সাহিত্য আকাশ থেকে পড়ে না, মাটিতেই জন্মায়। যে মাটিতে সাহিত্য জন্মায়, সেই মাটির বৈশিষ্ট্য সেই সাহিত্যে প্রচুর পরিমাণেই পাওয়া যায়। প্রকৃতপক্ষে সাহিত্য হচ্ছে একটা জাতির জীবনের, তার জীবনাদর্শের, তার সুখ-দুঃখের, তার আশা-আকাক্সক্ষার নিখুঁত প্রতিচ্ছবি।
ইংরেজি-সাহিত্যের কথাই ধরা যাক। প্রাথমিক যুগের ইংরেজি-সাহিত্যে গৌরবের বস্তু হচ্ছে ইংরেজি বাইবেল, (Old & New Testaments) স্পেনসারের Fairy Queen আর Canterbury Tales. এই সব গ্রন্থ জাতির সেই সময়ের জীবনের বৈশিষ্ট্যই প্রকাশ করে। আজ মানুষের ধর্ম নিয়ে কারবার। তাই রাজা-বাদশাহ, আমির-ওমরাহ, রানী, রাজকুমারী, সামন্ততন্ত্র, সামন্ততন্ত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত সমাজ-এই সব নিয়েই ছিল কারবার। সুতরাং এই সবের প্রতিচ্ছবিই সে-যুগের সাহিত্যে দেখতে পাই।
তারপর এল রানী এলিজাবেথের আর কবি শেকসপিয়ারের যুগ; ড্রেক ওয়ালটার র্যালে, বেকনের যুগ। ইংল্যান্ডে তখন নূতন জীবন, নূতন আশা, নূতন আকাক্সক্ষা দেখা দিয়েছে। পুরাতন বিশ্বাস শিথিল হয়েছে, নূতন বিশ্বাস এসে দেখা দিয়েছে। পুরাতন আদর্শ নিবন্ত প্রদীপের মত প্রাণহীন হয়ে পড়েছে, নূতন আদর্শ প্রজ্বলিত আগুনের মত চারিদিকে তার শিখা বিস্তার করেছে। চারিদিকে নূতনের আগমন-গীত আর পুরাতনের মরণোন্মুখ প্রাণহীনতা। এলিজাবেথ-যুগের সাহিত্য এই সমাজ ও জীবনেরই বিকাশ এবং প্রকাশ। এর প্রতিচ্ছবি আমরা সে-যুগের ইংরেজি সাহিত্যে দেখতে পাই।
শেকসপিয়ারে ধর্মের কথা আছে বটে, কিন্তু দ্যাঁতের (Dante) লেখায় যেমন ধর্মজীবনই মধ্যমণি, শেকসপিয়ারের লেখায় ঠিক তেমনটি মিলে না। সেখানে ধর্ম হচ্ছে জীবনের অন্যতম কাম্য, একমাত্র কামনা নয়। প্রেমের চেয়ে কম তার উন্মাদনা, রাজনীতির চেয়ে কম তার গুরুত্ব, দর্শনের চেয়ে কম তার মনের দাবি আর অধিকার। ইংরেজ তখন খ্রিস্টধর্ম নিয়ে গর্ব করে না। তারা গর্ব করে মাতৃভূমি ইংল্যান্ড নিয়ে। ইংরেজ-মনীষী পরলোকের চিন্তায় বিভোর হন না, বিভোর হন প্রকৃতির রহস্য নিয়ে, ইংরেজ যোদ্ধা দূর প্যালেস্টাইনে মুসলমানদের সঙ্গে ধর্মযুদ্ধ করার জন্য আর অন্তরের প্রেরণা অনুভব করে না; সে অন্তরের প্রেরণা অনুভব করে প্রতিবেশী ফরাসি খ্রিস্টানদের সঙ্গে, রাজ-আত্মীয় স্পেনীয়দের সঙ্গে যুদ্ধ করবার জন্য। ইংরেজ যুবকের মনে স্বর্গের স্বপ্নের চেয়ে তার প্রেমিকার স্বপ্নই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে বেশি। এই যে নূতন সমাজ, তার ছবিই সে-যুগের ইংরেজি সাহিত্যে আমরা দেখতে পাই। যেসব যুগের সাহিত্য হচ্ছে সমসাময়িক জীবন এবং মনেরই প্রতীক।
তারপর এলো বিলাস-বিরোধী, আনন্দ-বিরোধী, পিউরিট্যানিজম্ (Puritanism)-এর যুগ। ক্রমওয়েল হল রাজা, প্রেসবিট্যারিয়ানিজম্ (Presbyterianism), মেথডিজম্ (Methodism) প্রভৃতি হলো ধর্ম।
পাপ কী আর পুণ্য কী, (অবশ্য ধর্মগ্রন্থের দিক থেকে), সেই হলো আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু। সেই যুগের সাহিত্যিক মিল্টন, বানিয়ান প্রভৃতির গ্রন্থাবলি হলো এই মানসিকতার প্রতিচ্ছবি।
তারপর এলো পুনঃপ্রতিষ্ঠার (Restoration) যুগ। আবার ইংল্যান্ডে রাজা ফিরে এলেন, আনুষ্ঠানিক ধর্ম ফিরে এলো, বিলাসিতা ফিরে এলো, আভিজাত্য ফিরে এলো। মানুষের মন গেল বিলাসের দিকে, আমোদ-প্রমোদের দিকে, আড়ম্বরের দিকে, আভিজাত্যের দিকে। সে যুগের সাহিত্যেও তাই সেই মানসিকতাই প্রকাশ পেল।
অতঃপর রানী এনের (Queen Anne) ক্লাসিসিজম (Clasicism) এলো, তারপর প্রথম হ্যানোভারিয়ান (Hanovarian) যুগের রোমান্টিসিজমের (Romanticism) আবির্ভাব হলো। উভয় শ্রেণীর সাহিত্যই তার নিজস্ব যুগের মননশীলতাকে প্রকাশ করে গেল। তারপর এল ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ্বের ভিক্টোরিয়া (Victoria) যুগ, যার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অতি ঘনিষ্ঠ।
এই ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ্বের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- (১) রাষ্ট্রনীতিতে উদার মতবাদ, (২) অর্থনীতিতে অবাধ বাণিজ্য (Free Trade), (৩) ধর্মের বিষয়ে সন্দেহবাদ (Scepticism), (৪) বৈজ্ঞানিক ক্রমবিকাশবাদে একান্ত বিশ্বাস, (৫) দর্শনে নাস্তিকতামূলক আদর্শের প্রাধান্য, (৬) ইংরেজ জাতির নিজের ভবিষ্যৎ গৌরবের বিষয়ে ঐকান্তিক বিশ্বাস, (৭) ব্যষ্টি ও সমাজজীবনের যান্ত্রিক সভ্যতার প্রাধান্য।
যে যুগের সাহিত্য হয় এসব মতবাদকে সমর্থন করে, না-হয় এ সবের প্রতিবাদ করেই গড়ে উঠেছে। রাষ্ট্রনীতিতে জন স্টুয়ার্ট মিল (Jhon Stuart Mill), ব্যাগট (Baghot), (Seely) প্রমুখের প্রাধান্য দেখতে পাই। ধর্মে হাক্সলে, ইন্গ্রাম প্রভৃতির প্রাধান্য দেখতে পাই। বিজ্ঞানে ডারউইন, স্পেন্সার প্রভৃতির প্রাধান্য দেখতে পাই। দর্শনে গ্রিন, ব্রাডলে প্রভৃতির এক দিকে প্রাধান্য দেখতে পাই, অন্য দিকে প্রাধান্য দেখতে পাই যুক্তিবাদের (Rationalism) যার প্রধান প্রতিনিধি হচ্ছেন জেমস্ মিল এবং তাঁর প্রতিভাবান পুত্র স্টুয়ার্ট মিল। সাহিত্যে বিদ্রোহমূলক রাস্কিন, কার্লাইল প্রভৃতির, রক্ষণশীল আর্নল্ড, টেনিসন, থ্যাকারে প্রভৃতির এবং আদর্শমূলক সাহিত্যিক মরিস, রোজেটি (Morris, Rossette) প্রভৃতির প্রাধান্য দেখতে পাই।
এ যুগ ইংল্যান্ডের সত্যই স্বর্ণযুগ। এ যুগের চিন্তাধারায় যুগের ছাপ সুস্পষ্ট।
তারপর এলো এই বর্তমান জর্জিয়ান (Georgian) যুগ-মহাযুদ্ধোত্তর যুগ। এ যুগের সাহিত্যে যুগের ছাপই পড়েছে। সাহিত্যিক এবং কবিদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে জিজ্ঞাসু মন, যান্ত্রিক সভ্যতার প্রতি অবিশ্বাসের ভাব, নূতন কিছুর জন্য আগ্রহপূর্ণ আকাক্সক্ষা, গতানুগতিকতার প্রতি অবিশ্বাস, ভবিষ্যতের বিষয়ে কল্পনা-জল্পনা।
প্রকৃতপক্ষে, একটা জীবন্ত জাতির জীবন যেমন গতিশীল, তার সভ্যতা যেমন গতিশীল, তার সাহিত্যও তেমনি গতিশীল।
বাংলাদেশের দিকে একবার লক্ষ্য করলে সঠিক বুঝতে পারা যায় যে, বাঙালির জীবন সত্যই গতিশীল, বাঙালির সভ্যতা সত্যই গতিশীল, আর বাঙালির সাহিত্যও সত্যই গতিশীল। এ কথা বিশেষভাবে বাঙালি হিন্দুর সম্বন্ধে খাটে, বাঙালি-মুসলমানের জীবনের বিষয়ে অবশ্য এখনও খাটে না। কেননা, বাঙালি-মুসলমান এখনও স্থবিরতার স্তর অতিক্রম করতে পারেনি। বাংলাদেশের সভ্যতা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এবং দায়িত্ব এখনও হিন্দুর হাতে। মুসলমান সে দায়িত্ব গ্রহণ করেনি, আর তাদের এখন সে ক্ষমতাও নেই। তবে প্রগতিপন্থী মুসলমানেরা হিন্দুদের সঙ্গে যোগ দিয়ে এক ব্যাপকতর সভ্যতার, জীবনাদর্শের এবং সাহিত্যের সৃষ্টি করবার চেষ্টা করছেন। তাঁদের সে প্রচেষ্টা বাংলার জীবনে যথেষ্ট প্রভাবও বিস্তার করছে। এ যে আশার কথা, সন্দেহ নেই।
চন্ডীদাস, বিদ্যাপতি প্রভৃতির যুগের কথা এখানে বলব না। ভারতচন্দ্র, আলাওয়াল প্রভৃতির যুগের আলোচনাও করব না। বিদ্যাসাগরের যুগ থেকেই আরম্ভ করা যাক। বিদ্যাসাগরী সাহিত্যে সে-যুগের পন্ডিতি মনোভাব বিদ্যমান। ভাষা টোলের পন্ডিতের মত, আর ভাবও টোলের পন্ডিতেরই মত। তারপর এলেন বঙ্কিমচন্দ্র। তিনি পন্ডিতি ভাব এবং ভাষা ছেড়ে আধুনিক ভাব এবং ভাষার সৃষ্টি করলেন। বাংলা ও বাঙালি সভ্যতা বিশ্বসভ্যতার আওতায় এসে দাঁড়াল, বিশ্বসভ্যতার সঙ্গে নেয়া-দেয়া হলো তার শুরু। বাঙালির চিন্তা-জগতে এক বিপ্লব এসে দেখা দিল। এত বড় বিপ্লব বাংলাদেশে পূর্বে বোধ হয় কখনও আসেনি। সে যুগের সাহিত্যে সেই মানসিকতা পরিপূর্ণ মাত্রায় প্রতিফলিত হয়েছে।
তারপর এলো রবীন্দ্র-যুগ। সে যুগের পরিসমাপ্তি ঘটল মহাকবির মহাপ্রয়াণে। কিন্তু নূতন যুগের আগমনী-গান স্পষ্টতর হয়ে উঠেছে শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে, সত্যেন্দ্রনাথের কবিতায়-যদিও উভয় মনীষীই রবীন্দ্রনাথের পূর্বেই পরলোকে চলে গিয়েছেন।
রবীন্দ্রনাথের যুগ এবং রবীন্দ্র-সাহিত্য বঙ্কিমচন্দ্রের যুগ এবং বঙ্কিমযুগের সাহিত্য থেকে ক্রমবিকাশের পথে স্বতঃই স্ফুর্তি লাভ করেছে। উভয় সাহিত্যেই দেখতে পাই আভিজাত্যের মহিমা-কীর্তন; উভয় সাহিত্যেই দেখতে পাই সামন্তবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত সমাজের ভূমিকা; উভয় সাহিত্যেই ভারত অর্থে প্রধানত হিন্দু-ভারতের কথাই বলেছে এবং বুঝেছে; উভয় সাহিত্যেই দেখতে পাই ভিক্টোরিয়ান স্বাধীন চিন্তাকে (Victorian liberalism) হিন্দু-দর্শনের সাহায্যে চালাবার প্রচেষ্টা; বাংলার হিন্দু ভদ্রশ্রেণীর জীবনই উভয় সাহিত্যের প্রধান উপজীব্য হয়েছে; উভয় সাহিত্যই বাংলার সাধারণ তথা শ্রমিক শ্রেণীর জীবনকে সমানভাবে পাশ কাটিয়ে গেছে; আর উভয় সাহিত্যই নারীকে পুরুষের জীবনবিকাশের একটা উপলক্ষরূপেই দেখেছে।
তবে সূক্ষ্মভাবে দেখলে এই দুই সাহিত্যধারার মধ্যে যে প্রভেদ এসে দেখা দিয়েছে, তারও আমাদের চোখে পড়ে। বঙ্কিম-যুগের শ্রমিক হচ্ছে ছোটলোক! রবীন্দ্র-যুগের শ্রমিক কিন্তু ছোটলোক নয়, সেও মানুষ। অভিজাত-ভিত্তির ওপর উভয় সাহিত্যই প্রতিষ্ঠিত; কিন্তু রবীন্দ্র-সাহিত্যে সাধারণ মানুষেরও স্থান আছে, যদিও সে স্থান অত্যন্ত অপরিসর। বঙ্কিম-সাহিত্যের ভারতবর্ষ সরাসরি হিন্দু-ভারতবর্ষ অহিন্দুর স্থান তাতে নেই বললেই চলে। রবীন্দ্র-সাহিত্যে অহিন্দুর স্থান যা আছে তা অকিঞ্চিৎকর। তবে এ কথাও সত্য যে, রবীন্দ্র-সাহিত্যে মানবপ্রীতির উল্লেখ খুব বেশি স্থান পেয়েছে। বঙ্কিম-সাহিত্যে নির্জ্জলা ভিক্টোরিয়ানিজমই (Victorianism) দেখতে পাই, অবশ্য সে আদর্শের ভারতীয় সংস্করণ। রবীন্দ্র-সাহিত্যে সে আদর্শ নিয়ে বিভিন্ন দিক থেকে প্রশ্ন জেগেছে, যদিও প্রশ্নের ভঙ্গি যথেষ্ট মৃদু এবং নিরীহ। মধ্যবিত্ত ভদ্রশ্রেণীই উভয় সাহিত্যের বুনিয়াদ (normal society), তবে নিম্নতর শ্রেণীর মানুষও রবীন্দ্র-সাহিত্যে একেবারে বাদ পড়েনি। শ্রমিক জীবনের সমস্যা রবীন্দ্র সাহিত্যে যে নগণ্য স্থান পেয়েছে, বঙ্কিম-সাহিত্যে তাও পায়নি; আর নারীর প্রকৃতি দাবির, প্রকৃত অধিকারের এবং সমাজে তার প্রকৃত স্থানের আলোচনা বঙ্কিম-সাহিত্যে যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে করা হয়েছে, রবীন্দ্র-সাহিত্যে সে দৃষ্টিভঙ্গি আরও একটু ব্যাপক ও উদারতাপূর্ণ। সে যুগে পারিপার্শ্বিকতার মাঝে ইহাই হয়তো সম্ভব ছিল।
তাই বলছিলুম, শরৎচন্দ্র এবং সত্যেন্দ্রনাথ যদিও রবীন্দ্রনাথের পূর্বেই পরলোকে চলে গিয়েছেন, তবু কিন্তু সাহিত্যের ক্রমবিকাশের দিক থেকে দেখতে গেলে তাঁরা রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী যুগের মানুষ। কেননা, বঙ্কিম যে-সমস্যার কথা ভাবেননি, রবীন্দ্রনাথ যেসব সমস্যাকে একান্ত অস্পষ্টভাবেই দেখেছেন, সে-সব সমস্যা প্রায় পূর্ণাঙ্গ ভাবমূর্তি ধরেছে এই দুই লেখকের রচনাবলিতে। শ্রমিক-সমস্যা, নারীর প্রকৃত দাবি এবং অধিকারের সমস্যা’, পতিতের এবং পতিতার সমস্যা, পুঁজিহীন মানুষের সমস্যা-এ সব এই দুই লেখকের লেখায় দেখা দিয়েছে। অবশ্য বর্তমানে কারও কারও লেখায় এইসব সমস্যা এবং আধুনিক অন্যান্য সমস্যা স্পষ্টভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করেছে মাত্র। সমাজদেহের ক্ষতকে নির্ভীকচিত্তে দেখিয়ে দিলে, প্রতিকারের উপায় এসে যাবে। রোগ-নির্ণয়ের (Diagnosis) বিষয়ে আমাদের যতœবান হতে হবে। এ কাজ ব্যাপকভাবে হওয়া দরকার। আশা করি, প্রতিভাশালী সাহিত্যিকরা অতীতের মোহ কাটিয়ে এ পথে অগ্রসর হবার চেষ্টা করবেন। অবশ্য এখনও অনেকে বঙ্কিম ও রবীন্দ্রনাথের প্রদর্শিত বাঁধাধরা পথেই চলেছেন। তাঁদের প্রতি কোন অভিযোগ না এনেও, ইহা বলা অসঙ্গত নয় যে, যুগের তাগিদ-মত দৃষ্টিভঙ্গি না বদলালে সাহিত্যিকের যুগ-সাধনা সার্থক হবে না। তবে এও স্বীকার করতে হবে যে, সব সাহিত্যই রাষ্ট্র এবং অর্থনীতিক সমস্যাসূচক নয়- যদিও এই দুই সমস্যা উৎকট মূর্তি ধরে বর্তমানে আমাদের জীবনে দেখা দিয়েছে। এখানে আমি যুগধর্মের তাগিদে সৃষ্ট সাহিত্যেরই আলোচনা করছি।
এখনও অতীতের আলোচনা প্রয়োজনেরও অতিরিক্ত স্থান সাহিত্য-ক্ষেত্রে জুড়ে বসেছে। বর্তমানের আলোচনা কিছু কিছু চললেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা ভাবমূলক, যুক্তিমূলক নয়। ভবিষ্যতের আলোচনা কিন্তু বাংলাসাহিত্যে দেখতে পাই না বললেও অত্যুক্তি হবে না। এ বড় গৌরবের বিষয় নয়। কেননা, জীবন্ত জাতির লক্ষ্য সাধারণত এবং মুখ্যত ভবিষ্যতের দিকে। ভবিষ্যন্মুখী জাতিই বড় হয়। অতীতমুখী জাতি পতনের দিকেই যায়। যারা বর্তমান নিয়েই সন্তুষ্ট, তাদের ভবিষ্যৎ নেই বললেও অত্যুক্তি হবে না। একমাত্র ভবিষ্যন্মুখী জাতিই প্রাণচঞ্চল হয়। ইউরোপের ভাবুকদের মন সর্বদা ভবিষ্যতের দিকে। ওয়েলস্ (H.G. Wells) ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছেন, শ’ (Bernard Shaw) ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছেন, হাক্সলে (Aldous Huxley) ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন। একদিক থেকে না একদিক থেকে ইউরোপের প্রত্যেক মহামনস্বীই ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছেন। নিট্সে (Nietzsche) অতিমানবের স্বপ্ন দেখেছিলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ্বের ইউরোপীয় সাহিত্য তাঁর প্রভাবেই গড়ে উঠেছে। ইব্সন, স্ট্রিনড্বার্গ, শ’ প্রভৃতি যুগের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদের মধ্যেও নিট্সের বিশেষ প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়। ইউরোপের রাষ্ট্রীয় জীবনে তাঁর প্রভাবের কথা ভাবলে অবাক হতে হয়। জার্মানির সাম্প্রতিক রাষ্ট্রীয় জীবন এবং রাষ্ট্রীয় সাধনা মুখ্যত নিট্সের চিন্তার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছে। ইতালির রাষ্ট্রগুরু মুসোলিনিও তাঁকে নিজের গুরুরূপে স্বীকার করেছেন।
কার্ল মার্ক্সের চিন্তার কথা ভাবলেও দেখা যায়, তাঁর চিন্তা, কল্পনা এবং গবেষণাকে অবলম্বন করে রুশরাষ্ট্র গড়ে উঠেছে, সাম্যবাদ (Communism) গড়ে উঠেছে, সমাজতন্ত্রবাদ গড়ে উঠেছে।
মোটকথা, ইউরোপের মন স্বভাবত ভবিষ্যন্মুখী, আর আমাদের মন স্বভাবত অতীতমুখী। এখন আমাদের মনকে ভবিষ্যন্মুখী করতে হবে। যে জাতির ভবিষ্যৎ নেই, তার অতীতের মূল্য কী, আর বর্তমানেরই বা মূল্য কী?
বাঙালি সাহিত্যিকদের কর্তব্য তাঁদের মনকে, তাঁদের চিন্তাকে, তাঁদের কল্পনাকে ভবিষ্যন্মুখী করা। একশত বছর পরে বাংলাদেশ কেমন হবে, ভারতবর্ষ কেমন হবে, এশিয়া কেমন হবে, পৃথিবী কেমন হবে তা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করতে শেখার দরকার। শতাব্দী পরে স্ত্রী-পুরুষের সম্বন্ধ কিরূপ হবে, শতাব্দী পরে পারিবারিক জীবন কিরূপ হয়ে দাঁড়াবে, ছেলেমেয়েদের সঙ্গে পিতা-মাতার কিরূপ সম্বন্ধ হবে বা কিরূপ হওয়া উচিত, তা নিয়ে কবি, সাহিত্যিক, ভাবুকেরা ভাবুন। শতাব্দী পরে হিন্দু-মুসলমান থাকবে কি না; যদি থাকে, তা হলে তাদের পরস্পর সম্বন্ধ কিরূপ হবে, তাও ভাবতে শিখুন। শতাব্দী পরে জীবনযাত্রা-প্রণালী কিরূপ হবে, তা ভবিষ্যদৃষ্টি দিয়ে স্থির করা সৃষ্টিশীল সাহিত্যের ধর্ম।
এসব নিয়ে ভাবতে আরম্ভ করলে সত্যিকার দর্শনের দিকে, চিরন্তন সত্যের দিকে, মানুষের বিধিদত্ত স্বভাবের দিকে, মানুষের জন্মগত অধিকারের দিকে, মানুষের প্রতি সমাজের দায়িত্বের দিকে, সমাজের প্রতি মানুষের দায়িত্বের দিকে, নর-নারীর সম্বন্ধের প্রাকৃতিক ভিত্তির দিকে, এক কথায় জীবনের মূলগত সত্যের দিকে ভাবুকের দৃষ্টি স্বভাবতই যাবে। আর তার ফলে যে সাহিত্যের সৃষ্টি হবে, সে সাহিত্য সত্যই আমাদের আদরের, আমাদের গৌরবের, আর আমাদের আশার জিনিস হবে। ভবিষ্যতের বাংলাসাহিত্য যেন ভবিষ্যন্মুখী হয়, বর্তমানের পটভূমির ওপর তা যেন হিন্দু-মুসলমান, খ্রিস্টান প্রভৃতি বাংলা ভাষাভাষীকে আলিঙ্গন করে আপন ক্রোড়ে টেনে আনতে পারে, সুজলা-সুফলা বাংলার মাটি জল-আকাশের মহিমাকীর্ত্তনে তা যেন মুখর হয়ে ওঠে, এ হল আমার অন্তরের কামনা।