‘জোরালো আবেগময় শক্তির প্রকাশ ঘটে তাঁর উপন্যাসে, পৃথিবীর সাথে যোগাযোগের কাল্পনিক অনুভূতির অন্তর্গত হাহাকার ফুটে ওঠে। এই লেখক নিজের আদর্শ ঠিক রেখে আবেগপ্রবণ ভাষায় বিশ্বের সাথে আমাদের সংযোগ ঘটিয়েছেন।’ এ কথাগুলো এ বছর সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী জাপানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক কাজুও ইশিগুরোকে নিয়ে। সুন্দর সুন্দর কথা নিঃসন্দেহে। ৫ অক্টোবর সুইডেন সময় বেলা ১টায় সুইডিশ অ্যাকাডেমির স্থায়ী সচিব সারা দানিউস নোবেল বিজয়ীর নাম ঘোষণা করেন। তিনি সাইটেশনে উল্লেখ করেন এসব কথা। আর এ কারণেই তাকে বরণ করে নেয়া হয়েছে এ পুরস্কারের জন্য। কিন্তু তবুও কথা থেকে যায়, থেকে যায় বিতর্ক সমালোচনা। হ্যাঁ, নানা জল্পনা কল্পনা শেষে এ বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জয় করেছেন ঔপন্যাসিক, চিত্রনাট্যকার ও ছোটগল্পকার কাজুও ইশিগুরো। তার চেয়ে বেশি যে জাপানি ঔপন্যাসিক জল্পনা কল্পনার মধ্যে ছিলেন তিনি হলেন হারুকি মুরাকামি। আরো ছিলেন সিরিয়ার কবি আলী আহমদ সাঈদ ওরফে এডোনিস, কেনিয়ার এনগুগি ওয়া থিয়ং, ইতালির ক্লডিও ম্যাগরিস, কানাডার মার্গারেট অ্যাটউড, যুক্তরাষ্ট্রের ফিলিপ রথ ও ডন ডেলিও, ইসরাইলের অ্যামেস ওজ ও ডেভিড গ্রোসম্যান, আলবেনিয়ার ইসমাইল কাদারে ও চীনের ইয়াং লিংকি। এগুলোসহ আরো কিছু নাম ঘুরে ফিরে প্রতি বছরেই আসছে। মুরাকামি ও এডোনিসের নাম বহু বছর ধরে জল্পনা-কল্পনার কাতারে আছেÑ কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে না। অথচ দু’জনই নাম করা দুই লেখক। তাদের বহু বই নাম করেছে।
সুইডিশ অ্যাকাডেমির ১৮ সদস্যের কমিটি ৩৫০টি নাম থেকে বিজয়ীর নাম গোপন ব্যালটে বাছাই করেন। সাবেক নোবেল বিজয়ী ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৩৫০ জন সাহিত্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এই ৩৫০ জনের নাম প্রস্তাব করেছেন। সুতরাং কমিটিভুক্ত ১৮ জনের জন্য কাজটি যে কঠিন তা বলাই বাহুল্য। আলফ্রেড নোবেল ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন এভাবেÑ নোবেল বিজয়ীকে এমনভাবে যেন বাছাই করা হয়, যিনি সাহিত্যক্ষেত্রে বিশেষভাবে ভূমিকা রেখেছেন আর এই বাছাইপ্রক্রিয়া যেন সঠিক হয়। ১৯০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১১৩ জন সাহিত্য ব্যক্তিত্ব এই পুরস্কার পেয়েছেনÑ তার মধ্যে ১৪ জন মহিলা রয়েছেন। তবে ব্যতিক্রম যে ঘটেনিÑ ‘অযোগ্য’ হাতে যে এই পুরস্কার ওঠেনি, এমন নয়। গত বছরের কথা বাদ দিলেও এমন আরো অনেক পাওয়া যাবে।
এটা সবাই জানে নোবেলে অনেক সময়ই জল্পনা কল্পনা কাজে লাগে না, যেমন গত বছর সবাইকে অবাক করে দিয়ে নোবেল কমিটি ঘোষণা করে দিল মার্কিন সঙ্গীত শিল্পী বব ডিলানের নাম। এ নিয়ে কত বিতর্ক কত শোরগোল। তো এ বছরও অনেকটা সে রকমই হয়েছে। পুরস্কার ঘোষণার পর বিষয়টি ছিল সারপ্রাইজ বা অবাক করা ঘটনার মতো। গার্ডিয়ানসহ বড় বড় পত্রিকাগুলোর রিপোর্ট সে কথাই বলছে। অবাক কম হননি ইশিগুরো নিজেও। তিনি তো প্রথমে এ খবরকে বানোয়াট বা ফেক নিউজ বলেই বসেন। সিমাস হিনি, ডরিস লেসিং, টনি মরিসন ও পাবলো নেরুদার সঙ্গে তার নাম যুক্ত হচ্ছে একথা শুনে তিনি গার্ডিয়ানকে বলেন, তিনি এ রকম কোনো ঘোষণা শোনার জন্য পুরোপুরি অপ্রস্তুত ছিলেন এবং এ খবরের সত্যতার ব্যাপারে সন্দেহ ব্যক্ত করেন। তিনি খাবার টেবিলে বসে তার এজেন্টের মাধ্যমে টেলিফোনে খবরটি শোনেন। তার ভাষায়, ‘আমি মনে করেছিলাম এটা ফেক নিউজ, আমি এরকম কোন কিছুর জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। কিন্তু পরে অন্য সাংবাদিকরা ফোন করার পর এবং আমার বাসার সামনে ভিড় করার পর আমি ধাতস্থ হই।’ তো গত বছরের চেয়ে এবারের বিজয়ী বলা চলে উপযুক্তই বটে। অন্তত তার সাহিত্যিক ব্যাকগ্রাউন্ড রয়েছে।
দুই.
১৯৫৪ সালের ৮ নভেম্বর জাপানের নাগাসাকিতে জন্ম কাজুও ইশিগুরোর। তার পিতার নাম শিঝু ইশিগুরো ও মাতা শিজুকো ইশিগুরো। তার পিতা ছিলেন একজন ফিজিক্যাল ওসেনোগ্রাফার । তিনি ইংল্যান্ডের ইনস্টিটিউট অব ওসেনোগ্রাফি থেকে গবেষণার সুযোগ পেয়ে ব্রিটেনে গমন করেন। কাজুও এবং এই দম্পতির আরো দুই কন্যাসহ তারা ১৯৬০ সালে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। সে সময় কাজুওর বয়স মাত্র পাঁচ বছর। তাই কাজুও কতখানি জাপানি আর কতখানি ব্রিটিশ সে প্রশ্ন আসতেই পারে। কাজুও ৩০ বছর পর জাপানে ফিরেন জাপান ফাউন্ডেশনের এক আমন্ত্রণ পেয়ে। তার দেশ জাপান তার হৃদয়ে ছিল এ কথা তিনি সে সময়ে সাক্ষাৎকারে বলেছেন। ইশিগুরো ১৯৭৮ সালে কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ও দর্শনশাস্ত্রে ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮০ সালে তিনি ইস্ট অ্যাংলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্রিয়েটিভ রাইটিং কোর্সে মাস্টার্স করেন। তিনি ১৯৮৪ সালে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব লাভ করেন। বর্তমানে তিনি ব্রিটিশ স্ত্রী লরনা ম্যাকডোগাল ও এক কন্যা নাওমিকে নিয়ে লন্ডনে বসবাসরত। ব্রিটেন তাকে নানাভাবে আকৃষ্ট করেছে, তার নাগরিকত্ব গ্রহণ ও সেখানে স্বাধীনভাবে বসবাস ও লেখালেখিই তার প্রমাণ।
তিন.
কাজুও ইশিগুরো একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, চিত্রনাট্যকার ও গীতিকার। তার লেখালেখির সূচনা জাপানি সাহিত্য দিয়েই। তাঁর প্রথম দু’টি উপন্যাস জাপানে প্রকাশিত হয়। তবে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জাপানি ভাষা সম্পর্কে তার সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেন। পরে তিনি ইংরেজি ভাষাতেই সাহিত্য রচনায় মনস্থ করেন। এই প্রচেষ্টা তার বৃথা যায়নি। এক সময় সাফল্য এসে ধরা দেয় তার কাছে। ১৯৮২ সালে প্রকাশিত হয় তার উপন্যাস ‘এ পেল ভিউ অফ হিলস’। আর এ জন্য তিনি সে বছর ‘উইনিফ্রেড হল্টবি মেমোরিয়াল প্রাইজ’ লাভ করেন। এ পুরস্কার তার মনোবল বাড়িয়ে দেয়। পরের বছর ‘গ্রানটা’ বেস্ট ইয়ং ব্রিটিশ নভেলিস্ট সংখ্যায় তার লেখা প্রকাশিত হয। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় তার উপন্যাস ‘অ্যান আর্টিস্ট অফ দি ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড’। এই উপন্যাস তাকে এনে দেয় হুইটব্রেড প্রাইজ। অন্যান্য নামকরা নোবেল বিজয়ীর মতো তার প্রকাশনা অতোটা ব্যাপক নয়। তাঁর গ্রন্থ সংখ্যাও কম। চার বার ইশিগুরোর নাম বুকার পুরস্কারের তালিকায় স্থান পায়। তবে সাফল্য আসে ১৯৮৯ সালে। সে বছর তিনি ‘রিমেনিং অফ দি ডে’ উপন্যাসের জন্য বুকার পুরস্কার লাভ করেন। এর পর আরো কিছু লেখালেখির জন্য তিনি আলোচিত ও পুরস্কৃত হন। কিন্তু সেরা সাফল্য আসে এ বছর নোবেল লাভের মধ্য দিয়ে। তার লেখা অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘দি আনকনসোলড’ (১৯৯৫), ‘হোয়েন উই অয়্যার অরফ্যানস’ (২০০০), ‘নেভার লেট মি গো’ (২০০৫), ও ‘দি বেরিড জায়ান্ট’ (২০১৫)। এ ছাড়া রয়েছে কয়েকটি ছোটগল্প সংকলন ও চিত্রনাট্য। তার আটটি বই মোট ৪০টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। কাজুও ইশিগুরোর উপন্যাসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো ‘দ্য রিমেইন্স অব দ্য ডে’ এবং ‘নেভার লেট মি গো’। এ দুটো উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্ছিত্রও তৈরি করা হয়েছে। ২০০৫ সালে টাইম ম্যাগাজিন তার ‘নেভার লেট মি গো’ উপন্যাসকে ইংরেজি ভাষার সেরা ১০০ উপন্যাসের তালিকায় স্থান করে দেয়। ২০০৮ সালে দ্য টাইমস পত্রিকা তাকে ১৯৪৫ সালের পরের শ্রেষ্ঠ ৫০ জন ব্রিটিশ লেখকের তালিকায় ৩২তম বলে সম্মান জানিয়েছিল।
আগেই বলেছি, ইশিগুরোর রয়েছে বহুমুখী প্রতিভা। তিনি চিত্রনাট্য রচনায় ও গানে অনেক সময় দিয়েছেন। তার আরো অনেকগুলো কাহিনী নিয়ে টিভি ফিল্ম, নাটক ও মিউজিক ভিডিও নির্মিত হয়েছে। বলা চলে সঙ্গীত ও চিত্রনাট্য রচনায়ও তিনি যথেষ্ট মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি জাজ সঙ্গীত রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেছেন। এগুলো তাকে বাড়তি প্রশংসা ও অর্থ দুই-ই এনে দিয়েছে।
চার.
কাজুও ইশিগুরোর লেখার ধারা বা বৈশিষ্ট্য আলাদা ধরনের। নোবেল কমিটির সাইটেশনে সে কথার উল্লেখ দেখা যায়। সমালোচকরা লক্ষ্য করেছেন, তার উপন্যাসে ফিরে ফিরে আসে অতীত। তার ভাষা বৈশিষ্ট্যও অন্যের চেয়ে আলাদা। অন্য অনেকের কাছ থেকে এই ভাষাভঙ্গিই তাকে যেমন পৃথক করে তেমনি জনপ্রিয়তাও এনে দেয়। বলা হয়ে থাকে এই সময়ের ইংরেজি ভাষার জগতের অন্যতম নন্দিত লেখক কাজুও ইশিগুরো।
তাঁর দ্য রিমেইনস অব দ্য ডে অথবা নেভার লেট মি গো বলা হয়ে থাকে ‘খুবই পরিমিত প্রকাশভঙ্গির উপন্যাস, যা-ই ঘটুক কাহিনীতে লেখকের ভাষা থাকে নির্বিকার। ইশিগুরোর উপন্যাসের আরো একটা বৈশিষ্ট্য হলো তা কোনো সমাধানে বা উপসংহারে পৌঁছায় না। তার চরিত্রগুলো অতীতে যে সমস্যা-সঙ্ঘাতে পড়ে, তা অমীমাংসিতই থেকে যায়। বিষণ্নতায় শেষ হয় তার কাহিনী। এই একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতা বর্তমান কালের ফিকশনের একটি প্রধান বিষয়। ইশিগুরোর বইয়ের পাঠককে নিজ অধিবিদ্যা দিয়ে বুঝে নিতে হয় অনেক কিছু। আর এ জন্যই তিনি সবার থেকে আলাদা। তিনি নতুন একটি উপন্যাস নিয়ে কাজ করছেন। নোবেল প্রাপ্তি সে লেখায় নতুন মাত্রা যোগ করবে বলাই বাহুল্য।
সবাই জানেন এ বছর এ পুরস্কারের অর্থমূল্য বাড়িয়েছে সুইডিশ কমিটি। ২০১২ সালে পুরস্কারের অর্থমূল্য কমিয়ে দেয়া হলেও এবার তা আবার বাড়ানো হয়েছে। এ বছর সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী পাবেন ৯০ লাখ সুইডিশ ক্রোনোর বা ১১ লাখ মার্কিন ডলার। আগামী ১০ ডিসেম্বর স্টকহোমে কাজুও ইশিগুরোর হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার তুলে দেয়া হবে। হ