দু’পাশের মাটিতে চাপ দিয়ে উপরে ওঠে এলো পলান। এরই মধ্যে তিন বালতিরও বেশি পানি জমে গেছে সেগুলো উপরে ফেলে দিয়ে আস্তে আস্তে তার ফিতাপাইপ যেখানে শেষ হয়েছে সে সীমান্তের দিকে হাঁটতে লাগলো। পাম্পের মুখের কাছে পাইপের দুটো বড় রকমের ফুটো পড়ার কারণে তাদের খাটুনি আরও বেশি হচ্ছে। সাইকেলের টিউবের ছেঁড়া অংশ দিয়ে ঐ ফুটো দুটো ভাল করে বেঁধে দিলেও পানির চাপ অত্যধিক হওয়ায় সেখানে প্রচুর পানি বেরিয়ে যাচ্ছে।
পলানের গম কাটা হয়ে গেছে গত শুক্রবারে, কিন্তু মাঝের এই দুদিন বোরিন ফাঁকা না থাকায় সে গম কাটা জমিতে পানি দিতে পারেনি। আজও হয়তো পেতো না। তারপরও অনেক ভোরে আসায় আজ আর হাতছাড়া হয়নি। শনিবারে তারা ফিরে গেছে আলাউদ্দিন শেখের বাড়ির কাছে থেকে। আর রবিবারে ফিরে গেছে বাদলের মোড় থেকে নিচে নামার পর। আরও দু’একটা ফুটো আখপাতায় জড়িয়ে গম কাটা জমিতে এসে পা রাখলো পলান। তাদের জমির পরের জমিতে গম কাটছে রবি এবং তার দশ-এগারো বছরের ছেলে। পলান এতক্ষণ পরে ঘাড়টা ওদের দিকে ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ভাই কহুন আসিছিলেন? আর যে, এক পাই আছ! সগই কাটি ফ্যালাছেন! রবির কাঁচি থামলো না। একই গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সে এবং সাথে সাথে পলানের কথার উত্তরও দিচ্ছে- কি জানি, সাঁনঝের বেলা খা-দা বাইরেরই ঐ আমের গাছতলাত শুছুন। আর একবার চোখ খুলি দেখছি, আমার মুখ বরাবর আর্ধেকের ইকটু বেশি চান ভাসি বেড়াছে। আর কি কোরবো, কাটতে হবে আমারখেই। ব্যাটাক ডাকি বুলনু, চল ব্যাটা যাই। আমার এই আট কাঠা গম, সারা হলেই বাঁচি। ভাটাত একশো-দেড়শো পর্যন্ত কাম হছে। কামাই করি কদিন থাকা য্যা?
পলান আর কথা বাড়ালো না তার নিজের কাজে মন দিল। ফিতাপাইপের বস্তার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিল আলান। তাকে সে বস্তাটি এদিকে নিয়ে আসার জন্য ইঙ্গিত করলো। আলান বস্তাটি এনে তার সামনে রাখলো- মাঝারি সাইজের একটা পাইপ সে বস্তার পেটের ভেতর থেকে বের করে বাইরের মাথাটি আলানের হাতে ধরিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে আলান তার থেকে একটু ডানদিকে চেপে হাঁটতে লাগলো। আলানের হাঁটা বন্ধ হলেই পলান পাইপের এই মাথাটির ভেতরে আগের পাইপটির মাথা ঢুকিয়ে দিলো। পানি আবারও দৌড়াতে লাগলো তার নতুন গন্তব্যের দিকে। দু’হাতের তালুতে পানি ভর্তি করে চোখ-মুখে পানির ঝাপটা দিলো আলান। গামছাটা মাজা থেকে খুলে ভাঁজ দিয়ে মুখের ওপর রাখতেই তার নিজের নামটি সে বারবার শুনতে লাগলো তারই কানে। বামের দিকে ঘুরে সে বুঝতে পারলো রবি গমের বোঝাটি তুলে নেয়ার জন্য তাকে ডাকছে। তাদের এই জমিটির উত্তর-পশ্চিমের কোনাটি অপেক্ষাকৃত উঁচু। তাই তারা এ কোনা থেকেই নিয়মিত পানি দেয়া শুরু করে। এতে জমিটি ভিজিয়ে তাদের সুবিধে হয়। যতটুকু জমি পানিতে ভিজে ছিল সে পর্যন্ত পায়ের তেমন অসুবিধে হয়নি। কিন্তু শুকনো মাটিতে পা রাখলেই গমের গোড়ার আঘাতে যেন তার পা ফুটো হয়ে যাচ্ছে। কখনো পায়ের সামনের অংশ আবার কখনো পেছনের অংশ চেপে চেপে রবির কাছে পৌঁছালো সে। রেন্টুর বোরিনডা খুঁড়বে না? মাথায় গামছা জড়িয়ে নেয়ার ফাঁকে প্রশ্ন করলো রবি। কি জানি? খুঁড়লে তো আমারেও ভালো হতো। আমরাও সুমা পাছি নি। এ কথাগুলো বলতে বলতেই বোঝাটির একপাশে হাত লাগালো আলান অন্যপাশে রবি এবং তার ছেলে। তার মাথায় বোঝাটি রাখতেই সামান্য একটু ঝাঁকি দিয়ে ঠিক করে নিল। ভিজা গম, এক আঁটি কম করি লিবেন। বলে রবির ছেলের বোঝাটিও তুলে দিয়ে আবারও সে নিজের কাজে ফিরলো।
তাদের মাথার উপর দিয়ে চলে গেছে বিদ্যুতের টানা টানা তারগুলো। কোথায় যে শুরু আর কোথায় শেষ আলান তা জানে না। এদিকে শ্রীখন্ডি পার হয়ে গেলেও দেখা যায় ওরা চলে গেছে। আবার ওদিকে ভাংড়ার বড় বাগানও পার হয়ে গেছে। সে বিদ্যুতের খুঁটির সোজাসুজি ঐ আল ধরে হাঁকাতে হাঁকাতে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে ডুয়েল। সে একটি কথাই বার বার বলছে- এই ম্যাশিন কে ভিড়াছ রে? কাছাকাছি হয়ে আরও জোরে জোরে সে বলতে লাগলো- কদ্দুর তোরে? আলান অথবা পলান দু’ভাইয়ের কেউই এখনও কোন কথা বলেনি। আলান বললো, আমারে এ যে, আর অর্ধেক খানেক ভিজাতে আছ। নানীর এই দু’কাঠা আর ঐ ছয় কাঠাও ভিজাবো। এ কথাগুলো শোনার পর আর সে যেন স্থির থাকতে পারছে না। সে ঠোঁটের জ্বলন্ত বিড়িটিতে আরও জোরে টান দিয়ে বললো, এর ল্যাগিই তো ছুটু গণি কাখু ভিড়াত দিছে না। এই তোরেটুক দি, আমাখ ভিড়াত দে। তোর নানী-টানীর গিন পরে দিস। পলান কিছু বললো না, শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে ডুয়েলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। আবারও আলানই বললো, ম্যাশিন ভিড়া আবার খুলা যা নাকি? আর আজ খুলি লি গ্যালে আবার কবে দিবো? ডুয়েলের কণ্ঠ আরও একটু কর্কশ হয়ে উঠলো, তাহালে কিন্তু আমিই ম্যাশিন খুলি দিবো। এইবার পলান বলে উঠলো- বোরিন কার? বোরিন যারই হোক, বোরিন পচার। তারপরও বোরিনডা আমরাই খুঁড়িছি। আর পচা আমাখ ম্যাশিন পুড়ায় দিয়ার পর্যন্ত অডার দিছ। পলানের কণ্ঠও আর স্বাভাবিক থাকলো না আচ্ছা, পারলে পুড়ান। পচা চাচা যদি অডারই দি থাকে তাহালে পুড়ান। আ-রে, আপনেক সুদ্ধি পুড়ায় দিবো। খালি আমার এই আ’লডা পার হনতো দেহি! আপনেক সুদ্ধি যদি…! গ্রামের ভেতরে ফিরে আসার পর ডুয়েল কোন লোকের কতটা সমর্থন পাবে সেটা পরের কথা। এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো, পলান আর আলান দুই ভাইয়েরই বয়স তার তুলনায় কম হলেও আজ তারা পরিপূর্ণ যুবক। আর ডুয়েলের বয়স যৌবনের সীমানা পার হয়ে যাচ্ছে। তা ছাড়াও এখন সে একা। দু’তিনবার সামনে পেছনে তাকিয়েও তাকে সমর্থন করার মতো কোন লোক সে দেখতে পেলো না। বরং যে বোরিন থেকে পানি উঠে আসছে তার পাশের জমিতে ঘাস কাট ছিল পলান-আলানের বড় মামা। ডুয়েল আরও একটা বিড়ি জ্বালিয়ে বড় বড় করে দুটো টান দিয়ে পেছনে ফিরে হাঁটতে লাগলো। পলানও তার আগের জায়গায় ফিরে যেতে চেষ্টা করলো এবং আলানকে বললো- ত্যাল লি অ্যা’ আর নানীক খবর দে। যাতে এহুনি চড়াত আসে। পাশের আলেই খয়েরগাছের সাথে হেলান দিয়ে রাখা সাইকেলটি নিয়ে প্যাঁচানো আল বেয়ে হাঁটতে লাগলো সে। পাইপের মুখে পা রেখে পানির গতিটা পরীক্ষা করে নিল পলান। এখনও গতি ভালই। পাইপের মুখ থেকে গলগল শব্দে পানি বেরিয়ে মাটিতে পড়তে যতটুকু দেরি। সঙ্গে সঙ্গে তা চুষে নিচ্ছে এ পোড়া মাটি। মনে হয় এ মাটি যেন আজ তেইশ বছরের তৃষ্ণার্ত যুবক। বারো- চৌদ্দ থেকে এ আগুন জ্বলছে ওর বুকে। এ মাটির এক ইঞ্চি শরীরের তৃষ্ণাও অনেক! পলান ভেতরে ভেতরে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে- দুই বছর পার হয়ে গেলো তার ও সুফিয়ার বিয়ের। কত পথে- কত কৌশলে- কত চেষ্টা করলো পলান- কোন কিছুতেই কিছু হলো না। পানি পড়া- গাছ পড়া থেকে দাদা-দুলাভাই যে যা বলেছে সবকিছুই পরীক্ষা করে দেখেছে সে। কিন্তু না জেগেছে সুফিয়ার মন- না তার শরীর। সুফিয়া একটা কথাই বারবার বলে- পুড়া মাটিত পানি চুষে- ফুল ফুটে না। তবুও অজস্র অজস্রবার পলান সুফিয়াকে বিছানায় পেয়েছে। কিন্তু তার ভেতরের উষ্ণতার সন্ধান সে পায়নি। আজকে এই ফাটা মাটির মতো সুফিয়া হলে…! পলানের পারিবারিক প্রয়োজনেই ওদের বিয়ে হয়। পলানের বড় চাচা এবং তার পরিবারের লোকজন সুফিয়াকে দেখতে গিয়ে তার মুখে সূরা ফাতেহা- সূরা এখলাস শুনে পরের তিনদিন তার বড় চাচা মুখে আর কোন কথা আনলেন না। এ মেয়ের সাথেই পলানের বি হবে। কি সুন্দর মিষ্টি গলা- সূরা পড়ার ঢং! দশ নম্বর মেয়েটির তুলনায় সুফিয়া একটু খাটো হলেও তা তৎক্ষণাৎ কারো চোখে পড়লো না। এরপর পলান সত্যিই চেষ্টা কম করে নি- গোপনে গোপনে সবাই তার সাক্ষী। সুফিয়া তার চাচাত ভাই মাইনুলকে ভালবাসতো- মাইনুলের তুলনায় পলানদের পারিবারিক অবস্থা ভাল হওয়ায় পলানের সাথেই তার হয়। বিয়ে হয়ে যাবে এতদূর সুফিয়া আন্দাজ করেনি। এমনকি তার পরিবারেরও কেউ না। পলানের বড় চাচার পীড়াপীড়িতেই বিয়েটা হয়ে যায়। তিনি পলানের এ অবস্থা খুব একটা দেখে যেতে পারেননি। পলান নিজেও তার গ্রামের এক মেয়েকে ভালবাসতো। কিন্তু সে তো এমন হয়ে যায়নি। সে মেয়েটিও আজ তার মতো সংসার করছে। পলান আবারও ওর গম কাটা জমিতে ফিরে এসে পাইপের মুখটা একটু পশ্চিমে ঘুরিয়ে দিলো।
চকচকে রোদের সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে এদিকে এগিয়ে আসছে পলানের নানী। আলানের মুখে খবর পেয়ে আর হয়তো দেরি করেনি। পলানের কাছে পৌঁছানোর আগেই তিনি চিৎকার করে বলতে লাগলেন- কই, নুরের ব্যাটা কই? আজ আমি অক শিক্খা দিছি! আমি হই অর ফুবু শাওড়ি। আর আমার বিয়ে পানি দিত দিবে না! পলান বললো, থ্যাক। উই চলি গেছ। আপনে তো জ্যানলেন। আমারখে খিদি ল্যাগিছ, রুটি লি অ্যাসেন। উই অ্যাসলে আমরাই এবির অর ব্যবস্থা কোরি দিবোন। বাড়িত মুবাইল করিছি, উই আর বোধহ আসফে না। তারপরও যদি আসে? আপনে রুটি লি অ্যাসেন। পলানের নানী চলে গেলো।
আলান ফিরে আসছে অন্য রাস্তায়। সাইকেলটি আগের জায়গায় রেখে তেলের জারকিন বাম হাতে নিয়ে মেশিনের দিকে যাওয়ার জন্য পা তুলেছিলো আলান। পলান জিজ্ঞেস করলো- ক’লিটার? পাঁচ, বলে সে হাঁটতে থাকলো। আলান ওখানে পৌঁছানোর আগেই পাইপের শরীর শুকিয়ে যেতে লাগলো। আলান দৌড় দিলো, পলানও তার পিছু পিছু। আলান মেশিনটা বন্ধ করে মেশিনের চারপাশে জমা পানি তুলে ফেলতে লাগলো। চার ঘড়া পানি তুলে ফেলার পর আরও এক ঘড়া পানি ভর্তি করে নিচেই রাখলো। পলানও নেমে পড়লো নিচে। তাদের চারপাশে কাঁচামাটি। টিউবওয়েল টেনে টেনে পানি তোলার চেষ্টা করছে আলান। পলান প্রয়োজন মতো পানি ঢেলে দিচ্ছে টিউবওয়েলের মধ্যে। একবার পানি উঠলো। আলান তাকে মেশিন স্টার্ট করার ইশারা করলো। সহজেই স্টার্ট নিলো মেশিনটি। সকালের হিসেবে এখন অনেক সহজে। কিন্তু পাইপে পানি আসছে না। টিউবওয়েল থেকেও পানি নেমে গেলো। আবারও তারা চেষ্টা চালাতে লাগলো। অথচ আবারও একই রকম ব্যবহার করলো মেশিনটি। আলান রাগে আর ওর মধ্যে থাকতে পারলো না। ঐ গর্তের ভেতর থেকে উঠে গিয়ে সে অদূরে একটি কড়ইগাছের নিচে বসলো। এরই মধ্যে তার নানীও রুটি নিয়ে হাজির- পলানও আর ওর মধ্যে থাকলো না। গামছায় বাঁধা রুটিগুলো খুলে দু’বার মুখে দিয়ে জগটি হাতে নিয়ে উঠে গেলো আলান। পাইপের মাথা থেকে জগ ভর্তি করে পানি এনে আবারও বসলো সে। রুটি খাওয়া শেষ না হতেই তাদের বাবাও এসে হাজির হলো। তিনি অত্যন্ত রাগাম্বিত; এক নিঃশ্বাসে ডুয়েলকে অনেকগুলো গালিগালাজ করে তারপর জিজ্ঞেস করলো, ম্যাশিন বন্ধ ক্যা? পানি নামি গেছ? পাশে থেকে পলান মাথাটি দু’বার উপরে নিচে করলো। বেশিক্ষণ সময় আর ওখানে বসে থাকলো না কেউই- কিন্তু কিছু করেই কিছু হচ্ছে না। পলানের জমিরই এখনও তিনভাগের এক ভাগ বাকি- তারা পাইপগুলো গুছিয়ে নিতে শুরু করলো। পলান সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরেও এদিক ওদিক তীক্ষè দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। আলান ছোট টিউবওয়েল, ফিতা পাইপের বস্তা, তেলের জারকিন, কাঁচি, হ্যান্ডেলের ব্যাগ- সবকিছু এক এক করে সাইকেলটির শরীরে গেঁথে দিচ্ছে। আলান পেছনে থেকে সামান্য ঠেলা দিলো। পলান সাইকেলের ব্রেক চেপে ধরে আলানকে বললো, ঐ যে ষোল-তের ডাল। আলান পেছনে ফিরে সে ডাল রেঞ্জটি কুড়িয়ে এনে হ্যান্ডেল ব্যাগে রেখে পেছনে থেকে আবারও ঠেলা দিলো। তাদের পেছনে পেছনে হাঁটতে শুরু করলো তাদের বাবা; নানীও।
ফজলু মাস্টারের মেহগনি বাগানের কাছ দিয়ে পাকা সড়কে উঠে এলো পলান, আলান এবং তাদের বাবা। বাদলের মোড়ে পৌঁছানোর আগেই ঐ নতুন ঈদগাহ মাঠে- চারা আমগাছের ছায়ায় বসে আছে ক্লান্ত, অস্থির সাত-আটজন মানুষ। ওদের মধ্যে থেকে সরস আলী ডাক দিলো- পলান ইকটু শুনি যা, দাঁড়িয়ে কথা বলার মতো মন-মানসিকতা এ মুহূর্তে পলানের নেই। তারপরও ছায়া দেখে দাঁড়িয়ে পড়লো সে এবং আলানকে উদ্দেশ্য করে বললো, ধরিস। তাদের খুব কাছে যেতে হলো না পলানকে। সরস আলী আবারও বললো, মুগকালাই-পাট কুনুকিছুই তো বুনা যাছে না- তাই আমরা একটা ডিপ বসানির কথাবার্তা বুলছুন, সানজের দিক মুড়ে আসিস। পলান দু’বার মাথা ঝাঁকিয়ে আবারও সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে সামনের দিকে হাঁটতে লাগলো। কিন্তু সরস আলীর কথায় সে খুব একটা উৎসাহ পেলো বলে মনে হলো না। পলানের ভেতরে দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। এই মাঠে ক’বছর আগেও পানিতে ডুবে থাকার কারণে ঠিকমত কোন আবাদ-ফসল করা যায়নি। আউশ আর আমন ধান- তাও কাটতে হয় হাঁটু পানিতে নিজেকে ডুবিয়ে। এ মাহাতাব রোডের নিচ দিয়ে সমস্ত আখ ক্ষেতের আখগুলো গলা পর্যন্ত পানিতে ডুবে থাকতো। আর আজ বোরিন-তারপরও দেড় মানুষ গর্তের ভেতরে নেমেও পানি তোলা যাচ্ছে না। ছোট বেলায় অর্থাৎ মেজ মামার ঘাড়ে বসে ঘুরে ঘুরে বেড়ানোর বয়সে। সে কতদিন পদ্মা নদী দেখতে গেছে! মামা বলেছে, পলান; মামু- এডিই বাংলাদ্যাশের সবচেয়ে বড় নদী আর এডিই আমারে বাড়ির কাছ দি দিনরাত ছুটি যা। কিরুকুম একটা অহংকারের ব্যাপার না? পলানও ছোট থেকেই তার বুকের ভেতর পদ্মার মতো বড় নদীকে লালন করেছে এবং মেজ মামার ঘাড় থেকে নেমে নিজের পায়ে ভর দিয়ে বারবার সে কমেলা বুবুর শাড়ি ঢাকা শরীরের ভাঁজে ভাঁজে অথবা অসাবধানতায় উন্মুক্ত হওয়া নাভিমূলে সেই পদ্মাকে দেখেছে। তারপর কমেলা বুবুও শুকিয়ে গেছে পদ্মার মতো। উভয়ের বুকে জাগা বালুচরে এখনও প্রাণ জাগেনি। এবং সুফিয়াকেও সে অনেক দেখেছে। এতক্ষণ মনে মনে কষা এই জটিল অঙ্কের উত্তর পেলো পলান-ডিপ বসিয়েও খুব লাভ হবে না।
বাদলের মোড় পার হতেই রাস্তার দু’পাশে ঘন বাঁশঝাড়। ঐ বাঁশঝাড়গুলোর ফাঁকা জায়গাটায় অনেকগুলো ছোট ছোট ছেলেমেয়ে। দু’একজন ঘড়াতে করে পানি ঢেলে দিচ্ছে- আর বাকি সবাই সে পানিতে গড়াগড়ি দিচ্ছে আর বলছে, আল্লা ম্যাঘ দে, পানি দে। ওদের মধ্যেই একজনের হাতে কলাগাছের বাকলের মধ্যে দুটো ব্যাঙ। ওদের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে পলান এবং সে ডুবে যাচ্ছে ওদের ভেতরে। দু’পাশের মাটিতে চাপ দিয়ে উপরে ওঠে এলো পলান। এরই মধ্যে তিন বালতিরও বেশি পানি জমে গেছে সেগুলো উপরে ফেলে দিয়ে আস্তে আস্তে তার ফিতাপাইপ যেখানে শেষ হয়েছে সে সীমান্তের দিকে হাঁটতে লাগলো। পাম্পের মুখের কাছে পাইপের দুটো বড় রকমের ফুটো পড়ার কারণে তাদের খাটুনি আরও বেশি হচ্ছে। সাইকেলের টিউবের ছেঁড়া অংশ দিয়ে ঐ ফুটো দুটো ভাল করে বেঁধে দিলেও পানির চাপ অত্যধিক হওয়ায় সেখানে প্রচুর পানি বেরিয়ে যাচ্ছে।
পলানের গম কাটা হয়ে গেছে গত শুক্রবারে, কিন্তু মাঝের এই দুদিন বোরিন ফাঁকা না থাকায় সে গম কাটা জমিতে পানি দিতে পারেনি। আজও হয়তো পেতো না। তারপরও অনেক ভোরে আসায় আজ আর হাতছাড়া হয়নি। শনিবারে তারা ফিরে গেছে আলাউদ্দিন শেখের বাড়ির কাছে থেকে। আর রবিবারে ফিরে গেছে বাদলের মোড় থেকে নিচে নামার পর। আরও দু’একটা ফুটো আখপাতায় জড়িয়ে গম কাটা জমিতে এসে পা রাখলো পলান। তাদের জমির পরের জমিতে গম কাটছে রবি এবং তার দশ-এগারো বছরের ছেলে। পলান এতক্ষণ পরে ঘাড়টা ওদের দিকে ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ভাই কহুন আসিছিলেন? আর যে, এক পাই আছ! সগই কাটি ফ্যালাছেন! রবির কাঁচি থামলো না। একই গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সে এবং সাথে সাথে পলানের কথার উত্তরও দিচ্ছে- কি জানি, সাঁনঝের বেলা খা-দা বাইরেরই ঐ আমের গাছতলাত শুছুন। আর একবার চোখ খুলি দেখছি, আমার মুখ বরাবর আর্ধেকের ইকটু বেশি চান ভাসি বেড়াছে। আর কি কোরবো, কাটতে হবে আমারখেই। ব্যাটাক ডাকি বুলনু, চল ব্যাটা যাই। আমার এই আট কাঠা গম, সারা হলেই বাঁচি। ভাটাত একশো-দেড়শো পর্যন্ত কাম হছে। কামাই করি কদিন থাকা য্যা?
পলান আর কথা বাড়ালো না তার নিজের কাজে মন দিল। ফিতাপাইপের বস্তার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিল আলান। তাকে সে বস্তাটি এদিকে নিয়ে আসার জন্য ইঙ্গিত করলো। আলান বস্তাটি এনে তার সামনে রাখলো- মাঝারি সাইজের একটা পাইপ সে বস্তার পেটের ভেতর থেকে বের করে বাইরের মাথাটি আলানের হাতে ধরিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে আলান তার থেকে একটু ডানদিকে চেপে হাঁটতে লাগলো। আলানের হাঁটা বন্ধ হলেই পলান পাইপের এই মাথাটির ভেতরে আগের পাইপটির মাথা ঢুকিয়ে দিলো। পানি আবারও দৌড়াতে লাগলো তার নতুন গন্তব্যের দিকে। দু’হাতের তালুতে পানি ভর্তি করে চোখ-মুখে পানির ঝাপটা দিলো আলান। গামছাটা মাজা থেকে খুলে ভাঁজ দিয়ে মুখের ওপর রাখতেই তার নিজের নামটি সে বারবার শুনতে লাগলো তারই কানে। বামের দিকে ঘুরে সে বুঝতে পারলো রবি গমের বোঝাটি তুলে নেয়ার জন্য তাকে ডাকছে। তাদের এই জমিটির উত্তর-পশ্চিমের কোনাটি অপেক্ষাকৃত উঁচু। তাই তারা এ কোনা থেকেই নিয়মিত পানি দেয়া শুরু করে। এতে জমিটি ভিজিয়ে তাদের সুবিধে হয়। যতটুকু জমি পানিতে ভিজে ছিল সে পর্যন্ত পায়ের তেমন অসুবিধে হয়নি। কিন্তু শুকনো মাটিতে পা রাখলেই গমের গোড়ার আঘাতে যেন তার পা ফুটো হয়ে যাচ্ছে। কখনো পায়ের সামনের অংশ আবার কখনো পেছনের অংশ চেপে চেপে রবির কাছে পৌঁছালো সে। রেন্টুর বোরিনডা খুঁড়বে না? মাথায় গামছা জড়িয়ে নেয়ার ফাঁকে প্রশ্ন করলো রবি। কি জানি? খুঁড়লে তো আমারেও ভালো হতো। আমরাও সুমা পাছি নি। এ কথাগুলো বলতে বলতেই বোঝাটির একপাশে হাত লাগালো আলান অন্যপাশে রবি এবং তার ছেলে। তার মাথায় বোঝাটি রাখতেই সামান্য একটু ঝাঁকি দিয়ে ঠিক করে নিল। ভিজা গম, এক আঁটি কম করি লিবেন। বলে রবির ছেলের বোঝাটিও তুলে দিয়ে আবারও সে নিজের কাজে ফিরলো।
তাদের মাথার উপর দিয়ে চলে গেছে বিদ্যুতের টানা টানা তারগুলো। কোথায় যে শুরু আর কোথায় শেষ আলান তা জানে না। এদিকে শ্রীখন্ডি পার হয়ে গেলেও দেখা যায় ওরা চলে গেছে। আবার ওদিকে ভাংড়ার বড় বাগানও পার হয়ে গেছে। সে বিদ্যুতের খুঁটির সোজাসুজি ঐ আল ধরে হাঁকাতে হাঁকাতে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে ডুয়েল। সে একটি কথাই বার বার বলছে- এই ম্যাশিন কে ভিড়াছ রে? কাছাকাছি হয়ে আরও জোরে জোরে সে বলতে লাগলো- কদ্দুর তোরে? আলান অথবা পলান দু’ভাইয়ের কেউই এখনও কোন কথা বলেনি। আলান বললো, আমারে এ যে, আর অর্ধেক খানেক ভিজাতে আছ। নানীর এই দু’কাঠা আর ঐ ছয় কাঠাও ভিজাবো। এ কথাগুলো শোনার পর আর সে যেন স্থির থাকতে পারছে না। সে ঠোঁটের জ্বলন্ত বিড়িটিতে আরও জোরে টান দিয়ে বললো, এর ল্যাগিই তো ছুটু গণি কাখু ভিড়াত দিছে না। এই তোরেটুক দি, আমাখ ভিড়াত দে। তোর নানী-টানীর গিন পরে দিস। পলান কিছু বললো না, শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে ডুয়েলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। আবারও আলানই বললো, ম্যাশিন ভিড়া আবার খুলা যা নাকি? আর আজ খুলি লি গ্যালে আবার কবে দিবো? ডুয়েলের কণ্ঠ আরও একটু কর্কশ হয়ে উঠলো, তাহালে কিন্তু আমিই ম্যাশিন খুলি দিবো। এইবার পলান বলে উঠলো- বোরিন কার? বোরিন যারই হোক, বোরিন পচার। তারপরও বোরিনডা আমরাই খুঁড়িছি। আর পচা আমাখ ম্যাশিন পুড়ায় দিয়ার পর্যন্ত অডার দিছ। পলানের কণ্ঠও আর স্বাভাবিক থাকলো না আচ্ছা, পারলে পুড়ান। পচা চাচা যদি অডারই দি থাকে তাহালে পুড়ান। আ-রে, আপনেক সুদ্ধি পুড়ায় দিবো। খালি আমার এই আ’লডা পার হনতো দেহি! আপনেক সুদ্ধি যদি…! গ্রামের ভেতরে ফিরে আসার পর ডুয়েল কোন লোকের কতটা সমর্থন পাবে সেটা পরের কথা। এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো, পলান আর আলান দুই ভাইয়েরই বয়স তার তুলনায় কম হলেও আজ তারা পরিপূর্ণ যুবক। আর ডুয়েলের বয়স যৌবনের সীমানা পার হয়ে যাচ্ছে। তা ছাড়াও এখন সে একা। দু’তিনবার সামনে পেছনে তাকিয়েও তাকে সমর্থন করার মতো কোন লোক সে দেখতে পেলো না। বরং যে বোরিন থেকে পানি উঠে আসছে তার পাশের জমিতে ঘাস কাট ছিল পলান-আলানের বড় মামা। ডুয়েল আরও একটা বিড়ি জ্বালিয়ে বড় বড় করে দুটো টান দিয়ে পেছনে ফিরে হাঁটতে লাগলো। পলানও তার আগের জায়গায় ফিরে যেতে চেষ্টা করলো এবং আলানকে বললো- ত্যাল লি অ্যা’ আর নানীক খবর দে। যাতে এহুনি চড়াত আসে। পাশের আলেই খয়েরগাছের সাথে হেলান দিয়ে রাখা সাইকেলটি নিয়ে প্যাঁচানো আল বেয়ে হাঁটতে লাগলো সে। পাইপের মুখে পা রেখে পানির গতিটা পরীক্ষা করে নিল পলান। এখনও গতি ভালই। পাইপের মুখ থেকে গলগল শব্দে পানি বেরিয়ে মাটিতে পড়তে যতটুকু দেরি। সঙ্গে সঙ্গে তা চুষে নিচ্ছে এ পোড়া মাটি। মনে হয় এ মাটি যেন আজ তেইশ বছরের তৃষ্ণার্ত যুবক। বারো- চৌদ্দ থেকে এ আগুন জ্বলছে ওর বুকে। এ মাটির এক ইঞ্চি শরীরের তৃষ্ণাও অনেক! পলান ভেতরে ভেতরে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে- দুই বছর পার হয়ে গেলো তার ও সুফিয়ার বিয়ের। কত পথে- কত কৌশলে- কত চেষ্টা করলো পলান- কোন কিছুতেই কিছু হলো না। পানি পড়া- গাছ পড়া থেকে দাদা-দুলাভাই যে যা বলেছে সবকিছুই পরীক্ষা করে দেখেছে সে। কিন্তু না জেগেছে সুফিয়ার মন- না তার শরীর। সুফিয়া একটা কথাই বারবার বলে- পুড়া মাটিত পানি চুষে- ফুল ফুটে না। তবুও অজস্র অজস্রবার পলান সুফিয়াকে বিছানায় পেয়েছে। কিন্তু তার ভেতরের উষ্ণতার সন্ধান সে পায়নি। আজকে এই ফাটা মাটির মতো সুফিয়া হলে…! পলানের পারিবারিক প্রয়োজনেই ওদের বিয়ে হয়। পলানের বড় চাচা এবং তার পরিবারের লোকজন সুফিয়াকে দেখতে গিয়ে তার মুখে সূরা ফাতেহা- সূরা এখলাস শুনে পরের তিনদিন তার বড় চাচা মুখে আর কোন কথা আনলেন না। এ মেয়ের সাথেই পলানের বি হবে। কি সুন্দর মিষ্টি গলা- সূরা পড়ার ঢং! দশ নম্বর মেয়েটির তুলনায় সুফিয়া একটু খাটো হলেও তা তৎক্ষণাৎ কারো চোখে পড়লো না। এরপর পলান সত্যিই চেষ্টা কম করে নি- গোপনে গোপনে সবাই তার সাক্ষী। সুফিয়া তার চাচাত ভাই মাইনুলকে ভালবাসতো- মাইনুলের তুলনায় পলানদের পারিবারিক অবস্থা ভাল হওয়ায় পলানের সাথেই তার হয়। বিয়ে হয়ে যাবে এতদূর সুফিয়া আন্দাজ করেনি। এমনকি তার পরিবারেরও কেউ না। পলানের বড় চাচার পীড়াপীড়িতেই বিয়েটা হয়ে যায়। তিনি পলানের এ অবস্থা খুব একটা দেখে যেতে পারেননি। পলান নিজেও তার গ্রামের এক মেয়েকে ভালবাসতো। কিন্তু সে তো এমন হয়ে যায়নি। সে মেয়েটিও আজ তার মতো সংসার করছে। পলান আবারও ওর গম কাটা জমিতে ফিরে এসে পাইপের মুখটা একটু পশ্চিমে ঘুরিয়ে দিলো।
চকচকে রোদের সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে এদিকে এগিয়ে আসছে পলানের নানী। আলানের মুখে খবর পেয়ে আর হয়তো দেরি করেনি। পলানের কাছে পৌঁছানোর আগেই তিনি চিৎকার করে বলতে লাগলেন- কই, নুরের ব্যাটা কই? আজ আমি অক শিক্খা দিছি! আমি হই অর ফুবু শাওড়ি। আর আমার বিয়ে পানি দিত দিবে না! পলান বললো, থ্যাক। উই চলি গেছ। আপনে তো জ্যানলেন। আমারখে খিদি ল্যাগিছ, রুটি লি অ্যাসেন। উই অ্যাসলে আমরাই এবির অর ব্যবস্থা কোরি দিবোন। বাড়িত মুবাইল করিছি, উই আর বোধহ আসফে না। তারপরও যদি আসে? আপনে রুটি লি অ্যাসেন। পলানের নানী চলে গেলো।
আলান ফিরে আসছে অন্য রাস্তায়। সাইকেলটি আগের জায়গায় রেখে তেলের জারকিন বাম হাতে নিয়ে মেশিনের দিকে যাওয়ার জন্য পা তুলেছিলো আলান। পলান জিজ্ঞেস করলো- ক’লিটার? পাঁচ, বলে সে হাঁটতে থাকলো। আলান ওখানে পৌঁছানোর আগেই পাইপের শরীর শুকিয়ে যেতে লাগলো। আলান দৌড় দিলো, পলানও তার পিছু পিছু। আলান মেশিনটা বন্ধ করে মেশিনের চারপাশে জমা পানি তুলে ফেলতে লাগলো। চার ঘড়া পানি তুলে ফেলার পর আরও এক ঘড়া পানি ভর্তি করে নিচেই রাখলো। পলানও নেমে পড়লো নিচে। তাদের চারপাশে কাঁচামাটি। টিউবওয়েল টেনে টেনে পানি তোলার চেষ্টা করছে আলান। পলান প্রয়োজন মতো পানি ঢেলে দিচ্ছে টিউবওয়েলের মধ্যে। একবার পানি উঠলো। আলান তাকে মেশিন স্টার্ট করার ইশারা করলো। সহজেই স্টার্ট নিলো মেশিনটি। সকালের হিসেবে এখন অনেক সহজে। কিন্তু পাইপে পানি আসছে না। টিউবওয়েল থেকেও পানি নেমে গেলো। আবারও তারা চেষ্টা চালাতে লাগলো। অথচ আবারও একই রকম ব্যবহার করলো মেশিনটি। আলান রাগে আর ওর মধ্যে থাকতে পারলো না। ঐ গর্তের ভেতর থেকে উঠে গিয়ে সে অদূরে একটি কড়ইগাছের নিচে বসলো। এরই মধ্যে তার নানীও রুটি নিয়ে হাজির- পলানও আর ওর মধ্যে থাকলো না। গামছায় বাঁধা রুটিগুলো খুলে দু’বার মুখে দিয়ে জগটি হাতে নিয়ে উঠে গেলো আলান। পাইপের মাথা থেকে জগ ভর্তি করে পানি এনে আবারও বসলো সে। রুটি খাওয়া শেষ না হতেই তাদের বাবাও এসে হাজির হলো। তিনি অত্যন্ত রাগাম্বিত; এক নিঃশ্বাসে ডুয়েলকে অনেকগুলো গালিগালাজ করে তারপর জিজ্ঞেস করলো, ম্যাশিন বন্ধ ক্যা? পানি নামি গেছ? পাশে থেকে পলান মাথাটি দু’বার উপরে নিচে করলো। বেশিক্ষণ সময় আর ওখানে বসে থাকলো না কেউই- কিন্তু কিছু করেই কিছু হচ্ছে না। পলানের জমিরই এখনও তিনভাগের এক ভাগ বাকি- তারা পাইপগুলো গুছিয়ে নিতে শুরু করলো। পলান সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরেও এদিক ওদিক তীক্ষè দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। আলান ছোট টিউবওয়েল, ফিতা পাইপের বস্তা, তেলের জারকিন, কাঁচি, হ্যান্ডেলের ব্যাগ- সবকিছু এক এক করে সাইকেলটির শরীরে গেঁথে দিচ্ছে। আলান পেছনে থেকে সামান্য ঠেলা দিলো। পলান সাইকেলের ব্রেক চেপে ধরে আলানকে বললো, ঐ যে ষোল-তের ডাল। আলান পেছনে ফিরে সে ডাল রেঞ্জটি কুড়িয়ে এনে হ্যান্ডেল ব্যাগে রেখে পেছনে থেকে আবারও ঠেলা দিলো। তাদের পেছনে পেছনে হাঁটতে শুরু করলো তাদের বাবা; নানীও।
ফজলু মাস্টারের মেহগনি বাগানের কাছ দিয়ে পাকা সড়কে উঠে এলো পলান, আলান এবং তাদের বাবা। বাদলের মোড়ে পৌঁছানোর আগেই ঐ নতুন ঈদগাহ মাঠে- চারা আমগাছের ছায়ায় বসে আছে ক্লান্ত, অস্থির সাত-আটজন মানুষ। ওদের মধ্যে থেকে সরস আলী ডাক দিলো- পলান ইকটু শুনি যা, দাঁড়িয়ে কথা বলার মতো মন-মানসিকতা এ মুহূর্তে পলানের নেই। তারপরও ছায়া দেখে দাঁড়িয়ে পড়লো সে এবং আলানকে উদ্দেশ্য করে বললো, ধরিস। তাদের খুব কাছে যেতে হলো না পলানকে। সরস আলী আবারও বললো, মুগকালাই-পাট কুনুকিছুই তো বুনা যাছে না- তাই আমরা একটা ডিপ বসানির কথাবার্তা বুলছুন, সানজের দিক মুড়ে আসিস। পলান দু’বার মাথা ঝাঁকিয়ে আবারও সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে সামনের দিকে হাঁটতে লাগলো। কিন্তু সরস আলীর কথায় সে খুব একটা উৎসাহ পেলো বলে মনে হলো না। পলানের ভেতরে দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। এই মাঠে ক’বছর আগেও পানিতে ডুবে থাকার কারণে ঠিকমত কোন আবাদ-ফসল করা যায়নি। আউশ আর আমন ধান- তাও কাটতে হয় হাঁটু পানিতে নিজেকে ডুবিয়ে। এ মাহাতাব রোডের নিচ দিয়ে সমস্ত আখ ক্ষেতের আখগুলো গলা পর্যন্ত পানিতে ডুবে থাকতো। আর আজ বোরিন-তারপরও দেড় মানুষ গর্তের ভেতরে নেমেও পানি তোলা যাচ্ছে না। ছোট বেলায় অর্থাৎ মেজ মামার ঘাড়ে বসে ঘুরে ঘুরে বেড়ানোর বয়সে। সে কতদিন পদ্মা নদী দেখতে গেছে! মামা বলেছে, পলান; মামু- এডিই বাংলাদ্যাশের সবচেয়ে বড় নদী আর এডিই আমারে বাড়ির কাছ দি দিনরাত ছুটি যা। কিরুকুম একটা অহংকারের ব্যাপার না? পলানও ছোট থেকেই তার বুকের ভেতর পদ্মার মতো বড় নদীকে লালন করেছে এবং মেজ মামার ঘাড় থেকে নেমে নিজের পায়ে ভর দিয়ে বারবার সে কমেলা বুবুর শাড়ি ঢাকা শরীরের ভাঁজে ভাঁজে অথবা অসাবধানতায় উন্মুক্ত হওয়া নাভিমূলে সেই পদ্মাকে দেখেছে। তারপর কমেলা বুবুও শুকিয়ে গেছে পদ্মার মতো। উভয়ের বুকে জাগা বালুচরে এখনও প্রাণ জাগেনি। এবং সুফিয়াকেও সে অনেক দেখেছে। এতক্ষণ মনে মনে কষা এই জটিল অঙ্কের উত্তর পেলো পলান-ডিপ বসিয়েও খুব লাভ হবে না।
বাদলের মোড় পার হতেই রাস্তার দু’পাশে ঘন বাঁশঝাড়। ঐ বাঁশঝাড়গুলোর ফাঁকা জায়গাটায় অনেকগুলো ছোট ছোট ছেলেমেয়ে। দু’একজন ঘড়াতে করে পানি ঢেলে দিচ্ছে- আর বাকি সবাই সে পানিতে গড়াগড়ি দিচ্ছে আর বলছে, আল্লা ম্যাঘ দে, পানি দে। ওদের মধ্যেই একজনের হাতে কলাগাছের বাকলের মধ্যে দুটো ব্যাঙ। ওদের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে পলান এবং সে ডুবে যাচ্ছে ওদের ভেতরে।