[বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় রোহিঙ্গা নিধন। ঐতিহাসিকভাবে বাসবাসরত আরাকানের মানুষ এখন ভয়ঙ্কর মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার। গণহত্যা, গণনির্যাতন, জালাও-পোড়াও, উচ্ছেদ অভিযানে সেখানকার মানুষ বাস্তুহারা, বাংলাদেশে শরণার্থী। তাদেরও জীবন, সমাজ, সভ্যতা-সংস্কৃতি-সাহিত্য উন্নত পর্যায়ে ছিলো তা জানা যায় রোসাঙ্গ রাজসভায় রচিত বাংলা সাহিত্য পাঠে। মুহম্মদ এনামুল হকের ‘আরাকান রাজসভায় বাঙ্গালা সাহিত্য’ (যৌথ, ১৯৩৫), ‘মুসলিম বাংলা সাহিত্য’ (১৯৫) গ্রন্থে এ-বিষয়ে আলোকপাত হরা হয়েছে। রাজশক্তিরূপে ও জনসমাজে আরাকানের জনসাধারণের শক্তিশালী অবস্থান ছিলো তা জানা যায় বই দুটি পড়ে। এ-সময়ের পাঠকের কাছে ‘মুসলিম বাংলা সাহিত্য’ থেকে একটি অংশ পুনর্পাঠের জন্য উপস্থাপন করা হলো। বানান রীতি লেখকের নিজস্ব।- নি.স.]
আধুনিক ‘আরাকানের’ প্রাচীন নাম ‘রোসাং’ বা ‘রোসাঙ্গ’। আরাকানিরা ইহাকে “রখইং তংগী” বা ‘রাক্ষাস-ভূমি’ নামে অভিহিত করে। ইহা সংস্কৃত ‘রক্ষ-তুঙ্গ’ বা ‘রাক্ষসদের উচ্চ-মঞ্চ’ কথার অপভ্রংশ বলিয়া মনে হয়। ‘রক্ষ’ শব্দ বাংলায় ‘রক্খ’-রূপে উচ্চারিত হয়। বাংলা-উচ্চারণে এই ভঙ্গি প্রাকৃতি-ভাবাপন্ন। বাংলা ‘টং’ বা ‘টঙ্গী’ সংস্কৃত ‘তুঙ্গ শব্দের অপভ্রংশ বলিয়া মনে হয়। ‘টং’ শব্দ অনার্য হওয়ার বিচিত্র নহে। আরাকানি ‘ইং’ বা ‘ঈ’ প্রত্যয় যোগ ‘রখইং তইংগী সংস্কৃত ‘রক্ষতুঙ্গ’ হইতে উৎপন্ন বলিয়া মনে করার পক্ষে ভাষাতাত্ত্বিক যুক্তি আছে। এই ‘রখইং’ শব্দের ইংরেজি অপভ্রংশ ‘আরাকান’।
মুঘল-আমলে আরাকান-রাজ্যের সীমা নির্ণয় কঠিন। সময়ে সময়ে হাত বদলাইলেও সমগ্র চট্টগ্রামের অধিকাংশ স্থান, বিশেষ করিয়া কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ-তীরবর্তী ভূভাগ, মুঘল-যুগের শেষদিক পর্যন্ত রোসাঙ্গ-রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সমগ্র চট্টগ্রামে এখনও সে ‘মঘী সন’ প্রচলিত, তাহাই প্রমাণ করিয়া দিতেছে যে, চট্টগ্রামে আরাকানি প্রভাব কত গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। এই চট্টগ্রাম হইতেও আরাকানে বাংলা-ভাষার প্রভাব ছড়াইয়া পড়ে। এখানও আরাকান মুসলমানেরা বাংলা বর্মী এই দুই ভাষায় সমান পারদর্শী।
আমরা ‘আরাকান রাজ-সভায় বাংলা-সাহিত্য’ নামক পুস্তকে দেখাইয়াছি যে, রোসাঙ্গ-রাজ মহতেং চন্দয় (গধযধঃড়রহম ঞংধহফধুধ) (৭৮৮-৮১০ খ্রি:) বা মহৎচন্দ্র যখন রাজত্ব করিতেছিলেন তখন হইতে রোসাঙ্গে আরবি বর্ণিক সম্প্রদায় স্থায়ীভাবে বসবাস করিয়া আসিতেছিলেন। ইঁহাদের দ্বারা রোসাঙ্গে খ্রিষ্টার অষ্টম ও নবম শতাব্দী হইতে ইসলাম প্রচারিত হইতে থাকে। খ্রিষ্টীয় অষ্টম ও নবম শতাব্দী হইতে ইসলাম প্রচারিত হইতে থাকে। খ্রিষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীর গোড়া হইতেই ভাগ্যচক্র রোসাঙ্গ-রাজগণ মসুলিম-প্রভাবকে সানন্দে বরণ করিয়া লইতে বাধ্য হন। ১৪৩০ খ্রিষ্টাব্দে রোসাঙ্গ-দেশ গৌড়ের করদ রাজ্যরূপেও আপন অস্তিত্ব বজায় রাখে। এই সময়ে গৌড়ের মুসলমানগণ মোহীং বা বর্তমান ‘মুরং’ শহরে বসতি স্থাপন করিয়াছিলেন। ইহারা যে বাংলা ভাষাভাষী ছিলেন, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। আরও দেখা যায়, ১৪৩৪ খ্রিস্টাব্দ হইতে ১৬৪৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত, অর্থাৎ দুইশত বৎসর যাবৎ স্বাধীন রোসাঙ্গ-রাজগণ তাঁহাদের মুদ্রায় ‘কলিমা শাহ্’, ‘সিকান্দর শাহ’, ‘সলীম শাহ্’, ‘হুসৈন শাহ্’ প্রভৃতি মুসলিম উপাধি স্বীয় আরাকানি নামের সহিত ব্যবহার করিতেছেন। এই দুইশত বৎসর ধরিয়া বঙ্গের (মুঘল-পাঠান) মুসলিম রাজশক্তির সহিত স্বাধীন আরাকান-রাজগণের মোটেই সদ্ভাব ছিল না, অথচ তাঁহারা দেশে মুসলিম-নীতি ও আচার মানিয়া আসিতেছিলেন।
ইহা কারণ খুঁজিতে গেলে মনে হয়, আরাকানি মঘ-সভ্যতা, রাষ্ট্রনীতি ও আচার-ব্যবহার হইতে বঙ্গের মুসলিম-সভ্যতা, রাষ্ট্রনীতি ও আচার-ব্যবহার অনেকাংশে শ্রেষ্ঠ ও উন্নত ছিল বলিয়া আরাকানি-রাজগণ বঙ্গের মুসলিম-প্রভাব হইতে মুক্ত হইতে পারেন নাই। তাঁহাদের প্রধানমন্ত্রী (মহাপাত্র, মুখ্যপাত্র বা মহামাতা), অমাত্য (পাত্র), সময়-সচিব (লস্কর-উজির) কাজী বা দেওয়ানি ফৌজদারি বিচারক, প্রভৃতি সমস্ত উচ্চপদে মুসলমান অধিষ্ঠিত ছিলেন। রাজা বৌদ্ধধর্মাবলম্বী হইলেও বৌদ্ধ ভিক্ষুদের দ্বারা অভিষেক-ক্রিয়া সম্পন্ন হইত না। বোধ হয় রাষ্ট্রীয় ব্যাপার বলিয়াই, তাঁহদের অভিষেক-ক্রিয়া মুসলিম প্রধান-মন্ত্রীর দ্বারাই সুসম্পন্ন হইত। আরাকান-রাজ শ্রীচন্দ্র সুধর্মের (১৬৫২-১৬৮৪) অভিষেক ‘নবরাজ’ উপাধি প্রধান-মন্ত্রী মুসলিম কর্তৃক কিভাবে সম্পন্ন হয়, তাহার বিবরণ কবি আলাওলের ভাষায় নি¤েœ প্রদত্ত হইল :
সুচারু রোসাঙ্গ স্থান, নানাজাতি শোভযান,
শ্রীচন্দ্র সুধর্ম নরপতি।
অস্ত্রে শস্ত্রে সুপন্ডিত, ব্রতকর্মে সুরচিত,
খলনাশ দুঃখীতের গতি।
হেন ধর্মশীল রাজা অতুল মহত্ত্ব।
মজলিস নবরাজ তান মহামাত্য॥
রোসাঙ্গ দেশেতে আছে যত মুসলমান।
মহাপাত্র মজলিস সবার প্রধান॥
মজলিস পাত্রের মহত্ত্ব শুন এবে।
নরপতি স্বর্গ আরোহণ হৈল যবে॥
যুবরাজ আইসে যবে পাটে বসিবারে।
দন্ডাইল পূর্ব মুখে তক্তের বাহিরে॥
মজলিস পরি দিব্য বস্ত্র আভরণ।
সম্মুখে দন্ডাই করে দৃঢ়াই বচন॥
পুত্রবৎ প্রজারে পালিব নিরন্তর॥
না করিবে ছল-বল লোকের উপর॥
শাস্ত্র-নীতি রাজকার্যে হেবে ন্যায়বন্ত।
নির্ব্বলিরে বলী না করোক বলবন্ত॥
দলাল চরিত্র হেবে সত্য ধর্ম্মবন্ত।
সুনজরে সন্তোষিবে নাবিয়ে দুরন্ত॥
ক্ষমা-বর্ম্ম আচরিবে, চঞ্চল না হেবে।
পূর্ব অপরাধে কারো মন্দ না করিবে॥
আরো নানাবিদ প্রকাশস্ত রাজনীতি।
সত্য করিয়া। যদি দৃঢ়াইল পূপজি॥
প্রথমে মজলিসে তবে সালাম করয়।
শেষে মাতৃকুল আদি সবে প্রণাময়॥
ইহা হইতে দেখা যাইবে, আরাকানের রাজ-সভা সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত মুসলিম প্রভাব ভরপুর ছিল। এই প্রভাব ধর্মীয় হউক বা না হউক, সাংস্কৃতিক প্রভাব তো বটেই। খ্রিষ্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীতে এই প্রভাব চরমে ওঠে।
বলাবাহুল্য, আরাকানে যে মুসলিম-প্রভাব বিস্তৃতি লাভ করে, তাহা প্রধানত বঙ্গীয় মুসলিম-প্রভাব। ইহার ফলে, বঙ্গের বাহিরে স্বাধীন আরাকানে বাংলা-ভাষা ও সাহিত্য প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এই প্রতিষ্ঠার মূলে আরাকানি-ভাষার অপকর্ষ এবং বাংলা-ভাষার উৎকর্ষও কার্যকর হইয়া থাকিবে। অধিকন্তু, আরাকানের বাংলাভাষী সভাসদ্গণের পৃষ্ঠপোষকতায় পরপুষ্ট না হইলে এবং তথাকার বিদ্বজ্জনের উৎসাহ লাভ না করিলে এই প্রতিষ্ঠা সম্ভবপর হইত না।
সপ্তদশ শতাব্দীতে রোসাঙ্গ-রাজের যে-সকল মুসলমান সভাসদ বাংলা-ভাষা ও সাহিত্যের চর্চায় স্বজাতীয় কবিকে নিয়োজিত করিয়া মাতৃভাষার শ্রীবৃদ্ধি সাধন করিয়াছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে শ্রীসুধর্ম রাজার সমর-সচিবের নাম সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য। শ্রীসুধর্মের রাজ্য ঢাকা হইতে পেগু পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ইহার ‘লস্কর-উজির’ অর্থাৎ সমর-সচিব ছিলেন আশরাফ খান। তাঁহারই আদেশে কবি দৌলত কাজী তাঁহার ‘সতী-ময়না’ কাব্য রচনা করেন। আশরাফ খান চট্টগ্রামের অধিবাসী ছিলেন। বর্তমান হাটহাজারী থানার ‘চরিয়া’ গ্রামে তাঁহার বিরাট পাকা বাড়ির ধ্বংসাবশেষ এবং একটি দীঘি আজিও তাঁহার স্মৃতি বহন করিতেছে। রাউজান থানার অন্তর্গত ‘কদলপুর’ গ্রামে ‘লস্কর উজিরের দীঘি’-ও এই আশরাফ খানের অন্যতম কীর্তি।
আরাকান-রাজ শ্রীসুধর্ম রাজার রাজত্বকালে আরও একজন মুসলমান কবির আবির্ভাব ঘটে। তাঁহার নাম ‘মরদন’ এবং তাঁহার কাব্যের নাম ‘নসীরা-নামা’। শ্রীসুধর্ম রাজার পরে, নৃপতিগিরি বা নৃপগিরি আরাকানের রাজা হইলেন। এই সাত বৎসর আরাকানে রাষ্ট্রবিপ্লব ও গৃহ-বিবাদ চলিতে থাকে। ফলে, ঢাকা হইলে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ভূভাগ আরাকান-রাজের হস্তচ্যুত হয়। দেশের এই অরাজকতা ও অশান্তির সময় কোন সাংস্কৃতিক-চর্চা অব্যাহত ছিল বলিয়া মনে হয় না। প্রকৃতপক্ষে, এই সময়ে কোন সাহিত্যিক নিদর্শন আমাদের হস্তগত হয় নাই। কিন্তু, পরবর্তী রোসাঙ্গ-রাজ সাদ উমাদার বা ছদো উমংদার- এর রাজত্বকাল তাঁহার ‘মুখপাত্র’ বা প্রধান-মন্ত্রীর পক্ষপুটে থাকিয়া মহাকবি আলাওল তাঁহার অমর কাব্য ‘পদ্মাবতী’ রচনা করিয়াছিলেন। এই প্রধান-মন্ত্রীর নাম ‘মাগন ঠাকুর’। ‘ঠাকুর’ আরাকানি রাজাদের মহাসম্মনিত উপাধি। মাগন কোরেশ বংশ-উদ্ভূত মুসলমান ছিলেন। তিনিও স্বয়ং একজন কবি ছিলেন। তাঁহার ‘চন্দ্রাবতী’ নামে একখানা কাব্য আবিষ্কত হইয়াছে।
সাদ উমাদারের মৃত্যুর পর, তৎপুত্র চন্দ্র সুধর্ম রোসাঙ্গের রাজা হইলেন। তখনও কোরেশী মাগর প্রধান-মন্ত্রী (মুখপাত্র) এবং মহাকবি আলাওল মাগনের আশ্রয় ও অনুকম্পাপুষ্ট হইয়া কাব্যের পর কাব্য রচনায় বিভোর। মাগনের মৃত্যুর পর সুলেমান নামক আর একজন মুসলমান চন্দ্র সুধর্মের ‘মহাপাত্র’ বা প্রধান-মন্ত্রী হইলেন। এই সময়ে সয়্যিদ মুহম্মদ চন্দ্র সুধর্মের সমর-সচিব ছিলেন। মহাকবি আলাওল ইঁহার আদেশেই ‘সিকান্দর-নামা-র পদ্যানুবাদ করেন। চন্দ্র সুধর্মের আর এক মন্ত্রীর (পাত্রের) নাম সয়্যিদ মূসা। আলাওলা তাঁহার আদেশে ‘সয়ফুলমূলক’ রচনা করিয়াছিলেন।
এইভাবে আরাকানে যে সাহিত্য-চর্চা চলিল, তাহা মহাকবি আলাওলের তিরোধানের সহিত সমাপ্ত হয় নাই। তিনি সাহিত্য-চর্চার যে-পথ প্রদর্শন করেন, তাঁহার মৃত্যুর পর সেই পথ লক্ষ্য করিয়া আরও বহু মুসলমান কবি আরাকানে বাংলা-সাহিত্য-চর্চায় অগ্রসর হইয়া থাকিবেন। অতীতের গর্ভে তাঁহারা নাম আবদুল করীম খোন্দকার। তিনি ১৭০৫ খ্রিস্টাব্দে ‘দুল্লা-মজলিস’ নামে একখানা বিরাট কাব্য রচনা করেন। আরাকানের রাজধানী মুরুং বা স্রোহং নগরীতে বসিয়া রাজার এক অমাত্যের আদেশে কবি আবদুল করীম এই কাব্য লিখিয়াছিলেন।
উপরে আরাকানে বাংলা-সাহিত্য-চর্চার যে-ধারা নির্দেশ করা হইয়অছে, তাহা হইতে এই রাজ্যের সাংস্কৃতিক পরিচয় সম্বন্ধে একটা সাধারণ ধারণা পাওয়া যাইবে। এইবার আমরা এই দেশের বাংলা-সাহিত্য-চর্চার বিশিষ্ট ধারণা প্রদান করিতেছি :
১. দৌলত কাজী
আরাকানের রাজ-সভার উৎসাহে ও পৃষ্ঠপোষকতায় যাঁহার বাংলা সাহিত্যের চর্চা করিয়াছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে দৌলত কাজীই শ্রেষ্ঠ ও প্রাচীনতম। তিনি চট্টগ্রামের রাউজান থানার অন্তর্গত সুলতানপুর গ্রামের কাজী বংশে জন্মগ্রহণ করেন। কিংবদন্তিতে প্রকাশ, কবি অল্প বয়সেই নানা শাস্ত্রে সুপন্ডিত হইয়া উঠিয়াছিলেন; কিন্তু অর্বাচীনতার অজুহাতে দেশের কোন পন্ডিত তাঁহার পান্ডিত্যের স্বীকৃতি না দেয়ায়, কবি বীতশ্রদ্ধ হইয়া স্বদেশ পরিত্যাগ করেন এবং আরাকানের রাজসভায় গুণী ও জ্ঞানীর সমাদর হয় বলিয়া জানিতে পারিয়া স্বীয় বিদ্যাবত্তার স্বীকৃতি লাভের আশায় তথায় গমন করেন। যথা সময়ে আরাকান রাজ-সভা তাঁহাকে বহু-আকাক্সিক্ষত স্বীকৃতি দান করেন এবং রোসাঙ্গ-রাজ শ্রীসুধর্মের সমর-সচিব আশরাফ খানের অনুগ্রহ লাভ করিয়া কবি তাঁহার কাব্য-রচনায় প্রবৃত্ত হন। তাঁহার কাব্যের পূর্ণ নাম ‘সতী-ময়না ও লোর-চন্দ্রানী’; সংক্ষেপতঃ ‘সতী-ময়না’ অথবা ‘লোর-চন্দ্রাণী’।
তাঁহার কাব্যখানি মোট তিন খন্ডে সমাপ্ত। প্রথম খন্ডকে ‘পরিচয় খন্ড’ বলা যায়। ইহাতে কবি কাব্যের নায়ক-নায়িকার পরিচয়-সূত্রে তাঁহাদের বিবাহিত জীবনের ঘটনাবলী এবং দাম্পত্য-জীবনের নিষ্ফলতা ও অতৃপ্তির পূর্ণ আভাস দিয়াছেন।
কাব্যখানির দ্বিতীয় খন্ডকে ‘বিরহ খন্ড নাম দেওয়া যায়। এই খন্ডে কাব্যের প্রধান নায়িকা ময়নাবতীকে বিরহানলে দগ্ধ করাইয়া কবি শোধিত স্বর্ণে পরিণত করিয়াছেন। এই খন্ডেই ময়নাবতীর বিরহ ও তৎপ্রতি ছাউনের সহস্য প্রলোভনের চিত্র অঙ্কিত; এই দুই বিষয়কে উপলক্ষ করিয়া কবির কবিত্ব-সুধা ‘বারমাসী’-র আকারে মন্দাকিনী-ধারার ন্যায় শতস্রোতে উৎসারিত।
তৃতীয় বা শেষ খন্ডের নাম দিতে হয় ‘মিলন খন্ড’। ইহাতে ময়নাবতীর সহিত তাঁহার স্বামী লোর ও সপত্মী চন্দ্রাণীর মিলন ঘটে।
কবি প্রথম খন্ডেই কাব্যের মিলনান্ত পরিসমাপ্তির প্রতি ইঙ্গিত করিয়াছিলেন। কিন্তু, দ্বিতীয় খন্ডের ‘বারমাসী’-র একাদশ মাস (আষাঢ় হইতে বৈশাখ) পর্যন্ত লিখিয়া কবি মৃত্যুমুখে পতিত হন। কাব্যখানি এইভাবে প্রায় কুড়ি বৎসর অসমাপ্ত থাকিয়া যায়। অতঃপর পরবর্তী কবি আলাওল ১৬৫৮ খ্রিষ্টাব্দে দৌলত কাজীর ইঙ্গিত মত মিলনান্ত করিয়া কাব্যখানি সমাপ্ত করেন।
দৌলত কাজী শুধু বাঙালি মুসলমান কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নহেন, প্রাচীন বাংলার শক্তিমান কবিদের মধ্যেও তিনি একজন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। তাঁহার কবিত্ব-শক্তি অসাধারণ, তাঁহার শিল্প ও সৌন্দর্যবোধ তীক্ষè ও হৃদয়গ্রাহী। বাংলা ও ব্রজবুলি- এই উভয়বিধ ভাষায় তাঁহার ক্ষমতা তুলনাবিহীন। তিনিই বাংলা-ভাষায় একমাত্র কবি, যিনি হাতে-কলমে প্রমাণ করিয়া দিয়াছিলেন যে, রাঁধা-কৃষ্ণ-প্রেম অবলম্বন না করিয়াও চমৎকারভাবে বাংলা-ভাষায় ‘ব্রজবুলি’-র ব্যবহার করা যায়, তাহার সামান্য প্রমাণ নিম্নে উদ্ধত হইল:
আয় বাঞি কুজনী কি মোক সুনাওসি
বেদ উকতি হনে পাঠং।
লাভো উপায়ে মিটাতে কো পারয়ে
যো বিহি লিখিল ললাটং॥
মালিনী, বোলসি অনুচিত বাণী।
ধরম না চাওসি ত্যজি সতীত্ব মতি
লোর প্রেম করাওসি হানি॥
মোহোর সুনায়ন মহাগুণ সায়র
মধুর মূরতি বেশং।
সো মধু ত্যজিয়ে কেসে বিখ পানাও
ভাল বাঞি কত উপদেশং॥
তুহি বড় পাপিনী পাপ সুনাওসি
ধরম করাওসি বামং।
পাতক ঘাতক সম বাঞি মোর চিন্তসি
জাতি কুল করসি নির্ণামাং॥
দুরন্ত দুর্মতি দূতীপনা দূর কর
চিন্তহ মোহোর কল্যাণং।
কাজী দৌলত ভণে দাতা মনোভব মনে
শ্রীযুত আশরখ খানং॥
২. মরদন
দৌলত কাজীর সমসাময়িক কবিদের মধ্যে মাত্র একজনের কাব্য পাওয়া যায়, তাহার নাম মরদন। তিনি দৌলত কাজীর মত প্রতিভাবান কবি ছিলেন না। তবে তিনি যে আরাকান-রাজ শ্রীসুধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করিয়াছিলেন, তাঁহা তাহার একমাত্র কাব্য “নসীরা-নামা” পাঠে বুঝিতে পারা যায়। এই কাব্যে কবি মুক্তকণ্ঠে রোসাঙ্গ-রাজ শ্রীসুধর্মের গুণকীর্তন করিয়াছেন। বোধ হয়, কবি রোসাঙ্গের “কাঞ্চি” নামক নগরের অধিবাসী ছিলেন। এই প্রসঙ্গে কবি লিখিয়াছেন,-
সে রাজ্যেতে আছে এক কাঞ্চি নামে পুরী।
মোমিন মুসলমান কত বেশে সে নগরী॥
আলিম মৌলানা বেশে, কিতাব কোরান।
কায়স্থ বসয়ে শেখ সৈয়দ পাঠান॥
ব্রাক্ষণ সজজন তথা বসরে পন্ডিত।
নানা কাব্য রস-কথা কহত্র পুরীত॥
“নসীরা-নামা” একটি কাহিনী-কাব্য। কাহিনীটি মৌলিক। ‘অদৃষ্টলিপি অখন্ডনীয়- এই কথাই কাব্যটির প্রতিপাদ্য বিষয়। আবদুল করীম ও আবদুল নবী নায়ক দুই বণিক-বন্ধু পরস্পর বৈবাহিক বা বেয়াই হইবার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল। আবদুল করীমের কন্যার নাম ‘নসীরা বীবী’ এবং আবদুল নবীর পুত্রের নাম ‘আবদুল সবীর’। ঘটনাক্রমে দুই হুব- বৈবাহিকের মধ্যে আবদুল করীমের ভাগ্য বিপর্যয় ঘটে এবং নসীরার সহিত সবীরের বিহারে প্রস্তাব ভাঙিয়া যায়। ইহাতে আবদুল করমী অপমানিত মনে করে। তাহার স্ত্রী স্বামীকে সান্ত্বনা দিতে গিয়া অদৃষ্টলিপি অখন্ডনীয়’ এই কথাটি গল্পের সাহায্যে অবতারণা করে। এইভাবে কাব্যটি গড়িয়া উঠিলেও পরে আবদুল করীমের ভাগ্য ফিরিয়া বায় ও ‘নসীরা-র সহিত ‘সবীর-এর বিবাহ হয়।
৩. কোরেশী মাগন ঠাকুর
আমরা “আরাকান রাজ-সভায় বাংলা সাহিত্য” নামক পুস্তকে প্রমাণ করিয়াছি যে মহাকবি আলাওলের আশ্রয়দাতা ‘মাগন ঠাকুর’ এবং ‘চন্দ্রবতী’ কাব্য-প্রণেতা ‘মাগন’ বা ‘কোরেশী মাগন’ এক ব্যক্তি।
তিনি আরাকানের অধিবাসী ছিলেন। তিনি কোরেশ বংশ-জাত সিদ্দীক-গোত্রভুক্ত মুসলমান ছিলেন। তাঁহার প্রকৃত নাম কি ছিল, জানা যায় না। ‘মাগন’ তাঁহার ডাকনাম নামমাত্র। তাঁহার নিঃসন্তান মাতাপিতা আল্লার নিকট বহু আরাধনা করিয়া, ‘আল্লার কাছ হইতে মাগিয়া’ তাহাকে লাভ করেন, এই জন্য তিনি ‘মাগন’ নামে অভিহিত হইতেন। স্বয়ং আলাওল মাগন ঠাকুর সম্বন্ধে বলিয়াছেন যে, তাহা ন্যায় নানা গুণবান মনীষী তৎকালে রোসাঙ্গে কেহ ছিলেন না। তিনি আরবি, ফারসি, বর্মী ও সংস্কৃত ভাষা জানিতেন। বাংলা-ভাষায় তাঁহার কতখানি অধিকার ছিল ‘চন্দ্রবতী’ কাব্যই তাহার জ্বলন্ত নিদর্শন। তিনি সঙ্গীত, নাট্য, কাব্য ও অলস্কার শাস্ত্রের সুপন্ডিত ছিলেন। ১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দে আরাকানেই পরিণত বয়সে তাঁহার মৃত্যু হয় এবং তিনি তথায় সমাহিত হন। তখন সুলতান শাহ্ শুজা নিহত হইয়াছেন।
মাগনের ‘চন্দ্রবতী’ একখানি কাহিনী-কাব্য। এই কাহিনীও রূপকথা-শ্রেণীর অন্তর্গত বলিয়া মনে হয়। ভদ্রাবতী নগরের রাজা চন্দ্রসেনের পুত্র ‘বীরভান’ এই কাব্যের নায়ক। সরন্দ্বীপ-রাজ বা সিংহল-দ্বীপ-রাজ সুরপালের কন্যা ‘চন্দ্রাবতী’ এই কাব্যের নায়িকা। চন্দ্রাবতীর রূপের কথা ও বীরভানের শৌর্য-বীর্যের কথা পরস্পর জানিতে পারিয়া নায়ক-নায়িকা পরস্পর পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হন। অতঃপর নায়কের পক্ষ হইতে নায়িকা লাভের অভিযান আরম্ভ হয়। ‘জালিয়া’, ‘গোরাব’, ‘ডিঙা’ প্রভৃতি সহ¯্র নৌকার এক বহর সরন্দ্বীপ অভিমুখে যাত্রা করিল। বীরভানের সহিত প্রধান-মন্ত্রীর পুত্র ও তাঁহার পরম বন্ধু ‘সূত’-ও চলিলেন। সমুদ্র-পথে ঝড়-তুফান হইতে আরম্ভ করিয়া কত দুর্যোগ যে ঘটিল, তাহার ইয়ত্তা নাই। একে একে সমস্ত দুর্যোগ কাটাইয়া বীরভান ও সুত সরন্দ্বীপ পৌঁছিলেন এবং শুনিতে পাইলেন যে, চন্দ্রাবতীর বিবাহের জন্য এক নূতন প্রস্তাব করা হইয়াছে। বীরভান অধৈর্য হইলেন: তখন সূত আশ্বাস দিয়া বলিলেন,-
শুন পারি বুদ্ধি-বলে মর্তের মাঝার।
স্বর্গ হস্তে ইন্দ্র আর অপছরা আনিবার॥
পাতালেতে অনন্ত-নাগের শিরোমণি।
বুদ্ধি-বলে আনিয়া দিতে পারি পুনি॥
যদি বা থাকয়ে মোর কণ্ঠেতে জীবন।
চন্দ্রবতী আনি দিমু তোমা বিদ্যমান॥
সূত তাহার আশ্বাস-বাক্য পূর্ণ করিয়াছিলেন। বহু ঘটনা ঘটিবার পর বীরভানের সহিত চন্দ্রাবতীর বিবাহ হয়।
৪. মহাকবি আলাওল
মহাকবি আলাওল রোসাঙ্গ-রাজ-সভা কবিদের অন্যতম হইলেও, বাংলার মুসলমান কবিদের মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। তাঁহার ন্যায় দীর্ঘজীবী, মহাপন্ডিত ও বহুগ্রন্থ প্রণেতা কবি বাংলার হিন্দুদের মধ্যেও বিরল। ভাব-সম্পদ ও রচনা-পারিপাট্যে বাংলার খুব কম কবিই তাঁহার সহিত তুলিত হইবার যোগ্যতা রাখে। তবে, কাব্যকলায় আলাওল হইতে দৌলত কাজী অবিসংবাদিতরূপে উৎকৃষ্ট।
আলাওল সম্বন্ধে অনেক আলোচনা হইয়াছে। অতএব, এইস্থলে তাঁহার একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা লিপিবদ্ধ হইল।
১৬০৭ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে চট্টগ্রামে জেলার হাটহাজারী থানার ‘জোবরা’ নামক গ্রামে আলাওলের জন্ম হয়। কবি মুকীমের পূর্বোদ্ধৃত চট্টগ্রামী কবির তালিকায় দেখা যায়, আলাওলের পূর্ব পুরুষ “গৌড়িয়া’ ছিলেন, তিনি আরাকানেই জীবন অতিবাহিত করেন। কবির জীবনের শেষ কয়েক বৎসরও জন্মভূমি ‘জোবরা’ গ্রামে অতিবাহিত হয়। এই গ্রামে ‘আলাওলের দীঘি’র পাড়ে আলাওলের মসজিদ ও কবর এখনও তাঁহার স্মৃতি বহন করিতেছে।
কবির জীবন বৈচিত্র্যময়। তিনি ফতেরাবাদের শাসন-কর্তা মজলিস কুতুবের অমাত্য-পুত্র ছিলেন। এই ফতেয়াবাদ ফরিদপুর জেলার ‘সরকার ফতেয়াবাদ’ নহে বলিয়া আমার ধারণা। ‘গঙ্গা’ অর্থে ‘গঙ্গা নদী’ না বুঝিয়া শুধু ‘নদী’ বলিয়া বুঝিলে (বলা বাহুল্য, ‘গঙ্গা’ অর্থ শুধু ‘নদী’-ও হয়) বহু গোলযোগের হাত হইতে রক্ষা পাওয়া যায়। কবির ‘ফতেয়াবাদের’ বর্ণনা পড়িলে তৎপূর্ববর্তী কবি দৌলত উজীর বাহরাম খানের-
নগর ফতেয়াবাদ, দেখিয়ে পুরয়ে সাব,
চাটিগ্রামে সুনাম প্রকাশ।
প্রভৃতির কথা মনে পড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রামের হালদা নদী যেখানে কর্ণফুলী নদীর সহিত মিশিয়াছে, সেই অঞ্চলের কথাও চিন্তা করিতে হয়। এই অঞ্চলের ফতেয়াবাদ অবস্থিত।
একদা আলাওল ও তাঁহার পিতা ফতেয়াবাদ হইতে জলপথে কোন কার্যোপলক্ষে কোথাও চলিয়াছিলেন। পথে ফিরিঙ্গি জলদস্যু ‘হার্মাদ-দের সঙ্গে তাঁহাদের দেখা হয়। এই জলদস্যুদের সহিত যে যুদ্ধ হয়, তাহাতে কবির পিতা শহীদ হন এবং কবি আহত অবস্থায় আরাকানে নীত হন। তথায় তিনি আরাকান-রাজ সাদ উমাদারের রাজ-আসোয়ার বা রাজদেহরক্ষী অশ্বারোহী দলে ভর্তি হইলেন। তাঁহার বিদ্যাবুদ্ধি ও কাব্যকলা-জ্ঞানের খ্যাতি অচিরেই ছড়াইয়া পড়িল। প্রধানমন্ত্রী মাগন ঠাকুর তাঁহার পরিচয় লাভ করিলেন এবং তাঁহাকে আশ্রয় দিলেন। এই মাগনের আশ্রয় লাভ করিয়াই কবি অসি ত্যাগ করিয়া মসীযুদ্ধে আত্মনিয়োগ করিলেন। ১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দে শাহ শুজ যখন আরাকানে নিহত হন, তখন কবিরও ভাগ্য বিপর্যয় হয়। মীরজা-নামক কোন পাপিষ্ঠের অপবাদে তিনি ষড়যন্ত্রের অপরাধে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন এবং পঞ্চদশ দিন “গর্ভবাস-সম কর্মনিয়োজিত” কারাবাস ভোগ করিয়া মুক্তি লাভ করেন। সেই সময়ে তাঁহার পিতৃতুল্য মাগন ঠাকুরও মারা যান। মাগনের মৃত্যুর পর, বেশ কিছুকাল তাঁহার দুর্গত জীবন কাটিতে থাকে। অতঃপর তিনি ধারাবাহিকভাবে রোসাঙ্গ-বাজ-অমাত্য সয়্যিদ মূসা, সমর-সচিব সয়্যিদ মুহম্মদ খান, রাজ-মন্ত্রী নবরাজ মসলিস এবং অন্যতম সচিব শ্রীমন্ত সুলেমান প্রভৃতি বহু সভাসদের অনুগ্রহ লাভ করেন। ইহা হইতে দেখা যাইবে, মাগনের মৃত্যুর কয়েক বৎসর পর হইতে তাঁহার আশ্রয়দাতার অভাব ছিল না। তথাপি তিনি আর জীবনে সুখী হইতে পারেন নাই। ইঁহাদের সাহায্যকে তিনি ভিক্ষা বলিয়া মনে করিতেন। এই সময়ে তিনি “সবে ভিক্ষা জীব রক্ষা দুঃখে দিন যায়” অথবা “অসার্থক ভিক্ষামাত্র যাহার জীবন”- প্রভৃতি নানা খেদোক্তি কাব্যের নানাস্থানে করিয়াছেন।
কবি আলাওল তাঁহার ‘সয়ফুলমূলক’ নামক গ্রন্থে লিখিয়াছেন,- “রচিব পুস্তক বহু নানা আলাঝালা”। তাঁহার এক বহু পুস্তক হইতে এ পর্যন্ত মাত্র সাড়ে পাঁচখানি গ্রন্থ আবিষ্কৃত হইয়াছে। তাঁহার অন্যকান পুস্তক আবিষ্কৃত হইবার সম্ভাবনাও লুপ্ত হইয়াছে। বলিয়া মনে হয়। যেখানে তাঁহার কাব্যগুলির সংক্ষিপ্ত পরিচয় লিবিবদ্ধ হইল :
ক. পদ্মাবতী : কাব্যখানি হিন্দুী-ভাষায় খ্যাতনামা কবি মালিক মুহম্মদ জায়গীর “পদুমাবত” নামক রূপক-কাব্য-অনুসরণে রচিত। ইহা ১৬৫১ খ্রিস্টাব্দে (অর্থাৎ ১০১৩ মঘী সনে) রোসাঙ্গ-রাজ সাদ উমাদারের (১৬৪৫-১৬৫২) রাজত্বের শেষভাগে আলাওল কর্তৃক অনূদিত হয়।
খ. সতী ময়না : আলাওল ‘পদ্মাবতী-র পরেই ‘সতী ময়না’ ও ‘লোর-চন্দ্রণী’-র উত্তরাংশ রচনা করেন দৌলত কাজীর এই অসমান্ত পুস্তকটি সমাপ্ত করিয়া দিবার জন্য রোসাঙ্গ-রাজ শ্রীচন্দ্র সুধর্মের অন্যতম সচিব শ্রীমন্ত সুলেমান কবি আলাওলকে অনুরোধ করিতে গিয়া বলেন :
এই কন্ড পুস্তক পুরাও মোর নামে।
দুগ্ধ ধুম আনিয়া মিলাও এক ঠামে ॥
আলাওল এহেন মহৎ জনের অনুরোধ উপক্ষো করিতে না পারিয়া ১৬৫৮ খ্রিষ্টাব্দে ‘লোর-চন্দ্রাণী-র তৃতীয় ও শেষ খন্ড রচনা করেন।
গ. হপ্ত-পয়কর : এই পুস্তকের পূর্বে সয়ফলমূলকের প্রথমাংশ মাগর ঠাকুরের আদেশে ১৬৫৯ খ্রিষ্টাব্দে রচিত হয়। ইহার পর মাগন পরলোক গমন করেন। এই সময়ে আরাকানের সমর-সচিব সয়্যিদ মুহম্মদের আদেশে ১৬৬০ খ্রিষ্টাব্দে ‘হপ্ত-পয়কর’ রচনা করা হয়। ইহা ঐ নামীয় ফারসি কাব্যের ভাবানুবাদ।
ঘ. তোহফা : ‘হপ্ত-পয়করের’ পরেই আলাওল ফারসি কবি ইউসুফ গঙ্গা-রচিত (রচনা তারিখ ৭৯৫ হিজরি বা ১৩১২ খ্রিস্টাব্দ) ‘তোহফা’ বা ‘উপস্থার’ নামক গ্রন্থের অনুবাদ করেন। ইহা কাহিনী-কাব্য নহে, ধর্মীয় উপদেশপূর্ণ গ্রন্থ। ১৬৬৪ খ্রিস্টাব্দে আলাওল কর্তৃক এই গ্রন্থ অনূদিত হইয়াছিল। ইহার রচনায় দুই বৎসর আবশ্যক হইয়াছিল। ইহা মুসলমানদের ফিক্হ বা হিন্দুদের সংহিতা শ্রেণীর গ্রন্থ। ইহাতে যে সমস্ত ইসলামী ক্রিয়াকলাপের কথা লিখিত হইয়াছে, তাহা আজও পরিবর্তিত হয় নাই। ইহার বহুল-প্রচার বাঞ্ছনীয়।
ঙ. সয়ফুলমূলক : কবি আলাওল ‘তোহ্ ফা’ রচনার বহুদিন পরে ‘সয়ফুলমূলক বদীউজ্জামালে’র শেষাংশ রচনা করিয়াছিলেন। মাগন ঠাকুরের লোকান্তর গমনের নয় বৎসর পরে ১৬৬৯ খ্রিস্টাব্দে আরাকান-রাজ্যের প্রধান অমাত্য সয়্যিদ মূসার আদেশে ‘সয়ফুলমূলক রচনা সমাপ্ত হয়। ইহাও ফারসি উপাখ্যান-কাব্যের ভাবানুবাদ।
চ. সিকান্দর-নামা : আলাওলের আবিষ্কৃত গ্রন্থের মধ্যে ‘সিকান্দর-নামা’-ই কবির শেষ রচনা। এই কাব্য রচনার সময় কবি বৃদ্ধ এবং তাঁহার অবস্থা-
মন্দকৃত ভিক্ষা বৃত্তি জীবন কর্কম।
দারাপুত্র সঙ্গে অঙ্গ হেল পরবশ ॥
মজলিস নবরাজ বা নবরাজ মজলিস নামে কোন আরাকান-রাজ-সচিবের অনুগ্রহ লাভ করিয়া কবি ১৬৭৩ খ্রিস্টাব্দে এই কাব্য রচনা করিয়াছিলে। ইহাও ঐ নামীয় ফারসি কাব্যের ভাবানুবাদ।
এতদ্ব্যতীত আলাওল বহু গান ও পদাবলী রচনা করিয়াছিলেন। তাঁহার এই গান ও পদাবলরি কতকগুলি সম্প্রতি আবিষ্কৃত হইয়াছে।
৫. আবদুল করীম খোন্দকার
রোসাঙ্গের রাজ-সভায় থাকিয়া দৌলত কাজী, মরদন, মাগন ঠাকুর, আলাওল প্রভৃতি খ্যাতনাম কবিগণ যে সাংস্কৃতিক ধারা ও বাংলা সাহিত্য-চর্চার প্রবর্তন করেন, তাহা আলাওলের পরে অচিরে নিশ্চিহ্ন হইয়া গিয়াছিল, -এমন মনে করা ভ্রম মাত্র। রোসাঙ্গে এই সাংস্কৃতিক পরিচর্যা যে আরও বহুদিন অক্ষুন্ন ছিল, তাহার প্রধান প্রমাণ, এই দেশে আবদুল করীম খোন্দকার নামক আরও একজন শক্তিশালী কবির আবির্ভাব। ‘দুল্লা মজলিস’ নামে তাঁহার একখানিগ্রন্থ কিঞ্চিৎ খন্ডিত আকারে আবিষ্কৃত হইয়াছে। ইহার রচনাকাল সম্বন্ধে দেখা যায়-
সহ¯্রকে যাইট শকে কষিতে অব্দ আর।
‘হাজার মসাইল’ আর ‘তমীম আঞ্চার’॥
তার পাছে এই পুস্তক করির রচনা।
পদবন্ধ করি দিলু ভাবি নিরঞ্জন॥
সহস্রকে ষাইট শকে কষিতে অব্দ আর।
মধী সন এ লিখন শুন পুনর্বার॥
১০৬০ মধী সনে ১৬৯৮ খ্রিষ্টাব্দে হয়। এই দুল্লা মজলিস’ কবির একমাত্র গ্রন্থ নহে। ইহার পূর্বে কবি “হাজার মসায়েল” ও “তমিম-আনসারী” নামে আরও দুইখানি গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন।
আবদুল করীম আরাকানের অধিবাসী ছিলেন। ‘দুল্লা মজলিসে’ প্রদত্ত কবির বংশ-বিবরণ হইতে জানিতে পারা যায়, তাঁহার প্রপিতামহ ‘রমজু মিঞা’ রোসাঙ্গ-রাজের ‘বিষয়-পদবি’ লাভ করেন ও ‘ডিঙ্গার দোভাষী’ ছিলেন। মুহসিন আলীর পুত্র আলী আকবরই কবি আবদুল করীম খোন্দকারের পিতা। কবি রোসাঙ্গের রাজধানী ¤্রােহং বা মুরং শহরে বসিয়া রোসাঙ্গ-রাজ প্রদত্ত ‘সাদিউক-নানা’ উপাধিকারী রাজ-কোষাধ্যক্ষ আতিবর নামক এক ব্যক্তির আদেশে ‘দুল্লা মজলিস’ রচনা করিয়াছিলেন। বলা বাহুল্য, স্রোহং ১৪৩০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিনশত বৎসর ধরিয়া আরাকানের স্বাধীন রাজাদের রাজধানী ছিল।
‘দুল্লা মজলিস’ একটি ফারসি গ্রন্থের ভাবানুবাদ। ইহাতে হযরত আদম (আ), ইবরাহীম, লুৎ, শুয়াইব, মূসা, সুলেমান, ঈসা, মুহাম্মদ মুস্তফা (সা) প্রভৃতি নবীর কাহিনীর সহিত ফাতিমা, আলী, ইউসুফ সুফী, খালিদ, বিলাল, হাসান বসরী, হাসন কুরেশী, নেশাপুর রাজা, সুলতান আবু সয়ীদ প্রভৃতি মহাত্মদিগের কথা এবং তদুপরি রোজা, নামাজ ও বিহিশতের বিবরণ প্রভৃতি দেওয়া হইয়াছে।
তাঁহার ‘হাসার মসাইল’-ও বিরাট গ্রন্থ। ইহাকে ফিক্হ শাস্ত্রের সার সঙ্কলন বলিয়া উল্লেখ করা যায়। এই নামের ফারসি গ্রন্থ আছে বলিয়া শুনিয়াছি। সম্ভবত পুস্তকটি তারাই ভাবানুবাদ। কবিও বলিয়াছেন পুস্তকটি ‘কিতাবেতু’ বা কিতাব হইতে দেখিয়া লেখা।
‘নূর-নামা’ নামেও আর একখানি গ্রন্থ তিনি রচনা করিয়াছিলেন। ‘নূর’ হইতে কিভাবে হযরত মুহাম্মদ (সা) স্পষ্ট হইলেন, ইহাতে সেকথা বর্ণিত হইয়াছে। হ