সুকুমার রায় (১৮৮৭-১৯২৩) এর কবিতা আলোচনা প্রসঙ্গে সম্প্রতি পুষ্কর দাশগুপ্ত লিখেন, ‘মানসিকতার দিক থেকে বাংলা কবিতা আজও রবীন্দ্র-যুগ পার হয়ে বেশি দূর এগোতে পারেনি; একদিকে রাবীন্দ্রিক রোমান্টিকতার জগৎ আর অন্য দিকে রবীন্দ্রনাথ তার কবিতা আর গানে ব্রাহ্ম-ভিক্টোরিয়া মানসিকতা থেকে শব্দ-ব্যবহার আর বাগ্-বিধির যে ভাষিক প্রাচীর তৈরি করে গেছেন তা ভেঙে বাংলা ভাষার কবিতা নতুন উচ্চারণের সন্ধান পায়নি। ফলত বাংলা সাহিত্যের বিশেষত কবিতার ভাষা পরিশীলিত কৃত্রিম সাহিত্যের ভাষায় পরিণত হয়েছে। …আজও সেই অবস্থাটা খুব একটা পাল্টায়নি।’র বলা বাহুল্য, পাল্টানের প্রচেষ্টা থেমে নেই। এ ধারায় অনেকটা অগ্রগামী বাংলাদেশের অগণিত স্বতঃস্ফূর্ত কবিতাকর্মী। কবি কমরুদ্দিন আহমদ (১৯৬৫-) তাদেরই একজন। এঁরা কৃত্রিম সাহিত্যিক বাংলার বেড়া ডিঙিয়ে প্রজন্মের প্রাকৃত ভাষা কিংবা নিজ নিজ অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা তথা মাতৃভাষার সুধা পানে পরিতৃপ্ত ও সুগঠিত করে তুলতে চাইছেন নিজেদের কাব্য-ভাষা। রণেশ দাশগুপ্ত যথার্থই বলেন, ‘কবিতার ভাষা মূলত মাতৃভাষা। এই মাতৃভাষারই অপর নাম সংশ্লিষ্ট কবির দেশ বা অঞ্চলের লোকভাষা। এই সত্য শুধু লোকগীতিতেই প্রযোজ্য নয়, এ সত্য আধুনিক কবিতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।রর কাজেই পল্লীর প্রকৃতি আর লোকভাষা নিয়েও এঁরা আধুনিক কবিতা সৃষ্টিতে সক্রিয়-সমুজ্জ্বল।
কমরুদ্দিন আহমদের প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ শহর ছেড়েই যাবো (২০০৬)। বইটির প্রথম কবিতায় কবির সাবলীল ঘোষণা:
‘রাখাল ছেলের বাঁশির ধ্বনি
বনের মাঝে সোনার খনি
গাঁয়ের মেয়ে কলসী কাঁখে পড়ে যাওয়ার ভাণ
জাগলো আমার প্রাণ।’ (জাগলো আমার প্রাণ)
এভাবে কবি জেগে জেগে ওঠেন। সকলেই কবি নয় কেউ কেউ কবি হয়। বাঁশখালীর পল্লী-প্রকৃতি তাকে সকল সাধারণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে বাউল বিবাগী করে তোলে। কিশোর কমরুদ্দিন দিনে দিনে কবি কমরুদ্দিন হয়ে ওঠেন। কিন্তু কোথায় এবং কী সে জাদুর কাঠি ? মনে পড়ে হাসান আজিজুল হক এক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘কথাসাহিত্যে পেয়েছি বাংলাদেশের গ্রামের স্থির চিত্র, দুঃখ বা সুখের; গ্রাম হারানোর বিলাপ, শহর-জীবনের প্রতিতুলনায় গ্রামের নিশ্চিন্ত নির্ভয় কোটরগত জীবনযাপনের মোহ। উন্মূল শহরবাসীকে গ্রাম সম্পর্কে এমনিই স্বপ্ন তৈরি করে রাখতে হয়। বাস্তব থেকে তা যতই দূরে হোক না কেন।’ররর আমাদের কবি কমরুদ্দিনের গ্রাম কিন্তু শুধু সেই স্বপ্ন নয়, ফেলে আসা স্মৃতিও নয়; তার গ্রাম আর শহর যেনো নদীর এপার ওপার। ফলে তার কবিতায় যেনো ধ্বনিত হয় সেই রাবীন্দ্রিক পঙক্তি: ‘নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস / ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস’। তাইতো কাব্যগ্রন্থের নামকবিতায় কবির স্থির সিদ্ধান্ত:
‘শহর ছেড়েই যাবো নারীর কাছে
উজান ভাটির টানে শঙ্খের পাশে,
চিল শালিকের দেশে আমার জীবন
গ্রাম-বন-কালুমাঝি অতি প্রিয়জন।
ধানের শীষ, শিশির, বুকভরা শ্বাস,
সবুজের রঙে ভরা মাঠের আকাশ।’
কিন্তু কবিতো আধুনিক নাগরিক সভ্যতার দ্বিপদ প্রাণী। সভ্যতার সঙ্কটকে তিনি এড়াতে পারবেন না, এটাই স্বাভাবিক। নগর যন্ত্রণা তাঁকে যন্ত্র-জালে বেঁধে রাখে। কিন্তু রোমান্টিক কবি মনকে রোখে, কার সাধ্য। তবে কবির সে রোমান্টিকতাও স্বকীয় অতীত-অহঙ্কার আর ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে কাব্যিক রূপ লাভ করে:
‘তোমাকে হারালে-নারী,
পৃথিবীর তাবৎ পুরুষ
যক্ষ হয়ে ঠেলে যায়- শ্যামল মেঘের ভেলা।’
(কবিতার সংসার)।
ক্লান্ত কবি তাই ‘বিমুগ্ধ বেদনায়, শান্তি’ খোঁজেন আর অকস্মাৎ অন্তরের অকৃত্রিম আকাক্সক্ষা অনায়াসে আওড়ান তাঁর কাব্যভাষায়:
‘মিলনের পরিবর্তে আমি চাই বৈরী ভালোবাসা।
বিরহের উপলব্ধি ভালোবাসার প্রকৃত ভাষা।’
(বৈরী ভালোবাসা)
বৈরী বাতাস মুখের প্রকৃত ভাষা বদলে দিতে পারে হয়তো বা; কিন্তু সেই যে পল্লীকবি জসীমউদ্দীন লিখেছেন: ‘পরানের ব্যথা মরে নাকো, সে যে জেগে উঠে ক্ষণে ক্ষণে’। ক্ষণিকের জন্য হলেও তাই কবি কমরুদ্দিনও স্মৃতিকাতরতায় কাতরান, পাঠককে নস্টালজিক করে দিতে চান; এবং করে দেনও, যখন লিখেন:
‘ধীরলয়ে হাঁটবো দু’জন, বুনোপথে
শ্যামল ক্যাম্পাসে। …
এক জোড়া রুগ্ণ পায়রা পাখা ঝাপটায়,
হৃদয় শঙ্খের তীরে।’ (অপূর্ণ ইচ্ছার ভেলা)
অপূর্ণতা আর অনতিক্রম্য নাগরিক জীবনের চাকচিক্যময় প্রসাধনী এবং প্রকৃতির পানে ছুটে যাওয়ার এই টানাপড়েন; সেও এক ট্র্যাজেডি। এই ট্র্যাজেডির রসকে আরও প্রগাঢ় করতেই যেনো ট্র্যাজেডি রিলিজ কৌশল হিসেবে হাস্যরসের আনন্দ নিয়ে হাজির হয় স্বরবৃত্তের নৃত্য:
‘গুণ করতে লিখতে পারেন
“তিন চারে নব্বই,”
দশ লিখতে কী চমৎকার
“একের পিঠে দুই”
কানে শোনা শব্দ নাচে
মেকি ঝিলের জলে,
হৃদয় গ্রাহ্য ভাবকে নিয়ে রঙ্গ ব্যঙ্গ হলে।’ (স্বরবৃত্তের নৃত্য)
তারপর আবার বেদনা, আবার দুঃখ, আছে কষ্টও। তবু কষ্টের মাঝেও আস্তিত্বের আনন্দ কি অস্বীকার করা? সে আনন্দই কবি নিজ হৃদয়ের রসে সিক্ত করে উপস্থাপন করেন তাঁর সহৃদয় কাব্য পাঠকের সম্মুখে:
‘শঙ্খ নদী শঙ্খ নদী তোমায় নিয়ে কষ্টে আছি
তবু তোমার বুকের ওপর ডিঙ্গি চড়ে ঢেউয়ে নাচি। …
শঙ্খ তুমি জন্ম থেকেই বাঁশখালীর দুঃখ।’ (বাঁশখালীর দুঃখ)
এভাবে কষ্টের কর্ষণ করতে করতেই কবি নিজেকে গঠন করেন, তৈরি করে নেন। দুঃখের মধ্যে থেকেই নিজেকে চেনেন, অবগত হন আত্মপরিচয় সম্পর্কে। পাঠককে এবার তাই তার ভালোবাসার পরিচয় তুলে ধরেন:
‘আমার ভালবাসা পর্বতকে শিক্ষা দেয় দৃঢ়তা,
স্বচ্ছ করে ঝর্ণার জল,
চৈত্রের খরায় বর্ষণ করে বিষ্টি,
পুরাতনের জীর্ণতাকে ধ্বংসের অনিবার্যতা
দান করে বৈশাখী ঝড়।’ (বৈশাখী ঝড়)
নিজেকে চেনার জ্ঞান হলে কেউ আর বোকার স্বর্গে বাস করতে পারেন না। উন্নয়নের জোয়ারে নিরুদ্দেশ ভাসতে পারেন না; গড্ডালিকা প্রবাহে গড়িয়ে যেতেও পারেন না। কবি কমরুদ্দিন তাই উন্নয়ন ও সভ্যতাকে দেখেন বুলেট-আহত বটঘুঘু হয়ে:
‘বন্ধ্যা দেয়াং পাহাড়
রক্তিম মাটির স্তূপ
ধীরে ধীরে ই.পি.জেট হবে…
ঊর্ধ্বে তার নীলিমা নীরব।
জনবহুল আধুনিক নগর
কোথাও মানুষ নেই,
যান্ত্রিক পুতুল নাচে
প্রগতির চর্ম সার্কাসে।’ (আহত বটঘুঘু)
তবু কবিতো আর দূরের পাখি নন, আমাদের সমাজেরই একজন। সুতরাং এ সমাজের পঙ্কিলতা মাদকতা তাঁকেও স্পর্শ করে। সংসারের মদিরা পান করতে তাকে মিশতে হয় সমাজের সাথে: ‘আমি দ্যাখি-/ জলসাঘরে মাতাল খদ্দরের চোখে’। পাঠক জেনেযান তাঁর দর্শন:
‘বেস্যার কাঁচুলি বিহীন মাংস গোলক
ঝুলন্ত বিশ^বিদ্যালয়লব্ধ শিক্ষা,
সার্তের অস্তিত্ববাদী দর্শনের নির্লজ্জ প্রয়োগ।’
(জলে ভাসা পরিন্দা)
আমরা জানি কবি মাত্রেই দার্শনিক-ভাবুক। তবে আধুনিক কবির ভাবনা অবশ্যই সমকালীন সমাজকেন্দ্রিক। সমাজ-সচেতন কবি নিজ-দর্শনের দৃঢ়তা নিয়ে তাই সহৃদয় পাঠকের উদ্দেশে তাঁর সচকিত প্রশ্ন ছুড়ে দেন:
‘মূল্যবোধ বিবর্জিত
তথাকথিত শিক্ষকের কাছে
ছাত্র-ছাত্রীরা কী শিখবে?’ (জলে ভাসা পরিন্দা)
এমন সামাজিক অবক্ষয়ের আঁচ অনুভব করেও কবি কখনো কল্পনা-বিমুখ বাস্তববাদী হয়ে উঠেন না। কবির রোমান্টিকতা, প্রেমময়তা, উপমা-কবিত্ব আর ঐতিহ্য-প্রীতি একাকার হয়ে পাঠকের কাছে ধরা দেয়-যখন তিনি লিখেন:
‘ময়নামতি জাদুঘরে তোমাকে পেলাম
নারী মূর্তির পাশে দাঁড়িয়ে;
দেখলাম,
তোমার রূপ কষ্টিপাথরের মূর্তিকে হারমানায়।
নিখুঁত নারী শিল্পে পরিয়েছি-
খয়েরি গাঁদার জামদানি শাড়ি,
খুঁজে পাবে ঘাস ফড়িংয়ের গায়ে।
খোঁপায় মাধবীর মালা,
হাতে শঙ্খের বালা আর জাপানি ঘড়ি।
দু’খানি আশ্চর্য সুন্দর চৈনিক পা,
যার পাশে সাজানো পূজার অর্ঘ্য,
প্রণমি তোমারে প্রিয়তমা।’ (হৃদয়ে জাদুঘর)
এমন আর্য-মিথের সার্থক ব্যবহার সমকালীন বাংলা কবিতায় বিরল বলেই আমাদের মনে হয়। অধ্যাপক ড. আজাদ বুলবুল যথার্থই মন্তব্য করেন, ‘শহর ছেড়েই যাব শিরোনামে এক স্বতন্ত্রকণ্ঠ কাব্যপ্রয়াস কমরুদ্দিনকে আলাদা সত্তায় অভিসিক্ত করেছে। নাগরিক যন্ত্রণাক্লিষ্ট যাপনের দুর্বিষহ বোধ কবিকে তাড়িত করে প্রতিনিয়ত। মাটি-গন্ধ ভরা নোনাজলের শৈশবকাল, পাহাড়-টিলা, চাবাগান আর সাঁওতালী মহুয়া অরণ্যের অমোঘ ছোঁয়া না পেয়ে কবির মগজ-মনন যেন বন্ধ্যা হয়ে পড়ে।’রা অধ্যাপক ড. আহসান সাইয়েদ মনে করেন: ‘ভাব, বক্তব্য গতানুগতিকতা বর্জিত বলেই তাঁর কবিতা পাঠকের হৃদয় আকর্ষণ করে প্রথম ধাক্কায়। শৈলীও আয়ত্ত করেছেন চমৎকার।’ অবশ্য ‘সুন্দর মাইয়্যা’, ‘হেজায় হায় মূলা কেতি’ প্রভৃতি চট্টগ্রামী আঞ্চলিক ভাষায় রচিত কবিতায় উচ্চারণানুগ বানানের ব্যবহার বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়।
প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের সাত বছর পরে আরও পরিণত প্রাজ্ঞ কবির কাব্যগ্রন্থে পাই তাঁর সাকিন, তাঁর গন্তব্য। কেননা তাঁর হৃদয় যে সেখানেই প্রোথিত। এরই মধ্যে সবুজ সুখের পুলক (২০০৬) এবং বিষাদের ভাসানে জলজ ঘাতক (২০০৭) নামে আরও দু’টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হলেও, এবার তাঁর কাব্যগ্রন্থের নাম হৃদয় শঙ্খ তীরে (২০১৩)। গ্রন্থের প্রথম ফ্ল্যাপেই কবি জ্যোতির্ময় নন্দী ঘোষণা করেন: ইতোমধ্যে কমরুদ্দিন আহমদ নিজস্ব কাব্যস্বর নির্মাণে দ্যুতি ছড়িয়েছেন। এ গ্রন্থের প্রথম কবিতাতেই কবিকে বলতে শুনি:
‘শঙ্খের ঢেউয়ে তরল সোনা
বাঁশপাতার ফাঁকে ক্ষতবিক্ষত ষোড়শির মুখ
নয় কোন ঝলসানো রুটি
রূপকথার বট বৃক্ষ
চরকা কাটা বুড়ি
শ্রী রাধার বড়াই
কাউকে দেখি না
কেবল তোমার মুখ জোছনা ছড়ায়।’ (পূর্ণিমার চাঁদের বৃত্তে)
গ্রন্থের নামকবিতায় বর্ণিত হয়েছে মানবমনের চিরন্তন দার্শনিক অভিব্যক্তি-‘যাহা চাই তাহা পাই না, যাহা পাই তাহা চাই না’। রবীন্দ্রবাক্যের এই অতৃপ্তির ক্রন্দন মানুষের আজন্ম; তাইতো কবির আক্ষেপ:
‘না পাওয়া আমার ভেলা হয়ে ভাসে
জীবন নদীতে
রঙধনু গ্রীবায় বিষন্ন পায়রা
ডানা ঝাপটায়
হৃদয় শঙ্খের তীরে’ (হৃদয় শঙ্খের তীরে)
এ নদী তার জন্মভূমি বাঁশখালীর নদী, যেনো এক প্রতিবেশিনী স্নেহময়ী জননী। অন্যদিকে তার অন্তরের বুলি মাতৃভাষা বাংলার প্রাচীনতম গ্রন্থ চর্যাপদ-এর প্রধান নারী চরিত্র শবরী। নিজ মাতৃভূমির নদী আর মাতৃভাষার প্রথম নারীচরিত্র যেনো একাকার হয়ে ধরা দেয় কবির সত্তায়:
‘কালের সাক্ষী তুমি শঙ্খশবরী
এই দেশে জন্ম তোমার
এ দেশেই বাসর সংসার
তোমার স্নেহের বাঁকে
আমার জীবন গলে চর’ (চপলা শঙ্খবালা)
এ কারণেই দেখি শঙ্খ আর বাঁশখালীর সাথে নিজেকে একাকার করে নিয়ে কবি কমরুদ্দিন রচনা করেন নিজের বাউল জীবনের এপিটাফ:
‘বন আর সমুদ্রের মিতালিতে মিশে কমরুদ্দিন
মেহেদি রাঙা দাড়ি উড়ু উড়– চুল
সমুদ্র বাতাসে
চাঁদপুর গাঁয়ের বাউল।’ (কবিতার বাঁশখালী)
তবে এ গায়ের বাউলের চোখ এড়াতে পারে না কর্পোরেট কূটকৌশল আর সভ্যতার সঙ্কট। অশান্ত উন্নয়নের সুবাতাস ছেড়ে কবি মন তাই পালাই পালাই করে প্রকৃতির পাশে ফিরতে চায়। নিসর্গকে নিবিড়ভাবে পাবার আকাক্সক্ষায় কবি লিখেন:
‘কর্পোরেট যান্ত্রিক জীবনে
প্রকৃতির নিবিড় প্রশান্তি নেই
আছে দ্বন্দ্ব, তিক্ততা, ঘাত-প্রতিঘাত
বার বার আমি তাই ফিরে যাই
নিসর্গে শান্তির সন্ধানে।’ (ফিরে যাই নিসর্গে)
প্রকৃতি-প্রেমিক কবি কখনও প্রকৃতির ওপর মানুষের উৎপাত আতিশয্য মেনে নিতে পারে না। প্রকৃতির স্বাভাবিক বেড়ে ওঠাকে এড়িয়ে মেকি সৌন্দর্য বর্ধন আর বাড়াবাড়ি দেখে কবি বিলাপ করে উঠেন:
‘পাহাড়ি ঢালের গদ্য, নলখাগড়া ঘাসের নৃত্যে
সুন্দরীর কঙ্কাল।
তোমাকে দেখতে গিয়ে কোথায় রাখি
হৃদয়ের কৈছালি বিষাদ
প্যারালাইসিস সুন্দরী ইকোপার্ক।’ (হৃদয়ের কৈছালি)
কবির নতুন আঙ্গিকে চিত্রকল্প ব্যবহারের দক্ষতাও পাঠকের দৃষ্টি কাড়ে। জ্যান্ত কই মাছের গায়ে ছাই দিলে মাছ যেমন মৃত্যু-যন্ত্রণায় ছটফট করে, ইকোপার্কের নামে প্রকৃতির বিনাশও সহৃদয় কবি-মনে তেমনি যন্ত্রণা দিচ্ছে। সুতরাং কবি এই মেকি শহর ছেড়ে ছুটে চলেন ফেলে আসা প্রিয় শঙ্খ পানে, আর যাত্রাপথে তাঁর বয়ান শিল্পিত রূপ পায় কবিতায়। অধ্যাপক মোহাম্মদ আলম চৌধুরীর ভাষায়: ‘কবি কমরুদ্দিন যান্ত্রিক দুনিয়ার কোলাহলকে তুচ্ছ করে এখনো শঙ্খের ঢেউয়ে কবিতার রসদ খোঁজেন। কবি ফাউজুল কবির যথার্থই মনে করেন, ‘কমরুদ্দিনের কাবতায় নির্মাণের সহজ-সারল্যের মধ্যে ফুটে উঠেছে শঙ্খ ও বাঁশখালীর মাটি ও জীবনের ঘ্রাণ। কবির পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে স্মারক সঙ্কলনের সম্পাদকীয়তে অধ্যাপক শামসুদ্দীন শিশির লিখেন : ‘কবিতায় নিজস্ব পথ তৈরি করে সে পথেই নিরন্তর পথচলা তাঁর। একেবারেই নিজস্ব ঢং, স্বকীয় স্বর। … নিজের মতোন করে আলাদা মেধা, মন, মনন ও নিতি নিতি কৌশল অবলম্বনে তাঁর সাহিত্যপয়দা।’ারর সুতরাং, কবি কমরুদ্দিনের কবিতায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন আরও শৈল্পিকভাবে ফুটে উঠতে থাকবে আগামী দিনেও। আর কেন্দ্রবিমুখ ভিন্ন স্বাদের কাব্যপ্রেমীদের কাছে তাঁর কবিতার পাঠকপ্রিয়তা ক্রমবর্ধমানতা পাবে- এ কথা নিঃসন্দেহে বলাযায়।
তথ্য-সঙ্কেত:
১. পুষ্কর দাশগুপ্ত। ‘সুকুমার রায়: তাঁর ভাষাভাবনা ও রচনা শিল্প’। এবং মুশায়েরা (মৃণাল নাথ সম্পাদিত)। জানু-মার্চ ২০১৬, পৃ. ৮৩।
২. রণেশ দাশগুপ্ত। শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ। ঢাকা : কথাপ্রকাশ, ২০১৩, পৃ. ৭০।
৩. হাসান আজিজুল হক। শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ। ঢাকা : কথাপ্রকাশ, ২০১২, পৃ. ১৩।
৪. আজাদ বুলবুল। ‘আমি আছি থাকবো’। নন্দন অভিযাত্রী (শামসুদ্দীন শিশির সম্পাদিত)। চট্টগ্রাম : কোরক, ২০১৫, পৃ.৫৩।
৫. মোহাম্মদ আলম চৌধুরী। ‘শঙ্খতীরের গাঙচিল’। নন্দন অভিযাত্রী (শামসুদ্দীন শিশির সম্পাদিত)। চট্টগ্রাম : কোরক, ২০১৫, পৃ.৫৩।
৬. ফাউজুল কবির । ‘চাঁদপুর গাঁয়ের বাউল কবি’। নন্দন অভিযাত্রী (শামসুদ্দীন শিশির সম্পাদিত)। চট্টগ্রাম : কোরক, ২০১৫, পৃ.৮৫।
৭. শামসুদ্দীন শিশির। ‘সম্পাদকীয়’। নন্দন অভিযাত্রী (শামসুদ্দীন শিশির সম্পাদিত)। চট্টগ্রাম : কোরক, ২০১৫, পৃ.৫।