মানুষটি ‘দ্য রিমেইন্স অব দ্য ডে’ উপন্যাসটি লেখেন খুবই বিনয়ী একজন ইংরেজ বাটলারের নিখুঁত ধারণাকে উপস্থাপনের মাধ্যমে। লন্ডনের গোল্ডারস গ্রিনে তাঁর বাড়ির দরজায় আমাকে স্বাগত জানানোর পর তিনি তাৎক্ষণিকভাবে আমাকে চা তৈরি করে নেয়ার প্রস্তাব রাখলেন। আমি যখন তার সঙ্গে দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ করি সে সময় চা ও অন্যান্য খাবার নিয়মমাফিক পরিবেশিত হয়। তিনি ধৈর্যসহকারে তার জীবনের কথা বিস্তারিতভাবে বলতে শুরু করলেন। তিনি তার তরুণ বয়সের আমোদপ্রমোদের কথা বলতে সব সময়ই পছন্দ করেন। বিশেষ করে গিটার বাজানো হিপ্পির কথা। বিমূর্ত ভাষায় বিরামচিহ্ন ব্যবহার করে পৃথকীকরণের মাধ্যমে তার কলেজের প্রবন্ধগুলো লেখার কথাও। “এটা প্রফেসরদের দ্বারা উৎসাহব্যঞ্জক ছিল।” তিনি স্মরণে এনে বললেন, আফ্রিকা থেকে আসা একজন প্রফেসর খুবই রক্ষণশীল হলেও তিনি কিন্তু খুবই বিনয়ী ছিলেন। তিনি বলতেন, মি. ইশিগুরো, তোমার স্টাইল সম্বন্ধে একটা সমস্যা আছে। যদি তুমি এটা তোমার পরীক্ষাতে পুনরায় উপস্থাপন করো তবে তোমাকে সন্তোষজনক গ্রেডের কম নম্বর আমাকে দিতে হবে।
কাজুও ইশিগুরো ১৯৫৪ সালে নাগাশাকি শহরে জন্মগ্রহণ এবং পাঁচ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে দক্ষিণ ইংল্যান্ডের গাল্ডফোর্ড শহরে আসেন। তিনি ২৯ বছরের মধ্যে জাপানে ফিরে যাননি। ১৯৬০ সাল থেকে তিনি ইংল্যান্ডেই আছেন, তাই তার লেখালেখি ইংরেজিতে। ২৭ বছর বয়সে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘এ পেল ভিউ অফ হিলস’ (১৯৮২) প্রকাশিত হয়, যাতে তিনি ঐকান্তিকভাবে নাগাসাকিকে প্রশংসা করেন। তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস অ্যান আর্টিস্ট অফ দি ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড (১৯৮৬)। এই উপন্যাসের জন্য ব্রিটেনের বিখ্যাত হুইটব্রেড পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর তৃতীয় উপন্যাস ‘দ্য রিমেইন্স অব দি ডে’ (১৯৮৯) তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। ইংরেজি ভাষার এক মিলিয়ন কপি ‘দ্য রিমেইন্স অব দ্য ডে’ উপন্যাসটি বিক্রি হয়। তিনি এই বইয়ের জন্য বুকার প্রাইজ লাভ করেন। ইশিগুরো ব্রিটিশ চিত্রনাট্যকারও বটে। তাঁর লেখা চিত্রনাট্যগুলো বিশেষভাবে খ্যাত। তাঁর চিত্রনাট্যের উপর বিখ্যাত বিখ্যাত সিনেমা তৈরি করেন প্রখ্যাত চিত্রনির্মাতারা। ইশিগুরোকে অর্ডার অফ দি ব্রিটিশ এম্পায়ার এর নিয়মের ভিত্তিতে অফিসার পদে নামাঙ্কিত করা হয়। কিছুদিনের জন্য তাঁর ছবি ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে শোভা পায়। ইশিগুরোর পরবর্তী উপন্যাস দ্য আনকনসোলড (১৯৯৫) লিখে পাঠকদেরকে বিমুগ্ধ করেন। পাঁচ শত পৃষ্ঠার এই উপন্যাসে তিনি সচেতনতার ¯্রােতধারা বইয়ে দেন। বিখ্যাত সাহিত্য সমালোচকদের মধ্যে জেমস উড লেখেন যে ‘অযোগ্যতার নিজস্ব বিভাজন তিনি এই উপন্যাসে আবিষ্কার করেছেন।’ অন্য দিকে, অন্যান্যরা মনেপ্রাণে এগিয়ে আসেন তাঁর কথার প্রতিবাদ করতে। তাদের মধ্যে অনিতা ব্রুকনার তাঁর প্রাথমিক সন্দেহগুলোকে পরাভূত করে এই উপন্যাস সম্পর্কে বলেন, “প্রায় নিশ্চিতভাবে এটা একটা মাস্টারপিস।” এই লেখকের আরো দুটো উপন্যাসÑ ‘হোয়েন উই অয়ার অরফানস (২০০০)’ এবং ‘নেভার লেট মি গো (২০০৫)’ উচ্চ প্রশংশিত হয়।
ইশিগুরো স্ক্রিন প্লে ও টেলিপ্লেও রচনা করেছেন, আর তিনি অতি সম্প্রতি জাজ চ্যান্টেইউজ স্টাকে কেন্ট এর জন্য গান লিখেছেন। তাদের সম্মিলিত সিডি ব্রেকফাস্ট অন দি মর্নিং ট্রাম ফ্রান্সে সর্বাধিক বিক্রীত জাজ অ্যালবাম। আরামদায়ক সাদা প্লাস্টার করা বাড়িতে ইশিগুরো তার ষোল বছরের মেয়ে নোয়মি ও তাঁর স্ত্রী সাবেক সমাজকর্মী লোমা কে নিয়ে বসবাস করেন। সেখানে ছিল তিনটি ইলেকট্রিক গিটার। আর ছিল একটা স্টেট অফ দি আর্ট স্টিরিও সিস্টেম। তাঁর ছোট্ট অফিসটি উপরতলায় যেখানে ইশিগুরো লেখেন। মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত হালকা কাঠের ডিজাইন। আরামপ্রদ স্থানটি রঙিন বন্ধনী সুচারুরূপে সংযুক্ত। পোলিস, ইতালিয়ান, মালয়েশিয়ান এবং অন্যান্য ভাষায় অনূদিত তার উপন্যাসগুলো একটি ওয়ালে সারিবদ্ধভাবে সংযুক্ত।
প্রশ্ন : শুরু থেকে আপনি আপনার উপন্যাসে সফল হয়েছেনÑ আপনার তরুণ বয়সের কোন লেখা আছে কি যা কখনোই প্রকাশিত হয়নি?
কাজুও ইশিগুরো : বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পর আমি যখন ওয়েস্ট লন্ডনের গৃহহীন লোকদের জন্য কাজ করছিলাম সে সময় আমি আধা ঘন্টার রেডিও নাটক লিখে বিবিসিতে পাঠিয়েছিলাম। এটা বাতিল হলেও, আমি কিন্তু একটি উৎসাহব্যঞ্জক জবাব পেয়েছিলাম। এটা ছিল এক ধরনের অস্বস্তিদায়ক ব্যাপার। তাহলেও কিন্তু এটা ছিল প্রথম তরুণ বয়সের ঘটনা। আমি এটা পাঠানোর আগে অন্য লোকদের দেখানোর কথা মনে ভাবিনি। এটার শিরোনাম ছিল “চড়ঃধঃড়বং ধহফ খড়াবৎং.” পান্ডুলিপি জমা দেয়ার সময় আমি ঢ়ড়ঃধঃড়বং এর বানান ভুল করে একে ঢ়ড়ঃধঃড়ং. লিখেছিলাম। গল্পটা ছিল দু’জন ট্যারা তরুণ-তরুণী, যারা একটা ফিস এন্ড চিপস ক্যাফেতে কাজ করতো। তারা দু’জনই গুরুতর ভাবে ট্যারা ছিল। তারা পরস্পর প্রেমে পড়ে। কিন্তু তারা কখনোই শিকার করতো না যে তারা ট্যারা। তাদের দু’জনের মধ্যে একটা অব্যক্ত বিষয় ছিল। এই গল্পে শেষে দেখা যায় তারা পরস্পরকে বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই গল্পের বর্ণনাকারীর মধ্যে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন ছিল, তিনি একটি পরিবারকে সমুদ্রের জেটিতে আসতে দেখেন। পিতা-মাতা ট্যারা, তাদের সন্তানরা ট্যারা, কুকুরটাও ট্যারা। তাই তিনি বলেন, ঠিক আছে, আমরা বিয়ে করতে যাচ্ছি না।
প্রশ্ন : ইস্ট অ্যাঞ্জেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার বছরে কি আপনি প্রথম জাপান সম্বন্ধে লিখেছিলেন?
ইশিগুরো : হ্যাঁ। আমি আবিষ্কার করেছিলাম যে আমার কল্পনা জীবন থেকে এসেছে। আমি আমার চারপাশের মধ্যবর্তী জগৎ থেকে স্থানান্তরিত হয়েছিলাম। একটা গল্প শুরু করার চেষ্টা করলে তা ছিল এমনটা : “আমি ক্যামডেন টাউন টিউব স্টেশন থেকে বের হয়ে ম্যাগডোনাল্ডের ভেতর দিয়ে গিয়েছিলাম। সেখানে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু হ্যারি ছিল।” তারপর আর কি লিখতে হবে তা আমি আর ভাবতে পারিনি। অপরপক্ষে, জাপান সম্বন্ধে লেখার কালে সবকিছু আমার কাছে উন্মুক্ত ছিল। একটা গল্পে আমি পড়েছিলাম, নাগাসাকিতে ক্লাস শুরুর সময় বোমা পড়লো। একজন তরুণী মহিলার জবানীতে ওটা বলা হয়েছিল। আমার সাথী ছাত্রদের থেকে আমি প্রচন্ড সহায়তা পেয়েছিলাম। তারা সবাই বলেছিল, জাপানি উপদানগুলো সত্যিই খুবই উদ্দীপক। তারপর আমি ফাবার থেকে একটা চিঠি পাই তাদের ইন্ট্রোডাকশন সিরিজে আমার তিনটি গল্প অন্তর্ভুক্ত করার। ওটা ছিল একটা চমৎকার ঘটনা। আমি জানতাম যে টম স্টোপ্পার্ড এবং টেড হগস ওটা আবিষ্কার করেন।
প্রশ্ন : আপনি যখন ‘এ পেল ভিউ অফ হিলস’ শুরু করেন ওটা কি তখনকার ঘটনা?
ইশিগুরো : হ্যাঁ, ফাবার এর রবার্ট ম্যাকক্রাম প্রথম অগ্রিম অর্থ দিয়েছিলেন যাতে আমি গল্প যথাসময়ে লিখে দিতে পারি। আমি কমিশ শহরের একজন তরুণী মহিলাকে নিয়ে গল্প লিখতে শুরু করি। একটি খারাপ অনুষঙ্গের একটা বিরক্তিকর সন্তানের কথা গল্পে তুলে ধরি। আমার মনে ছিল যে ওই মহিলা বার বার বলছিল, আমি নিজে সন্তানটিকে চাই, আমি ওই লোকটার প্রেমে পড়েছিলাম। এই বাচ্চাটি একটি আপদ। আমাদের ক্লাসমেটদের কাছ থেকে প্রচন্ড সাড়া পেলাম এই গল্পটির জন্য। তারপর আমি কর্নওয়ালের গল্প লেখার দিকে মন দিলাম। আমি উপলব্ধি করলাম যে যদি আমি জাপান নিয়েই গল্প লিখে চলি তবে তা হবে সংকীর্ণ এবং তার প্রতিধ্বনি হবে স্বল্প পরিসরে।
প্রশ্ন : পাঁচ বছর বয়সে জাপান থেকে চলে আসার পর আপনি তো আর ফিরে যাননি সেখানে। আপনার বাবা-মা কোন শ্রেণির জাপানি ছিলেন?
ইশিগুরো : আমার মা তার প্রজন্মের একজন জাপানি ভদ্রমহিলা ছিলেন। তার মধ্যে আচার আচরণের একটা ধরন ছিল, আজকালের বিচারে যাকে বলা যেতে পারে প্রাক-নারীবাদী। আমি যখন পুরনো দিনের সিনেমা দেখি তখন আমি বুঝতে পারি প্রচুর সংখ্যক মহিলা আমার মায়ের মতোই তারা কথাবার্তা বলে। ঐতিহ্যগতভাবে জাপানি মহিলারা পুরুষের চাইতে ভিন্ন ধরনের ভাষা ব্যবহার করে। আমার মা আশির দশকের দিকে জাপান পরিদর্শন করে এসে বলেন যে তরুণী মেয়েরা এখন পুরুষদের মত ভাষায় কথা বলে। আণবিক বোমা বর্ষণের সময় আমার মা নাগাসাকিতে ছিলেন। তখন তার বয়স ছিল সতেরো আঠারো বছরের মতো। তার ঘর ছিল ভাঙাচোরা ধরনের। বৃষ্টি হলে তারা বুঝতে পারতেন ভাঙাচোরা ঘর মেরামত করতে হবে। ঘরের ছাউনি ছিদ্র হতে শুরু করেছে যেন ঘরের উপর টর্নেডো আঘাত হেনেছে। পরিবারে আমার মা ছিলেন সর্বেসর্বা। চারজন ভাইবোন, আর দু’জন পিতা-মাতা । বোমাবর্ষণে তিনি আহত হয়েছিলেন। আবর্জনার উড়ন্ত টুকরো তাকে আঘাত হানে। তিনি বাড়িতে সেরে উঠছিলেন, আর অন্যদিকে, তার পরিবারের বাকিরা সাহায্যের জন্য নগরের অপর প্রান্তে চলে গিয়েছিলেন। যুদ্ধের কথা ভাবলেই তিনি অ্যাটোম বোমার ভয়ে ভীত হয়ে উঠতেন। তিনি যে ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন সেখানে বিমান আক্রমণকালে আন্ডারগ্রাউন্ড শেল্টারে আশ্রয় নেয়ার কথা তার মনে পড়তো। যেদিন বোমা পড়ে সেদিন আন্ডারগ্রাউন্ড শেল্টারের অন্ধকারে সবাই আতঙ্কিতভাবে বসে ছিলেন। তারা ভেবেছিলেন যে তারা মারা যাচ্ছেন। আমার বাবা বংশগতভাবে জাপানি ছিলেন না, কারণ তিনি সাংহাই এ বড় হয়ে ওঠেন। তার মধ্যে চৈনিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল। কখনো খারাপ কিছু ঘটলে তিনি শুধু হাসতেন।
প্রশ্ন : কেন আপনাদের পরিবার ইংল্যান্ডে চলে আসেন?
ইশিগুরো : প্রাথমিকভাবে এটা ছিল একটা শর্ট ট্রিপ। আমার বাবা ছিলেন একজন ওসেনোগ্রাফার। ব্রিটিশ ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ওসেনোগ্রাফিংয়ের প্রধানের আহ্বানে আমার বাবা স্টর্ম রেঞ্জ মুভমেন্টের একটা আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়েছিলেন। আমি কখনোই বুঝতে পারিনি কাজটা কী ছিল। আমার বাবা সেখানে গেলে একবার আমি তার ওখানে গিয়েছিলাম।
প্রশ্ন : জাপান থেকে স্থানান্তরিত হয়ে আপনি কেমন অনুভব করেছিলেন?
ইশিগুরো : আমার মনে নেই। তবে আমি মাতৃভূমি ত্যাগের তাৎপর্য অনুধাবন করেছিলাম। আমার পিতামহ ও আমি নাগাসাকির একটি ডিপার্টমেন্ট স্টোরে গিয়েছিলাম মুরগির একটা খেলনা কিনতে। ওটার সঙ্গে একটা পিস্তল দেয়া হয়, তা দিয়ে মুরগিকে ফায়ার করলে মুরগি ডান দিক থেকে একটা ডিম বের হয়ে আসে। কিন্তু সেটা আমাকে কিনে না দেয়ায় আমি হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ি।
বিওএসি জেটে চড়ে যেত আমাদের তিন দিন লাগে। আমার মনে পড়ে একটা চেয়ারের উপর আমি ঘুমুতে চেষ্টা করছিলাম। লোকজন আমাকে আঙুর ফল দিয়ে জাগাতে চেষ্টা করছিল। প্রত্যেকবারই বিমান তেল নেয়ার জন্য অবতরণ করছিল। উনিশ বছর বয়সের সময় আমি আবার প্লেনে চড়ি। ইংল্যান্ডে আমরা সুখি ছিলাম কিনা সে কথা আমার মনে পড়ে না, যদিও আমি বড় হয়ে ভাবতে শিখলাম ওখানে বসবাস করা কষ্টকর হবে। আমার মনে নেই ভাষার জন্য আমাকে সংগ্রাম করতে হয়েছিল কিনা, কারণ আমি তো সে সময় পড়াশোনা শুরু করেছিলাম না। আমি কাউবয় সিনেমা ও টিভি সিরিয়াল পছন্দ করতাম আর ওই সব সিনেমা থেকেই সামান্য সামান্য ইংরেজি শিখেছিলাম। আমার প্রিয় ছবি ছিল রবার্ট ফুলার ও জন স্মিথের ল্যারামাই। দ্য লোন র্যান্জার। আমি দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম জাপানের বিখ্যাত ছবিগুলো। কাউবয় ছিল আমার আদর্শ।
প্রশ্ন : আপনি গাল্ডফোর্ড সম্বন্ধে তী মনে করেছিলেন?
ইশিগুরো : আমার বাবা-মা খ্রিষ্টান ছিলেন না। যিশুখ্রিষ্ট ঈশ্বর এই বিশ্বাস তাদের মধ্যে না থাকলেও এ বিষয়ে তারা খুবই বিন¤্র ছিলেন। এভাবে কোন উপজাতিও যদি তাদের অতিথি হতো তবে তারা তাদেরকে শ্রদ্ধা করতেন। আমার কাছে গাল্ডফোর্ডকে অন্য রকম মনে হতো। একটা গ্রাম্য, একান্ত অনাড়ম্বর এবং এক রঙা ছবির মত সবুজ। কোন খেলনাপাতি নেই। জাপানে মাথা ঘুরিয়ে দেয়ার মত ভাবমূর্তি বিরাজ করে। গাল্ডফোর্ড এ কিন্তু তেমনটা নয়। আন্টি মোলি নামে একজন ইংরেজ ভদ্রমহিলাকে মনে পড়ে। তিনি আমার জন্য একটি দোকান থেকে আইসক্রিম কিনে আনতেন। আমি আগে কখনো এ ধরনের দোকান দেখিনি। কাউন্টারের পেছনে শুধুমাত্র একটা লোক ছাড়া কেউ ছিল না। আমার মনে আছে ডবলডেকার বাসগুলো প্রথম কয়েকদিন চলেছিল। তা দেখে কিছুটা শিহরণ জেগেছিল। সরু রাস্তা দিয়ে বাসগুলোতে চড়তে হলে প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে উঠতে হতো।
প্রশ্ন : আপনি কি ছোটবেলায় বেশি পড়াশোনা করতেন?
ইশিগুরো : জাপান ত্যাগ করার ঠিক আগে সুপারহিরো নামে অভিহিত গেক্কোকামেন ছিল খুবই জনপ্রিয়। আমি বুকশপের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম এবং শিশুদের বইয়ের ছবি মনে করার চেষ্টা করতাম। তারপর আমি বাড়ি চলে যেতাম। আমার মা নিজের হাতে বইয়ের মত করে আমার পাতাগুলো সেলাই করে দিতেন। গাল্ডফোর্ডে একটি শিশু হিসাবে সম্ভবত শুধুমাত্র ইংরেজদের জিনিসগুলোর নাম আমি পড়েছিলাম এবং কমিকস শিখেছিলাম। ব্রিটিশ শিশুদের জন্য শিক্ষা সংক্রান্ত বই ছিল দেখ ও শেখ। কিভাবে ইলেক্ট্রসিটি ও সে ধরনের সাদামাটা বিষয় পড়ানো হতো। আমি বিষয়গুলোকে পছন্দ করতাম না। আমি তুলনা করতাম জাপানে যে জিনিসগুলো আমার পিতামহ আমাকে পাঠাতেন। সেগুলো বরং রঙহীন ছিল। নির্দিষ্ট জাপানি সিরিজগুলো সম্বন্ধে আমার মনে হয় এখনো অস্বস্তি আছে। দেখ ও শেখ, লেসনগুলো খুবই জীবন্ত সংস্করণ। ওটা হচ্ছে বড়সড় ডাইজেস্ট। এই বইয়ে কিছু কিছু বিশুদ্ধ আমোদপ্রমোদ, কমিকস, রঙিন অলঙ্করণকৃত গদ্যও আছে। একটা খুললেই সব ধরনের শিক্ষণের সরঞ্জাম বেরিয়ে আসতো। জাপানের বিখ্যাত বিখ্যাত চরিত্রগুলো সম্বন্ধে সচেতন ছিলাম জাপানের বইগুলোর মাধ্যমে। জাপান ত্যাগ করার পরও আমি জেমস বন্ডের জাপানি ভাষান্তর পছন্দ করতাম। তাকে জেমস বন্ড নামে অভিহিত করলেও তাকে আইয়্যান ফ্লেমিং কিংবা সিয়ান কোনারি’স জেমস বন্ডের মত ছিল। সে ছিল ম্যাংগনা কার্টার। আমি তাকে কিছুটা ইন্টারেস্টিং চরিত্র বলে ভাবতাম। সম্মানীয় ব্রিটিশ মিডিল ক্লাস চোখে জেমস বন্ডকে দেখা হতো মডার্ন সোসাইটির সব কিছুতে ভুল ধরার প্রতিনিধিত্বকারী হিসাবে। মুভিগুলো ছিল বিরক্তিকর। অশ্লীল ভাষায় ভরা। বন্ডে কোনো নৈতিক শিক্ষা ছিল না, কারণ লোকজনদের প্রহারের মাঝে তার ভদ্রচিত আচরণ ছিল না।
প্রশ্ন : স্কুলে থাকাকালে কি আপনি লেখালেখি করতেন?
ইশিগুরো : হ্যাঁ, আমি লোকাল স্টেট প্রাইমারি স্কুলে গিয়েছিলাম। সেখানে আমি মডার্ন টিচিং মেথড সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলাম। সেটা ছিল ষাটের দশকের মাঝামাঝি। সেখানে কোন নির্দিষ্ট লেসন শেখানো হতো না। ম্যানুয়াল ক্যালকুলেটিং মেশিন ব্যবহার করা হতো। মাটি দিয়ে গরু তৈরি করা কিংবা গল্প লেখা হতো। ওইগুলো ছিল আমাদের প্রিয়। আমরা ইচ্ছে করলে কিছুটা লিখতে পারতাম। প্রত্যেকের লেখাপড়ার সুয়োগ ছিল। তা উচ্চ কণ্ঠে পড়তেও পারা যেত। আমি মি. সিনিয়র নামে একটা চরিত্র সৃষ্টি করেছিলাম। ওটা ছিল আমার বন্ধুর স্কাউটমাস্টার। আমি ভাবতাম, একজন গুপ্তচরের নামের ক্ষেত্রে নামটা যথার্থ। আমি শার্লক হোমস থেকে অনেক কিছু জেনেছিলাম। একটি ভিক্টোরিয়ান ডিটেকটিভ থেকেও অভিজ্ঞতা অর্জন করি। ডেইলি মিরর খবরের কাগজের “ব্রিলিয়ান্ট চিলিং টেনসন” থেকে আমি বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করি।
প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন ওই সব অভিজ্ঞতা আপনাকে লেখক হতে সাহায্য করেছিল?
ইশিগুরো : ওই বইগুলো ছিল কৌতুকপ্রদ। আমার মনে হয় যে তারা যেন আমার সঙ্গে থাকতো। আমি মনে করি ওইগুলো থেকে একটি গল্প তৈরির করা যাবে না। ওইগুলো ছিল সহজ অনুষঙ্গের গল্প যা লোকজন অবসরের সময় পড়ে থাকে।
প্রশ্ন : ডিটেকটিভ গল্পের পর আপনি কী কাজ করেন?
ইশিগুরো : বিশ বছর পর্যন্ত শার্লক হোমস পড়ার পর আমি পড়া থামিয়ে দিয়ে রক মিউজিকের প্রতি আগ্রহী হই। আমি পাঁচ বছর বয়স থেকে পিয়ানো বাজাতাম। পনেরো বছর বয়সে আমি গিটার বাজাতে শুরু করি। তার আগে প্রায় বারো বছর বয়সে আমি পপ রেকর্ড শুনতে শুরু করি এবং তা শুনতে আগ্রহী হই। প্রথম রেকর্ড টম জোনসের “দ্য গ্রিন, গ্রিন গ্রাস অফ হোম” শুনে মুগ্ধ হই। ওটা ছিল কাউবয় সঙ। তেরো বছর বয়সে আমি বব ডিলানের জোন ওয়েসলি হার্ডি রেকর্ড ক্রয় করেছিলাম, ওটাই ছিল আমার প্রথম ডিলানের অ্যালবাম।
প্রশ্ন : ওটা আপনি পছন্দ করতেন?
ইশিগুরো : এক কথায় বব ডিলান হচ্ছে শ্রেষ্ঠ গীতিকার। আমি সুস্পষ্টভাবে জানতাম। দুটো জিনিসের প্রতি সব সময়ই আমার আস্থা ছিল। ওই সব দিনগুলোতে কোনটা ছিল ভালো লিরিক আর কোনটা কোনটা ছিল কাউবয় ফিল্ম। আমার ধারণা, ডিলানের সঙ্গে আমার প্রথম সম্পৃক্ততা স্ট্রেম অব কনসাসনেস কিংবা সুরেরিয়াল লিরিকস মাধ্যমে। আর আমি আবিষ্কার করেছিলাম লিওনার্ড কোহেনকে। তার গানগুলোতে সাহিত্যিক আবেদন খুঁজে পাই। তিনি দুটো উপন্যাস এবং কবিতা প্রকাশ করেন। আপনি গান লেখেন আপনার নিজের জন্য, তাদের কাছে গান করেন তাদের জন্য। আমি এই আবেদনটাকে ধারণ করেই গান লিখতে শুরু করি।
প্রশ্ন : আপনার প্রথম গান ছিল কোনটি?
ইশিগুরো : সেটা ছিল লিওনার্ড কোহেনের গানের মত। আমার যতদূর মনে পড়ে প্রথম লাইটি ছিল, “তোমার চোখ দুটো কি কখনোই আর খুলবে না উপকূলের যেখানে একদা বাসবাস আর খেলা করতাম তেমন করে।”
প্রশ্ন : সেটা কি একটা লাভ সঙ ছিল?
ইশিগুরো : ডিলান ও কোহেনের গানের আংশিক আবেদন যে ছিল তা আপনি আমার গান ধরতে পারবেন না। আপনি সংগ্রাম করেছেন নিজেই তার ব্যাখ্যা করতে। আপনি সর্বদাই মুখোমুখি হবেন যখনই আপনি সম্পূর্ণরূপে বুঝতে না পারবেন। আপনাকে সেগুলো বোঝার জন্য ভান করতে হবে। জীবনে প্রচুর সময় আছে। এক সময় যখন আপনি তরুণ ছিলেন এটাকে গ্রহণ করতে লজ্জা পেতেন। যাই হোক, তাদের গানগুলো সুস্পষ্টরূপে মূর্ত ছিল।
প্রশ্ন : কখন আপনি আবার প্লেনে চড়লেন উনিশ বছর বয়সে, কোথায় গিয়েছিলেন?
ইশিগুরো : আমি আমেরিকায় গিয়েছিলাম। প্রথম থেকেই সেখানে যাওয়ার কিছুটা বাসনা ছিল। আমি আমেরিকান কৃষ্টিকালচার সম্বন্ধে অজ্ঞাত ছিলাম। একটা বেবি প্রোডাক্ট কোম্পানিতে কাজ করে অর্থ জমিয়েছিলাম। আমি সেখানে বেবিফুড প্যাক করতাম এবং নষ্ট হয়েছে কিনা জানার জন্য “কোয়াডস আর বর্ন” ও “ক্যায়েসারেয়ান” নামের ৮ মিমি ফিল্মগুলো পরীক্ষা করতাম। ১৯৭৪ এর এপ্রিলে একটা ক্যানাডিয়ান প্লেনে চড়ে বসি। ওটা ছিল আমেরিকায় যাওয়ার সহজ পথ। আমি ভ্যাকুইভারে অবতরণ করি। মাঝরাতে গ্রেহাউন্ডের সাহায্যে সীমান্ত অতিক্রম করে আমেরিকায় পৌঁছি। আমি ইউনাইটেড স্টেটসে তিন মাস ছিলাম। প্রতিদিন আমি এক ডলার ব্যয় করে ভ্রমণ করতাম। ওই সময় প্রত্যেকের মধ্যে এসব বিষয়ে এক ধরনের রোম্যান্টিক আচার আচরণ বিরাজ করতো। আপনি রাতে কোথায় ঘুমাবেন কিংবা থাকবেন সে বিষয়ে চিন্তাভাবনা ছিল না। তরুণদের মধ্যে ওয়েস্ট কোস্ট ধরে হিচহাইকিং করার অভ্যাস গড়ে ওঠে।
প্রশ্ন : আপনি কি হিপ্পি ছিলেন?
ইশিগুরো : ধরুন, ভাসাভাসাভাবে ছিলাম, লম্বা চুল, গোঁফ, গিটার, পিঠে ঝোলাব্যাগ। পরিহাসের বিষয়, সবাই ভাবতাম আমরা ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র। আমি প্যাসিফিক কোস্ট হাইওয়ে ধরে লসঅ্যাঞ্জেলেস, সানফ্র্যান্সসিকো এবং নর্থদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার সব অঞ্চলে হিচহাইকিং করেছিলাম।
প্রশ্ন : আপনি কি এই ভ্রমণকাহিনী লিখেছেন?
ইশিগুরো : আমি ডায়েরি লিখতাম অন্য ধরনের গ্রন্থকারের আদলে, যা ঘটতো তা আমি প্রত্যেক দিন লিখতাম। বাড়িতে থাকাকালে ডায়েরিগুলো নিয়ে বসতাম। আমি প্রথম পুরুষের দুটো এপিসোডস লিখলাম। তার মধ্যে একটা ছিল সানফ্রান্সকিকোতে আমার গিটার চুরি সম্মন্ধে। ওই সময়ই প্রথমবারের মত আমি একটা আঙ্গিকে লেখার কথা ভাবতে শুরু করি। আমি কিন্তু এই অদ্ভুত আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারের টঙ্কার শব্দ ব্যবহার করেছিলাম আমার গদ্যে।
প্রশ্ন : কাউবয় অনুষঙ্গের মত কি?
ইশিগুরো : ওটার একটা ইকো ছিল, যা ছিল আমেরিকার বাচনভঙ্গির মত। আমার কাছে তা ছিল অনুত্তেজিত কিছু । আর শব্দগুলো ছিল মুক্ত অনুষঙ্গের।
প্রশ্ন : মনে হয় যেন এই ধরনের লেখা আপনার তরুণ বয়সকাল পর্যন্ত বলবত ছিল। আপনি কোন কিছুকে পছন্দ করে পরে সেটাকে অনুকরণ করেন। প্রথমে শার্লক হোমস, তারপর লেওনার্দো কোহেন, তারপর কেরোউয়াক।
ইশিগুরো : একজন কিশোর কিভাবে এটা শেখতে পারে। প্রকৃতপক্ষে গান লেখার একটা পরিমন্ডল থাকে। উপলব্ধি করেছিলাম যে আমি বেশি মাত্রায় অনুকরণ করছিলাম। যদি আমার বন্ধুরা ও আমি বব ডিলানের মত গিটার বাজিয়ে চলতাম তবে আমরা তার জন্য অবজ্ঞার পাত্র হতাম। আমার বন্ধুরা ও আমি এ বিষয়ে অতিমাত্রায় সচেতন ছিলাম যে আমরা ব্রিটিশ। আমরা প্রকৃতপক্ষে, আমেরিকান টাইপের গান লিখতে পারি না।
প্রশ্ন : আপনার জীবনীতে বলা হয়েছে যে আপনি ছিলেন একজন গ্রোউস বিটার।
ইশিগুরো : স্কুল ত্যাগ করার পর আমার প্রথম গ্রীষ্মকালে আমি বালমোরাল ক্যাসেলে কুইন মাদারের জন্য কাজ করেছিলাম। বালমোরাল ক্যাসেলে রাজকীয় পরিবার গ্রীষ্মাবকাশ কাটাতেন। ওই সমস্ত দিনে তারা স্থানীয় ছাত্রদেরকে গ্রোউস বিটার নিয়োগ করতেন। রাজকীয় পরিবার লোকজনকে তাদের এস্টেটে গুলি ছোড়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাতেন। কুইন মাদার ও তার অতিথিরা শটগান ও হুইস্কি নিয়ে ল্যান্ডরোভারে যেতেন এবং চাঁদমারীর স্থানে গুলিবর্ষণ করতেন। আমরা পনেরো জন মাঠ পেরিয়ে হাঁটলাম। প্রায় এক শত গজ দূরের জায়গাটি লতাগুল্মের অঞ্চল। লতাগুল্মের অঞ্চলে বুনোহাঁসেরা বাস করে। বুনো হাঁসগুলো আমাদের পায়ে আওয়াজ পেলে লাফাতে লাফতে পালিয়ে যায়। আমরা ওখানে পৌঁছালে বুনোহাঁসগুলো এক জায়গায় জড়ো হয়েছিল। কুইন মাম ও তার বন্ধুরা শটগান নিয়ে প্রস্তুত! প্রান্তরের চারপাশে আর কোন লতাগুল্মের বন ছিল না। তাই বুনো হাঁসগুলোর অন্য কোন লতাগুল্মের বনে উড়ে যাওয়ার উপায় ছিল না। তারপর গুলিবর্ষণ শুরু হলো তারপরেই আমরা পাশের মাঠটাতে হাঁটতে থাকলাম।
প্রশ্ন : আপনি কিকুইন মাদারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন?
ইশিগুরো : হ্যাঁ, প্রায় নিয়মিতই। একবার তিনি আমাদের কোয়ার্টার পরিদর্শন করতে এসেছিলেন। তখন সেখানে আমি একা ও অন্যান্য মেয়েরা ছিল। এটা ভীতিজনক ছিল। আমরা জানতাম না জগৎটাতে কী ঘটতে যাচ্ছে। আমরা যৎসামান্য আলাপ করার পর তিনি প্রস্থান করলেন। ওটা ছিল তা অনানুষ্ঠানিক আগমন। তাকে প্রায় প্রায়ই প্রান্তরে দেখা যেত। যদিও তিনি নিজে গুলিবর্ষণ করতেন না। আমার মনে হয় সেখানে প্রচুর পরিমাণে অ্যালকোহল ছিল।
প্রশ্ন : আপনি কি সেবারই প্রথম এমন জগতে ছিলেন?
ইশিগুরো : ওটাই ছিল শেষবারের মত এমন একটা জগতে।
প্রশ্ন : আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন কেমন ছিল?
ইশিগুরো : আমি কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ও ফিলোসোফি পড়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছরটা আমার কছে নিষ্প্রভ ছিল। রাজকীয় পরিবার থেকে বেবি- প্রোডাক্ট প্যাকিং করে মালগাড়িতে ভ্রমণ। এক বছর পর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আর এক বছর কাটিয়ে দিতে হবে। আমি গ্লাসগোর কাছের রেনফ্রিউ গিয়েছিলাম ছয় মাসের জন্য একটা হাউসিং এস্টেটে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে একটি কম্যুনিটি ওয়ার্কার হিসেবে কাজ করলাম। ওখানে যাওয়ার পর থেকেই সমুদ্রের ধারে আমাদের বসবাস। সাউদার্ন ইংল্যান্ডের একটি মিডিল ক্লাস পরিবেশে আমি বড় হয়ে উঠলাম। ওই এলাকাটা এক সময় ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কটিশ ভূখন্ডের অন্তর্গত ছিল, তবে ধীরে ধীরে ওখানকার শিল্পকারখানা ধ্বংস হয়ে যায়। বস্তুতপক্ষে, ওই সব হাউসিং এস্টেটের ভেতরে দুটোর বেশি রাস্তা ছিল না। তৃতীয় প্রজন্মের লোকগুলোর মধ্যে টেনশন ছিল। বাইরে থেকে আসা পরিবারগুলোর মধ্যে রাজনীতি পুরোমাত্রায় ছিল।
প্রশ্ন : ওখানে বসবাস করে আপনি কী অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন?
ইশিগুরো : আমি অনেক বড় হয়ে উঠলাম। আমি আমেরিকা ভ্রমণ করে অনেক অভিজ্ঞতা লাভ করি। স্কটল্যান্ড থেকে ফিরে বুঝতে পারলাম যে পৃথিবীর লোকজন সংগ্রাম করছে। এখানে প্রচুর ড্রিং ও ড্রাগস আছে। কিছু লোকের সাহসও আছে।
প্রশ্ন : তারপর আপনার লেখালেখির বিষয়ে কী বলবেন?
ইশিগুরো : ওই সময় মানুষ বইপত্র নিয়ে আলাপ করতো না। তারা আলোচনা করতো টিভি প্লে, থিয়েটার, সিনেমা, রক মিউজিক ইত্যাদি নিয়ে। সে সময় আমি মার্গারেট ড্রাব্বেলের লেখা জেরুজালেম দি গোল্ডেন বইটা পড়ি। ওই সময় থেকেই আমি উনিশ শতকের উপন্যাস পড়তে শুরু করি।
প্রশ্ন : আপনার লেখালেখিতে আপনি কখনোই বর্তমানের বিষয়গুলো নেই। আপনার লেখাতে আপনার নিজস্ব গল্পই উপন্যাসে উঠে এসেছে। জাপানের আবাস থেকে এসে ইংল্যান্ডে বেড়ে ওঠার কাহিনীই উপন্যাসে বিধৃত হয়েছে।
ইশিগুরো : ওইটাই আমি আপনাকে বলতে চাইছি।
প্রশ্ন : পেছন ফিরে তাকালে দেখতে পাই আপনার প্রথম প্রকাশিত ‘এ পেল ভিউ অফ হিলস’ উপন্যাসকে। এই উপন্যাস সম্বন্ধে আপনি এখন কী ভাবেন?
ইশিগুরো : আমি এটিকে খুব পছন্দ করি। কিন্তু আমি মনে করি এটা খুবই বিরক্তিকর। শেষ দিকটাও হতবুদ্ধিকর।
প্রশ্ন: আপনি কি সুচারুরূপে এই উপন্যাসটি সম্পন্ন করার জন্য চেষ্টা করেছিলেন?
ইশিগুরো : আসুন আমরা আলোচনা করি এ বিষয়ে পারস্পারিক বন্ধু হিসেবে। ‘এ পেল ভিউ অফ হিলস’ উপন্যাসের কথক একজন মধ্যবর্তী বয়সের বেশি মহিলা। তার যৌবনবতী মেয়ে আত্মহত্যা করে। এটাই এই উপন্যাসের শুরুতে বর্ণনা করা হয়েছে। আত্মহত্যার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একটা বন্ধুত্বের কথা প্রকাশ করতে গিয়ে ফিরে যেতে হয় দ্বিতীয় বিশ্বযদ্ধোত্তর নাগাসাকিতে। আমি ভাবলাম পাঠক এই উপন্যাসের মাধ্যমে নাগাসাকির কথা ভাববে। কেন আমরা নরকের কথা শুনেছিলাম? মহিলাটি কি অনুভব করেছিলেন তার মেয়ের আত্মহত্যার ঘটনায়? আমি আশা করেছিলাম পাঠকেরা উপলব্ধি করতে শুরু করবে যে তার গল্প তার বন্ধুর মাধ্যমে এগিয়ে যাবে।
প্রশ্ন : আপনি বলবেন রাইটিং প্রোগ্রাম আপনাকে কি একজন লেখক হতে সাহায্য করেছিল?
ইশিগুরো : আমি মনে করি, আমি চেষ্টা করেছিলাম একজন গীতিকার হতে, কিন্তু দ্বার উন্মুক্ত হলো না। আমি ইস্ট অ্যাঞ্জেলিয়া গেলে প্রত্যেকেই আমাকে উৎসাহিত করলো গল্প লিখতে। কয়েক জনের মধ্যে ম্যাগাজিনে গল্প প্রকাশ করতে সমর্থ হলাম। আমি একজন পাবলিশারের সঙ্গে আমার প্রথম উপন্যাস প্রকাশের চুক্তি করলাম। আর সেটাই আমাকে প্রকৃতপক্ষে লেখক হতে সাহায্য করে। আমি কখনোই অনুভব করিনি যে গদ্য লিখতে আগ্রহী হয়ে উঠবো। ম্যালকোম ব্রাডবারি’র পর আমার আর একজন গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শদাতা ছিলেন অ্যাঞ্জেলা কার্টার। তিনি আমাকে লেখালেখি সম্বন্ধে প্রচুর শিখিয়েছিলেন। এই ভদ্রমহিলা আমাকে দেবোরাহ রোজারস সঙ্গে পরিচয় করে দেন। তিনি আজও আমার এজেন্ট। আমাকে না বলেই অ্যাঞ্জেলা আমার স্টাফকে গ্রান্টাতে বিল বুফোর্ডের কাছে পাঠিয়েছিলেন।
প্রশ্ন: আপনার দ্বিতীয় উপন্যাস ‘অ্যান আর্টিসট অফ দি ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড’-এর অনুপ্রেরণা কোথা থেকে পেয়েছিলেন?
ইশিগুরো : ‘এ পেল ভিউ অফ হিলস’ এ একজন বৃদ্ধ শিক্ষক সম্বন্ধে একটা সাবপ্লট ছিল। আমি তাকে নিয়ে একটা উপন্যাস লিখতে মনস্থ করি। তারপর ‘দ্য রিমেইন্স অব দ্য ডে’ লিখতে শুরু করি। আমার ভাবনায় অ্যান আর্টিসট অফ দি ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড উপন্যাসের অনুপ্রেরণা কাজ করে। আপনি যখন তরুণ ছিলেন আপনি কি ভাবতেন কোন বিষয়ে আপনার ক্যারিয়ার গড়ে তুলবেন? আমি অনুভব করছিলাম যে আমি পুরো জিনিসটা আবার লিখতে চাই।
(আগামী সংখ্যায় সমাপ্ত)