লোকায়ত ইমারত
ইংরেজ কুঠি
বড়কুঠি : রাজশাহী শহরে সাহেব বাজারের দক্ষিণে ও পদ্মা নদীর উত্তর পাড়ে অবস্থিত ইটের নির্মিত ও সমতল ছাদবিশিষ্ট বড় কুঠি অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ওলন্দাজ রেশম ব্যবসায়ীদের নির্মিত এক উল্লেখযোগ্য কীর্তি। দ্বিতলবিশিষ্ট এই ইমারতটি বিভিন্ন আয়তনের মোট বারোটি কক্ষ নিয়ে গঠিত। নিচের কক্ষগুলো অপেক্ষাকৃত অন্ধকার। খুব সম্ভব নিচতলা এক সময় রেশম দ্রব্যাদি সংরক্ষণ কক্ষ হিসেবে ব্যবহারের সাথে সাথে বন্দিশালা হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। ব্রিটিশ শাসনামলের প্রথম দিকে ইংরেজগণ কর্তৃক সাধারণ মানুষকে ধরে এনে এই ইমারতে আটকে রেখে নির্যাতন, হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হওয়ার কথা এলাকার লোক মুখে শোনাা যায়। ইমারতের দুই দিকে দুটি অষ্টভুজাকৃতির বুরুজ বিদ্যমান। ইমারতটি লোহার তীর-বর্গার সমন্বয়ে নির্মিত সমতল ছাদে আচ্ছাদিত এবং দরজা-জানালা কাঠের তৈরি ভেনিসীয় খড়খড়ি যুক্ত। প্রকৃতপক্ষে ওলন্দাজ ব্যবসায়ীরা জরুরি সময়ে ইমারতটি দুর্গ হিসেবে ব্যবহার করতো। ১৮৩৫ সনে এটি মেসার্স রবার্ট ওয়াটসন অ্যান্ড কোম্পানির অধিকারে এলে ইমারতটি নীল ও রেশম সংরক্ষণাগার হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। পরবর্তীতে ১৮৫৭ সনের সিপাহি বিদ্রোহের সময় বড়কুঠি এই এলাকায় ব্রিটিশদের দুর্গ সদরদপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে ইমারতটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন রয়েছে।
সারদার বড় কুঠি ও ছোট কুঠি : রাজশাহীর চারঘাট থানার অধীন সারদায় ১৭৮১ সনে নীল ফ্যাক্টরি হিসেবে ওলন্দাজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক দু’টি কুঠি নির্মিত হয়। ১৮৩৫ সনে এই কুঠি দু’টি ওলন্দাজদের কাছ থেকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক অধিকৃত হলে ইমারত দুটি রাজশাহী অঞ্চলের ১৫২টি নীলকুঠির প্রধান সদরদপ্তরে পরিণত হয়। পরবর্তীতে ইমারত দুটি মেদনীপুর জমিদারদের কাছারি ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। এরও পরে ব্রিটিশ সরকার ইমারত দুটি ২৫,০০০ হাজার টাকায় অধিগ্রহণ করে সারদা পুলিশ ট্রেনিং কলেজের নিয়ন্ত্রণাধীনে নেয়। বর্তমানে ছোট কুঠি পুলিশ ট্রেনিং কলেজের অধ্যক্ষের বাসভবন এবং বড় কুঠি অফিসার্স মেস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দুটি কুঠিই একতলাবিশিষ্ট এবং একই ভূমি নকশায় নয়টি কক্ষ ও সম্মুখস্থ বারান্দা সমন্বয়ে নির্মিত। দক্ষিণমুখী বারান্দার মধ্য¯’ল সম্মুখে সামান্য বর্ধিত করে ইমারতে ওঠার প্রশস্ত সিঁড়ি এবং বারান্দার সম্মুখে ছয় সেট যুগল ও দুই প্রান্তে চারটি স্তম্ভের দুই সেট তুশকান বা রোমান ডরিক স্তম্ভের উপর সমতল ছাদ নির্মাণ করা হয়েছে। তবে বারান্দার ছাদ অপেক্ষা কক্ষসমূহের ছাদ অপেক্ষাকৃত উঁচু করে নির্মিত। কেন্দ্রীয় হলঘরের দেয়ালের উপরে রঙিন কাঁচ সংযুক্ত জানালা রয়েছে। ছোট কুঠিও ঠিক একই পরিকল্পনায় নির্মিত। শুধুমাত্র এই ইমারতের বারান্দার সম্মুখে আটটি যুগল ও দুই কোণায় চারটি স্তম্ভের দুই সেট তুশকান স্তম্ভের উপর ছাদ নির্মিত হয়েছে এবং ছাদে ওঠার সিঁড়িঘরে একটি গুপ্ত কক্ষ রয়েছে। এছাড়া দুই কুঠির মধ্যে আর তেমন কোনো পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় না। ইমারত দুটি অত্যন্ত সাদাসিধে ভাবে নির্মিত হলেও বেশ আকর্ষণীয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিস-আদালত
রাজশাহী সরকারি কলেজ ভবন
বর্তমানে কলেজের প্রশাসন ভবন হিসেবে ব্যবহৃত এ ইমারতটি ইট, চুন-সুরকি, লোহা ও কাঠের উপকরণে নির্মিত এবং দ্বিতল বিশিষ্ট। ভবনটির ভূমি নকশা ইংরেজি বর্ণ ঐ আকৃতির। সমগ্র ইমারতটি তিনটি ব্লক এবং উভয়তলায় দু’টি বারান্দাসহ মোট এগারোটি কক্ষে বিভক্ত। মধ্যবর্তী ব্লকে একটি হলঘর এবং হলঘরের সম্মুখে একটি টানা বারান্দা বিদ্যমান। বারান্দাটি পাঁচটি অর্ধবৃত্তাকার খিলানে উন্মুক্ত। ভবনটির নিচতলার কক্ষ বিন্যাসের ন্যায় দ্বিতলের কক্ষসমূহও ঠিক একই আয়তনের ও সমসংখ্যক দরজা-জানালায় সন্নিবেশিত। জানালাসমূহ ভেনিসীয় খিলান ও উপরে ঠেসযুক্ত কার্নিশ সংবলিত। তবে দ্বিতলের কিছু জানালা উল্লম্বাকারে ও তদুপরি ঢালু কার্নিশসহ লোহার নির্মিত পিস্তল আকৃতির ঠেসের ওপর টিনের সানশেড নির্মিত। ইমারতটির প্রতিটি দরজা ও জানালাসমূহ ভেনিসীয় খড়খড়ি সংবলিত। ১৮৭৩ সনে দুবলহাটির জমিদার রাজা হরনাথ রায় এবং দিঘাপতিয়ার জমিদার রাজা প্রমদানাথ রায়ের আর্থিক সহায়তায় এ কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলেও ভবনটি নির্মিত হয় ১৮৮৪ সনে। ইমারতটি বাংলার ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের এক উল্লেখযোগ্য নিদর্শন।
কারমাইকেল কলেজ ভবন, রংপুর
বাংলার গভর্নর লর্ড কারমাইকেলের নামানুসারে কলেজটি ১৯১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ৬১০ ফুট দীর্ঘ ও ৬০ ফুট কলেজ ভবনটি বাংলা ঔপনিবেশিক স্থাপত্যে এক উজ্জ্বল নিদর্শন। ভবনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের স্থাপত্যশৈলীর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। ভবনের ছত্রি সংবলিত কর্ণবুরুজ, বারান্দার সম্মুখস্থ খাঁজখিলান, পদ্ম ও কলস শীর্ষদ- সংবলিত গম্বুজ, মার্লন সজ্জিত ছাদপাঁচিল প্রভৃতিতে যেমন মোগল স্থাপত্যের অনুকরণ লক্ষণীয় তেমনি লোহার তীর-বর্গা সমন্বয়ে নির্মিত সমতলছাদ, ব্যালাস্ট্রেড প্যারাপ্যাট, কাঠের খড়খড়ি সংবলিত উল্লম্ব দরজা-জানালা ইত্যাদিতে ইউরোপীয় স্থাপত্যের প্রভাব সুস্পষ্ট। তবে ইমারতটিতে মোগলীকরণই বেশি চোখে পড়ে। এ জন্য ইমারতটিকে ইন্দো-সারাসানিক বা ইন্দো-ইউরোপীয় রীতির স্থাপত্য হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ছাড়াও উত্তরবঙ্গের পুরাতন জেলাশহরে নির্মিত কালেক্টরেট ভবন ও জজকোর্ট ভবন এবং রেলওয়ে স্টেশনগুলো ইউরোপীয় ভাবধারায় নির্মিত।
রাজবাড়ি
পুঠিয়া রাজবাড়ি, রাজশাহী
পুঠিয়ায় নির্মিত পুঠিয়ার জমিদারদের রাজবাড়ি বাংলার ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের এক অনন্য উদাহারণ। দ্বিতল বিশিষ্ট এই রাজবাড়িটি কাছারি অঙ্গন, মন্দিরাঙ্গন, অন্দরমহল ও মহারানি হেমন্তকুমারীর বাসভবন- এই চারটি অঙ্গনে বিভক্ত। মোট ৪.৩১ একর জমির ওপর রাজবাড়িটি অবস্থিত।
রাজবাড়ির সুবিশাল অর্ধবৃত্তাকৃতির তোরণপথ, গাড়িবারান্দা, সম্মুখের করিন্থীয় স্তম্ভ, দ্বিতলের হলঘর, কাঠের সিঁড়ি, ভেনেসীয় খড়খড়ি, ছাদ নির্মাণে লোহার তীর-বর্গার ব্যবহার, পেডিমেন্ট, ভাস্কর্য, কার্নিশের নিচের পাড় নকশা ইত্যাদিতে ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব স্পষ্ট। দ্বিতল ভবনের সম্মুখে ছাদপাঁচিলের অ্যাগ্রিকালচার ফলকের ওপরে চুন-বালির মিশ্রণে ক্লাসিক্যাল গ্রেকো-রোমান স্থাপত্য রীতিতে নির্মিত দন্ডায়মান একটি নারীমূর্তি ও উপবিষ্ট অবস্থায় একটি পুরুষ মূর্তি এবং জাস্টিস ফলকের ওপর দুটি মানবমূর্তি স্থাপিত ছিল যেগুলো বর্তমানে অর্ধভগ্নাবস্থায় বিদ্যমান। বারান্দার দেয়ালে স্থাপিত একটি শিলালিপি অনুসারে রাজবাড়িটি ১৮৯৫ সনে মহারানি হেমন্তকুমারী কর্তৃক নির্মিত হয়। স্থানীয়দের নিকট এই রাজবাড়ি পাঁচআনি নামে পরিচিত। রাজবাড়িটি বর্তমানে বাংলাদেশ প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক সংস্কারাধীন রয়েছে।
দুবলহাটি রাজবাড়ি, নওগাঁ
দুবলহাটি নওগাঁ শহর হতে আনুমানিক সাত কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। দুবলহাটির জমিদাররা স্বীয় আবাসিকতা ও জমিদারি কার্য পরিচালনার জন্য দুবলহাটিতে নির্মাণ করেন এক সুদৃশ্য ও সুবিশাল রাজবাড়ি। দ্বিতল বিশিষ্ট এই রাজবাড়ি ২.৪৫ একর ভূমির ওপর নির্মিত। সামগ্রিকভাবে এই রাজবাড়ির ভূমি নকশা চারটি অঙ্গনে বিভক্ত যথা- (ক) নাটমহল অঙ্গন; (খ) কাছারি অঙ্গন; (গ) অন্দরমহল অঙ্গন ও (ঘ) রন্ধনশালা অঙ্গন। এই অঙ্গনসমূহকে কেন্দ্র করেই রাজবাড়ির নিচতলা ও দ্বিতলে শতাধিক কক্ষ নির্মিত হয়েছে।
ভবনের সম্মুখাংশের মধ্যস্থলে রয়েছে অর্ধবৃত্তাকৃতির খিলান বিশিষ্ট একটি সুউচ্চ প্রবেশতোরণ। তোরণ ও বারান্দার সম্মুখে রয়েছে চারটি করে মোট আটটি সুউচ্চ করিন্থীয় স্তম্ভ। রাজবাড়ির অভ্যন্তরে নাটমহল অঙ্গনের পশ্চিম দিকে রয়েছে সমতল ছাদবিশিষ্ট একটি অনন্য সুন্দর নাট্যমঞ্চ। রাজবাড়ির প্রতিটি কক্ষ লোহা ও কাঠের তীর-বর্গার সমন্বয়ে নির্মিত সমতলছাদে আচ্ছাদিত। এই রাজবাড়ির অত্যন্ত আকর্ষণীয় অলঙ্করণ রয়েছে রঙ্গমঞ্চ ও ইমারতের সম্মুখ গৃহমুখের ছাদপাঁচিলে। রঙ্গমঞ্চের ছাদপাঁচিলে চুন-বালির সংমিশ্রণে নির্মিত পেঁচানো লতাপাতা বেষ্টিত মেডেল নকশা ও প্রাচীন গ্রিক স্থাপত্যে ব্যবহৃত মানবমূর্তি সংবলিত অলঙ্করণ ভাস্কর্য বিদ্যমান। ঠিক একইভাবে প্রাসাদের উত্তর গৃহমুখের ছাদপাঁচিলও মানবমূর্তি সংবলিত অত্যন্ত আকর্ষণীয় অলঙ্করণ ভাস্কর্যে সজ্জিত। পেঁচানো লতাপাতা সজ্জিত ছাদপাঁচিলের মধ্যস্থলে একটি মেডেলাকৃতির রাজকীয় পদমর্যাদা পরিচায়ক প্রতীক নকশাও বিদ্যমান। রাজবাড়িটি ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে নির্মিত বলে অনুমান করা হয়।
নাটোর রাজবাড়ি
উত্তরবঙ্গ তথা সমগ্র বাংলার জমিদারদের ইতিহাসে নাটোর জমিদারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রানী ভবানী ছিলেন নাটোর রাজবংশ তথা তদানীন্তন সমগ্র বাংলার জমিদারকুলের একজন প্রথিতযশা মহারানী। নাটোর জেলা সদরে অবস্থিত নাটোর রাজবাড়ি প্রায় ৫০.৪২ একর জমির ওপর নির্মিত। রাজবাড়ি এলাকায় মোট নয়টি লোকায়ত ইমারত রয়েছে। এগুলো হলো বড়তরফ ও ছোটতরফের রাজপ্রাসাদ, বড়তরফের কাছারি ভবন, গার্ডহাউজ ও মালখানা, রানী মহল, অতিথিশালা, মধুরানী ভবন, ছোটতরফের কাছারি ভবন, কর্মচারীদের আবাসস্থল ইত্যাদি। এগুলোর মধ্যে কেবল দুটি ইমারতের স্থাপত্য বর্ণনা করা হলো :
রাজপ্রাসাদ (বড়তরফ) : উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত আয়তাকার ভূমি পরিকল্পানায় নির্মিত এই ভবনটি কেন্দ্রীয় অভ্যর্থনা হলঘরকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন আয়তনের মোট বারোটি কক্ষ ও চারদিকে চারটি বারান্দায় বিভক্ত। হলঘরে আলো ও বায়ু প্রবেশের জন্য চার দেয়ালের উপরিভাগে ভেনিসীয় খিলান বিশিষ্ট জানালা এবং তিনটি করে ফ্যানলাইট বিশিষ্ট প্রবেশপথ রয়েছে। ভবনটির দক্ষিণ বারান্দার সম্মুখে রয়েছে একটি গাড়ি বারান্দা। ইমারতের প্রতিটি কক্ষের প্রবেশপথ ভেনিসীয় খড়খড়ি সংবলিত। এছাড়া ভবনটির প্রতিটি কক্ষ ও বারান্দার মেঝে এবং সিঁড়িপথ মার্বেল পাথরে আচ্ছাদিত। অভ্যর্থনা হলঘরসহ অন্যান্য কক্ষসমূহের অভ্যন্তরের দেয়ালগাত্রে রঙ তুলিতে চিত্রিত পেঁচানো লতাপাতা ও ফুলদানি সংবলিত পাড়নকশা রয়েছে।
রাজপ্রাসাদ (ছোটতরফ) : ইমারতটি আনন্দকালী পুকুরের পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত। এই ভবনটিও বড়তরফের প্রাসাদের ন্যায় একতলা বিশিষ্ট এবং কেন্দ্রীয় অভ্যর্থনা হলঘরকে কেন্দ্র করে ছোট-বড় মোট পনেরোটি কক্ষে বিভক্ত। মূলত পূর্বমুখী এই প্রাসাদটির পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণে তিনটি বারান্দা রয়েছে। পূর্ব বারান্দার সম্মুখে রয়েছে একটি গাড়ি বারান্দা। প্রাসাদের প্রতিটি কক্ষ ও বারান্দা লোহার নির্মিত তীর-বর্গার সমন্বয়ে সমতল ছাদে এবং তিনটি বারান্দার মেঝে শ্বেত ও কৃষ্ণ প্রস্তরে আচ্ছাদিত। ইমারতটির বহির্ভাগের দেয়ালগাত্র পলেস্তারায় কর্তিত বেশ কিছু আকর্ষণীয় অলঙ্করণে সজ্জিত। ইমারতের চারিদিকে কার্নিশের নিচে একটি প্রশস্ত টানা পাড়নকশা রয়েছে। পাড় নকশাটি পলেস্তারায় কর্তিত ফুল, নারী মূর্তি এবং পেঁচানো লতাপাতায় শোভিত। গাড়ি বারান্দার ছাদের সম্মুখভাগের ছাদপাঁচিল একটি মেডেলাকৃতির রাজকীয় পদমর্যাদা সূচক প্রতীক নকশার পাশ দিয়ে উত্থিত পেঁচানো লতাপাতা ও ক্লাসিক্যাল গ্রিক স্থাপত্যে ব্যবহৃত মানবমূর্তি সংবলিত অলঙ্করণ ভাস্কর্যে সজ্জিত। প্রতীক নকশার ওপরে একটি সুদর্শনা নারী এবং তার দুই পাশে উপবেশনরত দুটি অর্ধনগ্ন নারী মূর্তি দৃশ্যমান। নির্মাণশৈলী দৃষ্টে ইমারত দুটি ১৮৯৭ সনের ভূমিকম্পের পরে অর্থাৎ বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে নির্মিত বলে অনুমিত হয়।
দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি
নাটোর শহর হতে আনুমানিক তিন কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি অবস্থিত। প্রায় ৪১.৫০ একর জমির ওপর দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি নির্মিত। উত্তরবঙ্গের রাজবাড়িসমূহের মধ্যে কেবলমাত্র দিঘাপতিয়া রাজবাড়িই বর্তমানে সুসজ্জিত অবস্থায় বিদ্যমান। ১৯৬৭ সনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর জনাব আব্দুল মোনায়েম খান এই রাজবাড়িকে ‘গভর্নর হাউজ’ হিসেবে উদ্বোধন করেন এবং ১৯৭২ সনে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই গভর্নর হাউজের নামকরণ করেন ‘উত্তরা গণভবন’। বর্তমানে এই রাজবাড়িতে স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন চারটি অট্টালিকা রয়েছে। এগুলো হলো প্রবেশতোরণ, প্রধান রাজপ্রাসাদ, কুমার প্যালেস ও খাজাঞ্চিখানা।
প্রবেশতোরণ
রাজবাড়িতে প্রবেশের একমাত্র সুউচ্চ খিলানবিশিষ্ট তোরণপথটি পূর্ব বহির্প্রাচীরের মধ্যস্থলে অবস্থিত। তিনতলায় নির্মিত এই তোরণপথের দুই পার্শ্বে পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত একই পরিকল্পনা ও একই আয়তনের সমসংখ্যক কক্ষ রয়েছে। দুই পার্শ্বে অবস্থিত কাঠের নির্মিত দুটি পেঁচানো সিঁড়ি দিয়ে তোরণপথের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় ওঠা যায়। তৃতীয় তলার কক্ষের মধ্যে একটি বিশাল ঘড়ি স্থাপিত রয়েছে। সর্বোচ্চ এই কক্ষটির উপরিভাগে স্থাপিত সমতল ছাদের ওপরে পিরামিড আদলের একটি চৌচালা ছাদ বিদ্যমান। সমগ্র ইমারতটির বহির্দেয়ালগাত্র লাল রঙে রঞ্জিত।
প্রধান প্রাসাদ ভবন
একতলাবিশিষ্ট সুবিশাল এই ভবনটি চারদিকে চারটি বারান্দা এবং কেন্দ্রীয় অভ্যর্থনা হলঘর ও ডাইনিং হলকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন আয়তনের মোট চৌত্রিশটি কক্ষে বিভক্ত। এছাড়া একটি সম্মেলন কক্ষ, একটি গোপন কক্ষ, নয়টি শয়ন কক্ষ এবং কয়েকটি সাজকক্ষ ও স্নানকক্ষ রয়েছে। অভ্যর্থনা হলঘরের উপরিভাগে আলো ও বায়ু প্রবেশের জানালা রয়েছে। ইমারতের পূর্ব গৃহমুখের মধ্যস্থলে গাড়ি বারান্দাসহ এর প্রধান প্রবেশপথ বিদ্যমান। উত্তর দিকের বারান্দা উঠানের ন্যায় উন্মুক্ত। অন্যদিকে পশ্চিমের বারান্দা কৌণিক খিলানসারি, দক্ষিণের বারান্দা ত্রিভাঁজ বিশিষ্ট খিলানসারি এবং পূর্ব বারান্দা কৌণিক ও ত্রিভাঁজ বিশিষ্ট খিলান সারিতে উন্মুক্ত। অভ্যর্থনা হলঘরের উপরে ১৯৬৭ সনে একটি বিশাল আকৃতির গম্বুজ স্থাপিত হলেও সমগ্র ইমারতটির উপরিভাগ লোহার তীর-বর্গায় নির্মিত সমতলছাদে আচ্ছাদিত। প্রাসাদের বারান্দায় ওঠার সিঁড়িপথ, বারান্দা ও কক্ষের মেঝে শ্বেত ও কৃষ্ণ মর্মর পাথরে আবৃত। অভ্যর্থনা হলঘরের উপরিস্থিত গম্বুজ তারা নকশা খচিত এবং কলসচূড়া সংবলিত শীর্ষদন্ডে শোভিত। প্রাসাদের দক্ষিণ বারান্দার সম্মুখে রয়েছে একটি সুসজ্জিত ফুলের বাগান। বাগানে একটি জলফোয়ারা এবং চার কোনায় প্রাচীন গ্রিক স্থাপত্য অনুকরণে মার্বেল পাথরে নির্মিত চারটি নারী মূর্তি দন্ডায়মান রয়েছে। ইমারতটি ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে অথবা বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে নির্মিত বলে অনুমিত হয়।
দিনাজপুর রাজবাড়ি
দিনাজপুর জমিদারি বাংলার প্রাচীন জমিদারিসমূহের অন্যতম। দিনাজপুর শহরের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে প্রায় ১৬.৪১ একর জায়গা জুড়ে (পরিখা ও পুকুরসহ) এই রাজবাড়ি অবস্থিত। বিশাল এই রাজবাড়ির ইমারতসমূহ বর্তমানে অত্যন্ত জরাজীর্ণাবস্থায় বিদ্যমান। মূলত এই রাজবাড়ি আয়না মহল, রানীমহল ও ঠাকুরবাড়ি মহল নামে তিনটি মহলে বিভক্ত। রাজবাড়িতে প্রবেশের জন্য খিলানবিশিষ্ট প্রধান প্রবেশতোরণ ও সিংহতোরণ অত্যন্ত আকর্ষণীয়। সুউচ্চ তোরণদ্বার দিয়ে প্রাসাদ চত্বরে প্রবেশ করলে বামদিকে কৃষ্ণ মন্দির, সম্মুখে কয়েকটি পরিত্যক্ত বাসগৃহ এবং ডানদিকের আরেকটি প্রবেশতোরণের পর একটি বর্গাকার অঙ্গন পরিলক্ষিত হয়। উন্মুক্ত অঙ্গনের পশ্চিম দিকে পূর্বমুখী সমতল ছাদ বিশিষ্ট একটি নাট মন্দির বিদ্যমান। নাট মন্দিরের ঠিক পশ্চাতেই রয়েছে রানীমহল। দ্বিতল বিশিষ্ট এই ইমারতটি একটি বর্গাকার উন্মুক্ত অঙ্গনকে কেন্দ্র করে নির্মিত। বর্তমানে ইমারতটি ভগ্নাবস্থায় বিদ্যমান। রানীমহলের ঠিক পূর্ব দিকে ধ্বংসোন্মুখ অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে রাজবাড়ির প্রধান প্রাসাদভবন। দ্বিতল বিশিষ্ট এই ভবনটির গৃহমুখ বেশ আকর্ষণীয়। ইমারতটির বারান্দার সম্মুখে রয়েছে এক সারি চমৎকার তুশকান স্তম্ভ। দ্বিতলে এই স্তম্ভ সারিটি যুগলভাবে নির্মিত। ইমারতটির ছাদপাঁচিলের মধ্যস্থলে একটি বক্রাকার দেয়াল ফলকে রিলিফ পদ্ধতিতে রচিত রাজমুকুট পরিহিত পরস্পরমুখী দুটি হস্তী উৎকীর্ণ রয়েছে। ভবনটির দ্বিতলের ঝুলবারান্দার ঠিক পশ্চাতেই রয়েছে একটি বিশাল হলঘর। মূলত এই হলঘরের মেঝে মার্বেল প্রস্তরে আচ্ছাদিত ছিল। হলঘরটি লোহার নির্মিত তীর-বর্গার সমন্বয়ে সমতল ছাদে আচ্ছাদিত। এক সময়ের অত্যন্ত জৌলুসপূর্ণ এই প্রধান প্রাসাদ ভবন বর্তমানে ধ্বংসাবস্থায় বিদ্যমান।
তাজহাট রাজবাড়ি, রংপুর
বৃহত্তর রংপুর জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে একসময় বেশ কিছু বিখ্যাত জমিদারির অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল। এই জমিদারি সমূহের নির্মিত অত্যন্ত সুন্দর সুন্দর রাজবাড়ি ছিল যেমন- তাজহাট, ডিমলা, কাকিনা, কুন্ডি, বর্ধনকোট, তুষভান্ডার, মন্থনা, পীরগঞ্জ ইত্যাদি। তবে এসব জমিদারির মধ্যে কেবলমাত্র তাজহাট জমিদারদের নির্মিত প্রাসাদটি ব্যতীত অন্যান্য জমিদারদের নির্মিত প্রাসাদসমূহ প্রায় সবই ধ্বংসপ্রাপ্ত।
রংপুর জেলা শহরের বাইরে ৩ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে তাজহাট প্রাসাদ অবস্থিত। পূর্বমুখী ও দ্বিতল বিশিষ্ট অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ এই প্রাসাদটির সম্মুখভাগ প্রায় ৭৬.২২ মিটার দীর্ঘ। প্রাসাদের সম্মুখভাগের কেন্দ্রীয় অংশে রয়েছে একটি বিশাল গাড়ি বারান্দা এবং গাড়ি বারান্দার ওপরে সরাসরি দ্বিতলে ওঠার জন্য রয়েছে মসৃণ সাদা প্রস্তরে আচ্ছাদিত একটি সুবিশাল সিঁড়িপথ। প্রাসাদটির ছাদের কেন্দ্রীয়ভাগে রয়েছে অষ্টভুজাকৃতির পিপার ওপর স্থাপিত একটি লম্বিত শিরাল রেনেসাঁ গ¤ু^জ। গম্বুজটি আংশিকভাবে কতকগুলো করিন্থীয় সরু স্তম্ভের ওপর স্থাপিত। প্রাসাদ গৃহমুখের দুই প্রান্তে অষ্টভুজাকৃতির দুটি বহির্গত অংশ রয়েছে। প্রাসাদটির গাড়ি বারান্দার ওপরের ঝুলবারান্দার ছাদ চারটি আকর্ষণীয় করিন্থীয় স্তম্ভের ওপর স্থাপিত। প্রাসাদটির নিচতলার প্রবেশপথের পরেই রয়েছে একটি বিশাল হলঘর। ভবনটির দুইতলায় সর্বমোট প্রায় বাইশটি কক্ষ রয়েছে।
তাড়াশ রাজবাড়ি, পাবনা
অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও দ্বিতল বিশিষ্ট এই ইমারতটি পাবনা শহরের মধ্যে প্রধান সড়কের পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত। একটি অর্ধবৃত্তাকৃতির খিলান বিশিষ্ট তোরণপথ দিয়ে পূর্বমুখী এই প্রাসাদ চত্বরে প্রবেশ করতে হয়। তোরণপথের উভয় পার্শ্ব যুগল-ডরিক স্তম্ভে সুসজ্জিত। ইমারতটির সম্মুখে একটি অভিক্ষিপ্ত দ্বিতল গাড়ি বারান্দা বিদ্যমান। গাড়ি বারান্দার উপরিস্থিত ছাদ সুবিশাল চারটি করিন্থীয় স্তম্ভের ওপর স্থাপিত। ইমারতটির উভয় শেষ প্রান্তে করিন্থীয় শীর্ষ সংবলিত আয়তাকৃতির পিলাস্টারসহ আরো দু’টি অভিক্ষিপ্ত অংশ রয়েছে। প্রাসাদটিতে প্রায়শই অর্ধবৃত্তাকৃতির খিলান ব্যবহৃত হয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে নির্মিত এই প্রাসাদটি এখনো সুরক্ষিত অবস্থায় বিদ্যমান।
উল্লিখিত রাজবাড়িগুলোর নির্মাণশৈলীতে মুসলিম স্থাপত্য-ঐতিহ্যের সাথে সাথে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে আধুনিক ইউরোপীয় নির্মাণরীতির সংমিশ্রণ ঘটানো হয়েছে। যেমন ইট দিয়ে নির্মিত প্রাসাদগুলোর গঠন কাঠামোর সমতল ছাদে লোহা কিংবা কাঠের তীর-বর্গা, ক্লাসিক্যাল তুশকান, আইওনীয় ও করিন্থীয় স্তম্ভ, দরজা-জানালায় কাঠের তৈরি ভেনিসীয় খড়খড়ি, ভেনিসীয় জানালা, ফ্যানলাইট, পেডিমেন্ট, গাড়িবারান্দা, ব্যালাস্ট্রেড কাঠের সিঁড়ি, অলঙ্করণে নর-নারী বা অন্য কোনো জীবজন্তুর ভাস্কর্য প্রভৃতি ইউরোপীয় বৈশিষ্ট্যের সাথে খিলান ও গম্বুজ এবং অলঙ্করণ বিষয়বস্তু হিসেবে অ্যাকান্থাসপত্র, পেঁচানো লতাপাতা, গোলাপ নকশা, জ্যামিতিক নকশা ইত্যাদি মুসলিম স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের সংমিশ্রণ সহজেই লক্ষণীয় যা ইমারতগুলোকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এসব ইমারত সামগ্রিকভাবে বাংলার ঔপনিবেশিক স্থাপত্য নামে পরিচিত।