কবি আবদুস সাত্তার (১৯২৭-২০০০) আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। তার লেখালেখি মধ্য চল্লিশে ব্যাপকভাবে প্রকাশ পেলেও গ্রন্থ প্রকাশিত হয় পঞ্চাশ দশকে। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বৃষ্টি মুখর’ প্রকাশ পেয়েছিল ১৯৫৯ সনে। আবদুস সাত্তার বাংলা সাহিত্যের সব্যসাচী লেখক। তিনি একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, বহুভাষাবিদ, অনুবাদক, শিশুসাহিত্যিক ও সম্পাদক। তার প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ১১৭টি। এর মধ্যে রয়েছে ১০টি কাব্যগ্রন্থ যথা: ১. বৃষ্টি মুখর (প্রকাশ : ১৯৫৯), ২. আমার ঘর নিজের বাড়ী (প্রকাশ : ১৯৭০), ৩. অন্তরঙ্গ ধ্বনি (১৯৭১), ৪. নামের মৌমাছি (১৯৭২), ৫. The Intimate Voice (১৯৭৮), ৬. আমার বনবাস (১৯৮২), ৭. আমার বাবা-মা’র ক্বাসিদা (১৯৮৫), ৮. পবিত্র নামের কাব্য (১৯৮৬), ৯. বিস্মিত স্বরূপ (১৯৮৫) ও ১০. আবদুস সাত্তার ও অন্যান্য কবিতা (১৯৯০)। অনুবাদ কবিতার মধ্যে রয়েছে : ১. আরবী কবিতা, ২. বালি ও ফেনা, ৩. ফারসী কবিতা, ৪. ইমরাউল কায়েসের কবিতা, ৫. আরবী ফারসী তুর্কি কবিতা প্রভৃতি।
গবেষণা গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: ১. অরণ্য জনপদ (উপজাতীয় গবেষণা), ২. Tribal Culture in Bangladesh ৩. The Manipuries Society for Pakistan Studies, ৪. The Tribesmen of Mymensingh, ৫. The Chakmas, Society for Pakistan Studies, ৬. আদিবাসী সংস্কৃতি ও সাহিত্য, ৭. উপজাতীয় সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য, ৮. গারোদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ৯. ফারসী সাহিত্যের লৌকিক উপাদান, ১০. আরবী সাহিত্যে লৌকিক উপাদান, ১১. অরণ্য সংস্কৃতি প্রভৃতি।
আরবী, ফারসী ও তুর্কি সাহিত্যের ওপর তার গবেষণামূলক এবং ঐ সাহিত্যের গল্প, নাটক সম্পর্কিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কতিপয় গ্রন্থ: ১. আধুনিক আরবী সাহিত্য, ২. আরবী লোকসাহিত্য, ৩. আধুনিক আরবী গল্প, ৪. আধুনিক আরবী নাটক, ৫. আধুনিক আরবী কবিতা, ৬. নির্বাচিত আরবী গল্প, ৭. ফারসী সাহিত্যের কালক্রম, ৮. ছোটদের আরবী গল্প, ৯. মসনবীর গল্প, ১০. শেখ সাদীর গল্প, ১১. ইরানী রূপকথা, ১২. তুর্কি রূপকথা, ১৩. আরবী রূপকথা, ১৪. শ্রেষ্ঠ আরবী গল্প।
তাঁর অন্যান্য রচনার মধ্যে রয়েছে: ১. কবি কায়কোবাদ, ২. মিয়া তানসেন, ৩. কাহিনী কাব্য নয় কাব্য কাহিনী, ৪. জরটঙ্গী, ৫. উপজাতীয় জন্মকাহিনী, ৬. নিজেরেই নিজে খুঁজি, ৭. সাহাবা কবি লবীদ, ৮. সুরভি অন্যতর, ৯. কেউ দেখে কেউ দেখে না, ১০. সে তুমি এবং আমি, ১১. অন্ধ হয়েও অনুনয়, ১২. স¤্রাটের দ্বন্দ্ব, ১৩. সোনার সিংহ, ১৪. ঢাকায় ঢাকা আছি, ১৫. না’ত যুগে যুগে প্রভৃতি।
আবদুস সাত্তার বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি বিচিত্র বিষয় নিয়ে লিখেছেন। কবিতা, শিশুসাহিত্য, ছোটগল্প, বিদেশী সাহিত্য বিশেষত: আরবী, ফারসী, তুর্কি সাহিত্যের গল্প, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, নিরেট গবেষণাধর্মী গ্রন্থ, আত্মকথন, জীবনী গ্রন্থ রচনায় তিনি সর্বদা সৃষ্টিশীল ছিলেন। লেখক হিসেবে তিনি যেমন গবেষক তেমন কবি। তবে তিনি কবি হিসেবেই বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন।
খ.
কাব্য রচনার ক্ষেত্রেও তিনি সুনির্বাচিত, রুচিশীল ও পরীক্ষাপ্রবণ ছিলেন। মাত্র দশটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পেলেও এর মধ্যে বিষয় ও প্রকরণে বৈচিত্র্য ছিল। কবি হিসেবে তিনি মার্জিত ও স্বতঃস্ফূর্ত সনেটিয়ার। প্রায় দুই শত সনেট তিনি রচনা করেছেন। প্রেত্রাকিয়ান ও শেকসপিয়ারিয়ান রীতিতে, কখনো মিশ্র রীতিতে তিনি সনেট রচনা করেছেন।
তাঁর ‘বৃষ্টি মুখর’ কাব্য গ্রন্থে ১৫টি, ‘আমার ঘর নিজের বাড়ী’ কাব্য গ্রন্থে ২৪টি, ‘অন্তরঙ্গ ধ্বনি’ কাব্যে ২৫টি, ‘আমার বনবাস’ কাব্যে ২৪টি, ‘বিস্মিত স্বরূপ’ কাব্যে ২৮টি, ‘আবদুস সাত্তার ও অন্যান্য কবিতা’ কাব্যগ্রন্থে ২৬টি, ‘পবিত্র নামের’ কাব্যে ৪১টি সনেট এবং আমার বাবা-মা’র ক্বাসিদায় ৬টিসহ প্রায় ১৯২টি সনেট প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়াও অগৃহীত আরও অনেক সনেট বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় রয়েছে।
তাঁর একক কোন সনেট গ্রন্থ না রইলেও তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সনেট রচয়িতা। তাঁর চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘নামের মৌমাছি’ ট্রিওলেট কাব্য। বাংলা কবিতায় সম্ভবত এটিই প্রথম একক ‘ট্রিওলেট’ কর্মের কাব্যগ্রন্থ।
‘আমার বাবা-মা’র ক্বাসিদা’ কবি আবদুস সাত্তারের একটি অনন্য সৃষ্টি। এটি একটি মাত্র দীর্ঘ কবিতার কাব্যগ্রন্থ। কবিতাটি সমিল মুক্তক অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রচিত। তবে এ কাব্যের শেষে শিরোনাম ছিল। একই বিষয়ের ৬টি সনেট রয়েছে। ÔThe Intimate Voice’ তার ‘অন্তরঙ্গ ধ্বনি’ কাব্য গ্রন্থের কিছু কবিতার ইংরেজি ভার্সনে অনূদিত। অনুবাদ করেছেন যথাক্রমে মনমোহন বর্মণ, সুরাইয়া খানম, জাকারিয়া সিরাজী, জামাল উদ্দিন আকবর এবং কবির চৌধুরী। ‘পবিত্র নামের কাব্যে’ রসূল প্রশস্তিমূলক কাব্যগ্রন্থ। তবে এ গ্রন্থে ¯্রষ্টা প্রেম, আধ্যাত্মিকতা ও মরমীপদ বিষয়ক বেশ কিছু উচ্চকিত কবিতা রয়েছে।
আবদুস সাত্তার বাংলা সাহিত্যের মূলধারার আধুনিক মরমীবাদী অস্তিবাদী কবি। তাঁর সমসাময়িক কবি আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, ফজল শাহাবুদ্দীন, শহীদ কাদরী-এর মত তিনিও তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে দেদীপ্যমান। তার বিশ্বাস, প্রকৃতি প্রেম, দেশপ্রেম, মানবতাবোধ, অধ্যত্মবোধ তাকে স্বমহিমায়-স্বকীয় উচ্চারণে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করেছে। তিনি প্রকৃতিকে নিবিড়ভাবে ভালোবেসে দেশ-মাটি-মৃত্তিকা-মানুষকে, মানুষের গ্রন্থকে গভীরভাবে হৃদয়ে ধারণ করেছেন।
উদ্ধৃতি:
হে আকাশ তোমার আড়ালে
এমন সুন্দর আলো বলো কে বা জ্বলে।
মেঘের কাজল চোখে বৃষ্টির নূপুর পরে পায়
প্রথম আষাঢ়ে এসে কে নাচে আমার আঙিনায়।
তুমি আজ দ্বার খোলো, হে আমার সুনীল আকাশ;
অদৃশ্য রহস্য যতো সব কিছু হোক না প্রকাশ।
আমার নিভৃতে হোক তার সে আলোর লীলা-খেলা,
আমার হৃদয় নিয়ে কেটে যাক তার সারা বেলা।
(অন্তরাল/বৃষ্টি মুখর)
গভীর অরণ্যে বসে একদা ভেবেছি, যদি পারি
নিজেকে মিশাতে এই মায়াবী অরণ্য নীলিমায়,
বিস্তৃত মাঠের প্রেমে যেমন পাহাড়ী নর-নারী
সময় কাটায় সুখে সৃষ্টির উল্লাসে, কী ছায়ায়
(অন্য এক আনন্দের পাশে/আমার ঘর নিজের বাড়ী)
যে দেশে জন্মেছি আমি, সেখানের আলো হাওয়া মাটি
জরের অমৃত ছোঁয়া আমার দেহের প্রতি ভাঁজে
এক হয়ে মিশে আছে; সে মাটিতে জানি সোনা ফলে
যে হাওয়ায় রাতদিন প্রাণের সুঘ্রাণ খেলা করে,
যে জলে জীবন, সেই ¯েœহ-ভেজা সকল বৈভব
আমাকে দিয়েছে যেন অকৃপণ দানের উল্লাসে।
(আমার দেশ/আমার দেশ নিজের বাড়ী)
জমি ও মানুষে তবে আছে কি তফাৎ?
এই দুই সত্তায় কখনো
ভিন্ন রেখা কোনো
টানেনি বাবর দুই হাত।
আদম মাটির তৈরি, মাটির সে আদমের ঘ্রাণ
মিশিয়ে মাটির দেহে মাটির পিদিম হাওয়া ভালো
তাহলে জ্বলবে মনে চির সত্য আলো।
(আমার বাবা-মা’র ক্বাসিদা)
মহান আল্লাহ তৈরি এই আমি, আমার এগায়
একমাত্র অত্যস্থিত আল্লাহর পবিত্র নামাবলী
মানায় কাব্যের নামে। এবং এ দেহের কাবায়
আল্লাহ-নামের কাব্য ঝুলিয়ে দৃষ্টির অলিগলি
আলোকে ভরিয়ে যদি করা যায় হৃদয় মহান,
সে হৃদয় কাবা ঘরে আল্লার আসন দীপ্তিমান।
(হৃদয়ের কাবাঘর/পবিত্র নামের কাব্য)
কবির কবিতার অসংখ্য পঙ্ক্তির মধ্যে রয়েছে এমন আত্মদর্শন সম্পৃক্তি উচ্চারণ।
প্রখ্যাত কবি ও সাহিত্য সমালোচক আবদুল মান্নান সৈয়দ তার সম্পর্কে বলেন, ‘যে কবি তাঁর যাত্রা শুরু করেছিলেন বহিঃপৃথিবীর রূপদর্শনে, এখন তিনি পৌঁছেছেন আত্মদর্শনে। আবদুস সাত্তারের কবিতা জীবনের বৃত্তের একটি পাক সম্পূর্ণ করেছে’। ¯্রষ্টাদর্শনে কবি এক আধ্যাত্মিক কবি। ¯স্ষ্টাদর্শনের সার্থক পরিণতি শুদীপ্ত দীপদ্র উচ্চারণ তার ‘নামের মৌঁমাছি’ শীর্ষক ‘ট্রিওলেট’ কাব্যে পরিস্ফুট হয়েছে।
উদ্ধৃতি:
যে নাম লিখেছি আমার শরীর জুড়ে,
জাফরানী ঘ্রাণ কেবল বাতাসে ছোটে।
তারকার মালা আকাশ কি রাখে দূরে?
ওনাম লিখেছি দেহের দেয়াল জুড়ে।
হায়রে কপাল! নামের আগুনে পড়ে
মরছি এখন। পেলাম না তাকে মোটে।
সে নাম লিখেছি আমার শরীর জুড়ে
জাফরানী ঘ্রাণ কেবল বাতাসে ছোটে।
রূপ দর্শন, আধ্যাত্মদর্শন, আত্মদর্শন যে অভিজ্ঞায় তিনি অভিষিক্ত হন না কেন তিনি ছিলেন আপাদমস্তক মরমী প্রেমিক কবি। তার প্রমাণ মেলে চিত্রকল্প সমৃদ্ধ বেশ কিছু পঙ্ক্তি চয়নে।
উদ্ধৃতি:
চলে গেলো, হাঁসের মতন বুকে কবিতার বই
চোখের দীঘিতে তার মেহদিনি বনের সবুজ।
(ট্যুরিস্ট/বৃষ্টি মুখর)
একটি ঝিনুক গুনে দেখালো সে মুক্তোর লাবনি
সমুদ্র-সৈকতে ব’সে পৃথিবীর আলোকের পথে।
(জন্মের ইতিকথা/বৃষ্টি মুখর)
ফেনার মুকুটে দোলে কাশ-ফুল হাসির উচ্ছ্বাস,
দর্শক সূর্যের খুশী গুঁড়ো হয় ঝড়ের ভিতরে।
(তাহলে সমুদ্র পারে/বৃষ্টি মুখর)
তখন রোদের কান্নায়
এমন কী পাহাড়ের গা পর্যন্ত ভিজে গেছে।
সূর্যটা অসম্ভব কাঁপছে পাশের ঝরনার;
সেগুন শাখায় হাওয়ার চাপা নিঃশ্বাস
লাল মাটিতে আগুন জ্বলছে।
(নির্লিপ্ত ক্রোধ/আমার ঘর নিজের বাড়ী)
চাঁদের সাম্পান ভাবে আকাশের নীল দরিয়ায়
তারার রূপালী মাছ খেলা করে চারিপাশ ঘিরে,
মেঘের সাগরÑ পাখী কী উল্লাসে সঙ্গ নেয়, তীরে
কীভাবে ভিড়বে গিয়ে ইশারায় সঙ্কেত জানায়।
(রাত্রির স্বপ্ন/ আমার ঘর নিজের বাড়ী)
রূপালী মারমা মেয়ে অনন্ত আলোর রূপ নিয়ে
নেমেছে সুনীল জলে; ভিজে বায়ু মৃদ্ধ পাখনায়
সুগন্ধী ফুলের ঘ্রাণ বুকে নিয়ে নিবিড় মায়ায়
দিগন্তে উধাও হয়ে; সুদূর আকাশে কভু গিয়ে
ছড়ায় সুরভি তার। কখনো বা তারার কুসুম
ঝুর ঝুর ঝুরে পড়ে আবছায়া মাটির সীমায়
নির্জন জলের বুকে ¯িসগ্ধ মৃদু স্বপ্নের কুমকুম
(নিয়ম/আমার বনবাস)
দেখেছি গভীর রাতে তাহাজ্জুদ শেষে
মা যখন বসতেন মোরাকাবা ধ্যানের আবেশে
আতশী তসবী দানা বিড়ালের চোখের মতন
জ্বলতো তখন;
পাপের ইঁদুর সব কোথায় পালাতো-
সে আলোর দীপ্ত রেখা আমাদের হৃদয়ে জ্বালাতো
আলোর মহিমা।
(আমার বাবা-মা’র ক্বাসিদা)
তোমার প্রশংসা লিখি এমন ভাষার কারুকাজ
আমার আয়ত্তে নেই, প্রাণপ্রিয় রাসূল আমার।
(পবিত্র নামের কাব্য)
আবদুস সাত্তার বাংলাভাষার একজন মৌলিক আধুনিক মরমী কবি। তার কাব্যে প্রচুর অলঙ্কার শোভিত চিত্রকল্প রয়েছে। এসব চিত্রকল্প একেবারে নতুন তরতাজা বহুবর্ণে বর্ণিল মনোমুগ্ধকর। তার প্রেম, আত্মপ্রেম, দেশপ্রেম, মানবপ্রেম, নবীপ্রেম, স্ষ্টাপ্রেম-তাকে একজন বড় কবির শেরপায় অভিষিক্ত করেছে। অত্যন্ত সাবলীল-সহজবোধ্য চিত্ত উদ্বেলা সমৃদ্ধ অজস্ পঙ্ক্তিমালা তাকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখবে। আবদুস সাত্তারের কাব্য স্বতঃস্ফূর্ততা কাব্যরম্যতা যে কোন বোদ্ধা পাঠককে তীব্রভাবে আকর্ষণ করবে- তিনি প্রাজ্ঞ, প্রেমিক, মরমী মানুষের অন্তরে চিরকালীন হয়ে যাবেন।