডা জমে উঠেছে। আগে এ বাড়ির লোকেদের তারিয়ে তারিয়ে চায়ের স্বাদ উপভোগের সুযোগ ছিল না। পিন্টু এক কাপ চায়ে খড়খড়ে একটা টোস্ট ভিজিয়ে কোনমতে চা শেষ করে চাবির গোছা নিয়ে দৌড়াত দোকানে। এখন দামি টোস্টে বাটার লাগিয়ে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে টিভিতে সকালের অনুষ্ঠান দেখে। সাবেরা আগে রান্নাঘর থেকে বের হতে পারত না- এখন রান্নাঘরে ঢোকে বুয়াকে দুয়েকটা ধমক দেয়ার জন্য। এখন তার ঘুম ভাঙে আটটার পর। ছেলেমেয়ে দুটাকে স্কুলের গাড়িতে তুলে দেয় নিনি। তার নাশতা এখন ওটস-দুধ আর গ্রিন টি-ওজন কমানোর জোর চেষ্টা চলছে। মা খুব ভোরে নিজে বানিয়ে নিতেন আখের গুড়ের শরবত-এখনও তা-ই করেন। নান্টু একটা রুটি আলুভাজি মুখে পুরে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে যেত-তার চা খাওয়া হতো অফিসে গিয়ে- এখন চা-নাশতা দুটাই করতে হয় অফিসে। বাড়িতে আর রুটি আর আলুভাজি হয় না। পরোটা-সবজি-ডিম এবং একদিন পর পর হয় মুরগি, না হয় গরু-ভুনা। বিকালে চায়ের আড্ডায় থাকে পাপড়ভাজা-বাকরখানি-নুডুলস আর ছোটদের জন্য এ সবের সাথে দুধ।
নুডুলস-বাকরখানি খেয়ে নিয়ে পাপড়ভাজায় কামড় দিতে দিতে আমজাদ জমিয়ে চায়ের কাপে লম্বা চুমুক দিচ্ছিল। হঠাৎ কথাটা মনে হতেই কাপ নামিয়ে রেখে বলল, ভাইয়া, শুনলাম কনফেশনারিটা ছেড়ে দিয়েছেন?পিন্টু সোফায় পিঠ ছড়িয়ে দিল, অনেকদিন তো করেছি, আর ভাল্লাগে না। ফ্যামেলিটাকে খাড়া রাখার জন্য এই দোকান নিয়ে কত কষ্ট করেছি। দোকানদারি ব্যবসার মত খারাপ ব্যবসা আর একটাও নেই। ঝন্টু কি বলে জান- বলে, ভাইয়া জীবনে অনেক করেছ, তুমি আর কোনো কষ্ট করবে না-মাঝখানে সাবেরা বলে উঠল, তোমাকে তো আগেই বলেছি- আরে ব্যবসাই যদি করবে তো রাজনীতি কর, শুনলে কই!আমজাদ বলল, ভাইয়া, ঝন্টুর মত ভাই ভাগ্যের ব্যাপার। আপনার কি মনে হয় না, ঝন্টুর যেভাবে উন্নতি হচ্ছে, ও চাইলে ঢাকা শহরের একটা বড় জায়গা কিনে ফেলতে পারবে?পিন্টু হেসে ফেলল, তোমারও দেখছি মগজ খুলতে শুরু করেছে- ঝন্টুকে বলেছি, হাউজিংয়ের ব্যবসার কথা চিন্তা করতে। ঝন্টু কি বলেছে জানো- বিশ্বের যত বড় বড় ধনী, তাদের প্রধান ব্যবসাই এই হাউজিং-এটা কোন হেলফেলা ব্যবসা নয় আমজাদ-আমজাদ বলল, ভাইয়া, ডলার হলো ওয়ার্ল্ডে সবচেয়ে তেজি টাকা, এ দিয়ে কি না হয়!নান্টু অফিস থেকে ফিরে ঘরে ঢোকে আমজাদের কথাটা শুনতে পেল। বেশি কথা বলা আর অপ্রাসঙ্গিক কথা নিয়ে মাতামাতির জন্য আমজাদকে তার অসহ্য মনে হয়। মিনিকে নিয়ে এবার আমজাদের এ বাড়িতে ওঠা এবং তার বডি ল্যাংগুয়েজ নান্টুর ভালো লাগছে না। তার মগজে একটা কিছু মতলব শান দিয়ে এসেছে নিশ্চয়ই।সে বলল, কথাটা ঠিক নয় আমজাদ, তুমি যখন শুনেছিলে, তখন ঠিক থাকলেও এখন আর নেই। এখন তেজি মুদ্রা হল ইওয়ান-মার্ক-ইউরো এগুলো।আমজাদ ঠোঁট উল্টাল, কি জানি ভাই, আমরা তো পাচ্ছি ডলার-
নান্টু শান্ত স্বরে বলল, এই ডলার একটা সুযোগ। সুযোগের সদ্ব্যবহার না করলে পরে পস্তাতে হয়। কথিত উন্নতির নামে এই ডলারের যাচ্ছেতাই ব্যবহার হচ্ছে কি হচ্ছে না, এটা দেখার দায়িত্বও কাউকে নিতে হবে। ঝন্টুর পাঠান হার্ডআর্ন মানির যথাযথ ব্যবহার হলে, এর সুফল সবাই পাবে- এটা তো তোমার ভুলে যাওয়ার কথা নয় ভাইয়া।পিন্টু বিরক্তি গোপন করতে পারল না, তুই কি বলতে চাস বুঝলাম না। ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে বলছিস কেন, যা বলার সোজাসুজি বল।নান্টু বলল, তুমি তো এখন দৌড়ের মধ্যে আছ, একটু থেমে ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখ- যা বলেছি, সেটা তোমার না বোঝার মতো কোন বিষয় নয়।নান্টু বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার পর আমজাদ চাপা গলায় বলল, ভাইয়া, ঝন্টু টাকা আপনার কাছে পাঠায়-ওর কাছে পাঠায় না, এ জন্য কি নান্টু ক্ষুব্ধ! হতে পারে- পিন্টুর কণ্ঠে ঝাঁজ, ঝন্টুর টাকার দরদ ঝন্টু বুঝে না, বুঝে অন্যে- ও বরাবর ফ্যামেলিটাকে পেছনে টেনেরাখতে চায়- একটা অড, একটা স্টুপিড-ঘরে ঢুকতে ঢুকতে মা বললেন, কাকে স্টুপিড বলছিস, পিন্টু?কেউ কথা বলল না-মা আবার জিজ্ঞেস করলেন, কিরে আমি একটা প্রশ্ন করেছি, তোরা কথা বলছিস না কেন?পিন্টু এড়াতে চাইল, ও তোমার শোনার দরকার নেই। তুমি ঘরে যাও-মা ক্ষুব্ধ-ব্যথিত, আমাকে সবাই ঘরে পাঠাতে চাস-কিছু বুঝছি না। আমি আবারও পিন্টু তোকে বলছি, গরম দুধ গলায় ঢেলে দিয়ে খাবি না-গলা-পাকস্থলী পুড়ে যাবে-মা’র কথাও এখন আর পিন্টুর ভালো লাগে না- সইতে পারে না। ঝন্টু তাদের হাতে মুঠোয় যে সুযোগ এনে দিয়েছে, মা আর নান্টু তা বুঝতেই পারছে না।কথা বলতে বলতে ওরা কফিশপ ম্যা-ফিনে ঢোকে কোণের ওই টেবিলে বসল। ফুটপাথ ঘেঁষে-থাকা গাছগুলোর ওপর শেষ বিকেলের সোনালি আলোর মিষ্টি ছায়া পড়েছে। পাশের জানালা-পথে তাকিয়ে আছে নান্টু।হাতে নাড়া দিল নায়লা, এ্যাই, তোমরা নাকি গাড়ি কিনছ?নান্টু জানতে চাইল, তোমাকে কে বলল?নায়লা বলল, নিনি আর সাবেরা আপার সঙ্গে কাকরাইলে দেখা হয়েছিল ক’দিন আগে, গাড়ির শোরুম থেকে বের হচ্ছিল তারা- সাবেরা আপা জানালেন।নান্টু দৃষ্টি না ফিরিয়েই বলল, খালি কী গাড়ি! গত ছ’মাসে কখন যে কি করছে- বাড়িটা একদম পাল্টে ফেলছে-
হাসল নায়লা, একবার যাওয়ার ইচ্ছে করছে-নান্টু বলল, বাড়িটা কেমন করে আকাশযাত্রা করছে, তা দেখতে?নায়লা বলল, রাইট, ঊর্ধ্বগমনের দৃশ্য তো কাছে থেকে দেখিনি কখনও-হাসল নান্টু, ভালো লাগবে না- মার্কিন ডলারের উত্তাপ তো, সইতে পারবে না-নায়লা বলল, আমার এক কলিগ- ওই যে লেডি হ্যামিলটনে দেখা হয়েছিল- নিশি আপা, তার এক ভাই থাকেন কানাডায়-গাজীপুরে একটা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি করছেন-নান্টু বলল, আরে কত কিছু করার আছে- ইচ্ছে তো থাকতে হবে- গত ছ’মাসে অন্তত দশবার এই নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়েছে, আর কিছু বলব না। কাল সন্ধ্যায়ও বলেছি, তুমি তো এখন দৌড়ের মধ্যে আছ, একটু থেমে ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে দেখ- যা বলেছি, সেটা তোমার না বোঝার মত কোন বিষয় নয়-নায়লা বলল, তুমি ওভাবে কথা বললে কেন? এক প্রকার অপমানজনক কথা বলেছ তুমি- কি ভাববে ভাইয়া-
নান্টু হাসল, আরে তুমি অস্থির হচ্ছ কেন, ভাইয়ার এখন মান-অপমান বোঝার সময় নেই- মানুষ যখন সিঁড়ি ভাঙে তখন নিচে তাকায় না-তাকালে আর সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে পারে না। ভাইয়া এখন শুধু উপরে উঠছে-ভাইয়া বলছি কেন, ভাবী-নিনি সবাই এখন ঊর্ধ্বগামী। মা ছাড়া-মা’ই এখনও আগের জায়গায় আছেন- তাঁর কথা ওরা শুনছে না-মা এখন নীরব দর্শক- কিছুই করার নেই তাঁর।নায়লা বলল, তবু বড় ভাই- এর দায় তো তোমাকেও বহন করতে হবে-নান্টু হাত নাড়াল, হবে না। কারণ ঝন্টুর মার্কিন ডলারের সঙ্গে আমার কোন সংশ্রব নেই- ভবিষ্যতেও থাকবে না। চল হাঁটি-হাত ধরে থামাল নায়লা, আরে কফি শেষ করিনি তো-গত ক’মাস ধরে দেখছি তোমার এই অস্থিরতা। কেন, জান? মুখে যাই বল তুমি আসলে ভেতরে ভেতরে খুব বেশি কনসার্ন-একটু জোরেই বলে উঠল নান্টু, নো-নো নট অ্যাটঅল-অবাক দৃষ্টিতে নান্টুকে দেখে নায়লা উঠতে উঠতে বলল, কনভিন্সিং কথা বলবে- দেখবে ভাইয়া-ভাবীর বোধ-শোধ জাগ্রত হবেই-নান্টু নীরবে হাঁটছে-নায়লা বলল, অ্যাই, মনে আছে তো আগামী পরশু-মনে করতে পারছে না নান্টু, আগামী পরশু কি?
হাসল নায়লা, জানতাম, ভুলে যাবে। আরে পূর্ণিমা-নিশি আপুদের ছাদে রাতভর গজল আর পুরনো দিনের গান। মাঝখানে খিচুড়ি-ইলিশ। জান চাঁদ আর পূর্ণিমা নিয়ে গত মাসে একত্রিশটা গান শুনিয়েছিলেন মাহিন আজাদ। আমি কখনও ভাবিইনি, অতোগুলো গান আছে চাঁদ আর পূর্ণিমা নিয়ে-নান্টু আগ্রহী হয়ে উঠল, খুব মজা তো-নায়লা ওর হাতে চাপ দিল, এই মজাটা দু’জনে এনজয় করব এই পূর্ণিমায়-নায়লার হাতে ফিরতি চাপ দিল নান্টু, ঠিক আছে, দেখা যাবে।নান্টু যতক্ষণ বাসায় থাকে চা-কফির জন্য আগের মত আর নিনিকে বলে না- নিজে বানিয়ে নেয়। এক মগ কফি বানিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকতে গিয়ে থমকে দাঁড়ায়- পিন্টুর রুম থেকে সাবেরা আর পিন্টুর তর্কাতর্কির জোর আওয়াজ আসছে। সে ড্রয়িংরুমে এসে বসল। পরক্ষণেই এল নিনি- নান্টু জিজ্ঞেস করল, কিরে, ভাইয়া আর ভাবী কী করছে?
নিনি টিভির রিমোট তুলে নিতে নিতে বলল, জান না কি করছে-ঝগড়ার মাত্রাটা উচ্চগ্রামে পৌঁছল- ঠিক তখনই মা ঢোকে জিজ্ঞেস করলেন, কি রে নিনি, পিন্টু আর বউমা’র অত ঝগড়াঝাঁটি কিসের?নিনি ঠোঁট উল্টাল, তা আমি কি করে বলব।মা বললেন, কতক্ষণ আগেই তো দেখলাম, ওরা কি সব কিনে-টিনে ফিরল, বেশ হাসিখুশি-নান্টু, এটা তোমার ছোট ছেলে ঝন্টুর ম্যাজিক-গোটা পরিবারকে ও একটা ম্যাজিকের মধ্যে ছুঁড়ে দিয়েছে।ক্ষোভ ও বেদনায় একাকার মা’র কণ্ঠ, আমার তো ভাল লাগছে নারে নান্টু-তুই কিছু একটা কর-হাসল নান্টু, আমাকে বলছ- তুমি কিছু কর না কেন?মা বললেন, কাল পিন্টু কি বলেছে, জানিস?নান্টু মা’র দিকে তাকাল, কী বলেছে?মা কোন জবাব দেবার আগেই নিনি সোফার ওপর থেকে সেলফোনটা তুলে নিয়ে চট করে বেরিয়ে গেল। নান্টু বুঝতে পারল, মা এখন যা বলবেন, নিনি তা শুনতে চায় না-মা বললেন, আমার ঘরের খাট-আলমারি-চেয়ার-টেবিল ওগুলো সব সরিয়ে ফেলতে চায়। আমি বললাম, তোদের ঘরেরগুলো বদলেছিস-ভাল। কিন্তু এগুলোতে তোর বাবার ছোঁয়া আছে- আমি চোখ বন্ধ করলে ঠিক টের পাই-মা’র গলা বুজে এলো। নান্টু ঠিক বুঝতে পারছে, কি হতে যাচ্ছে। তারপরও মা’কে এখনই এতটা বলতে চায় না- প্রেসারের রোগী-কতক্ষণ চুপ করে থাকল। মা তাকিয়ে আছেন ওর দিকে।নান্টু কফির মগটা ডাইনিং টেবিলে রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করল, ভাইয়া তখন কী বলল?
মা বললেন, কি আর বলবে- বলল তোমার ওসব বস্তাপচা কথা রাখো মা-এ বাড়িতে ওসব থার্ডক্লাস ফার্নিচার থাকবে না-নান্টু মেজাজ বিগড়ে গেল, তাই বলেছে! শুধু তোমাকে নয়, বাবার স্মৃতিকেও অবজ্ঞা করেছে- না মা ভাইয়ার বাড়াবাড়ি মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে-পিন্টুর কিশোরী মেয়ে লালি এসে দাদির পাশে বসল, চাচু, দিদা না আজ সারাদিন কেঁদেছে-দুপুরে খায়ওনি-
নান্টু জোরে ডাক দিল, ভাইয়া এদিকে আস-অল্পক্ষণের মধ্যে পিন্টু বেরিয়ে এল-তার পেছনে পেছনে এল সাবেরা-পিন্টু এসে দাঁড়াল, কী হয়েছে, ডাকছিস কেন?ধীর কণ্ঠে নান্টু বলল, তুমি মা’র ঘরের ফার্নিচার সরাতে চেয়েছ?পিন্টু বলল, নতুন ফার্নিচার দিতে চেয়েছি।নান্টু জিজ্ঞেস করল, মা কি তোমার কাছে চেয়েছেন নতুন ফার্নিচার?পিন্টু বলল, বাড়ির সব ফার্নিচার বদলাচ্ছি, মারটাও বদলাব-দৃঢ় কণ্ঠ নান্টুর, না মা’র ঘরের ফার্নিচারে তুমি হাত দেবে না-আমার ঘরেও না।সাবেরা বলে উঠল, তোমার ঘরে কে যাবে-নান্টু জিজ্ঞেস করল, ড্রয়িং রুমের সোফা সরিয়েছ- আমাকে বলনি কেন?রাগে কাঁপতে লাগল পিন্টু, তোকে জিজ্ঞেস করতে হবে কেন?
নান্টু শান্ত কন্ঠে বলল, জিজ্ঞেস করতে হবে- কারণ ওই সোফা আমার টাকায় কেনা- ঝন্টুর টাকা যেভাবে খুশি উড়াও, আমি কিছু বলব না- ওটা ঝন্টুর ব্যাপার। তবে এই বাড়ির সব কিছু তোমাদের ইচ্ছেমত চলতে পারে না- চলবেও না।পিন্টু আরও ক্ষেপে উঠল, বেয়াদব, তুই আমাকে এই ভাষায় বলতে পারলি?নান্টু বলল, আমি বলিনি, কথাটা তুমি শুনেছ। কারণ তুমি মা’র ঘর থেকে বাবার স্মৃতি মুছে ফেলতে চেয়েছ। তুমি বাবার স্মৃতি এ বাড়ি থেকে মুছে ফেলবে আর কেউ তোমাকে কিছু বলবেনা- নিজের সম্পর্কে একটু বেশি ভেবে ফেলেছ তুমি-নান্টুর সেলফোন বেজে উঠল। নান্টু ফোন ধরে বলল, হ্যালো-রাখ-আমি ঘরে গিয়ে কল দিচ্ছি-নান্টু বেরিয়ে যাবার পর পিন্টু-সাবেরা বেরিয়ে গেল। ওদের রুমে ঢোকে দরজা বন্ধ করে দিল। মা লালিকে বুকে জড়িয়ে আবার চোখ ভাসালেন কান্নায়।নান্টু বেডরুমে ঢোকে সিডি প্লেয়ারের সুইচ অন করল। লো ভলিউমে গোলাম আলির গজল বাজতে লাগল। মিনিট পাঁচেক চুপ করে বসে থাকল। এর মধ্যে লালি এক কাপ কফি চাচুর হাতে দিয়ে দরজা বন্ধ করে গেল।
নান্টু কাপে চুমুক দিয়ে নায়লাকে কলব্যাক করল-হ্যালো-বল-নায়লা হাসল, বাহ্ গোলাম আলি বাজাচ্ছ?কফিতে আরেকটা চুমুক দিয়ে নান্টু বলল, হুম-নায়লা বলল, অ্যাই কি খাচ্ছ?নান্টু হাসল, সন্দেশ-মরণচাঁদের-ক্ষেপে উঠল নায়লা, অ্যাই মিথ্যুক, সন্দেশ কি চুমুক দিয়ে খায়?নান্টু বলল, কি করে বুঝলে?নায়লা হাসল, মেয়েরা পারে। অ্যাই দুষ্টু, তুমি যে অত ভাল গাইতে পার কোনদিন তো বলনি-নান্টুও হাসল, তুমি জিজ্ঞেস করনি তো-নায়লা গাল ফুলাল, সব কিছু কি জিজ্ঞেস করতে হয়!নান্টু বলল, সব কিছু কি বলতে হয়!দু’জনে একসঙ্গে হেসে উঠল- তারপর অনেকক্ষণ চুপচাপ- শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ সেলাই করল সময়কে-বেশ কিছু সময় পর নায়লা বলল, অ্যাই কি হয়েছে-কথা বলছ না কেন?নান্টু বলল, মেজাজ খারাপ-ভাইয়ার সঙ্গে এইমাত্র বেশ কথা কাটাকাটি হয়ে গেলো-নায়লা বলল, তুমি এসব আর করবে না-নান্টু দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, পারা যাচ্ছে না নায়লা-পরিবেশ বিনষ্ট হয়ে পড়ছে-নায়লা বলল, শোন কাল ভোরে আমি রাজশাহী যাচ্ছি-ওটা আসলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে- মনাকশায় আমাদের একটা প্রোজেক্ট আছে তো ওটার ব্যাপারে। বলতে পার গোটা অফিসটাই যাচ্ছে- চেয়ারম্যান-ইডি-পিডি-আরডি। উনারা চলে আসবেন, আমরা থাকব একটা টিম-সেভেন ডে’জ ওভজারবেশন প্রোগ্রাম-ঘাবড়ে গেল নান্টু, আরে বাবা-সাত-দিন!নায়লা বলল, না- আট দিন। কি ভাবছ- অনেকদিন-মোটেই না। দেখতে দেখতে চলে যাবে।
নান্টু বলল, গেলে ভাল-নায়লা বলল, অ্যাইল্যান্ড ফোনে একটা কল এসেছে-বোধহয় মুশফিক স্যার- শোন আমি ফিরে আসা পর্যন্ত চুপচাপ থাকবে- ফোন দেবে রাত ন’টার পর-রাখি ভালো থাক।নান্টু সকালে তাড়াহুড়া করে ঘর থেকে বের হল-ড্রয়িংরুমে ঢুকতে গিয়ে খাবার টেবিলে নাশতার উপর চোখ পড়ল-পাউরুটি-মাখন-বাটি-ভর্তি ওটস-মগভর্তি দুধ আর পাশে গ্রিন টি’র প্যাকেট-কেটলিতে পানির ফুটছে। আমজাদ সোফায় গা এলিয়ে নিশ্চিন্ত মনে আয়েস করে বিদেশি ফিল্ম ম্যাগাজিনের পাতা উল্টাচ্ছে- মিনি ওর মাথার চুল বেছে দিচ্ছে।নান্টুকে দেখে আমজাদ জিজ্ঞেস করল, কি অফিসে যাচ্ছ- যাও আমি যাব না অফিসে-নান্টু কিছু না বললেও মিনি জিজ্ঞেস করল, অফিসে যাবে না, মানে- চাকরি করবে না?আমজাদ বলল, করব না-মিনি অবাক, কী বলছ!আমজাদ চোখ বন্ধ করল, যার ব্রাদার-ইন-ল আমেরিকায় আস্ত একটা রেস্টুরেন্টের মালিক- সে করবে এজি অফিসের কেরানিগিরি-রামছাগল না হলে কেউ করে!
মিনি উঠে দাঁড়াল, আরে রাখ-রাখ-কি বলছ তুমি-নান্টু প্রায় দরজার কাছে পৌঁছে যাওয়ার পর লালি ভেতর থেকে ট্রে হাতে এসে তার পথ আগলে দাঁড়াল, চাচু, তোমার চা- আমি বানিয়েছি-তোমার মা’র মত তো হবে না- তবু চুমুক দিয়ে দেখ-যত্নে বানান এক কাপ ধোঁয়াওঠা লিকার চা আর দু’টা বিস্কুট- নান্টুর চোখে পানি এসে গেল। সে কাপটা তুলে নিয়ে লালির মাথায় হাত বুলিয়ে আদর বুলাল, আরে তুমি হলে আমার ছোটমা-
লালি বলল, আরে চাচু একটা বিস্কিট নাও-দাদুর বিস্কিট-সুগারফ্রি-জান তো খালি পেটে গরম চা খেতে হয় না-নিনি ড্রয়িংরুমে ঢুকতে গিয়ে আমজাদের কথাটা শুনেছে। নান্টুর জন্য লালির চা বানিয়ে আনার দৃশ্যটি কি তাকে কিছুটা আনমনা করে দিতে চাইছে! নিনির এখন এসবে মন দেয়ার সময় নেই-সে এগিয়ে গেল সোফার সামনে, গ্রেট আমজাদ খান, চাকরি করবেন না তো এখন কী করবেন?আমজাদ মিট মিট করে হাসল, জান, আমজাদ খান কি করে গেছে? শিশুদের জন্য একটা বিরাট অ্যাসাইলাম-আমি ওরকম একটা কিছু করব-নান্টু চায়ের কাপ লালির ট্রেতে রাখতে গিয়ে বলল, জান কত টাকা ইনভেস্ট করেছেন আমজাদ খান-
আমজাদ প্রশ্নটা ঝেড়ে ফেলল, আরে দূর রাখ, আমাদের ঝন্টুর কি টাকা কম আছে- এক বছরে দেখবে আরও একখানা রেস্টুরেন্ট চালু হয়ে যাবে? আমেরিকার মানুষ কি আমজাদ খানকে চেনে-চেনে না। কিন্তু রয়েল বেঙ্গল রেস্টুরেন্ট? ভাইয়া বলেছে, সারা আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়েছে ঝন্টুর রেস্টুরেন্টের এই নাম-নান্টু বলল, আমজাদ খান যা করেছে, তা নিজের উপার্জিত টাকায়-তোমার গায়ে ভাইয়ার বাতাস ভর করেছে-ওটা ঝেড়ে ফেলে অফিসে যাও। অলস মানুষ সরকারি চাকরি ছাড়লে আর কিছু করতে পারে না, এটা মনে রেখ-মিনি ঢুকে গেল, মেজো ভাই, তুমি কি ওকে অপমান করছ?নান্টু বলল, তাহলে তুই বুঝতে পেরেছিস-মিনি বলল, তুমি আমাকে ওর মত ভোম্বল ভাব নাকি–দ্যান ইট’স গুড বলে নান্টু বেরিয়ে গেল। লালি স্কুলে যাবার জন্য তৈরি হয়ে এসে দাঁড়াল।নিনি বলল, দুলাভাই, মেজোভাইর কথায় আপনি মাইন্ড করবেন না। আমি লালিকে গাড়িতে তুলে দিয়ে আসি- পরে কথা বলছি-আজ আমার ক্লাস নেই-
মা এসে আমজাদকে ওরকম বসে থাকতে দেখে ধমকে উঠলেন, কিরে আমজাদ তোর অফিস-টফিস নেই?আমজাদ কাচুমাচু করে বলল, ফুপুআম্মা ছুটি নিয়েছি-মা জিজ্ঞেস করলেন, নাশতা করেছিস?আমজাদ বলল, জি করেছি-মা বললেন, বড় ভাইজানের খোঁজ-খবর জানি না, কেমন আছেরে ?আমজাদ বলল, ভালই আছে, শুধু বাতের ব্যথাটা-মা ভেতরে চলে যাবার পর নিনি এসে আমজাদের সামনের সোফায় বসল-নিনি বলল, দুলাভাই, এই বাড়ির পুরোটাই আনন্দদায়ক। তবে মাঝে মধ্যে এই মেজোভাইর দুয়েকটা তির্যক ডায়লগ- আমাদের সয়ে গেছে, আনন্দের কোন ব্যাঘাত ঘটে না। বুঝতে পেরেছেন তো?আমজাদের ভেতর থেকে হাসি বেরিয়ে এলো, একদম আয়নার মত-হা হা হা-নিনি বলল, তবে আপনার কিন্তু অফিসে যাওয়া দরকার- মেজোভাই চাকরি সম্পর্কে যা বলেছে, তা কিন্তু মিথ্যা নয়।বিরক্ত হয়ে উঠল মিনি, তুইও এ কথা বলছিস? তুই চাস না আমরা এখানে থাকি- এটা কী আমি বুঝি না। আমার পড়ালেখা কম কিন্তু এটুকু বুঝি।নিনি বলল, আহা, তুমি দেখছি সেই ছোটবেলার মতই রয়ে গেছ- বোঝার চেষ্টা কর-দেখবে আমি খারাপ কিছুই বলিনি।আমজাদকে টেনে তুলে মিনি ওদের রুমে নিয়ে গেল।নায়লা চাঁপাইনবাবগঞ্জের কাজটা নিয়ে বেশ ঝামেলায় আছে। অফিসে এসেই কম্পিউটারে বসে গেছে- কিছু ইনফরমেশন সার্চ করতে হবে। অফিস সহকারীকে বলে দিয়েছে, বারোটার মধ্যে কেউ যেন রুমে না ঢোকে-
মিনিট বিশেকের মধ্যেই সে এসে বলল, ম্যাডাম, এক ভদ্রলোক ইডি সাবের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। ইডি সাবের রুমে বিদেশি মেহমান- উনি আপনার সঙ্গে কথা বলতে বলেছেন, নিয়ে আসব?বিরক্ত হলেও নায়লা বলল, যাও পাঠিয়ে দাও। অফিস সহকারী তপুকে নিয়ে এলো।তপু সালাম দিয়ে বলল, দেখুন এই চিঠিটা আমার হাতে পৌঁছেছে কাল বিকেলে-দেখা করতে বলা হয়েছিল কালকেই।নায়লা চিঠি দেখে বলল, কালকে ইডি সাব বলেছিলেন- আপনি না আসায় যিনি দুই নম্বরে আছেন- তার জন্য চিঠি ড্রাফট করা হয়েছে- ওয়েট দেখি-নায়লা ফোনের রিসিভার তুলে ইডি-কে কল করল, স্যার ওই যে নতুন প্রোজেক্টের জন্য যাকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেয়া হয়েছে- তার কালকে জয়েন করার কথা ছিল, বাট হি গেট দ্য লেটার ইয়েস্টারডে অ্যাট ইভনিং। আজ এসেছেন, কী করব স্যার…. ঠিক আছে স্যার।ফোন ছেড়ে দিয়ে নায়লা বলল, অলরাইট-আপনি জয়েন করবেন। তবে কালকের ডেটে- ওয়েলকাম ইউ অ্যাট সিএমসি টিম।তপু বলল, থ্যাঙ্কূ ম্যাডাম-
নায়লা হাসল, জুনিয়ররা আমাকে নীলাপা বলে-তপু শুধরে নিল, থ্যাঙ্ক ইউ নীলাপা-নায়লা হাসল, মোস্ট ওয়েলকাম। আপনি তিন মাস কাজ করবেন আমার সঙ্গে। কাজ মানে আমাকে হেল্প করা- আমি কি করি- তা ফলো করা- রপ্ত করা। অ্যাম আই ক্লিয়ার?তপু বলল, ইয়েস নীলাপা-নায়লা বলল, গুড-নায়লা উঠে কফি বানিয়ে একটা কাপ এগিয়ে দিয়ে বলল, ফলো করছ তো?হেসে উঠল তপু, জি নীলাপা’ আমি খুব ভাল বানাতে পারি কফি-ড্রয়িংরুমে মিনি টিভি দেখছে- নিনি এসে ঢুকল-নিনি জিজ্ঞেস করল, আপু ছোটভাই কি তোকে আলাদাভাবে পাঠায় টাকা?মিনি বলল, বড় ভাইয়ার কাছে আসে- কিন্তু কেন?নিনি বলল, এমনি জিজ্ঞেস করলাম।বাইরে থেকে এসে আমজাদ সোফায় বসে হাইফাই করছে। নিনি জিজ্ঞেস করল, আমজাদ ভাই কাজ হয়েছে?আমজাদ সোজা হয়ে বসল, হবে না মানে, ওরা বলল এটা টিকিট না, কার্ড- এলিট ক্লাসের জন্য। ওস্তাদ গোলাম আলির গজল সামনে বসে শোনার ভাগ্য তো সবার নেই। শুনে মেজাজ খিঁচড়ে গেল। আমি হলাম ঝন্টুর দুলাভাই, আমাকে এলিট দেখায়-নিনি বলল, আহা আগে বলুন- কার্ড পেয়েছেন তো?
আমজাদ হাসল, আরে আমি কি সহজ পাত্র! কাছে ডেকে দু’হাজারের জায়গায় তিন হাজার ধরিয়ে দিলাম, সুরসুর করে বেরিয়ে এল এলিট ক্লাসের কার্ড। জ্যামাইকায় রয়েল বেঙ্গল রেস্টুরেন্টের মালিক ঝন্টু খান- তার ইয়াংগেস্ট সিস্টার নিনি খান এলিটের বাপ-স্যরি বাপ না, কি বলে, মা-মিনি ক্ষেপে গেল, রাখ তোমার মা- নিনিই শুধু ঝন্টু খানের বোন, ওল্ডডেস্ট সিস্টার মিনি খান কিছুই নয়- আমার কার্ড কোথায়?সাবেরা এসে ঢুকে বলল, বাহ্ দুই বোন তো খুব বাহাদুরি ফলাচ্ছ-আমি কি ঝন্টুর জন্য কম করেছি?ঠিক তখনই নান্টু ঢোকায় ওরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে।
কার্ড বাগিয়ে আনার আনন্দ-উত্তেজনায় আমজাদের সেদিকে খেয়াল নেই-জামার বোতাম খুলে বুকের কাছ থেকে কার্ড বের করে বলল, ভাবী আমার হিসাবনিকাশ পাকা-এই নিন, কার্ড তিনখানই এনেছি। এই কার্ড যার হাতে থাকবে সেই এলিট, কি নিনি ঠিক বলিনি?নিনি ভাবছে- ওর সহপাঠিনী আনিকার পাশে সিটটা পড়লেই হয়-বুঝবে শুধু দামি গাড়িই এলিট শ্রেণীর প্রতীক নয়। তার বিগলিত কণ্ঠস্বর-একদম রাইট। তিন রমণীর চোখে-মুখে উপচে-পড়া আলোয় ঘরটা ঝলমল করে উঠল।ড্রয়িংরুমের মাঝ বরাবর পার হয়ে প্যাসেজে যেতে যেতে নান্টু আমজাদ আর নিনির কথা যতটুকু শুনল, তাতে তার ক্ষোভ-বিরক্তি চরমে উঠল। সে বুঝতে পারছে ভাইয়া-ভাবী-নিনির যুতসই বাহন হয়ে উঠেছে আমজাদ-তার ঘৃতাহুতিই ওদের দ্রুত কিছু একটা হয়ে ওঠার আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে ঠেলে দিচ্ছে। নিজের ঘরে আসার পর অনেকক্ষণ ভেবেও ঠিক বুঝতে পারল না তার এখন কী করা দরকার-
আমজাদ খুশিতে উদ্ভাসিত, ভাবী, যা যা বলেন- ঠিক ঠিক করে দেব। কিন্তু নান্টুকে সামলাতে পারব না।সাবেরা বলল, ওকে অত ভয় করবে কেন- কী করবে ও?আমজাদ বলল, দেখবেন কিছু করার হলে ওই করবে। ভেতরে ভেতরে ফুঁসছে-একটু তা পেলেই ফেটে পড়বে।সাবেরা চিন্তিত, আশ্চর্য নান্টু অত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে কেন?নিনি বলল, ওটা তুমি বুঝবে না, নায়লা না কি যেন নাম, ওই মেয়েটাই মেজোভাইর মাথাটা পলিউটেড করে দিয়েছে। শোন ভাবী-আমরা ঠিক পাঁচটায় রওনা দেব- আজ বৃহস্পতিবার তো রাস্তায় রাজ্যের জ্যাম।সাবেরা বলল, যাতায়াতের ঝুট-ঝামেলা আর থাকবে না- তোমার ভাইয়া ব্যাংকে কথা বলেছে-ঝন্টু যা পাঠাবে বাকিটা ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে গাড়ি কিনে ফেলবে- তখন আর প্রোবলেম থাকবে না-মা এসে জিজ্ঞেস করলেন, কিরে কোথায় যাবি তোরা?সাবেরা বলল, কন্টিনেন্টালে-নিনি বলল, ওস্তাদ গোলাম আলির গজল সন্ধ্যা-মা বললেন, না গেলে হয় না।সাবেরা বলল, না মা এখন আর হবে না-অনেকগুলো টাকা গচ্চা যাবে।মা বললেন, টাকা গচ্চা যাওয়া কাকে বলে আমরা আর বুঝি না মা।নিনি বলল, কেন মা?মা বললেন, না থাক-যা তোরা-মা নিজের ঘরে যেতে যেতে ভাবলেন, কী অবাক কা– বাবার মৃত্যুবার্ষিকী এখন আর ওদের কোন বিষয় নয়-সপ্তাহে একদিন ম্যা-ফিন কফিশপ আর রিকশায় খিলগাঁও পর্যন্ত সময়টুকু নান্টু আর নায়লার একান্ত। বাকি সময়টুকু তাদের অপেক্ষা-নায়লার মাঝেমাঝে মনে হয়- এর নামই বুঝি অনন্তকাল। গতকাল সন্ধ্যা সাতটা থেকে এগারোটা-অনেকদিন পর এই সময়টুকু তারা ছিল একসঙ্গে।
কোণের ওই টেবিলে বসেই নায়লা জিজ্ঞেস করল, কাল কেমন দেখলে আমাদের মাটির কাছাকাছি প্রোগ্রাম?নান্টু বলল, চমৎকার তোমার সাথে না গেলে একটা বড় অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত থাকতাম। তুমি গ্রামের মানুষজনদের সঙ্গে অমন সুন্দর মিশে যেতে পার যে মনেই হয় না-ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স-পড়া এক আধুনিকা।গম্ভীর হয়ে উঠল নায়লা, বেশি প্রশংসা করবে না। আমাদের শিকড় তো এখনও গ্রামেই। গ্রামের মানুষদের সঙ্গেই তো আমাদের আত্মার মিল। আজকে যারা দেশের সবকিছু চালাচ্ছেন-তাদের শতকরা নব্বই ভাগই তো নিম্নমধ্যবিত্ত আর গ্রাম থেকে আসা-নান্টু বলল, এই বাস্তবতা কি আমাদের কাজে প্রমাণিত হতে পারছে?নায়লা বলল, এটা আমাদের ব্যর্থতা।নান্টু বলল, অথচ এই ব্যর্থতাই সহজ সরল মানুষগুলোর দুর্ভোগের কারণ হচ্ছে।
কফির কাপে চুমুক দিয়ে আলোচনার মোড় পাল্টাল নায়লা, আমরা বড়বেশি গুরুগম্ভীর আলোচনায় প্রবেশ করছি। আজ সারাদিন জটিল থিয়োরি নিয়ে নাড়াচাড়া করেছি। ভাল কথা, নিনি কি করছে? ওকে একদিন দেখলাম আজিজ মার্কেটে-সঙ্গে একটা ছেলে-নান্টু বলল, হবে হয়তো তপু-এক সঙ্গে পড়ত। ছেলেটা ভালো-আমি চিনি। নিনির সমস্যাটা ওর না বোঝার কথা নয়। কিন্তু নিনিই বোধ হয় এখন ঊর্ধ্বাকাশে বিচরণ করছে। খুব স্যাড-নায়লা বলল, নিনির সাথে কি আমি কথা বলব?নান্টুর কণ্ঠে হতাশা, লাভ হবে বলে মনে হয় না- ওরা সব এখন ম্যারিকার স্বপ্নে ভাসছে-সম্পূর্ণ নিরাশ নয় নায়লা, নিনি ইন্টিলিজেন্ট মেয়ে, কিছুদিন গেলে কেটে যাবে।উঠে দাঁড়াল নান্টু, চল উঠি-
সবকিছুতে নান্টু স্থির-অচঞ্চল-যে কোন জটিল বিষয়ে ধীর-স্থির মতামত দেয়ার জন্য পরিচিত মহলে নান্টুর সুনাম রয়েছে। সেই মানুষটা আজকাল কেন অস্থিরতায় আক্রান্ত-প্রথমদিকে বুঝতে না পারলেও এখন নায়লা কারণটা ঠিক অনুভব করতে পারছে। হঠাৎ উঠে-পড়া বা চলে যেতে চাওয়ায় এখন সে কিছু মনে করে না-আজও করল না। শুধু জানতে চাইল, কোথায় যাবে?সেই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের মত জবাব নান্টুর, চল রিকশায় ঘুরি সন্ধ্যা পর্যন্ত।নায়লা আঁতকে উঠল, ওরে বাবা, রিকশায় সাংঘাতিক ভয় লাগে। প্রতি মুহূর্তে মনে হয়, এই বুঝি পড়ে গেলাম-
নান্টু হাসল, তুমি পড়ে গেলে আমি ধরব না- এটা মনে করছ-আস্থার এই অভাব তো থাকার কথা নয়-নায়লা বলল, তা যে নেই সেটা তোমারও ভালোই জানা আছে- তবে তোমার-আমার জানা নেই কতদিন সমান্তরাল রেল লাইনের মত বয়ে যাব আর আমাদের ওপর দিয়ে সময়ের ডাকগাড়ি-মালগাড়ি-লোকাল গাড়ি দুরন্ত গতিতে ছুটে যাবে!নান্টু ওর হাত ধরে জোরে চাপ দিল, আর মাত্র ছ’টা মাস-নায়লা বলল, মা কী বলেন জান, এখন তো আর তোদের কারও কোন ঝামেলা নেই। নান্টুর তো আর সংসারে কিছু দিতে হয় না, নিসারের এই দুই সেমিস্টারই শেষ- তোরও আর দিতে হবে না, দু’জনই জব করছিস-অসুবিধা কোথায়? মা’র এ কথার জবাব কোথায়!নান্টু বলল, জবাব ছ’মাস পর দেব। এখন চল লালির জন্মদিন- একটা গিফট কিনি।
নায়লা জিজ্ঞেস করল, লালি তো সেভেনে- এক কাজ কর অক্সফোর্ডের একটা মিনি এনসাইক্লোপেডিয়া আছে- চমৎকার গিফট প্যাকেটে। তোমার বাজেট?
নান্টু বলল, ধর- দুই থেকে আড়াই-নায়লা বলল, গুড-হবে চল-ফিশপ থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামতেই তপুর সঙ্গে দেখা-নান্টু গলা ছেড়ে ডেকে ওঠে, অ্যাই তপু কেমন আছ?তপু সালাম দিয়ে বলল, জি ভাল- আপনি ভাল?নান্টু বলল, ভাল, অনেকদিন বাসায় যাও না তুমি- ও পরিচয় করিয়ে দিই-নিনির বন্ধু তপু-আর এ হচ্ছে আমার বন্ধু নায়লা-আমরা ক্লাসমেট ছিলাম-তপু এতক্ষণ খেয়াল করেনি-এখন থতমত খেয়ে বলল, নীলাপা-নায়লা বলল, আরে তোমার ডাকনামটা তাহলে তপু-তপু বলল, জি-নীলাপা’নায়লা জিজ্ঞেস করল, এদিকে কোথায় এসেছিলে?তপু বলল, এক বন্ধুর কাছে-নান্টু জিজ্ঞেস করল, তপুকে চেন তুমি?নায়লা হাসল, বাহ এক অফিসে কাজ করি-তপু বলল, আমি নীলাপা’র সহকারী হিসেবে জয়েন করেছি এ মাসেই-নান্টু বলল, খুব ভাল-তোমার নীলাপা’র কাছে শিখতে পারবে অনেক কিছু- আচ্ছা তপু তুমি দুয়েকদিনের মধ্যে একটু আসবে- কেমন।তপু বলল, আপনার অফিসে যাব মেজোভাই-নান্টু বলল, হ্যাঁ অফিসেই আসবে-আমরা লালির জন্য একটা গিফট কিনব তো-তপু নায়লাকে বলল, আমি যাই নীলাপা’-আমার বন্ধু দাঁড়িয়ে আছে-নায়লা হাসল, ও-কে যাও-জান নান্টু, খুবই ভালো ছেলে-নান্টুও হাসল, আমি তো অনেক আগে থেকে জানি-পুরো ফ্যামিলি ভালো- যেমনটা কমই দেখা যায়-
নায়লা বলল, তোমাদের-আমাদের অনেকের ফ্যামিলিই এরকম-নান্টু বলল, তোমাদের দুটা ঠিক আছে-আমাদেরটা ছিল-এখন নেই।ড্রয়িংরুম ফুলে-ফুলে বেলুনে-ঝালরে সাজান। লাল-সবুজ-নীল-হলুদ আলো গায়ে মেখে সাবেরা অস্থির হয়ে পায়চারি করছে, বারবার ঘড়ি দেখছে। নান্টু এসে ঢুকল-তার হাতে একটা গিফট প্যাকেট-সাবেরার উত্তেজিত পায়চারি দেখে নান্টু জিজ্ঞেস করল, কি ব্যাপার ভাবী, অত অস্থির পায়চারি-এনিথিং রং?সাবেরা ক্ষুব্ধ, ড্রাইভারের কান্ডটা দেখ- কন্টিনেন্টাল থেকে কেক আনতে যাব- ওকে বলেওছি, তাও গাড়িটা নিয়ে আসছে না। পেট্রোল ভরতে কোথায় গেছে কে জানে-নান্টু আস্তে করে বলল, মনে হচ্ছে- তোমাদের আর একটা গাড়ি দরকার-সাবেরা বলল, তুমি যেভাবেই বলে থাক- কথাটা কিন্তু সত্য- একটা গাড়িতে আর চলছে না।কথার মাঝখানে নিনি ঘরে ঢোকে বলল, কী ভাবী, গাড়ি নিয়ে আসেনি? দেরি করে লাভ নেই, চল আমি তোমাকে সঙ্গ দিই- ক্যাবে চলে যাই।সাবেরা বলল, আহা- তুমি বুঝতে পারছ না, কন্টিনেন্টালে ক্যাবে গেলে প্রেস্টিজ পাওয়া যায় না।
ঠিক তখনই বাইরে গাড়ির শব্দ-ড্রাইভার ভেঁপু বাজাচ্ছে-নিনি বলল, এক কাজ করি ড্রাইভারকে পাঠিয়ে দিই- ওই নিয়ে আসুক। সবাই তো আসতে শুরু করবে- তোমার থাকা দরকার।সাবেরা বলল, ঠিকই বলেছ- যাই ড্রাইভারকে রিসিটটা দিয়ে বলে দিই-নান্টু হেসে উঠল, এলাকার সবাইকে দাওয়াত দিয়েছিস তো- নিনি ভালই করেছিস তোরা- ওদিকে ভাইয়া টাকা বিলিয়ে যাচ্ছে-কোন কথা না বলে নিনি ঘরের কোণের দিকে নিচে ঝুলে যাওয়া বেলুনটা উপরে তুলে দিতে লাগল। নান্টু লালিকে ডাকতে ডাকতে ভেতরে চলে গেল।সাবেরা আবার ফিরে আসার পর নিনি বলল, ভাবী শোন- মেজোভাই বলছে আমরা নাকি দাওয়াত দিয়ে লোক আনছি আর ভাইয়া টাকা বিলিয়ে বড়লোকি ফলাচ্ছে-শাড়ির কুচি ঠিক করতে করতে সাবেরা বলল, ওতো বলবেই- পরিবারের উন্নতি সইতে পারছে না। ঝন্টুকে নিয়ে ও কম কথা বলেছে- স্পয়েল্ড হয়ে গেছে- কিচ্ছু হবে না ওর দ্বারা-আরও কত কথা-মনে নেই তোমার?
নিনি বলল, থাকবে না কেন-সাবেরা চাপাস্বরে বলল, তবে এটা ঠিক যেভাবে গরিব আত্মীয়-স্বজন সব আসা শুরু করেছে- টাকা দিয়ে এসব সামলালে আমাদের-নিনি আরও কাছে সরে এলো, এক কাজ কর ঝন্টু ভাই-আমেরিকা-গাড়ি-হেনতেন এসব কথা বলা বন্ধ করে দাও।সাবেরা কণ্ঠ তাতিয়ে উঠল, তুমি বলতে চাও- আমিই শুধু এসব বলে বেড়াই?নিনি সাবেরার আঁচলের ভাঁজ ঠিক করতে করতে বলল, আহা ভাবী- আমি কি শুধু তোমাকে বলছি।সাবেরা বলল, তাই তো বললে-
আজ একটা ষাট ইঞ্চি টিভি আর বিশাল ডেক সেট কিনে এনেছে পিন্টু। সে ফেরার ঘন্টাখানেক পর পিকআপে করে নিয়ে এসে দোকানের লোকজন ড্রয়িংরুমে রাখে। তারপর পুবদিকের দেয়ালে টিভি সেট করে ডেক সেট নতুন কেনা বার্মাটিকের নিচু ক্যাবিনেটের ওপর সাজিয়ে দেয়। ওদের জন্য ভেতর থেকে দামি বিস্কুটসহ চা আসে। টিভি-ডেক সেট ট্রায়াল দিয়ে ফিরে যাবার সময় পিন্টু পাঁচ শ’ টাকার একটা কড়কড়ে নোট ওদের হাতে ধরিয়ে দেয়- বখশিশ। আমজাদ সারাটা সময় চুপচাপ বসেছিল কোণের সোফায়। তার সামনেই পিন্টু বাসায় ফিরে সারাক্ষণ ড্রয়িংরুমে পায়চারি করেছে- সাবেরা বারবার এসে অস্থিরতা প্রকাশ করেছে- ওরা আসতে এত দেরি হচ্ছে কেন!
নান্টু অফিস থেকে ফেরার পরই আসে টিভি আর ডেক সেট। ড্রয়িংরুমের উল্টোদিকেই তার রুম- খোলা দরজা দিয়ে ড্রয়িংরুমের প্রায় অর্ধেকটাই দেখা যায়- কথাবার্তাও সব শোনা যায়-ঝিম মেরে সব দেখেশুনে এবার আমজাদ জিজ্ঞেস করল, ওদের মনে হল স্টেডিয়াম মার্কেটের লোক- কোন দোকান থেকে কিনেছেন ভাইয়া?খানিকটা ক্ষুব্ধ পিন্টু, কি করবে দোকানের নাম দিয়ে?আমজাদ হাসল, না- আমার চেনাজানা দোকান আছে তো ওখানে- আপনাকে ঠকিয়েছে কি না- খবর নিতে পারতাম।বিরক্ত হলেও পিন্টু বুঝতে দেয় না, কোন দরকার নেই- একবার কিনে ফেললে আর কিছু করার থাকে না।আমজাদ বলল, আসলে কী জানেন- কেনাকাটার সময় সাথে থাকলে দরদাম তলিয়ে দেখা যায়-
পিন্টুর বিরক্তি আরেক মাত্রা বাড়ল, তোমার কথায় মনে হচ্ছে- দরদাম তলিয়ে না দেখেই আমি কেনাকাটা করি-অস্থির হয়ে ওঠে আমজাদ, না না-ছি ছি এ কি বলছেন- আমি কি তা বলতে পারি? আমি বলছিলাম আসলে আপনি কত ব্যস্ত, অত সময় কোথায় আপনার- আমি তো বসেই আছি- আপনার সঙ্গে থাকলে সাহায্য হয়-কঠিন হয়ে ওঠে পিন্টু, তুমি কি আমাকে বোকা ভাবছ? আমজাদ এবার অন্য পথ ধরে, স্যরি বড় ভাইয়া- মাফ করবেন। আমি সোজা মানুষ তো- সব কিছু সোজাভাবে ভাবি আর বলিও সরাসরি। এই যেমন মনে হচ্ছে, অত টাকা খরচ হচ্ছে- একটা ক্যাশবুক মেইনটেন করা দরকার-পিন্টু চমকে ওঠে, ক্যাশবুক- ক্যাশবুক দিয়ে কী হবে?আমজাদ বলল, বলেন কী- হিসাব রাখার দরকার আছে না- ঝন্টুকে হিসাব দিতে হবে না?
পিন্টু বলল, তোমার ভাবতে হবে না- সেটা আমি রাখতে পারব-
আমজাদের কণ্ঠে দৃঢ়তা, পারবেন না- যাই বলুন না কেন- এই হিসাব অত সোজা নয়-
ওকে দমিয়ে দিতে চায় পিন্টু, কেন আমি পঁচিশ বছর দোকান চালাইনি? শুনেছ কোনদিন হিসাবের গোলমাল হয়েছে?
আমজাদ মাথা নাড়ে, দু’টা এক নয়- মার্কিন ডলারের হিসাব- যাবে আমেরিকায়- এটা হতে হবে হিসাব বিজ্ঞানের নিয়ম মাফিক। আর আমি হলাম বিকম অ্যাকাউন্টিংয়ের লোক- তার ওপর সরকারি অডিটর-
পিন্টু ধমকে উঠল, রাখ তোমার অডিটর-ডিগ্রি নিলেই বিদ্যান হওয়া যায় না- ইন্টারভিউতে ডাব্বা মেরেছিলে- কী পরিমাণ ধর-পাকড় করে চাকরিটা হয়েছে, সেটা কী আমি জানি না?
এরপর নীরবতা নেমে এলেও নান্টু সব শোনে বুঝতে পারল, ঝন্টুর ডলারে নিজের একটা অবস্থান তৈরি করতে মরিয়া আমজাদ। ওর কথা ডলারের অপচয় ছাড়া নয়ছয়ের ইঙ্গিতও অস্পষ্ট নয়। সে কি ভাইয়াকে কিছু বলবে? কেউ বাঘের পিঠে সওয়ার হলে সে থামে না- তাকে থামান যায় না। ডলার ঝন্টুর-ঝগড়া নান্টুর-এটা কোন যুক্তির বিষয় নয়- নান্টুর সাক্ষী গোপাল হওয়া ছাড়া আর কিছু করার নেই-আজকাল শোয়ার আগে সাবেরা প্রসাধন সারে। পিন্টু প্রতিরাতে অনেকক্ষণ ধরে দেখে- তার মনে হয়, এ আরেক সাবেরা-স্বপ্নের সাবেরা। এরকম রাত তার জীবনে কখনও আসবে- সে ভাবেনি। আজ সারাঘরে পায়চারি করছে- সাবেরার দিকে নজর নেই।
প্রসঙ্গটা সাবেরাই তোলে, আমজাদ তো বেশ ঘুরেল লোক- তোমাকে হিসাব-টিসাব নিয়ে কি কি যেন বলল।
আমজাদের প্রসঙ্গটা ঝেড়ে ফেলতে চায় পিন্টু, আরে দূর- ও কি জানে?সাবেরা বলল, তুমি অমন অস্থির পায়চারি করছ কেন? আচ্ছা একটা সত্যি কথা বল তো- ঝন্টু অত টাকা দিচ্ছে- ও কত টাকার মালিক হয়েছে?
পিন্টু বলল, এটা আমি কী করে বলব। তবে একটা কথা বলতে পারতাম, কিন্তু বলব না কারণ তুমি মেয়েমানুষ।
সাবেরা এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রাখে, আমি তোমার কত গোপন কথা জানি- বলেছি কখনও? ইউনিভার্সিটিতে তুমি যে কেয়া বলে একটা মেয়ের সঙ্গে- কই আমি কি কাউকে বলেছি? তাহলে আমাকে বিশ্বাস করবে না কেন?পিন্টু বলল, ওটা তুমি বলতেই পারবে না- স্বামীর অতীত প্রেমের কথা কেউ বলে বেড়ায় না। ঝন্টু একটা কাজ করেছে- কি কাজ করেছে- ওটা এখন বলা যাবে না- যখন দেখবে তখন বুঝবে।সাবেরা বিরক্ত, তুমি একটা কঞ্জুষ-পিন্টু হেসে উঠল, এই যে যা চাইছ তাই দিচ্ছি, তারপরও-সাবেরা গাল ফুলাল, যে বউয়ের কাছে সব কথা বলে না- সে তো একটা কঞ্জুষই-
পিন্টু হেসে ওঠে সাবেরাকে কাছে টেনে নিল।সাবেরা, মিনি আর নিনি অলস দুপুরে ড্রয়িংরুমে বসে কথা বলছে। কারও কোন কাজ নেই- দু’জন কাজের বুয়া- একজন রান্নাবান্না করে, আরেকজন ঘরদোর সামলায়। কাজ না থাকলে কথা বাড়ে- কথায় খরচের পথ বাড়ে। তারপরও সারাদিন তো বকবক করা যায় না- মাঝেমধ্যে বিশাল টিভিতে ছবি দেখে- কার্টুন ফিল্মও দেখে। এ নিয়ে লালিও ওদের ঠাট্টা করে।
আজ কার্টুন ফিল্ম দেখতে দেখতে সাবেরা বলল, নিনি জান, তোমার বড় ভাইয়া যে একটা হদ্দ বোকা-আমার সন্দেহও এখন আর নেই।নিনি অবাক হয়ে তাকাল, কেন ভাবী?সাবেরা বলল, একটা সত্যি কথা বলি- নিনি তুমি হলে এই বাড়িতে সবচেয়ে চৌকস।নিনি হাসল, জান ভাবী, গন উইথ দ্য উয়িন্ড-একটা ফিল্ম আছে- তুমি তো আবার এগুলো দেখ না- দেখ বাংলা নাটক- রটেন মাল। জান চলতি হাওয়ার সাথে উড়ে চলার এক দুর্দান্ত মজা আছে-যে পেয়েছে, সে বুঝেছে-অন্যে বুঝবে না-কিছুতেই বুঝবে না-কথা শেষ না করেই নিনি কণ্ঠে বাতাসের কাঁপন লাগিয়ে গেয়ে ওঠে, গন উইথ দ্য উয়িন্ড…
ভাবী বলে উঠল, আরে দূর তোমার কথায় ক’দিন ইংলিশ ফিল্ম দেখেছি। ইংলিশ বলে মেশিনগানের মত ফলো করতে পারি না। কি করব বল-
এবার মিনি কথা বলে উঠল, ঠিক বলেছ ভাবী-আমিও বুঝি না- ফুসফাস কি বলে-নিনি হাসে, চেষ্টা কর- চলতি হাওয়ায় উড়তে শেখ- লাইফ এনজয় কর-আমজাদ বাইরে থেকে এসে সোফায় গা এলিয়ে বসল, বাহ্ নারী সম্মেলন চলছে-নিনি বলল, পুরুষদের-যারা ঘরকুনো তাদের একটা সম্মেলন করতে পারেন- খুব জমবে-আমজাদ বলল, তোমার রসবোধ তো চমৎকার-তপু-টপুর রসবোধ কেমন তা তো দেখলাম না একদিনও-নিনি উঠে পড়ল, তপু-টপু ক্যান্সেল-কথা শেষ না করেই নিনি ভেতরে চলে যায়- তারপর যায় ভাবী। আমজাদের মোবাইলে কল আসে। সে নাম দেখে মোবাইল ধরতে ধরতে মিনির দিকে তাকায়। দু’দিন ধরে মিনি শুধু ভাবছে, আমজাদ কি ঠিক পথে আছে? সে আমেরিকা চলে যাক, মিনি এটা চায় না।
কানের কাছে আমজাদ জোরে জোরে কথা বলছে, আরে দূর আমি তো বাইচান্স ঢাকায়- আমার জন্য নিউইয়র্কে টিপটপ জীবন হাপিত্যেস করছে- আমি চাকরি করব কোন দুঃখে! …আরে কত মাস্টার্স গিয়ে জ্যামাইকায় আমাদের রয়েল বেঙ্গল রেস্টুরেন্টে ওসি-ডিসিগিরি করছে!….ওসি-ডিসিগিরি বুঝলি না-ওসি অনিয়ন কাটার আর ডিসি ডিশ ক্লিনার-ঠিকাছে….দু’চার পাঁচজন তো নেয়াই যাবে… দশ-পনেরো লাখের নিচে তো আর আমেরিকার নামও নেয়া যায় না….আরে তুই তো নিজের মানুষ-দেখা করবি, অ্যানিটাইম….না বাড়িতে না-ফোন করবি-আমি চলে আসব ও-কে, বাই-
মিনি জিজ্ঞেস করল, কার সঙ্গে অত কথা বললে?মুচকি হাসে আমজাদ, বললাম একজনের সঙ্গে-মিমি বলল, কি বললে-বুঝলাম না তো-আমজাদের হাসি আরেকটু বিস্তারিত হলো, তোমার এখন বোঝার দরকার নেই- তুমি হলে গিয়ে পেট-পাতলা মানুষ, কখন ফস করে হাঁড়ি ভেঙে দেবে।সাবেরা সেজেগুঁজে ব্যাগ নিয়ে বের হতে যাচ্ছে- তখনই অফিস থেকে ফিরল নান্টু। এরকম সময়ে সাবেরা একা- নান্টু ভেবে পাচ্ছে না, যাচ্ছেটা কোথায়। গাড়ি কেনার পর বিকেলে বের হওয়া যে নিয়মিত হয়ে উঠেছে, এটা নান্টু বুঝতে পারেনি-সাবেরা যায় হেঁটে গলি পেরিয়ে বড় রাস্তায় ময়লার ডাস্টবিনের কাছের ফাঁকা জায়গাটায়, ড্রাইভার ওখানেই গাড়ি নিয়ে অপেক্ষায় থাকে। সাবেরার এটা পছন্দ না হলেও মেনে নিতে হয়েছে- গলির ভেতর গাড়ি ঘুরাতে গিয়ে প্রথমদিনেই ব্যাক-লাইট ভেঙে চুরচুর হয়ে যায়-সামনাসামনি হয়ে যাওয়ায় সাবেরা নান্টুকে জিজ্ঞেস করল, এ্যাই তোমাকে দেখি না কেন? তুমি নাকি সকালে নাশতা কর না- রাতেও খাও না-
তার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন করে নান্টু, আরে ভাবী এই অবেলায় হঠাৎ ব্যাগ-ট্যাগ নিয়ে কিশোরী সেজে যাচ্ছটা কোথায়?
সাবেরা বলল, হঠাৎ হবে কেন- তুমি তো আর এখন বাড়িতে থেকেও থাক না- আমাদের দেখেও দেখ না।নান্টু হেসে উঠল, ডলারের দাপটে টাকা তো চিড়ে চ্যাপ্টা। তা এই ভরসন্ধ্যায় যাচ্ছটা কোথায়?সাবেরা বলল, কন্টিনেন্টালে-জিমে যাচ্ছি-বিস্ময়ে চমকে উঠল নান্টু, তুমি জিমে যাও-জিমে!সাবেরার কণ্ঠ স্বাভাবিক, গাড়ি কেনার পর থেকে প্রতিদিনই তো জিমে যাই- তুমি অবাক হচ্ছ কেন?নান্টু আরও অবাক, বাহ্ গাড়িও কেনা হয়ে গেছে গুড- তা জিমে গিয়ে কর কী?সাবেরা উচ্ছ্বসিত, জান সিক্সটি নাইনের এসএসসি মিসেস চৌধুরী- দেখে মনে হয় আমার অর্ধেক বয়স। তোমার চেয়ে মাত্র বছর তিনেকের বড় আমি- এটা একটা বয়স হলো? তুমি তো এখনও বিয়েই করনি। আচ্ছা ওই যে নায়লা না কী যেন মেয়েটার নাম- ওর খবর কি?
নান্টু-জানি না- বলে বেরিয়ে নিজের রুমে চলে এল।পিন্টু আর সাবেরা চায়ের কাপ নিয়ে আয়েশ করে সোফায় বসল। আজকাল বিকেলটা তারা বেশ উপভোগ করে। সাবেরা বাম পা লম্বা করে দিল সেন্টার টেবিলে- সেদিন কিনে আনা ব্রোঞ্জের ঘোড়সওয়ার সৈনিকের তরবারি আর তার পায়ের বুড়ো আঙুল এখন মুখোমুখি।
পিন্টু বলল, ডেভেলপারের সঙ্গে কথা ফাইনাল হয়ে গেছে- ফিফটি ফিফটি বেসিসে করবে ওরা। এই জায়গার দাম বেড়ে যাচ্ছে- বেশ ভালো দামে সেল হবে ফ্ল্যাট।সাবেরা বুড়ো আঙুলটা তরবারি পর্যন্ত নিয়ে গেল, বেশি দামে সেল করবে ভালো কথা- কিন্তু আমরা থাকব কি ভাড়া বাড়িতে?
পিন্টু বলল, আরে দূর, গুলশানের লাগা সাড়ে তিন কাঠার প্লট- বাড্ডায় লিংক রোডে ব্যবস্থা করে ফেলেছি। এখান থেকে যা পাব- তার সঙ্গে লাখ বিশেক ভরতে হবে- নো প্রোবলেম। ঝন্টুকে বলেছি মাস ছয়েকের মধ্যেই ও টাকা পাঠাবে- এই টাকা তো ওর জন্য কোনো ব্যাপারই না।
সাবেরা লাফিয়ে ওঠে পিন্টুর পাশে ঘন হয়ে বসল, দুর্দান্ত ডার্লিং-জান কাল না স্বপ্নে দেখলাম গুলশানে ছবির মত সুন্দর একটা বাড়ি থেকে লেক্সাস গাড়ি থেকে নামছি তুমি আর আমি-
পিন্টুর চেখেও স্বপ্ন দীর্ঘায়িত হলো, আর ক’মাস যাক গাড়িটা পাল্টাব-উপরে উঠার সিঁড়ি এখন হাতের কাছে এসে গেছে-
সাবেরা বলল, এ্যাই তুমি যে সেদিন বললে পার্টিতে তোমাকে টানটানি করছে- ওটার কদ্দূর?
পিন্টু ওর গালে টোকা মারল, আরে হবে-হবে। আগে কোন বেইস ছিল না-বেইস ছাড়া কিছু হয় না-লোকে পাত্তা দেয় না। ঝন্টু একটা বেইস তৈরি করছে- এখন খালি দেখে যাও সাবেরা বেগম-
সাবেরা আদুরে গলায় বলল, আমার মেয়েটা ভাঙা চামচে দুধ খেয়েছে- এবার ওর জন্য একটা সোনার চামচ দেবে। আমি কি ঝন্টুর কম অত্যাচার সহ্য করেছি? ওকে স্কুলে দিয়ে রোদের মধ্যে চার-পাঁচ ঘণ্টা বসে থাকিনি? আমার এই সোনার হাত দু’টার যে তামার রঙ- সে কি এমনি এমনিই?
পিন্টু বলল, তা বুঝলাম- তোমার ক্লাস নাইনেপড়া মেয়ে এখন সোনার চামচ দিয়ে কী করবে?
সাবেরা বলল, বোকা! ও করবে কেন- আমি শোকেসে তুলে রাখব। লোকজনকে বলব দেখেন- এটা আমার মেয়ের দুধ খাওয়ার চামচ। আভিজাত্য কী একদিনে হয়!
আড়াল থেকে ওদের কথা শোনে মা অবাক- সামনে এসে বললেন, হ্যাঁ রে-আমার ঝন্টু কি একটা সোনার পাহাড় পেয়েছে?
কোন জবাব না দিয়ে রহস্যময় হাসি ছড়িয়ে সটকে পড়ল পিন্টু আর সাবেরা। মা অনেকক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থেকে গিয়ে ঢুকলেন নিনির রুমে।নিনিকে জিজ্ঞেস করলেন, হ্যাঁ রে আমার ঝন্টু কি একটা সোনার পাহাড় পেয়েছে?নিনি অবাক, কী ব্যাপার মা- কী বলছ তুমি?মা বললেন, না- জানতে বড় ইচ্ছা করছে।নিনি বলল, মা তুমি এসব নিয়ে ভাববে না মোটেও-চল আমার সঙ্গে-মা’র রুমের বেলকনিতে এসে মাকে দোলনা চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে চেয়ারটা দুলিয়ে দিল-নিনি বলল, মা, তুমি এখানে বসে দোল খাও আর দেখে যাও- আরেকটা কথা- তোমার মেজো ছেলের কথায় একদম কান দেবে না- উনি উন্নতিতে বিশ্বাসী না।নিনির হাত ছাড়িয়ে উঠে মা নান্টুর রুমে গেলেন। নান্টু বাইরে বের হচ্ছিল- অফিস থেকে আগে ফিরলে দোয়েল চত্বর হয়ে শাহবাগ পর্যন্ত হাঁটে-আজিজ মার্কেটে বইপত্র দেখে ভাল লাগলে কেনে-আবার ওই পথেই বাড়ি ফেরে। ইদানীং এক-দুই সপ্তাহ পর সুযোগ পায়।
মা’র চোখে-মুখে উদ্ভ্রান্ত ভাব দেখে বিচলিত হলো, কি ব্যাপার মা, তোমার শরীর খারাপ?মা বললেন, তুই সত্যি করে বল তো- ঝন্টুর মত একটা ছেলে যে এখানে কিছু করতে না পেরে বহু কষ্টে আমেরিকায় ঢোকে গেছে- সে কি ওখানে কোন সোনার পাহাড় আবিষ্কার করে ফেলেছে?নান্টু বলল, এ প্রশ্ন তো মা ওদের কাছে জিজ্ঞেস করতে হবে তোমাকে।মা বললেন, ওরা তো হাসে।নান্টু বলল, আর ওদের দেখে লোকজন যে আড়ালে হাসে!মা জিজ্ঞেস করলেন, সত্যিই হাসে?নান্টু বলল, হাসবে না- এ দেশের কত ছেলে আমেরিকায় অড জব করে টাকা উপার্জন করে পাঠাচ্ছে- তোমার ছেলের লাক ফেভার করেছে-ও একটু বেশি পাঠাচ্ছে। এই টাকা কি ফালতু কাজে উড়িয়ে দেয়ার জন্য? কোনো নিম্নমধ্যবিত্ত ফ্যামেলি কি এভাবে টাকা উড়াতে পারে?
মা বললেন, আমি তো তা-ই বলি। এখন এক হুজুগ শুরু হয়েছে- গ্রাম থেকে একের পর এক লোক আসছে- দু’হাজার-পাঁচ হাজার নিয়ে যাচ্ছে-
নান্টু বলল, নিয়ে যাচ্ছে না মা বল- দিয়ে দিচ্ছে। গ্রামের লোকেরা জানল কি করে যে ঝন্টু আমেরিকা থেকে সোনার পাহাড় কেটে টাল টাল সোনা পাঠাচ্ছে? তোমার বড় ছেলে-বউ আর ছোট মেয়ে ফোন করে করে বিত্তের খবর জানাচ্ছে- দাওয়াত দিয়ে লোক নিয়ে এসে টাকা বিলিয়ে প্রমাণ করছে তারাও বড়লোক। টাকার বদহজম হচ্ছে মা-এর নাম বদহজম-মা বললেন, আর বলিস না- আমি পাগল হয়ে যাব-একটু থেমে বললেন, আচ্ছা ঝন্টু কি জানে ওর টাকা খোলামকুচির মত উড়াচ্ছে এরা?নান্টু বলল, ঝন্টু তো তোমার সাথে ফোনে কথা বলে- তুমি কি ওকে বলেছ কখনও?
মা বললেন, কি করে বলব- ওরা সবাই টেলিফোন পাহারা দেয় যে। জানিস আজ পিন্টু সাবেরাকে বলছিল এই বাড়িটা নাকি ডেভেলপারকে দিয়ে ওরা গুলশানে চলে যাবে। এদের এসব আজগুবি কাণ্ড-কারখানা ঠেকাবে কে?নান্টু বলল, আমি ফেডআপ মা-আমাকে কিছু বলতে বল না- তুমি ঝন্টুকে বলবে-বলতে হবে-মা বললেন, নান্টু আমি আশঙ্কায় মরে যাচ্ছি- একটা সর্বনাশ ধেয়ে আসছে-জীবনে কখনও এমন পরিস্থিতির মুখে পড়েননি মা। তিনি কি করবেন- কি তার করা উচিত- তার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে-নান্টু দোয়েল চত্বর পার হয়ে একাডেমির সামনে নিরিবিলি রাস্তায় পড়ার পর একটা কল এল-প্রথম বুঝতে পারেনি এটা ঝন্টুর ফোন। ঝন্টু যে তাকে দুয়েকবার কল করেছে, সেটা বাড়ির টিঅ্যান্ডটি নম্বরে।
ঝন্টু সরাসরি বলল, ছোটভাইয়া আমি তো আর পারছি না- একটা টেকঅ্যাওয়ে রেস্তোরাঁ চালু করেছি- মোটামুটি চলছে-পূর্ণাঙ্গ রোস্তোরাঁয় পরিণত করতে প্রথম অবস্থায় অনেক বিনিয়োগ দরকার- বড়ভাইয়ার চাহিদা মেটাতে গিয়ে তা আর হচ্ছে না। ছোটভাইয়া আমি কি করি একটা বুদ্ধি দাও-
নান্টু হাসল, আমি রাস্তায়- বেশি কথা বলতে পারছি না- খোলামকুচির মত উড়াবার জন্য কষ্টের ডলার কিভাবে পাঠাবি- কত পাঠাবি- নাকি রাস টেনে ধরবি-এসব একান্তই তোর ব্যাপার। এমনিতেই তাদের কর্মকাণ্ড সমর্থন না করায় আমি বড়ভাইয়া-ভাবীর শত্রু হয়ে গেছি- তবে মার্কিন জমিনে একটুখানি পা রাখাটা তোর প্রথম কাজ-সবকিছুর আগে এটাই করতে হবে- এ ছাড়া তোকে আমার আর কিছু বলার নেই-
ঝন্টু একটু চুপ করে থেকে বলল, আমি বুঝতে পেরেছি ছোটভাইয়া-বারবার তুমিই আমাকে রক্ষা করেছ- দোয়া করবে-রাখছি।রাতে খাবার আগে ড্রয়িংরুমে ষাট ইঞ্চি টিভি পর্দার সামনে কফির আড্ডা জমজমাট হয়ে ওঠে। পিন্টু-সাবেরা-নিনি-মিনি-আমজাদ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে মত বিনিময়ে দারুণ ব্যস্ত থাকে এই সময়টায়। নান্টু আজকাল ফিরে ওদের খাবার শেষ হওয়ার পর। তারা দিল খুলে উন্নয়ন প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করে। আজ আলোচনার সূত্রপাত ঘটায় আমজাদ। নিজের অবস্থান মজবুত করার জন্য সে বেদম চেষ্টা করে চলছে। মা’র কাছে এসব অসহ্য- তিনি আজকাল ড্রয়িংরুমে আসা প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন।
আজ মা ঢুকেই বললেন, পিন্টু আমার অসহ্য লাগছে তোদের কাণ্ডকীর্তি- তোরা এগুলো থামাবি- না হলে আমি চলে যাবো গ্রামের বাড়িতে।পিন্টু বলল, কি থামাতে বলছ মা?মা বললেন, তোরা স্বাভাবিক হ- আল্লাহ এগুলো পছন্দ করেন না-দেখবি বড় কোন ক্ষতি হয়ে যাবে।পিন্টু বলল, মা তুমি যে কাণ্ডকীর্তির কথা বলছ- অস্বাভাবিক বলছ এসবই হলো বেইস-সব কিছুরই একটা বেইস থাকে-ফ্যামিলিরও থাকে।
আমজাদ বলল, রাইট ভাইয়া-ব্যবসার এস্টাবলিস্টমেন্ট কস্টের মত আর কি!
বাইরে থেকে নান্টু এসে ঢুকল, এটা কোন ব্যবসার ব্যাপার নয়। একটা ফাঁপা বেলুন ধরে সবাই আকাশে উড়ে চলেছ- এসব কোন সুস্থতার লক্ষণ নয়।
পিন্টু বলল, সবাই সব কিছু বুঝতে পারে না- ফ্যামিলির একট বেইস দরকার। বাবা তো কিছু করে যাননি। আমিও পারিনি- এখন ঝন্টুর কারিশমায় ফ্যামিলির একটা ভিত্তি গড়ে উঠছে। এটা কারও কারও ভালো নাও লাগতে পারে-কিন্তু এটা প্রয়োজন-
নান্টু বলল, বাবাকে দোষারোপ আমাদের অনেকের ম্যানিয়ায় পরিণত হয়েছে। বাবা যা করেছেন, তা কি আমরা কাজে লাগিয়েছি? তুমি ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র ছিলে- ছাত্র রাজনীতির নর্দমায় পড়ে সব ভণ্ডুল করে দিলে। ঝন্টুও তোমার পথ অনুসরণ করল। আর সেন্টু তো তোমার কথায় ফ্যামিলির বেইস তৈরি করতে গিয়ে ড্রাগে নিমজ্জিত- এখন বাসায় আসা পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছে। নিনি একটা মেধাবী সৎ ছেলেকে চরম ব্রিবতকর অবস্থায় নিক্ষেপ করেছে-
নিনি বলল, মেজোভাই তুমি কিন্তু আমার নিতান্ত ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ ফ্যামিলি ডিসকাশনে মিলিয়ে ফেলছ।
নান্টু বলল, করছি, কারণ এর পেছনেও রয়েছে ভাইয়ার ওই ফ্যামিলি বেইস। তোমাদের যা খুশি কর আমি তো কিছু বলিনি- বলবও না। তবে ভাইয়া তোমার কথিত ফ্যামিলি বেইসে আমার যে একটা অংশ আছে, এটা তুমি ভাবছ না- এ জন্যও আমি কিছু বলব না। কিন্তু পৈতৃক বাড়িটা ডেভেলপারকে দিয়ে দিচ্ছ- আমাকে জিজ্ঞেস করার দায়িত্বও তুমি অনুভব করছ না। আমি বিস্মিত হইনি- কারণ তুমি যে ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরি করছ তার কাছে এটাই স্বাভাবিক। ও-কে আমি বাড়ি ছেড়ে যাচ্ছি-
নান্টু নিজের রুমে ঢোকে যাবে- সবাই নিশ্চুপ-
আমজাদ প্রথম কথা বলে উঠল, হোপলেস- নান্টুটা ব্যাকডেটেড জানতাম-এখন দেখি রিঅ্যাকশনারিও-
মা এবার ধমকে উঠলেন, চুপ বজ্জাত ছেলে, আমার ব্রিলিয়ান্ট ভাইয়ের ছেলে হয়েও তুই হয়েছিস একটা অকালকুষ্মাণ্ড। পিন্টু তোরা যা করছিস-এসব কোন ভাল কাজ নয়। ঝন্টুর কষ্টের টাকা এভাবে উড়াবি না-আর নান্টুর কাছে তোদের মাফ চাওয়া উচিত-
পিন্টু বলল, মা তোমার কাছে এটা আমি আশা করিনি-মা বললেন, কি আশা করেছিলি?সাবেরা বলল, ছোট ভাইয়ের কাছে মাফ চাইতে বললেন মা- এটা কি ঠিক হলো!মা হেসে উঠলেন, বাহ্ নিজেরা কোন ঠিক কাজটা করেছ?বেরিয়ে গেলেন মা এবং এক এক করে সবাই। বসে থাকল নিনি-ঘরে ঢুকেই সাবেরা বলল, ছি! তোমার ছোটভাই তোমাকে এভাবে অপমান করল আর তুমি চুপ করে থাকলে, এটা ধমকও দিতে পারলে না!পিন্টু নিশ্চুপ- সে ভাবছে নান্টু কি ফোনে ঝন্টুকে কিছু বলতে পারে বা বলবে- যদি বলে তাহলে তার সাজান বিষয়গুলো কি নয়ছয় হয়ে পড়বে- না সে আর ভাবতে পারে না।লালি ঘরে ঢোকে বাবা-মাকে গম্ভীর অবস্থায় দেখে বলল, মাম্মী ইজ দেয়ার অ্যানিথিং রং?ধমকে উঠল পিন্টু, স্টুপিড মেয়ে-যাও-নিজের রুমে যাও-সাবেরা ক্ষেপে উঠল, কি পেয়েছ তুমি- মেয়েটাকে অযথা ধমকালে কেন?পিন্টু আরও রেগে গেল, চুপ কর তুমি-
মা স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন- তার কিছু ভালো লাগছে না। ঝন্টু টাকা পাঠাতে শুরু করা মাত্র পিন্টু অন্য মানুষ হয়ে গেল- রাতরাতি সবকিছু বদলে ফেলতে থাকে। এমনকি নিজের দোকানটাও ছেড়ে দেয়- নান্টুর চাকরি হওয়ার আগ-পর্যন্ত দোকানটা ছিল পরিবারের বড় ভরসা। দোকানের আয়- নান্টুর বেতনের টাকা- সংসার তো আগের চেয়ে ভালই চলছিল। সারা জীবন তিনি সংসার চালিয়েছেন টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে-তারা দু’জন ছিলেন অল্পে তুষ্ট মানুষ-ছেলেমেয়েদেরও ছোটবেলায় ওই শিক্ষাই দিয়েছেন। নান্টুর বেলায় শিক্ষাটা ঠিক ঠিক কাজে লেগেছে। নান্টুর চেয়ে ছাত্র ভাল হলেও পিন্টু ছাত্ররাজনীতিতে ঢোকে অনার্সটাও শেষ করতে পারল না। ঝন্টুকেও ঠেকান গেল না- নানা হুজ্জুত-হাঙ্গামা ডিঙিয়ে নান্টু ওকে শেষ পর্যন্ত যাহোক আমেরিকায় পাঠাতে পেরেছে। ঝন্টুর আয় তো তার নিজের ভবিষ্যৎ-পিন্টু এটাও ভুলে গিয়ে গোটা পরিবারকে বাঘের পিঠে সওয়ার করে দিয়েছে- বাড়িটাও ডেভেলপারকে দিয়ে দিতে চাচ্ছে- নান্টুর কোন কথাই শুনছে না-
নান্টু এসে বলল, মা আমি যাচ্ছি-মা চমকে উঠলেন, যাচ্ছি-মানে?নান্টু বলল, সামনের মাসে একটা অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া করে তোমাকে নিয়ে যাব- নিনি যদি যায়, যাবে-মা বললেন, তুইও কি ওদের মত পাগল হলি নাকি?হাসল নান্টু, মা ভুল বললে- ওরা পাগল হয়নি, কিন্তু আমি এখানে আর কিছুদিন থাকলে সত্যিই পাগল হয়ে যাব।নান্টুর দিকে তাকিয়ে চুপ করে থাকলেন। মা তার ভেতর ভাঙচুরের শব্দ শুনছেন। নান্টু নিশ্চুপ-ভাঙচুর পার হয়ে সিদ্ধান্তে স্থির-আর যা-ই হোক এখানে থাকা যাবে না।অনেকক্ষণ পর মা বললেন, এ বাড়িতে তোর অংশ আছে- পিন্টুর খেয়ালখুশির কাছে ছেড়ে যাবি কেন?
নান্টু বলল, ওসব করে আমি লোক হাসাতে চাই না মা। ওরা আশপাশের পরিচিতদের যথেষ্ট হাসিয়েছে।মা বললেন, আমি তোকে আটকাতে চাই না। কিন্তু আমি তো মা-মায়েরা শেষ পর্যন্তও আশা করে সন্তান ঠিক পথে ফিরে আসবে। তুই থাকলে এটা সহজ হতো।নান্টু বলল, হতো না মা-ফিরে আসার একটা পর্যায় আছে- ভাইয়া সবাইকে পয়েন্ট অব নো রিটার্নে পৌঁছে দিয়েছে। ওখান থেকে বড় ধরনের ক্ষয় ছাড়া ফেরা যায় না। আসি মা-
নান্টু মাকে সালাম করে বেরিয়ে যাচ্ছিল তখনই লালি এসে বলল, মেজোচাচু আমি জানি ইউ আর রাইট- হান্ড্রেড পার্সেন্ট রাইট-নান্টু লালির মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বেরিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকল। নিনি বসে আছে- তার দৃষ্টি ছাদে স্থির। নান্টু ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যেতে গিয়ে থামল-মুখ না ফিরিয়ে বলল, বিকশিত চিত্তের মানুষ স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয় না। তপু তেমন একজন- তুমি কিন্তু প্রমাণ করতে পারনি যে তোমার চিত্তও বিকশিত। সময় শেষ হয়ে যায়নি- তপুর সঙ্গে এখনও দেখা করতে পার-নিনির কণ্ঠ কান্নাভেজা, মেজোভাই আমি বোধ হয় বিভ্রান্ত-নান্টু বলল, বিভ্রান্তি আসতে পারে- স্থায়ী হলে মানুষ পরাজিত হয়। তুমি বুঝতে পারছ- পরাজিত হবে না। আসি-মেজোভাই- ছাড়া নিনি আর কিছু বলতে পারল না।
মধ্যরাতে ফোন বেজে উঠল। পিন্টুর ঘুম ভেঙে গেল- তাড়াহুড়া করে উঠে ড্রয়িংরুমের দরজার পাশে প্যাসেজে এসে উঁচু টেবিলে রাখা ফোন ধরল-
অচেনা কণ্ঠ, আমাকে চিনবেন না- আমি ঝন্টুর বন্ধু নিউ ইয়র্ক থেকে বলছি- আপনি বড় ভাইয়া তো?পিন্টু বলল, জি বলছি-বলুন-অচেনা কণ্ঠ নিশ্চুপ-পিন্টু কয়েকবার হ্যালো-হ্যালো-বলার পর অচেনা কণ্ঠ বলল, ভাইয়া কি করে বলি-একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে-পিন্টু চমকে উঠল, দুর্ঘটনা! কার দুর্ঘটনা?অচেনা কণ্ঠ ভেসে এল, রোড অ্যাক্সিডেন্ট-আপনি ঘাবড়াবেন না-ঘাবড়াবার কিছু নেই- আমরা ঝন্টুর বন্ধুরা ওটির সামনে আছি। ফোনের কাছে থাকুন আপনি-পরে কথা বলছি-পিন্টু আপন মনে আওড়ায়, রোড অ্যাক্সিডেন্ট-ঝন্টুর বন্ধুরা ওটির সামনে- মাথায় কিছু ঢুকছে না- আল্লাহ কি হয়েছে-কে জানে-পেছন থেকে সাবেরা বলল, কী ব্যাপার-কার ফোন?পিন্টু বলল, বুঝতে পারছি না- একটা গুরুতর ঘটনা মনে হচ্ছে-
মিনি তার পেছনে এসে আমজাদ বলল, ভাইয়া কি হয়েছে, অত রাতে ফোন বাজল-পিন্টু বলল, ড্রয়িংরুমে চল- আমজাদ টেলিফোনটা নিয়ে এসে দরজা বন্ধ করে দাও।সাবেরা বলল, কী হয়েছে-কে ফোন করল-খুলে বল-
পিন্টু বলল, বুঝতে পারছি না- বলল অ্যাক্সিডেন্ট-ওটি-তারপর বলল অপেক্ষা করতে-কথা শেষ না করে উঠে পায়চারি করতে লাগল। দরজা ঠেলে নিনি ঢুকে সবাইকে দেখে অবাক হল-নিনি বলল, কী ব্যাপার অত রাতে তোমরা সব ড্রয়িংরুমে-কি হয়েছে-সংক্ষেপে বলল মিনি, টেলিফোন-নিনি জানতে চাইল, টেলিফোন কার-ছোটভাইর?
এ প্রশ্নের কোনো জবাব কেউ দিল না। সবার উৎসুক অপেক্ষার পরিবেশ নিনিকেও আর প্রশ্ন করায় উৎসাহিত করল- সে বুঝতে পারল টেলিফোনটা গুরুত্বপূর্ণ-কোন খবর দিয়েছে কিংবা দিতে পারে তা অনুমান করতে পারছে না। সে-ও সবার মত অপেক্ষায় শামিল হলো। কেউ পায়চারি করছে- কেউ ভেতরে গিয়ে পানি খেয়ে আসছে-কেউ ঝিম মেরে বসে আছে। অনেকক্ষণ পর ফোন বাজল-সবাই উৎসুক-
পিন্টু রিসিভার উঠাল, হ্যালো-হ্যালো-হ্যালো-লাইন কেটে গেল-রুদ্ধশ^াস অপেক্ষা-না এবার দ্রুতই আবার রিং হলো-আমজাদ গিয়ে ফোন ধরল, হ্যালো- হ্যাঁ- হ্যাঁ আছেন-প্লিজ হোল্ডঅন-ভাইয়া-পিন্টু হাত বাড়িয়ে রিসিভার ধরল, হ্যালো-হ্যাঁ বলছি-কি বললেন? এ কি বলছেন আপনি! সব কিছু চুরমার হয়ে গেল-ফোনের রিসিভার ধরিয়ে দিল আমজাদকে- ঠিক তখনই বিদ্যুৎ চলে গেল- গাঢ় অন্ধকারে পুরো ঘর উথাল-পাতাল করছে পিন্টুর কণ্ঠস্বর, শেষ-সব শেষ-আহা একি হল-কি হল হায় আল্লাহ-আমজাদ কাঁপা গলায় ফোনে কথা বলছে, হ্যালো-কি হয়েছে?…. ঝন্টু-ঝন্টু মারা গেছে? এ কি খবর দিলেন আপনি- আপনি কে….ঝন্টুর বন্ধু? কি হল-কি করে মারা গেল ঝন্টু?…. রোড অ্যাক্সিডেন্ট? কোথায়?…আমজাদ ফোন ধরে রেখে সবার মুখে তাকাল-তারপর বলল, হ্যালো- হ্যাঁ বলছি….লাশ-লাশ কি করবেন! দেখুন আমরা সুস্থির চিন্তা করতে পারছি না…. এটা সম্ভব নয়। আপনাদের পরামর্শ কী? … আচ্ছা ধরুন- আমি বড় ভাইয়ার সাথে কথা বলে নিই- ভাইয়া আপনি শান্ত হোন-ঝন্টু-ঝন্টুর লাশ কী করবেন?তার শেষ ক’টা শব্দের তুমুল অনুরণনের মধ্যে এই ঘর-পুরো বাড়ি উল্টো হয়ে সেঁধিয়ে যাচ্ছে মাটিতে….
অনেকদূর থেকে আমজাদের কণ্ঠ থেঁতলে থেঁতলে আসছে, তারা বলছেন- অনেক ঝক্কি-ঝামেলা-টাকা পয়সা-তারচেয়ে ওখানেই দাফন-পিন্টুর চোখে শূন্য দৃষ্টি- সবার ভেতর শূন্যতার হাহাকার-করুণ কান্না নেমে এল-কখন ভোর হলো-কিভাবে ভোর হল-কেউ টের পেল না। মা স্থির বসে আছেন-চোখে ঘোলা দৃষ্টি। নিনি এসে মা’র হাতে হাত রাখল- মাথায় হাত বুলাল-তারপর ধীরে বসে পড়ল মা’র পাশে-মা বললেন, কোন খবর নিতে পারলে?
নিনি কণ্ঠে হতাশা, না মা-আমাদের তো আমেরিকায় আর কেউ নেই-মা বললেন, আচ্ছা নান্টু খবরটা জানে?নিনি উঠতে উঠতে বলল, জানে- নায়লা আপা জানিয়েছে-মা কতক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ও এলো নারে-নিনি বলল, ট্যুরে আছে মেজোভাই-আজ রাতে ফিরবে- ফোন করেছিল আমার কাছে-নিনি আবার এগিয়ে যায় মা’র কাছে, মা নিনিকে জড়িয়ে ধরলেন-মা হঠাৎ বলে উঠলেন, আমার ঝন্টু মরতে পারে নারে- ঝন্টু মরেনি-
পিন্টু তার ঘরে খাটে হেলান দিয়ে আধশোয়া-সাবেরা খাটের এক কোণে দলামোচড়া হয়ে শুয়ে আছে-সাবেরা আহাজারি করে উঠল, হায়! আমাদের কী হবে! আচ্ছা ডেভেলপারদের না-করে দেয়া যায় না?পিন্টু যন্ত্রচালিতের মত বলল, তাই করব-অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে সাবেরা বলল, হ্যাগো দোকানটা আবার নেয়া যায় না?পিন্টু বলল, মনে হয় না-সাবেরা বলল, দেখ না চেষ্টা করে-পিন্টু বলল, একটু ভাবতে দাও- দেখি কী করা যায়-মা’র ঘরে দিদার পাশে লালি দু’হাতে মুখ ঢেকে বসে আছে-লালি বলল, দিদা জান মিনিফুপি আর ফুপা না খুব ভোরে চলে গেছে-মা বললেন, তারা আর কী করবে?লালি বলল, দিদা আমরা কি আবার আগের মত হব-হতে পারব!মা বললেন, পারব না কেন-পারব। আমরা আগে ভালো ছিলাম না?
লালি বলল, অনেক ভাল ছিলাম দিদা-অনেক ভাল-ঝন্টুর পাঠান টাকা খরচের পর বাকিতেও ওরা অনেককিছু কেনাকাটা করে বসে আছে। কয়েকদিনের মধ্যে বাকি-বকেয়া শোধের তাগিদ শুরু হয়ে গেছে। গাড়িটাও বোঝা হয়ে উঠল পিন্টুর কাছে। শেষ পর্যন্ত লাখ দুয়েক টাকা কমে গাড়িটা বিক্রি করে দেয়া ছাড়া উপায় থাকল না।
পিন্টু যখন বলল, আপনি গাড়িটা নিয়ে যেতে পারেন- কোন সমস্যা নেই-যে কিনেছে-সে পিন্টুকে বলল, দুয়েকদিন চালান- আমার তো আরেকটা গাড়ি আছে। আপনার গাড়িটা নিলাম প্রিমিও-৫ মডেল দেখে। চালান দু’চার দিন-তারপর নিয়ে যাব-পিন্টু বলল, না-না দরকার নেই-আপনি আজকেই নিয়ে যান।ক্রেতা বলল, আপনি পেমেন্টের জন্য ভাববেন না-আমি চেক নিয়ে এসেছি-এই নিন-পিন্টু চেকটা নিয়ে চোখ বুলিয়ে ড্রাইভারকে বলল, আমিনুল তুমি গাড়িটা উনাদের দিয়ে আসো-আমিনুল বলল, জি স্যার-সবাই বেরিয়ে যাবার পর পিন্টু চোখ বন্ধ করে সোফায় গা এলিয়ে দিল।তখন পেছনের বারান্দা স্তব্ধ হয়ে বসেছিল সাবেরা।পুরনো কাগজওয়ালা রাস্তা থেকে ডাকছে, এ্যা-ই পেপার-শিশি-বোতল-পেপার-
সাবেরা সতর্কতার সঙ্গে চারদিক দেখে বারান্দার পর্দা সরিয়ে চাপাস্বরে ডাকল, এ্যাই কাগজওয়ালা তুমি কি কাগজ ছাড়া আর কিছু নাও?কাগজওয়ালা জিজ্ঞেস করল, কি দিবেন খালাম্মা?সাবেরা বলল, কাল ঠিক এমন সময় আসবে- আমি দেখাব।
কাগজওয়ালা বলল, জে খালাম্মা-আমু-সাবেরা বারান্দা থেকে ঘরে ঢুকল-ওয়াল কেবিনেট খুলে তাকে সাজানো শাড়ি হাতড়াল-শোকেসে দু’চারটা শোপিস হাতড়াল। তারপর আপন মনে বলল, কী হবে এসব রেখে- না কিছু রাখব না-কিচ্ছু না-এ সবের মধ্য থেকে লালসার বিষ ছড়াচ্ছে-বিষ-তপু বড় রাস্তায় অফিসের গাড়ি থেকে নেমে ওদের বাড়ির সামনে রাস্তায় পা রাখতেই দেখল এক তরুণী তপুদের বাড়ি থেকে হেঁটে আসছে- পশ্চিম আকাশের সূর্যের ছটা লেগে তার নতমুখি মুখমন্ডল এমন অদ্ভুত এক রঙ ধারণ করেছে- যা চেনা মানুষকেও অচেনা করে তোলে।কাছাকাছি হতেই তপু অবাক-নিনি তুমি!নিনি সোজাসুজি তাকাল, হ্যাঁ আমি-তপু বলল, ফিরে যাচ্ছ কেন? চল-
নিনি হাসল, ছিলাম তো-ভাবীর সঙ্গে রান্না করলাম- খেলাম-স্থৈর্য আর স্থিতির সঙ্গে খেললাম-আরও-তপু বলল, অতক্ষণ ছিলে?নিনি বলল, অতক্ষণ না- বলতে পার সারাটাদিনই ছিলাম-আচমকা তপু বলে ফেলল, হঠাৎ-কি ব্যাপার!
নিনি আবার হাসল, সব সময় কি ব্যাপার থাকতে হয়? আর আমি তো তোমার কাছে যাইনি যে তুমি ব্যাপার নিয়ে প্রশ্ন তুলবে।তপু বলল, একদম ঠিক- তাহলে আবার চল আমার সঙ্গে-এবার তার সেই চেনা মুচকি হাসিতে উদ্ভাসিত হল নিনি, না এবার গেলে স্থিতিরা আর আসতে দেবে না। বলেই দিয়েছে- এরপর আর তোমাকে যেতে দেব না। সময় থাকে তো চল বাসে তুলে দেবে-তারা বড় রাস্তার দিকে হাঁটতে থাকল-তপু আপন মনে বলল, আগে সময় ফুরাত না- এখন এই কাজটা পাওয়ার পর সময় কোথা দিয়ে যায় টেরও পাই না।নিনি বলল, কাজ না করলে চলবে কী করে?তপু বলল, চলবে না- কাজ ছাড়া আর কোনো কিছুতেই চলে না। তুমি বাসে যাবে বলছিলে?
নিনি বলল, যা সব সময় সম্ভব- তাই করা উচিত-তপু অবাক দৃষ্টিতে তাকাল চিরচেনা সেই নিনির দিকে-তাকিয়ে থাকল-নিনি চোখ তুলে তাকাল, কি দেখছ?তপু বলল, চিরচেনা নিনিকে-সন্ধ্যার আগ-মুহূর্তে নিনি নায়লাকে নিয়ে মা’র রুমে ঢুকল-পেছনে নান্টু। মা এক নজরে তাকিয়েছিলেন ঝন্টুর ছবিটায়। ঝন্টু আমেরিকা যাওয়ার পর ছবিটা দেয়ালে টানান হয়েছিল। মা সময় পেলেই কথা বলতেন ঝন্টুর সঙ্গে। গত ক’দিন তিনি আর কথা বলেন না- শুধু তাকিয়ে দেখেন- মানুষ মরে গেলে কি তার ছবি বদলে যায়? তিনি বলতে গেলে দিনরাত সারাক্ষণ তাকিয়ে আছেন- কই কোন পরিবর্তন তো চোখে পড়ছে না- একদম আগের মত-দুষ্টুমিভরা চোখজোড়া জীবন্ত-নিনি ঢোকেই বলল, মা এই যে দেখ কে এসেছে-
ফিরে তাকিয়েই মার চোখ খুশিতে ভরে উঠল, নায়লা-মা কেমন আছ?নায়লা পা ছুঁয়ে সালাম করল, মা আপনি কেমন আছেন- আমি ভালো মা।মা বললেন, ভাল থাক মা- বস আমার কাছে বস মা-নায়লাকে হাত ধরে বসালেন।নায়লা বলল, মা আপনি আমাকে জানেন- মনে আছে আমার কথা?মা বললেন, মায়েরা অনেক কিছু জানে- যা মেয়েরা জানে না। এই যে আমার এই মেয়ে জানে না- যা আমি ওর চোখ দেখে জানতে পারি। মায়েদের জানতে হয়- তোমরাও যখন মা হবে জানবে।নায়লা বলল, আপনি- কি বলব- আমার খুব ইচ্ছে করছে আপনার কাছ থেকে জানতে-শিখতে-মা বললেন, উহু মা- কেউ কাউকে শেখাতে পারে না- নিজে নিজে শিখতে হয়- দেখে দেখে শিখতে হয়- শেখার ইচ্ছেটা শুধু থাকতে হয় মা।একটু থেমে মা বললেন, আমার মনটা ভালো নেইরে মা-নায়লা বলল, মা কি করবেন- আল্লাহর কাজের ওপর তো আমাদের কোনো আপত্তি চলে না।
মা বললেন, সে তো বুঝি মা কিন্তু আমার মন কোন যেন বলছে ঝন্টু মরেনি- মরতে পারে না-নান্টু বলল, মা অনেক সময় সাময়িকভাবে হলেও অনেক কিছুই আমাদের মেনে নিতে হয়- এছাড়া উপায় নেই।মা বললেন, এদিকে আয় দেখি-মা নান্টুর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন- আল্লাহ তোদের ভাল রাখুন-
সেই মধ্যরাতে অন্ধকার ড্রয়িংরুমে পিন্টু-সাবেরা-নান্টু-নিনি-বুয়ার জটলার মাঝ বরাবর সাদা শাড়িপরা মা শান্ত-ধীর পায়েএগিয়ে গেলেন-নান্টু আর লালিকে ওইখানটায় রেখে জটলার সবাই আড়ালে সরে গেল। সবার মুখচোখ ফ্যাকাসে-মা দরজা খুললেন-সুইচ টিপে বাতি জ্বালালেন-মা’র মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল-মা আনন্দে বলে উঠলেন, ঝন্টু তুই! তুই না মরে গেছিস-ওরা বলে-ঝন্টু হাসল, ভুল বলে মা- আমি মরিনি-মরেছে অন্য কিছু-মা দু’হাত বাড়িয়ে ঝন্টুকে জড়িয়ে ধরলেন।