প্রাক্ সাতচল্লিশ ও বিভাগোত্তর বাংলা কথাসাহিত্যের ধারায় আবুল মনসুর আহমদ, সোমেন চন্দ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত- বিগত সাত দশকে যাঁরা গদ্য লিখেছেন-তাঁদের সাহিত্য পর্যালোচনা করলে আমরা বাংলাদেশের বাংলা কথাসাহিত্যের অঙ্কুরিত অবস্থান থেকে বৃক্ষপ্রতিম হয়ে ওঠার বিষয়টি সহজেই উপলব্ধি করতে পারি।
পঞ্চাশের দশকে বাংলাদেশের কথাসাহিত্য যে অর্ধস্ফুট আবছা অবয়ব নিয়ে দেখা দেয় ষাটের দশকে তা সুস্থির মৃত্তিকার ওপর দন্ডায়মান হয়। গ্রামীণ বিষয় ও ঘটনার উপকরণের পাশাপাশি নাগরিক মধ্যবিত্তের বহির্জীবন ও অন্তর্জীবন এই কালের কথাসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখলজনিত কারণে সৃষ্টি হয় এক ভীতিকর বাক্রুদ্ধ পরিবেশ। এই পরিবর্তমান সমাজপ্রেক্ষিত ও রাজনৈতিক বাক্রুদ্ধকর পরিবেশে ষাটের কথাশিল্পীরা পরোক্ষরীতির আশ্রয় নেন এবং নির্মাণ করেন ভিন্নতর প্রতিবাস্তবতা। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের ইতিহাসে ষাটের দশকই সবচেয়ে সফল ও নিরীক্ষামূলক দশক। বিশ্বযুদ্ধোত্তর শিল্পরীতির অঙ্গীকারে ষাটের দশকের কথাসাহিত্যিকেরা আধুনিক। আবু জাফর শামসুদ্দীন, আবদুল হক, আবু ইসহাক, আনোয়ার পাশা, আহমদ রফিক, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, মুর্তজা বশীর, হুমায়ুন কাদির, হাসান হাফিজুর রহমান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, হাসান আজিজুল হক, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, আব্দুস শাকুর, রশীদ হায়দার, আহমদ ছফা, আবদুল মান্নান সৈয়দ, সেলিনা হোসেন প্রমুখ ঔপন্যাসিক ও গল্পকার এ দশকে দ্যুতি ছড়িয়েছেন। ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ বাংলার রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি আত্ম-উন্মোচন করতে সক্ষম হয়। আর একাত্তরের রক্তাক্ত মুক্তির সংগ্রামের মাধ্যমে আমরা পাই স্বাধীন সার্বভৌম একটি দেশ; বাংলাদেশ। তাই শিল্প সাহিত্যেও ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে দেখা দেয়। বাদ যায়নি বাংলা ছোটগল্প ও উপন্যাস।
মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ ও অনন্য শিল্পদ্রষ্টা সেলিনা হোসেন (১৪ জুন, ১৯৪৭)। সেলিনা হোসেনের জন্ম রাজশাহীতে। পৈতৃক নিবাস লক্ষ্মীপুর জেলার হাজিরপাড়া গ্রাম। পিতা এ. কে মোশাররফ হোসেন ও মাতা মরিয়ম-উন-নিসার নয় সন্তানের মধ্যে সেলিনা হোসেন ছিলেন চতুর্থতম। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে করতোয়া ও পদ্মা বিধৌত নদী অববাহিকা রাজশাহী শহরে।
“রাজশাহীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন শেষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততা যেমন ছিল, ততোধিক আগ্রহ ছিল সাহিত্যে। ১৯৬৯ সালে ছোটগল্পবিষয়ে প্রবন্ধ রচনার জন্য সেলিনা হোসেন ড. এনামুল হক স্বর্ণপদক লাভ করেন। জীবনের নানামাত্রিকতায় তিনি অনুধাবন করেছেন সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবেশকে।”১
নিজের জন্ম ও সাহিত্য সাধনা সম্পর্কে সেলিনা হোসেনের সহজ স্বীকারোক্তি স্মরণযোগ্য :
‘১৪ জুন, ২০১৭। একাত্তর বছরে পা দিলাম। জন্মগ্রহণ করেছিলাম সাতচল্লিশ সালে। বড় হয়ে জেনেছি দেশভাগ হয়েছে। পাকিস্তান নামের একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। এই অর্থে আমি দেশভাগ দেখেছি। ভাষা আন্দোলন বুঝিনি। বাহান্নোর সেই সময়ে নিজের ভাষায় কথা বলেছি। কিন্তু মাতৃভাষার মর্যাদা বোঝার বয়স ছিল না। মহান মুক্তিযুদ্ধের একাত্তর আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। একাত্তর আমার জীবনের একটি সংখ্যা বা শব্দ মাত্র নয়। শব্দটি আমার অস্তিত্বের অংশ। এ কারণে একাত্তর বয়সের সূচনার জন্মদিন আমি ভিন্নমাত্রায় দেখছি।’২
সাহিত্যের নানা শাখায় বিচরণ করলেও কথাশিল্পী হিসেবেই তিনি সমধিক খ্যাত। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের নিরন্তর শিল্পসাধনায় তিনি নির্মাণ করেছেন নিজস্ব এক শিল্পভুবন। কথাকার সেলিনা হোসেন বিষয়গৌরবে যেমন বিশিষ্ট্য, তেমনি প্রকরণকলাতেও অনন্য। সেলিনা হোসেন সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট অধ্যাপক ও সমালোচক বিশ্বজিৎ ঘোষের মন্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য :
‘ইতিহাসের গভীরে সন্ধানী আলো ফেলে ঔপন্যাসিক প্রতিবেদন সৃষ্টিতে তাঁর সিদ্ধি কিংবদন্তিতুল্য। বস্তুত ইতিহাসের আধারেই তিনি সন্ধান করেন বর্তমানকে শিল্পিত করার নানামাত্রিক শিল্প-উপকরণ। সমকালীন জীবন ও সংগ্রামকে সাহিত্যের শব্দস্রোতে ধারণ করাই সেলিনা হোসেনের শিল্প-অভিযাত্রার মৌল অন্বিষ্ট। এক্ষেত্রে শ্রেণি অবস্থান এবং শ্রেণিসংগ্রাম চেতনা প্রায়শই শিল্পিতা পায় তাঁর ঔপন্যাসিক বয়ানে, তাঁর শিল্প-আখ্যানে। কেবল শ্রেণিচেতনা নয়, ঐতিহ্যস্মরণও তাঁর কথাসাহিত্যের একটি সাধারণ লক্ষণ। উপন্যাসে তিনি পৌনঃপুনিক ব্যবহার করেছেন ঐতিহাসিক উপাদান, কখনো-বা সাহিত্যিক নির্মাণ।’৩
সাহিত্যিক নির্মাণকে ভেঙে নতুন সাহিত্য সৃষ্টির ধারায় সেলিনা হোসেন রেখেছেন প্রাতিস্বিক প্রতিভার স্বাক্ষর। তাঁর উপন্যাসে রাজনৈতিক সময় বা আন্দোলন অধিকতর পরিপ্রেক্ষিত অর্জন করে। নারীর শাশ্বত দৃষ্টি, সনাতন আদর্শ বজায় থাকে তাঁর লেখায়। তবে রাজনৈতিক অনুপ্রেরণাটি অর্জিত হয় সমকালীন বুর্জোয়া শ্রেণিচরিত্রের স্বার্থান্বেষী রূপটি অতিক্রম করবার প্রচেষ্টায়। এ ক্ষেত্রে তিনি স্বদেশ ও স্বজাতির ঐতিহ্যের প্রতি দৃঢ় ও দায়িত্বশীল। এমন প্রত্যয়ে স্বাধীন ভূখন্ড, স্বায়ত্তশাসিত-বৈষম্যহীন সমাজ ও জাতীয় আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল পর্বগুলো উন্মোচিত হয় কাহিনীগোত্রে। কখনো কখনো জাতীয় চরিত্র প্রতীকায়িত হয় আদর্শের আশ্রয় থেকে। এরূপ প্রস্তাবনায় তাঁর উপন্যাস অনেকক্ষেত্রে সরলকৃত কিংবা পূর্বফলপ্রসূত। ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ কিংবা স্বেচ্ছাচারী স্বৈরশাসকের প্রতিমূর্তির প্রতীকায়ন তিনি যেভাবে ঘটান সেটা অনবদ্য এবং অভিনব। ইতিহাসের নান্দনিক প্রতিবেদন বিনির্মাণে সেলিনা হোসেনের সিদ্ধি শীর্ষবিন্দুস্পর্শী। সেলিনা হোসেন তাঁর ‘নিজস্ব ভাবনায় ইতিহাসকে সমকালের সঙ্গে বিমন্ডিত করেছেন-ইতিহাসের কঙ্কালেই নির্মাণ করেছেন সমকালের জীবনবেদ। ইতিহাস ও শিল্পের রসায়নে সেলিনা হোসেন পারঙ্গম শিল্পী। ইতিহাসের সঙ্গে সমকালীন মানবভাগ্য বিমন্ডিত করতে গিয়ে সেলিনা হোসেন, অদ্ভুত এক নিরাশক্তিতে, উভয়ের যে আনুপাতিক সম্পর্ক নির্মাণ করেন, বাংলা উপন্যাসের ধারায় তা এক স্বতন্ত্র অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছে। তাঁর উপন্যাস পাঠ করলে বিস্মৃত হতে হয় কোনটা ইতিহাস আর কোনটা কল্পনা।’৪
সেলিনা হোসেনের প্রকাশিত উপন্যাসের সংখ্যা চল্লিশটি। এসব উপন্যাসে যে শুধু ইতিহাস আর রাজনীতিই উঠে এসেছে তা কিন্তু নয়-তাঁর লেখনীতে আমরা জীবন ও সমাজ বাস্তবতার চমৎকার মেলবন্ধন লক্ষ করি। ‘জীবন যেখানে যেমন’ সেলিনা হোসেন এই আদর্শে বিশ্বাসী। তাই শিল্পমানের চেয়ে জীবনের রূঢ় বাস্তবতা আর উপন্যাসে গল্পের প্রাণ সঞ্চার করে। ইতিহাসের পরতে পরতে যে রিরংসা, লোভ, ধ্বংসের হাতছানি তিনি তাঁর উপন্যাসে এ বিষয়গুলো উপজীব্য করেছেন।
১৯৫২ সালের পরিধিতে সেলিনা হোসেনের ভাষা আন্দোলন-ভিত্তিক দুইটি উপন্যাস হচ্ছে ‘যাপিত জীবন’ (১৯৮১) ও ‘নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি’ (১৯৮৭)। ‘যাপিত জীবন’ উপন্যাসে সমকালীন রাজনীতি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের বস্তুরূপের উপস্থাপনার সাফল্য নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি করা হলেও এ উপন্যাসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যতিক্রমী প্রাণপ্রবাহের সুর অনুরণিত হয়েছে। এ উপন্যাসের শুরু উনিশ সাতচল্লিশ সালের দেশ বিভাগের পর। আর সমাপ্তি ঘটেছে বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। সেলিনা হোসেন সময়ের ইতিহাসকে চরিত্রের মধ্যে প্রবিষ্ট করেন। সেখানে ‘সময়’ই চরিত্র। সোহরাব হোসেন, মারুফ ও তার স্ত্রী সুমনা, জাফর, আঞ্জুম এসব চরিত্র পারিবারিক জীবনে দৈনন্দিনতার ভেতরে নিজস্ব মূল্যবোধ ও রুচির চর্চা করে। সেখানে রাষ্ট্রের আন্দোলন সংগ্রামের সাথে তাদের সম্পৃক্তিও বাড়ে। চরিত্রগুলো যেন সমস্ত ঘটনার অংশ হয়ে যায়। ‘যাপিত জীবন’ উপন্যাস প্রসঙ্গে প্রথমা রায় মন্ডলের মন্তব্যটি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য :
“নতুন দেশে জীবনযাপন শুরু হয় নতুন অস্তিত্বে। ব্যক্তিগত ভালোবাসা ও স্বদেশপ্রেমে একাকার হয়ে বাঙ্ময় হয়ে ওঠে; সঙ্গে আসে সমকালীন আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক ঘূণাবর্ত। উপন্যাসের সূচনায় যে ভয়-ভীতির চিত্র উদ্ভাসিত তা থেকে বেরিয়ে আসার মধ্য দিয়ে উপন্যাসের পরিসমাপ্তি।”৫
‘নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি’ উপন্যাসে সেলিনা হোসেন মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রস্তুতিকাল এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লবে তাঁদের উত্থানের সাফল্য ঐতিহাসিক চরিত্র (সোমেন চন্দ) বিকাশের মধ্য দিয়ে নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন। “নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি’ উপন্যাসে ঢাকার আন্দোলনের পটভূমিতে ভাষা আন্দোলনে প্রগতিশীল মধ্যবিত্তের যে ভূমিকা এবং ক্রমবর্ধমান গতিবেগ সঞ্চারিত ছিল তা উঠতি মধ্যবিত্তশ্রেণিকে কেন্দ্র করেই সংঘটিত হয়েছে। এ উপন্যাসের প্লট রচিত হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিছু পূর্বকাল থেকে এবং সমাপ্তি ঘটেছে-১৯৫৩ সালে জেলখানায় বসে মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটক লেখা হচ্ছে এ পটভূমিতে।”৬
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া ছাত্রনেতা মুনিম। আসাদ, সালাম, রাহাত, বেণু, নীলা, রেণু এরা উপন্যাসের মূল কাহিনির সাথে কেন্দ্রীয় ভূমিকার সহায়কশক্তি রূপে কাজ করেছে। মাত্র তিন দিনের ঘটনা প্রবাহে আমরা দেখতে পাই একুশের চেতনা কিভাবে তিমির বিনাশী আয়োজনে প্রগতিশীল ছাত্রদের আগামীর পথ নির্মাণে এগিয়ে যায়। তিন দিনের কাহিনিতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শোষক গোষ্ঠীর নিপীড়ন, দমননীতি, পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শোষকগোষ্ঠীর নিপীড়ন ও দমননীতি পাশাপাশি মুক্তিকামী বাঙালির অপ্রতিরোধ্য সাহসিকতা যেমন ফুটে উঠেছে তেমনি বাঙালির চেতনাকামী ঐতিহ্য কিভাবে উত্তরাধিকার খুঁজে পেয়েছে তা বিধৃত হয়েছে। এ উপন্যাসের ভূগোল নির্মিত হয়েছে ঢাকার বুকে। ব্যক্তিগত অনুভব, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের পথ আবিষ্কার করেছে প্রেমময় পথ ধরে, রোমান্টিক মনের আবহে।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ সেলিনা হোসেনের ঔপন্যাসিক প্রতিভাকে প্রাণিত করে নিরন্তর। তাই ঔপন্যাসিক প্রতিবেদন নির্মাণে তিনি বার বার ফিরে যান গৌরবোজ্জ্বল একাত্তরের কাছে। এ প্রসঙ্গে তাঁর ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ (১৯৭৬), ‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’ ত্রয়ী (১৯৯৪-১৯৯৬), ‘কাকতাড়–য়া’ (১৯৯৬) এসব উপন্যাসের কথা স্মরণ করতে পারি। মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসে একাত্তরের সাধারণ মানুষের জাগরণটাকেই ধরতে চেয়েছেন সেলিনা হোসেন। ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ প্রত্যক্ষ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস। হলদী গাঁয়ের মানুষের মুক্তিযুদ্ধে সম্পৃক্তি, সলীমের যুদ্ধে যাওয়া, কলিমের আহত হওয়া, বোবা রইসের প্রতিরোধ তীব্রতায় উঠে আসে উপন্যাসে। এ উপন্যাসের সবচেয়ে বড় শক্তি, প্রধান চরিত্র বুড়ির মাতৃত্ব। সে মাতৃত্বকে অতিক্রম করে বোবা সন্তান রইসের হাতে যুদ্ধে ব্যবহৃত এল.এম.জি তুলে দিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানোর জন্য নিজের বোবা সন্তানকে বিসর্জন দিয়েছে চোখের সামনে। হলদী গাঁয়ে বুড়ির পরিবারের এ ত্যাগ একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য। এ উপন্যাসে বুড়ি কেবল সলীম, কলীম ও রইসের মা নয়, সে হয়ে উঠেছে যুদ্ধে যোগদানকারী সকল বীরের মা। শহীদ জননী।
‘গায়ত্রী সন্ধ্যা’ উপন্যাসের কাহিনীর বিস্তৃতি সাতচল্লিশের দেশভাগ থেকে পঁচাত্তরের স্বাধীন বাংলাদেশে সিভিল শাসকের পতন পর্যন্ত। প্রজন্মান্তরের চরিত্র সৃষ্টি করেন সেলিনা হোসেন। আলী আহমদ থেকে প্রদীপ্ত-প্রতীক; বাংলাদেশ সৃষ্টি প্রতিক্রিয়ায় সমস্ত প্রতিরোধে এগিয়ে চলা। উপন্যাসটিতে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, সীমাবদ্ধতা এবং একই সঙ্গে আছে স্বপ্ন আকাক্সক্ষার অনুসন্ধান। একটি স্বাধীন দেশের জন্মবৃত্তান্তই গায়ত্রী সন্ধ্যার মূল প্রতিপাদ্য। তেইশ বছরের পাকিস্তানি শাসনের নিগড় থেকে মুক্তির প্রক্রিয়া-তার কার্যকারণসূত্র; অতঃপর স্বাধীন বাংলাদেশ, রাজনৈতিক নেতা, নেতৃত্ব ইতিহাসসিদ্ধ হয় উপন্যাসের চরিত্রের অন্তঃপ্রবাহে। স্বাধীন দেশের দুরূহ পুনর্গঠন, দুর্ভিক্ষ, অব্যবস্থাপনার সুযোগে অপশক্তির হাতে দেশনায়কের (বঙ্গবন্ধু) মৃত্যু; সিভিল শাসনের অপমৃত্যুর মধ্য দিয়ে উপন্যাসের যবনিকাপতন ঘটে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে সেলিনা হোসেনের একটি কিশোর উপন্যাস ‘কাকতাড়–য়া’। এ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র বুধা নামের এক গ্রাম্য কিশোর। সে অনাথ। বছর দুই আগে বাবা মা, দুই ভাই, দুই বোন কলেরা রোগে আক্রান্ত হয়ে এক রাতে সবাই মারা গেছে। চোখের সামনে সে দেখেছে প্রিয়জনের মৃত্যুর আহাজারি। সে আশ্রয় নিয়েছিল চাচির বাড়ি। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে সে আশ্রয়টুকুও তাকে ছাড়তে হল। বুধা একান্তই একা। সে একা হলেও গ্রামের সব মানুষই তার আপনজন। কিন্তু একদিন ঐ গ্রামে মিলিটারি ঢুকল। পুড়িয়ে দিল ঘর-বাড়ি দোকানপাট। বুধার চোখে তখন ক্ষোভ আর বিস্ময়। সে ভাবল এর প্রতিকার হওয়া দরকার। কিন্তু সে তো আর মুক্তিযুদ্ধ বোঝে না। তবে মিলিটারিদের অত্যাচার আর নির্যাতনের জবাব দেয়াটা জরুরি বলে বোধ করে। জীবন বাঁচানোর তাগিদে গ্রামের মানুষগুলো পালিয়ে অন্যত্র চলে যেতে থাকে। কিন্তু বুধা মা আর মাটি ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে চায় না। ততোদিনে দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এদেশের দামাল ছেলেরা ট্রেনিং নিয়ে হানাদারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে দেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্য বদ্ধপরিকর। বুধা যে তাদেরই একজন। ছোট বলে সে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে না পারলেও গ্রামের শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আহাদ মুন্সি ও রাজাকার কমান্ডার কুদ্দুসের বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা করে। মিলিটারিরা গ্রামের স্কুল দখল করে নিয়ে সেখানে ক্যাম্প তৈরি করেছিল। এক রাতে মুক্তিযোদ্ধা আলী, মিঠু আর শাহাবুদ্দিন বুধার সাহায্যে হানাদারদের ক্যাম্প উড়িয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বাঙ্কার খোঁড়ার সময় কৌশলে বুধা সেখানে মাইন পুঁতে রেখে চলে আসে নদীর ধারে। পাকিস্তানি সেনারা বাঙ্কারে ঢুকতেই ক্যাম্পটা মাইন বিস্ফোরণে উড়ে যায়। নদীতে নৌকায় বসে শাহাবুদ্দিন, বুধা শুনতে পেল বিস্ফোরণের শব্দ। অভিযান সফল হলো। এভাবেই কাকতাড়–য়া উপন্যাসে এক সাহসী কিশোর মুক্তিযোদ্ধার কাহিনী ফুটে উঠেছে। উপন্যাসটি বুধাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও কুন্তি, নোলক বুয়া, হরিকাকু, ফুলকলি প্রভৃতি চরিত্রের গুরুত্বও কম নয়। তবে এসব চরিত্রের বাইরেও আরও একটি চরিত্রের প্রভাব সুস্পষ্ট- তিনি হলেন বঙ্গবন্ধু। উপন্যাসে যদিও এ চরিত্র একবারও দেখা যায়নি তথাপি ছায়ার মত বুধার স্বাধীনতার আহবানকে উদ্দীপ্ত করেছে।
বাংলাদেশের সাহিত্যের ধারায় সেলিনা হোসেন, প্রকৃত প্রস্তাবেই নির্মাণ করেছেন নিজস্ব একটা শিল্প ভুবন। সাহিত্যিক হিসেবে তিনি সামাজিক দায়বদ্ধতাকে কখনই ভুলে যাননি। ফলে তাঁর সকল রচনার পশ্চাতে আমরা অনুভব করি সামাজিক অঙ্গীকার, থাকে প্রগতিশীল ভাবনা। তাঁর শিল্পীমানসে সবসময় সদর্থক ইতিহাস চেতনা জাগ্রত থাকে বলে মানুষকে তিনি ম্যাক্রো-ভাবনায় আয়ত চোখ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। মাইক্রোভাবনা প্রাধান্য পায়নি বলে তাঁর মানুষেরা কখনো খন্ড-জীবনের আরাধনায় মুখর হয়নি, নষ্ট হয়নি জীবনের উপাসনা। তাই সেলিনা হোসেন সমকালীন বাংলা কথাকলার অন্যতম শিল্পী অভিধায় ভূষিত হয়েছেন। হ
সহায়ক পত্রিকা ও গ্রন্থ
১. কামরুল ইসলাম, ‘বহুমাত্রিক কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন’, বঙ্গীয় সাহিত্য-সংস্কৃতি সংসদ কর্তৃক প্রকাশিত সেলিনা হোসেনের ৭০তম জন্মবার্ষিকী পত্রিকা। প্রকাশকাল ১৪ জুন, ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ।
২. সেলিনা হোসেন, ‘ফিরে দেখা আপন ভুবন’, ঐ।
৩. বিশ্বজিৎ ঘোষ, ‘সেলিনামঙ্গল’, ঐ।
৪. শহীদ ইকবাল, ‘বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাস’ (১৯৪৭-২০০০), ঢাকা: ২০১৪, আহমদ পাবলিশিং হাউস, পৃ. ১৫৫-৫৬ ।
৫. প্রথমা রায় মন্ডল, ‘সেলিনা হোসেন ও বাংলা সাহিত্য’, পৃষ্ঠা ২৮২, সঞ্জীব কুমার বসু সম্পাদিত, সাহিত্য ও সংস্কৃতি, বৈশাখ-আষাঢ় ও শ্রাবণ, আশ্বিন সংখ্যা, কলকাতা: ১৪০৫।
৬. আমিনুর রহমান সুলতান, ‘বাংলাদেশের উপন্যাস নগরজীবন ও নাগরিক চেতনা’, ঢাকা: ২০০৩, বাংলা একাডেমি, পৃ. ১১৯।