সামার প্যালেসের পাহাড়ে আছে দুই ধাপে স্পষ্টত দু’টি লেয়ার। ট্যাক্সি আমাদের নিচের লেয়ারে নামিয়ে দেয়। এখান থেকে মুরাম বিছানো ঘুরানো পথে সামান্য হেঁটে ওঠে যেতে হয় উপরের লেয়ারে প্যালেসের ইমরাতের কাছে। এখানে এসে স্ত্রী হলেন ও কন্যা কাজরিকে নিয়ে উপরের লেয়ারে ওঠার আগে আমরা বড় বড় শেড ট্রিতে ছাওয়া বাগানটি ঘুওে ফিরে দেখি। দেখতে দেখতে পাহাড়টির কিনারায় এলে চোখে পড়ে দালাত শহরের ভিউ। সুন্দর চৌখুপ্পি করা চষা খেত, তার মাঝে মাঝে টিনের চৌচালা ঘরদুয়ার এবং সব কিছু ছাড়িয়ে দিগন্তের কাছে গাঢ় নীলাভ পাহাড়ের উপরিভাগ আচ্ছন্ন হয়ে আছে মেঘের শুভ্র মসলিন পরানো নিখুঁত পর্দায়। এ দৃশ্যপটের দিকে তাকিয়ে ভিয়েতনামের শৈল শহর দালাতকে ফরাসি দেশের মফস্বলের কোনো পাস্তোর্যাল গ্রামের মতো দেখায়। আমরা এবার মুরাম বিছানো ঘুরানো পথে উপরের লেয়ারের দিকে উঠতে থাকি। আধাআধি উঠে আসতেই পাওয়া যায় সিমেন্টে বাঁধানো বেলকনির মতো একটি লুকআউট। আমাদের আড়াই বা তিন সদস্যের পর্যটক পরিবার- তথা আমরা লুকআউটটির প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকাই। সামান্য দূরে, পাহাড়টির ঢালে চা-বাগানের ঝোপে ঝোপে কর্মরত শ্রমিকরা নিড়ানি দিতে দিতে ঘাড় ঘুরিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ে। সাথে সাথে তাজা সবুজ চায়ের সৌরভে ভরে ওঠে তনুমন।
লুকআউট ছেড়ে আসতেই পাওয়া যায়- সরাসরি প্যালেসের আঙিনায় পর্যন্ত ধাপে ধাপে তৈরি সিমেন্টের সিঁড়ি। সিঁড়ি বেয়ে প্রাসাদের আঙিনা সংলগ্ন বাগানে আসতেই চোখে পড়ে, সদ্য বার্নিশ করা উজ্জ্বল নীল রঙের একটি এন্টিক মোটর-কার। আমার কন্যা কাজরি তৎক্ষণাৎ ‘লুক..হোয়াট অ্যা লাভলি ব্লু কার’, বলে নীল গাড়িতে সওয়ার হতে চাইলে তাকে সামলে সুমলে আমরা আরেক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসি সামার প্যালেসের বারান্দায়।
সামার প্যালেসটি আকার আকৃতিতে জমকালো হলেও বাইরে থেকে তেমন একটা দৃষ্টিনন্দন না। এর বারান্দার দেয়ালে ঝুলছে নিঃসঙ্গ এক শিংগাল হরিণের ট্যাক্সিডার্মি করা মস্তক। প্রবেশদ্বারের কাছাকাছি বৃহৎ কাউন্টার। ঈষৎ দূরে অপেক্ষা করার জন্য ফরাসি কেতার এন্টিক চেয়ারে সজ্জিত মাঝারি মাপের লাউঞ্জ। আমরা এখানে এসে খানিক থতমত খেয়ে যাই। আশপাশে কাউকে পাওয়া যায় না যে, দু’টি কথা বলব বা পরিবেশ হালকা করার মতো কিছু উপায় বের করবো। আমি ও হলেন বিশাল এ ভবনের ফরাসি বাতাবরণে দাঁড়িয়ে খানিক বিভ্রান্ত হয়ে পরস্পরের দিকে তাকাই। নির্জন কাউন্টারটির ওপরের দেয়াল জুড়ে বিশাল একটি তৈলচিত্র। তাতে পেছন ফিরে হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে চার ভিয়েতনামিজ যুবতী। তাদের সকলের পরনে লালচে-কামলালেবু রঙের সনাতনী পোশাক আওডাই। পট্টবস্ত্রের রেশমি আবরণ ভেদ করে নারীদের শরীরের রেখা শোভনভাবে স্পষ্ট হয়ে আছে। তৈলচিত্রটির দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকালে চোখে এসে লাগে বর্ণের হলকা।
লাউঞ্জে বসে বসে আমরা ভাবি, আপাত নির্জন এ বিপুল অট্টালিকায় না থেকে রাত্রিবাসের জন্য অন্য কোথাও যাওয়া যায় কি? কিন্তু যে ট্যাক্সি ধরে এখানে এসেছি-তা আমাদের পাহাড়ের নিচের লেয়ারে নামিয়ে দিয়ে গৃহস্থ যে রকম অনাকাক্সিক্ষত বেড়াল দূরে কোথাও ফেলে দিয়ে পেছন দিকে না তাকিয়ে ফিরে যায় নিজ গৃহে, সে রকম ড্রাইভারটি আমাদের স্যুটকেস, ব্যাগ-পোঁটলা নামানো হয়ে যেতেই কালো ধোঁয়া ছেড়ে চলে গেছে দালাত শহরের দিকে। এখন চাইলেও আর ব্যাগ, গাঁটটি ও বোঁচকা নিয়ে হেঁটে পাহাড়ের ঢাল ধরে নেমে দালাতে যাওয়া যাবে না। কেবল দূরত্বের জন্য এ পড়ন্ত বিকেল বেলা ওখানে পয়দলে গিয়ে রুচি অনুযায়ী হোটেল বা গেস্টহাউজ পাওয়া যাবে না। আমরা খানিক উদ্বিগ্ন হয়ে কাউন্টারে কারো উপস্থিত হওয়ার প্রত্যাশা করি। বেলে রঙের বিশাল দেয়ালে রূপালি ধূসরে মেশানো অন্য একটি বিমূর্ত কিউবিক ছাদের একটি চিত্র আমাদের এ সুনসান প্রশস্ত নীরব ইমারতে অবস্থানের অবাস্তবতাকে গাঢ় করে তুলে। কাজরি ফিস ফিস করে জিজ্ঞেস করে, ‘ইজ দিস অ্যা ভেরি ভেরি রিচ হাউজ বাপি?’ আমি তাকে সত্য কথাটি না বলে পারি না, জানাই, ‘এটা ইন্দো-চীনের গভর্নর জেনারেলের গ্রীষ্ম প্রাসাদ।’ কাজরি অবাক হওয়ার ভান করে বলে, ‘ওয়াও, এ প্যালেস! ইজ গভর্নর জেনারেল অ্যা রাজা?’ ইন্দো-চীনের এককালীন ফেঞ্চ গভর্নর জেনারেল যে একাধিক রাজন্যবর্গের শিরোপরি রাজচক্রবর্তী হয়ে বিরাজ করতেন- ঔপনিবেশিক যুগের শাসন-বিভ্রাট ছোট্ট মেয়েটিকে সহজে বুঝাই কিভাবে? ব্যাখ্যা করতে না পারার ব্যর্থতা আমাকে স্পষ্টত বিরক্ত করে তুলে। হলেন আমার দিকে তাকিয়ে ইশারায় ধৈর্য ধরতে বলে। দূরে কোথাও প্রাসাদের কোনো অলিন্দে যেন কাককু ক্লকে অপরাহ্ন চারটা বাজার ঢং ঢং সঙ্কেত হয়। কিউবিক ছাদের চিত্রটির আড়াল থেকে খড়কুটা মুখে উড়ে আসে দু’টি চড়ুই। পাখি দু’টি প্রবেশ দ্বারের দিকে না গিয়ে লাউঞ্চে খানিক উড়াউড়ি করে চলে যায় অন্য কোন কক্ষের অন্তরালে।
লাট সাহেবের বাস ভবনে এসে পড়ার জন্য আমাদের কোন রূপ পূর্ব-প্রস্তুতি ছিল না। আমরা ঠিক জানতামই না যে, ফরাসি লাট বাহাদুর দালাত শৈল নিবাস থেকে ঈষৎ দূরে পাইন বনের গভীরে গ্রীষ্ম প্রাসাদ হাঁকিয়ে বসে আছেন। হোচিমিন সিটি বা সায়গন থেকে ২১৫ কিলোমিটার দূরে দালাত বলে এ হিল স্টেশনের নাম শুনেছি এ যাত্রায় ইংরেজ ট্র্যাবেল রাইটার নরমান লুইসের বই পড়ে। তিনি যদিও দালাতকে ইন্দোচীনের প্লেগ্রাউন্ড বলে উল্লেখ করেছেন, তবুও তার লেখায় স্থানটির নিরিবিলি পরিবেশের তারিফ আছে। এখানে আসার আগে আমরা দিন কতক হোচিমিন সিটিতে ছিলাম। ছৃহৎ মেট্রোপলে জন অরণ্যের চাপ, সারা দিনমান গাড়ি ঘোড়ার হাঁকাহাঁকিতে স্নায়ুর ওপর বেশ ধকল গেছে। তাই হলেন টেলিফোনে দালাতের ট্যুর এজেন্টকে নির্জন একটি স্থান দেখে দেয়ার জন্য অনুরোধ করেছিল। সুতরাং এ হচ্ছে নিরিবিলিতে বাসের গোনাগারি। মিনিট তিরিশেক হলো বিশাল এক প্রাসাদের লবিতে বসে বিমূর্ত চিত্রের দিকে তাকিয়ে আছি। এখানে কিউবিক রঙ-নকশার প্রান্ত ধরে চড়ুই দু’টির উড়ে যাওয়া ভিন্ন অন্য কোন প্রাণ আছে বলে মনেই হয় না। কাজরি অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘ক্যান উই ওয়াক অ্যারাউন্ড দিস প্যালেস?’ প্রস্তাবটি মন্দ নয় ভেবে আমরা অট্টালিকটির কিছু অজানা অংশ ঘুরে ফিরে দেখতে এগোই।
লাউঞ্চের অন্য প্রান্তে আঙিনার মতো খোলা স্পেস্। দু’কোণে দু’টি প্লাস্টার অব প্যারিসে গড়া ম্লান হয়ে আসা সোনালি বর্ণের গ্রিক কিংবা রোমান পৌরাণিক মূর্তি। একটি মূর্তির বাহু ও দেয়ালজুড়ে টাঙানো মস্ত এক মাকড়সার জাল। আমরা কাছাকাছি হতেই সুতা বেয়ে দ্রুত অন্ধকারের দিকে অপসৃত হতে থাকে ডোরাকাটা বৃহৎ পতঙ্গ। জালটির এদিক ওদিক নার্ভাস হয়ে হেঁটে বেড়ায় ক’টি হালকা শিশু-মাকড়সা। তাদের সঞ্চালন রীতিমত সন্ত্রস্ত করে তুলে আমাদের ছোট্ট মেয়েটিকে। কাজরি আমার আস্তিন সাপটে ধরে কাছে সেঁটে থাকে। দেয়ালের ¯ট্যান্ডে রাখা বেশ ক’টি ছড়ি, ট্রেকিং স্টিক ও ঝুলন্ত কিছু সাহেবি টুপি। পাশে কাচের স্কাইলাইটের সমান্তরাল রেখায় টাঙানো আয়না। আরশিতে ছায়া পড়ে কম্পমান এক অলিভবর্ণ ঝুপসি বৃক্ষের। বাইরে বুঝি হাওয়া হচ্ছে। আয়নায় অজস্র পত্রালি প্রাণের স্পন্দনের মতো কাঁপে। আমি কাজরিকে কাঁধে তুলে বৃক্ষের প্রতিফলন দেখাই। হলেন আস্তে আস্তে হেঁটে গিয়ে গাঢ় কৃষ্ণ বর্ণের ল্যাকারে স্বর্ণপত্রের নকশা আঁকা স্ক্রিন খুলে। স্ক্রিনটির গায়ে সাঁটা ফলক। আমি কাজরিকে কাঁধে নিয়ে ফলকটি পড়ি। ‘ভিয়েতনামের শেষ সম্রাট বাওডাই এন্টিক স্ক্রিনটি গভর্নর জেনারেলকে গিফট্ হিসেবে পাঠান সাতষট্টি বছর আগে।’ স্ক্রিন ঠেলে সরিয়ে আমরা বৃহৎ পার্লারে চলে আসার মুখে শুভ্র টিউনিক পরা এক তরুণীর পোর্ট্রেটের সামনে খানিক দাঁড়াই। বিশের দশকের ভিয়েতনামের নামজাদা চিত্রশিল্পী তন নগক ভানের আঁকা সাদা ফুল হাতে নারীর চোখমুখ থেকে ঝরে যুগপৎ বিষণœতা ও সিগ্ধ আলো। এ তৈলচিত্রও ফরাসি গভর্নরকে দেয়া সম্রাটের উপঢৌকন। দালাতে বোধ করি নির্দিষ্ট মৌসুমে তীব্র শীত পড়ে, তাই এ হল কক্ষটিতে আছে দু’টি ফায়ারপ্লেস। এক কোণে বিশাল পিয়ানো। পিয়ানোর ওপর রাখা রকমারি ফ্রেমে বাঁধানো কিছু পারিবারিক চিত্র। আমি ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে পরিবারবর্গের চেহারা-সুরত কল্পনা করতে চেষ্টা করি। হলেন স্বরলিপির বইগুলো উল্টায়। অনেক দিনের জমে থাকা ধুলা উড়ে। কাজরি হাঁচতে শুরু করলে আমরা কামরাটির অন্যদিকে হাঁটি।
এখানকার দেয়ালেও প্রকান্ড আরেকটি তেলের কাজ। চিত্রটিতে পাঁচটি ভিয়েতনামিজ তরুণী ঘাসে বসে তাস খেলছে। মেয়েগুলোর পরনে পুদিনা সবুজ, লাইম, রোজ্ ও নীল বর্ণের আওডাই বলে এক ধরনের পোশাক। একটি মেয়ের জামায় লেবু ফুলের মতো ছোট্ট সাদা নকশা আঁকা। সে খেলছে না, তাকিয়ে আছে অন্য মেয়েটির তাসের দিকে। দূরে অস্পষ্ট হয়ে আসা আলোয় আরেকটি মেয়ে তাকিয়ে আছে আনমনা। মেয়েটির দীর্ঘ চুল যেন প্রপাতের কাসকেটের মতো নেমে এসেছে স্তরে স্তরে, আর তাতে ফুটে আছে তীব্র নীল ক’টি অপরাজিতা। আমরা তৈলাচিত্রের প্রাণবন্ত তারুণ্যের দিকে খানিকক্ষণ মুগ্ধ হয়ে তাকাই। কল্পনা করতে চেষ্টা করি- বহুদিন আগের এক হারিয়ে হাওয়া অপরাহ্ন, যখন পাঁচটি মেয়ে কোন এক চিত্রশিল্পীর দৃষ্টি সীমানায় বসে তাস খেলছিল। ভাবতে আমার কেন জানি অস্বস্তি বোধ হতে থাকে। মনে হয়, কারা যেন আড়াল থেকে আমাদের দেখছে। কিন্তু দেখার কি-বা আছে? আমরা তো এখানে অবৈধভাবে আসিনি। এসেছি রীতিমত পয়সাকড়ি দিয়ে বিধি সম্মতভাবে রিজারভেশন করে। তাই আচমকা অদ্ভুত কোন ভাবনাকে আমল দেই না। কাজরি চলে গেছে দেয়ালজুড়ে বসানো কাচের বৃহৎ ফেঞ্চউন্ডোর কাছে। আমি ও হলেন তার কাছে যাই। কাচের অন্তরালে সিমেন্টের খোলা বারান্দায় যতেœ করা বাগান। এক রাশ সাদা ও বেগুনি করোনেশন ফুলের প্রেক্ষাপটে স্থানে স্থানে ফুটে আছে থোকা থোকা মেজেন্টা রঙের হলিহক ফুলের ঝাড়। আমরা ভিন্ন প্রেক্ষিত পাওয়ার জন্য ফেঞ্চ উইন্ডোটি থেকে পেছনে সরে দাঁড়াই। পাহাড়ের ঢালে নেমে যাওয়া দীর্ঘ পাইন গাছের ঈষৎ বাদামি সবুজ রেখা আমাদের দৃষ্টি পথে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দূরে মেঘের ফাঁকে চাঁদের মতো ঝক ঝক করে ওঠে হ্রদের রূপালি জল।
কোথায় যেন হালকা মেয়েলি হাসির শব্দে আমি ও হলেন চমকে উঠে পরস্পরের দিকে তাকাই। আড়াল থেকে আমাদের বুঝি কেউ দেখছে- এ অনুভূতিকে আর অবহেলা করা যায় না। আমি ও হলেন সাবধানে চারদিকে তাকাতে শুরু করি। কাজরি ওপরের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, ‘বাপি, লুক দেয়ার।’ আমরা ঘাড় বাঁকিয়ে দোতালার ঝুলন্ত বেলকনির দিকে তাকাই। তিন তিনটি ভিয়েতনামিজ তরুণী যেন বক্সে বসে থিয়েটার দেখছে এরূপ মুখ করে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আমার সাথে চোখাচোখি হতেই তারা ক্লাউনের অঙ্গভঙ্গিতে খিল খিল হাসিতে লুটিয়ে পড়ে। এবার তারা হাতের ইশারায় কাজরিকে ওপরে যেতে ইশারা করে। কাজরিকে আর পায় কে? সে ছুটে যায় মেহগিনি কাঠের ভারী বাঁকানো সিঁড়ি পথের দিকে। আমাকে নিয়ে মেয়েরা কিঞ্চিৎ হাসাহাসি বিদ্রুপ করছে বটে। কিন্তু তাতে আমি মোটেই বিরক্ত বোধ করি না। বরং স্বস্তি হয় প্রাসাদটিতে লোকজন আছে দেখে। সাটিনের ফুলেল গাউন পরে পক্ব কেশ এক বৃদ্ধা নেমে আসেন সিঁড়ি পথে কাজরির পাশ দিয়ে। আমাদের তিনি ওয়েটিং লাউঞ্চের কাউন্টারে যেতে বলেন। অতঃপর তিনি আমার পাসপোর্টটি নেড়ে চেড়ে দেখেন পেশাগত দক্ষতায়। তারপর বিশুদ্ধ ফরাসিতে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আমরা বিবাহিত কি না?’ হলেন কিছু একটা জবাব দেয়। আমার ইচ্ছা হয় বলি – ‘এখানে কাজী ফাজী থাকলে ডেকে নিয়ে এস, কাজটি না হয় তোমার সামনে আবার করে দেখাই।’ কিন্তু আমি ফরাসি বলতে অপারগ বলে মনের বাসনা অপূর্ণ থেকে যায়। কাজরিসহ মেয়ে তিনটি এবার নিচে নেমে এসেছে। তারা আমাদের স্যুটকেস, ব্যাগ বাক্স-পোঁটলা তুলে নিচ্ছে বোধ করি কক্ষে পৌঁছে দেয়ার জন্য। কিন্তু তাদের থেকে থেকে কোমরে ভাঁজ ফেলে খিলখিলেমির বিরাম হচ্ছে না। কাজরি তাই সরাসরি জিজ্ঞেস করে বসে, ‘হোয়াই আর দে লাফিং সো মাচ?’ হলেন মৌলিক এ প্রশ্নটি ফরাসিতে তরজমা করে বৃদ্ধার দিকে তাকায়। বৃদ্ধার নাতিদীর্ঘ জবাব থেকে যা জানা যায় তার সারাংশ হলো, ‘এ বাড়িতে প্রায়ই লোকজন আসে সিনেমার শুটিং করতে। তাই মেইড তিনটি আড়াল থেকে আমাদের দেখে ভেবেছিল আমরা সিনেমার লোক। এমন কি আমাকে মনে করেছিল আমি অভিনয়ের জন্য ইন্ডিয়ানদের ছদ্দবেশ নিয়েছি। কিন্তু তাদের ভুল ভেঙে যেতে এখন সকলে থেকে থেকে হেসে আকুল হচ্ছে।’ বৃদ্ধা এবার আমাদের জানানÑ বসবাসের জন্য এ ভবনে মোট পঁচিশটি কক্ষ আছে। আমাদের রাত্রিবাসের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে যে কক্ষ- সেখানে এক সময় গভর্নরের মেয়ে ও জামাতা থাকতো । আমাদের ব্যাগ-বোঁচকা নিয়ে মেইড তিনটি সাথে সাথে আসে কামরা সরজমিনে দেখিয়ে দেয়ার জন্য। ঔপনিবেশিক ধাঁচের অতি বৃহৎ এ কামরায় মেহগিনির ভারী পালঙ্ক ও কাউচ। আমরা কামরায় ঢুকলে- চলাফেরার আলোড়নে ভড়কে গিয়ে দু’টি সাদা সবুজে ফোঁটা ফোঁটা তক্ষক দেয়াল বেয়ে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার পেছনে মুখ লুকায়। হোক না সে লাট বেলাটের মেয়ে-জামাতার কক্ষ, আমরা নিজস্ব একটি কামরা পেয়ে স্বস্তি পাই। জামাকাপড় পাল্টাতে গিয়ে ক্লসেট খুলতে হয়। কাঠের দুয়ার টেনে রীতিমতো থমকে যাই। ওখানে ঝুলছে জীর্ণ হয়ে আসা অতি পুরাতন ক’টি ড্রেসিং গাউন ও সিল্কের মেয়েলি মলিন হয়ে আসা নৈশবাস। ফিরে এসে রঙচটা সোনালিতে গিল্টি করা কাউচে বসে কেবলই মনে হতে থাকে, বুঝি কারো প্রাইভেট এলাকায় এসে পড়েছি। কিন্তু কি আর করা যায়? অলস চোখে তাকিয়ে থাকি দেয়ালে ঝুলন্ত রঙ জ্বলে যাওয়া সাদাটে ধূসর ছোট্ট তৈলচিত্রের দিকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে ক্রমশ চিত্রটি মূর্তিমান হয়ে ওঠে। মনে হয়, নব বিবাহিত এক দম্পতি চার্চের আইল ধরে ফুলের তোড়া হাতে হেঁটে আসছে।
আমরা কামরা থেকে বেরিয়ে করিডোর ধরে একটু হাঁটাহাঁটি করি। এসে পড়ি ছোট্ট এক চিলতে এক বেলকনিতে। ওখানে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে ঝুঁকে তাকাতেই চোখে পড়ে – বেশ দূরে, দালাত শহরের মাঝ বরাবর দৃষ্টিনন্দন সরোবরটির। শেষ বিকালের আলো লেগে লেকের জলে যেন ছলকে যাচ্ছে রূপালি বিদ্যুৎ। লেকের কিনার ঘেষে রূপকথার দৃশ্যপটের মতো রাজহাঁসের আকৃতিতে তৈরি এক সারি নৌকা। কাজরি ডাক-বোটগুলোর দিকে ইশারা করে জানতে চায়, ‘বাপি, কুড উই গো ব্যাক টু লেক, আমি রাজহাঁসের মতো নৌকায় ভাসতে চাই।’ সন্ধ্যা হয়ে আসছে, তাই আজ আর এখান থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সি ধরে শহরের গিয়ে লেকে নৌকা চড়ার কোন উপায় নেই। তাই মেয়েটিকে বলি, ‘কামন গার্ল, লেট সি হাউ দিস প্যালেস ট্রিট আস টু নাইট। কালকে অবশ্যই তোমাকে নিয়ে সরোবরে যাবো ডাক-বোট চড়তে।’
আমরা বেলকনি ছেড়ে আবার ফিরে আসি আমাদের কামরায়। কামরাটির বিশাল ফেঞ্চ উইন্ডো থেকে প্রাসাদ প্রাঙ্গণের বেশ খানিক দেখা যায়। এখান থেকে দূরের পাইন বন ও আরো এক সারি ঢেউ খেলানো পাহাড়ের নীলাভ রেখা দিব্যি চোখে পড়ে। কিছুক্ষণ পর আমরা প্রাঙ্গণের বাগানে হাঁটাচলা করার জন্য নেমে আসি। নানা বর্ণের মরশুমি ফুল ও দীর্ঘ ঘাসকে মেনিকিওর করে এখানে তৈরি করা হয়েছে বাগান সজ্জার আশ্চর্য সবুজ জ্যামিতি। কিন্তু আমাদের ঘাসের নকশার ভেতরবাগে যেতে দেয়া হয় না। বৃদ্ধা স্বয়ং এসে ডেকে আমাদের নিয়ে গিয়ে বসান গোলাকার একটি কক্ষে। ফলক পড়ে জানা যায়- এ বৃত্তাকার কামরাটি ছিল গভর্নর-পত্নী লেডির নিজস্ব ড্রয়িং রুম। মেইডদের একজন নিয়ে আসে টিপট ও চায়ের পেয়ালা। চীনা মাটির চায়ের সরঞ্জামগুলো চেয়ে দেখার মতো। টিপট ও পিরিচে হাতে আঁকা ছোট্ট ছোট্ট মিনিয়েচার ফরাসি চিত্র। আমাদের টেবিলের পাশে একটি সেলাই মেশিনের অবস্থান থেকে আন্দাজ করি -লেডি অবসরে সেলাই-ফোড়াই নিয়ে থাকতেন। আমরা চা খেতে খেতে কামরার চিত্রগুলো দেখি। আমাদের সামনের দেয়ালে ভিয়েতনামি তিন কিশোরীর আরেকটি প্রাণবন্ত তৈলচিত্র। মেয়েগুলো খিল খিল হেসে শক্তপোক্ত ডাল থেকে ঝুলানো দোলনায় দোল খাচ্ছে। রঙের বিকিরণে প্রকাশ পাচ্ছে তাদের মনের লুঘুত্ব। এ ড্রয়িংরুমের সোফাগুলো রিভলবিং। তাই অনায়াসে আমরা আসন ঘুরিয়ে অন্যদিকের স্ট্যান্ডে আটকানো অন্য চিত্রটি দেখি। এ ছবিটির মুড মিলাংকোলিক, বিষন্ন। এখানে ছায়া ছায়া নীলে আঁকা এক তরুণী তারের যন্ত্র বাজাচ্ছে, দূর দিগন্তে ভাসছে ক্রিমসন মেঘমালা, তার নিচে উড়ে চলেছে ধূসরে সূর্যরশ্মির গোলাপি ছোপ দেয়া দ্রুতগামী এক অশ্বারোহী। চিত্রটির নিচে তাম্রফলকে লেখা, ‘আই অ্যাম অ্যাট হোম, অ্যান্ড ইউ আর ইন দ্য হোরাইজন।’ ছবিটির মুড ছোঁয়াছে বীজাণুর মতো সংক্রামিত হয় আমাদের মনে। চায়ের পেয়ালা হাতে বিষন্ন হয়ে বসে থাকি আমরা খানিকক্ষণ।
ড্রইংরুমের কোথাও কাজরিকে দেখা যায় না। সে বোধ করি বাইরে গেছে। আমরা তার সন্ধানে কামরার বারান্দায় চলে আসি। এখানে নকশাকাটা টাইলের ছোট্ট একটি অঙ্গন। অঙ্গনের মাঝামাঝি শ্বেত পাথরের পরি মূর্তি ও ফোয়ারা। আঙিনাটি ঘেরা চার দিকে বাঁধানো ছাদখোলা করিডোর দিয়ে। করিডোরের যেখানে ছাদ থাকার কথা, সেখানে থেকে ঝুলছে রাশি রাশি বাগান বিলাস ও গোল্ডেন শাওয়ারের ট্রেলাস। কাজরিকে পাওয়া যায় ফোয়ারার পাশে পাথর খন্ডের উপর বসে থাকতে। তার সামনে খেলনার সোফায় বসে ভিয়েতনামিজ ছেলে ও মেয়ে পুতুল। আমাদের দেখে সে বলে উঠে, ‘মাই ডলস্ আর হেবিং কোয়াইট টাইম অ্যান্ড আই অ্যাম থিংকিং।’ আমরা পুতুলের ব্যক্তিগত মুহূর্তে বিগ্ন হতে চাই না, এমন কি একমাত্র কন্যার একাগ্র চিন্তায় ব্যাঘাত ঘটাতেও অনাগ্রহী। তাই গোল্ডেন শাওয়ারের সোনালি ফুলে ছাওয়া করিডোর ধরে চলে আসি প্রাসাদের মূল বাগানে। বাগানে ল্যাভেন্ডার রঙের ঝাঁক ঝাঁক রকি মাডন্টেন এসটার। এখানে সেখানে বেশ কিছু কমলারঙের পপি ও ঝুমকো লতার মতো দেখতে পার্পোল বর্ণের পিটুনিয়া ফুল। আমরা বাগানের জ্যামিতিক ল্যান্ডস্কেপিং নিয়ে একটি-দু’টি কথা বলি। পুতুল দম্পতি হাতে নিয়ে কাজরি এবং তার পেছন পেছন বৃদ্ধা এসে আমাদের সাথে যোগ দেন।
আমরা সকলে মিলে প্রাঙ্গণের প্রান্তে যত্নে লাগানো পাইন বনে হাঁটি। একটি বাঁধানো সড়ক বেঁকে চলে গেছে বনানীর খানিক গভীরে। সড়কটির পর ধাপে ধাপে নেমে গেছে সিঁড়ি। আমরা ওখানে দাঁড়িয়ে দূরের সারি সারি পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকি কিছুক্ষণ। নিচের বুনো ট্রেইল ধরে ধীরে ধীরে হাঁটে গোটা চারেক ঘোড়া। ঘোড়াগুলোর পাশে পাশে চলে কাউবয়দের মতো পানি টেইল করা চুল, হ্যাট, বুট ও চামড়ার জ্যাকেট পরা ভিয়েতনামিজ যুবক। ঘোড় সওয়ারদের সকলকেই পশ্চাত্যের পর্যটক বলে মনে হয়। দিগন্তে একটি প্যারাস্যুট উড়তে দেখা যায়। দেখতে দেখতে মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে আরেকটি প্যারাস্যুট। প্যারাস্যুট দু’টি এবার ধীরে উড়ে যাচ্ছে শেষ বিকেলের আলোয় পাহাড় চূড়া যেখানে রাঙা হয়ে উঠেছে সে দিকে। ঘোড়ার পিটে বসে ট্রেইল ধরে যেতে যেতে সকলে ঘাড় বাঁকিয়ে প্যারাস্যুট দু’টির দিকে তাকায়। প্রাসাদের বৃদ্ধা কেয়ারটেকার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, ‘দালাত শৈল শহরটি আর আগের মতো নেই। আজকাল এখানে প্রতিদিন আসে হাজার রকমের টুরিস্ট। তাদের কেউ ঘোড়া ভাড়া করে চলে যেতে চায় বনানীর গভীরে। অন্যরা ভালোবাসে আকাশে উড়তে।’ আমরাও টুরিস্টদের অন্তর্ভুক্ত। তারপরও বুঝতে পারি, তার মন্তব্যে যেন ঝরে হারানো দিনের নস্টালজিয়া-জাত বেদনা। আমরা নীরবে প্রাসাদ প্রাঙ্গণে ফিরে আসি। এখন শেষ বিকেলের আলো এসে লাগছে হলদে বেলে পাথরের স্থাপত্যটিতে। বিশাল এ ভবনকে এখন আরো বেশি অচেনা মনে হয়। মনে হয়, রঙজ্বলা পুরানো দিনের এ গৃহের অনেক কিছুই এখনো অজানা থেকে গেছে।
প্রাসাদের পেছন দিকে ছাদহীন প্রশস্ত বারান্দা। এখান থেকে দালাত লেকের খানিকটা দেখা যায়। কাজরি চোখে মুখে রহস্য ফুটিয়ে তুলে বলে, ‘লেটস গো অ্যান্ড এক্সপ্লোর দেয়ার।’ আমরা বারান্দা ধরে হাঁটি। পাইনের ডাল বেয়ে ক্ষিপ্রগতিতে ছুটে যায় দু’টি কাঠবিড়ালি। বারান্দার প্রান্তদেশ ধাপে ধাপে নিচে নেমে যেতে থাকে। এখানকার নিম্নগামী সিঁড়ি পথটি বাগান বিলাসের বর্ণিল ঝাড়ে অন্ধকার হয়ে আছে। আমরা ধীরে ধীরে নেমে যেতে থাকি নিচে। খোলা দরজা পথে অবশেষে প্রবেশ করি বেইসমেন্ট বা তলঘরে। এখানেও অনেক কক্ষ, বৃহৎ স্পেসের সব কিছু আঁধার হয়ে আছে। জায়গাটি অনেক করিডোর ও নানা রকমের গোলকধাঁধায় রহস্যময়। আমরা লন্ড্রিরুম ও কিচেন অতিক্রম করে যাই। একটি কক্ষে ডাঁই করে রাখা অনেকগুলো পুরনো পেইনটিং। খান তিনেক আধ ভাঙা মার্বেল পাথরের মূর্তি। মস্ত এক টেবিলের ওপর রাখা আদ্যিকালের গ্রামোফোন। পাশে অবহেলায় পড়ে আছে অনেকগুলো মাটির রেকর্ড। দেয়ালে ঝুলানো একটি চিত্রে সুঁইসুতা দিয়ে আঁকা আইফেল টাওয়ার। টাওয়ারের নিচে রাখা অপেরা গাস ও একটি রেমিংটন টাইপ রাইটার। আমরা এবার চলে আসি, বেশ কিছু পশু, পাখি ও প্রাণীর মূর্তিতে ভরপুর হলঘরে। হলঘরটিতে তুলনামূলকভাবে আলো আসছে অনেক বেশি। ছাদের সাথে লাগানো গুলগুলো ছাড়াও এখানে আছে দু’খানা কাচের জানালা। একটু নজর করতেই বুঝতে পারি, প্রাণীগুলো মূর্তি নয় বরং ট্যাক্সিডার্মি করা। বেশ ক’টি চিতাবাঘ, লেপার্ড ও বন বিড়ালের ট্যাক্সিডার্মির কাছে রাখা ছোট্ট একটি ভালুক ও মায়া হরিণের মৃত শরীর। এখানকার ফলক পড়ে জানা যায়Ñ প্রাণীদের সকলেরই মৃত্যু হয় বড় লাটের অব্যর্থ গুলিতে। প্রাণীগুলোর পাশেই রাখা লাট সাহেবের ব্যবহৃত জংধরা তিনটি বন্দুক। প্রাণী ছাড়াও বোধ করি সাহেবের পাখি শিকারের শখ ছিল। জানালার পাশে আমরা বেশ ক’টি ঈগল, বিরল প্রজাতির সবুজ ঘুঘু, ধনেশ ও পেঁচকের ট্যাক্সিডার্মি দেখতে পাই। বুনো জানোয়ার ও পাখির ট্যাক্সিডার্মিগুলো থেকে ঈষৎ তফাতে রাখা কুচকুচে কালো একটি অ্যালসেসিয়ানের মূর্তি। কাজরি বলে, ‘বাপি, দ্যা ডগ ইজ লুকিং অ্যাট আস।’ আমি ফ্লাশ লাগিয়ে পাখা ছড়ানো ঈগলের ছবি তুলতে তুলতে তার কথার বিশেষ গুরুত্ব দেই না। তবে মনে মনে লাট সাহেবের শখের কথা ভাবি। মনে হয়, কুকুরটি হয়তো তার প্রিয় ছিল। তাই মৃত্যুর পর তাকেও ট্যাক্সিডার্মি করে রাখা হয়েছে। আমার ক্যামেরায় ফ্লাশ হয়। সাথে সাথে মৃত কুকুরটি তীব্র ঘেউ ঘেউ শব্দে জেগে ওঠে। আমি ও কাজরি এতই চমকে যাই যে, আমরা আর্তচিৎকার করতে করতে ছুটি সিঁড়ির পানে। আমাদের পেছন পেছন ধেয়ে আসে অ্যালসেশিয়ানের রাগত স্বর। আমরা পিতা-পুত্রী এতো জোরে চিৎকার করি যে- আমাদের আর্তস্বর বোধ করি দালাত শহর থেকে শুনা যায়। সিঁড়ির মুখেই আমাদের সাথে বৃদ্ধা কেয়ারটেকারের দেখা হয়। তিনি আমাদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু আমরা প্রবলভাবে লবির দিকে ছুটছি। অবশেষে হলেন ও সব ক’টি মেইড্ আমাদের চারপাশে জড়ো হয়। বৃদ্ধা এসে বুঝিয়ে বলেন, ‘কুকুরটি তার নিজস্ব পোষা, ওটি ট্যাক্সিডার্মি করা নয়। উপরন্তু অ্যালসেশিয়ানটি চেনে বাঁধা। এ পর্যন্ত শোনার পর আমি ও কাজরি একটি কাউচে বসে পড়িÑ আমাদের বুকের ধুকধুকানি থামানোর জন্য।
সন্ধ্যা শেষ হলে আমাদের লাট সাহেবের খানা কামরায় ডিনার পরিবেশন করা হয়। প্রায় পঁচিশ জনের বসার উপযোগী বৃহৎ মেহগিনি টেবিলে আমরা আড়াই জনের পরিবার সান্ধ্য ভোজনে বসি। অতি বিস্বাদ ফরাসি খাবারের সাথে পরিবেশিত হয় দুই প্রকারের ওয়াইন। আমি স্ফটিকের পাত্রে পরিবেশত গরলটি না ছুঁয়ে পানি খাচ্ছি দেখে মেইড আমার দিকে এমনভাবে তাকায়, যেন আমি এক আধ-নগ্ন নাগা সন্ন্যাসী। আমি ও সবে ভ্রুক্ষেপ না করে উৎকট স্বাদের খাদ্যটি ঘাঁটতে ঘাঁটতে ভাবি, ডিনার শেষ হলে শহরে হেঁটে গিয়ে চিঁড়ামুড়ি কিনে আনতে হবে। তারপর সময় কাটানোর জন্য দেয়াল জোড়া মস্ত চিত্রটি খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করি। মনে হয়, স্রোতস্বিনীর রূপালি জলে পা ডুবিয়ে বসে আছে একাকী এক রাজকুমার। পাশে অবহেলায় পড়ে আছে তার তরবারি। একটু দূরে ঘাসে নিঃসঙ্গ চরে বেড়ায় সওয়ারিহীন ঘোড়া। কুমার তাকিয়ে আছে এক ফালি চাঁদের দিকে। চিত্রটির নিচে একখানি ফলক দেখতে পেয়ে আমি ফর্মালি ডিনার শেষ না করে চলে যাই তা পড়তে। দু’জন মেইড্ পরস্পরের দিকে চোখাচোখি করে। আমি ফলকে পড়ি- ‘চতুর্দশ শতকের বীরেন্দ্র কেশরী ডংডুয়াং চন্দ্রালোকে ধারালো করে নিচ্ছেন তার তরবারি খানা।’ খাবার শেষে পার্লারে পরিবেশন করা হয় পোর্ট ওয়াইন ও তারপর ফ্রেঞ্চরোস্ট কফি। আমরা ওসব না ছুঁয়েই চলে আসি শয়নকক্ষে।
প্রাসাদে রাত গভীর হয় দ্রুত। এক সময় লাউঞ্চ, পার্লারের মস্ত মস্ত সব ঝাড়বাতি নিভিয়ে দেয়া হয়। কাজরি বিছনায় শোয়া মাত্রই চলে যায় ঘুমের দেশে। কিন্তু আমাদের সহজে ঘুম আসে না। আমাদের কামরার চতুর্দিকে বেশ ক’টি দরোজা। আমি একটি দরোজা অতিক্রম করে ছোট্ট একটি ড্রেসিংরুমে চলে আসি। কামরাটির দেয়ালে টাঙানো সুন্দর একটি জলরঙের কাজ। চিত্রটিতে ভিয়েতনামিজ শৈলীতে আঁকা সাঁকো, নৌকা ও সবুজ গাছের প্রতীক আমার দৃষ্টিপাতে স্নিগ্ধতা ছড়ায়। হলেণ একটি দরোজা খুলে আমাকে ওদিক পানে যেতে বলে। গিয়ে দেখি, এ যে মস্ত এক গোছলখানা। কামরার ঠিক মধ্যস্থলে বসানো সিরামিকের বৃহৎ বাথটাব। আমরা ফসেটগুলো নেড়ে চেড়ে দেখি। মনে হয়, জলের কলটি বিকল হয়ে আছে বহু বছর। তাই আর কবোষ্ণ জলে গা চুবিয়ে বসে থাকার গুড়ে বালি পড়ে। হলেনই আবিষ্কার করে ছাদের বিবর্ণ চিত্রটি। ছবির বিষয় কি তা খুঁটিয়ে দেখার জন্য আমাদের দু’জনকে পালা করে বাথটাবে শুতে হয়। একদিকে শুলে চোখে পড়ে, ছাদে শুয়ে থাকা নগ্নিকা নারী দেহের ওপর। শোয়ার ভঙ্গি বদলিয়ে দিক পরিবর্তন করলে মূর্তিটি যেন হয়ে দাঁড়ায় পাইপ মুখে পেশি বহুল পুরুষ। আর মাথা একটু নাড়াচাড়া করলেই মনে হয়, নারী পুরুষ পরস্পরকে আলিঙ্গনের জন্য হাত বাড়িয়ে আছে। আমরা রেখাচিত্রের রহস্য নিয়ে খানিক কথাবার্তা বলি। হঠাৎ করে একটি চামচিকা বাথটাবের ওপর দিয়ে উড়ে গেলে হলেন মৃদু আর্তনাদ করে ফিরে যায় শয়নকক্ষে। আমি বিছানায় ফিরে এসে চেষ্টা করি অর্ধ সমাপ্ত নরমান লুইসের ট্র্যাবেল-বুক’টি শেষ করার। কিন্তু মনোসংযোগ হয় না। অবশেষে বিরক্ত হয়ে আমরা বাতি নেভাই।
রাত বাড়ে। কিন্তু ঘুম আর আসেই না। এক সময় বিছানা ছেড়ে উঠি। ভাবি, কামরার বাইরে গিয়ে বেলকনিতে খানিক পায়চারি করলে কেমন হয়। ইংরেজি এল অক্ষরের মতো আধো অন্ধকার বেলকনি থেকে লাউঞ্চের বেশ খানিকটা দেখা যায়। আমি হাঁটতে হাঁটতে কোথায় যেন নারী কণ্ঠের হাসির ধ্বনি শুনতে পাই। খানিক কথাবার্তাও কানে ভেসে আসে। তাই বিষয়টিকে আর উপেক্ষা করা যায় না। আমি সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসি ল্যান্ডিং এর কাছাকাছি। এখানে জ্বলে থাকা একটি মাত্র টিমটিমে বাতি বুঝি প্রাসাদের বৃহৎ স্পেসে বৃদ্ধি করেছে অন্ধকারের গভীরতা। আমি ল্যান্ডিং এ আসা মাত্রই চোখে পড়ে দিনে না দেখা আরেকটি চিত্র। ছবিতে দু’টি কবুতর বেতের ঝুড়িতে রাখা যবধান খাচ্ছে। আমাকে চমকে দিয়ে অট্টালিকার কোন এক নাম না জানা কক্ষে কাককু ঘড়িতে পর পর বারো বার পাখি কণ্ঠে কাককু ধ্বনি হয়। আমি নিজের অজান্তে নেমে আসি সিঁড়ির আরো দু’টি ধাপ। এখান থেকে গুটানো স্ক্রিনের বৃহৎ ফোকর দিয়ে পার্লারের বেশ কিছু অংশ দেখা যায়। আমি অবাক হয়ে দেখি, লাট সাহেবের চেয়ারটিতে আধ শোয়া হয়ে বসে আছে তিন প্রস্ত স্যুট ও বো টাই পরা টেকো এক ব্যক্তি। লোকটির চারপাশে দাঁড়ানো রঙিন আওডাই পরা তিন ভিয়েনামিজ তরুণী। সকলের হাতে ক্রিস্টালের ওয়াইন গ্লাস। মনে হয়, তৈলচিত্রের তাসের দান ছেড়ে তিন যুবতী নেমে এসেছে পানপাত্র হাতে। একটি মেয়ে চেয়ারের কাছাকাছি হয়ে লোকটির চুলে হাত রাখে। পার্লারের ঝাড়বাতি নেভানো। গোল সেন্টার টেবিলে জ্বলছে মৃদু মোমবাতি। তার ম্লান আলোয় মেয়েটির দাঁড়ানোর ভঙ্গি পরিচিত মনে হয়। একটি মেয়ে চলে যায় দৃষ্টির অন্তরালে। কোথায় যেন বেজে ওঠে ফরাসি নৃত্য-সম্ভব মিউজিক। এবার টেকো লোকটি উঠে দাঁড়িয়ে একটি মেয়ের সাথে ফ্লেমিংগো নাচছে। আর বিশদ অবলোকন করা বিবেচনার কাজ মনে হয় না। তাই ফিরে আসি নিজ কক্ষে।
আমাদের কক্ষের অনেকগুলি দরোজার একটি আধ ভেজানো। আমি বেরিয়ে আসি গোলাকার এক চিলতে ছাদে। রেলিং এ হেলান দিয়ে হলেন চেয়ে আছে প্রাঙ্গণের বাগান ও পাইন বনের দিকে। বাগানের আলোগুলো নেভানো। তাই যেন আকাশ থেকে তারকার ঢল নেমেছে। আমরা কিছুক্ষণ তারাভরা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকি। দূরে কোন বৃক্ষ কোটর থেকে পেঁচার হুউপ হুউপ ধ¡নি শোনা যায়। গাড়ি-বারান্দা থেকে হেডলাইট নেভানো কালো এক বিশাল লিমোজিন সজোরে স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে যায়। গাড়িটি মেইন গেটের কাছাকাছি হলে ওখানে রাতজাগা প্রহরী সৈনিকের মতো জ্বলে থাকা ল্যাম্পপোস্টের আলো লিমোজিনটিতে পড়ে। হলেন মন্তব্য করে, পুরানো মডেলের ফরাসি সিঁত্রোন গাড়ি। আমরা পরস্পরের দিকে তাকাই। ভাবি, সকাল হলেই ব্যাগ-বোঁচকা কাঁধে নিয়ে লাট সাহেবের বিচিত্র বাড়িটি ত্যাগ করতে হয়।