সায়েদাবাদ থেকে চট্টগ্রামগামী বিলাসবহুল বাসে উঠে নিজের সিট খুঁজতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালাম। আমার জন্য নির্ধারিত সিটের পাশের সিটে জানালার পাশে যে বসে আছে, সে কি আমার বহুদিনের পরিচিত নয়? না, না। তাকে আগে কখনো দেখেছি বলে মনে হলো না, তবে সে আজ আমার মনে জাগিয়ে দিলো এক খুব পরিচিত মুখের ছবি, যা আমি অবচেতনেই ভুলতে বসেছিলাম। শেষ কথা হবার ঠিক ছয় মাসের মাথায় ওর অস্তিত্বকে এমন বিলীন আবিষ্কার করে কম অবাক হলাম না। এমনকি কুণ্ঠিত হলাম না নিজেকে গালিগালাজ করতেও।
আমার পাশের সিটে যে বসে আছে, সে এক রূপবতী মেয়ে। দীর্ঘদিনের আক্ষেপ ছিলো: বন্ধুরা সবাই গল্প করে-বাসভ্রমণ কিংবা ট্রেনযাত্রায় রূপবতী মেয়ের পাশে বসে ভাব জমানোর গল্প। আমারই পোড়া কপাল! রূপবতী মেয়ে দূরে থাক, কখনো কোনো মেয়েকে সহযাত্রী হিসেবে পাইনি, এমনকি পাইনি এমন কাউকে, অন্তত যেকোনো প্রক্রিয়ায় যার বৈশিষ্ট্য নারীত্ব। জানতাম দীর্ঘ অপেক্ষায় সৌভাগ্য ধরা দেয় ধীরে ধীরে। এ যেন দীর্ঘ অপেক্ষায় আকস্মিকভাবে পরিপূর্ণ সৌভাগ্য ও সাফল্যের হাতছানি। সৌভাগ্যকে সাফল্যে রূপান্তরিত করতে হয় নিজ যোগ্যতায়। হ্যাঁ, নিজ যোগ্যতায় তার সাথে ভাব জমানোই আমার করণীয় হওয়া উচিত।
তার সাথে তো আমার কথা বলা চাই। কিন্তু কেন বলতে পারছি না? সে মেয়ে, এ বোধ কি আমায় উত্তেজিত নয়, বরং বিব্রত করছে? অসম্ভব কিভাবে বলি? প্রথম অভিজ্ঞতা বলে কথা। তবুও সাহস করে স্বীকার করছি মনের অনুমিত কারণটি। তাকে যেন আমি ওর মাঝে হারিয়ে ফেলেছি।
সে কোলের ওপর মাঝারি সাইজের বইটি নিয়ে নিবিষ্ট চিত্তে পড়ছে; আর আমার মনে পড়ে যাচ্ছে সেই দিনটির কথা যেদিন আমার জীবনে এসেছিলো একজন নতুন মানুষ; একজন শ্রেষ্ঠবন্ধু হিসেবেই গ্রহণ করেছিলাম যাকে। ওর কোলেও ছিলো একটি মাঝারি সাইজের বই, যার মাঝে ও বুঁদ হয়ে ছিলো লাইব্রেরির এক কোণে। সে তো বেশিদিন আগের কথা নয়, যে ঘটনাগুলো বিস্মৃত হবে; এমনকি বিস্মৃত হয়নি ঘটনাগুলোর ছিটেফোঁটাও। হয়তো এসব ঘটনা বিস্মৃত বলে মনে হবে কেবল তখনই, যখন ওর অস্তিত্বকে আমি অস্বীকার করতে পারবো; একজন আত্মপ্রবঞ্চক হিসেবে। আত্মপ্রবঞ্চক না হয়েই বা উপায় কী? ওর স্মৃতি তো আমায় আমায় যুগপৎ যন্ত্রণাদায়ক আনন্দ ও যন্ত্রণা দেয়। এ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব, যদি না ও অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে আমার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতে।
যা বলছিলাম- ও বুঁদ হয়ে ছিলো মাঝারি সাইজের বইটির পাতায়, যা আমার মতো সাহিত্যামোদীকে আগ্রহী করে তুলেছিলো ওর সঙ্গে যেচে কথা বলতে। তা ছাড়া কলেজ জীবনের শুরুটায় আর কাউকে দেখিনি সাহিত্যের বইয়ে এভাবে চিত্ত নিবিষ্ট করতে। তাই সমমনা এক সহপাঠীর সন্ধান পেয়ে তৎক্ষণাৎ ছুটে গেলাম পরিচিত হতে।
‘কী বই পড়?’ উত্তর না পেয়ে বিব্রত হলাম।
‘কী বই পড়?’ হয়তো খেয়াল করেনি এ আশঙ্কায় অভিন্ন প্রশ্ন অভিন্ন ধাঁচেই।
ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তিতে মুহূর্তেই ফিকে হয়ে গেলো আন্তরিকতার রঙ।
‘বোবা কালা নাকি?’ মৃদুস্বরে বললাম প্রস্থানে উদ্যত হতে হতে।
‘বোবাওনা, কালাও না। বোবা কালারা কি বই পড়তে পারে?… ইশ, যদি দুইটা মিনিট পরে কথা বলতি! খুব এক্সাইটিং এক মোমেন্টে তুই আমার মনোযোগটা নষ্ট করলি।’
‘আচ্ছা, আচ্ছা পরে কথা বলব।’
‘মনোযোগ নষ্ট কইরা এখন কাইটা পড়ার মতলব! কথা শুরু করছস, শেষ কইরা যাবি।’
আমি বিব্রত বোধ করছিলাম। না, আমার ওপর ওর অপ্রত্যাশিত দোষারোপে নয়। প্রথম কথোপকথনেই তুই সম্বোধনে যেন দীর্ঘদিনের পুরনো বন্ধুর মতোই কথা বলছিলো ও।
আমার পাশে যে বসে আছে তার সাথে ওর মিল কতটুকু? সত্যিই কি কোনো মিল আছে চেহারায়, নাকি কেবল বই পড়ার সেই ভঙ্গিমায় সাদৃশ্য? দুজনের চেহারায় যেন যথেষ্ট মিল খুঁজে পেলাম।
সে কি ওর আপন বোন, যে ওর চেয়ে দুই বছরের বড়? শুনেছিলাম, ও ওর বড় বোনের ফটোকপি। সে কি সেই মানুষ, যে আমার সঙ্গে ওর দীর্ঘ ছয় মাসের কথাহীন আচরণের জন্য দায়ী? সে কি মেডিক্যাল কলেজে পড়ুয়া সেই মারাত্মক বিপজ্জনক অভিভাবক কিংবা যাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিলো এ পরিচয়ে?
সেদিন অপ্রত্যাশিতভাবে ও এসে বলেছিলো,
‘তোরে বলছিলাম গল্পটা কয়েকদিন পরে দিতে; আপু ঢাকায় যাওয়ার পরে। শুনলি না। ধরা খাইছি, বকা খাইছি, মাইরও খাইছি। তোর সাথে আমার বন্ধুত্ব শেষ।’
‘কী বললি এইটা! বন্ধুত্বের সংজ্ঞা তো এইবার লজ্জায় মাথা কুইটা মরবে।’ বলেছিলাম বজ্রাহতের মতো।
‘সাহিত্য ফলাইস না আর।’
এক বছরের চেয়েও কম স্থায়িত্বের এ সম্পর্ককে আজ ছয় মাস পর আমি কী নামে চিহ্নিত করবো, সন্দিহান।
আজ আমি কি বসে আছি সেই মানুষটির পাশে পরোক্ষভাবে যার প্রতি আমার মনে কাজ করে এসেছে এক ধরণের গভীর ক্ষোভ? হয়তো নিতান্তই অযৌক্তিক সেই ক্ষোভ। কিন্তু আবেগকে খুব কম ক্ষেত্রেই ধরাশায়ী করতে পারে যুক্তি; অন্তত আমার ক্ষেত্রে তাই সত্য।
যে অস্পষ্টতার শিকার আমি তা থেকে আমায় মুক্তি দিতে পারে কথোপকথন। আত্মপরিচয় প্রকাশ করেই হোক কিংবা গোপন রেখেই হোক তার পরিচয় জানার ক্ষেত্রে কথা বলা ব্যতীত বিকল্প কোনো পথ আমি দেখছি না। একজন রূপবতী মেয়ে বলে তার সাথে আমি কথা বলতে চাই এ কথা সত্য তো নয়ই বরং কথা বলাই যখন আবশ্যক তখন এ রূপ যেন এক দৃঢ় বাধা হিসেবেই অবতীর্ণ হচ্ছে। মনে হচ্ছে- যদি ভেবে বসে তার রূপই আমায় তার সাথে যেচে কথা বলার প্রেরণা দিচ্ছে! না, ভাববে না বোধ হয়। ওর বোন যদি হয়েই থাকে তবে তার বৈশিষ্ট্য কি ওর মতো হবে না? ও তো কখনো এভাবে ভাবেনি।
না, আর পারা যায় না। তার কাছ থেকে অস্থিরতা গোপনের উদ্দ্যেশেই পামুকের ‘গু ঘধসব ওং জবফ’ খুলে বসেছি। কিভাবে পামুক উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্রকে উত্তম পুরুষে উপস্থাপন করেছেন, কিভাবে প্রত্যেকের মনের গভীরে প্রবেশ করেছেন, কিভাবে চিনেছেন প্রত্যেককে? আমি তো ওকেই চিনতে পারলাম না বিন্দুমাত্র; আর নিজেকে চেনার লক্ষ্যে তো চালিয়ে যাচ্ছি নিরন্তর প্রচেষ্টা। বুঝতে পেরেছি, নিজেকে চেনার জন্য চাই মানুষের মাঝে বসবাস। বিভিন্ন ধাঁচের মানুষের সঙ্গই নিজেকে চেনার পথ মসৃণ করে। কিন্তু পামুক তো বদ্ধ দরজায় বিশ্বাসী। তবে কি পরস্পরবিরোধী দুটো প্রক্রিয়ায়ও অভিন্ন সমাধান পাওয়া সম্ভব?
যাহোক, অস্থিরতা গোপনের প্রচেষ্টাটি ফলপ্রসূ হলো কিংবা হলো না। আড়চোখে তাকিয়ে তার ভাবলেশহীন মুখ দেখতে পেলাম। এমনকি তার চোখ পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া আড়দৃষ্টি যেন তার ঘন কালো চোখের মাঝে মাঝারি সাইজের বইটির সাদা পাতায় মুদ্রিত ঘনকালো অক্ষরের প্রতিবিম্ব স্পষ্ট দেখতে পেলো। ঘন কালোর মাঝে ঘন কালোর স্পষ্ট প্রতিবিম্ব! মজার তো। পরিস্থিতির এ এক উপহার অথচ উপহার প্রাপ্তির এ মিষ্টি অনুভূতিটিকে দীর্ঘসময় উপভোগ করতে ব্যর্থ হলাম পরিস্থিতিরই চাপে। হয়তো পরিস্থিতিই আমায় হঠাৎ এক অপ্রত্যাশিত প্রশ্নের মুখোমুখি করলো যার মুখোমুখি এর আগে কখনো হতে হয়নি। না নিজের কাছে, না অন্যের কাছে। যে প্রশ্নের মুখোমুখি না হয়েও অবচেতনেই প্রস্তুত করে রেখেছিলাম উত্তর, আকস্মিকভাবে সে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে যেন থমকেই দাঁড়ালাম।
‘সেদিন কেন তুমি ওর সাথে কথা বলতে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলে?’
তারপর আরও কয়েকটি জটিল প্রশ্ন, ‘এটিইকি সত্য নয় যে সেদিনকার সেই আগ্রহ জাগরণে বইয়ের ভূমিকা ছিলো না; বই ছিলো কেবল ওর রূপে মুগ্ধ হয়ে কথা বলার ইচ্ছে পূরণের আশায় উদ্ভূত এক ছুঁতা? তুমি কি আত্মপ্রবঞ্চনার শিকার? নিজেকে যদি তুমি প্রতারিত করেই থাকো, তবে তো ওকেও প্রতারিত করার চেষ্টা করেছো। তুমি কি সফল হয়েছো ওকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলতে, যে ফাঁদের শিকার তুমি নিজেই?’
মনে পড়ে গেলো কিছুক্ষণ আগে কী ভেবেছি; প্রশ্ন জাগলো- ও তো কখনো এভাবে ভাবেনি!- কতটুকু সত্য এ ধারণা কিংবা অনুমান।
ঠিক এ মুহূর্তে এ ধরনের জটিলতায় পড়ার ইচ্ছে নেই বলেই বোধ হয় খুব দ্রুত এ প্রশ্নগুলোর হাত থেকে নিস্তার পেতে চাইলাম; সফল হলামও। এই যুক্তি দাঁড় করালাম এবার-
প্রায় এগারো মাসের খাতির এবং ছয় মাসের কথাহীন সম্পর্ক চলাকালী যে প্রশ্নের সম্মুখীন একবারও হতে হয়নি, সে প্রশ্নে এ মুহূর্তে যন্ত্রণাগ্রস্ত হওয়া নিতান্তই অযৌক্তিক। প্রবঞ্চনাতো একটি সাময়িক ধারণা, যার পেছনে একমাত্র আকস্মিক আবেগই ক্রিয়াশীল।…
এভাবেই মানালাম নিজেকে এবং নতুন উদ্যমে প্রস্তুত হতে থাগলাম সৌভাগ্যকে সাফল্যে রূপান্তরিত করার লক্ষ্যে।
কিছুক্ষণ আগে কুমিলায় প্রবেশ করেছে বাস। অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, তবে এটিই সত্য যে, এখন পর্যন্ত কথা হয়নি পার্শ্ববর্তিনীর সঙ্গে, সারাটি পথ যার দৃষ্ট নিবদ্ধ ছিলো মাঝারি সাইজের বইটির পাতায়। নিশ্চয় তা হুমায়ূন আহমেদের বই। বইটি যে হুমায়ূন আহমেদের লেখা আকস্মিকভাবে এ বিশ্বাস খুব দৃঢ় হয়ে উঠলো। না, এই চিরাচরিত যুক্তিতে নয় যে, কেবল হুমায়ূন আহমেদের বইগুলোতেই এভাবে ডুবতে দেখেছি অধিকাংশ পাঠককে।
তবে কী সেই যুক্তি?
সেদিন ওর মনোযোগ নষ্ট করার পর যখন ওর হাতে আশ্রিত বইটি দেখতে পেলাম, বিস্মিত হলাম ভীষণ। এ বিষয়ে আমার পরিপূর্ণ আস্থা ছিলো যে, বইটি হুমায়ূন আহমেদের না হয়ে যায় না। চিরাচরিত যুক্তিটি যেন সে মুহূর্তে দৃঢ় বিশ্বাসে পরিণত হয়েছিলো; আর তাই বিস্ময়সূচক বাক্যই উচ্চারিত হলো,
‘হুমায়ূন আহমেদের বই না!’
‘ওহ, বাংলা সাহিত্যে কি হুমায়ূন ছাড়া কোনো লেখক নাই! এক প্রশ্ন আর কতো সহ্য হয়! হুমায়ূন আহমেদের লেখা আমার একদম পছন্দ না। যা ইচ্ছা বল এইবার।’
ওকে সমমনা ভেবেছিলাম এই যুক্তিতে যে, ও আমার মতো গভীর মনোযোগে বই পড়ে। কিন্তু খুঁজে পাওয়া অন্য মিলটি ছিলো আশাতীত। বিশেষত সাজুগুজু করা এক বইপড়ুয়া মেয়ের হুমায়ূন আহমেদের লেখা অপছন্দ, এ অপ্রত্যাশিত ঘটনায় আমার মতো তৎকালীন হুমায়ূন-না-পড়া হুমায়ূন নিন্দুকের আনন্দের সীমা রইলো না।
‘আমিও একদম পছন্দ করি না উনার লেখা।’
‘তাইলে ঐ প্রশ্ন করলি ক্যান?’
‘প্রশ্ন করি নাই। ঐ বাক্যে বিস্ময়বোধক চিহ্ন ছিলো। কারণ এইটাই পরিস্থিতির দাবি।’
‘হু, আমার আপুও হুমায়ূন আহমেদের পোকা।’
ওর আপুর প্রসঙ্গ এভাবেই পরিচয়ের প্রথম দিনই উঠে এসেছিলো এবং প্রতিনিয়তই সে উপস্থিত হতো আমাদের নিত্যকার কথাবার্তার ভাঁজে। তাকে দেখার ইচ্ছে সবসময় ছিলো, ইচ্ছে ছিলো তার সঙ্গে কথা বলার। আজ হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে এভাবে তার দেখা পেলাম যখন পূর্বেকার কিঞ্চিৎ শ্রদ্ধামূলক আগ্রহ পরিণত হয়েছে তীব্র বিদ্বেষমূলক আগ্রহে।
ওহ, আমি কিভাবে নিশ্চিত হলাম যে সে ই ওর আপু! না, আমি তো নিশ্চিত হইনি এখনো; অথচ আমার ভাবনার গতিপথ যেন নিশ্চয়তারই জানান দিতে চাচ্ছে।
ওহ, কেন বইটিকে হুমায়ূন আহমেদের লেখা ভাবছি! তবে কি চিরাচরিত যুক্তিতেই জোর দিচ্ছি? নাকি…? এবারকার ভাবনাটি যেন রীতিমত লজ্জিত করছে; নিজেকে নিজের কাছে। তবুও না ভেবে পারছি না।
কী সে ভাবনা?
আচ্ছা, হুমায়ূন আহমেদের প্রতি যেদিন শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়েছিলো সেদিনটি তো খুব বেশি আগের নয়। মাস সাতেক হবে। সাড়া জাগানো সে ঘটনার সাপেক্ষে সাত মাস নিশ্চয় বেশি সময় নয়। একজন লেখকের মৃত্যুতে যদি কেঁদে ওঠে দেশের অন্তত অর্ধেকের বেশি মানুষ, তাঁকে উঁচু মানের সাহিত্যিক বলা না বলা পরের ব্যাপার, উঁচু মানের শিল্পী কি বলা যায় না?
এ জাতীয় ভাবনা মাথায় নিয়েই বলেছিলাম ওকে (যদিও ততদিনে জেনে গেছি ওরও আমার মতো তখন পর্যন্ত হুমায়ূন আহমেদের কোন বই পড়া হয়নি। এখন যথেষ্ট হুমায়ূন-সাহিত্য পড়ার পর ঐসব অপক্ব আচরণ আর অপটু সমালোচনার কথা মনে করে লজ্জামিশ্রিত হাসি পাচ্ছে),
‘এতোদিন ওনার একচেটিয়া বদনাম কইরা গেছি।’
‘এখন তাইলে সুনাম করতে চাস!’
‘না তো কী? উনি কি একজন পরিপূর্ণ শিল্পী না? উনার লেখায় না হয় বিলাস আর….’
‘দোষগুলা সবসময় আলোচনায় আসে। গুণ কী পাইলি বল।’
‘উনার সংলাপগুলা কিন্তু খুব রসপূর্ণ; স্টাইলটা আমারেও মুগ্ধ করে। উনার সামগ্রিক কাজকর্মের দিকে তাকা। চিত্রকর্মগুলা কম কিসে? গানগুলা ভালোই তো, নাটকগুলাও অসাধারণ।…’
‘বুঝছি, বুঝছি। তোর মুখ থেকে এখন খালি হুমায়ূন বন্দনা নিঃসৃত হবে। আমি-তুই-আমরা কিন্তু কখনোই বলি নাই যে হুমায়ূন আহমেদের ভালো সৃষ্টি নাই। আমরা সবসময় সমস্বরে বলছি, উনি এতো বেশি আগাছা সৃষ্টি করেছেন যে সৃষ্ট অতি মূল্যবান শস্যগুলাও ঢেকে গেছে আগাছায়।…’
‘যা ই বল; উনার সঙ্গীত অভিরুচির দিকে তাকা।…’
‘সদ্য প্রয়াত সম্পর্কিত আলোচনা কখনো নির্মোহ হয় না।’
‘কথাটা অবশ্য অযৌক্তিক না।’
‘মনে করছস আমার উক্তি?’
‘কার?!’
‘হুমায়ূন আহমেদরে নিয়া একটা স্মৃতিকথা পড়ছিলাম কালকে। সেন্টেন্সটা ঐখান থেইকা নিছি। লেখকের নাম জানতে চাস তো?…ভুইলা গেছি।’
নিজের কথায় মজা পেয়ে হেসে দিয়েছিলো ও; আর তারপরই বলেছিলো,
‘আপু কালকে সারাদিন শহীদ মিনারে ছিলো। হুমায়ূন আহমেদের কফিন ধইরা আপুর কী কান্না! টিভিতে দেখাইছে ওরে।’
‘সত্যি! দেখি নাই তো। অবশ্য তোর আপুরে তো চিনিও না।’
‘আমি আপুর ফটোকপি।’
‘তাইলে হয়তো খেয়াল করি নাই। পুরাটাই তো দেখলাম। মাঝখান দিয়া হয়তো মিসিং হইছে।…কী ড্রেস পরসিলো?’
‘হলুদ স্যালোয়ার কামিজ। হলুদ শাড়ি পরতে চাইছিলো, কিন্তু ঐসময় হাতের কাছে পায় নাই।’
পাশে বসা নারীটিকে অপূর্ব দেখাচ্ছে হলুদ সালোয়ার কামিজে।
সুতরাং?…
ওহ, কথা বললেই তো হয়।
বাস কুমিল্লা অতিক্রম করে গেলো। এখন তো আমি হয়ে উঠেছি রীতিমত অধৈর্য।
কথোপকথনের অত্যাবশ্যকীয়তা আবারো আবিষ্কার করে কিছুক্ষণ আগে যখন এর জন্য প্রস্তুত করছিলাম নিজেকে, নতুন এক যুক্তি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। এ যুক্তি সৌন্দর্য সংক্রান্ত প্রথম যুক্তির তুলনায় অধিকতর সুনিশ্চিত।
যেহেতু সে বইয়ের মাঝে ডুবে আছে, কথা বলে মনোযোগ নষ্ট করা হবে মারাত্মক অভদ্রতা। অভদ্রতাকে নিশ্চয় স্বাগত জানাবে না সে; বিশেষত ওর বোন যদি হয়। সেদিন যদি ও ভেবেও থাকে যে, আমি ওর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে কথা বলেছি, প্রকাশ করেনি তা।
অথচ মনোযোগ নষ্ট করার প্রসঙ্গে কিন্তু সরাসরিই দোষারোপ করেছিলো। আবার এমনও হতে পারে যে, কথা বলে মনোযোগ নষ্ট করায় ও অখুশি হয়নি, বরং যথেষ্ট আনন্দিত হয়েছিলো ওর রূপে মুগ্ধ হয়ে কথা বলেছি ভেবে।
কেন তবে অভিযোগ?
এটি হয়তো তথাকথিত ভাবমারা।
আজ তার মনের গভীরে যা ই রাখুক না কেন, নেতিবাচক ভঙ্গিমায় সরাসরি আক্রমণ না করলেই চলে। নাটক, সিনেমা ছাড়া কোথাও দেখিনি যে অপরিচিত সুন্দরী মেয়ের সাথে কথা বললে তারা মুখ ঝামটা দিয়ে সরিয়ে বলে, ‘সুন্দরী মেয়ে দেখলেই কথা বলতে ইচ্ছা হয়!’ বই পড়ায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে মনোযোগ নষ্ট করায় আপত্তি জানাতে দেখেছি কেবল ওকেই। তাই বই পড়ার সময় কথা না বলার দিকে এতো মনোযোগ। কিন্তু ওর ক্ষেত্রে যেমন ব্যতিক্রম দেখেছি, তেমনি তারও ক্ষেত্রে যদি ব্যতিক্রম হিসেবে সৌন্দর্য সংক্রান্ত মুখ ঝামটায় যদি হয়ে যেতে হয় নাটক সিনেমার চরিত্র? না, এ আশঙ্কায় বসে থাকা চলবে না। কুলুপ যদি পরে থাকি এ যুক্তিতে, কুলুপ পরেই থাকতে হবে। সৌন্দর্য তো আর এক নিমেষে হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে না। বই কিন্তু একসময় না একসময় মুক্তি পাবে এর প্রতি নিক্ষিপ্ত কড়া দৃষ্টির হাত থেকে। চোখটা কেবল বইয়ের বাইরে যাক একবার!
না, তবুও পারিনি কথা বলতে, যখন সে বইয়ের পাতা থেকে সরিয়ে ছিলো চোখ। যাত্রাবিরতিতে সে বইয়ের পাতা থেকে মুখটি উঠিয়ে একটিবার জানালার কাচ গলিয়ে বাহিরটা দেখার চেষ্টা করে। কিন্তু স্টিকার আচ্ছাদিত জানালা এক্ষেত্রে মোটেই বন্ধুসুলভ আচরণ করে না। তারপর কিন্তু সে দাঁড়িয়েই পড়ে। সে আমায় কিছু বলে না; হয়তো বলতে হয় না বলেই। আমি তো উঠে দাঁড়িয়েছিলাম আগেই। বাসের অন্যান্য যাত্রীর মতো নামাটা যে তারও জরুরি হতে পারে তাইবা আমি ভুলি কী করে?
বিরতির সময় তো সে বইয়ের পাতায় চোখ রাখেনি। তবু কেন কথা বলিনি? কেবল দূর থেকে মুগ্ধ চোখে দেখেছি স্যান্ডোইচের শেষ টুকরাটি মুখে পুরে দেয়া।
পাশাপাশি থাকা অবস্থায়ই কথা বললাম না; এখন কিভাবে কথা বলি বাহিরে এসে? এ কথা ভাবতে ভাবতেই যখন চায়ের অর্ডার দিলাম, দেখি খাওয়া শেষ করে উঠে যাচ্ছে সে; ফিরে যাচ্ছে বাসে।
ভাবছিলাম, তার আগেই নিজের সিটে গিয়ে বসবো; অপেক্ষা করবো তার জন্য। আবারো বইয়ের পাতায় মুখ ডুবানোর আগে কথাটা শুরু করা চাই।…কফির অর্ডার দেয়ার আর সময় পেলাম না!
কফি আসতেই বিল মিটিয়ে না ছুঁয়েই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলাম। যাক, বাঁচা গেলো। এখনো বইটি খুলে বসেনি সে। স্বস্তি উদযাপনে বেশি সময় ব্যয় না করে এখনই কথাটা শুরু করা হোক।
এরপর?!
এ অবস্থা। এখনো কথাহীন।
বইটি সে ব্যাগে ঢুকাতে উদ্যত।
‘বইটা একটু দেখা যাবে, আপু?’ বলেই ফেললাম শেষ পর্যন্ত। পারলাম। যখন পৌঁছে যাচ্ছিলাম হতাশা ও হীনমন্যতার শেষ পর্যায়ে।
কিছু বললো না সে। আমার দিকে তাকালো এমন ভাব নিয়ে, যেন শুনতেই পায়নি কিছু। আমার বাড়িয়ে দেয়া হাতের দিকে বইটি বাড়িয়ে দিয়ে তাকিয়ে রইলো জানালার স্টিকারের দিকে। কী কঠোর অধ্যবসায়!
হুমায়ূন আহমেদের তো নয়ই, বরং তার মন জয় করতে ব্যর্থ হওয়া আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসটির মাঝেই কিনা এতোক্ষণ ডুবে ছিলো সাজুগুজু করা এ ললনা, যে কিনা হতে পারে হুমায়ূনপ্রেমী সে আপুও! অগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর তো পেলাম, গুরুত্বপূর্ণের উত্তর কিভাবে পাই? তার ভাবভঙ্গিমা দেখে তো কথা বলার উৎসাহ বহুদূর ছুটে পালাতে চাচ্ছে।
বইটির পৃষ্ঠা উল্টেপাল্টে দেখতে থাকি অনাগ্রহ সত্ত্বেও। অনাগ্রহ?!
এ কী! …
সে খেয়াল করেনি যে, আমার দৃষ্টি একটি পরিচয়পত্রে নিবদ্ধ, যেখানে লেখা :
ক্যাটাগরি: শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী
আর স্ট্যাম্প সাইজের ছবিটি?
নিশ্চিতভাবেই তার!