মানুষের জীবনের সামগ্রিক রূপকল্প নির্মাণে উপন্যাসের ধারণক্ষমতা সন্দেহাতীত। বাংলা গদ্যের বিকাশের প্রারম্ভেই উপন্যাস শিল্পের যাত্রা শুরু হলেও বাংলা কথাসাহিত্যে সার্থক উপন্যাস নির্মাণের কৃতিত্ব বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের। বঙ্কিম, রবীন্দ্র ও শরৎযুগ অতিক্রান্তের পর ত্রিশোত্তর ঔপন্যাসিকের হাতে বাংলা উপন্যাস নতুন মাত্রা পায়। মানবমনের জটিলতর বিশ্লেষণ ছাড়াও নিম্নবিত্ত সাহিত্যে অঙ্গীভূত হয় সময় ও সমাজ বাস্তবতার নিরিখে। বিভাগোত্তর কালে চল্লিশ ও পঞ্চাশ দশকের কথাসাহিত্যিকগণ নব্য ঔপনিবেশিক যুগে গ্রামীণ পরিবেশকেই তাদের কথাসাহিত্যের পটভূমি হিসেবে নির্বাচন করেন। নাগরিক জীবনের অভিঘাত ও নাগরিক যুগযন্ত্রণা প্রথম বারের মতো ষাটের দশকের কথাসাহিত্যিকদের উপন্যাসশিল্পে প্রতিভাত হতে দেখা যায়। আর এই ষাটের দশকেই অবরুদ্ধ সময় ও সমাজবাস্তবতায় কথাসাহিত্যিক শওকত আলীর আবির্ভাব নাগরিক জীবনের ক্লেদাক্ত ও যন্ত্রণাদগ্ধ জীবনের রূপায়ণ দিয়ে। কলাকৌশল ও প্রকাশভঙ্গির ভিন্নতায় ট্রিটমেন্ট ও পরিচর্যার স্বতন্ত্র-বীক্ষণে তিনি পর্যায়ক্রমে নির্মাণ করতে থাকেন একের পর এক শিল্প। তাঁর শিল্পমানসের ক্রম রূপান্তর ও নিরীক্ষাপ্রবণ মনমানসিকতায় সামাজিক দায়বদ্ধতার শিল্পনির্মাণে তার সৃষ্টিকর্ম বাংলা উপন্যাস শিল্পে বিশিষ্ট হয়ে ওঠে। ফলত কথাসাহিত্যিক শওকত আলীর সাহিত্যকর্মের সাথে তাঁর অগ্রজ, অনুজ ও সমসাময়িক কথাসাহিত্যিকদের রচিত সাহিত্যকর্মের স্বাতন্ত্র্য পরিলক্ষিত হতে দেখা যায়। এই পরিপ্রেক্ষিতে শওকত আলীর স্বাতন্ত্র্য ও বিশিষ্টতা নিরূপণ ও উদ্ধারের জন্য আমরা তার সমসাময়িক অগ্রজ ও অনুজ কথাসাহিত্যিকের রচিত সাহিত্যকর্মের সাদৃশ্য ও ঈষৎ সাদৃশ্য পাওয়া উপন্যাসগুলো তুলনামূলক আলোচনায় এনেছি । আমরা পুনর্বিন্যস্ত সারণিতে উল্লিখিত কথাসাহিত্যিকের আখ্যান নির্বাচনকৌশল, চরিত্রায়ন পদ্ধতি, ভাষারীতি, গল্প বলার ভঙ্গি, সামাজিক দায়বদ্ধতা, শিল্প-অভিপ্রায় প্রভৃতির তুলনামূলক আলোচনা করে শওকত আলীর স্বাতন্ত্র্য যেমন তেমনি বাংলা উপন্যাসের প্রেক্ষাপটে তাঁর উপন্যাসের বিশিষ্টতাও নির্ধারণ করার চেষ্টা করেছি। শুধুমাত্র তুলনামূলক আলোচনা করে শওকত আলীর অনন্যতা ও বিশিষ্টতা নির্ণয় হয়নি। লেখকের শিল্পীজীবনের মানসরূপান্তরের প্রক্রিয়া এবং টেকনিক ও ট্রিটমেন্ট নিয়ে আলোচনা করেও কলাকৌশলের নানা দিক অনুসন্ধান করা হয়েছে। বাংলা উপন্যাসের প্রেক্ষাপটে শওকত আলীর উপন্যাস কিরূপ বিশিষ্ট তা নির্ণয়ে তাঁর উপন্যাসগুলোর বিষয়ভিত্তিক বিভাজিত সারণি অনুসরণ করে আলোকপাত করা যায়।
নাগরিক মধ্যবিত্ত চেতনার উপন্যাস
দাম্পত্যসংকট, রিরংসাবৃত্তি, ভোগবিলাস, নিম্নবিত্ত ও উচ্চবিত্তের ভেদ, প্রযুক্তির অভিঘাত, দুর্নীতিচিত্র, নগরায়ণের কুফল ও অস্তিত্ববাদী জীবনদর্শনের রূপায়ণ।
শওকত আলীর নাগরিক মধ্যবিত্ত চেতনার উপন্যাসের সংখ্যা সর্বাধিক। ৩১টি উপন্যাসের মধ্যে উপরিউক্ত শিরোনামে ১৪টি উপন্যাস নাগরিক মধ্যবিত্ত চেতনার। তাঁর রাজনৈতিক চেতনার উপন্যাসগুলোও মধ্যবিত্তের বলয়োদ্ভূত। তবে, চেতনার আধিক্যের প্রেক্ষিতে আমরা সেগুলো রাজনৈতিক চেতনার উপন্যাসের গোত্রভুক্ত করে আলোচনা করেছি। আমরা জানি ষাটের দশকেই শওকত আলীর সাহিত্যাঙ্গনে আবির্ভাব এবং তা মধ্যবিত্ত চেতনার উপন্যাস পিঙ্গল আকাশ দিয়েই শুরু। আমরা দেখেছি বাংলাদেশের ঔপন্যাসিকগণ ষাটের দশকেই নাগরিক মধ্যবিত্ত চেতনার উপন্যাস লেখায় আত্মনিয়োগ করেন। বিভাগোত্তর কালে রচিত উপন্যাসগুলি অধিকাংশই গ্রামীণ প্রেক্ষিতে রচিত হওয়ায় অগ্রজদের সাহিত্যাদর্শ দ্বারা শওকতের এ পর্যায়ের উপন্যাসগুলোর তুলনামূলক আলোচনা করা যায় না। ফলে নাগরিক মধ্যবিত্ত চেতনার উপন্যাস বিচারে তাঁর সমসাময়িক ও সময়ের ব্যবধানে কিছুটা অগ্রজ ও অনুজ কথাসাহিত্যিকের সাহিত্যকর্ম নির্বাচন করতে হয়। এই আলোচনায় আমরা রশীদ করীম, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আব্দুল গাফফার চৌধুরী, রাজিয়া খান, সৈয়দ শামসুল হক, রিজিয়া রহমান ও সেলিনা হোসেনের কতিপয় উপন্যাস আলোচনা বিবেচনায় আনা যায়।
নাগরিক জীবনের ভোগবিলাস, কামসর্বস্বতা ও দাম্পত্য-সংকট নিয়ে লেখা শওকত আলীর উপন্যাসের মধ্যে পিঙ্গল আকাশ, গন্তব্যে অতঃপর, ভালোবাসা কারে কয়, যেতে চাই, বাসর ও মধুচন্দ্রিমা,পতন এক ডাইনীর গেণ্ডুয়া খেলা অন্যতম। এসব উপন্যাসের সমান্তরালে সারণিতে উল্লিখিত যে সব উপন্যাস রচিত তার মধ্যে নাম না জানা ভোর, তেইশ নম্বর তৈলচিত্র, উত্তম পুরুষ, হে মহাজীবন প্রেম একটি লাল গোলাপ, বটতলার উপন্যাস প্রভৃতি অন্যতম।
শওকত আলীর প্রথম উপন্যাস পিঙ্গল আকাশ উত্তম পুরুষে লেখা। এ উপন্যাসের বিষয় ও নাগরিক ক্লেদাক্ত জীবনের রূপাঙ্কনের সমান্তরালে আব্দুল গাফফার চৌধুরীর নাম না জানা ভোর, আলাউদ্দিন আল আজাদের তেইশ নম্বর তৈলচিত্র ও রাজিয়া খানের বটতলার উপন্যাস। এ সব উপন্যাসের বিষয় নাগরিক মানুষের কামপ্রেম, মানসিক স্খলন কামবৃত্তির পাশবিকরূপের অনুপুঙ্খ চিত্রণ। আমরা বিষয় পর্যালোচনা অধ্যায়ে উল্লেখ করেছি শওকত আলীর পিঙ্গল আকাশ-এ উপরিউক্ত বিষয় চিত্রিত হলেও শওকত আলী ভোগবিলাস ও যৌনচেতনাকে আঁকতে অভাজনের জীবনমথিত বেদনাকে প্রকাশের কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেন। উল্লিখিত উপন্যাসগুলোতে একান্তই দাম্পত্য-সংকট ও ফ্রয়েড নির্দেশিত মনোবিকলনের ছায়াপাত ঘটেছে, কিন্তু গ্রিক ট্র্যাজেডির কোন অনুষঙ্গ নেই। শওকত আলী পিঙ্গল আকাশ-এ মধ্যবিত্তের স্বরূপাঙ্কনের পাশাপাশি গ্রিক ট্র্যাজেডির নিয়তিবাদকে তুলে এনেছেন। এ উপন্যাসের চরিত্রগুলো শুধুই নিয়তি কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত নয়- নিয়ন্ত্রিত সমকালীন স্বৈরতন্ত্রের শোষণের কোপানলে।
অপেক্ষা উপন্যাসের বিষয় স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সামগ্রিক চিত্রায়ণ এবং যুবসমাজের স্বপ্ন ও কালক্রমে সে রাজনৈতিক শোষণ-নিপীড়ন ও রাজনৈতিক দলের মধ্যকার দলীয় কোন্দলে তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত। হিসাব নিকাশ ও ঘরবাড়ি উপন্যাস দুটি এই সময়ের অবলোকন ধরা পড়লেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আধিক্য থাকায় আমরা তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক উপন্যাসে আলোচনা করেছি। এই উপন্যাসের সমান্তরালে সরদার জয়েনউদ্দিনের শ্রীমতি ক ও খ এবং শ্রীমান তালেব আলী, রিজিয়া রহমানের ‘রক্তের অক্ষর’ এবং হাসানাত আব্দুল হাইয়ের তিমি উপন্যাসের সাদৃশ্য পরিলক্ষিত। অপরাপর ঔপন্যাসিকগণ যেখানে যুদ্ধোত্তর বিপন্ন বাংলাদেশের ছবি এঁকে ক্ষান্ত হন, শওকত আলী নায়ক সেখানে দিন, মাস বছর অপেক্ষা করতে থাকে শুভদিন ও সাফল্যের জন্য। শওকত আলীর এই বাড়তি বৈশিষ্ট্যারোপ তাঁর স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় বহন করে।
গন্তব্যে অতঃপর উপন্যাসের বিষয় অস্তিত্ববাদ। কিন্তু যৌনকামনার বিকলাঙ্গতা এ উপন্যাসের আবেদনকে নগ্ন করেছে। এরূপ নগ্নতা পিঙ্গল আকাশের সাথে তুলনীয় উপন্যাস ছাড়াও সৈয়দ শামসুল হকের অনুপম দিন- ও খেলারাম খেলে যা-এর মিল পাওয়া যায়। নগ্নতা এইসব উপন্যাসকেন্দ্রিক অনুষঙ্গ হলেও শওকতের এখানে কৃতিত্ব অস্তিত্ববাদ এবং জীবনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে মূর্তায়ন।
যেতে চাই উপন্যাসের বিষয় দাম্পত্য সংকট। নাগরিক জীবনে এই সংকট পারিবারিক ভাঙন ছাড়াও সমাজব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। দাম্পত্য-সংকটকে বিষয় করে লেখা রাজিয়া খানের বটতলার উপন্যাস ও রশীদ করীমের প্রেম একটি লাল গোলাপ উপন্যাসে আমরা এই দাম্পত্য সংকটকে অবলোকন করি- যেখানে মধ্যবিত্তকে উদোম করে দেখার প্রয়াস লক্ষণীয়। কিন্তু যেতে চাই উপন্যাসে মধ্যবিত্তকে খুলে দেখার প্রয়াস থাকলেও শওকত আলী পাত্র-পাত্রীকে পূর্বোজ ঘটনাবলি ভুলে গিয়ে নতুন জীবন ও পরিবার পুনর্গঠনের দুর্মর আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করান। সেলিনা হোসেনের পদশব্দ এই ধারার উপন্যাস।
বাসর ও মধুচন্দ্রিমা, পতন ও জননী ও জাতিকা উপন্যাসত্রয় শওকত আলীর একই প্রেক্ষণবিন্দু থেকে ধাবিত। এগুলোর বিষয়ও নাগরিক জীবনের বিকলাঙ্গ মানসিকতা। রাজিয়া খানের হে মহাজীবন রশীদ করীমের প্রেম একটি লাল গোলাপ এই উপন্যাসগুলোর সমানুপাতিক ভাবে চিত্রায়িত। জোড় বিজোড়, শেষ বিকেলের রোদ উপন্যাস দুটি প্রৌঢ়নায়ক প্রধান। শেষ বিকেলের রোদ ঔপন্যাসিকের রোমান্টিক প্রকাশ। রবি ঠাকুরের শেষের কবিতা-এর সাথে এর বিষয় সাদৃশ্যমান।
মধ্যবিত্ত চেতনার উপন্যাস :
শওকত আলীর ভিন্নতা ও স্বাতন্ত্র্য
অগ্রজ, অনুজ ও সমকালীন ঔপন্যাসিকদের রচিত সাহিত্যকর্মের মধ্যবিত্ত চেতনার উপন্যাসসমূহ তুলনামূলক আলোচনা ও পর্যালোচনা করে কোনো কোনো ঔপন্যাসিকের সাহিত্যকর্মের সাথে শওকত আলীর নাগরিক মধ্যবিত্ত চেতনার উপন্যাসের সাদৃশ্য ও সাযুজ্য পরিলক্ষিত হলেও তাঁর অবস্থান ভিন্ন প্রেক্ষণবিন্দুতে। শওকত আলীর কোনো কোনো লেখায় কোনো একটা বিশেষ বিষয়কে উপন্যাসের বিষয় হিসেবে দেখা গেলেও তাঁর কৌশল মূলত জীবনের সামগ্রিকতা, সেই সাথে অন্তর্বাস্তবতা ও বহিরাঙ্গিক বিষয়গুলোও চিত্রায়ণ করা। নাগরিক মধ্যবিত্ত চেতনার উপন্যাসে তিনি মধ্যবিত্তের স্বরূপ অঙ্কনে যে টেকনিক অবলম্বন করেন তা উপন্যাসের বর্ণনাকৌশলে স্বাভাবিক প্রকাশ মনে হলেও তা নয়। মধ্যবিত্তের অন্তর বাহির উন্মোচন সূত্রে তিনি স্থূলকামরুচিসম্পন্ন, ভোগবিলাসী নৈতিকতাহীন ও উগ্র আধুনিকতা ভাবাপন্ন বিকৃত মানসিকতাদের কটাক্ষ করেন। নিম্নবিত্তের সাথে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের ভেদ, প্রযুক্তির অভিঘাত, নগরায়ণের কুফল, দাম্পত্যসংকট প্রভৃতি এ পর্যায়ের উপন্যাসের প্রকাশকৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সমকালীন কথা সাহিত্যিকগণ যেখানে মাত্রাতিরিক্ত লিবিডো ভাবনা ও নগরজীবনের গতানুগতিক জীবনাচার অঙ্কন করেছেন শওকত সেখানে বিষয় বৈচিত্র্যে সজাগ থেকেছেন। এ ধারার উপন্যাসের চরিত্রায়নে যে মানুষগুলো নির্বাচন করেন সেগুলো মূলত অধিকাংশই ফ্রয়েড নির্দেশিত রিরংসার অনুগামী। এই অনুগামীতা অনেক ক্ষেত্রে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন নি লেখক- জীবনের স্বাভাবিক বিকাশও সেখানে দেখিয়েছেন।
শওকত আলী তাঁর মধ্যবিত্ত চেতনার উপন্যাসগুলো নীতিবাদ বা ধর্মকথা প্রকাশের জন্য লেখেন নি বলে আমাদের প্রতীতি জন্মায়। সাহিত্য ধর্মকথা নয়- নীতিবাদ প্রকাশ করাও তার লক্ষ্য নয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর সাহিত্যে যখন সুন্দর ও কল্যাণই মূর্ত হয়ে ওঠে তখন তা তাঁর নৈতিকতারই অন্যতম প্রকাশ বলে আমরা বলতে পারি। খল, বিকারগ্রস্ত মানুষ ও দালাল চরিত্রের যে রূপ তিনি অঙ্কন করেন, শেষে যে প্রায়শ্চিত্ত দেখান তা সুষম শৃঙ্খলাকেই বুঝায়। ফলত আমরা বলতে পারি, শওকত আলীর নাগরিক মধ্যবিত্ত চেতনার উপন্যাসে বিকৃত, লম্পট ও দালাল চরিত্রের যে আধিক্য তা তাঁর প্রকাশ কৌশলের অন্যতম টেকনিক। ভাষা প্রয়োগে ইংরেজি বাক্যের ব্যবহার উগ্র আধুনিকতা ও উর্দু বাক্যের ব্যবহার হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিকে ইঙ্গিত করেছে এবং চরিত্রের বিকাশকে গতিশীল ও প্রাসঙ্গিক করেছে। পরিবেশ নির্মাণ ও পরিচর্যারীতিতেও একই কথা প্রযুক্ত হতে পারে।
রাজনৈতিক চেতনার উপন্যাস
জাতিভেদ, উদ্বাস্তু সমস্যা, শাসকের শোষণ-নিপীড়ন, হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি, ভাষা আন্দোলন, ’৬৯ ও ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থান, তে-ভাগা আন্দোলন প্রভৃতি অনুষঙ্গে চিত্রায়ণ।
ভারতবর্ষে এক সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব উন্মাদনা সৃষ্টি করে তার ফলে স্বাধীনতা প্রাপ্তির উন্মাদনা পুরো ভারতবর্ষে বিরাজ করে। হিন্দু-মুসলমান মধ্যকার দাঙ্গা সাম্প্রদায়িকতার রূপ পরিগ্রহ করে, উদ্ভূত হয় দ্বিজাতিতত্ত্বের। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হলে ভারতে মুসলমানদের থাকা যেমন নিরাপদ হয়ে ওঠে না, তেমনি পাকিস্তানে হিন্দুুদেরও অবস্থান নিরাপদ হয়ে ওঠে না। এ সময়ে প্রাণরক্ষার্থে অনেক মুসলমান যেমন ভারত থেকে পাকিস্তানে চলে আসে তেমনি পাকিস্তান থেকেও অনেক হিন্দু ভারতে চলে যায়। ফলত দেখা যায়, সাধারণ লোকের মতো বাংলার স্বনামধন্য কতিপয় কবি কথাসাহিত্যিক যেমন হাসান আজিজুল হক, শওকত ওসমান, আবু রুশদ, রশীদ করীম প্রমুখকে ভারত থেকে পূর্ব পাকিস্তানে এসে বসতি স্থাপন করতে হয়। তাঁদের মধ্যে শওকত আলীকেও আমরা খুঁজে পাই।
এইসব কথা সাহিত্যিক জীবনযুদ্ধে স্বভূমি থেকে উন্মূলিত হওয়ার হৃদয়ক্ষত-বেদনাকে অন্তর্লোকে লালন করেছেন ফল্গুধারার মতো। ফলত দেখা যায় শিল্পে, কাব্যের ক্যানভাসে ও কথাসাহিত্যের বিস্তীর্ণ পটভূমিতে তার ছাপ পড়েছে প্রায়শ। আর সে কারণেই শওকত আলীর উপন্যাসেও এই উদ্বাস্তু সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে তাঁর রাজনৈতিক চেতনার উপন্যাসে এই উদ্বাস্তু সমস্যা ও হিন্দু মুসলমান দাঙ্গার বিষয়টি ফুটে উঠেছে প্রবলভাবে। সরদার জয়েনউদ্দিনের অনেক সূযের্র আশা, আবুল ফজলের রাঙা প্রভাত, আবু রুশদের নোঙর, শওকত ওসমানের আর্তনাদ, ও সেলিনা হোসেনের গায়ত্রী সন্ধ্যা প্রভৃতি উপন্যাসেও এই উদ্বাস্তু সমস্যা, বাস্তুভিটা থেকে উন্মূলিত হওয়ার হৃদয়বিদারক বেদনা তীব্রভাবে উঠে এসেছে; তবে শওকতের উপন্যাসে তার একটা আলাদা মাত্রিকতা আমরা পাই।
রাজনৈতিক চেতনা : প্রেক্ষিত অনুসন্ধান ও বৈশিষ্ট্য
আমরা শওকত আলীর রাজনৈতিক চেতনার উপন্যাস লেখার পরিপ্রেক্ষিত অনুসন্ধানে দেখি সামাজিক দায়বদ্ধতা যেমন তাঁকে প্রণোদনা দিয়েছে, তেমনি সহজাত সংক্ষুব্ধতা থেকে এই চেতনা উৎসারিত। আমরা দেখেছি তাঁর রাজনৈতিক উপন্যাসে শুধু রাজনৈতিক চেতনা প্রতিভাত হয় না, শাসকের শোষণ, দালালদের তোষামোদী এবং বিকলাঙ্গরূপ, অন্যায় অনাচারের প্রতিবাদ চিত্রিত। তাঁর সৃজ্য চরিত্ররা ক্ষমতার আসীন হওয়ার আকাক্সক্ষায় কিংবা ক্ষমতায় লোভে রাজনীতিতে জড়িয়ে যায় না। স্বৈরাচারী শাসকের শাসন-শোষণ, নির্যাতন থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রতিবাদ, সংগ্রাম থেকেই তারা উদ্ভূত। ফলত আমরা দেখেছি শওকত আলী আপন বাস্তু থেকে উন্মূলিত হয়ে পাকিস্তানে এসে বসতি স্থাপন করার পরই পাকিস্তান সরকারের নয়া ঔপনিবেশিকতায় ক্ষুব্ধ হয়ে কংগ্রেস আদর্শে পুষ্ট নবগঠিত ‘ছাত্র ইউনিয়নে’ যোগ দেন এবং মিছিল করার প্রাক্কালে পুলিশ কতৃর্ক ধৃত হন। কারাবাসে দীর্ঘদিন অতিবাহিত করতে হলেও রাজনীতি না করার অঙ্গীকারে সরকার ছেড়ে দিতে চাইলেও তিনি রাজি হন না বরং জনৈক জেলারের রাজনীতি করা প্রশ্নে তিনি রাজনীতির সংজ্ঞায়নে যখন বলেন : ‘আমি রাজনৈতিক দলের লোক নই, রাজনীতি করিনি, অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছি।’ (শওকত ২০০৫ : ২১১)। তখন তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ ও প্রাজ্ঞতা আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি।
বাস্তু ত্যাগের বেদনা, সমকালীন শাসকদের শোষণ, শোষিত মানুষের আর্ত হাহাকার তাঁকে অনিবার্যভাবে রাজনীতিসচেতন করে তোলে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমরা তাঁকে রাজনৈতিক উপন্যাস লিখতে দেখি। তাঁর রাজনৈতিক চেতনার রেখাচিত্র অঙ্কনে আমরা দেখেছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে ভারতবর্ষে হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা, তে-ভাগা আন্দোলন, বিভাগোত্তর কালে জাতিগত সহিংসতা, ভাষা আন্দোলন, ষাটের দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ’৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থান, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধোত্তরকালে স্বাধীনতার আদর্শের ভূলুণ্ঠন এবং ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ বাঙালির প্রদোষকালের রাজনৈতিক অনুষঙ্গ চিত্রিত হয়েছে তাঁর উপন্যাসে সামাজিক দায়বদ্ধতার অনুষঙ্গে। বিষয় বৈশিষ্ট্যে তাই শওকত আলী পূর্ণধি। শওকত আলীর রাজনৈতিক চেতনার উপন্যাস ০৮টি। আমরা এ পর্যায়ের উপন্যাসগুলো সারণি-২(ক) মোতাবেক আলোচনা করেছি।
ষাটের দশকে রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে আমাদের দায়বদ্ধ কথাসাহিত্যিকগণ প্রায়শ শিল্প নির্মাণে সচেষ্ট। এ পর্যায়ে আমরা সরদার জয়েনউদদীনের অনেক সূর্যের আশা, আলাউদ্দিন আল আজাদের ক্ষুধা ও আশা, শহীদুল্লাহ কায়সারের সংশপ্তক জহির রায়হানের আরেক ফাল্গুন জহিরুল ইসলামের অগ্নিসাক্ষী, সত্যেন সেনের অভিশপ্ত নগর ও পাপের সন্তান প্রভৃতি উপন্যাস প্রকাশিত হতে দেখি। আবার ষাটের দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে (যা স্বাধীনতার পরে প্রকাশিত) পাই শওকত ওসমানের আর্তনাদ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের চিলেকোঠার সেপাই, সেলিনা হোসেনের গায়ত্রী সন্ধ্যা প্রভৃতি উপন্যাস। একই অনুসন্ধানে এ পর্যায়ে শওকত আলীর কাছেও পাই দক্ষিণায়নের দিন, অবশেষে প্রপাত উপন্যাস।
শওকত আলীর মধ্যে কাহিনীর অনুষঙ্গ হিসেবে অনেক উপন্যাসে যে উদ্বাস্তু সমস্যা ঘুরে ফিরে এসেছে তা নিয়ে লেখা ওয়ারিশ, উত্তরের খেপ, হিসাব নিকাশ, স্ববাসে প্রবাসে অন্যতম। বৈপরীত্য হিসেবে ষাটের দশকের ঘটনানুষঙ্গে দক্ষিণায়নের দিন, অবশেষে প্রপাত, নব্বইদশকের সেনাশাসিত সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সমালোচনা ও শোষিত মানুষের জীবনচিত্রের বয়ান পাই দলিল উপন্যাসে। উভয় পরিপ্রেক্ষিতই রাজনৈতিক।
উপরিউক্ত কথাসাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্মের কৌশল, প্রকরণ ও বিষয়ানুঙ্গ শওকত আলীর সাহিত্যকর্মের সাদৃশ্য যেমন পাওয়া যায় তেমনি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য এবং কৌশলও পরিলক্ষিত হয়।
রাজনৈতিক চেতনা : অনুধাবন ও উপলব্ধি
আমরা শওকত আলীর রাজনৈতিক চেতনার উপন্যাস লেখার পরিপ্রেক্ষিত অনুসন্ধানে দেখি সামাজিক দায়বদ্ধতা যেমন তাঁকে প্রণোদনা দিয়েছে, তেমনি সহজাত সংক্ষুব্ধতা থেকে এই চেতনা উৎসারিত। আমরা দেখেছি তাঁর রাজনৈতিক উপন্যাসে শুধু রাজনৈতিক চেতনা প্রতিভাত হয় না, শাসকের শোষণ, দালালদের তোষামোদী এবং বিকলাঙ্গরূপ ও অন্যায় অনাচারের প্রতিবাদ চিত্রিত। তাঁর সৃজ্য চরিত্ররা ক্ষমতায় আসীন হওয়ার আকাক্সক্ষায় কিংবা ক্ষমতার লোভে রাজনীতিতে জড়িয়ে যায় না। স্বৈরাচারী শাসকের শাসন-শোষণ, নির্যাতন থেকে পরিত্রাণের জন্য প্রতিবাদ, সংগ্রাম থেকেই তারা উদ্ভূত। বাস্তু ত্যাগের বেদনা, সমকালীন শাসকদের শোষণ, শোষিত মানুষের আর্ত হাহাকার তাঁকে অনিবার্যভাবে রাজনীতিসচেতন করে তুলেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমরা তাঁকে রাজনৈতিক উপন্যাস লিখতে দেখি। তাঁর রাজনৈতিক চেতনার রেখাচিত্র অঙ্কনে আমরা দেখেছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে ভারতবর্ষে হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা, তে-ভাগা আন্দোলন, বিভাগোত্তর কালে জাতিগত সহিংসতা, ভাষা আন্দোলন, ষাটের দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ’৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থান, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধোত্তরকালে স্বাধীনতার আদর্শের ভূলুণ্ঠন এবং ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ বাঙালির প্রদোষকালের রাজনৈতিক অনুষঙ্গ চিত্রিত হয়েছে তাঁর উপন্যাসে। এমন বহুবিধ জাতীয় চেতনার অনুষঙ্গে উপন্যাসগুলো রচিত হওয়ায় তা বাংলা উপন্যাস শাখায় বিশিষ্ট হয়ে উঠেছে।
প্রান্তিক ও নিম্নবিত্তের জীবনচেতনাভিত্তিক উপন্যাস
নিম্নবর্গের ধারাবাহিক রূপায়ণ
আমরা দেখেছি ’৪৭ পূর্ববর্তী উপন্যাসের ধারায় নিম্নবিত্ত অঙ্গীভূত হয়েছে অনিবার্যভাবে কিংবা সময়ের প্রয়োজনে। এ পর্যায়ে ঔপন্যাসিকদের মধ্যে আমরা প্রথমেই পাই বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে অতঃপর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, অদ্বৈত মল্লবর্মণ এবং ১৯৪৭ পরবর্তী উপন্যাসের ধারায় শওকত ওসমান, জহির রায়হান, সরদার জয়েনউদ্দিন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শহীদুল্লাহ কায়সার, শামসুদ্দিন আবুল কালাম এবং আবু ইসহাক -এঁদের নাম উল্লেখ করা যায়। বিভাগপূর্বকালে নিম্নবর্গ সাহিত্যে অনুপ্রবেশ ঘটেছে আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায়। কিন্তু বিভাগ-উত্তরকালে এর প্রবেশ ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের সংক্ষুব্ধ মানসিকতা থেকে। এ সময়কালে সৃজ্যমান নবীন পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রে উদ্বাস্তু সমস্যা, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ এবং অস্তিত্বসংকট দেখা দিলে কথা সাহিত্যিকগণ তার প্রতিফলন ঘটান তাঁদের লেখায়। প্রসঙ্গত এ ধারার লেখক হিসেবে শওকত আলীর আবির্ভাব ষাটের দশকে। উপরিউক্ত অগ্রজ কথাসাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্মের সাথে তাঁর সাযুজ্য পাওয়া যায়, আবার কারো কারো সাহিত্যকর্মের সাথে স্বাতন্ত্র্য বা সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। সাদৃশ্য, সাযুজ্য ও স্বাতন্ত্র্য যাই পাওয়া যাক না কেন, শওকত আলী তাঁর সৃজিত কথাসাহিত্যে নিম্নবর্গের জীবন রূপায়ণে শুধুমাত্র জীবনের ট্র্যাজিক পরিণতি দেখান না; শেষাবধি সংগ্রাম ও লড়াইয়ে যবনিকা টানেন। এই কৌশলের প্রক্রিয়ায় তাঁর উপন্যাস বাংলা উপন্যাসে বিশিষ্ট হয়ে ওঠে।
ত্রিশোত্তর কথাসাহিত্যে কিংবা ’৪৭ পূর্ব কথাসাহিত্যে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে নিম্নবর্গের অবস্থান তাতে প্রকৃতির সাথে মানুষের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কসূত্রে চিত্রিত। তিনি তৃণমূলের কথা বলেন প্রকৃতিকে জীবনের সাথে মিশিয়ে দিয়ে সৃষ্টির রহস্য উদঘাটনের চেষ্টায়। পথের পাঁচালী, আরণ্যক প্রভৃতি উপন্যাসে সে চেষ্টাই প্রতিভাত হয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নিম্নবর্গকে অঙ্কন করেন মনোলোকে অবস্থান করে তিনি মানুষের আদিমতম প্রবৃত্তিগুলোর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে নামেন। ফলত আমরা দেখি তাঁর অধিকাংশ উপন্যাসে ফ্রয়েড নির্দেশিত তত্ত্ব আবিষ্কারের চেষ্টা। তবে বহির্জগৎ, গার্হস্থ্যজীবন সমভাবে চিত্রিত হয়েছে মানিকের উপন্যাসে। দিবারাত্রির কাব্য,পদ্মা নদীর মাঝি, পুতুল নাচের ইতিকথা প্রভৃতি উপন্যাসে লেখক তার-ই নিরীক্ষা চালিয়েছেন। অপরদিকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ মানুষের মনের গভীরে প্রবেশ করে সেখানেই অবস্থান নেন এবং মনোবিশ্লেষণ করে রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করেন। চাঁদের অমাবস্যা ও কাঁদো নদী কাঁদো এই দু’টি উপন্যাসে তাঁর সে নিরীক্ষার প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে ভণ্ডামি, গোঁড়ামি ও প্রতারণা তার উপন্যাসে বিষয় হলেও তিনি মূলত অস্তিত্ববাদী জীবনদর্শনে বিশ্বাসী।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, অদ্বৈত মল্লবর্মণ, শওকত ওসমান, জহির রায়হান, সরদার জয়েনউদ্দিন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শহিদুল্লাহ কায়সার, শামসুদ্দিন আবুল কালাম, আবু ইসহাক এবং সেলিনা হোসেন- এঁদের কথাসাহিত্যে মূলত আলোকচিত্রির ক্যামেরায় যেন নিপুণভাবে ধরা পড়েছে জীবন ও সময়। আমরা প্রসঙ্গত বলতে চাই, শওকত আলী অগ্রজ ও সমকালীনদের পথ তো অনুসরণ করেনই কিন্তু অবস্থান নেন ভিন্ন প্রেক্ষণন্দিুতে। এই ভিন্নতাই তাঁর উপন্যাসগুলো বাংলা উপন্যাসে বিশিষ্ট স্থান দখল করেছে। শওকত আলীর তৃণমূলের জীবনচেতনাভিত্তিক উপন্যাস ০৪টি। যথা : সম্বল, নাঢ়াই, উত্তরের খেপ ও মাদারডাঙ্গার কথা। প্রদোষে প্রাকৃতজন এ পর্যায়ে আসলেও বাঙালি ঐতিহ্যের আধিক্য থাকায় আমরা আগেই তা আলোচনা করেছি। তৃণমূলের জীবনচেতনাভিত্তিক উপন্যাসগুলো আমরা আলোচনা করে শওকত আলীর স্বাতন্ত্র্য ও বিশিষ্টতা নিরূপণ করেছি। এ পর্যায়ে দেখা গেছে তৃণমূলের সাথে জীবনঘনিষ্ঠতায় শওকত আলী মৃত্তিকামূলসংলগ্ন মানুষগুলোকে অবিকল চিত্রায়ণ করতে পারঙ্গমতা প্রদর্শন করেছেন।
বাঙালি ঐতিহ্য প্রধান উপন্যাস
প্রদোষকালে অবগাহন ও ব্রাত্য-অন্ত্যজ শ্রেণির জীবনধারা চিত্রায়ণ
বাংলা উপন্যাসে ঐতিহ্য এসেছে জাতিসত্তার অঙ্কুরোদ্গমে, আত্মনুসন্ধানে, পরিচয়ে, গৌরবের অনুষঙ্গে এবং রাজনৈতিক চেতনায়। ’৪৭ পরবর্তী কথাসাহিত্যে ঐতিহ্যচেতনার উপন্যাসের মধ্যে আবু জাফর শামসুদ্দিন, সত্যেন সেন, সরদার জয়েনউদ্দিন এবং ’৭১-উত্তর বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে রিজিয়া রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও সেলিনা হোসেন পারমাঙ্গতা দেখাতে সক্ষম হয়েছে। এ ধারার উপন্যাস রচনায় ঐতিহ্যসন্ধানী লেখক শওকত আলীর অবদানও অনস্বীকার্য। শওকত আলীর ঐতিহ্যপ্রীতি তাঁর সাহিত্যকর্মে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও প্রদোষে প্রাকৃতজন তাঁর ঐতিহ্যপ্রীতির সফলতম নির্মাণ। ওয়ারিশ পূর্ব পুরুষের জীবনাখ্যান হলেও একশতাব্দীকাল পরিসরের বাঙালি জীবন চিত্রিত হওয়ায় রাজনীতি চেতনার সাথে ঐতিহ্যপ্রীতি আংশিক রূপায়ণ ঘটেছে শুধু। মাদারডাঙ্গার কথা-য় তে-ভাগা আন্দোলনের বিষয় ও আধুনিক প্রযুক্তির অভিঘাত ব্যবহারের প্রাবল্য থাকলেও মিথস্ক্রিয়ায় ঐতিহ্যপ্রীতির সন্ধান মেলে। এ দুটো উপন্যাসে ভৌতিক কাহিনী ও অলৌকিক ঘটনা বর্ণনের মধ্যে ঐতিহ্যানুষঙ্গ চিত্রায়িত। প্রদোষে প্রাকৃতজন-র বিষয়ানুঙ্গে কলাকৌশলগত পদ্ধতিসাদৃশ্যে রচিত হয়েছে রিজিয়া রহমানের বং থেকে বাংলা রাহুল সাংকৃত্যায়নের ভোল্গা থেকে গঙ্গা সত্যেন সেনের অভিশপ্ত নগরী, বিদ্রোহী কৈবর্ত সেলিনা হোসেনের নীল ময়ূরের যৌবন প্রভৃতি উপন্যাস। শওকত আলীর ঐতিহ্যপ্রধান উপন্যাসের সংখ্যা ০১ টি। শওকত আলী স্বাতন্ত্র্য অনুসন্ধানে উপরিউক্ত উপন্যাসগুলোর সাথে তাঁর উপন্যাসের তুলনামূলক আলোচনা করে আমরা দেখেছি তিনি গতানুগতিক ঐতিহ্যপ্রীতির স্রোতে গা ভাসিয়ে না দিয়ে অতীতকে সমকালের বলয়ে প্রতীকায়ন করেছেন এবং দেখিয়েছেন রক্তধারায় গ্রথিত চেতনা কাল পরম্পরা চলে জাতির দিকনির্দেশনা দেয়।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক উপন্যাস
নবীন-প্রবীণ সম্মিলন
মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির জাতীয় জীবনে একটি স্মরণীয় গুরুত্ববহুল অধ্যায়। ঔপনিবেশিক কালে রাজশোষণ, পীড়ন ও ক্ষমতার নগ্নরূপ স্বাধীনতাকামী বাঙালিকে অবরুদ্ধ করার প্রক্রিয়া গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দিলে স্বায়ত্তশাসনের দাবি ক্রমে স্বাধীনতার দাবিতে রূপান্তরিত হয়। ফলত মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও চেতনার অকালমৃত্যু নিয়ে নবীন প্রবীণ ঔপন্যাসিকগণ সাহিত্যকর্ম নির্মাণ করেছেন। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রচিত হয়েছে আনোয়ার পাশার রাইফেল রোটি আওয়াত শওকত ওসমানের জাহান্নাম হইতে বিদায়; পরবর্তী পর্যায়ে সেলিনা হোসেনের হাঙর নদী গ্রেনেড শওকত আলীর যাত্রা। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে যাঁরা সাহিত্য নির্মাণে প্রায় অধিক পরিমাণে প্রতিষ্ঠিত তাঁরা স্বাধীনতা পরবর্তীসময় নতুন প্রত্যয়ে সাহিত্য নির্মাণে সচেষ্ট হলেন। এ ধারার মধ্যে রয়েছেন সত্যেন সেন, শওকত ওসমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, সৈয়দ শামসুল হক, রাজিয়া খান এবং রশীদ করীম। এ ধারার অন্যতম লেখক শওকত আলীকেও আমরা শানিত হাতে কলম ধরতে দেখি। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে নবীন লেখকদের মধ্যে আছেন আখতারুজ্জান ইলিয়াস, আবু বক্কর সিদ্দিক, সেলিনা হোসেন, হূমায়ুন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন ও মইনুল আহসান সাবের। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক উপন্যাসে প্রথম পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের মহান আদর্শ ও পরবর্তী পর্যায়ের উপন্যাসে স্বাধীনতার আদর্শেও ভূলুণ্ঠন ও স্বপ্নভঙ্গ দেখান। এই দেখানোর অগ্রজ অনুজ ও সমকালীনদের চেয়ে স্বতন্ত্র। এই স্বাতন্ত্র্য নির্ণয়ের জন্য আমরা দ্বিতীয় অধ্যায়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছি। প্রসঙ্গত বলতে হয় শওকত আলী পূর্বতন ধারার লেখক হলেও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তিনি তাঁর সক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। তাঁর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক উপন্যাস মোট ০৫টি।
অনুজদের মিছিল : শামিল ও একাত্মতা
আশি ও নব্বই দশকে এসেও তরুণ লেখকদের সাথে তুলনায় তাঁর লেখা এতটুকু ম্লান হয় না। বরং একটু বেশি পরিমাণে গ্রহণীয় হয়ে ওঠেন। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ে যে ক’জন তরুণ লেখক আবির্ভূত হন তাদের মধ্যে হুয়ায়ূন আহমেদ, মঞ্জু সরকার, ইমদাদুল হক মিলন, মইনুল আহসান সাবের, আনিসুল হক ও নাসরিন জাহান প্রমুখ রয়েছেন। এ পর্যায়ে শওকত আলীর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক উপন্যাসের মধ্যে আছে ঘরবাড়ি, হিসাব নিকাশ। এ উপন্যাসের গতিরেখার আমরা সৈয়দ শামসুল হকের দ্বিতীয় দিনের কাহিনী ইমদাদুল হক মিলনের রাজাকারতন্ত্র, নিরাপত্তা চাই, দ্বিতীয় পর্বের শুরু মঈনুল আহসান সাবেরের পাথর সময়, পরাজয় ও কেউ জানে না প্রভৃতি উপন্যাস পাই।
সামগ্রিক মূল্যায়ন : রূপাঙ্কন ও চিত্রায়ণ
উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা দেখি, শওকত আলীর মধ্যবিত্ত চেতনার উপন্যাসে বিকৃত মানসিকতার চরিত্রের রূপাঙ্কনের দিকে তাঁর ঝোঁক অপেক্ষাকৃত বেশি। নাগরিক মধ্যবিত্তের মনোলোক উন্মোচনে তিনি ফ্রয়েডিও মনোবিকলন তত্ত্বের দিকে যেমন ঝুঁকেছেন বেশি তেমনি সাধারণ মানুষ কীভাবে নিয়তিরূপ এইসব মানুষের কামনা ও লালসার শিকার হয় তাও দেখিয়েছেন। শওকত আলীর শিল্প-অভিপ্রায় কৌশল কুৎসিত কদাকার চরিত্রাঙ্কন নয়- মুখোশধারী এইসব মানুষের স্বরূপ উন্মোচনসূত্রে তথাকথিত ভদ্রবেশধারীদের কটাক্ষ করা। এইসব উপন্যাসে অবশ্য অভাজনের জীবনমথিত বেদনার শৈল্পিকরূপেও প্রতিচিত্র প্রতিভাত হয়েছে। আমরা দেখেছি শেষ পর্যন্ত মঙ্গল ও কল্যাণই তাঁর উপন্যাসের অন্তিম আবেদন হয়ে ওঠে।
শওকত আলীর রাজনৈতিক চেতনার উপন্যাসগুলোও মধ্যবিত্তের বলয়োদ্ভূত। তবে আমরা লক্ষ্য করেছি বিকৃত মানসিকতার চরিত্রসমৃদ্ধ উপন্যাসগুলো অধিকাংশই নাগরিক মানুষের বিকৃত জীবনাচার। উপন্যাসের চেতনা পরিমাপে আধিক্যের প্রেক্ষিতে আমরা উপন্যাসগুলো বিষয়ভিত্তিক ভাগ করেছি- যা আগেই উল্লেখিত হয়েছে। রাজনৈতিক চেতনার উপন্যাসের কাহিনী নির্বাচনে তিনি শিক্ষিত মধ্যবিত্তের জীবনই নির্বাচন করেন এবং তরুণ সমাজ অর্থাৎ ছাত্ররাজনীতিকেই কাহিনীর বাঁকে জুড়ে দেন। তাঁর রাজনৈতিক চেতনার উপন্যাসগুলোর বড় বৈশিষ্ট্য জাতিভেদ, উদ্বাস্তু সমস্যা, স্বৈরশাসকের কুক্ষিগত ক্ষমতায়ন, শোষণ, অস্তিত্ব সংকট প্রভৃতির শিল্পিত চিত্রায়ণ। এইসব উপন্যাসের শিল্পঅভিপ্রায় শোষণহীন, সুন্দর ও কল্যাণময় একটি সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণ। আর এই নির্মাণের যোগ্য উত্তরাধিকার হিসেবে তরুণশক্তিকে উপন্যাসগুলোর নায়ক হিসেবে নির্বাচন প্রবণতা।
ঐতিহ্যপ্রধান উপন্যাসে শওকত আলী বাঙালির উৎসমুখ সন্ধান করেন। প্রদোষকালের মানুষের জীবনাচারের প্রতিটি দিক অনুপুঙ্খ চিত্রায়ণ করেন। সেই সাথে দেখান সামন্ত-মহাসামন্তের শোষণ, নিপীড়ন ও শোষিতের প্রতিরোধ চেতনা। কাহিনী নির্বাচনে তিনি প্রদোষকালে অবগাহন করেন এবং গবেষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সমকালীন সময়োপযোগী চরিত্র সৃজন করেন- ভাষায়ও কালগত দূরত্ব সৃষ্টি করে ধ্র“পদীরীতির চিত্রায়ণ দেখান।
গ্রামীণ পরিপ্রেক্ষিত ও তৃণমূল মানুষের জীবন চেতনাভিত্তিক উপন্যাসে শওকত আলী নিরালম্ব, অভাজন ও হাভাতে মানুষের জীবন নির্বাচন করেন। তাদের জীবনঘনিষ্ঠ বোধ চেতনা স্বপ্ন ও স্বপ্নের অকাল প্রয়াণ দেখান। মৃত্তিকামূলসংলগ্ন মানুষের ভাষা নির্বাচনে তিনি তাদের জীবনসংলগ্ন ভাষাও অর্থাৎ আঞ্চলিক ভাষাকে প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন। এই হাভাতে মানুষের ক্ষুধা, আশা, নিপীড়ন প্রভৃতি চিত্রায়ণ করতে গিয়ে বিপরীত বিন্দুতে শোষকের রিরংসাবৃত্তি, শোষণচিত্র ও আধুনিক প্রযুক্তির অভিঘাত প্রভৃতি অনুষঙ্গ চিত্রায়ণ জরুরি হয়ে পড়লে ফলত তিনি তা সুষমশৈল্পিক নিরাসক্তিতে অঙ্কন করেন।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক উপন্যাসে শওকত আলী মুক্তিযুদ্ধের প্রাক-প্রস্তুতিপর্বের বর্ণনা দেন এবং প্রতিরোধ চেতনায় উজ্জীবনের বার্তা যাত্রা উপন্যাসের মাধ্যমে জানান দেন। পরবর্তী উপন্যাসসমূহ যেমন অপেক্ষা, হিসাব নিকাশ, ঘরবাড়ি প্রভৃতি উপন্যাসে তিনি স্বাধীনতা-পরবর্তী পর্যায়ের স্বাধীনতার আদর্শ ও আশার ভূলুণ্ঠন দেখান- পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের নিগ্রহণ এবং স্বাধীনতাবিরোধীরাই সরকার কর্তৃক পুনর্বাসিত হওয়ার চিত্র দেখান। চরিত্রায়নে তিনি যুদ্ধে আহত, পঙ্গু ও সবর্স্বহারা মানুষের জীবনই নির্বাচন করেন। তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক উপন্যাসের বড় দুর্বলতা তাতে রয়ে গেছে; কোন উপন্যাসেই রণাঙ্গনের সম্মুখ যুদ্ধের বর্ণনা নেই। সম্ভবত ব্যক্তি অভিজ্ঞতার অভাবেই এমনটি হয়েছে। তবে তিনি ভোলেন না সাহিত্য শুধু কল্পনার ফুলঝুরি কথামালা নয়- জীবনাভিজ্ঞতার শৈল্পিক রূপায়ণ। ফলত তিনি প্রায়শ অতিকথনে যান না- জীবন ও যাপিত সময়ের অভিঘাতে অবিকল জীবনই চিত্রিত করেন। আর এভাবেই শওকত আলী হয়ে ওঠেন অনন্য আর স্বাতন্ত্র্য স্বসৃষ্ট সাহিত্যধারায় আপন স্বরূপে ধন্য।
লেখকের মানস রূপান্তর
কালগত সীমানা নির্ধারণ ও প্রকরণগত নিরীক্ষা
শওকত আলীর উপন্যাসগুলির শ্রেণিবিন্যাসকরণ সূত্রে তুলনামূলক আলোচনায় অগ্রজ সমসাময়িক ও বাংলা সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে শওকত আলীর স্বাতন্ত্র্য প্রতিভাত হয়। শিল্পরচনার দীর্ঘ পরিক্রমায় তাঁর মানসলোক ক্রমরূপান্তর ঘটেছে। শওকত আলীর উপন্যাস অনুপুঙ্খ আলোচনার অনুধাবন ব্যক্ত করা যায়। এই সূত্রে আমরা দেখতে পাচ্ছি তাঁর প্রথম পর্যায়ে রচিত উপন্যাসে আবেগনির্ভরতা, চরিত্রায়নে দুর্বলতা পরিলক্ষিত এবং ঘটনার গাঁথুনিকেন্দ্রিক আবহ থেকে অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন। প্রথম উপন্যাস পিঙ্গল আকাশ-এ আমরা অভাজনের জীবনমথিত কান্নার অনুরণন শুনতে পেলেও উপন্যাসের নায়িকা মঞ্জুর দিনপুঞ্জিই উপন্যাসের আখ্যান হওয়ায় এটি যেমন হয়েছে আবেগনির্ভর তেমনি মঞ্জুর মনের অগোছালো ভাবনাগুলো ঘটনার উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় সংলাপ ও বাক্যের পুনারবৃত্তি ঘটেছে একাধিকবার। ঔপন্যাসিক নায়িকা মঞ্জুর দৃষ্টিকোণের সাথে নিজকে এমনভাবে মেশান যে নিজেই আবেগ সংবরণ করতে ব্যর্থ। ফলে মাত্রাতিরিক্ত আবেগনির্ভরতা উপন্যাসের ভাষাকে করেছে কাব্যময়। চরিত্রাঙ্কনে দুর্র্বলতা থাকায় নায়ক আনিস ব্যর্থময় নায়কে পরিণত হয়েছে। ঔপন্যাসিকের দ্বিতীয় উপন্যাস যাত্রা ক্ষেত্রেও লেখক চরিত্রায়নে উন্নাসিক। ফলত নায়ক রায়হান আনিসের ন্যায় ব্যর্থতম নায়কে অভিষিক্ত। লেখক নির্মোহ থাকতে ব্যর্থ হওয়ায় এ উপন্যাসটিও ঘটনাপ্রধান উপন্যাসে পরিণত হয়েছে। এ দুটি উপন্যাসে লেখক রীতিতে বর্ণনাধর্মিতা পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। কালগত বিবেচনায় আবেগনির্ভর আখ্যান নির্বাচনের পরিসীমা ১৯৬৩ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত উল্লেখ করা যায়।
দ্বিতীয় পর্যায়ের উপন্যাসগুলো শওকত আলীর পরিণত বয়সের রচনা হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই তিনি নির্মোহ থেকে উপন্যাসের ঘটনা বর্ণনা করেন। ফলে আবেগবর্জিত প্রাবন্ধিক ও ধ্র“পদী গদ্যের সন্ধান পাওয়া যায় এ সময়টাতেই। এ পর্যায়ে চরিত্রাঙ্কনে দৃঢ়তা পাওয়া যায়। আখ্যান নির্বাচনে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক ঘটনাসহ মধ্যবিত্তের জীবনাচার নির্বাচন ঘটেছে। ঘটনা বর্ণনায় বর্ণনাধর্মিতা ও বিশ্লেষণাত্মকরীতি উভয়ই অনুসৃত। পরিচর্যারীতিতেও গভীর নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা পরিলক্ষিত হয়। এ পর্যায়ে তিনি মধ্যবিত্তের ক্যানভাসে বিচরণ করে তাদের রূপাঙ্কনেই ব্যস্ত থাকেন; ফলত রাজনৈতিক চেতনার শিল্পসফল উপন্যাস এ পর্বেই রচিত হয় বলে দেখা যায়। কালগত সীমানা ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত উল্লেখ করা যায়। এ পর্যায়ে রচিত উপন্যাসের মধ্যে দক্ষিণায়নের দিন, প্রদোষে প্রাকৃতজন, সম্বল, অপেক্ষা, গন্তব্যে অতঃপর, যেতে চাই, ভালোবাসা কারে কয়, পতন ও বাসর ও মধুচন্দ্রিমা প্রভৃতি উপন্যাস।
তৃতীয় পর্যায়ের উপন্যাসগুলোতে রাজনৈতিক ঘটনার পাশাপাশি আঞ্চলিকতা, প্রযুক্তির অভিঘাত, লৌকিক বিশ্বাস ও তৃণমূল মানুষের জীবন প্রভৃতি অনুষঙ্গ চিত্রিত। চরিত্রায়নে দৃঢ়তা যেমন পরিদৃষ্ট তেমনি উন্নাসিকতাও পরিলক্ষিত হয়। এ পর্যায়ে লেখক অনেকটা ক্লান্ত। ফলে আখ্যান নির্বাচনে অতিসাধারণ ও অনেকক্ষেত্রে টুকরো টুকরো কাহিনীকে নির্বাচন করে উপন্যাসের পটবিন্যাসরীতি অনুসৃত হয়েছে। লেখক এ পর্বে আবেগ নিয়ন্ত্রিত করতে সক্ষমতা প্রদর্শন করেছেন। ভাষা প্রয়োগে আঞ্চলিকতা বিশেষত উত্তরবঙ্গের আঞ্চলিক ভাষা প্রয়োগ দেখা যায়। চরিত্রায়নে প্রৌঢ় চরিত্র নির্বাচন প্রবণতা পরিদৃষ্ট। এ পর্যায়ে শিল্পসফল উপন্যাস যেমন তেমনি শিল্পব্যর্থ উপন্যাস রচিত হয়েছে। শিল্পসফল উপন্যাসের মধ্যে নাঢ়াই মাদারডাঙ্গার কথা, বসত ও অবশেষে প্রপাত অন্যতম। তবে এই উপন্যাসগুলো প্রকাশের কাল থেকে অপেক্ষাকৃত আগের রচনা হওয়ায় শিল্পসফলতা পেয়েছে স্বাভাবিকভাবেই। এগুলোর গঠনকৌশল দৃঢ়, চরিত্রগুলোও বিকশিত এবং ভাষা প্রয়োগে নিরীক্ষাধর্মী বৈশিষ্ট্য আরোপিত। এ উপন্যাসগুলো শওকত আলীর দ্বিতীয় পর্যায়ের উপন্যাসের ন্যায় অনন্য সৃষ্টি বলে বলা যায়। শেষ পর্যায়ের উপন্যাস তনয়ার স্বীকারোক্তি, ঘরবাড়ি, এক ডাইনীর গেণ্ডুয়া খেলা প্রভৃতি নাগরিক মধ্যবিত্তের জীবনাচারের প্রমাণিত দলিল হলেও এগুলোতে লেখকের বিশেষ বৈশিষ্ট্য আরোপের চেষ্টা ক্ষীণ। ফলত প্রদোষে প্রাকৃতজন, দক্ষিণায়নের দিন-র ন্যায় এগুলো তাঁর বিশেষ সংযোজেনের মধ্যে পড়তে ব্যর্থ হয়েছে। সময়ের পরিমিতে এ পর্যায়টির কালসীমা ১৯৯১ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত উল্লেখ করা যায়।
কৌশলগত দিক থেকে শওকত দীর্ঘ পরিক্রমায় বহুমুখিতার নিরীক্ষণ সচেতনভাবে করেননি। মূল প্রতিপাদ্য, পটবিন্যাস, চরিত্রচিত্রণ এবং লেখকের আত্মমুকুর প্রকাশের প্রয়োজনে তিনি কলা-কৌশল নির্ধারণ ও অনুসরণ করেছেন। এর সফলতা বা ব্যর্থতার খতিয়ান আমাদের প্রাক-অন্তিম পর্যায়ে বিবেচ্য বলে মনে করি।
শওকত আলীর উপন্যাসের বিষয়বৈচিত্র্য, আঙ্গিককৌশল, চরিত্রচিত্রণ, পরিচর্যারীতি, ভাষা প্রয়োগে নিরীক্ষাধর্মিতা, কাহিনী নির্বাচন পদ্ধতিতে অভিনবত্ব, গল্প বলার স্টাইল, রীতি প্রভৃতি প্রকরণগত ও পদ্ধতি-কৌশল নিরীক্ষা করে আমরা দেখেছি সমসাময়িক ও বাংলা সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে তাঁর উপন্যাস বিশিষ্ট ও তিনি শীর্ষস্থানীয় লেখকের মধ্যে অন্যতম হয়ে উঠেছেন।