১৯৭০ সাল। সাধারণ নির্বাচনের বছর। জনতার জয়গানের প্রবল সময়। সবে আঘাত দিয়ে গেছে ‘৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান- আসাদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে ঢাকার রাজপথ। আগরতলা মামলা তখন মানুষের মুখে মুখে। স্মৃতিতে কিছুটা হালকা হলেও রাজনীতিতে প্রবল হয়ে আসছে ৬৬-ও ছয়দফা। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর হৃদয়ে তখনো ৬২-ও শিক্ষা-বিদ্রোহের কালো দাগ। ১৯৬১ সালে জন্মশতবর্ষে রবীন্দ্র-সঙ্গীত ও রবীন্দ্রচর্চার ওপর সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের চিহ্ন তখনো মুছে যায়নি। ফিকে হয়ে আসছে কাগমারি সম্মেলন আর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের স্মৃতি ও কথা। আর মনে ও মননে জ্বলজ্বল করছে ৫২-র স্বর্ণালি সব প্রহর। আরও পেছনে তাকালে দেখা যায় দূরে ’৪৭-এর দেশভাগ। এই ছিল সত্তরের কবিতার দৃশ্যমান আকাশ। চারদিকে মেঘ তো ছিলই। আর সেইসব মেঘেদের সারিতে ঘুড়িদের কাটাকাটি খেলায় মত্ত- বাতাসের প্রতীক্ষায় তখনো লাটাই হাতে দাঁড়িয়ে সত্তরের কবি ও কবিতাকাল।
১৯৭১ সালে একটি স্বাধীন ও নতুন রাষ্ট্রভূমির প্রসব-বেদনা ও জন্মপ্রহর। কবিতার শরীরে তখন প্রবেশ করছে যন্ত্রণা ও আনন্দের বারতা। তৈরি হচ্ছে নতুন কবিদের চেতনা-বলয়। চল্লিশের, পঞ্চাশের, ষাটের কবিরা তখন প্রবলকণ্ঠ। তাদের সামনে নতুন উপাদান ও উন্মাদনা। এর মধ্যে ১৫-১৮ বছরের কিছু কিশোর-তরুণ একেবারে অনভিজ্ঞ হাতে অনুভবের ওপর ভর করে সাজাতে শুরু করে কবিতার পঙক্তিমালা। এঁরা ফ্রেশ বাংলাদেশি কবি। বাংলাদেশের প্রথম-প্রজন্মের কবি। সত্তরের কবিতার দায় ও দায়িত্ব তখন তাঁদের মাথায় ও হাতে।
সত্তরের দশক বাংলাদেশের জন্য, বাংলাদেশের সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতির জন্য নানান কারণে একটি বিশেষ কাল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা প্রাপ্তি, শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামল, ’৭৪-এর দুর্ভিক্ষ, ’৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ড, জেলহত্যা, বিপ্লব ও সংহতি, সেনানায়ক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উত্থান ও বিকাশ-পর্ব সত্তরের সাহিত্য-পরিসরে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। এমন আনন্দের, এমন সংগ্রামের, এমন দমবন্ধ-করা সংকটের কাল; এমন উত্তরণের কাল বাঙালির জীবনে আর কখনো আসেনি। সমকালের সাহিত্য এই দুর্নিবার কালের সুবিধা ও স্বাদ লাভ করেছে। তাই, এই সত্তরের সাহিত্য এবং বিশেষত কবিতা অন্য যে কোনো দশকের তুলনায় ভিন্নতর। সময়ের সমাজ-রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের দাগ ও ভার তখনকার কবিদেরকে গ্রহণ ও ধারণ করতে হয়েছে সময়েরই সাথে তাল মিলিয়ে। কাজেই, তাঁদের শিল্পবোধের লালন ও প্রকাশ যেমন চমকপ্রদ ছিল, তেমনই তা ছিল কনফিউজিংও। সমকালের সবকিছু যে তাঁরা বুঝে উঠতে পেরেছিলেন, তা-ও নয়। আবার কবিতার শব্দমালায় নিজের প্রতিবেশের বিষয়াদিকে ঠিকঠাক মতো জায়গা করে দেওয়ার প্রচন্ড চাপও অনুভব করেছেন ভেতরে ভেতরে। সত্তরের কবিতায় আমরা পেয়ে যাই রাজনীতির সাথে মুক্তির আনন্দ ও ব্যক্তির বিকাশের নানান সূত্রাবলির অনাবিল মিশেল। নতুন-জন্ম-নেয়া রাষ্ট্রের নতুন কৌশল ও প্রকৌশল কবিতার গায়ে নতুন ভাতের সুবাস আর ধোঁয়ার মতো ভাপ ও মৃদু শিহরণ তোলে পাঠকের ধারণায় এবং অনুভবে।
আবিদ আজাদ (জন্ম : ১৬ নভেম্বর ১৯৫২; মৃত্যু : ২২ মার্চ ২০০৫) সত্তরের প্রধানতম কবি। ভাবনা-প্রকাশে তিনি তাৎক্ষণিক তাড়িত আবেগ শাসিত ননÑ কবিতার সাথে তাঁর ছিল আত্মার নিবিড় সম্পর্ক। সমকাল ও উত্তরকালের অপ্রতিদ্বন্দ্বী সাহিত্য-সমালোচক আবদুল মান্নান সৈয়দ বলেছেন- ‘আবিদ আজাদের উচ্চারণ মাত্রই কবিতা।’ (করতলে মহাদেশ, ১৯৯৩, ১৯৬) আবিদের কবিতা, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই, বর্ণনাধর্মী। তাঁর উচ্চারণে আছে দৃঢ়তা ও দাপট। শুরু থেকেই তিনি সাবধানী কান-মেধা স্থাপন করেছেন শিল্পের অভিযাত্রায়। একটা উদাহরণ-
আমি জানি পৃথিবীর সমস্ত সমুদ্রপথ যদিও এখন
সমরাস্ত্রবাহী সব রণতরীদের ভয়ে আতঙ্কিত আজ
যদিও শঙ্কিত আজ মানুষের সারা জলভাগ
আমি জানি পরাক্রান্ত পরাশক্তির দাপটে কোনো স্বাধীন দেশের
নৌবাহিনীর মতো
নও তুমি উৎকণ্ঠিত…।
(‘চা’, বনতরুদের মর্ম)
কবি আবিদ দেখেছেন, সত্তরের প্রবল কালে, এ সমাজ নষ্টামি আর অভিনয়-কৌশলের যন্ত্রমাত্র। মানবতা ও নান্দনিকতা লোভাতুর বিনাশকের জিহ্বার ডগায় স্পন্দিত দেখে তিনি ধারণা করেছেন সমাজ ও মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপ ও কাজ কৃত্রিম- যেন সবকিছু খেলনা। তাই ‘খেলনা যুগ’ কবিতায় তাঁকে লিখতে দেখি-
মানুষ খেলনা
মানুষের স্বাধীনতাও খেলনা
রাষ্ট্র খেলনা
জাতীয় পতাকাও খেলনা
সার্বভৌমত্ব খেলনা
জাতিসংঘও খেলনা।
‘যার হয় তার তিরিশেই হয় তিরিশের পরে নয়।’ কিংবা ‘মানুষের ভিতরে সবকিছু যখন ভাঙতে শুরু করে/ সেই ভাঙনের শব্দ কবিরাই প্রথম শুনতে পায়।’- এই ধরনের প্রবাদপ্রতীপ বাক্য তৈরি করে যখন আবিদ পার হচ্ছেন কবিতার গলি ও পথ, নির্মাণ করছেন কবিতার নতুনতর ভঙ্গি, তখন তিনি দেখতে পেয়েছিলেন ‘বাংলাদেশের করতল’। যে করতল বহন করে চলেছে ‘বৃষ্টি, রক্ত ও অশ্রুর অজস্র ফোঁটা’ আর নির্মাণ করছে স্বাধীনতার প্রশস্ত পথ। কিন্তু তখন তিনি বাংলা কবিতার মাথায় দেখেন অগণন উকুনের আনাগোনা; কবিতার মাথায় অস্থির যন্ত্রণা। আর অনুভব করেছেন- আমাদের খুব প্রয়োজন তখন একটি ঘন দাঁতবিশিষ্ট ও প্রশস্ত উকুন-নিবারক চিরুনি। তখন তাঁর খুব মনে পড়েছে আধুনিক বাংলা কবিতার মহান স্থপতি মাইকেল মধুসূদনের কথা। আবিদ আজাদ ’৭৪-এর দুর্ভিক্ষের কালে ‘কবিতার মধ্যে দুর্ভিক্ষ শুরু’ হতে দেখেছেন, ‘বধ্যভূমির অসংখ্য হাড় ও কঙ্কালের মধ্যে/ বসন্তের দুরন্ত হাওয়ার মতো’ বেবি-সাইকেল দেখেছেন ‘ভূতের বাড়ি’র পরিচয় ও আচার। আর এই সবকিছুর মধ্যে ছিল আবিদের প্রবল প্রত্যয়ের দাগ।
কবিতা-কারিগর তার কাক্সিক্ষত কথামালা খোঁজেন প্রতিবেশের আলো-আঁধারি আর আপন বিবরের চেতনালোকে। ব্যক্তির মানস-বিলোড়ন এবং জীবন-সংকট কবিতা-কাঁথায় জমাতে থাকে অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞানের নির্যাস। আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক আবহ কবিতার গায়ে বিবর্তনের তির্যক রশ্মি ফেলে। আর তাই কবিতার শরীর বদলাতে থাকে সময়ের পরিক্রমায়। অবশ্য এ পথ-পরিক্রমায় বিশেষ বিশেষ সময়-পরিসর প্রভাব বিস্তৃত করে প্রবল মাত্রায়। বাংলা কবিতার প্রশস্তÍ শরীরে একটি দগদগে চিহ্ন অঙ্কিত হয় উনিশ শ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের যন্ত্রণা আর প্রাপ্তি-প্রত্যাশার উত্তপ্ত আঙিনায়। বাংলা কবিতায় তখন প্রবেশ করে নতুন বিষয়, প্রকাশের নতুন ভঙ্গি আর শিক্ষানবিসি কিছু প্রত্যয়ী কবি। ‘বাংলাদেশ’ নামক নতুন রাষ্ট্রের জন্মলগ্নে যে কবিদল কলম-কাগজ আর কবিতাকে আশ্রয় করে বিপ্লবী অগ্রপথিকের ভূমিকায় আত্মসমর্পণ করেছিল, তাদের মধ্যে আবু করিম (জন্ম : ১২ সেপ্টেম্বর ১৯৫৩) অন্যতম। আবু করিমের কবিতার অবস্থান স্থবিরতা, আত্ম-পরিক্রমা আর পুনরাবৃত্তির বিপক্ষে। কাব্যচর্চায় করিম আত্মগ্লানি, নগরের নির্মমতা, নারীর স্নিগ্ধ মুখ, স্বপ্নাবিলতা আর প্রকৃতির অমোঘ টান প্রতিভাত করতে সদা সচেষ্ট।
আবু করিম অবক্ষয়-অধঃপাতের চালচিত্র অবলোকন করেছেন কৈশোর-পরিভ্রমণ-কাল থেকে। তিনি দেখেছেন মানবপাড়া প্রকৃতির কোমলতার আড়ালে গভীর কোনো ‘ক্ষুদ্রতা’য় নিমজ্জিত হয়ে পড়ছে যেন ক্রমান্বয়ে। শোভন ‘খড়ের স্তূপ’ পুড়ছে অনেভা শিখার চাতুর্যে। ‘আগুনের লেলিহান জিহ্বা আপন গহ্বরে টেনে নিচ্ছে। বিশাল বনস্পতি, তরুলতা, পশুপাখি, গৃহস্থালির বিবিধ চিহ্ন/… আকাশ ছোঁয়ানো বৃক্ষ, বিশাল দিঘি/ দিঘির পেটের মধ্যে লুকানো পূর্ণিমার বিশাল চাঁদ।’ অনিন্দ্য নির্জনতা আর অকৃত্রিম বিস্তৃতির কোলে অভিশপ্ত লাল চাদর বিছিয়েছে যেন রক্তচক্ষু বিবাগী শকুনের দল। এসব নিষ্ঠুরতার কল্পচিত্র করিমকে কবিতালোকে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে অবিরাম। আর তিনি এক প্রবল শব্দাসক্তিতে আছড়ে আছড়ে শিরদাঁড় খাড়া করেছেন কবিতা-কলসের কনকনে আওয়াজে। আবু করিম কুয়াশাকাতর জীবনতলাকে কবিতা-কথায় রূপ দিয়েছেন এভাবে-
আমাদের চতুষ্পার্শে কুয়াশা
আমাদের ভালোবাসার প্রহরী হয়ে জেগে আছে
আলিঙ্গনাকাক্সক্ষী দুই বাহু, মাথা কুটে মরে
নিটোল কুয়াশার দেয়ালে
চতুর্দিকে ভাসমান শূন্যতার মধ্যে পান্ডুর হয়ে আসে সজীবতা
(‘কুয়াশা’, পল্টনে আবার জনসভা হবে)
মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত স্বাধীনতা আমাদেরকে আজও প্রত্যাশিত প্রশান্তি দিতে পারেনি। এমনটি ঘটেছিল সাতচল্লিশের দেশ-বিভাগের পরও। দেশের সাধারণ জনতা রাজনৈতিক সুফল ভোগের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে বারবার। আর পরোক্ষ কোনো ফল ভোগ করলেও কিংবা পেয়ে থাকলেও তা ব্যাপক অর্থে স্বস্তিÍর আশ্বাস বয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। এ দেশের রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনে বারবার মানুষ আশাবাদী হয়েছে। কখনো কখনো অতিক্রম করেছে কষ্টের প্রহর। ১৯৭৫ সালের পনের আগস্ট একদিকে যেমন বাঙালির এক কলঙ্কের অধ্যায় নির্মমতার ইতিহাস, অন্যদিকে একটি মহল এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দাঁড় করাতে চেয়েছে নতুন অভিজ্ঞান। জনতাকে আশার উত্তাল সাগর উপহার দেবার প্রত্যয়ও তারা ব্যক্ত করেছে। কিন্তু এদেশবাসী নির্বাক-স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে দেখেছে বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতিহিংসা আর অস্তিÍত্ব-অন্বেষায় অস্থির রাজনীতিবিদদের নির্দ্বিধ প্রতারণার প্রতিচিত্র। আবু করিম বাংলাদেশের রাজনীতির এ পঙ্কিলতার এক খন্ডচিত্র রূপায়ণ করেছেন তাঁর ‘বিশ্বাসঘাতক’ নামক কবিতায়। রাজনীতির এক নোংরা চরিত্র হলো মানুষকে পণ্য করে ফেরি করা। তৃতীয় বিশ্বের তথাকথিত উন্নয়নশীল দেশগুলো দরিদ্র, অসহায় হাড্ডিসার মানুষকে কল্যাণসূত্র হিসেবে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক সাহায্য প্রার্থনা করে। বিপুল সাহায্য পেয়েও যায় কোনো কোনো সরকার কখনো কখনো। এতে অবশ্য দারিদ্র্যের অবসান কিংবা হাড্ডিসর্বস্ব জনতার মাংস বৃদ্ধি ঘটে না। বিশেষ মহলের উদরস্ফীতি ঘটে মাত্র। দারিদ্র্য-বিমোচন কিংবা নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্তি-প্রার্থনারত জাতির জন্য এ এক অপ্রকাশ লজ্জা। আবু করিমের ভাষ্য-
আমাদের দারিদ্র্য,
আমাদের নগ্নতা, বন্যা ও খরায়
রাজপথে ভিক্ষুকের সারি, সব কিছু
সেলুলয়েডে বন্দি করে অথবা রঙিন
স্থির চিত্রে পত্রিকায় ও পরদায়
সারা দুনিয়ার কাছে ফেরি করছে
আমাদেরই শাসকগণ।
(‘বড় শরমিন্দা লাগে’, যাত্রা)
সমাজ-সভ্যতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমনগরায়ণ জনপ্রিয় অনুষঙ্গ হয়ে উঠতে থাকে বিশ্বব্যাপী। শিক্ষা, কৃষিব্যবস্থার পরিবর্তন, শিল্পকারখানার ব্যাপক বিস্তৃতি মানুষের মনে চাঞ্চল্য আনে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তি অকল্পনীয় অগ্রসরতায় বিশ্ব-কাঠামো পরিবর্তিত হতে থাকে দ্রুত। গ্রাম থেকে মানুষ কাজের প্রয়োজনে উল্লসিত জীবনের নেশায় শহরমুখো হয়। উঁচু দালানের সিঁড়ির তলায়, অন্ধকার গলিতে, ইটের পাঁজার আড়ালে আর বস্তিÍতে ভিড় বাড়তে থাকে গ্রাম্য-মানুষের। কালে কালে শহর-জীবনের যাবতীয় সুবিধার অন্তরালে জমতে থাকে যন্ত্রণার জাল। এ নগরক্লিষ্টতাকে আবু করিম কাব্যকথায় নির্মিতি দিয়েছেন আত্মগত অনুভবে-
আমি শহরে যাব না
শহরে আমার নখ বড় হবে তাড়াতাড়ি
আমার ডান গালের তিলটা দিঘির জলে আর দেখা হবে না।
(‘শহর’, জলের নিচে শুয়ে আছি, ছায়া)
নানাবিধ নাগরিক সুবিধায় দীর্ঘদিন শহরে বাস করেও আবু করিম গ্রামের প্রকৃতিলগ্নতায় নিবিড়। তিনি ভেবে দেখেছেনশহরে প্রকৃতি দেখার একমাত্র সরল পথ সংকীর্ণ জানালা। এখানে প্রকৃতির নির্মলতা নেই, সজীবতাও উধাও। ‘বনসাই দেখে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত মানুষের কথা মনে হয়’ তার। নগরজীবনের প্রকৃতিপ্রেমের আর্তি আর দীর্ঘশ্বাস অনুভব করেছেন তিনি। নিরেট অবসরে জানালায় দাঁড়িয়ে গাছের পাতায় তিনি খুঁজে ফেরেন নারীর কোমলতা, কৈশোরে ফেলে আসা সেই উদ্দাম সজীবতা। জানালার পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি নারকেল গাছের সঙ্গে তার অনুপম হার্দিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। করিম যাপিত জীবনের কষ্টক্লিষ্টতাকে ঢেকে রাখতে চান নারকেল পাতার অনিশ্চিত ক্যানভাসে-
এখন ঢাকা শহরের সাততলা দালানের
পাঁচতলায় থাকি
কী অদ্ভুত উপায়ে এই নারকেল গাছটির
আজানুলম্বিত সবুজ পাতার সাথে আমার
বন্ধুত্ব হয়েছে নিজেও জানি না
কিন্তু প্রতিদিন তার গল্প শুনি।
ভোরে এক ঝাঁক টিয়াপাখি নারকেল গাছের
ওপর হুটোপুটি করে।
দুপুরে নারকেল পাতা জানালায় আঁচড় কেটে
টিয়াপাখিদের ভাষায় তাদের বিভিন্ন কাহিনী শোনায়।
তবে রাতের গল্পগুলোই জমকালো
(‘নারকেলগাছের গল্প’,যাত্রা)
অস্তিÍত্বের সংকট, অনিকেত, উন্মুলতা আবু করিমের কাব্যদর্শনকে ক্লান্ত করে। আত্মগ্লানির বহর অতিক্রম করতে পারেন না তিনি। পরিচিত সমাজ-পরিপ্রেক্ষিত তাগিদ ও তৃপ্তির দ্বন্দ্ব তাকে বিপর্যস্তÍ করে নিয়ত। কিন্তু কবি হিসেবে প্রবল অহংবোধ, দৃঢ়তা কখনো কখনো তাকে ‘উল্লোল চিৎকার’ অতিক্রমের শক্তি জোগায়। লেখক, গ্রন্থ, গ্রন্থবাজার, জনপ্রিয়তার জোয়ার আর পাঠকের মনোবৃত্তি ও অবস্থান তাকে ভাবতে শেখায় কবি-জীবনের তাৎপর্যহীনতার উজ্জ্বলতা সম্পর্কে। মধ্যবিত্তের সংকট, আর কবির আলোময় অভিব্যক্তি স্বতন্ত্র সমবায়ী সত্তায় শেষ পর্যন্ত কবির চরম অসহায়তাকেই নির্দেশ করে যেন। করিমের কবিতা-জীবনে তাই কাব্যসাধনার প্রয়োজনহীনতার বার্তা আসে কোনো কোনো বিষণ্ন প্রহরে।
করিমের কবিতায় আরেক বিশেষ আনন্দ জড়িয়ে আছে তাঁর শব্দবন্ধ নির্মিতিতে। তিনি আশৈশব লালিত অনুভবরাশির যথার্থ প্রক্ষেপণ ঘটিয়েছেন কোনো কোনো শব্দ-বাক্য তৈরির প্রকৌশলে। ‘কাইক্কা মাছের মতো এরোপ্লেনের ক্ষিপ্রতায়’, ‘বিকেল-বালিকার শিথিল আঁচল’, ‘ঝুলবারান্দায় ঝুলে আছে রাত শাড়ির মতন’, ‘এখন মেয়েদের শরীর থেকে পেয়ারার বাস পাওয়া যাচ্ছে না আর’, ‘টুকটুকে এক টিয়াপাখি আমি সবুজ কাব্য লিখি’, ‘গাছের পাতারা পরস্পরের শরীরে মিশে খোঁজে শরীরী উষ্ণতা’, ‘প্রকৃত প্রণয় শিখি কুকুরের কাছে’, ‘কালো চশমার কল্পিত কবরে দেয় পুষ্ট উপহার’ প্রভৃতি শব্দমালা যখন তৈরি হতে থাকে, তখন কবিতা পাঠকের জন্য, সত্যিকার অর্থে আনন্দ-আলিঙ্গনের আবাহন-বার্তা অপেক্ষার প্রহর পার হয়।
কবি ও গল্পকার ইকবাল আজিজ (জন্ম : ১২ জানুয়ারি ১৯৫৫) মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের কবিতায় প্রবলভাবে সক্রিয়। তাঁর মনন পরিস্নাত হয়েছে স্বাধীন ভূখন্ডের প্রত্যূষে- সংকট ও সম্ভাবনার এক আলো-আঁধারিতে। সাহিত্য-শিল্পের আকর্ষণ তিনি অনুভব করেন কৈশোরকালে। আর মফস্বল থেকে রাজধানী ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের পরিকল্পনাও করেন তিনি সাহিত্য-সাধনায় নেশায় পড়ে। আজিজ অনুভব করতে পেরেছিলেন এদেশের সাহিত্যচর্চার প্রাণকেন্দ্র রাজধানী শহর ঢাকা।
সময় এবং সমাজ ইকবাল আজিজের কবিতায় নানান মাত্রায় প্রতিফলিত। তিনি মূলতসমাজ ও রাষ্ট্রের বিবিধ অনুষঙ্গের, মানুষের বিচিত্র প্রবণতার আর সময়ের খানাখন্দের নিবিষ্ট উপস্থাপক। তাই তাঁর ভাষা-নির্মিতিতে মেলে দার্শনিকের অভিনিবেশ। ইকবাল আজিজের কবিতার শক্তি ঈর্ষণীয়। সংকটের বৈধ বর্ণনা তাঁর কবিতায় অনন্যতা লাভ করে প্রায়শই। একটি উদাহরণ-
আয়নায় দেখলাম এক অচেনা মানুষ
যার কিছুই বুঝি না আমি।
প্রেমহীন জীবাশ্মের ছায়া
হাত মাথা ও পা
নিকষ কর্কটক্রান্তি রেখা ধাবমান পৃথিবীর মাঝ দিয়ে;
দেখলাম আয়নায় তাকে, তার পাশে
নদী আর সাগরের অনন্ত দুঃখ-
সামাজিক সুরভিত সুর
নিষ্পলক বেঁচে আছে।
(‘আয়নায় দেখলাম এক অচেনা মানুষ’, প্রতীকের হাত ধরে অনেক প্রতীক)
ইকবাল আজিজ অনুভব করেন স্নেহ-মায়া-মৃত্যু ঝরে পড়ে চিরচেনা মানুষের ঘরে। বেঁচে থাকে আত্ম-অনুভব; ছিটে ফোঁটা কিছু অহংবোধ। মানুষ মানুষের কাছে নয়, নতজানু জীবনের কাছে। তবে সবকিছুর পরেও মানুষের মনে টিকে থাকে নক্ষত্রের আলো, প্রত্যয়ের বীজ। কবি ইকবাল বলেন-
নদীর দুঃখ নদীই জানে ভালো-
আমি কিছুই জানি না তার ব্যথা
আমার বুকে হাজার কথা বাজে
আমার বুকে প্রাণের আকুলতা।
(‘নদীর দুঃখ’, একটি স্বপ্নের কথা)
কবি ইকবাল দেখেছেন প্রীতিহীন সভ্যতা; শিথিল সম্পর্ক। দেখেছেন রাজনীতিতে ডান-বাম সংকট আর সংসারের জটিল রাজনীতি। তাঁর বারবার মনে হয়েছে মানুষ ছলচাতুরীর দিকে, অস্পষ্টতার দিকে এগোচ্ছে ক্রমাগত; সত্য-ভাষণ, সরল-আচরণ এখানে ক্রমবিলীয়মান। তবে তিনি এসবকিছুর মধ্যেও অনুভব করেছেন অনিবার্য পরিবর্তনের বারতা। বিনষ্টির যন্ত্রণাকাতর কবি লিখছেন-
তো তো তো করে তোতলায় সকল মানুষ।
ধুলো ওড়ে, কণ্টকিত বুদ্ধির কূটনীতি
এলোমেলো কোটপ্যান্ট-নেকটাই উড়ছে বাতাসে।
(‘তো তো তো করে তোতলায়’, প্রতীকের হাত ধরে অনেক প্রতীক)
ভাঙনের শব্দ থেকে আশাবাদের আলোকশিখার দিকে চোখ প্রসারিত রাখেন ইকবাল আজিজ। ‘অন্তহীন সৌরঝড়ে’ তিনি ঠায় শুনতে পান ‘মোহিনী মিলের বাঁশি’।
শর্তহীন স্বপ্নচারী, শিল্পচারী কবি বিমল গুহ (জন্ম : ২৭ অক্টোবর ১৯৫২) সত্তরের বাংলা কবিতায় নতুন চেতনা ও প্রকাশ-কৌশলের অন্যতম অভিযাত্রী তিনি। শব্দের শক্তি অনুসন্ধান, অবসাদের স্বরূপ-অন্বেষা ও উত্তরণের প্রয়াস তাঁর কবিতায় ছায়া ফেলে পরম মমতায়। বিমলের কবিতামাত্রই শুদ্ধচেতনার শিল্পিত কথামালা। জাতীয় চেতনার প্রতি বিশ্বস্ততা আর প্রত্যয়ের দৃঢ় অভিব্যক্তি এই কবির প্রধান বৈশিষ্ট্য। তিনি বলছেন-
আগুন আকাশকে ছুঁতে পারে না
বিশ্বাস আকাশকে ছোঁয়,
বাতাস পাহাড়কে নাড়াতে পারে না
প্রেম পাহাড়কে নাড়ায়।
(‘আলোকবর্তিকা’, অহংকার, তোমার শব্দ)
‘বৃষ্টি’ বিমল গুহের কবিতার একটি প্রধান অনুষঙ্গ। শান্তির অনন্ত প্রত্যাশা বুঝাতে তিনি বৃষ্টিকে আশ্রয় করেছেন। সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি, বর্ণবাদ, রাজনীতির শক্তির অশুভ দাপট- সবকিছুতে শিল্পির রঙতুলির ছোঁয়া বুলিয়ে দেয়ার পক্ষপাতী কবি বিমল। তবে তিনি দেখেছেন কল্যাণ-কামনা আর আশার আলো সবসময় সরলরেখায় চলে না। তাঁর অভিব্যক্তি-
যারা আশা করেছিল মেঘ ও বর্ষণ
রাশি রাশি বৃষ্টির শীতল আমেজ, শস্যের মহিমা
তারা আজ ব্যর্থ হলো,
কেউ কেউ বৃষ্টির আশায় বেরিয়েছিলো
সদর রাস্তায়- গেয়েছিল বৃষ্টির বন্দনা
তারাও ব্যর্থ হলো,
(‘লিফলেট বোঝাই ট্রাক’, সাঁকো পার হলে খোলাপথ)
‘ভাঙা কবিতার টুকরো জড়ো’ করে ‘রোজ প্রার্থনার ভঙ্গিতে’ কবি বিমল গুহ এসে দাঁড়ান কবিতার দ্যুতির কাছে। চোখে-মুখে, শরীরে ও মনে মেখে নেন জ্যোতির্ময় আলো-কণা। তিনি যেন ‘শতাব্দীর অন্ধকারে জোছনার জন্যে পাগল কোনো শব্দ প্রেমিক’। ‘কোনো বৃথা পোশাকি শিল্পীর মতো খুব ঝুঁকে শিল্পের আসরে বাজিমাত করা’র রাস্তা থেকে বিমল অনেক দূরে দাঁড়িয়ে। তিনি শর্তহীনতার পক্ষে। ‘স্বপ্নে জলে শর্তহীন ভোর’ দেখতে চান তিনি। ‘বাঙালির বীর্যে লেখা মহান বীরের প্রতিকৃতি তাঁর কবিতার প্রধান প্রেরণা। প্রতিদিনের ‘প্রতিবাদী শব্দের মিছিলে’ তিনি সাজিয়ে তুলতে চান শেখ মুজিবের তর্জনী’র প্রভা। সত্তরের দশকে রাজনীতির ‘অমাবস্যার কালে’ তাঁর কবিতার শরীর-নির্মিতি তাই বিশেষ শৈলীও ধারণ করে। বিমলের কবিতা থেকে আরেকটি দৃষ্টান্ত-
আমার কবিতা ভোটাধিকার চায়
গণতন্ত্র পার্লামেন্ট চায়;
মিছিলে শরিক হয় মুক্তি পাগল সকল কবিতা-
পোস্টারে পোস্টারে ভরে তোলে
ঘরের দেয়াল সুযোগ পেলেই,
(‘আমার কবিতা’, নষ্ট মানুষ ও অন্যান্য কবিতা)
বিমল গুহ মানবতার কবি, প্রত্যাশার নব-নির্মিতির ভাষ্যকার। শর্তহীন শিল্পচারী শব্দ-প্র্রেমিক। বাংলাদেশে গত ৪৬ বছরে নিরন্তর সৃজনশীলতায় নিমগ্ন থেকে যাঁরা কবিতা-শিল্পের পরিসরকে প্রসারিত ও পরিপক্ব করে তুলতে চিন্তা আর প্রয়াসকে রেখেছেন উদার জমিনে বিস্তৃত, নাসির আহমেদ (জন্ম : ৫ ডিসেম্বর ১৯৫২) তাঁদের মধ্যে অবশ্য-স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। কল্পনা আর জনবাস্তÍবতার অসম্ভব সহাবস্থান তাঁর সৃষ্টিভূমির অন্যতম প্রধান প্রসঙ্গ। কবিতা, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী এবং সংগীত রচনায় ইতোমধ্যেই তিনি আপন ভাষাভঙ্গি নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। শিশুতোষ রচনায়ও পেয়েছেন ঈর্ষণীয় সাফল্য। কবিতাকৃষক নাসির চষে চলেন কবিতাজমিন, খুঁজে ফেরেন না-পাওয়া প্রবল-চাওয়া কোনো সহযাত্রীকে। জীবন আর শিল্পের হিসেব মেলাতে গিয়ে বারবার হিমশিম খান এই আত্ম-অন্বেষী, সত্যলগ্ন কবি। কিশোরবয়স থেকে ধাঁধালো নেশায় অতিক্রম করছেন রহস্যময় কবিতা-যাপনের যন্ত্রণা-প্রহর। ‘কবিতার আগুনে’ নির্ভয়ে হাত রেখে প্রাপ্তি-প্রশংসার মোহ থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন কবি নাসির তৈরি করে চলেছেন কালো অক্ষরের অন্তরালে কষ্টের অশেষ দৃশ্যাবলি।
মাটির সামর্থ্য আর মহত্ত্ব নাসিরকে আশ্বস্তÍ করে সমূহ জটিলতানির্যাস জাগতিকতায়। মাটিকে তিনি অভিভাবক মানেন; লৌকিক-অলৌকিক-পারলৌকিক বিচারক জানেন। ‘সমতা-মমতা’র বিধান স্থাপনের নির্ভরতার আশ্রয় মাটিকে তিনি আরাধ্য করেছেন কবিতায়, সত্যসাধনায়, সৌন্দর্য-অন্বেষায়। মাটিলগ্নতা আর কবিতাগ্রস্তÍ তাকে অভিন্ন জেনেছেন তিনি। তাঁর অনুভূতি আর উপলব্ধির নির্মেদ প্রকাশ-
মাটিতেই ঢেলে দিই ক্লান্তি, সব দুঃখ-কষ্ট শ্রমে ঝরা এই ঘাম
মাটিকে জেনেছি শেষ শয্যায় আরাম। মাটিকে কবিতা জানি
অথবা কাব্যই পলিমাটি; কবিতার ধর্মে যাঁরা দীক্ষিত তাঁদের কাছে
কবিধর্ম একমাত্র পরিপূর্ণ খাঁটি।
কৃষক আমার কাছে মাটিধর্ম একমাত্র, শেষ সত্য এই; উর্বর মৃত্তিকা ছাড়া
আমার নগর কিংবা আধুনিক ঐশ্বর্য-বিলাস কিছু নেই।
(‘মাটিধমর্’)
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রজন্মের তরুণ নারীকবি কেলি রাসেল এগোডেন একুশশতকের প্রথমপাদে ‘নেরুদার হ্যাট’কে বিবেচনা করেছেন আভিজাত্য আর ব্যক্তিত্বের প্রতীক; উদ্দীপনার প্রেরণাভূমি হিসেবে। তিনি লিখেছেন- ‘একদিন যখন, আবহাওয়া চুরি করে প্রতিটি হাল্কা বাতাস/ পাবলো জানায় সে নারীকে/ একমুঠো কবিতা তার দিয়েছে রেখে/ ভাঁজ করে বন্ধনীর পিছন হ্যাটের ভিতর’(‘নেরুদার হ্যাট’)। আর বাংলাদেশের কবি নাসির আহমেদ প্রায় একই সময়ে নেরুদাদের সার্বজনীনতা, কাল-উত্তীর্ণতার বিষয়টি অনুধাবন করেছেন; শোক-ধ্যান-দ্রোহ-বিপদে খুঁজে পেয়েছেন তাঁদের ‘নিসর্গ-অমরতা’। সময় আর ভূগোল যেন সংকটে কোনো বাস্তÍব সীমারেখা নয়; যেন তৃষ্ণা-রহস্য আর উদ্ভাসন অভিন্ন শব্দাবলি। নেরুদাদের শরীরী অবস্থান-তিরোধানের প্রসঙ্গও হয়ে পড়ে অপ্রাসঙ্গিক, চিন্তাবিলাসমাত্র।
গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে সারা দুনিয়ায় চলছে মিথ্যা চিৎকার, চালবাজি আবেগ-বণ্টনের বিপুল আয়োজন। সাজানো নাটকের পর্দার আড়ালে গুমরে মরছে মানবপ্রবৃত্তি, সাম্যবাদ-ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যভাবনা। আধিপত্যবাদ আর আগ্রাসী-অভিসন্ধিতে আটকে পড়ছে মানবতা-স্বচ্ছতা-চিন্তাপ্রসারতা। দেশপ্রেম হন্তারকের হাতে লুট হয় নান্দনিকতা; বিলুপ্ত হয় চিন্তাপ্রক্রিয়া। মৃত্যুপথযাত্রী প্রাজ্ঞ আর প্রবল সচেতন কিছু মানুষের চিন্তাসঙ্গী কল্পনা-বাস্তÍবের স্রোতে ভাসমান বিস্ময়াপন্ন কবি নাসির আহমেদ বর্তমান আর্থ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিচ্ছেন-
বিশ্ব অর্থনীতি আর সমরকৌশল
প্রগতির হন্তারক, নিরন্তর বক্তৃতাবিবৃতি
তারা গণতন্ত্র চায়, এমনই সময়!
(‘আমার সময়’)
প্রসন্নতার পিঠে আজ শুধু অন্ধকার। সেই সবুজতা আর যেন দেখা যায় না কোথাও; সর্বত্র মলিন স্মৃতি বহন করে ফেলে-আসা দিনের প্রফুল্লবচন- দিনযাপনের শুভ্রতামাখা দারুণ আবেশ। মানুষ বেড়েছে অনেক, বেড়ে চলেছে যান্ত্রিক সুবিধা, চারপাশের সারিসারি বৃক্ষ; বাড়েনি কেবল মানবিকতা-নগরসুখ-দৃশ্যরাজির আনন্দবাতাস। ব্যক্তির উপলব্ধি, সমাজ-রূপান্তরের প্রত্যয়, অগ্রগমন-পশ্চাৎগমনভাবনা আর প্রকৃতিকে বান্ধবের দায় ও দায়িত্ব দিতে প্রস্তুত অভিজ্ঞতাবাদী কবি নাসির আহমেদ। প্রসন্নতা-প্রসন্নতা কিংবা বিষণ্নতা-বিষণ্নতা অসুখ থেকে তিনি মানবের প্রকৃত চিন্তামুক্তির আকাক্সক্ষা করেছেন রক্তপাত অথবা অশ্রুপাতের পথ দিয়ে- তবে কোনো আপস নয়। প্রতিটি বিচ্ছিন্ন হাতের ‘খাড়া’ থাকার নিজস্ব অহমিকার বিজয়-পতাকায় খুঁজেছেন তিনি মানুষের মর্ম-অন্বেষার সামর্থ্য।
স্থাপত্যতুল্য মূল্যবোধ, গতিহীন মনুষ্যত্ব আর জাতিসত্তা, শেষচিহ্নকণাগ্রস্তÍ মুক্তচিন্তা মানুষকে ঘুমহীন রাতে প্রবল তৃষ্ণায় রহস্যময়-মায়াবী গল্পমোড়া শৈশব-নির্জনতার অন্বেষণ-প্রবণ করে তোলে। নাগরিক জটিল রহস্যরীতি, ক্ষুধার্ত হৃদয়, নিরন্তর আকাল, পরস্পরবিছিন্ন বিপন্ন মুখর মানুষ ক্রমাগত ‘উন্নয়ন স্বপ্নের নামে’ চলেছে বাহনহীন কোনো অজানা রাজপথে; এমনকি চলেছে স্বদেশও। রহস্যনিবিড় অরণ্যের আর জ্যোৎস্নার ভাষার আলোকে আমরা খুঁজতে থাকি শান্তি আর নিরাপত্তার ভাষা। রাত্রির বিলীন সৌন্দর্যে হাতড়াতে থাকি গ্লাসভর্তি তরলতা। কবি লিখছেন-
কী অপার অনন্ত শূন্যতা! দিগন্তবিস্তৃত নীল এই শূন্যতাকে
নিঃশব্দে পাহারা দিচ্ছে একটি নিঃসঙ্গ লাল চিল।
জীবনানন্দীয় রৌদ্র আজ এই দুপুর পোড়াচ্ছে সেই
চিলের ডানার রঙ।
(‘অনন্ত শূন্যতায় তুমি’)
ইংরেজ কবি চার্লস টমলিনসনের কবিতা যেমন বস্তুকে নতুনভাবে দেখার প্রেরণায় মানববিশ্ব ও প্রকৃতিবিশ্বকে আবিষ্কারের এক অঙ্গাঙ্গী প্রত্ন-উৎসারণ; তেমনি নাসির আহমেদের কবিতা জগৎ সম্বন্ধে চিন্তার এক বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি। দেখা আর বিশ্বাসের মধ্যে অনবরত এক পালাবদল পরিলক্ষিত হয় তাঁর কবিতায়। তাঁর কবিতাজমিনে আছে ইতিহাস ও সময়ের নির্ধারণীয়তা। তাঁর বর্ণিত মানুষ সময়ের শাশ্বততায়, জীবনের তাৎপর্যে, পরীক্ষা-উত্তীর্ণ-ব্যাকুল।
‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়, এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’- এই প্রবল স্লোগান-কবিতার স্রষ্টা হেলাল হাফিজ (জন্ম : ১৯৪৮) স্লোগান সৃষ্টি করে তিনি ঢুকে পড়েছেন কবিতা পাঠকদের মনে। অচেনা অজানা অনেকের মনেই নোঙর ফেলেছেন কবি হেলাল হাফিজ। ১৯৮৬ সালে ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ কবিতার বইটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে জ্বলে ওঠে কবি হেলাল হাফিজ-এর নাম। বইটি সর্বত্র তুমুল আলোড়ন তোলে। ২৬ বছর পর ২০১২ সালে আসে তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘কবিতা একাত্তর’। হেলাল হাফিজ স্বল্পপ্রজ হলেও জনপ্রিয় কবি। তাঁর বহুল পঠিত ও আলোচিত কবিতা ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ থেকে খানিকটা উদ্ধৃত করছি-
এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
মিছিলের সব হাত কণ্ঠ পা এক নয়।
সেখানে সংসারী থাকে, সংসার বিরাগী থাকে,
কেউ আসে রাজপথে সাজাতে সংসার।
কেউ আসে জ্বালিয়ে বা জ্বালাতে সংসার
শাশ্বত শান্তির যারা তারাও যুদ্ধে আসে
অবশ্য আসতে হয় মাঝে মধ্যে
অস্তিত্বের প্রগাঢ় আহ্বানে,…
যদি কেউ ভালোবেসে খুনি হতে চান
তাই হয়ে যান
উৎকৃষ্ট সময় কিন্তু আজ বয়ে যায়।
হেলাল হাফিজ-এর কবিতা দারুণভাবে রাজনীতির কথা বলে- প্রকাশ্যে। সাহসী কবি তিনি। আর প্রবল প্রেমিক তিনি। ‘রাডার’ শিরোনামের আরেকটি কবিতা এ রকম-
একটা কিছু করুন।
এভাবে আর কদিন চলে দিন ফুরালে হাসবে লোকে দুঃসময়ে আপনি কিছু বলুন
একটা কিছু করুন।
চতুর্দিকে ভালোবাসার দারুণ আকাল
খেলছে সবাই বেসুর-বেতাল
কালো-কঠিন-মর্মান্তিক নষ্ট খেলা,
আত্মঘাতী অবহেলো নগর ও গ্রাম গেরস্থালি
বনভূমি পাখপাখালি সব পোড়াবে,
সময় বড়ো দ্রুত যাচ্ছে
ভাল্লাগে না ভাবটা ছেড়ে সত্যি এবার উঠুন
একটা কিছু করুন।
দিন থাকে না দিন তো যাবেই
প্রেমিক যারা পথ তো পাবেই
একটা কিছু সন্নিকটে, হাত বাড়িয়ে ধরুন
দোহাই লাগে একটা কিছু করুন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে ১৯৭২ সালে হেলাল হাফিজ তৎকালীন জাতীয় সংবাদপত্র দৈনিক পূর্বদেশ-এ সাংবাদিকতায় যোগদান করেন। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন দৈনিক পূর্বদেশ-এর সাহিত্য সম্পাদক। ১৯৭৬ সালের শেষ দিকে তিনি দৈনিক দেশ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক পদে যোগদান করেন। কাজেই সত্তরের কালে তিনি কবিতার শরীর নির্মাণের সমূহ উপাদান পেয়ে গিয়েছিলেন অভিজ্ঞতা আর অনুভব থেকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতোত্তরকালে সামরিক পট-পরিবর্তনের অস্থির সময়ে প্রতিবাদী লেখনী নিয়ে রুখে দাঁড়ানো কবিদের একজন হেলাল হাফিজ। তার কাব্যের প্রধান উপকরণ যৌবন এবং বিদ্রোহ।
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ (জন্ম : ১৬ অক্টোবর ১৯৫৬; মৃত্যু : ২১ জুন ১৯৯১) তাঁর কবিতায় সাজিয়েছেন আড়মোড়ার আওয়াজ। তিনি প্রবলভাবে রাজনীতিলগ্ন কবি। কবিতার সঙ্গে রাজনীতির সংশ্লিষ্টতা অত্যন্ত স্পষ্ট এবং স্বীকৃত। দেশ-কালের সংকটে কবিরা সর্বদাই সাহসী ভূমিকায় অবতীর্ণ থাকেন। এদেশে রাজনৈতিক সংকট মানবতাকে বিপর্যস্তÍ করেছে বারবার। আর তাই সচেতন কবিকেও থাকতে হয়েছে সদা সতর্ক। স্বাধীনতা-পরবর্তী ‘বাংলাদেশে এই দাবি অধিকতর তীব্র হওয়ায় কবিদের ওপর যে-গুরুভার অর্পিত হয়েছে তার বোঝা কাঁধে নিতে যে কজন কবি সামনের কাতারে নিজেদের এগিয়ে নিয়েছে, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ তাঁদের মধ্যে অন্যতম।’ সত্তরের কবিদের মধ্যে নিঃসন্দেহে রুদ্রের কবিতাই সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় কবিতামঞ্চে, পাঠকের কণ্ঠে। রুদ্রর বিশেষত্ব এখানে যে, তিনি খুব দ্রুত জনতার কবি হয়ে উঠতে পেরেছেন।
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, নষ্টামি আর যাবতীয় প্রবণতার বিরুদ্ধে রুদ্রর কবিতা ছিল সক্রিয়। কবি একাত্তরের স্বাধীনতার স্বাদ ও মর্যাদাকে বিপর্যস্তÍ হতে দেখেছেন। লিখেছেন‘আজো আমি বাতাসে লাশের গন্ধ পাই। আজো আমি মাটিতে মৃত্যুর নগ্ন নৃত্য দেখি/ধর্ষিতার কাতর চিৎকার শুনি আজো আমি তন্দ্রার ভেতরে।’ (‘বাতাসে লাশের গন্ধ’)। কবির এ বোধ বাঙালি জাতিকে এক প্রবল প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। বাঙালি কি তবে হারাতে বসেছে তার গৌরবের ঐতিহ্য-শক্তির দৃঢ়তা, প্রতিবাদের শক্তি?
পঁচাত্তর-পরবর্তী এদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন তৎপর। মিছিলে, কবিতার মঞ্চে রুদ্রের যাতায়াত ছিল সুদৃঢ়। কবিতা এবং রাজনৈতিক-ভাবনা সম্পূর্ণ ভিন্ন সত্তা বিবেচনা করেও বলা যায়, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ এ দুয়ের এক চমৎকার সমন্বয়, সহাবস্থান তৈরির প্রত্যয়ে স্থিতধী কবিসত্তা। আবৃত্তি-যোগ্যতা রুদ্রের কবিতার অনন্য বৈশিষ্ট্য। যেমন-
রক্তের কাফনে মোড়া কুকুরে খেয়েছে যারে, শকুনে খেয়েছে যারে,
সে আমার ভাই, সে আমার মা, সে আমার প্রিয়তম পিতা
স্বাধীনতা সে আমার স্বজন হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন
স্বাধীনতা সে আমার প্রিয় মানুষের রক্তে কেনা অমূল্য ফসল
ধর্ষিতা বোনের শাড়ি এ আমার রক্তাক্ত জাতির পতাকা।
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ মানুষের মধ্যে শামুক-প্রবণতার প্রাবল্য দেখতে পেয়েছেন। অগণিত অসংখ্য মানুষ পৃথিবীর ও জীবনের জাটিল্যে কেবলই যেন নিজেকে গুটিয়ে নিতে চায়। বাধা দেখলেই ফিরে আসে সন্তর্পণে। এগুবার সাহস হারায় ক্রমাগত। যেন নিজেকে গুটিয়ে নিতে নিতে নিজেরই অস্তিÍত্ব বিলীনে প্রয়াসী মানুষ। কবি এ অবস্থার মানুষের এ দুর্গতির অবসান প্রত্যাশা করেন। রুদ্র ব্যক্তিত্ব-সচেতন কবি। রাজনৈতিক, সামাজিক, কিংবা ধর্মীয় কাঠামোয় তিনি আপন বিবর থেকে নিজেকে সমর্পণ করেননি কখনও। পরাভব নামক জন্তুটি তাঁর ঘোরতর শত্রু। আত্মবিশ্বাস তাঁর প্রবল শক্তি। ‘যেখানে আকাশ অসীম, বলাকারা নিশ্চুপ’ সেই শূন্যতার প্রাসাদে তিনি গড়েন কবিতার শরীর, শিল্পের দেহ শামুক-স্বভাব মানুষের ভিড় থেকে তিনি উঠে আসেন সাহসী, প্রত্যয়ী কবি-পুরুষ হয়ে-
স্বাধীন অস্তিÍত্ব আমার বিলুপ্ত নয়।
আপন ব্যক্তিত্বকে চাই না দিতে বিসর্জন
ধর্ম কিংবা সমাজের সংস্কারে।
… … …
আমার আপন সৃষ্টিতে আমি
চির দীপ্তিময়; কারণ
আমার সৃষ্টিকর্তা আমি।
(‘আমি স্রষ্টা’)
রুদ্রের কবিতায় যে প্রতিবাদী সুর, তা তাঁর চেতনার গভীর থেকে উত্থিত। সংস্কারমগ্নতা ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে তিনি সর্বদাই ছিলেন সোচ্চার, উচ্চকণ্ঠ। ‘বিপুল বিষ বিদ্রোহ’ আন্দোলিত করে তাঁর সত্তাকে। কড়া নাড়ে মগজের আধাখোলা দরোজায়। রক্তে রক্তে দোলে ‘যুগান্তকারী ইতিহাসের সুউচ্চ চূড়ায়’ ওঠার অনন্ত বাসনা। আর এ সব কিছুর ভেতরও রুদ্রর ছিল প্রেমনিমগ্ন আকুল ভিখারি বাউল মন। মাঝে মাঝে তিনি চাইতেন নির্বাসন। অসংখ্য জীবিত ফ্রাসট্রেশন তাঁকে অতল অধঃপতনের দিকে যাবার হাতছানি দিত। মাঝে মাঝে তিনি খুঁজতেন অফুরন্ত অবসর। একটু প্রেম, একটু ভালোবাসা যদি দেয় অসীম তৃষা, যন্ত্রণা নিবারণের সঠিক সূত্র – তাতে মন্দ কী! রুদ্র লেখেন-
এসো না হয় কিছুক্ষণ বসি-
শিয়রের খোলা জানালায়,
কিছুক্ষণ ভুলে থাকি পৃথিবীর
মরা আকাশ; বাতাসের প্রেম।
(‘কিছুক্ষণ ভুলে থাকি’)
বিশেষত সাংসারিক-জীবন অবসানের পর তাঁর মধ্যে ভিন্ন চেতনার আবর্ত নাড়া সৃষ্টি করতে থাকে। অবসাদে আর হতাশায় পুড়ে খাক হয়ে পৃথিবীকে নতুনভাবে দেখতে শুরু করেন। তাঁর কবিতায় মদ, গাঁজা, বেশ্যা প্রসঙ্গের অনুরণন শোনা যায়। এটা খুব প্রচলিত কথা। রুদ্র মূলত জীবন-জাটিল্য থেকে, পারিপার্শ্বিক জাঢ্য থেকে আর দাম্পত্য-পাখির উড়াল দেয়ার দৃশ্য থেকে এক গভীর আড়মোড়াযুক্ত অবসাদে ঘুরপাক খেতে থাকেন।
মৃত্যু জীবনের অনিবার্য পরিণতি। মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে প্রয়াত হন কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। জীবনের প্রবাহে যাপিত দিন-রাত্রিতে মৃত্যু ছিল তাঁর নিত্য সহচর। তিনি জানতেন জন্ম মানে মানুষের মৃত্যু-প্রস্তুতির প্রথম ধাপ অতিক্রমণ। তাই তিনি ‘দ্বিখন্ডিত বার্থডে কেকের’ ভেতর মৃত্যুর ছায়া দেখতে পেয়েছেন। আর জন্মদিনে ‘বন্ধুদের করতালির ভেতরেও’ শুনতে পেয়েছেন ‘মৃত্যুর অনাহুত শব্দ’। কবির ভাষায়-
জন্মদিনে আমিমৃত্যুকে ভয় পাই
জীবনের প্রচন্ড করতালির ভেতর
শুনি মৃত্যুর নিঃশব্দ চারণ।
(‘বার্থডে কেকের ভেতর মৃত্যুর পদধ্বনি’)
পৃথিবী, নারী, স্বপ্ন, সংগ্রাম আর শিল্পের প্রতি নিমগ্ন কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। বাংলাদেশের কবিতার আপাদমাথা জুড়ে তাঁর সরব উপস্থিতি। প্রেম ও সুন্দরের প্রতি তাঁর আকণ্ঠ অনুরাগ। দ্রোহ ও সংগ্রামের প্রতি তাঁর অনড় বিশ্বাস আর শিল্পিত চর্চায় তিনি কবিতাকে দিয়েছেন অনন্য মহিমা।
শিহাব সরকার (জন্ম : ২ মার্চ ১৯৫২)-এর কবিতায় মেলে অনুভূতির অন্তর্খনন। বিষয়বস্তু ও উপস্থাপনশৈলীর ভিন্নতায় তাঁর কবিতা পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করে। সমকালীন সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা শিহাবের প্রিয়-প্রসঙ্গ। অবশ্য সময়ের বিরূপ বাতাস তাঁর কল্পনা ও পরিকল্পনাকে আচ্ছন্ন করে না। অব্যবহিত পরিপার্শ্ব, মানুষ ও প্রকৃতি, এই ধ্বংসশীল সময় প্রভৃতি অচ্যুত এক রোমান্টিকতায় নির্মিতি লাভ করে শিহাব সরকারের কবিতায়। শিহাব অন্তর্মুখী শিল্পী- স্লোগান-ধর্মিতাকে তিনি সবসময় পরিহার করতে চেয়েছেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি শিহাবের প্রথম কবিতা ‘সাবিত্রী বোসের রুমাল’ ছাপা হয় ১৯৭২ সালে দৈনিক বাংলা পত্রিকায়। অল্প সময়ের ভেতরেই পাঠক-সমালোচক শিহাবের স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর আবিষ্কার করে। তাঁর প্রথম দিককার কবিতায় খুব প্রবলভাবে স্থান পেয়েছে নারী, প্রেম আর স্বপ্ন-বিলাস। যেমন একটি উদাহরণ-
বাস্তবে খুব তাপ
স্বপ্নে কি অতিরিক্ত সুখ আছে
কল্পনায় আমিও বহুদিন গিয়েছি উড়ে গ্রিসের
হিম উপকূলে
(‘উদ্বাস্তু যুবকেরা’ : লাল যৌবন দিন)
শিহাবের তারুণ্যনির্ভর এই ভাবনা বেশিদিন স্থিতি পায়নি। ক্রমে তাঁর কবিতার কথাবস্তু ধারণ করে আমাদের প্রাত্যহিক উদযাপন, স্বপ্নভঙ্গ এবং অন্তর্গত বিলাপ-প্রসঙ্গ। ফলত, শিহাবের কবিতা পাঠকের বোধের গভীর তন্ত্রীতে নাড়া দিয়ে যায়। মানুষের মনস্তাত্ত্বিক মানচিত্র নির্মাণে তিনি কৌশলী শিল্পী। শিহাব সরকারের ‘করো গান বনজ্যোৎস্নার’ কাব্যের ‘জাগো, জাগো’ কবিতা থেকে খানিকটা পাঠ নিচ্ছি-
কোটিযুগের বরফনিদ্রা শেষে
পাথরে পাথর ঠুকে জ্বালো অগ্নি পুনর্বার
গুহার প্রাচীরে আঁকো ফের
স্বপ্নের রাংতার সাথে ভোরের রৌদ্রের বিকেলে
ভ্রুমণের পথ নিশানা।
গভীর এক দুঃসময়ে নিজেকে আবিষ্কার করেন কবি শিহাব। চারদিকে ভাঙনের সুর, ধ্বংসস্তূপ পড়ে আছে। নাচঘর, দূরের পার্ক, সকালের খোলা জানালার বাতাসেরা আজ নিথর, নিস্তব্ধ। শিহাবের চারপাশে বিস্মৃতির খেলা অবিরাম। তবে তিনি জানেন, আনন্দ, প্রেম-ভালোবাসা ‘অস্তিত্বের মূল শিখা’। নিষ্কলুষ আনন্দ তাই শিহাবের কামনা। শিহাবের ‘নির্বাসনের আগের রাত্রি’ ‘মাথা ধরে আছে’, ‘ইবলিস দিচ্ছে ফুঁ’, ‘মানুষকে কাঁদায়’, ‘ফেরার রাস্তা’, ‘নয়নতারা মরে গেছে কবে’ প্রভৃতি কবিতা জীবনের প্রতি, দেশমাটির প্রতি, পৃথিবীর প্রতি গভীর এক বোধে নমিত।
শিহাব মূলত দেশকাল ও স্মৃতিলগ্ন কবি। গুহা জীবনের সংগ্রামী প্রত্যয়, ভাঙা-দেয়ালের ভাঙা শরীরের গায়ে জমে-ওঠা নবজন্মের অবগাহন, ফুলতোলা রুমালে কান্নার অনুবীজের মোহময়তা তাকে নমিত করে কবিতার কাছে। নদী, নারী, সমুদ্র, মধ্যরাতের মাদকতা, বৃষ্টির শুচিতা শিহাবকে শিল্পের কাছে ঠায় দাঁড়াতে শেখায়।
জাহাঙ্গীর ফিরোজ বহমান বাংলা কবিতায় সত্তরের উজ্জ্বল ও অপরিহার্য কবি। কবিতার বাঁকবদলে যুক্ত হয়েছে আটটি কাব্যগ্রন্থ। ‘বদ্ধমাতাল রাদে’ই (১৯৮৭) তাঁর আলোকোজ্জ্বল উপস্থিতি। ‘যে ছিল প্রাণের জরুরি’ (১৯৯৭), ‘চাকরিজীবীদের কোন স্পার্টাকাস নেই (২০০০)’, ‘অণুুবিশ্বের মেঘমালা (২০০৩)’, ‘মৌরীবনের বাতাস (২০০৮)’, ‘সাগরের গর্জন থেকে নুন রক্তে আসিল (২০১২)’ এর মাধ্যমে কবির দশ দিগন্ত সৃষ্টি করেন।। প্রকৃতি, স্বদেশ, স্বাধীনতা, আন্তর্জাতিকতা, প্রেম-প্রতিবাদে নির্মাণ করেন কবিতার আপন জগৎ।
সত্তরের কবিতার কাল ও অভিযাত্রায় বাঙালির হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্য, সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাস, স্বাধিকারের চিন্তা এবং মুক্তির আন্দোলনের উত্তরাধিকার ও উত্তাপ জীবনের রঙে চিত্রিত। উল্লিখিত কবিরা ছাড়াও ময়ুখ চৌধুরী, হাসান হাফিজ, পুলক হাসান, মতিন বৈরাগী, তমিজউদ্দিন লোদী, ফারুক মাহমুদ, মুজিবুল হক কবীর, জাহিদ হায়দার প্রমুখ নতুন কালের নতুন কণ্ঠস্বর নির্মাণ করেন। এই সময়ের কবিরা সময়ের টানে আর প্রকাশের উন্মাদনায়-আনন্দে বিমোহিত। মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা সত্তরের কবিদের সবচেয়ে বড় শক্তি, প্রেরণা ও প্রকাশসূত্র। তাই, বাংলা কবিতা-পরিক্রমায় অন্য যে-কোনো সময়ের চেয়ে সত্তরের কবিতার রয়েছে আলাদা চাওয়া ও পাওয়া।