বাতাসে মৃদু মৃদু শৈশবের গন্ধমাখা। বাতাসটা ভারী চেনা। আকাশজুড়ে বিশাল একটা চাঁদ এসে যেন প্রায় ঘরের উঠানে পড়েছে। রমিজ উদ্দিনের ঘরে প্রচণ্ড অভাব হাহাকার। কিন্তু তার মুখে মৃদু হাসি। এ জীবনে থাকার মধ্যে আছে তার পরিবার সাজিদা অত্যন্ত রূপবতী কিশোরী কন্যা ছিলো। সাজিদার গাত্র বর্ণ শ্যামলিয়া কিন্তু মুখাবয়ব অত্যন্ত মায়াকাড়া। অভাব অনটনে জমিজমা বিক্রয় করতে করতে তার এই ভিটে ছাড়া আর কিছু নাই। আর সাজিদার রূপও ম্লান হয়ে গেছে। প্রত্যেক সন্ধ্যায় রমিজ ঘরের উঠোনে এসে বসে। আর আকাশে চাঁদ থাকলে তার বসা সার্থক হয়। বিধাতা এই পৃথিবীর শোভা বর্ধন করার জন্য একটা চাঁদকে দিয়ে রেখেছেন। তার কত বড় বিবেচনা। রমিজ চাঁদের দিকে তাকিয়ে এইসব ভাবে।
রমিজ ক্ষণপরে আলামিন ও রতনকে ডাক দেয়। আলামিন আর রতন পড়া ফেরে দৌড় দিয়া আসে। “তোমার পছন্দ কারে? তোমার মা, না বাবা?” দুই ছেলে একসাথে বলল, “তোমাকে পছন্দ আমার।”
“আচ্ছা! বড় হয়ে তোমার কার মতো হতে চাও?”
দুই ছেলে একই সাথে বলে, “তোমার মতো হতে চাই।”
“তোমার বাবা নিষকর্মা, ঘুমায় আর খায় আর এই চানরে দেখে! এতে কোন লাভ হইবে? আমার মতো কেন হতে চাও?”
“বাবজান কারণ হইলো গিয়া তোমার মইধ্যে কোন চিন্তা নাই, আর আম্মার মধ্যে খালি চিন্তা।”
“তোমাদের ঢাকার একটা উদ্দেশ্য আছে। তোমরা বলতেছো তোমাদের বাপজানের কোন চিন্তাই নাই। তোমার বাপজান মুখে হাসি দিয়া সারাক্ষণ ভাবে কেমনে তোমাদের ভবিষ্যৎ ভালো হইব।
আমি নতুন একটা জিনিসের গবেষণা নিয়েছি। তোমাদের দুঃখের দিন আইজ শেষ। তোমার মায়েরও ডাইকা এখানে আনো যাও।”
ছেলে দুইটা দৌড় দিয়ে তাদের মাকে ঢেকে আনে। সাজিদা সবসময় ঘোমটা টেনে রাখে তাদের বিয়ে হয়েছে প্রায় ১০ বছর তবুও তার মধ্যে লজ্জার কমতি নাই।
“বউগো, আমার পাশে বসো। তুমি সারাজীবন লাকড়ি চুলায় রান্না করে তোমার দেহ পোড়াচ্ছো, আমি উঠোনে বসে দেখি। তোমার খুশির খবর দিব। আমি নতুন আবিষ্কার নিয়েছি। সেইটা একটা খাদ্যদ্রব্য যার নাম অমৃতসুধা। তুমি আমাকে বানাইয়া দিবা আমার বলা মত। আমার উঠোনে হাজার হাজার মানুষের ভিড় বসবো। তুমি বউ এই দশ বছরের কত বেলা খাও না? বল!”
“আপনি তো আমাকে সব বেলাই তো খাওয়াইছেন।”
“বউ, তুমি কোন বেলা অনাহারে ছিলা, তারপরও তোমার মুখে হাসি আমি তোমার হাসির মধ্যে দিয়ে ক্ষুধার্তকে খুঁজছি।”
“আমি আপনার জন্য বুট বাজছিলাম। আপনার জন্য নিয়া আসি।”
“চাঁদ প্রত্যেকদিন দেখি, প্রত্যেকদিনই চাঁদ নতুন লাগে। সবাই চাঁদ উঠলে একবার আকাশে তাকায়।
বউ! তুমিও আমার আন্ধার ঘরের চাঁদ। তুমিও প্রত্যেক দিন নতুন! তোমাকে আমি কি দিব বলো? তুমি কি চাও বলো?”
সাজিদার চোখ ভর্তি পানি! মানুষটা মানুষটা তারে বড্ড ভালোবাসে তা সে পদে পদে টের পায়। সেই এইটুকুন এই ঘরে বউ হয়ে এসেছিলো। তখন তার বয়স পনেরো বছর। আজ দেখতে দেখতে দশ বছর হয়ে গেলো।
২.
পরের দিন সকালে সাজিদা বড় একটা মাটির ডেকসিতে অমৃত সুধা বানায়। পাঁচটা উপাদান দিয়ে বানানো। সাজিদা চারটা উপাদানের নাম জানে। কিন্তু একটা উপাদানের নাম জানে না। তবে জিনিসটা অত্যাশ্চর্য হয়েছে।
সাজিদা উপাদানগুলো মনে করার চেষ্টা করে।
১. মাসরুমের গুঁড়া
২. কালজিরা
৩. ডুমুরের ফল
৫. …………..
কিন্তু পাঁচ নাম্বারটা আলামিনের বাপ সাজিদাকে বলেনি। এক গ্লাস শরবত খেয়ে সাজিদার প্রাণ জুড়িয়ে যায়। তার মনে হয় সে সুখের পৃথিবীতে আছে। মনে হয় সে বেহেশতের কোন সুধা খাচ্ছে। বাসার সামনে হাতে লেখা বড় বড় পোস্টার লাগানো হয়েছে। পোস্টারে লেখা : অমৃত সুধা তৃষ্ণা নিবারক, নিদ্রাদায়ক, ক্লান্তি নাশক। বিকেলের দিকে লোক আসতে শুরু করে। আস্তে আস্তে বাসাটা লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। রমিজ উদ্দিন সাজিদাকে বলে তুমি আরেক ডেকচি বানাও আর আলামিন রতনকে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও। পাঁচ নাম্বারটা আমি মিশাবো। শরবত বিক্রি করতে করতে রমিজ উদ্দিন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আর ডেকচির পর ডেকচি এনে সাজিদা পাগল প্রায় হয়ে যায়। সে লুকিয়ে লুকিয়ে এক গ্লাস করে শরবত খেতে থাকে। আর সাথে সাথে মনে হয় তার অবসাদ উড়ে গিয়ে সে প্রশান্তি ডানায় ভর করে উড়তে থাকে। বারোটার দিকে আরেকটা হাতে লেখা কাগজ টানিয়ে দেয়া যাতে লেখা : শরবত বিক্রি আজ বন্ধ, আবার কালকে আসবেন।
৩.
সাজিদা এতো টাকা একসাথে কখনো দেখেনি। একদম টাকার বস্তা হয়ে গেছে। টাকা গুনা হচ্ছে। রমিজ উদ্দিন বলল, “বউ জানো পৃথিবীর সবচেয়ে মাজার কাজ কোনটা? মজার কাজ হলো, টাকা গোনা। এই সব টাকা আমি তোমার জন্য ব্যয় করবো।”
রমিজ বলল, বউ বড় একটা মোটকা কিনতে হইবে। ওইটার মধ্যে শরবত বানাইয়া রাখবো। কারণ আইজ আরও বেশি বিক্রি হইবে।
রুমিজ দোকানে গিয়ে সাজিদার জন্য বেশ সুন্দর দেখতে শাড়ি, দুইটা ব্লাউজ ও একটা পেটিকোট আনে। শরবতের জন্য কল লাগানো বিরাট একটা মোটকা আনে। আর সবার জন্য প্যাকেট খানা হাট থেকে নিয়ে আসে। খাবার নিয়ে রমিজ উদ্দিন বসে আকাশের দিকে তাকায়। তার মুখভর্তি হাসি। হঠাৎ তার হাসি ম্লান হয়ে গিয়ে চোখে মুখে রাগ ফুটে ওঠে।
“সাজিদা, তোমার জন্য নতুন শাড়ি আনছি, এইটা পর নাই কেন? এখনি যাও নীল রঙেরটা পইরা আসো। চান্দের সাথের নীলের মিলন হয়। তাই নীল রঙা শাড়িটা পরবো।”
সাজিদা নীল রঙের শাড়িটা পরে চাঁদকে তার সামনে রেখে খুব মিষ্টি হাসি দিয়ে রমিজের সামনে দাঁড়ায়। রমিজ খুব হাহাকার করে সঙ্গে সঙ্গে বলে, আহারে আল্লাহ আমাকে কি ধন দিছে, আমি তার মূল্য বুঝি নাই। চাঁদের নাহান সুন্দর আমার বউ। ছুটির ফলার মতো চকচকে দুপুরের রৌদ্রে সকাল এসেছে রমিজের উঠোনে। সবেদা গাছটি মৃদু হাওয়ায় খুব দুলছে। রৌদ্রের প্রখরতা খুব বেশি কিন্তু অসহনীয়তার নেই, খুব হালকা রৌদ্র। পাশের দীঘি থেকে সোদা গন্ধে মন মাতিয়ে যাচ্ছে। মৌরি মৌতাত খানিকটা মেশানো গন্ধে। শয়ে শয়ে মানুষ শরবতের জন্য রমিজের উঠোন ভিড় করছে। ডাক্তারের কাছে লোকসমাগম কমে যাচ্ছে আর রমিজের ব্যবসা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজকে একটু ভিন্ন কিছু ঘটনার উদয় হলো রমিজের বাসায়। বিশাল এক পাজেরো গাড়িতে মধ্য বয়স্ক এক রমণী রমিজের সাথে দেখা করতে এসেছেন। তার হাতে রমিজের জন্য কিছু গিফট। পায়জামা, পাঞ্জাবি, একটা শাড়ি আর কিছু খেলনা। মহিলা রমিজের শোবার ঘরে অপেক্ষা করছে। সাজিদা তাকে বাতাস করছেন। কিছুক্ষণ পর রমিজ এসে পড়ে।
“আস্সালামু আলাইকুম, অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলেন, এইবার বিষয়টা বলেন।”
“আমার কাছে একটা গল্প আছে। আপনাকে গল্পটা শুনতে হবে।”
“আচ্ছা বলেন দেখি কি গল্প!”
আমার হাজব্যান্ডের মৃত্যুর দিন ডাক্তার ধার্য করে ফেলেন। ডাক্তার বললেন, তিনি বাঁচবেন আর মাত্র সাতদিন। তো এর মধ্যে তার যা পছন্দের খাবার আমার তাকে চাওয়া মাত্রই এনে দেই।
একদিন সে শখ করে বললেন আমাকে, কালিজিরা আর মধুর শরবত খাব। এটা আমার শেষ ইচ্ছা। আমার এই জিনিস খেয়ে মারা যাওয়ার ইচ্ছা। আমার এ রকম ব্যতিক্রম শরবতের খোঁজ করতে লাগলাম। পরে এক লোক আমাকে আপনার ঠিকানা দিলেন। আমি খুব বেশি পরিমাণে এই শরবত কিনে আনি। কারণ, আমার ছোট ছেলেটাও অনেক অসুস্থ। আমি শরবত নিয়মিতভাবে খাওয়ানো শুরু করি। এক পর্যায়ে আমার স্বামী ও ছেলে অবিশ্বাস্যভাবে সুস্থ হয়ে ওঠে। এখন আমি আপনাকে একটা প্রস্তাব দিব। তার আগে বলে নেই। আপনি জানেন না আমাদের পরিবারটা কত সমৃদ্ধ। আমি জানি, আপনি শরবত বানানোর ফরমুলো আমাকে বলবেন না। তাই আমি চাই আপনি আমাদের পারিবারিক বাবুর্চি হয়ে প্রতিদিন দুইবেলা এই অমৃতসুধা বানাবেন। আমি আপনার পরিবারের ভরণপোষণের জন্য সমস্ত খরচ আমার সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। আপনি ভেবে দেখুন।”
“আফা, আপনে আমাকে যা কিছু বললেন, এই অমৃত সুধার জন্য বললেন। মানে আপনার অমৃত সুধা দরকার। আপনে এই জন্য ব্রিফকেস ভইরা টাকা নিয়া আসছেন। আর আমারও এক ধরনের অমৃত সুধা আছে। যেটা ছাড়া আমি বাঁচবো না। আমি মারা যাবো।”
“সেটা কি?”
রমিজ উদ্দিন হাউ মাউ করে কেঁদে তার দুই ছেলে মানিক রতনকে বুকে চেপে ধরে। তারপর সাজিদা মুখে দুই হাত দিয়ে আলতোভাবে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, এরা আমার অমৃত সুধা!, এরা আমার অমৃত সুধা! এদের চোখে মুখে তাকালে আমি আমার অমৃত সুধা খুঁইজা পাই। এদের ছাড়া আমি একমুহূর্ত বাঁচবো না। আমার চকচকো এমিটিশন দেখাইন্যা। আমি আমার সোনা চাই। আপনি চলে যান। আপনি চলে যান!