তিন
ঝুপ ঝুপ বৃষ্টি মাথায় বেরয় ওরা।
সকালে যেন সন্ধ্যে ঘনিয়েছে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে পুব হয়ে দক্ষিণে ঘোরে ওরা। কোণা পাড়ার মধ্যে দিয়ে গিয়ে দক্ষিণের মাঠে নামবে। সেই মাঠ পেরিয়ে নদী।
বাড়ি ছেড়ে একটা বিশাল পুকুরের পাশ দিয়ে রাস্তা। পুকুরটা থইথই করছে পাড়-ছোঁয়া পানিতে। কতকগুলো হাঁস ভাসছে পুকুরের কিনার ঘেঁষে।
রাস্তায় পা-ডোবা কাদা থিকথিক করে। কোথাও কোথাও খাদ-খন্দক, বৃষ্টির পানি জমে আছে তাতে। আকাশ গুম মেরে আছে। বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষ্মণই নেই। মমিন আর খেজমত ছাতা নিয়েছে। তাদের নিজেদেরই ছাতা। খলিলও একটা ছাতা নিয়েছে। কেবল কাজের ছেলেটার মাথায় একটা বড় মাথাল, আর গায়ে প্লাস্টিকের ব্যাগ জড়ানো।
এমন দিনে কেউ ঘরের বাহির হয়?
-দ্যাখেন না, আমার শরীল খারাপ, আর আমাক্ই এই দুর্যোগের ভিতর আইস্তে হইলো।
-তোর তো কেউ পা ধরেনি, তুই লিজের ইচ্ছাতেই আস্লি। অ্যাখুন কুচুরকুচুর করছিছ্ ক্যান? কথাটা বলে হাতের ব্যাগটা ঘাড়ে চাপায় ইলিয়াস। ওই ব্যাগের মধ্যে রয়েছে কয়েকটা চটের খুতি। ছেলেটা মণ্ডলবাড়ির কাজের লোক। বয়স হয়তো বিশ পেরিয়েছে। বেশ সুঠামদেহী, গায়ে জোর আছে বোঝা যায়। কালো কুচকুচে রং শরীরের, কিন্তু একটা কমনীয় সৌন্দর্য আছে তার চোখে-মুখে। মুখটা ছোট, চৌকো ধরনের। খালি গা, ঘাড়ের ওপর একটা আধময়লা গামছা ঝুলছে।
-দেখছেন মাস্টার ভাই, মুখে ষুলো আনা। ওদিক হিসাবে অ্যাক্খিবারে রসোগুল্লা। অক্ জিজ্ঞাস করেন আট দশ আর তেরোতে কত হয়? পার্ইবে না।
মৃদু হাসে মমিন। কিছু বলে না। তার পরিবর্তে মুখ খোলে খেজমত। -ক্যানে গো ভাইডি, অ্যাত্তো বড়ডা জুয়ান মানুষ, আর হিসাব জানো না! সে ক্যামুনধারা কথা।
-জাইন্বো না ক্যান্! খলিলের খালি ওই! মুখ বাঁকায় ইলিয়াস। বাইরের অতিথির সামনে এরকম অপমান তার একটু গায়ে লেগেছে। -বকর-বকর করছিছ্ ক্যান? তুই যা না, আমি একাই মাছ আইন্তে পার্ইবো।
-আমি কি বুলছি পারবিনি? চোখে-মুখে দুষ্টুমি ছড়িয়ে হাসে খলিল, আড়চোখে খেজমতের দিকে তাকায়, তার দৃষ্টিতে ইশারা। -পারবিই তো। এইডি কী আর কঠিন কাম। খালি বাঘাড় বুইলি আইড় লিয়ে চইলি আসপি এই যা।
থমকে দাঁড়ায় ইলিয়াস। -দ্যাখ্, ভায়েরে সামনে আজে-বাজে কথা বুল্বিনি, আমি কিন্তুক্ চইলি যাবো।
-তা গ্যালে ভালুই হবে… আজিম মুণ্ডলের চড়-থাপ্পড় অনেকদিন খাওয়া হয়নি তুমার।
-তে জ্বালাছিছ্ ক্যান? বেশি জ্বালালে আমি কিন্তুক্ দাদাক্ বুইলি দিবো।
-অ্যার ভিতরে আবার দাদা ক্যানে? খলিলের দিকে তাকায় খেজমত। -এই দাদাডা কে গো ভাইডি?
-বড় বাপ। বড় বাপেক্ উই দাদা বুলে।
-ক্যানে গো ভাই, মুণ্ডলজী খুব রাগী মানুষ নাকি? খেজমত প্রশ্ন করে।
-না, না, অর কথাত্ আপ্নেরা কিছু মুনে কইরেন না। বড় বাপ খুব ভাল মানুষ।
-হ্যাঁ, ভাল মানুষ। খালি চড়-থাপ্পড় মারে এই যা। তাই নারে ইলিয়াস?
-দোষ কর্ইলে মার্ইবে না, বুলেন ভাইসব? মারে, কিন্তুক্ ভালওবাসে। অক্ কি যা-তা ভালবাসে? বুলুক উই। বলতে বলতে চোখ দুটোকে পাকিয়ে তোলে ইলিয়াস।
খেজমত বলে, ভাল তো বাসবেই, লিজের ভাতিজা ব্যুলে কথা। তাই না?
-না, না, অর ব্যারাম তো, তাই অক্ ইট্টুক্ বেশিই ভালবাসে।
খলিল থমকে দাঁড়ায়। ঘুরে দাঁড়ায় ওর দিকে মুখ করে। তার হাত-পা শক্ত হয়ে যায়। মুখটা তার একটু কালো আর ভারী হয়ে ওঠে। সেটা কেউ খেয়াল করে না। ইলিয়াসও না। সে বরং বলে চলে- খুব খারাপ ব্যারাম, ভাল হয় না।
-কিসের ব্যারাম রে? কিসের ব্যারাম? আঁ? মানুষের ব্যারাম হয় না? কুন্ মানুষের ব্যারাম নাই? বুলেন মাস্টার ভাই, আপনেরে ব্যারাম নাই? কম আর বেশি, দুনিয়ার সগলারই ব্যারাম আছে। খলিল হাত-পা ছুঁড়তে থাকে। তার হাতের ছাতা এলোমেলো হয়ে যায়। ভড়কে যায় ইলিয়াস। -তুই ও রকুম করছিছ্ ক্যান? আমি কি ও রকুম মুনে কইরি বুইলিছি? সে এগিয়ে যায় ওর দিকে।
মাথার ওপর থেকে ছাতা নামিয়ে ফেলে খলিল। কাঁপছে সে। হাতের ছাতাটাও কাঁপে থরথর করে, পানি ছিটিয়ে। -ক্যান্ বুললি তুই অই কথা? আমার ব্যারাম? তাই বড় বাপ আমাক্ ভালবাসে? তা না হইলে ভালবাইস্তো না?
তার কাছে এগিয়ে যায় ইলিয়াস। তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় খলিল। ছাতাটা পড়ে যায় তার হাত থেকে।
ইলিয়াস আবার তার কাছে যায়। তাকে জড়িয়ে ধরে। -চাচা আমার, সুনা আমার। তুই রাগ করিস্নি বাপ, আমি অই রকুম মুনে কইরি বুলিনি।
বেশি রেগে গেলে খলিল তার ধকল সহ্য করতে পারে না, অজ্ঞান হয়ে যায়, দাঁতকপাটি লাগে। এই কাদা-পানির ভেতর সে রকম হলে খুব মুশকিল হবে। সে খেজমত আর মমিনের দিকে তাকায়। -অক্ ধরেন ভাই, অক্ থামান। অর শরীল খারাপ।
এদের দুজনের কথা এতক্ষণ ভালই উপভোগ করছিল মমিন আর খেজমত। কিন্তু এবার ওরাও বিব্রত হয়। ঘটনা এত দ্রুত এরকম জটিল হয়ে উঠবে তা কল্পনাও করেনি ওরা। দুজনেই এগিয়ে যায়। খেজমত এক হাতে খলিলের মাথার ওপর ছাতা ধরে, অন্য হাতে তাকে জড়িয়ে নেয়। মমিন অন্য পাশে গিয়ে তার ঘাড়ে হাত রাখে।
-ওর কথা ধোরো না তো। ওর বুদ্ধি কম।
-তুমি ক্যানে ওই কথা ব্যুললে, আঁ? মাফ চাও। ইলিয়াসকে ধমকায় খেজমত।
-আমি তো বুল্ছিই আমার ভুল হয় গেছে। আমি মাফ চাছি।
-হ্যাঁ, ভাল কইরে মাফ চাও। তুমি অখে মাফ কইরে দ্যাও ভাইডি, ও ব্যুঝতে পারেনি। লেখাপড়া জানে না তো। কখুন কী ব্যুইলতে হয় জানে না। তুমি অখে মাফ কইরে দ্যাও।
ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়ে খলিল। কিন্তু সে-ও বুঝতে পারে বিদেশী অতিথিদের সামনে এতটা প্রতিক্রিয়া দেখানো ঠিক হয়নি। সে শান্ত হওয়ার চেষ্টা করে। দুই হাতে মুখ মোছে। মমিন এগিয়ে এসে ওর হাত দুটো তুলে নেয় নিজের হাতের মধ্যে। -খলিল যা করেছে তা ঠিকই করেছে। আমার সঙ্গে এরকম হলে আমিও তাই করতাম। তবে কথা হচ্ছে কী, ও তো তোমাদেরই বাড়ির লোক, তোমাদের কত বিশ্বাসী, তোমাদের কত ভালবাসে… সে একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে এই যা। ও তো এসব বোঝে না, বুঝলে কি বলতো, বলো?
-না, না বুইল্তোক্ না। ও ছেইলে খারাপ লয় গো ভাইডি। তুমাদেরই লোক, অকে তুমি মাফ কইরে দ্যাও। সায় দেয় খেজমত।
-ঠিক আছে।
ছাতাটা তুলে খলিলের মাথার ওপর ধরে ইলিয়াস। ক্ষিপ্র হাতে তার কাছ থেকে ছাতাটা কেড়ে নেয় খলিল। তার চোখ ছলছল করছে। অতিথি দুজন দুদিক থেকে তাকে ধরে রেখেছে।
-আর কুনুদিন বুল্বিনি এ রকুম কথা। বুইলি রাখ্নু। কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে তার চোখ বেয়ে।
-কাইন্দো না ভাইডি, আমারে খুব খারাপ লাইগ্ছে। তুমি কত ভাল ছেইলে।
খেজমতের সহানুভূতিময় কথায় তার কান্নার বেগ আরো বেড়ে উঠতে চায়। কিন্তু লজ্জাও পায়। দ্রুত কান্না চেপে হাসতে চেষ্টা করে সে।
এসব ঘটনায় খুব একটা ভূমিকা রাখতে পারে না মমিন। সেটা সে পারে না। খলিলের মতো কোনো কঠিন অসুখ হয়নি তার। কিন্তু তারও দুঃখ আছে বুক-ভরা। সেকথা কাউকে কখনো বলতে পারে না সে। খেজমতই যা একটু উপলব্ধি করতে পারে। তার পিতাকে সে কখনো দেখেইনি। তার জন্মের মাস তিনেক আগে তার মৃত্যু হয়েছে। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মা ইন্তেকাল করেছে। শৈশব কেটেছে ভাই-ভাবিদের ফাই-ফরমায়েস খেটে। কৈশোর থেকে এখন অব্দি জীবন কেটেছে বাড়িছাড়া হয়ে, ভিন্ন জায়গায়, ভিন্ন লোকের বাড়িতে। সেটাকে জায়গীর বলে, কিন্তু কখনো কখনো সেটা বাড়ির মাস্টার নয়, চাকরের সমতূল্য হয়ে যায়। তবে মমিনের জায়গীর-ভাগ্য ভালই বলতে হবে। যেখানে যখন থেকেছে বাড়ির মানুষের মতোই থেকেছে। তবু সেটা তো কখনো নিজের বাড়ি, নিজের বাপ-মা, নিজের ভাই-বোন, নিজের আত্মীয়-স্বজন, নিজের পাড়া-প্রতিবেশীর বিকল্প হতে পারেনি। তাই সে এই বিশাল পৃথিবীতে নিজেকে সব সময় একা, স্বজনহীন মানুষ হিসেবেই মনে করেছে। এই স্বল্প-পরিসরের জীবনের অভিজ্ঞতা তাকে কিছুটা আবেগহীন, এবং স্থিত মানুষ করে তুলেছে। অল্পতে রেগে যাওয়া, কিংবা আবেগাপ্লুত হওয়া, শোকে মুষড়ে পড়া, কিংবা আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে পড়া তার ধাতে নেই। সেজন্যে খলিল আর ইলিযাসের ব্যাপারটায় সে খুব একটা মনোযোগ দেয়নি। সে বরং চারদিকে চোখ ফেলে ফেলে বর্ষাস্রোত প্রকৃতিকেই পর্যবেক্ষণ করছিল। এই প্রকৃতি হয়তো নতুনতর কিছু নয়। মুর্শিদাবাদ, হুগলি কিংবা রাজশাহীর প্রকৃতি এমন কিছু আলাদা নয়। তবু নতুন জায়গা বলে কথা। প্রত্যেক নতুন জায়গার মধ্যেই আলাদা একটা আকর্ষণ থাকে। একটা ভীষণ রকম মায়া জড়ানো থাকে। আগন্তুকের মন তাতে মুগ্ধ হয়, আকর্ষিত হয়, প্রলুব্ধ হয়। মমিনের মনের অবস্থাও এখন অনেকটা সেই রকম। ইলিয়াস আর খলিলের কথোপকথন সে শুনছিল বটে, কিন্তু তাতে মন ছিল না তার। এখন ব্যাপারটা মিটে যেতে আবার প্রকৃতির প্রতি মন দেয় সে।
শ্যামপুর বেশ বড় গ্রাম। মোট সাতটা পাড়া। আসলে একেকটা পাড়াই একেকটা গ্রামের সমান। মণ্ডলদের পাড়া গ্রামের একেবারে মাঝখানে, তাই এর নাম মধ্যপাড়া। কাগজে-কলমে ও নাম থাকলেও লোকের মুখে তার নাম পাহাড়ী পাড়া। এখানে কোনো পাহাড় তো দূর অস্ত্ কোনো টিলা বা ঢিবিও নেই। কোনো কালে ছিল কিনা তা-ও কেউ বলতে পারে না। তবে উঁচু, হ্যাঁ, গ্রামের অন্যান্য এলাকা থেকে বেশ খানিকটা উঁচু। সেই জন্যেই বোধ হয় নামটা ও রকম হয়েছে। এই পাড়ার আবার দুটো অংশ, মণ্ডলদের অংশের নাম বড় বাড়ি। বড় বাড়িই বটে। একটার পর একটা বাড়ি, সীমানাবিহীন, কার ভিটে কোনটুকু তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। বাড়ির মধ্যে বা আশপাশে তেমন গাছপালাও নেই।
বড় বাড়ির পর দক্ষিণে কোণা পাড়া, মধ্যপাড়ার আরেক অংশ। সেই পাড়ার মধ্যে দিয়ে নদীতে যাওয়ার সহজ ও সোজা পথ। কোণা পাড়া পেরিয়ে আকাট জঙ্গল। তার মধ্যে দিয়ে পায়ে চলা পথ। তারপর একটা আঁকাবাঁকা মাটির সড়ক, খাদ-খন্দকে ভরা। রাস্তাটা পশ্চিমে মোল্লাপাড়ার ভেতর দিয়ে দক্ষিণে ঘুরে পদ্মানদীর তীর পর্যন্ত গিয়েছে। কিন্তু সেটা ঘোরা পথ। সে পথে না গিয়ে সোজাসুজি দক্ষিণের মাঠ ভেঙ্গে আলপথে হাঁটা ধরে ওরা। মাঠের পরে একটা খাল। তাতে ঘোলা পানির ¯্রােত বইছে নদীর মতো। তার ওপর দিয়ে বাঁশের আড় পেতে চলাচলের ব্যবস্থা। খালের অপর পাড় আসলে একটা সড়ক। তার নাম পাবনা রোড। কালো পাথরের বাঁধানো রাস্তা, কিন্তু মেরামতের অভাবে এবড়ো-খেবড়ো। এই সড়ক রাজশাহী শহর থেকে ঈশ্বরদী হয়ে পাবনা পর্যন্ত গিয়েছে। এক সময় এটাই ছিল মহাসড়ক। ইদানীং এর কদর কমেছে। কারণ আরেকটা বড় সড়ক হয়েছে। সেটা এই গ্রাম থেকে মাইলটাক্ উত্তর দিয়ে নাটোর ও পাবনা হয়ে নগরবাড়ি ঘাট পর্যন্ত গিয়েছে।
পাবনা রোড পেরিয়ে আবার একটা মাঠ, তারপরে নদী।
এই হচ্ছে পদ্মা নদী, মানে গঙ্গা।
-কী রে ভাইডি! এইড্যা লদী না সমুদ্দুর?
কী বিশাল! কী বিশাল! অবাক হয়ে দেখে তারা। ট্রেনে আসার সময় এই নদীর ওপর দিয়েই এসেছে। কিন্তু সেটা ছিল সন্ধ্যের পর, সেজন্যে তখন নদী দেখা হয়নি। ভারতে গঙ্গা দেখেছে ওরা, ভাগীরথী নামে বহরমপুর শহরের পাশ দিয়ে গেছে। হুগলিতেও দেখেছে, তখন ওর নাম হুগলি নদী। সেসব এই পদ্মার কাছে নস্যি। কী ভয়ানক উথাল-পাথাল স্রোত এই নদীতে। তীরে এসে আছড়ে পড়ছে ঢেউয়ের পরে ঢেউ। এখানে-ওখানে পানির ঘূর্ণি। কত কী যে ভেসে চলেছে- গাছের ডালপালা, খড়কুটা, আস্ত কলাগাছ। তীর জুড়ে হরেক রকমের জাল ফেলে মাছ ধরছে লোকেরা। কয়েকটা ডিঙি নৌকা তীর ঘেঁষে জাল ফেলেছে। একটা বড় মহাজনী নৌকা ভেসে চলেছে পুবমুখো। ঢেউয়ের আনুকূল্য পেয়ে একেবারে তরতর করে ছুটে চলেছে মালবোঝাই অতো বড় নৌকা।
নদীর অপর পাড়ে দৃষ্টি ছড়ায় মমিন। কিছু দেখা যায় না। ফিরফিরে বৃষ্টির কারণে দৃষ্টি যায় না বেশি দূর। কুয়াশার মতো ধোঁয়া ধোঁয়া দেখায় দিগন্ত। সেখানে পানি না মাটি না খালি শূন্যতা, কিছুই বোঝা যায় না। সত্যি, সমুদ্র বললে অত্যুক্তি হয় না।
এই নদী লিজ নিয়েছেন আজিম মণ্ডল। পুবে টাঙন থেকে পশ্চিমে ডাঁশমারি পর্যন্ত, লম্বায় মাইল তিনেক এলাকা। জেলেরা মাছ ধরে স্বাধীন মতো, কেবল কমিশন দিতে হয়। নগদ টাকাতেই কমিশন নেন তিনি। তবে বাড়ির প্রয়োজনে মাছ নেন প্রায়ই, সেটার হিসাব থাকে, মওসুম শেষে সমন্বয় হয়। গ্রামের গরিব-গুর্বো লোকেরা ছোট ছোট জাল ফেলে বা খলসুন-বেড় পেতে মাছ ধরে। তাদের কাছ থেকে কোনো কমিশন নেন না মণ্ডল। কখনো হয়তো কেউ, কোনোদিন একটু বেশি মাছ পেলে, মণ্ডলদের কিছু দিয়ে আসে। এভাবে তিন-চার মাস জীবিকার একটা সংস্থান হয় তাদেরও।
চারজনের কাছ থেকে মাছ পাওয়া গেল। নানারকম মাছ, বড় রুই একটা, মাঝারি ধরনের তিনটা, আইড়, পাবদা, টেংরা, চিংড়ি, সব ধরনের মাছ।
-পদ্মার ইলিশ তো খুব নামকরা মাছ গো ভাইডি, পেইলে এক-আধটা?
-দুইডি পাইছি। ইলিয়াস বলে।
খেজমত এগিয়ে যায়। -দেখাওধিনি, দেখি।
মাছ দুটো বের করে তার সামনে ধরে ইলিয়াস। মাছের রুপোলি রং এই মেঘলা রোদহীন আলোতেও যেন চিকমিক করে। একটা প্রায় দেড় সের ওজনের। -অ্যার প্যাটে ডিম আছে।
-তাই, না? হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখে খেজমত। পেটটা বেশ মোটা মোটা লাগে। ইলিশ মাছ এর আগে দেখেনি বা খায়নি এমন নয়, কিন্তু একেবারে নদী থেকে তুলে আনা টাটকা ইলিশ মাছ দেখা এই প্রথম। নেড়ে-চেড়ে উল্টে-পাল্টে দেখে খেজমত।
-অ্যার চায়েও বড় ইলিশ পাওয়া যায়। কিন্তুক্ কদিন থেকি মাছ ভাল হোছে না।
ছোটটার ওজন তা-ও তিন পোয়াটাক তো হবেই। -এই মাছটার পেট পাতলা। ডিম নাই মনে হয়, তাই না ভাইডি?
-হ্যাঁ। বা থাইক্লেও ক্যাবল হ্যোছে, ডিমের অ্যাখুনো দানা ধরেনি। মাছটার বয়স কম।
প্রায় দশ-এগার সের মাছ নিয়ে ওরা ফিরে চলে।
এইবার ঘোরা পথ।
ঘোরা পথেরও সোজা-বাঁকা আছে। পাবনা রোড হয়ে পশ্চিমে পোয়া মাইলটাক গিয়ে কাঁচা রাস্তা পড়বে। সেই রাস্তা ধরে মোল্লাপাড়ার ঈদগাহ মোড়। সেখান থেকে উত্তরে মাঠের মধ্যে দিয়ে সোজা বড়বাড়িতে পৌঁছানো যায়। আবার মাঠের মধ্যে দিয়ে না গিয়ে একই রাস্তÍা ধরে পুবে পোয়া মাইলটাক গিয়ে আগের রাস্তা ধরা যায়। ওরা মাঠ ভেঙ্গে গ্রামের স্কুলে পৌঁছে। সেটা মোল্লা পাড়ার পুবে, আর কোণা পাড়ার দক্ষিণে। স্কুল বটে, রেলস্টেশনের মতো লোহার থামের ওপর টিনের চালা। কোমরসমান উঁচু মেঝে। ঘরগুলো বাঁশের বাতা দিয়ে ঘেরা। স্কুলের প্রাঙ্গণে বড় বড় ফজলি আমের গাছ কয়েকটা। স্কুল এখনো খোলেনি।
মোল্লা পাড়ায় বাড়িতে বাড়িতে গাছ। বড় বড় আমের বাগান তো আছেই, বাড়ির উঠোনে, আশপাশে নানা রকম ফল-ফলারির গাছ। এর-ওর বাড়ির আন্ঠা-কান্ঠা দিয়ে ঈদগাহ মোড়ে ওঠে ওরা। তারপর মাঠ ভেঙ্গে সোজা বাড়ির পথে এগোয়।
-আরে এই রাস্তাই তো সুজা ছিল, ভাইডি?
-সুজা, কিন্তুক্ পাঁক-কাদা বেশি। দেখলেন না?
তা ঠিক, মানে খেজমত, যদিও এসব পাঁক-কাদা তার কাছে কিছুই না। মুর্শিদাবাদের মাটি কোথাও এঁটেল, কোথাও এঁটেল-দোআঁশ। পানিতে ভিজলে আঠার মতো, শরীরে ঠেকলে লেপ্টে যায়, ছুটতে চায় না সহজে। আর সেই মাটির কাদায় পা ঢুকে যায় হাঁটু অব্দি।
-গিরামডা লদীর পাশে, কিন্তুক্ পুখোর-ডোবা কম। তাই না মমিন?
মমিন কিছু ভাবছিল। সে খেজমতের প্রশ্নটা ধরতে পারে না। -তুমার কি মুখ বন্ধ থাকে না খেজমত ভাই? অ্যাতো কথা বলো ক্যানে?
-আমি কী আর অ্যামুন কথা বুলনু অতো? হ্যাঁগো ভাইডি, আমি কি বেশি কথা বুলছি নাকি?
নিঃশব্দে হাসে খলিল ও ইলিয়াস। -আপনে মানুষডা ভাল বড় ভাই। বেশি কথা বুইল্লে মুন খুলাসা হয়া যায়।
-তাহলে আমি কি খারাপ মানুষ, ইলিয়াস?
-না, না, তা না। তে বুইল্ছুনু কি বেশি কথা বুইল্লে মুন ভাল থাকে।
মমিন বলে, তা একদিক থেকে ঠিক। আবার অন্য দিক থেকে- বেশি কথা বললে মিথ্যা আর বাজে কথা বলা হয় বেশি। সেজন্যে কথা বলতে হয় প্রয়োজন মতো।
খেজমত কথা বাড়ায় না। সে ভাবে, পণ্ডিত শ্যালকের সঙ্গে বিদ্যায়-বুদ্ধিতে পারা যাবে না যখন তখন চুপ থাকাই ভাল। তারা মোল্লাপাড়ার আণ্ঠা-কাণ্ঠা দিয়ে ধানের ক্ষেতে নামে। সেখান থেকে বড়বাড়ি দেখা যায়। একেবারেই কাছে, এক দৌড়ের দূরত্ব।
পুকুরের শানে বাড়ির মেয়েরা থালাবাসন, কাপড়-চোপড় ধোয়া-কাচা করছিল। খলিল আর ইলিয়াস তাদের সরিয়ে দেয়। মমিন আর খেজমত শানে নেমে হাত-পা-মুখ ধুয়ে নেয়।
বৃষ্টি আসে আর যায়। কখনো ঝমঝম শব্দে, কখনো বা ঝিরঝির করে। কখনো থম মেরে থাকে।
মমিন আর খেজমত ঘরে বসে নিজেরা কথা বলে। ঘরটা ছোটখাট। আট হাত দশ হাত ঘরের ওপরে খড়ের চালা। চালাটা পুরনো, তবে ভাল আছে এখনো। চুনকাম করা মাটির দেয়াল দেখে মনে হয় ইট-চুন-সুরকির পাকা বাড়ি। মেঝেটা হাঁটুসমান উঁচু, বর্ষায় রসেছে কিছুটা। একটা বড় চৌকি ঘরটার আধখানা জুড়ে আছে।
মমিনের নিজের বাড়ির কথা মনে পড়ে একবার। সেটা সত্যিকারের পাকা বাড়ি। নিজে ইট পুড়িয়ে বাড়ি করেছিলেন মহম্মদ হুসেন মোল্লা। কাঠের বর্গার ওপর চুন-সুরকির ছাদ। সামনে প্রশস্ত বারান্দা। তার ওপর টালির চালা। ঘরগুলো বেশ বড়সড়। তিনটা ঘরের মধ্যে তার ভাগে একটা ঘর পড়েছে। সে ঘরের কথা ভেবেই বা কী লাভ! বাস্তবে ওই ঘরে বসবাস করার সুযোগ তার কমই হয়েছে। সেটা আসলে মেজ ভাই ব্যবহার করে। সে বাড়ি গেলেও ও ঘরে তার জায়গা হয় না। তাকে থাকতে হয় একটা বেড়ার ঘরে। সে তুলনায় এই ঘরটা মন্দ কিসে? নিজেকে বোঝায় মমিন।
তাকে চুপচাপ থাকতে দেখে তার ঘাড়ে হাত রাখে খেজমত। -কী ভাবছিছ্?
-না, ত্যাামুন কিছু লয়।
খেজমত বলে, আমি বোলছুনু কী- আর থেইকে কী কর্ইবো? কাইল্ চইলে যাই।
মমিন বলে, থাকো নাহয় আর দু-এক দিন। বেড়িয়ে যাও সব।
-থাইক্লে খারাপ হইতোক্ না। রাশ্শাহীর বাজারডা দেখা হইতোক্। আর কখুনো আসা হবে কিনা কে জানে। দ্যাশটা তো আর আগের মতন এক নাই।
ভগ্নিপতির দিকে তাকায় মমিন। এই দুনিয়াতে এই লোকটাকেই তার সবচেয়ে আপন মনে হয়। মানুষটা তার চেয়ে অন্তত সাত-আট বছরের বড়। অশিক্ষিত। কথা বলে বেশি। কিন্তু মনটা সরল। পরোপকারী মানুষ। অবস্থাপন্ন ঘরের সন্তান, জমি-জমা আছে ভাল। কিন্তু শ্বশুর-ন্যাওটা ছিল লোকটা। এপাড়া-ওপাড়া বাড়ি। ফাঁক পেলেই চলে আসতো শ্বশুরের কাছে। এইভাবে শ্বশুরের কারবারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে সে। ডোমকুল, জিয়াগঞ্জ, বহরমপুর যেতে হতো প্রায়ই, কখনো শ্বশুরের সঙ্গে, কখনো একা, বা কারবারের লোকজনদের সঙ্গে। কখনো মাল নিয়ে কখনো টাকা দিতে বা আনতে। কোলকাতায়ও গিয়েছে কয়েকবার। মহম্মদ মোল্লার আকস্মিক মৃত্যুর পর বহু দেনাদার লেনদেনের কথা অস্বীকার করেছে, পাওনা নেওয়া যায়নি তাদের কাছ থেকে প্রমাণের অভাবে। যা কিছু পাওয়া গেছে তা সম্ভব হয়েছে খেজমতের কারণে। মমিনকে নিজের ছোট ভায়ের মতো ভালবেসে এসেছে সে চিরকাল। মমিন যখন যেখানে থেকেছে সেখানেই তাকে দেখতে গেছে সে, একদিনের জন্য বা একবারের জন্য হলেও। সে মমিনের মুখের দিকে তাকায়। এ মুখের আদল তার চেনা। একেবাওে তার শ্বশুরের মতো। কেবল চোখ দুটো পেয়েছে মায়ের কাছ থেকে। সে চোখ দুটি এখন ছলছল করছে।
ভগ্নিপতির হাঁটুর ওপর হাত রাখে মমিন। -থেকে যাও না আর দু-একদিন? কণ্ঠে শ্রাবণের বৃষ্টির মতো তরলতা।
-ভরা বষ্ষার কাল। বাড়িতে তোর বহিন গরু-ছাগল লিয়ে কী যে কইরছে। তা বাদে আউশ ধান আছে মাঠে, পাট কাটা তো আছেই। ছেইলেডা তো কুনো কামের হইলো না।
বৃষ্টি বেশ ধরে এসেছে। শিশিরের মতো ঝরছে কি ঝরছে না। আকাশজোড়া ঘন মেঘ, দিন-রাত বৃষ্টি, খাল-বিল-ফসলি মাঠ পানিতে টইটুম্বুর, তবু গুমোট গরম যাচ্ছে না।
একটা বড় তালপাখা দিয়ে বাতাস করে খেজমত। ছোট্ট ঘরের ভেতর বার বার চোখ বুলায় সে। -লিজের পাকা বাড়ি থুয়ে এই ঘরে থাইকতে হবে। কী ভাগ্য!
-আমি তো সারা জীবন এইভাবেই থাকলাম খেজমত ভাই, পরের বাড়িতে, পরের খেয়ে। মাঝে-মধ্যে বই-খাতা কিনার পয়সাও থাকে না। আমার ভাগের জমিতে যে আয় হয় তাতে আমার তো অভাব হওয়ার কথা লয়। বলো, অভাব হওয়ার কথা?
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে খেজমত। -তা তো লয়। আমি তো তোকে আগেই ব্যুলেছি, ওই জমির টাকা তুই কুনোদিনই ঠিক মতোন পাবিনি।
দুজনেই চুপ করে থাকে খানিকক্ষণ। আবার বৃষ্টি শুরু হয়। তার সাথে হালকা ঝাপটা বাতাস।
-বাপকে তো চোখেই দেখ্নু না, মায়ের স্বাদও বেশি দিন পানু না। ভায়েরা থেইকেও নাই। কেঁদে ফেলে মমিন।
তাকে বুকে টেনে নেয় খেজমত। -কান্দিসনি ভাইডি, কান্দিসনি। আল্লা হয়তো অ্যাথেই মুঙ্গল রেইখেছে। আল্লার উপর ভরসা রাখবি, দেখবি সব ঠিক হয়ি গিইছে।
-আমার তো লিজেরই টাকা, বলো, তাহলে আমাকে ক্যানে অর্থসংকটে ভ্যুগ্তে হবে? বলো? আমাকে ক্যানে রোজ রোজ ভিখ মাঙার মতোন টাকা দেন টাকা দেন কর্ইতে হবে!
এর কোনো উত্তর নেই খেজমতের কাছে। সে প্রথম প্রথম এ নিয়ে ঝগড়া করেছে ওর ভাইদের সাথে, তারা ফল হয়েছে উল্টো। তার শ্বশুরবাড়িতে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। শ্বশুরের এই ছোট ছেলেটা বাপের বৈভব-বিত্তের কোনো স্বাদই পায়নি।
শ্বশুরের সহায়-সম্পদ নিজের চোখের সামনে শেষ হয়ে যেতে দেখল খেজমত। যেটুকু ছিল সেটুকুও একেবারে কম নয়। সেটুকু ভাঙিয়েই অনেক কিছু করা সম্ভব ছিল। পাঁচ ভাই প্রত্যেকে পনের বিঘা করে জমি পেয়েছে। হয় না এমন কোনো ফসল নেই, এমনই উর্বর জমি সেসব। তাদের গ্রামে এতটুকু জমিই বা আছে কয়জনের। মমিন যদি লেখাপড়ার পেছনে না ছুটতো তাহলেও এই জমির ওপর নির্ভর করে বহাল তবিয়তে দিন গুজরান করতে পারতো বউ-ছেলেমেয়ে নিয়ে। তাহলে হয়তো এমনটা হতো না। তখন সে নিজের জমি নিজেই চাষ করতো। ভাইদের হাতে কর্তৃত্ব যেত না। এখন তার উপায় নেই। জমি কাউকে-না-কাউকে চাষ করতে দিতেই হবে। ভাইরা থাকতে অন্যকে জমি করতে দেওয়া কি মানায়? লোকে কী বলবে।
-তুই ভাবিস্নি। আমি আছি না? আমি দেখবো। আমার তো বেশি সামর্থ্য নাই, তা-ও ভাইরা যদি না দেয় তো আমি তোকে…
-থাইক্লেই বা কী? তুমি ক্যানে দিবে? আমার কি নাই? আমি তো বেশি চাইনি।
মেজ ভায়ের বড় সংসার। ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করে। তার অর্থের প্রয়োজন আছে। সেজন্যে ফসলের পুরো ভাগ নেয় না মমিন। তার প্রয়োজনটুকু মিটলেই হলো। বাকিটুকু ভাই নিক, সে তো বলেই দিয়েছে। সে যতটুকু ভাগে পায় তার অর্ধেকও তার দরকার হয় না। কিন্তু সেটুকুও পায় না। আজ এই, কাল সেই, অজুহাতের শেষ নেই।
মমিনকে কখনো এভাবে ভেঙ্গে পড়তে দেখেনি খেজমত। এই এত্তটুকুন বয়স থেকেই তো দেখছে তাকে। এই স্বল্পকালীন জীবনেই কত ঝড়-ঝঞ্ঝা গিয়েছে ছেলেটার ওপর দিয়ে। ভাই-ভাবিদের হাতে কী মারই না খেয়েছে। কত ভারী ভারী কাজ করতে হয়েছে তাকে সেই ছোট্ট বয়সে। মুখ ভার করেছে কখনো কখনো, কিন্তু কাঁদেনি। তারপর গত আট-দশটা বছর বাড়ির বাইরে। বলে বটে ভালই থেকেছে, কিন্তু সব সময় যে ভাল থাকার কথা নয় তা তো বোঝাই যায়। হয়তো কোনো বাড়িতে খাওয়ার কষ্ট হয়েছে, হয়তো কোনো বাড়িতে থাকার কষ্ট হয়েছে, হয়তো কোনো বাড়ির লোকেদের আচার-ব্যবহার ভাল ছিল না, অসুখ করেছে মাথায় হাত বোলানোরও কেউ ছিল না, এরকম তো হতেই পারে। তার বিষণœ মুখ, দুর্বল স্বাস্থ্য কিছু ইঙ্গিত তো দেয়। কিন্তু মুখ ফুটে কখনো কিছু বলেনি মমিন। বলে না সে। এমনই সহনশীল আর আত্মমুখি মানুষ সে। তো সেই মানুষটার ভেঙ্গে পড়া দেখে কষ্ট লাগে খেজমতের। তার চোখেও অশ্রু ছলছল করে। সে ভাবে, বাড়ির বাইরে থাকার অভ্যাস তো তার আছে। সেজন্যে সে উদ্বিগ্ন নয় নিশ্চয়। তার দুশ্চিন্তা হয়তো এই জন্য যে, দেশটা এখন আলাদা, আগের মতো যখন-তখন বাড়িতে আসা-যাওয়া সম্ভব হবে না। না থাক বাড়িতে বাপ-মা, তবু নিজের জন্মভূমি তো বটে। মন কাঁদবেই। আরো একটা সমস্যার কথা হয়তো সে ভাবছে। দেশে থাকতে যখন-তখন বাড়ি গিয়ে যাহোক কিছু টাকা-পয়সা জোগাড় করে আনতে পারতো। এখন সেটা কঠিন হয়ে গেল। সময় মতো অর্থ পাওয়া দুষ্কর বটে। তাই যদি হয় তাহলে তার লেখাপড়া সংকটে পড়বে! এসব চিন্তাই হয়তো মমিনকে কাবু করে ফেলছে।
বাইরে বৃষ্টির জোর বাড়ে। ঝমঝম শব্দে কী যেন বলতে চায় প্রকৃতি অব্যক্ত ভাষায়। ভিজে গলে পড়তে থাকে পৃথিবীর যত দুঃখ-ক্ষোভ-বঞ্চনার মেঘ। দুই বিদেশী এই অজানা দেশে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভাবতে থাকে চুপচাপ।
জোহরের নামাজের পর খাবার নিয়ে আসে ইলিয়াস। গরম ভাতের সঙ্গে পাতলা মসুরের ডাল, একটা সবজি আর ইলিশ মাছ। ইলিশ মাছের কী সুবাস! ঝোলে আধডোবা বড় বড় পেটির দিকে লোভাতুর চোখে তাকায় খেজমত। পদ্মার ইলিশের নাম ভারতজোড়া। কিন্তু মুর্শিদাবাদে সেই ইলিশ প্রায় দুর্লভ। এই মাছ সহজেই পচে যায়। সেজন্যে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের হাট-বাজারে ইলিশ পাওয়া খুবই মুশকিল। সেই ইলিশ এখন সামনে। খেজমত দ্রুত হাতে একটা পেটি তুলে দেয় মমিনের পাতে। -থাক, থাক, আমাকে পরে দাও।
-আরে লে লে, পদ্মার ইলিশ ব্যুলে কথা।
-না, আমি আগে সবজি-ডাল খাবো।
-দূর! বলে সে পেটিটা নিজের পাতে ঢেলে দেয়। ঝোল নেয় প্রায় ডালের মতো চুবচুবিয়ে। ভাতটা ভাল করে মাখায়ও না, তুলে নেয় মুখ ভরে। -আহা! কী সুয়াদ, মাইরি! অ্যাখেই বোলে পদ্মার ইলিশ। খাইয়ি দ্যাখ্।
খাবার-পাগল ভগ্নিপতির এই সারল্য ভাল লাগে মমিনের, যদিও তা কখনো কখনো বিব্রতকর হয়ে ওঠে। সে বলে- ভাল লাগলে ওইটাও খেয়ে নাও না।
-না, না, কী বোলিস তুই! ছিঃ! ছিঃ! তোর ভাগেরডা আমি খাইয়ি লিবো সেডা ভাইবতে পারলি তুই!
-খেলে কী হবে?
তারপর নিজেও নেয়।। তৃপ্তি ভরে খায় ওরা। তারপর কাজ নেই যখন একটু ভাতঘুম দিয়ে নেয় ওরা। ঘুম ভালই ধরেছিলো, হয়তো ঘুম ভাঙ্গত না সহজে। হইচই শুনে ওদের কাঁচা ঘুম চটকে যায়।
বৃষ্টি তখন ঝিমিয়ে এসেছে। আকাশ ঘন কালো মেঘে ঢাকা। বিকেল বেলাটাকে মনে হয় যেন সন্ধ্যে রাত। ছেলেমেয়ে, তরুণ-প্রবীণ, হইহই করে ছুটছে সবাই। মানুষের চেঁচামেচি শুনেই হয়তো বা কুকুরগুলো ঘেউঘেউ শুরু করে দিয়েছে। তাহলে আর গরুগুলো বাদ যাবে কেন, ওরাও শুরু করে দেয় হাম্বা হাম্বা রব।
-কী ব্যাপার বোল্ তো! ডাকাত-টাকাত পইড়েছে নাকি?
-এই দিনের বেলা ডাকাত পড়বে?
-সে-ও তো কথা মাইরি।
একটা ছেলেকে ধরে জিজ্ঞেস করে খেজমত, কী হয়িছে গো?
-মারামারি।
ছাতা মাথায় ওরাও বের হয় ঘটনা দেখতে। সবাই ছুটছে পুবে, গোয়ালপাড়ার দিকে। দুই পাড়ার মাঝখানে একটা বিশাল চৌকোণা পুকুর, দীঘিই বলা চলে। তার বাম তীর ঘেঁষে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পায়ে চলা পথ। পথটার ব্যবহার কম। দুই পাশ থেকে লতা-পাতা ঝুলে পড়ে পথটাকে প্রায় অদৃশ্য করে রেখেছে। জঙ্গল, লতা-গুল্ম ছিঁড়ে, পায়ে দলে হইহই করছে আর ছুটছে পাহাড়ী পাড়ার লোকজন। কারো হাতে লাঠি, কারো হাতে বল্লম, কেউ নিয়ে চলেছে লম্বা কোঁচ। ব্যাপার যে গুরুতর সেটা বুঝতে পারে ওরা, কিন্তু সেটা কী ও কেন তা আন্দাজ করতে পারে না। পুকুরের উত্তর-পুব কোণে সড়কের ওপর জমায়েত হয়ে লম্ফ-ঝম্ফ করছে লোকজন। খেজমত আর মমিন পেছনের দিকে একপাশে একটা আমগাছের নিচে গিয়ে দাঁড়ায়। বৃষ্টি তখনো ঝরছে ফিরফির করে, যেন ঘন ভারী শিশির পড়ে। সে বৃষ্টির তোয়াক্কা নেই কারো।
হঠাৎ কোত্থেকে খলিল ছুটে আসে। -আপনেরাও আইসিছেন?
-না, না, আমরা কী হোচ্ছে দেখতে এইসেছি। তো তুমার হাতে লাঠি কই?
ছেলেটা একটু হাসে। সেটা লজ্জার না খুশির বোঝা যায় না। খেজমতের প্রশ্নের উত্তর দিতে দেরি করে না সে। -আমার অসুখ না? আর আমার মারামারি ভাল লাগে না।
ছেলেটার কথা শুনে চোখ তুলে ওর দিকে তাকায় মমিন। তার মনে হয় ছেলেটা সত্যি কথাই বলছে। -তুমি ঠিক করেছ। দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদ ভাল না।
-কিন্তুক্ আপনেরা যান এখিন থেকি। কখুন কী হয় বুলা যায় না।
খলিলের কথা শুনে হাসে খেজমত। -না, না, আমরা দূর থেকে দেখব, কাছে যাব না।
-তা-ও! ধরেন একটা ইটের ভাংড়ি আইসি মাথার উপুর পইড়লো। কী কইরবেন তখুন?
-তাহলে তুমিই বা এইখেনে ঘুরছো ক্যানে? তোমারও তো লাইগ্তে পারে।
-আমারে বংশের ব্যাপার তো। মারামারি করি আর না করি সাথে থাইক্তে হয়।
হঠাৎ কে একজন শূন্যে লাঠি ঘুরিয়ে হাঁক মারে, অমনি সবাই সমস্বরে হই দিয়ে ছুটতে থাকে। খলিলও দৌড় লাগায়। যেতে যেতে বলে, আপনেরা চইলি যান মাস্টার ভাই। গণ্ডগোল শুরু হয় গ্যালো।
-চল যাই, দেখি কী হয়। মমিনের হাত ধরে টানে খেজমত।
-না, আমাদের যাওয়া ঠিক হবে না। বিদেশ-বিভুঁই জায়গা, কিছুই এখনো জানি না আমরা।
খেজমতের চাপাচাপিতে আর একটু এগিয়ে সুবিধা মতো এক জায়গায় দাঁড়ায় ওরা। সেখান থেকে দেখা যায় সবকিছু।
গোয়ালপাড়ার দক্ষিণ অংশ এটা। এখানে মজিদ মণ্ডলের শ্বশুরবাড়ি। ঘরামি বংশের কয়েকঘর মানুষের বসবাস এখানে। এই অংশটুকুকে ঘরামিপাড়াও বলে। এরা এখন আর ঘরামির কাজ করে না। কিন্তু বাপ-দাদা চৌদ্দ পুরুষের কোনো প্রজন্ম হয়তো ঘরামি ছিল। সেই বংশের নাম এখনো রয়ে গেছে। এই ঘরামিদের জমি নিয়ে দ্বন্দ্ব এ পাড়ার আমিরের সঙ্গে। টাক মাথা বলে লোকটার নাম হয়েছে চাইন্দা আমির। এই জমিতে পাট বুনেছিলো মজিদ মণ্ডলের চাচাতো শ্যালক আনফার ঘরামি। সেই পাট কাটতে লোক লাগিয়েছে চাইন্দা আমির। ঘরামিরা গরিব না হলেও তাদের লোকবল কম। তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে বড়বাড়ির লোকেরা। তারা জমির ওপর না গিয়ে আমিরের বাড়িতে চড়াও হয়। আমির সম্পদশালী মানুষ। পাকা প্রাচীর ঘেরা বাড়ি তার। দরোজা-জানালা বন্ধ করে ওরা বাড়ির ভেতর ঘাপটি মারে। তারও আত্মীয়-স্বজন কম। পাড়ার কিছু ভাড়াটে লোক একবার বাধা দিতে আসে, কিন্তু তাড়া খেয়ে পালিয়ে যায়। ঘরামিরা আর বড়বাড়ির লোকেরা মিলে আমিরের বাড়ির দরোজা-জানালায় লাঠালাঠি করে, ইটপাটকেল ছোঁড়ে বাড়ির ভেতর। ভেতর থেকে সাড়া না পেয়ে তারা হতাশই হয়। মারামারি ঠিক জমে ওঠে না। খানিকক্ষণ এরকম করে তারা ছোটে জমির উদ্দেশে। খবর পেয়ে আমিরের লোকেরা আগে-ভাগেই জমি ছেড়ে পালিয়ে গেছে। বেশ কিছু পাট তারা কেটে ফেলেছিল। সেগুলো আঁটি বেঁধে তুলে নিয়ে আসে ঘরামিরা। (চলবে)