পাঁচ
দিন-রাত অবিশ্রান্ত বৃষ্টির তোড়ে বাড়ির আন্ঠা-কাণ্ঠাও পানিতে থই থই করছে। খানা-খন্দক তো আগে থেকেই টই-টুম্বুর। নিচু পাড়ের পুকুর-মাইঠাল ভেসে গিয়ে একাকার। আর মাছের যেন খই ফুটছে। বাড়ির উঠোনে পর্যন্ত মাছের লাফালাফি। এই বৃষ্টির ভেতর একান্তই জরুরি কাজ না থাকলে কেউ ঘরের বার হয় না। একেই বলে ঘনঘোর বরষা। শ্রাবণ যেন শেষকালে পৃথিবীটাকে ডুবিয়ে দিয়ে যেতে চায়।
বৈঠকঘরের বারান্দায় টুলের ওপর বসে একটা বই পড়ছিল মমিন। শরৎচন্দ্রের পণ্ডিতমশাই। ছোট্ট উপন্যাস, বড় গল্প বললেও চলে। বইটা ট্রেনে হকারের কাছ থেকে কিনেছিল। ক্লাসের লেখাপড়া এখনো শুরু হয়নি। বর্ষাভেজা সময় যেন কাটতে চায় না। কাদা-পানিতে যেমন পথ সরে না, তেমনই সময়টাও চলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। আর সকাল, দুপুর, বিকাল সব সমানÑ রোদ নেই এক চিলতেও, যেন সন্ধ্যা ঘনিয়ে থাকে সবসময়। এই যে এখন দুপুর কেবল পেরিয়েছে, জোহরের নামাজ হয়েছে খাণিকক্ষণ আগে, অথচ মনে হচ্ছে যেন সন্ধ্যা নামবে এখনই। অল্প আলোতে বই পড়তে অসুবিধেই হচ্ছে তার। চোখের ওপর চাপ পড়ছে। তবু পড়ছে, কারণ সময় কাটানোর এর চেয়ে ভাল উপায় আর নেই আপাতত।
বই পড়ছে আর মাঝেমাঝে তাকাচ্ছে চারপাশে। সেটা কোনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাপার নয় অবশ্য। কেবল যে বৃষ্টির ঝমঝম রিমঝিম শব্দ হচ্ছে তা তো নয়, ব্যাঙ ডাকছে, কখনো বাতাসের দমকা উঠছে, গাছের ডালপালা গা ঝাড়া দিয়ে উঠছে। কখনো বা কোনো পাখি সড়াত-সড়াত করে ভেজা পাখনা দুলিয়ে উড়ে যাচ্ছে, বা ডালে বসে ডেকে উঠছে। তখন তার দৃষ্টি চলে যাচ্ছে সেদিকে, আপনাপনিই। এভাবে কখনো বই, কখনো বর্ষামুখর প্রকৃতি, মমিনের অলস বিকেল গড়িয়ে চলেছে।
একটা ভেজা কাক কাঁঠালগাছের ডালে বসে বারবার ডাকতে শুরু করল। অগত্যা বই থেকে মুখ তুলে তাকালো মমিন। কাকটা গাছের ডাল ছেড়ে মাটির ওপর বসল। তাকে অনুসরণ করতে গিয়ে তার চোখ পড়ল কাঁঠালগাছের গোড়ায়। বৃষ্টির মাটিধোয়া ঘোলা পানির একটা ¯্রােত বয়ে চলেছে তার পাশ দিয়ে। আর সেই -তের উজানে উঠে আসছে কয়েকটা মাছ। একটা মাছ পানির ¯্রােত ছেড়ে গাছের গোড়ায় উঠে পড়েছে। কৈ মাছ। কানকো বাঁধিয়ে গাছে ওঠার চেষ্টা করছে। তার পেছন পেছন সার বেঁধে উঠে আসছে আরো কয়েকটা মাছ। তাদের পিঠের দাঁড়া পানির ওপরে বেরিয়ে রয়েছে। বইটা উবুড় করে রাখল মমিন। ঘরে ঢুকে ছাতা নিয়ে এলো। তারপর ছাতা মাথায় নেমে গেল নিচে। গোটা পাঁচেক মাছ ধরতে পারে সে। বেশ বড় বড় কৈ। পেকে একেবারে হলদেটে রং ধরেছে। এ মাছ খুব স্বাদের হবে তা বোঝাই যায়। এক সময় ইলিয়াসকে দিয়ে বাড়ির ভেতর পাঠিয়ে দেয় সে মাছ ক’টা।
তার বাড়ির কথা মনে পড়ে। বাড়ির স্মৃতি খুব বেশি নেই মমিনের। সারাটা জীবনই তো তার কেটেছে বাইরে, অন্য জায়গায়। জন্মভূমি গ্রামের কথা তাই তার খুব বেশি মনে পড়ে না। কিন্তু এরকম এক ঘনঘোর বর্ষার কথা সে কখনো ভুলতে পারে না। সেদিন তার মা মারা গিয়েছিল। তখন কতই বা বয়স ছিল তারÑ বড় জোর ছয় বছর। কিন্তু স্পষ্ট মনে আছে তার।
বেশ কয়েকদিন থেকেই অসুস্থতা যাচ্ছিল মায়ের। সংসারে তার দেখভাল করার কেউ ছিল না। বরং তাকেই সবার দেখাশোনা করতে হতো। স্বামীর মৃত্যুর পর নাবালক সন্তানদের নিয়ে সংসার চালাতে হতো তাকেই। মেয়ে তিনটির বিয়ে হয়েছিল মহম্মদ হোসেন মোল্লা বেঁচে থাকতেই। বড় দুই ছেলের বিয়েও তিনি দিয়ে যেতে পেরেছিলেন। কিন্তু বউদের বয়স ছিল কম। প্রায়ই বাপের বাড়ি থাকতো তারা। সংসারের কাজ-কর্মও শিখে উঠতে পারেনি তখনো। ওইদিন দুই বউয়ের কেউই এ বাড়িতে ছিল না। ভাইরা ছিল মাঠে, পাটের জমিতে। মমিনও ভাইদের সঙ্গে ছিল। তার মনটা কেমন যেন আনচান করছিল। কিন্তু ভাইদের ভয়ে কিছু বলতে পারছিল না। একসময় বড় ভাইয়ের চোখ পড়ল তার ওপর। তিনি কম কথা বলেন। তার কথা ছিল খুব নরম। মনটাও ছিল কোমল। ছোট শিশুই মমিন তখনো। এই বয়সে মাঠে কাজ করার কথা নয় তার। তবু তাকে নিয়ে এসেছে তারা। মনে করেছে কাজ-কর্ম শিখুক। মমিনও তাই মনে করতো। কাজ-কামে তার গাফিলতি ছিল না কখনো। কিন্তু তার কোমল মুখে হয়তো ক্লান্তি বা কষ্টের ছাপ পড়ে থাকবে, বড় ভাই বললেন, তুমি বাড়ি যাও, অনেক বেলা হয়িছে। এই ভাইটার একটা স্বভাব, কাউকে তিনি তুই-তুকারি করেন না, তা সে যতই না হোক ছোট কিংবা তুচ্ছ। মমিন তার বড় ভায়ের চেয়ে অন্ততঃ উনিশ-কুড়ি বছরের ছোট হবে। তাকেও তিনি তুমি করেই বলেন। তার কথা শুনে অন্য দুই ভাই চোখ তুলে তাকালেন। ল ভাই একটু হাসিমুখ করে বললেন, যা। মা বাড়িতে একলা আছে। তার উপর আবার তার শরীল ভাল না। মেজ ভাইও বললেন, তোর এখেনে কাম নাই, তুই যা।
সত্যিই তার কাজ নেই। মুনিষরাই পাট কাটছে। ভাইরাও কাটছে। সে-ও একটা-দুটো করে চেষ্টা করছে। পাটের জমিতে এক হাঁটু পানি, তার প্রায় কোমর পর্যন্ত। সে পেরে উঠছিল না।
তখন মাঝে মাঝে হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল। সূর্য ঘন মেঘের আড়ালে। তবু বোঝা যায় বেলা মাথার ওপর ওঠেনি। খুশি মনে বাড়ি ফিরে এলো মমিন। বাড়ির পুকুরে নেমে গা-হাত-পা ধুয়ে নিলো সে।
তাদের বাড়িটা চারদিক দিয়ে ঘেরা। ভিটের উত্তর ঘেঁষে পাশাপাশি দুটো ইটের ঘর দক্ষিণমুখো, তার প্রায় পাশেই, পশ্চিম প্রান্ত জুড়ে পুরনো মাটির দেওয়ালের ঘর দুটো। উঠোনের পুব পাশে উত্তর-দক্ষিণে লম্বা একটা বেড়ার রান্নাঘর। তার দক্ষিণ প্রান্তে ঢেঁকি পাতা। বাকিটা রান্নাঘর। বাড়ির পশ্চিম পাশে বাইরের অঙ্গন। তারপর সড়ক। ওইদিক দিয়ে মাটির ঘর আর পাকা ঘরের মাঝখান দিয়ে বাড়িতে ঢুকতে হয়। এটাই এ পাড়ার দক্ষিণে শেষ বাড়ি। পূবেও ফাঁকা, মানে ফসলের মাঠ। পশ্চিমে সড়কের ওপারে শাহজীদের পুকুর ও বাগান। উত্তরে ইনসান মণ্ডলের বাড়ি। দক্ষিণে পুকুর, সবজির বাগান, তারপর ফসলের মাঠ।
বাড়িতে ঢোকার মুখে ইনসান মণ্ডলের সঙ্গে দেখা। মাঝারি গড়নের এই মানুষটা অসীম শক্তির অধিকারী। আর চরম দুঃসাহসী। সবাই সমীহ করে তাকে। কিন্তু ভারি হাশি-খুশি মানুষ তিনি। দিন-রাত গান-বাজনা, হই-হুল্লোড় করে বেড়ানো তার কাজ। মমিনের ভাইরা সেজন্যে দূর সম্পর্কের এই চাচাতো ভাইটাকে পছন্দ করেন না। লোকটা বংশের বাহির হয়ে গেলো বলে আফসোস তাদের। কিন্তু ইনসান মণ্ডল এই এতিম ভাইদের খোঁজ-খবর রাখার চেষ্টা করেন। মমিনকে দেখে তিনি বললেন, কী রে ভাইডি, কুঁঠে গিইছিলি তুই?
-দাঁড়ের মাঠে।
-পাটের ভুঁয়ে? এই বর্ষণের ভিতর তুমি পাট কাটতে গিইছিলে? কী কাণ্ড দ্যাখোধিনি!
ইনসান মণ্ডল গজরাতে গজরাতে মাঠের দিকে এগোলেন।
মায়ের সঙ্গেই থাকে মমিন। তার পৃথক ঘর হয়নি এখনো। বারান্দায় উঠে মাথা-গা-হাত-পা মুছে কাপড় বদলিয়ে ফেলে। তারপর মনে হয় তার পেটের ভেতর ধাড়ি ইঁদুর ছুটে বেড়াচ্ছে। সকাল বেলা কড়কড়া ভাত খেয়ে বেরিয়েছিল। বেশি খেতে পারেনি সে। খাওয়ার ব্যাপারে ছুঁৎমার্গ আছে তার, সবকিছু সে খেতে পারে না। মাকে দেখতে না পেয়ে সে হাঁক ছাড়ল- মা?
কোনো সাড়া নেই। এই অসময়ে মা আবার কার বাড়ি গেল! এঘর ওঘর দেখেও মাকে না পেয়ে সে কুয়োতলায় গেল। কুয়োটা বেশ বড়। তার চারপাশ পাকা করে বাঁধানো। সেখানেই পড়ে আছে তার মা। মমিনের চীৎকার-চেঁচামেচি শুনে ছুটে এলো ইনসান মণ্ডলের বাড়ির লোকেরা। মাথায় পানি ঢাললো, তবু মায়ের জ্ঞান ফিরলো না। সবাই মিলে ধরাধরি করে ঘরে নিয়ে এলো। দুকড়ি ডাক্তার এসে দেখলেন, কিন্তু কোনো আশা দিতে পারলেন না। পরের দিন দুপুর নাগাদ মারা গেলেন মা। কী যে ঝমঝম বৃষ্টি। মাকে ওই ঘনঘোর বর্ষণের মধ্যেই কবর দেয়া হয়েছিল। কবরের মধ্যে একটা কলাগাছের ভেলা বানিয়ে তার ওপর রাখা হয়েছিল লাশ। পিতৃহীন জীবনে এই মা ছিল তার একমাত্র অবলম্বন ও ভরসা। ভালবাসা। সেই মা এভাবে কিছু না বলে চলে গেলেন। এই দুঃখ, শোক ও বেদনা সে এখনো ভুলতে পারে না। পরে, পড়াশোনা করতে গিয়ে সে জেনেছে প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও একই পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন। তিনিও তার পিতাকে হারিয়েছিলেন মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায়। আর নির্জন মরুভূমিতে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে হারিয়েছিলেন মাকে। নবীর জীবনের সঙ্গে তার জীবনের এই মিল নিয়ে অনেক ভেবেছে সে। ভেবে ভেবে আনন্দ পেয়েছে, সান্ত¡না লাভ করেছে। তবু কখনো কখনো, সেকথা মনে পড়লে বুকটা দুমড়ে-মুচড়ে ওঠে, খুব অসহায় বোধ হয়, মনে হয় এ জগতে সে সম্পূর্ণ একা, তার আপন বলতে কেউ নেই।
-ও মাস্টার সাইব, নমাজ পইড়্বেন না? চলেন।
ইবরাহীম মণ্ডলের ডাকে সম্বিত ফেরে মমিনের। কয়দিনই বা হলো, এর মধ্যেই ‘মাস্টার সাহেব’ হয়ে গেছে সে। সম্মান করেই বলে। এতে একটু লজ্জা লাগে বটে, কিন্তু খারাপ লাগে না।
একটা জোড়াতালি দেওয়া ছাতা মাথায় বেরিয়েছেন ইবরাহীম মণ্ডল। হালকা-পাতলা ছোট-খাট মানুষ, মুখভর্তি মাঝারি গোছের দাড়ি। পরিষ্কার করে কামানো গোঁফ। চুল-দাড়িতে পাক ধরতে শুরু করেছে। এই লোকটাই সম্ভবত এই পাড়ার সবচেয়ে পাক্কা নামাজী। বৈঠকখানার সামনেই মসজিদ, পাঁচ ওয়াক্ত তাদের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ ঘটে, এভাবে এই অসমবয়সী দুজন মানুষের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছে।
বৃষ্টির তোড় একটু যেন কমেছে। বইটা বন্ধ করে মমিন। তখনই বুঝতে পারে তার গাল বেয়ে অশ্রু ঝরছে। দু’এক ফোঁটা অশ্রু বইয়ের পাতার ওপর পড়েছে। তাড়াতাড়ি চোখ মোছে সে।
-হাঁ, আজান দেন চাচা, আমি আসছি।
ইবরাহীম মণ্ডল আর আজিম মণ্ডল দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাই। বাড়িও একেবারে লাগালাগি। সেই সূত্রে তাকে চাচা বলে ডাকে মমিন। তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে পেরে ইবরাহীম মণ্ডলও খুশি। এর মধ্যেই এটা-ওটা ফল-মূল এনে খাওয়েছে সে ভিনদেশী ছেলেটাকে।
আজানের পর খাণিকক্ষণ অপেক্ষা করে ওরা। কিন্তু কেউ আসে না। এই ভরা বর্ষায় কাদা-পাঁক ভেঙ্গে মসজিদে আসা বেশ কঠিনই বটে। তাই অনেকেই হয়তো বাড়িতে বসেই নামাজ পড়ছে। এরকম দিনে সেটা অস্বাভাবিক নয়। অগত্যা দুজন মিলেই আসরের নামাজ পড়ে ওরা।
নামাজের পর মসজিদের বারান্দায় বসে সুখ-দুঃখের গল্প শুরু হয়। এক ওজুতে মাগরিব পড়ে ওঠার মতলব তাদের।
বৃষ্টি কখনো ঝেঁপে নামে, কখনো ফিরফির করে ঝরে। বাতাস পড়ে গিয়েছে। প্রকৃতি যেন ঝিম মেরেছে, যেন গুটিসুটি হয়ে চুপটি করে বৃষ্টির পানিতে ভিজছে। মসজিদের পাশ দিয়ে রাস্তা, কিন্তু পথিক নেই।
মাগরিবের আজানের তখনো বেশ দেরি, যদিও প্রকৃতিতে সন্ধ্যের আমেজ, আঁধার নামি-নামি ভাব, তখন একটা ঘোড়ার গাড়ি এসে থামল মসজিদের সামনে। ত্রিপল দিয়ে ঢাকা খোপ তার ওপর। বৃষ্টি থেকে যাত্রীকে রক্ষা করতে যে এ আয়োজন তা বোঝা যায়। ঘোড়াটা ভিজে একসা। আর মাঝবয়সী কোচোয়ানের মাথায় একটা বড়-সড় মাথাল, গায়ে অয়েলক্লথের মতো একটা কাপড় জড়ানো।
-এ সুময় কে আইলো গো মাস্টার সাইব?
মমিন কোনো জবাব দেয় না। কোচোয়ান তার খোপের ত্রিপলের একটা প্রান্ত তুলে ধরে। তখন খোপের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে এক সুদর্শন তরুণ। তাকে দেখে হইচই করে ওঠেন ইবরাহীম মণ্ডল। -আরে রে রে…, ভিইজি গ্যালে যে! ব্যাটা, দাঁড়াও, আমি ছাতা আনছি।
ছেলেটি যে এ বাড়ির গণ্যমান্য কেউ তা বুঝতে বাকি থাকে না মমিনের। তাছাড়া মুরুব্বি মানুষটাকে কষ্ট দেয়া উচিত হবে না মনে করে ওঠে সে। -আচ্ছা, দাঁড়ান, আমি যাচ্ছি। এরকম ভব্যতা দেখানোর রেওয়াজ তার পরিবার এবং মাদ্রাসা থেকে শিখেছে মমিন। এটা তার অভ্যাসগত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বানরের মতো তিড়িং করে লাফিয়ে উঠে ছাতা নিয়ে ছোটে মমিন। তরুণটি বিস্মিত চোখে তাকায় তার দিকে। কিন্তু দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে তার পাশে ছাতার নিচে দাঁড়ায়। ততক্ষণে ইবরাহীম মণ্ডলও ছাতা মাথায় নেমে এসেছেন। -কুণ্ঠে থেকি আইসছো ব্যাটা? প্রশ্নের উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করে তিনি বলেন, তুমি এক কাম করো ব্যাটা, ওই ছাতা লিই তুমি বাড়িত্ যাও। মাস্টার সাইব আপনে আমার সাথে আসেন।
মমিন তরুণের হাতে ছাতা দিয়ে ইবরাহীম মণ্ডলের ছাতার নিচে এসে দাঁড়ায়।
-বাড়ির খবর সব ভাল, চাচা?
-হ্যাঁ বাপ, সব ভাল। কথা পরে হবে, তুমি অ্যাখুন বাড়িত্ যাও। তুমার গা-গতর তো সব ভিইজি গেইল্ছে।
ত্রিপলের খোপ হলেও বৃষ্টি বোধ হয় তাতে সম্পূর্ণ আটকায়নি। তরুণের জামা-পাজামা কিছু ভিজে গেছে। সে বাড়ির দিকে পা বাড়ায়। তারপর কী মনে করে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে, এডি কে তা তো চিন্নুনি চাচা?
-এডি তুমারে মাস্টার সাইব, বাপ। খুব ভাল ছেইলি। তুমার বাপ জায়গীর রাইখিছে।
মমিনের দিকে আর একবার তাকায় তরুণ, তারপর কিছু না বলে হাঁটা দেয়।
-এডি আজু ভায়ের ছেইলি। ফের মসজিদে ফিরে এসে বলেন ইবরাহীম মণ্ডল। আজু মানে আজিম মণ্ডল। সেটা এতদিনে জেনে ফেলেছে মমিন। তার এখানে আসার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। স্বাভাবিক কারণেই জায়গীর মালিকের পরিবার সম্পর্কে কিছু খোঁজ-খবর নিয়েছে। আজিম মণ্ডলের এক পুত্র। সে-ই তার সন্তানদের মধ্যে সবার বড়। তারপর একে একে তিনটি কন্যা সন্তান। বড় মেয়েটির বিয়ে হয়েছে তা প্রায় বছর আষ্টেক হবে। আর সবাই এখনো অবিবাহিত। -ছুটু দুই ম্যা অ্যাখুনো বি’র লায়েক হয়নি। জানিয়েছেন ইবরাহীম মণ্ডল। ছেলের বিয়ের জন্য মেয়ে দেখা হচ্ছে।
আজিম মণ্ডলের ছেলেকে প্রথম দর্শনেই ভাল লেগেছে মমিনের। বাপের মতোই ধবধবে ফর্শা গায়ের রঙ, আকর্ষণীয় নাক-মুখ-চোখ, একহারা গড়ন, মাথাভর্তি চুল। সব মিলিয়ে খুব আকর্ষণীয়। একটুক্ষণের এই মুআমালাত দিয়ে মানুষকে বিচার করা ঠিক নয়, জানে মমিন, তবু তার মনে হয় লোকটা মোটের ওপর ভদ্র ও বিনয়ী। হয়তো কথা কম বলে।
-না, ভাল। আব্দুল্লাহ আমারে ছেইলি ভাল। আমারে সাথ্ কুনুদিন অসম্মান কইরি কথা বুলে না। কারু সাথেই খারাপ ব্যবহার করে না।
নামটাও চমৎকার, মনে মনে বলে মমিন। বয়সে তার চেয়ে তিন-চার বছরের বড় হবে হয়তো। বন্ধুদের সাথে কলকাতা বেড়াতে গিয়েছিল আব্দুল্লাহ। হায় রে কলকাতা! হুগলিতে থাকার সময় মমিন দেখেছে, কথায় কথায় কলকাতা যায় লোকেরা। তারও খুব সখ হতো। কিন্তু একে তো বয়স কম, একা একা যাওয়া সম্ভব নয়, তার ওপর টাকা-পয়সার ব্যাপার রয়েছে। সেই কলকাতা বেড়িয়ে এলো এত দূর থেকে। বড়লোকের ছেলে বলে কথা।
মাগরিবের সময় বৃষ্টি একটু ছাড় দেয়। তাই দেখেই হয়তো বা আরো তিনজন মুসল্লি যোগ হয়। নামাজের পর সেখানে বসেই গল্প করে ওরা। একেবারে ইশার নামাজ পড়ে যাবে সবাই। ওদের নামাজের মাসআলা শেখায় মমিন। ফাঁকে ফাঁকে নানান জনের নানান গল্প আর কিস্সা।
ছয়
সকালে বৃষ্টির সুমতি হয়েছে দেখে মন ভাল লাগে মমিনের। আকাশভরা মেঘ তখনো, পরতের পর পরত। ওপর দিয়ে বাতাস বইছে। সেটা বোঝা যায় মেঘের ছোটাছুটি দেখে। সব মেঘের একই রঙ- কালো, কোনোটা হাঁড়ির কালির মতো কালো, কোনটা বা খানিকটা হালকা। ছুটে চলেছে সব উত্তরমুখো। হিমালয়ে গিয়ে ধাক্কা না খাওয়া পর্যন্ত থামবে না ওরা। এ কি আত্মহত্যা? কবিরা হয়তো বলবে এ হচ্ছে প্রেমের টান। পিপীলিকা যেমন আগুনে ঝাঁপ দিয়ে মরে, অনেকটা সেইরকম। এসব বিষয়ের ব্যাখ্যা পাওয়া কঠিন। তবে মেঘের ছুটে চলার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে, সেটা জানে মমিন।
ভিতরবাড়ির দিকে হইচই হচ্ছে। কান খাড়া করে মমিন। আজ ভোর থেকেই এরকম থেমে থেমে হট্টগোলের আওয়াজ ভেসে আসছে। কিছু একটা ঘটেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। খানিক পরে ইলিয়াসের কাছ থেকে জানা গেল ব্যাপারটা। মমিনের সকালের নাস্তা নিয়ে এসে সেই কথা পাড়ে।
-বেলা উঠতে না উঠতেই মাইঠিলে নাইমিছে নাপাক শরীলে। অমনি ধইরিছে। জানে না, যে এই মাইঠিলে জ্বিন আছে?
আকবর মণ্ডলের ছেলে মুস্তাকের বউ। তার প্রথম বাচ্চা হয়েছে মাসখানিক আগে। -কিচ্ছু মানে না। ছেলির গু-মুতের ত্যানা-ক্যাঁথা ধুইতে গেইল্ছে আল্লার সকালবেলা।
-তা তো যাবেই। তাতে অস্বাভাবিক কী হলো?
-আমার মুনে হয় কী জানেন, অর উপুর আগে থেকিই জ্বিনের আছর আছে।
-কী করে বুঝলে?
-অর কথা-বাত্রা আর চাল-চলন ওই রকুম।
-কী রকম?
-কী রকুম যেন্। সগলাই জানে।
বর্ষার দিনে কাপড় শুকাতে চায় না। তাই সে সকাল সকালই ছেলের নোংরা কাপড়-চোপড় ধোয়। আজও ঘাটে নেমেছিল। গিয়ে দেখে ঘাটের পাটাতনটা নেই। বহু পুরনো কাঠের পাটাতনটা। বর্ষণে ভেসে গেছে মনে করে আশপাশে তাকাতে গিয়ে সে দেখতে পায় মাইঠিলের একেবারে মাঝখানে ডিঙি নৌকার মতো ভেসে রয়েছে পাটাতনটা। আর তার ওপর শুয়ে আছে অনেকটা মানুষের মতো দেখতে একটা থলথলে জীব। তার দিকে জুলজুল করে তাকিয়ে আছে জীবটা। ভয় পেয়ে চীৎকার করে দৌড় দেয় মুস্তাকের বউ। কিন্তু ঘাট থেকে উঠতে পারে না। জন্তুটা তার একটা হাত লম্বা করে বাড়িয়ে দেয়, চেপে ধরে তার আঁচল। সে ওখানেই ধপাস করে পড়ে গোঙাতে থাকে।
-অ্যাখুন জ্ঞান ফিরিছে। কিন্তু ভুল বইকছে বিড়বিড় কইরি। এই ভাল তে এই খারাপ।
-আশ্চর্য ব্যাপার তো! ও ঠিক দেখেছে?
-ঠিকই দেইখিছে। এই মাইঠিলে এইরকুম একটা জ্বিন আছে। অ্যার আগেও একবার দেখা দিইছিলো।
-তাই নাকি? অবাক ব্যাপার!
-ক্যান, অবাক ব্যাপার ক্যান? আপনে জ্বিন মানেন না নাকি?
-না, কথা তা নয়। …
কথা বাড়ায় না মমিন। এই জ্বিন নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। বিশেষ করে মানুষকে জ্বিনে ধরা বিষয়ে। এ নিয়ে আলোচনা করার মানুষ ইলিয়াস নয়। তাছাড়া এর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।
-ফকির আইস্লে বুঝা যাবে আসল ব্যাপার। ইলিয়াস বলে।
আজ আবহাওয়া একটু ভালর দিকে বলে মনে হচ্ছে। বাইরে বেরবে, মনে মনে ভাবে মমিন। কয়েকদিন হয়ে গেল, সেই যে রাজশাহী কলেজে গিয়েছিলো, তারপর আর বেরনো হয়নি। হাত-পা ঠিসঠিসে ধরে গেছে। মনটাও ভারি আঁকুপাকু করছে। মনে হচ্ছে জেলখানায় বন্দী হয়ে পড়েছে সে। বাইরে থেকে ঘুরে এলে শরীর-মন দুটোই তাজা হবে। গোসল আগেই করে নিয়েছিলো, এখন নাস্তা সেরে কাপড় বের করে। আর তখনই ইলিয়াস ঘুরে এসে জানায়, তাকে ভেতরে ডাকছে।
এই কয়দিনেই জানাজানি হয়ে গেছে যে মমিন মৌলবি না হলেও মাদ্রাসায় পড়া মানুষ, অনেক দোয়া-দরুদ জানে। জ্বিনেরা আল্লাহর কালামের কাছে জব্দ। তাই তাকে দোয়া পড়ে ফুঁ দিতে হবে।
বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে মমিন। মাদ্রাসায় পড়ার কারণে তো বটেই, তার বাড়ির ঐতিহ্যের কারণেও ধর্মকর্মের ব্যাপারে তার ভাল জ্ঞান আছে। কিন্তু ঝাড়-ফুঁক একেবারেই পছন্দ করে না সে। ভাবতা মাদ্রাসার হেড মওলানা বলতেন, কুরআন ঝাড়-ফুঁক দেওয়ার জন্যে নাজিল হয়নি। তাই যদি হতো তাহলে তো নবী আর তার সাহাবারা খালি ঝাড়-ফুঁক করেই বেড়াতেন, ঝাড়-ফুঁক করেই সব অসাধ্য সাধন করে ফেলতেন। কিন্তু তা করেননি। আসল কথা হলো দোয়াও করতে হবে, আবার নিদানের ব্যবস্থাও নিতে হবে। তকদির আর তদবির দুটোই প্রয়োজন।
তবে জানে মমিন, তত্ত্বকথা দিয়ে সব সময় চিড়ে ভেজে না। সুতরাং যেতে হয় তাকে।
মুস্তাকের বউ খুব অল্পবয়সী মেয়ে, হয়তো তের-চৌদ্দ হবে বয়স। পাতলা, একহারা গড়নের ফর্শা মানুষ। কিন্তু তার ফর্শা রঙে কোনো কমনীয়তা নেই। একে ফর্শা না বলে ফ্যাকাসে বলাই ভাল। হয়তো শরীরে রক্ত নেই। সে গিয়ে যখন দাঁড়ালো, ঠিক তার পরপরই চোখ খুললো মেয়েটি। আর তার দিকে তাকিয়েই হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিলো। -ভাইজান, আপনে আইসিছেন? আমাক্ লিই যান। আমি এখিনে থাকপো না। আমাক লিই যান। তার হাত চেপে ধরলো সে।
কিংকর্তব্যবিমূঢ় হওয়ার মতো অবস্থা মমিনের। এইসব জ্বিন-ভুতে ধরা মানুষ সম্পর্কে অনেক রকম কথা শুনেছে সে, কিন্তু চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা এই প্রথম। সে বড় ভায়ের মতো আন্তরিক দরদে তার মাথায় হাত রাখলো।
-আহ, কী শান্তি! আমার লেগি দুয়া করেন তো ভাই, আমি যেন্ ভাল হয় যাই।
তাকে এভাবে বিপদ থেকে উদ্ধার করবে মেয়েটি তা সে কল্পনাও করেনি। সে বললো, হ্যাঁ, হ্যাঁ, দোয়া করবো বলেই তো এলাম। দ্রুত বিড়বিড় করে দোয়া পড়তে লাগলো সে। আয়াতুল কুরসি, দোয়া ইউনুস, আর শেষ তিন ক্কুল সুরা, অর্থাৎ সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক্ক আর সুরা নাস পড়ে মেয়েটির মাথায় আর মুখে ফুঁ দিলো। সে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে দেখলো, মেয়েটি কেমন শান্ত হয়ে ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়লো। মনে মনে সিজদা করে আল্লাহকে শুকরিয়া জানায় মমিন।
সেদিন আবহাওয়া মোটামুটি ভালই গেল। কিন্তু তার আর বাইরে যাওয়া হলো না। কিন্তু সে ভেবে পাচ্ছে না, তাকে মেয়েটি ভাই বললো কেন। তার কথা এবং ভাব-ভঙি দেখে যে কারো মনে হবে তাদের মধ্যে বহুদিনের চেনা-জানা সম্পর্ক আছে। কিন্তু বাস্তবে তো এ জীবনে তার সঙ্গে আজকের আগে কখনো সাক্ষাৎ ঘটেনি। ব্যাপারটা সত্যিই রহস্যময়, ভাবে মমিন।
বিকালে আর একবার দেখতে গেল সে মুস্তাকের বউকে। মেয়েটি তখন লজ্জায় শুয়ে পড়ে আরকি! সে ভাল আছে দেখে তার নিজেরও ভাল লাগে।
(চলবে)