মনে হল পিঁপড়েটা শুভেন্দুর দিকে মুখ তুলে তাকাল, সেও তাকাল, পিঁপড়েটা আবার চিনির ভেতর মুখ দেয়, বোধ হয় মানুষের সাথে মুখোমুখি হওয়ায় পিঁপড়েটা লজ্জা পেয়েছে। হায় মানুষের লজ্জা নেই কেন! শুভেন্দুর স্বভাবটা পিঁপড়েমুখী বাইরের জগৎ নিয়ে তার কোন বারতি কৌতূহল নেই, অন্তরে সবসময় অনন্ত একতারা টংটং করে বাজে, সে সুরে শুভেন্দুর ভেতর চেতনার বুদবুদ তৈরি হয় ক্রমশ। সে প্রতিনিয়ত অন্তর্মুখী হয়ে থাকে ভেতরের জগৎটাকে জানার জন্য, এত অন্তর্জালের ভেতর জড়িয়ে যায় তার ভাবনার জারিত স্বপ্ন। কখন কখন ভাবে জল ময়ূরের ছায়া তার ছায়াটাকে পিষে পিষে খাচ্ছে, মানুষ হওয়ার যন্ত্রণা অনেক। পিঁপড়ে হলে ভালোই হতো এত ভাবনার জগৎ থাকত না, পুনর্জন্মে মানুষ কি কখন পিঁপড়ে হতে পারে? শুভেন্দুর জানা নেই। জানালা দিয়ে বাইরে তাকায় সে খোলা আকাশ, মেঘগুলো ধূসর আলোয় বেগানা বাতাসে চুলের মত উড়ছে, মনটা ভিজে যায়, মনের জানালাটা যেন ভেতর থেকে খুলে যাচ্ছে, খুলে দিল সে; হাট হয়ে খুলে গেল ভেতর বাহির। একাকার হয়ে যাচ্ছে বিধুর বিকেলের ম্লান আলো, কাঁঠাল পাতার ছায়া, সুখ সুখ বাতাসের নেওটা স্বভাব, চিন্তার স্রোত, নির্ভার জীবনের বেসুর আওয়াজ। হঠাৎ ঝনঝন করে শব্দ হলো ঘরে, মিনিবিড়ালটা রান্নাঘরে রাখা এঁটো বাসন ফেলে দিয়েছে, উঠতে ইচ্ছে করছে না। পায়ের কাছে একটা আরশোলা দৌড়ে বুকসেলফের ভেতর আত্মগোপন করল। শুভেন্দু আজ এখন অবধি টিকটিকিটাকেও দেখছে না খাটের উপরের ঠিক ওয়ালের পাশ টাতে, এখন তবে ঘরে আলো জ্বলেনি। শুভেন্দুর চোখে মুখে গোধূলির ম্রিয়মাণ আলো জলছাপ তৈরি করছে, একটা শেষ বিকেলের স্মৃতি চোখের সামনে নাই হয়ে গেল, এ জীবনে আর এই বিকেলটা ফিরে পাবে না সে। শুভেন্দু ভাবছে, সে মানুষ কিনা জানি না কিন্তু নিরন্তর ভেতরে মানুষ হওয়ার চেষ্টা করছে; সত্যিকারের মানুষ যে বড্ড পাগল হয়, কারণ ভেতরটা জলের মত পবিত্র আর পরিষ্কার না হলে, সেখানে দুর্গন্ধ থাকে। জল বয়ে চলে আপন মনে যেথায় তার আজন্ম ঠিকানা, কোথাও ঠাঁই নেই শুধু মাত্র ধেয়ে চলা আপন মনের সুখে। মনে সুখ না থাকলে মন তো কথা বলে না; মন কে কথা বলতে দিতে হয়, তারও তো কথা বলার লোক লাগে। একটা বিষপিঁপড়ে কুট করে শুভেন্দুর পায়ে কামড় দিল; “কি পাপ করলাম আমি, পিঁপড়ের কামড় খেতে হল”! এদিকে আবার ঘুণপোকার উৎপাত খুব বেড়ে গেছে, খাটের মধ্যে শোয়া মাত্রই ওদের কটর কটর শব্দ কানে বাজে। শুভেন্দু বিয়ের পর পরেই এই খাটটা কিনেছিল, সে প্রায় ত্রিশ বছর আগের কথা। শুভেন্দু নিজে অর্ডার দিয়ে সেগুন কাঠ দিয়ে খাটটা বানিয়েছিল। কিছুক্ষণ বন্ধ থাকার পর আবার কটর কটর শব্দ তার নিñিদ্র অবসর প্রহরে ছন্দ পতন ঘটায়; ঘুমটা সবেমাত্র চোখে থিতু হয়েছে। পারমিতা নাকি এই শব্দ শুনতে পায় না, সে বিছানায় শরীর দিলেই গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়। শুভেন্দু ছুটির দিনে ভাত খাওয়ার পর একটা মশলা দেয়া পান খেয়ে সোজা বিছানায় আসে একটু ঘুমের জন্য। সপ্তাহের এই দিনটা বাইরে হাজার কাজ থাকলেও সে যায় না। জানালা খোলা, পর্দা দাপাদাপি করছে বাতাসে। দেখতে দেখতে জীবনটা প্রায় ফুরিয়ে যাচ্ছে, আর মাত্র দুই বছর আছে তার চাকরির তারপর পিআরএল এ যেতে হবে, তারপর সংসার কিভাবে চলবে ইত্যাদি ভাবতে থাকে শুভেন্দু চোখ বন্ধ করে। শুভেন্দুর চিন্তায় আবার ঘুণপোকারা হানা দেয়। দৌড়াতে দৌড়াতে জীবনটা প্রায় শেষ হয়ে গেল, কখন নিজের দিকে তাকানোর অবসর পেল না সে, সংসারের অভাব সবসময় তাকে তাড়া করেছে। ঘুণপোকাদের দোষ কি! জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই এই ঘুণে ধরা সংসারের ঘানি টানতে টানতে আজ সে ক্লান্ত। চোখে আবার ঘুম জড়িয়ে আসতে চায় শুভেন্দুর, মাথার ওপর সিলিং ফ্যানটাও মাঝে মাঝে ঘটঘট শব্দ করে। একটা দিন এভাবেই কাটলো তার। পারমিতা তার সংসারে মনপ্রাণ ঢেলে খেটেছে একটু সুখ আর স্বচ্ছন্দের জন্য। সন্ধ্যায় চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে জানালার কাছে গিয়ে বাইরে তাকায়, দিগন্ত শূন্যতায় মাখামাখি, মেঘ আছে আকাশে, বৃষ্টির ঠিকানা সেখানে স্পষ্ট। পাশের ঘরে আশি বছরের বাবা জয়দীপ গোস্বামী খক্খক্ করে কাশে, দম নিতে কষ্ট হচ্ছে বোধ হয়। বাবার ওপর খুব রাগ শুভেন্দুর, মানুষটা জীবনে একটু কষ্ট করলে তার জীবনটা অন্যরকম হতে পারতো কিন্তু তা তিনি করেননি। সমস্ত জীবন তিনি নিজের কথা আর আনন্দ ফুর্তি করে কাটিয়েছেন। যৌবনে যা উপার্জন করেছেন তা তিনি সংসারের জন্য খরচ করেননি বরং নিজের ব্যক্তিগত ভোগ বিলাসে ব্যয় করেছেন। শুভেন্দুর মা গত হয়েছেন আজ প্রায় বিশ বছর হলো। ফুলের মালা দিয়ে দরজার চৌকাঠের ওপরে ঝুলিয়ে রাখা পরমা দেবীর ছবির দিকে তাকায় শুভেন্দু, মা নেই কিন্তু বাবা দিব্যি আজও বেঁচে আছেন। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে এক সময় সংসারের সব দায়ভার গ্রহণ করেছিল শুভেন্দু। মায়ের সব স্মৃতিগুলো এখন তার বুকে জ্বল জ্বল হয়ে আছে, তার শূন্যতার ঘ্রাণ ভীষণভাবে তাকে জীর্ণ করে তোলে। মা-বাবার বড় সন্তান শুভেন্দু ছাত্র হিসেবে খুব ভালো ছিল, পরে তার আরও দু’টি বোন হয়; সুকন্যা আর সুলেখা। বাবা জয়দীপ গোস্বামী গোড়া থেকেই ছিল সংসারের প্রতি চির উদাসীন। জয়দীপ গোস্বামী বিয়ের পর থেকেই ছিল পরস্ত্রীর প্রতি আসক্ত, পরমাদেবী দেখতে তেমন সুশ্রী ছিল না কিন্তু মানুষ হিসেবে তার গুণকীর্তন এখন মানুষ করে। এক সময় জয়দীপ গোস্বামী মদ খেয়ে মাতাল হয়ে রাতে বাসায় ফিরত, পরমাদেবী কিছু বললে তার গায়ে হাত তুলতো স্বামী। সেই থেকে শুরু হলো অশান্তির সংসার। শুভেন্দুর কৈশোরটা আট-দশটা ছেলের মত ছিল না, পরমাদেবী ছেলেকে বুকে জড়িয়ে কাঁদতো। সেই ছেলে বেলা থেকেই নিজের অজান্তে জন্মদাতা পিতৃদেবের প্রতি তার অশ্রদ্ধা ও ঘৃণা বুকের মধ্যে জমা হতে থাকে। মেট্রিক পরীক্ষা পাস করার পর কলেজে ভর্তি হয়েই শুভেন্দু টিউশনি শুরু করলো, ততদিনে সুকন্যা আর সুলেখা হাইস্কুলে উঠে গেছে। নিজের পড়াশুনা টিউশনি এসব ব্যস্ততা নিয়েই যৌবনের শুরুতে শুভেন্দু বুঝতে পারলো জীবনটা কত কঠিন! জয়দীপ গোস্বামী তখন ঠিকমত সংসারে টাকা পয়সা দিত না, পরমাদেবী বাসায় সেলাইয়ের কাজ শুরু করলো। সুকন্যা আর সুলেখা মাকে স্কুল থেকে এসে সেলাই ফোঁড়াই কাজে সাহায্য করতো। একটা নির্লিপ্ত যৌবন কাল কাটিয়েছে শুভেন্দু, লক্ষ্য ছিল কোন রকমে গ্র্যাজুয়েশনটা কমপ্লিট করে সংসারের হাল ধরবে মায়ের মুখে হাসি ফোটাবে। অনার্সে ফার্স্টক্লাস পেয়েও এমএটা কমপ্লিট করতে পারেনি শুভেন্দু, প্রথমে বেসরকারি একটা কোম্পানিতে চাকরি নিয়ে ছিল, সারাদিন গাধার পরিশ্রম করে রাতে বাসায় এসে সরকারি চাকরির জন্য পড়াশুনা করতো। সেই সময় এক বছরের মধ্যে অনেক ধারদেনা করে সুকন্যা আর সুলেখাকে বিয়ে দিয়েছিল। ভাল পাত্র পাওয়ার পর পরমাদেবী আর দেরি করতে চায়নি, হয়তো তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সংসারে তিনি আর বেশি দিন বাঁচবেন না। দুটি বোনের বিয়ের জন্য যে লোন হয় তা শোধ করার জন্য শুভেন্দু সরকারি চাকরি পাওয়ার পরেও রাতে টিউশনি করতো। পরমাদেবী ছেলেকে বুকে টেনে বলেছিল তোর মত ছেলে যেন প্রতি মায়ের ঘরে ঘরে জন্মায়। আমি আশীর্বাদ করছি বাবা জীবনে তুই অনেক বড় হবি, জীবনে তোর কোন দিন অভাব হবে না। পারলে তোর বাবাকে ক্ষমা করে দিস। সংসারে সব মানুষ সমান হয় না। মায়ের কথা ভাবতে ভাবতে শুভেন্দুর চোখে জল চলে আসে, বুকের ভেতর দীর্ঘশ্বাসটা আবার সর্বস্ব পুড়িয়ে দেয়। শুভেন্দুর সংসারে এক ছেলে এক মেয়ে, মেয়েকে বিয়ে দিয়েছে আজ প্রায় দশ বছর হলো, ছেলে পরমব্রত বিয়ে করেছে তিন বছর আগে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে পরমব্রতের ছেলে হয়। পরমব্রত ম্যানেজমেন্টে পড়াশুনা করে এখন একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করছে, বাবার সংসারে তেমন টাকা পয়সা দেন না, যে টাকা উপার্জন করে তা নিজের আর বউয়ের বিলাসিতার পিছনে খরচ করে। পরমব্রত বাবার মত দায়িত্বশীল নয়, কিছুটা ঠাকুরদার চরিত্র পেয়েছে। পরমব্রতের স্ত্রী মৌপিয়া সুন্দরী আধুনিক কিন্তু ঘরকন্যায় সে উদাসীন, নিজের রূপ চর্চা নিয়েই দিনের অধিকাংশ সময় ব্যস্ত থাকে। মৌপিয়া তার শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি কোন দায়িত্ব পালন করে না, এমনকি তার একমাত্র ছেলে ঋত্বিকের যতœও সে ঠিকমত নেয় না, সব দায়িত্ব যেন ঠাকুরমা পারমিতাদেবীর। শুভেন্দু জানে তার মৃত্যুর পর ছেলে পরমব্রতকে অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে হবে, কেননা বাস্তবতাকে সে সবসময় এড়িয়ে চলতে চায়। জীবনের জটিল চক্রে বাবা তার এতদিন কাছে ছিল পাশে ছিল, বাবার মৃত্যুর পর পরমব্রত ঠিক বুঝতে পারবে বাস্তবতা কিভাবে সব কিছু গ্রাস করে। শুভেন্দু দুশ্চিন্তা আর উৎকণ্ঠায় থাকে ছেলেকে নিয়ে, তার অবর্তমানে ছেলের কী হবে! পাশের রুমে গভীর রাতে ঋত্বিকের কান্না শুনে শুভেন্দুর ঘুম ভেঙে যায়, দুধের শিশুটা এতক্ষণ ধরে কাঁদছে অথচ মৌপিয়া বা পরমব্রতের কোন সাড়া শব্দ নেই। মশারির ভেতর থেকে আবছা অন্ধকারে মেঝেতে পা রাখে শুভেন্দু, দাদুভাইয়ের কান্না শুনে তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে, তার রক্তবীজের দ্বিতীয় প্রজন্ম, বেঁচে থাকার স্বপ্ন ও জীবনের ট্রানজিশন। শুভেন্দু অনেকক্ষণ ধরে দরজায় কড়া নাড়িয়ে ডাকাডাকি করলে তবেই পরমব্রত ও তার স্ত্রীর ঘুম ভাঙে। হয়তো দীর্ঘ সময় ধরে সহবাসের পর এই গভীর ঘুম খুব স্বাভাবিক কিন্তু শিশুপুত্রের কথা মাকে অন্তত খেয়াল রাখা উচিত ছিল। শিশুর চিৎকারে মৌপিয়া খুব বিরক্ত কিন্তু মুখে কিছু বলে না ছেলেকে থামানোর চেষ্টা করে সে। দাদুভাই ঋত্বিকের জন্য শুভেন্দুর বুকে একটা মায়ানদী তৈরি হয়েছে; নদীটা ক্রমশই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। অফিস থেকে ফিরেই শুভেন্দু ঋত্বিককে কোলে তুলে নেয়, আপন মনেই কথা বলে পরম ¯েœহ মাখা কণ্ঠে। এ যে রক্তবীজের খেলা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, সম্পর্কের সংমিশ্রণ আত্মসমর্পণের প্রতীকাশ্রয়। শুভেন্দু সন্ধ্যার পর শহরতলির বাজারে এলে স্কুল বন্ধু জয়নাল তালুকদারের সাথে দেখা হয়ে যায়, সে আজ অনেক উঁচু তলার মানুষ। জয়নাল তালুকদার ছুটি পেলেই নিজের জন্ম শহর মানিকগঞ্জে ছুটে আসে অসুস্থ মাকে দেখার জন্য। সে সরকারের অতিরিক্ত সচিব, বর্তমানে শিল্প মন্ত্রণালয়ে কর্মরত আছে। স্কুল বন্ধুকে সাথে নিয়ে জয়নাল তালুকদার একটা বেঞ্চের ওপর বসে নদীর পাশে, যে নদী তাদের কৈশোর ও যৌবনের অনেক স্মৃতির সাক্ষী হয়ে আছে। ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত তারা একই কলেজে পড়তো এবং এই নদীর ধারে দেবদারুর ছায়ায় আড্ডা দিত, কত সুন্দর ও স্বপ্নময় ছিল সেই সময়গুলো। শুভেন্দুর জীবনের সমস্ত টানাপড়েন জয়নাল তালুকদার জানে। বন্ধুর কাঁধে হাত দিয়ে জয়নাল একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
-তবুও তুই সুখী, সার্থক। আমার মত হতভাগা নস তুই। আমি বাবার স্নেহ ভালোবাসা এই জন্মে কিছুই পেলাম না। জন্মেও তিন বছরের মাথায় বাবা মারা গেল। নিজের সংসারে আজ অবধি কোন সন্তান এলো না। অথচ তুই এখন বাবার সেবা করছিস, শুনলাম পরমব্রতর নাকি ছেলেসন্তান হয়েছে। তুই দাদা হয়েছিস। এই এক জীবনে আর কী চাস। আমি সেই তুলনায় রিক্ত, আমার শূন্যতার অন্ত নেই। তোর ভাবী এই অন্তহীন শূন্যতা নিয়ে অনেক বিলাপ করে..বয়স হয়েছে..
শূন্যতার ছায়াটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে জাফর তালুকদারকে গ্রাস করে, তার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয় শুভেন্দু, সত্যি জীবনের লেন দেন বড় অদ্ভুত। সংসারে একেক জনের একেক রকম কষ্ট, অথচ শুভেন্দু সারা জীবন সরকারি ছা-পোষা চাকরি করে হাপিত্যেশ করছে। এক সময় সেও যোগ্য ছিল বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে আমলা হওয়ার কিন্তু সংসারের বাস্তবতার যাঁতাকলে তার সেই স্বপ্ন পিষ্ঠ হয়ে গেছে। এখন সেই কষ্টের দাগ রয়ে গেছে অন্তরের নিখাদ অন্ধকারে। যৌবনে শুভেন্দু স্বপ্ন দেখতো, একবারের জন্য হলেও জীবনে অ্যারোপ্লেনে উঠবে; দূর দেশে যেতে না পারলেও অন্তত কলকাতা যাবে। স্বপ্নটা এখন স্বপ্নময় ছায়া তলে চাপা পড়ে গেছে হাজার দায়িত্ব আর সংসারের পিছুটানে। সংসারের জন্য উপার্জিত টাকা ব্যয় করে প্লেনে ওঠার মত সামর্থ্য কিংবা সাহস দুটোর কোনটাই আজ শুভেন্দুর নেই। শুভেন্দু প্রসঙ্গ পাল্টালে জয়নাল তার সাম্প্রতিক বিদেশ ভ্রমণের গল্প বেশ জমিয়ে বললো বন্ধুকে। এই চাকরি জীবনে অনেক দেশ ভ্রমণ করেছে জয়নাল তালুকদার, সেই স্বপ্নময় গল্পগুলো গোগ্রাসে গিলতে থাকে শুভেন্দু। জোছনা উঠেছে আকাশে, মনের ভেতর আর্তনাদ তৈরি করে জীবনের অপূর্ণ ইচ্ছেগুলো। নদীর জলের ওপর চাঁদের জল জোছনা অলীক ভাল লাগায় রূপান্তরিত হয়, অতীতকে মনে করে। তবুও জীবন বড় মধুময়, দুই বন্ধু স্বপ্নডানায় ভর করে অতীতের বাতিঘরে পুরনো স্মৃতিগুলো খুঁড়ে খুঁড়ে দিকশূন্য গন্তব্যে যাত্রা শুরু করলো। একটাই জীবন দেখতে দেখতে ফুড়–ত করে শেষ হতে চললো। শুভেন্দুর জীবনের অপ্রাপ্তিগুলো জয়নালের কষ্টের তুলনায় অতি নগণ্য তবুও কত কিছুই তো করার ছিল এই জীবনে। সব কিছুর মাঝে ঋত্বিকের কথা মনে পড়লেই শুভেন্দুর মন মূহূর্তে ভালো হয়ে যায়।
জয়নাল একদিন আমার বাসায় চল দাদুভাইকে দেখবি কেমন রাজপুত্রের মত দেখতে হয়েছে।
আজ নয় শুভেন্দু, আগামী মাসে আসলে অবশ্যই যাব, সঙ্গে তোর ভাবীকেও নিয়ে আসব, ও প্রায় তোদের কথা বলে।
ঢাকা থেকে মানিকগঞ্জ বেশি দূরে নয়, জয়নাল অফিসের পাজেরো গাড়িটা নিয়ে এসেছিল। শুভেন্দুর বাজারে একটু কাজ আছে, সে দাদুভাই আর বাবার জন্য অষুধ কিনবে, অষুধের মার্কেটটা বাজারের পশ্চিম দিকের উল্টো গলির মাথায়। জয়নাল চলে গেলে সে দিকেই হাঁটতে থাকে শুভেন্দু। পরমব্রত বন্ধুদের সঙ্গে সিলেটের জাফলং গেছে বেড়াতে। তিরতির করে বৃষ্টি পড়ছে, বাজার থেকে বিশ মিনিটের হাঁটা পথ হলো শুভেন্দুর বাড়ি। মেইন বাজার থেকে অনেকগুলো গলির ভেতর দিয়ে তাকে যেতে হয়, রিকশায় ঘুরে গেলে বিশ টাকা ভাড়া লাগে। দ্রুত ঔষধ কিনে সে গলির মুখে হাঁটা দেয়; বৃষ্টি জমিয়ে আসার আগেই তাকে বাসায় পৌঁছতে হবে। দ্বিতীয় গলির আবছা অন্ধকারে নেড়ি কুকুরের সঙ্গে ধাক্কা খেলে ঘেউ ঘেউ করে উঠে জন্তুটি। ইলেকট্রিক পোলের বাতিগুলো টিমটিম করে জ্বলছে, কয়েকটা বোধ হয় ফিউজ হয়ে গেছে। কোথাও যেন হালকা বাতাসে টিনের চালের পুরাতন জং ধরা ছাউনি ঘরং করে উঠলো; ঝনঝন শব্দে এলোমেলো দাপাদাপি করছে টিনগুলো। ঘামে শরীরে জামাটা লেপ্টে আছে, একটা সাইকেল ক্রিং ক্রিং বেল দিয়ে ভুঁশ করে গলির রাস্তা পার হলো। অষুধের প্যাকেটটা শুভেন্দু বুকের কাছে তুলে ধরে, বড্ড দেরি হয়ে গেল। জয়নাল তালুকদারের সাথে কথা বলতে বলতে সময় যে কেমন করে ফুরিয়ে গেছে সে বুঝতেই পারেনি। শুভেন্দু যখন বাড়ির চৌকাঠে পা দিল, সেই মুহূর্তেই বৃষ্টির বড় বড় দানা তাণ্ডব শুরু করলো। শুভেন্দুর পাকা টিনশেড বাড়িতে খই ফোটার মত বৃষ্টির শব্দ ছন্দের জাদুতে মায়া তৈরি করছে। পুরাতন গামছা টেনে শুভেন্দু মাথার ভেজা চুল মুছতে থাকে। ছেলের পায়ের শব্দ পেয়েই জয়দীপ গোস্বামী একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে অষুধের কথা জিজ্ঞেস করলো ঘরের ভেতর থেকে। শুভেন্দুর হাত মাথার ওপর থেমে যায়, বাবার ইনহেলারের কথা সে বেমালুম ভুলেই গিয়েছিল সে, এমনটা তো হবার কথা নয়। দাদুভাইয়ের অষুধের কথা তো তার ঠিকই মনে ছিল, তবে কি সংসারে মানুষের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে তার আর কোনো মূল্য থাকে না প্রিয়জনের কাছে। নিজেকে বড্ড অপরাধী লাগে শুভেন্দুর। সে রাতে ছাতা নিয়ে বৃষ্টিতে বাবার অষুধের জন্য বাজারে যেতে চাইলে, পারমিতা স্বামীকে বাধা দেয়।
– তোমারও তো বয়স হয়েছে, এতরাতে বৃষ্টিতে ভিজলে তোমার শরীর কি ঠিক থাকবে।
প্রচণ্ড শীত অনুভব করে শুভেন্দু। বিছানায় শুতে গিয়ে ভেতরটা খচ্খচ্ করছে বাবার অষুধের জন্য। বৃষ্টি যেন ঢেলে ঢেলে পড়ছে পাহাড়ি ঝর্ণার মত। বালিশে মাথা রাখতেই শুভেন্দু হঠাৎ ঘুণপোকাদের কটর কটর শব্দ শুনতে পেল; ভ্রম নয়তো। বৃষ্টির ঘ্রাণ বিচিত্র আর্তনাদ তৈরি করলে শুভেন্দুর ভেতরটা শূন্যতায় মাখামাখি হয়। জীবন বড় স্বার্থপর বিষাদের অন্তিম শ্বাসে অন্ধকার ধরে রাখে মায়াগর্ভে। ঘুমের বীজ কুয়াশার ভেতর চলে গেছে। বেদনার রাতে শুভেন্দু স্বপ্ন দেখে অ্যারোপ্লেনে চেপে সে আকাশে মেঘের দেশে ভাসছে, ছুটে চলছে অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে পেছনে ফেলে রেখে প্রিয়ভূমি, প্রিয়জন্ম ভিটা, স্বজন আত্মীয় পরিজন…নাড়ির টান..পটপট করে ছিঁড়ে যাচ্ছে সম্পর্কের সুতোগুলো। আজন্ম লালিত স্বপ্ন তার স্বপ্নের ভেতর একটা প্রশস্ত রাস্তা তৈরি করে; যেভাবে একটি পুংরেণু বৃক্ষের পুষ্পে অনাগত বীজের জন্য একটি স্বপ্ন দেখে অনন্ত দীর্ঘ নক্ষত্রের শেষরাতে। একটা অদৃশ্য পিঁপড়ে শুভেন্দুর সমস্ত শরীরে হেঁটে বেড়াচ্ছে, কুট কুট করে কামড় দিচ্ছে অসহ্য লাগছে তার। শুভেন্দু অন্ধকার বারান্দায় বাবা জয়দীপ গোস্বামীর ঘরের দরজার সামনে দাঁড়ায়; টিনের চালে ঝম ঝম বৃষ্টি পড়ছে, ভেতরের শব্দ শোনা যাচ্ছে না…শুধুই বৃষ্টির শব্দ। “আজ রাতে বাবার মৃত্যু হলে সে জন্য দায়ী থাকবে সে” শুভেন্দু মনে মনে ভাবছে; সে ছাতি নিয়ে অন্ধকার উঠোন পেরিয়ে বাড়ির টিনের তৈরি সদর দরজা খুলতে থাকে, হয়তো মোড়ের মাথায় মতিমিয়ার অষুধের দোকানটা খোলা আছে। শুভেন্দুর মনে হতে থাকে সে যেন সংসার সে পালিয়ে অন্য আর এক অদৃশ্য জগৎ সংসারে প্রবেশ করছে … যেখানে কোন পিছু নাই নেই, বন্ধন নেই.. শুধুই মুক্তি..মুক্তির আলো!