জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সংখ্যা ‘নতুন এক মাত্রা’য় জনাব শহীদ ইকবালের “বাংলাদেশের কবিতা : পঞ্চাশ ও ষাটের পরিক্রমা” শীর্ষক নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধটি পড়ে- বেশ অবাকই হলাম। কারণ আমার প্রত্যাশা ছিল চল্লিশের অন্যতম শক্তিশালী কবি ফররুখ আহমদ সম্বন্ধে এবার হয়তো একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন পাবো। সেটাতো পেলাম না, তার জন্য দুঃখও করি না। কারণ স্বাভাবিক শহীদ ইকবালের মতো সমালোচকরা বরাবরই ফররুখ আহমদকে নিয়ে বেশ বিপদে পড়ে যান। আর ইচ্ছে করেই চল্লিশের এই বিশিষ্ট কবিকে এড়িয়ে যাবার অনেকটা ভান করেন। জনাব শহীদ ইকবাল সানন্দে আহসান হাবীব ও আবুল হোসেনকে বিস্তারিত আলোচনার তালিকায় রাখলেও ফররুখ আহমদ সম্বন্ধে সংক্ষিপ্ত মন্তব্য দিয়েই দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলেছেন। যা বলেন তাও রীতিমত বির্তকমণ্ডিত, বিবেচনা বোধহীন। যেমন ধারা যাক-জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সংখ্যা ‘নতুন এক মাত্রা’য় জনাব শহীদ ইকবালের “বাংলাদেশের কবিতা : পঞ্চাশ ও ষাটের পরিক্রমা” শীর্ষক নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধটি পড়ে- বেশ অবাকই হলাম। কারণ আমার প্রত্যাশা ছিল চল্লিশের অন্যতম শক্তিশালী কবি ফররুখ আহমদ সম্বন্ধে এবার হয়তো একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন পাবো। সেটাতো পেলাম না, তার জন্য দুঃখও করি না। কারণ স্বাভাবিক শহীদ ইকবালের মতো সমালোচকরা বরাবরই ফররুখ আহমদকে নিয়ে বেশ বিপদে পড়ে যান। আর ইচ্ছে করেই চল্লিশের এই বিশিষ্ট কবিকে এড়িয়ে যাবার অনেকটা ভান করেন। জনাব শহীদ ইকবাল সানন্দে আহসান হাবীব ও আবুল হোসেনকে বিস্তারিত আলোচনার তালিকায় রাখলেও ফররুখ আহমদ সম্বন্ধে সংক্ষিপ্ত মন্তব্য দিয়েই দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলেছেন। যা বলেন তাও রীতিমত বির্তকমণ্ডিত, বিবেচনা বোধহীন। যেমন ধারা যাক- “কায়েম করেন দ্বিজাতিত্ব বা মুসলিম ঘরানার সাহিত্য কিংবা প্রেরণায় দাঁড়িয়ে যান কায়েদে আযম। গোলাম মোস্তফা, তালিম হোসেন, মুফাখখারুল ইসলাম ও ফররুখ আহমদ অনেকটা ঝুঁকিহীন থেকে যান। মধ্যযুগের মুসলমানদের দোভাষী পুঁথির আবর্তেই তাদের বিশ্বাস স্থাপিত হয়। ইসলামী রাষ্ট্র পাকিস্তানের পর্যাবৃত্ত তাদের অবসাদ যেমন দেয় তেমনি প্রেরণার উৎসটি দখল করে।”ফলাফল হিসেবে জনাব শহীদ ইকবাল আরো দেখিয়েছেন -“কেউ সংশয় হয়ে যান নাগরিক কবি, গণমানুষের কবি।” আবার বলেন-“তবে ইসলামী বা পাক ভাবাদর্শের লেখকরা শীঘ্রই অবসিত হন। প্রচলিত আন্দোলন ধারায় কিংবা জাতিত্ব চেতনায় তারা একাত্ব যেমন হননি তেমনি অনৈক্যে অপসৃত হয়ে পড়েন।”আমি ইচ্ছে করেই তার মতামতগুলো হুবহু তুলে ধরলাম যাতে করে আমার দীপ্র দ্বিমতের বিষয়টি পাঠকদের ভালোভাবেই বোঝানো যায়। এটা ঠিক যে, ফররুখ আহমদ পাকিস্তান আন্দোলনকে সমর্থন করেছিলেন। বলা বাহুল্য, আমাদের বাঙালি মুসলমানদের আত্মঅধিকারের জন্য এটি একটি স্বাভাবিক ঐতিহাসিক ঘটনা। ফররুখ আহমদের মত বিরল প্রতিভাবান কবি সেই ঘটনার থেকে বিরত থাকবেন এটা ভাবাই যায় না। তবে আহসান হাবীব ও আবুল হোসেন পাকিস্তান আন্দোলনের বিরোধিতা করেননি। কারণ, দেশ ভাগের পর তারা কলকাতা থেকে এসে ঢাকায় বসবাস করেছেন। কেউ সচিব হয়েছেন, আবার সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে আজীবন কাটালেন।অবশ্য এই তথ্য সমুদয় কবির কবিতার সাফল্য ব্যর্থতা নিরূপণ করা যায় না। কারণ কবিরা যেহেতু মানুষ। তাদেরও কাজ করে খেতে হয়। এই প্রবন্ধে সমালোচক শহীদ ইকবাল পাকিস্তান সৃষ্টির যে প্রেক্ষাপটকে তুলে ধরেছেন, সেখানেও রয়েছে বাস্তবতার অভাব। কেবলমাত্র সমাজবাদী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে এই প্রেক্ষাপটকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যা আজকের যুগে পচনশীল বস্তুতে পরিণত হয়েছে। এবার আসা যাক তার মন্তব্যের কাছে। সেই সময় কায়েদে আযম মুসলমান সাহিত্যিকদের সৃষ্টির নেপথ্যে কাজ করেছেন বলে যে মতামত ব্যক্ত করেছেন তার খানিকটা সত্যতাও রয়েছে। শুধু মুসলমান সাহিত্যিক কেন বাম ধারার শক্তিশালী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য পর্যন্ত কায়েদে আযমকে কবিতা উৎসর্গ করেছেন। পাশাপাশি গোলাম মোস্তফা, তালিম হোসেন ও মুফাখখারুল ইসলামের নামের পরে ফররুখ আহমদের নাম জুড়ে দেয়া মোটেও ঠিক হয়নি। ফররুখ আহমদ আদর্শবাদী কবি ও ইসলামের বিষয়-আশয় নিয়ে কবিতা লিখেছেন এটা যেমন সত্য; কিন্তু ফররুখ আহমদ তাদের ধারার কবি নন। এটাও তেমনি সত্য যে, তিনি আপন প্রতিভা বলে কবিতায় যে এক পৃথিবী বিনির্মাণ করেছেন, ভালো হোক মন্দ হোক তার উত্তরসূরি নেই বললেই চলে। কারণ ফররুখকে অনুকরণ করা যে কোন অনুজ কবির পক্ষে খুব কঠিন। ফররুখ আহমদ কবি গোলাম মোস্তফার কবিতারও ঘোরতর সমালোচক ছিলেন- কারণ তাঁর কবিতার মৌলিকতার অভাবকে দায়ী করতেন। স্বয়ং গোলাম মোস্তফা এটা জানতেন। কারণ ফররুখ আহমদ তার স্কুলের ছাত্র ছিলেন। এটা নিয়ে কবি গোলাম মোস্তফারও দুঃখবোধ ছিল। এই সমস্ত কবিরা কিভাবে ‘ঝুঁকিহীন’ থেকে গেলেন, এই মন্তব্যটি আমার কাছে খুব একটা পরিষ্কার হলো না। ইসলামী আদর্শকে সামনে রেখে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এটা সত্য। সেই আদর্শের বাস্তবায়ন হলো না সেটা দেখে সবচেয়ে বেশি আশাহত হয়েছিলেন কবি ফররুখ আহমদ। তাই রোমান্টিক কবি ঢাকায় এসে পরিণত হলেন ক্লাসিক ধারার কবিতে। সমালোচকরা ফররুখ আহমদের এই পরিবর্তন দেখে আশাহতকেই দায়ী করেন। আর এই কারণে ব্যঙ্গ কবিতা লিখে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর কাছে শত্রুতে পরিণত হয়েছিলেন। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে ফররুখ আহমদ ঝুঁকিহীন থেকে গেলেন কিভাবে? এটা আমার বোধগম্য হলো না। এটা আমার বিশ্বাস করতে প্রচন্ড অসুবিধা হয়। আর একটা কথা ফররুখ আহমদের কবিতার কোন দোষ নেই সেই কথা আমি মানি না। কিন্তু সমস্যা হলো আমাদের সমালোচকরা কবির সেই বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে আলোচনা করতেই চান না। তার কারণই হলো সমাজবাদী সমালোচনার প্রভাব আমাদের সাহিত্যে এখনো বিস্তার করে আছে। মুসলিম বা ইসলামী সাহিত্য বলে পৃথিবীতে কোন কিছু নেই, সাহিত্যে মুসলিম চেতনা থাকলো অথচ সাহিত্যই হলো না- সেই রকম প্রবণতায় কবি ফররুখ আহমদ কখনো ভুগতেন না। তিনি মনে করতেন কবিতাকে প্রথমে কবিতাই হতে হবে।আমার ব্যক্তিগত ধারণা- ফররুখ আহমদ সম্বন্ধে কম পড়ার কারণে জনাব শহীদ ইকবালের পক্ষে এই মন্তব্য করাটা সহজ সাধ্য হয়েছে। দ্বিতীয়ত, শহীদ ইকবাল বলেছেন, “মুসলমানদের দোভাষী পুঁথির আবর্তেই তাদের বিশ্বাস স্থাপিত হয়।”ফররুখ আহমদ পুঁথি সাহিত্যের ভক্ত ছিলেন এ কথা যেমন সত্য; কিন্তু পুঁথি সাহিত্যের আবর্তে ডুবে গিয়েছিলেন এটা ভাবাটাও অপপ্রচার সুলভ মন্তব্য। সেই কাজটাই করেছেন জনাব শহীদ ইকবাল। পুঁথি সাহিত্য নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাটা তখনকার অনেক কবির প্রিয় বিষয় ছিল। কবি আহসান হাবীব পুঁথি সাহিত্যের অনুসরণ করে চমৎকার অবিস্মরণীয় কবিতা লিখেছেন, যেমন “হক নাম ভরসা” ও “সহি জঙ্গনামা”র (কবিতা দুটি ‘ছায়া হরিণ’ কাব্যগ্রন্থের রয়েছে) নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। ফররুখ আহমদ মধ্যযুগীয় পুঁথি সাহিত্যের অনুকরণে কোন রকম কবিতা লেখার চেষ্টা করেননি। বরং Reconstration (বিনির্মাণ) করার চেষ্টা করেছেন। বলা বাহুল্য এটা তার কবিতার একটি প্রশংসিত দিকও বটে। ইংরেজি সাহিত্যে এই রকম উদাহরণ ভুরি ভুরি পাওয়া যায়। ইংরেজি কবি Jhon Keats এর On First Looking Chapasman Homer বা আইরিশ কবি উইলিয়াম বটলার ইয়েটস তো জীবনের মধ্য ভাগে আইরিশ লোকজ কাহিনীর দিকে চলে গিয়েছিলেন। এমনকি সলেমান ও সেবার রাণীকে নিয়েও তাঁর কবিতা রয়েছে। আমিতো খুঁজে পেতে দেখেছি- গোলাম মোস্তফা, তালিম হোসেন ও মুফাখখারুল ইসলামরা কেউ পুঁথি সাহিত্যের অনুকরণে কবিতা লেখেননি। জনাব শহীদ ইকবাল কেন এই মন্তব্য করলেন বুঝতে পারলাম না। আবার এরপর যখন বলেন – “তবে ইসলামী বা পাক ভাবাদর্শের লেখকেরা শিগগিরই অবসিত হন।”বিষয়টা আমার কাছে খুব বেশি পরিষ্কার হলো না। তার মানে কি কবিরা ইসলামী বা পাক আদর্শের অনুসারী-কবিতা সৃজন বাদ দিয়ে অবসরে চলে গেলেন। ইসলামী আদর্শ বা পাক আদর্শ কি একই জিনিস? আসলে আমার মুশকিল হয়েছে এই প্রবন্ধের অনেক ভাষাভঙ্গি আমি বুঝতে পারিনি। তার ভাষারীতি আমাকে টানে না। একথা ঠিক যে, তিনি হয়তো অসামান্য পন্ডিত ব্যক্তি। কিন্তু সেটা প্রবন্ধে কতখানি খাটিয়েছেন সেটাই বোঝার বিষয়। তবে দুঃখ থেকে গেলো এত বড় প্রবন্ধে ফররুখ আহমদের মত শক্তিশালী কবি উপেক্ষিত থেকে গেলেন। আর একটি কথা শেষাবধি উল্লেখ না করে পারলাম না। সেটি হলো এই যে, ‘নতুন এক মাত্রা’র সম্পাদক এ বিষয়ে প্রবন্ধ লেখার জন্য শহীদ ইকবাল সাহেবকে নির্বাচন করে বিরাট ভুল করেছেন। যার মাশুল হলো নিরপেক্ষতার অভাবে প্রবন্ধটি এক পেশে হয়ে গেছে, যেখানে বাম ধারার কবিদেরকে প্রাধান্য দিয়েছেন। ইংরেজি কবি পারসি বুশি শেলি Revolt of Islam নামে কবিতা লিখে বিখ্যাত হতে পারেন-আর আমাদের দেশে ফররুখ আহমদরা নিন্দনীয় হয়ে যান। আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস এরকম সমালোচকরা প্রচার করে থাকেন যে, ফররুখ আহমদ দেশজতা বর্জিত কবি। আর এই কারণে দেখলাম এই প্রবন্ধে শহীদ ইকবাল ফররুখ আহমদের একটি কবিতার পঙ্ক্তিমালাও ব্যবহার করলেন না। বলা বাহুল্য এই রকম মানসিকতা থাকলে আর যাইহোক ভালো সমালোচক হওয়া যায় না। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক অধ্যাপকেরা এই ধরনের বিষাক্ত Trend (এ বিষয়ে পাঠকদেরকে আনোয়ার পাশা রচনাবলীর তৃতীয় খণ্ডের “ফররুখ আহমদ” শীর্ষক প্রবন্ধটি পড়তে অনুরোধ করছি। যার পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩২৬-৩৩৭। প্রকাশক বাংলা একাডেমি) ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন। আর সেটা হয়ে গেছে বামবাদীদের এক ধরনের সাফল্যের জয়গান। যাইহোক জনাব শহীদ ইকবালদের প্রবণতা সম্বন্ধে ফররুখ আহমদ অনেক আগেই জানতেন বলেই বলতে পেরেছিলেন-উর্বর জমিনে যেথায় গজায় রাতারাতিপন্ডিত মনেরা সেথা মানবে না কেন ঘোড়া-হাতিপ্রকৃত সজ্জন আর গুণীরা যেখানে একপেশেপায় না ইরানি পাত্তা, ফারসি পড়ে অন্য কেউ এসে।[দাও, হালকা লেখা, ফররুখ আহমদ রচনাবলী ২য় খন্ড, প্রকাশক : বাংলা একাডেমি]আশা করি তিনি আগামীতে সাহিত্য সমালোচনায় সত্যনিষ্ঠ হবেন।