২০১৭ সালেই প্রথম পাঠক হয়েছি। পড়তে গিয়েই মনে হয়েছে গতানুগতিক পত্রিকাগুলো থেকে ভিন্নতর, অনন্য বৈশিষ্ট্যে দৃষ্টিনন্দন ও নতুনমাত্রার এক সাহিত্য পত্রিকা। প্রচ্ছদ, বিষয় ও লেখা নির্বাচনে সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। পত্রিকার সাহিত্য মান সমুন্নত রাখতে সমসাময়িক সাহিত্য সংশিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তথ্যবহুল ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের লেখা এবং অগ্রজ সম্মানিত কবি-সাহিত্যিকদের লেখাগুলোকে যেমন সম্মান করা হয় তেমনি প্রতিটি পত্রিকায় নতুন, সাহিত্য রচনায় আগ্রহী অনুজদের লেখা ও সমানভাবে উৎসাহিত করে পত্রিকাটি। অসংখ্য নব নব প্রস্তুতি। সুচিন্তিত, ঋদ্ধ। মনে গভীর ছায়া ফেলে। পড়তে আগ্রহী করে তোলে। পড়তে থাকলে ক্রমশ ভাবনার গভীরে ছায়া ফেলে অগ্রজ অনুজ সাহিত্যকর্মের অপূর্ব মেলবন্ধন। যথেষ্ট দক্ষ, সুযোগ্য, অভিজ্ঞ নিপুণ ও সুবিবেচ্য হাতের স্পর্শ রয়েছে এর পথ চলায়Ñ বুঝতে বাকি থাকে না।
নতুন এক মাত্রার হেমন্ত সংখ্যাটি হাতে পেলাম। এটি তৃতীয় বর্ষের ষষ্ঠ সংখ্যা। প্রচ্ছদ এর পরিচয় বহন করে। শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতির কাগজ। জলরঙে ছাপা। একেবারেই অকৃত্রিমতার ছোঁয়া। পত্রিকাটি সামনে এলেই সাহিত্যপ্রেমীদের টেনে নিয়ে পড়বার ইচ্ছে হবে নিশ্চিত। পাতা উল্টিয়েই চোখে পড়ে সম্পাদকীয়। সম্পাদক সম্মানিত একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি আল মুজাহিদী। নির্বাহী সম্পাদক সুসাহিত্যিক ড. ফজলুল হক তুহিন। রুচিশীলতায় অপূর্ব জুড়ি।
স্নিগ্ধ রঙ এ পত্রিকার পরের পাতায় সূচিপত্র। ধারাবাহিকভাবে বিষয়গুলো সাজানো হয়েছে প্রচ্ছদ কবিতা, সাক্ষাৎকার, শ্রদ্ধা নিবেদন, মুক্তিযুদ্ধ, প্রবন্ধ, সাম্প্রতিক, বেশ ক’টি ছোটগল্প, বিশ্বসাহিত্য, ভ্রমণ, শিল্পকলা, প্রতিবাদী কবিতাগুচ্ছ, চারজন কবির রচিত গুচ্ছকবিতা, মূল্যায়ন, ধারাবাহিক উপন্যাস, ধারাবাহিক রচনা, প্রতিবাদী ছড়াগুচ্ছ, ইতিহাস-ঐতিহ্য, পুনর্পাঠ, বইপত্র, সাহিত্য সন্দেশ এবং সবশেষে পাঠপ্রতিক্রিয়া। কিছুই যেনো বাকি নেই। একবারেই মনের ক্ষুধা তৃষ্ণা মিটিয়ে পড়বার মতো সম্পূর্ণ একটি পত্রিকা।
রয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুলের ‘অঘ্রাণের সওগাত’। যেন হেমন্তে অঘ্রাণের পূর্ণ চিত্র চিত্রায়িত। যেন সব নতুন আয়োজনে উৎসব মুখর। নতুন ধান এর সাথে প্রাণে প্রাণে নতুন সুরালাপন, খুশির নাচন, উষ্ণ সম্ভাষণ। নতুন স্বপ্নবিভোর হাসিখুশি সঞ্চয়। এ বছর সাহিত্যে নোবেল পেলেন জাপান বংশোদ্ভূত কাজুও ইশিগুরো সাক্ষাৎকার পর্বে মনোজিৎকুমার দাস অনুবাদ করেছেন তার প্যারিস রিভিউ এ সুসাননাহু হুননেওয়েল এর নেয়া দীর্ঘ ইংরেজি সাক্ষাতের প্রথম অংশ। প্রাণবন্ত সাক্ষাতের প্রাঞ্জল অনুবাদ। শওকত আলীর সাক্ষাৎ নিয়েছেন শাফিক আফতাব। শ্রদ্ধা নিবেদনপর্বে সীমান্ত আকরামের শ্রদ্ধায় উঠে এসেছে শান্তনু কায়সারের সৃজন ও মননের প্রতিকৃতি সীমান্ত আকরামের গভীর উপলব্ধির স্পর্শে। যথাযথ। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক দু’টি লেখায় রয়েছে যার লেখার এবং বক্তব্যের গভীরে পৌঁছাতে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হই, সুপ্রিয় তরুণ সাহিত্যিক ও পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক ড. ফজলুল হক তুহীন তাঁর অকৃত্রিম, স্বচ্ছ, স্পষ্ট ও প্রাজ্ঞ হাতের ছোঁয়ায় মুক্তিযুদ্ধের কবিতা শিরোনামে নতুন কাব্যভাষার রূপায়ণ নিয়ে লিখেছেন। তথ্যবহুল, সমৃদ্ধ ও অনবদ্য। উনিশ শতকের কবি মাইকেল মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল ইসলাম, বিষ্ণু দে, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সমর সেন, আহসান হাবীব, ফররুখ আহমদ, আবুল হোসেন, সৈয়দ আলী আহসান, শামসুর রাহমান কিংবা আল মাহমুদÑ উলেখযোগ্য সকল নবীন ও প্রবীণ কবির কাব্যভাষার সৃজনশীলতার বিশদ ব্যাখ্যাসমৃদ্ধ, মানুষকেন্দ্রিক ও জনসমাজকেন্দ্রিক উপাদান ও বৈশিষ্ট্যগুলো তাঁর বিজ্ঞ গবেষণালব্ধ ফসল যা বাংলা কবিতা ও বাংলাদেশের কবিতার এক অনন্য প্রবাহ চিহ্নিত করেছে। তাঁর বিবেচনাপ্রসূত লেখায় মুক্তিযুদ্ধের কবিতা বাংলা কবিতার এক উজ্জ্বল ও উদ্দীপ্ত অধ্যায় যা নতুন এক কাব্যভাষার ইমারত নির্মাণের অগ্রগণ্য নিয়ামক। অনন্ত পৃথ্বীরাজ সেলিনা হোসেনের উপন্যাসে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে লিখছেন। তার সাবলীল, সুদক্ষ রচনায় সেলিনা হোসেনের সাহিত্য রচনায় যে সামাজিক অঙ্গীকার ও প্রগতিশীল ভাবনা থাকে তা তুলে ধরতে পেরেছেন। মনোযোগের তালিকায় রয়ে গেল তাঁর লেখা। এরপরই রয়েছে বেশকিছু প্রবন্ধ। প্রবন্ধপর্বে রবীন্দ্রনাথের ধর্মচিন্তা নিয়ে লিখেছেন মুহম্মদ মতিয়ার রহমান। রবীন্দ্রনাথ আস্তিক্যবাদী ছিলেন। পিতার আদর্শে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত রবীন্দ্রনাথের ওপর একান্ত স্বাভাবিকভাবেই সুফিবাদের প্রভাব এবং পাশ্চাত্য চিন্তা-দর্শনের প্রভাবে তাঁর সংস্কারমুক্ত উদারচিত্ততার পরিচয় পাওয়া যায় অত্যন্ত ঋদ্ধ প্রবন্ধটিতে। প্রবন্ধ পর্বের রচনাগুলো অনন্য। সাম্প্রতিকে সুপ্রিয় জগলুল হায়দারের ছড়া ও ছড়াভাবনা। ভাবনা সমৃদ্ধ। আকর্ষণীয়। ছোটগল্প লিখেছেন রবিউল হাসান, মুহাম্মদ মহিউদ্দীন, মঈন শেখ, শাদমান শাহিদ ও নিলোফার জাহান ববি প্রমুখ, প্রত্যেকের নিজস্বতায়, সুন্দর। ভ্রমণবিষয়ে চেমন আরার অভিজ্ঞতা আমাদেরও সঞ্চয়। শিল্পকলায় রফিক সুলায়মান ও মাহফুজুর রহমান আখন্দের অবগাহনে আন্দোলিত। প্রতিবাদী কবিতাগুচ্ছ পর্বে মুহাম্মদ নূরুল হুদা, জাহাঙ্গীর ফিরোজ, ফেরদৌস সালাম, বান্দাহ হাফিজের কবিতা সচেতন করে তোলে। নাজিব ওয়াদুদের ধারাবাহিক উপন্যাস পদ্মাপারের উপাখ্যান একান্তই মনকাড়া।
অত্যন্ত পরিমার্জিত, নবীন-প্রবীণের মেলবন্ধনে সমৃদ্ধ পত্রিকাটির নিয়মিত গ্রাহক হবো, নতুন বছরের এই আন্তরিক প্রত্যয় ও সার্বিক শুভকামনা। নিজেকেও যুক্ত রেখেই।
মীর জাহান
টাঙ্গাইল, অগ্রহায়ণ ১৪২৪