সিরিয়ার কবি আলি আহমদ সাঈদ আসবার (যিনি কবি অ্যাডোনিস নামে পরিচিত) উদ্বোধন করলেন এবারের ‘ঢাকা লিট ফেস্ট-২০১৭’-এর সপ্তম আসর। সঙ্গে ছিলেন ঢাকা লিট ফেস্টের তিন পরিচালক কাজী আনিস, সাদাফ সায্, আহসান আকবার ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান।
আধ্যাত্মিক সুরের মূর্ছনায় সকাল থেকেই ঝলমল করছিল বাংলা একাডেমির লন। হৃদয়ে কম্পন তোলা সেই গানের কথা ও সুরের টানে কর্মব্যস্ত সকালেও ছুটে এসেছেন আগ্রহী পাঠক এবং শ্রোতাবৃন্দ। গায়িকাও অতি পরিচিত নেদা শাকিবা। তার সুরের সুরভি দিয়েই গতকাল বৃহস্পতিবার শুরু হলো ঢাকা লিট।
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে এখন বইছে সাহিত্যের জোয়ার। সেই জোয়ারে গা ভাসাতে এসেছেন সিরিয়ার কবি অ্যাডোনিস। তিনি উদ্বোধন করলেন দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় সাহিত্য উৎসব ‘ঢাকা লিট ফেস্ট-২০১৭’। অ্যাডোনিসকে এক পলক দেখতে রীতিমতো ভিড় জমিয়েছে দর্শকবৃন্দ। বাংলা একাডেমির আব্দুল করীম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে তিল ধারণের সুযোগ ছিল না।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে লিট ফেস্টের পরিচালক সাদাফ সায্ বলেন, সপ্তমবারের মতো এ বছর আমরা অন্যবারের চেয়েও বড় পরিসরে আয়োজন করেছি লিট ফেস্ট। বিদেশি অতিথি এসেছেন ৭৫ জন। আমাদের দেশি অতিথি দেড় শ’। তিন দিনে ৯০টির মতো সেশনের আয়োজন রয়েছে।
তিনি জানান, এ বছর আমরা লিট ফেস্টে দক্ষিণ এশিয়ার ইংরেজি ভাষা সাহিত্যের সম্মানজনক ডিএসসি প্রাইজ ঘোষণা করছি। ব্রিটিশ জার্নাল ‘গ্রান্টা’র যাত্রাও এ বছর শুরু হচ্ছে এ আয়োজনে। আর জেমকন সাহিত্য পুরস্কার তো রয়েছেই।
লিট ফেস্টের পরিচালক আহসান আকবার বলেন, এ বছরের লিট ফেস্টের থিম হলো- বাধাকে না বলা। পরিচালক কাজী আনিস বলেন, এ উৎসব কেন করি, অনেকে জানতে চান। এর উত্তর হলো- আমরা সাহিত্য ও শিল্পকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে চাই। বাংলা পৃথিবীর সপ্তম বৃহত্তম ভাষা। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। এই সংস্কৃতি আমাদের এতই ঘিরে রাখে যে আমরা অন্য দেশের সংস্কৃতির দিকে তাকানোর সুযোগ পাই না।
উদ্বোধন শেষে আরবের আধুনিক সাহিত্যধারার অন্যতম পথিকৃৎ কবি সিরিয়ার অ্যাডোনিস বলেন, আরব দেশগুলোতে ধর্ম অন্যতম প্রধান সমস্যা, সেখানে ধর্ম আর রাজনীতিকে অভিন্ন করে রাখা হয়েছে। ফলে একটির দুর্বৃত্তায়নে দু’টিই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। অথচ দেশ ও ধর্ম আলাদা সত্তা হিসেবে টিকে থাকা উচিত। আর রাষ্ট্রের যে সমাজকাঠামো, তার ভিত্তি হওয়া উচিত মানবাধিকার, স্বাধীনতার চেতনা এবং নারীর স্বাধীনতা।
সাহিত্যে প্রাচীন আরব সাহিত্যের সঙ্গে অ্যাডোনিস মিথস্ক্রিয়া ঘটিয়েছেন আধুনিকতার। আর এ কারণেই তিনি আধুনিক আরব কবিতার পথিকৃৎদের একজন হয়ে উঠেছেন। অ্যাডোনিস আরও বলেন, পাশাপাশি কুরআনেরও নতুন পঠন-পাঠন ও ব্যাখ্যা দরকার। সেটা হতে হবে আরো উদার ও সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। কেবল কুরআনেরই নয়, নতুন পঠন-পাঠন দরকার সব প্রাচীন কাব্যসাহিত্যেরই। এ ব্যাপারে আমি ও আমার সমসাময়িক আরব লেখকরা বিশেষভাবে কাজ করেছি। বিশেষ ভূমিকা রেখেছে আমাদের ঘরানার পত্রিকাগুলোও। তিনি জানান, বিশেষ করে সে জন্য তারা জোর দিয়েছেন ভালো পাঠক গড়ে তোলার জন্য। কারণ মাঝারি মানের পাঠক ভালো সাহিত্যকেও মাঝারি মানে নামিয়ে আনে।
আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনের ওই সেশনটি সঞ্চালনা করেন সাহিত্যিক ও অনুবাদক কায়সার হক। ফরাসি ভাষা থেকে অ্যাডোনিসের ভাষ্যের অনুবাদক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক আশরাফুল হক চৌধুরী।
সেশনের শুরুতে দর্শকদের সঙ্গে সিরিয়ার কবি অ্যাডোনিসকে পরিচয় করিয়ে দেন কায়সার হক। সেশনটি শেষ হয় উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব দিয়ে। সে পর্বে তিনি নিজের একটি কবিতাও আবৃত্তি করে উপস্থিত দর্শকদের বিমোহিত করেন।
বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনের সম্মাননা ‘জেমকন সাহিত্য পুরস্কার’ ঘোষণা করা হয়েছে। প্রবীণ কথাসাহিত্যিক মোহাম্মদ রফিক এবং তিন তরুণ লেখক কবি আশরাফ জুয়েল, মামুন অর রশিদ ও নুসরাত নুসিন পেয়েছেন এ বছরের ১২তম জেমকন পুরস্কার। সম্প্রতি ‘ঢাকা লিট ফেস্ট ২০১৭’-এর প্রথম দিনের সন্ধ্যায় এ পুরস্কার ঘোষণা করেন জেমকন গ্রুপের পরিচালক ও সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ।
আগের বছরগুলোর ধারাবাহিকতায় এ বছরেও জেমকন পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে ‘ঢাকা লিট ফেস্টে’। বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় এই আয়োজন।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, প্রবীণ কথাসাহিত্যিক মোহাম্মদ রফিককে তার ‘দুটি গাঁথাকাব্য’ গ্রন্থের জন্য এ বছর পুরস্কৃত হয়েছেন। পুরস্কার হিসেবে তার হাতে তুলে দেয়া হয় ৮ লাখ টাকার চেক, বই, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র; পরিয়ে দেয়া হয় উত্তরীয়। এ বছর ‘তরুণ সাহিত্য পুরস্কার-২০১৭’ ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পেয়েছেন যৌথভাবে আশরাফ জুয়েল ও মামুন অর রশিদ। তাদের প্রত্যেকেই পেয়েছেন ৫০ হাজার টাকার চেক, উত্তরীয়, বই, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র। আর প্রথমবারের মতো জেমকন পুরস্কারে যুক্ত হওয়া ‘তরুণ কবিতা’ ক্যাটাগরিতে পুরস্কৃত হয়েছেন তরুণ কবি নুসরাত নুসিন। ‘দীর্ঘস্বরের অনুপ্রাস’ কাব্যগ্রন্থের পাণ্ডুলিপির জন্য তিনি পেয়েছেন ১ লাখ টাকার চেক, উত্তরীয়, বই, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন পুরস্কার পর্ষদের সদস্যসচিব কবি শামিম রেজা।
তিন দিনের এই মেলায় তির্যক তাদের নিজস্ব প্রযোজনার ‘বিসর্জন’, ‘ইডিপাস’ ও ‘তরঙ্গভঙ্গ’ নাটক তিনটি মঞ্চস্থ করে। এই মেলায় সম্মাননা জানানো হয় নাট্যব্যক্তিত্ব ফেরদৌসী মজুমদার ও নাসির উদ্দিন ইউসুফকে।
কত্থন ও সম্মাননা শেষে জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তনে মঞ্চস্থ হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটক ‘বিসর্জন’।
প্রথম দিনে ‘কবিতা: বাংলার মুখ’, ‘বাংলার নারী দুর্জয় ঘাঁটি’, ‘গল্পকার: সীমানা যখন কেন্দ্রে’ গুরুত্বপূর্ণ সেশন ছিলো এবং দ্বিতীয় দিনে ‘প্রকাশনার একাল সেকাল’, ‘কবিতা: বাংলার মুখ’ ও ‘রূপকথা: পুরনো কথা যখন নতুন করে আসে’ সেশনগুলো বেশ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বিশেষভাবে কথাশিল্পী ফরিদা হোসেনের প্রাঞ্জল উপস্থাপনা সবাইকে মুগ্ধ করে।
শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় নাট্যশালার সেমিনার কক্ষে ‘নাট্যভাবনা আদান প্রদান’ শীর্ষক এক সেমিনারে অংশ নেবেন নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার ও নাসির উদ্দিন ইউসুফ। এদিন সন্ধ্যায় মঞ্চস্থ হয় নাটক সক্রেটিসের গ্রিক ট্র্যাজেডি ‘ইডিপাস’। রোববার বিকাল সাড়ে ৫টায় সমাপনী আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। এদিন নাট্যব্যক্তিত্ব ফেরদৌসী মজুমদারকে সম্মাননা জানায় তীর্যক। একইদিন এ দল পরিবেশন করে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ নাটক ‘তরঙ্গভঙ্গ’। নাটক মঞ্চায়নের পাশাপাশি শিল্পকলা একাডেমির মুক্তমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় সংগীত, আবৃত্তি, নৃত্য, মুকাভিনয় ও চট্টগ্রামের লোকগান। মেলায় অন্যান্য আয়োজনের মধ্যে ছিল নাটকবিষয়ক সেমিনার।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রামের এই দলটি প্রতিষ্ঠার ৪৪ বছরে এ পর্যন্ত ৪৪টি নাটক প্রযোজনা করেছে, এগুলোর প্রদর্শনীর সংখ্যা ২ হাজার ৬১৫টি। তীর্যক নাট্যদলের এসব প্রযোজনার মধ্যে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-মাইকেল মধুসূদন দত্ত, শেকসপিয়র, বার্টোল্ড ব্রেখট, ওলে সোয়েঙ্কা, জে এম সিঞ্জে, জিয়া হায়দার, সেলিম আল দীন, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহদের নাটক। এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যনাটক ‘বিসর্জন’-এর দ্বিশততম প্রদর্শনী অতিক্রম করেছে। এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী, রথযাত্রা, সফোক্লিসের ‘ইডিপাস’, বার্টোল্ড ব্রেখটের ‘সমাধান’, মধুসূদন দত্তের ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটকগুলোর শততম প্রদর্শনী হয়ে গেছে। এই নাটকগুলোর কয়েকটি আবার ভারতের বিভিন্ন নাট্যোৎসবেও মঞ্চস্থ করেছে এসেছে তীর্যক।