কাঁচা সড়কে ধুলোর ঘূর্ণিগুলো পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে দুঃখ বুনছে। বাতাসের কণায় ভর করে শঙ্কাগুলো ছড়িয়ে পড়ছে মানুষের মনে, কোণে, বারান্দায় উঠোনে। অণু অণু ভালোবাসার স্থানগুলোয় অযথা অমূলক শঙ্কা দখল করে নিচ্ছে। ঘোড়াটা পা টেনে টেনে হাঁটছে, সড়কের দু’পাশে ফসলের মাঠ। দূরে বামে ডানে গায়ের বাড়িগুলি ছায়ার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে।
স্কুলের সময় হয়ে আসছে। ঘোড়ার লাগামে, ঢেউ খেলিয়ে দিলে সে বোঝে এখন দৌড়ে যেতে হবে। দৌড়ায় কিন্তু শরীর মন যেন সওয়ারির মন খারাপের ভাবটা তাকে চলতে দেয় না। যদিও বসন্তকাল। চারিদিকে রোদটা কেমন পোড়া পোড়া। এইতো জগৎজীবন, তাও আবার এমন করে ভেঙে ভেঙে চলা।
সাতচল্লিশে দেশ ভাঙলো। ভাঙবিতো ভাঙ তিন টুকরোতে দুই দেশ, হিন্দু-মুসলমান। এমনতো সবাই চায়নি। ব্রিটিশ লাটেরা কিযে এক অঙ্ক করে দ্বন্দ্বটা বাধিয়ে দিয়ে গেল। তখন অনিবার্যভাবে ভাগ ভাগতো ভাগ- তুই ভাগ তুই মুসলমান। ওপারে ক্লেদ নৈরাশ্য। ভাগ তুই হিন্দু। চলল হিংসা-দ্বেষ-ধাক্কাধাক্কি-ঘাম-রক্ত। এমন করে ক’দিন চললো তারপর সময়ে শান্ত হয়ে এলো। এই যে, জমিন, মানুষ, ফসল, ভানুদা- হরিশ, মিহির, ওসমান, আমি বাপ যে যার নামাজ পড়ে- যে যার পূজা করে। মারপ্যাঁচ নেই। কিন্তু কেমন করে ভেতরে ভিতরে কি যেন এক দহন ছড়িয়ে পড়ছে, এর ওর মধ্যে, হিংসা চোখে মুখে শূন্যতায়। সব ভালোবাসার ভাই, দাদা, জ্যাঠা, পিসি, মাসি, চাচা, খালা সরে সরে যায় এর কাছ থেকে, ওর মন থেকে। এই যে শোনা যাচ্ছে হাওডায় দাঙ্গাটা চলছে। এই শোনা যাওয়াটায় এখানে সেখানে হাড়ে হাড়ে ঠোকাঠুকি লাগিয়ে দিচ্ছে। আতঙ্ক শঙ্কা, বিরান শূন্যতায় ধেয়ে এসে কানে কানে বলে যায় রায়ট রায়ট। তখন তারা বলে শালারা যায় না ক্যানে, সেই চাইলিতো দ্যাশ, পালিতো তাহল্যে?
ঢং ঢং করে ঘণ্টা পড়ছে- স্কুলের অ্যাসেম্বলি। মনু এসে ঘোড়াটার লাগাম ধরে নিয়ে যায়। ছাত্ররা আদাব দেয়, সালাম দেয়, নমস্কার। ক্লাসে আজ মন নেই মনিরউদ্দীনের। মুর্শিদাবাদের রানীনগর থানায় একজনই বিএ পাস। কত মানুষ আসে দেখতে। কত সম্মান, বড় বড় চাকরির চিঠি আসে। তারপরও এই হাইস্কুলেই যেন তার ঠেকা। এই গ্রাম-মানুষগুলোর ভালো-মন্দ, এই নিচু জাত, জড়িয়ে থাকে নিত্যদিনের কর্মের মধ্যে। যাদের ছ্যা ছ্যা করে তাড়িয়ে দেয় তারা এসে বসে থাকে বাপের এই বৈঠক খানায়। জেলেরা মাছ ধরে বড় মাছটা দিয়ে যায়। মেয়েরা সারাদিন ধান শুকোয়, ধান ভানে। বিরাট বাড়ির বিরাট ওঠোন। বিরাট বৈঠক খানায় মেহমানদের সব ঠায়।
রায়ট হয়েছে হাওড়ায় তো এখ্যানে কিসের কি? মানিকলাল ময়লা কাপড়টা ঝেড়ে অধীর বাগচির গলায় পেঁচাতে পেঁচাতে বলে। মুখ বিগড়ে তাকায়- অধীর। শংকিত হয় মানিকলাল- বাবু কিছু ভুল বললেম নাকি? অধীর চোখ ফাটিয়ে বলে, রায়টটা হচ্ছে ক্যানে জানিস? না জেনে কথা বুলবিন্যা হারাম জাদা। গালি শুনে মানিক মিইয়ে যায়, এ্যা এ্যা করে। ভুল হলে মাফ চাই। গরিব মুখ্য সুখ্য মানুষ, নাপিতগিরি করে খাই। অত রাজনীতি কি বুঝি বাবু। শুধু বুঝি গন্ডগোলডা বড্ড ভয়ের। মানুষে ক্যানে মারামারি করে মরে। অধীর ধমকে উঠে- দাড়িটা সাফ কর ব্যাটা কথা কম বুল। মানিকের মনের মধ্যে একটা বাটখারা বসিয়ে দিলে মন ভার হয়ে পড়ে। সে অধীর বাবুর চামড়া টেনে টেনে খুর চালায় ভয়ে ক্লান্তিতে। না জানি কেটে গেলে যদি ধমকের শোধটা মনে করে। আড়লপাড়ার শেষ মাথায় এই সেলুন আর সুবলের চায়ের দোকান সামনাসামনি। মাঠের মধ্যে দিয়ে কাঁচা সড়ক সোজা কাতলামারির দিকে দৌড়ে গেছে। গায়ে দু’এক ঘর মুসলমান। তারা ভয়ে হিম হয়ে আছে। বাতাসে খরা বুকের মধ্যে বরফ। রাধা গোবিন্দপুরের বেশির ভাগই মুসলমান। কিছু নীচু শ্রেণীর হিন্দু অথচ নেই কোন ভেদ বিবাদ। ভয় মনে ভয় বাতাসে। যেমন দুটো গরুর গাড়ি সামনা-সামনি সংঘর্ষ হয় না, সড়কের এধার ওধার করে সাবলীল যে যার পথে যায়। কিন্তু কখনো কোন গরু বিনা কারণে পাশের গাড়ির গরুকে হিংসে করে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে গেল তো গেল। তখন শুধু গাড়োয়ানদের চিল্লাচিল্লি, মারামারির শেষ থাকে না। তেমনি করে যদি হঠাৎ সাবলীলতা ধ্বংসে পড়ে এই ভয়ে এ গাঁ ও গাঁয়ে আশংকারা বাড়ির বারান্দা, চৌকাঠে, জায়গা দখল করে বসে থাকে। জানি না কখন কার মগজ বিগড়ে বিষবাষ্প উগরে উঠে।
অধীর বাগচি দাড়ি চেছে উঠে- মানিককে ধমকে বলে- আয়নাটা ভালো করে মুছবি। চেয়ারেতো একপালা ধুলা লাগিয়ে রেখেছিস। আজ্ঞে বাবু বলে মানিক লাল একটু ফিক করে হেসে উঠে। অধীর কাকে যেন খিস্তি আওড়াতে আওড়াতে সুবলের চায়ের দোকানের দিকে চলে যায়। মানিক চেয়ার আর আয়নার ধুলো ঝাড়ে আর ভাবে ময়লাটাতো ঝাড়লেই যায়, কিন্তুক মনের মধ্যে যে ময়লা জমছে তার কি হবে। সে ময়লা ছাড়ায় কে?
রাধা গোবিন্দপুরের জহির উদ্দীনের বৈঠকখানায় মৌমাছির মতো একটা একটা করে লোক জড়ো হচ্ছে। কোন খবর থাকলেও লোক জমে না থাকলেও জমে। দায়তো এখন মুসলমানের। ওপার থেকে নদী পার হয়ে এ গাঁ হয়ে একটা, দুটো হিন্দু পরিবার আসে। এখন রায়টের গুজবে রোজই আসছে, কারো মুখে ঘৃণা, বিদ্বেষ। কেউ বলে এই চল্যা আসলাম। হাজার হলো নিজের দ্যাশ। সবাই আস্যা পড়ছে- তাই আমরাও আসলাম। এই সব কথা বার্তার মধ্যেও তেমন কোন বিভেদ হয় না। কেউ কেউ বলে- এই শালারা যায় না ক্যানে? কেউ মুখ চেপে ধরে ঐসব কথা বুলে নাখো। জহির উদ্দীনের বৈঠক খানায় একটা খবর এনে, গোফরান সবার মনটা খারাপ করে দেয়। গুজবের মতো খবরটা ডালপালা সাট করে গোটা গোবিন্দপুরে শুয়ে পড়তে থাকে। কারো মন দুঃখে ভরে যায়, কারো মনে জাগে জিহাদী জোস। আগে খবর লে। দেখ গিয়ে মনির মাস্টার আড়লপাড়ার মোড়ে বসে গল্প স্বল্প করছে। অত ভাবলে কি জীবন চলে। আড়লপাড়ায় মুসলমান নেই। তাছাড়া কেউতো এসে বললো না যে মাস্টারকে হেস্তনেস্ত করেছে। জহির উদ্দীনের নিত্য সঙ্গী আমিনুদ্দিন চেঁচিয়ে বৈঠক ফাটায়। ধমকায় কেউ আজে বাজে কথা বলবিনে। ত্যক্ত করবিনে কাউকে। গোফরান কি দেখেছে? কই গোফরান এদিকে আয়। গোফরান বুক চেতিয়ে আমিনুদ্দির কাছে এসে পড়ে। লোকজনের ভিন ভিনে কোলাহল ক্যাঁচর ম্যাচর ধীরেসুস্থে থেমে যায়- কাঁচা সড়কের পাশে ঘোড়াটা একা একা ঘাস খায়, মনির মাস্টার নাই। আড়লপাড়ার অধীর বাগচি তো আমাদের জহির দাদাগো- সাথে পঞ্চায়েত ভোটে হাইর্যা গেলছে- তো তারা যদি মনির মাস্টারকে ধইর্যা নিয়া মার্যা ফ্যালায়। চারদিকে যা সব শুনছি। আমিনুদ্দিন বলে, তাতে কি প্রেমান হয় যে, মনির মাস্টাররে ধইর্যা লিয়্যা গেলছে। না তা হয় না। সুবলের চায়ের দোকান তো- কাঁচা সড়ক থাক্যা দেখা যায় না। ঠাহর হয়। সেইখানে থাকলেও থাকতে পারে। খবরটা লেওয়া দরকার। আমিনুদ্দিন একবার ভেবে নেয়। এর মধ্যে পঞ্চায়েত জহির উদ্দীন বারান্দায় উঠে আসে। প্রাগৈতিহাসিক হাতল ওয়ালা একটা তেলাচিটচিটে কালো চেয়ারে বসে। তার চোখে মুখে হতাশা। গভীর বেদনা মুখাবয়বে ধুলোবালির মতো লেগে আছে যেন। সমবেত গায়ের মঈনুদ্দীন, আমিন, বিশু, নলিন, জমসেদ, ছামু বিশ্বাস সবার মুখের মলিন ভাবটা বেড়ে যাচ্ছে ক্রমশ; জহির কথা বলে না ক্যান, তার এক কথায় সবার সব দুঃখ একনিমেসে বাতাসে মুছে যেতে পারে অথবা চোখ দিয়ে তরল কেচোর মতো নদী নেমে যাবে। লম্বা কালো, অথচ মার্জিত এই লোকটার কথার উপর নির্ভর করছে- এই গাঁয়ে মুসলমানরা থাকবে না- পূর্ব পাকিস্তান চলে যাবে? যদি এই গায়ের মুসলমানরা চলে যেতে থাকে- তাহলে আশেপাশে দশ গাঁর একটা মুসলমানও টিকবে না। সুড় সুড় করে পিঁপড়ের মতো, লাইন ধরে চলে যাবে, পদ্মা নদীর ওপারে।
আমিন উদ্দীন ইতস্তত করে কথাটা তোলে- সবাই বলাবলি করছে মনির মাস্টার স্কুল থেকে ফেরত আসে নিই। ঘটনা কিছু শুনেছেন, এদিকে সাঁঝ নাইম্যা আসে। জহির উদ্দীন সমবেতদের দিকে ডানেবামে, সামনে দেখে নিয়ে মুখ খোলে- তোমরা কেউ একজনও হিন্দুদের গালি দিবা না, জোর দেখাবা না। কারণ, তাদের ভোটে আজ আমি পঞ্চায়েত প্রধান। তারা আমারে মান্যি করে ভোট দেয়।
গোফরান ভিড় ঠেলে সামনে এসে দাঁড়ায়, কিন্তু অধীর বাগচি তো আপনার কাছে হাইর্যা গেলছে। হিন্দুরাও ওরে ভোট দেয় না। জহির উদ্দীন বলতে থাকে, কিন্তু তোমরা দেখ অধীরের ভাই সুধীর কত ভালো মানুষ, তারে অধীর ভোটে দাঁড়াতে দেয় না। এর মধ্যে তোমরা ধর্ম, জাতপাত, খুঁজবা না। সাতচল্লিশে দ্যাশ ভাগ হলেও তো আমরা আছি। আত্মার আত্মীয় হয়েই তো আছি, বাতাসে কি গুজব ভাসে তার দিকে কান দিলে থাকতে পারবা না। তবে তোমাদের একটা প্রস্তুতি থাকাও দরকার। বলাতো যায় না যেকোন সময় পদ্মা পার হলেও হতে পারি। বাতাস কেমন উল্টো, বোঝাতো যায় না। মৌচাকের মতো ভিনে ভিনে শব্দটা গুঞ্জরিত হলো। কেউ কেউ হায় হায় করে উঠলো। মনির মাস্টারের ঘটনাটা আমি জানি, তবে খবর নাও সে এখন কোথায়। খবরদার কোন হুজ্জুতি করবা না। খারাপ কিছু ঘটলে আগে আমারে বুইলবা, কেউ লাঠি হাতে নিবানা বুঝলা। এই পর্যন্ত কথা জহির মোল্লা উঠে ভেতরে চলে গেল। আরো দু’একজন এসে বললো লাগাম ছাড়া, মাস্টার ছাড়া, ঘোড়াটা তারাও দেখেছে। সে খবর রটলো বিকাল পর্যন্ত। শেষে অন্ধকার গুলো গুটি সুটি মেরে খানা, খন্দে, ঝোপের আড়ালে, জমা হতে হতে গোটা পাড়ায় একটা অন্ধকার পর্দা চোখের সামনে দুলিয়ে দুলিয়ে ভীতি বাড়াতে লাগলো। মাগরিবের আজান হয়ে উঠেনি। এখানে সেখানে দলা পাকালো জটলা। গোফরান আমিনুদ্দিনের আঙিনায় এসে দাঁড়ায়- সাথে পাড়ার আট দশজন তরুণ যুবক। তারা সেখানে বসে কি শলাপরামর্শ করলো কেউ বুঝলো না, লোকজন দেখলো আট দশটা লাঠি বল্লম হাতে দশ বারোজন জোয়ান মুসলমান পাশের হিন্দুপাড়ার উদ্দেশ্যে অন্ধকার সাঁঝের মধ্যে অদৃশ্য হলো। পাড়ার নারী-পুরুষদের মাঝে আতংক ভীতি, ভয়, কোন্দল, রক্ত, মৃত্যু এইসব। এ বাড়ি ও বাড়ি করে গুঞ্জরিত সংলাপ ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। আরো, ক’জন কিশোর বৃদ্ধ হাতে লাঠি নিয়ে অন্ধকার মাঠের দিকে কিছুদূর এগুলো। জহির উদ্দীন এসবের কিছুই জানলো না, অথচ তার সিদ্ধান্তেই জন্মভূমির টান থাকবে না- শেকড় উপড়ে ফেলে মাটির বন্ধন ছেড়ে পদ্মা পার হয়ে পড়বে ওপারে। এই যুবকেরা কেন এমন সিদ্ধান্ত নিলো! আমিনুদ্দিন জানলেও কাউকে কিছু বললো না- শুধু পেছন পেছন লোক পাঠালো, মনিরের খবরটা তাড়াতাড়ি দেবার জন্য।
আড়লপাড়ার মোড়ে সুবলের চায়ের দোকানে তখন অন্ধকার ঘিরে ধরেছে। দুটো হারিকেন কেবল জ্বলে উঠেছে। আশেপাশে অন্ধকারগুলো ওঁৎ পেতে আছে- মনে হচ্ছে হারিকেনটা নিভে গেলে গপ করে দোকানটা গিলে খাবে। আলোকিত মুখে মনির উদ্দীন আছে, অধীর আছে, আরো দশ বারোজন হিন্দু-মুসলমান। আপোষ আর ভালোবাসার গল্পে হাসি ঠাট্টা জমে উঠেছে। তারপরও হাস্যোজ্জ্বল মুখগুলো কেমন ভয়ংকর লাগছে। তাদের ছায়াগুলো আলোর নড়া চড়াতে হেলে দুলে নাচছে। মনির কেবল মনে মনে যাওয়ার আয়োজনটা করেছে, ঘোড়াটাও এখন চায়ের দোকানের খুঁটিতে বাঁধা। এমন একটা সময়।
অন্ধকারের ভেতর কাদের যেন বিজ, বিজে, পা হাঁটার খস, খসে শব্দ চায়ের দোকানের কাছাকাছি এসে পড়ছে। মনির, অধীর, মানিক, নরেন, পরান, সুবল সবাই যখন মনের দূরত্ব দূর করে আমরা সবাই ভাই ভাই, এপাড়া ওপাড়া হিন্দু-মুসলমান, এক হয়ে থাকবো। কোন শংকা গুজবে কান দেব না, এমন একটা সমঝোতার মধ্যে দিয়ে চা খেয়ে, সময়ের মূল্যটা উসুল করে ফেলেছিল। ঠিক সেই সময় শব্দটা চায়ের দোকানের কাছে এসে পড়লো। কি জানি শংকায় মনির উদ্দীন ঝট করে দাঁড়িয়ে গেল। অধীর বাগচি গোটা গ্রামে যার একমাত্র টর্চ বাতি আছে, সেটা ফস করে মাঠের দিকে জ্বালিয়ে দিলো। তখন ভয়ংকর রাগান্বিত, গর্জনের মতো, হাত নিসপিসে লাঠিগুলো খাড়া খাড়া দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো। এক মুহূর্ত বুঝতে বাকি রইলো না মনিরের। তাকে খুঁজতেই গোফরানদের এই দুষ্কর্ম। ভিতরে ভিতরে নিজেকে দোষী সাব্যস্ত করে ফেললো মনির উদ্দীন। তারপর গর্জন করে উঠলো- এত বড়ো সাহস, তোদের কে বলেছে লাঠি ধরতে? আমাকে কি অধীর নীরেনরা ধরে রেখেছে। যা ভাগ এখান থেকে, দূর হো হারামজাদারা। এমন একটা অবস্থার মধ্যে অধীর, নরেন, মানিক সুবলসহ আরো জনা ছ’য়েক গ্রামবাসী নিজেদের মারাত্মক অপমানিত বোধ করলো আর ভাবলো, শালা মুসলমানরা লাঠি নিয়ে এই গাঁয়ে চলে এসেছে- এত বড় অপমান। ছি ছি ছি, এই দ্যাশ আমাদের আর আমাদেরই অপমান। অধীর ক্রুদ্ধতায় ফুঁসতে লাগলো। কিন্তু মনির মাস্টারকে সম্মান দেখায়, তাই মনে মনে দাঁত পিষে দাঁড়িয়ে রইল। মনির মাস্টারের ধমকানিতে গোফরানের দল বুঝলো তারা বিরাট ভুল করে ফেলেছে, তারা যে পরিস্থিতি আশা করে এসেছিল, ঘটনা ঠিক তার উল্টো। তাতেই অর্ধেক হতাশ হয়ে পড়েছিল। বশিরের ধমকে কারো কারো লাঠি হাত থেকে পড়ে গিয়েছিলো। কারো কারো হাতের লাঠিকে ছাগলের দাড়ি মনে হতে লাগলো অথবা মনে করলো আসলে তার হাতে লাঠি জাতীয় কিছু নেই। গোফরান কেঁদে উঠে ক্ষমা চাইতে লাগলো। মনির ভাই শুধু আপনাকে ভালোবাসি বুল্যা এভাবে আস্যা গেলছি। অধীর দাদা আপনারা কিছু মুনে লিয়েন না। আমরা এখনই চল্যা যাছি। আমরাও ইসব চাইন্যা।
ক্ষণিকের নিস্তব্ধতা। ক্ষণিকের একঝাঁক ঝিঁ ঝিঁ পোকার আতংকিত গান। দশ মনের মধ্যে দশ রকমের বিষ। হাত নিসপিস। যন্ত্রণা, ভুল, অপমান, হতাশা সময়টা সন্ধ্যা। বুকের মধ্যে নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে ঢুকে পড়ছিলো অন্ধকার। হঠাৎ বোধের পরিবর্তন শরীরের মধ্যে সমন্বয় না হওয়ায় কেউ কেউ হোঁচট খেয়ে ভারসাম্য রক্ষা করে চলছিল। হাতের লাঠির এক প্রান্ত ধরে অন্য প্রান্ত ছেচড়িয়ে নিয়ে চললো। যেন মৃত কোন সাপকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে তারা। মনির উদ্দীন অধীর বাবুকে বিষয়টা বোঝালো যে কতটা ভুল বুঝলে এই বাড়াবাড়িটা হয়ে যেতে পারে। পরিস্থিতি সবাই মোটামুটি ঠাহর করতে পারলেও কারো কারো অপমানে মন বেদনায় নীল হয়ে যাচ্ছিল। মনির মাস্টার সবার কাছে সবার হয়ে মাফ চেয়ে, ঘোড়ায় চেপে, সন্ধ্যার অন্ধকারের মধ্যে ইতস্তত বিশ্বাস নিয়ে, রওনা হয়ে গেল। ঘাটে এসে গোফরানরা নৌকা ডুবিয়ে দেওয়ায় মনটা একেবারে নাকানিচোবানি খেয়ে গেল কিনা। নিজের প্রতি মারাত্মক রাগ হলো। সে যদি স্কুল থেকে এসে এখানে বসার খবরটা কাউকে দিয়ে পাঠাতো, তাহলে কি এমন হতো? এসব ভাবার আর সময় নাই। গোফরানের দলটা সড়ক হয়ে গেলে হয়তো সামনে পড়ে যাবে। কিন্তু তারা গেছে জমির আল আর চষা মাঠ দিয়ে। লাঠিসোটা হাতে সাধারণত সড়কপথে কেউ যায় না। মনিরের আশংকার মধ্যে দেশ ছাড়ার প্রস্তুতিই বারে বারে ধাক্কা দিতে লাগলো। এভাবে যখন সে বাড়ির বৈঠক খানায় ঘোড়া থেকে নামলো তখন গায়ের অর্ধেক ছেলে-মেয়ে মানুষ জড়ো হয়েছে। তারা গোফরানের কাছে আগেই খবর পেয়েছে। আসলে ঘটনাটা কি? তাই কারো মনে অন্য কোন প্রশ্ন ছিল না- অথবা ভয় আতংক।
শুধু মনিরের মা এসে বললো বেটা দেরি করলি ক্যান। তোর বাপতো তোর লাগ্যা পেরেশান। জহিরউদ্দীন পঞ্চায়েতের কাছে গোফরানদের কীর্তির খবর এলো। রাগে গা-রিরি করলেও দলটার কোন টিকি খুঁজে পাওয়া গেল না। ভাটার মধ্যে ভুল করে আগুন লাগিয়ে তারা যেন দূরে বসে হা হুতাশ করে। যে আগুন নেভানোর দায় এখন নাগলের বাইরে। মনির উদ্দীনও কারো খোঁজ পেল না। শুধু বুঝলো দেশপ্রেম কাহাকে বলে, এখন কোন দেশকে ভালোবাসবে। মাঠে পড়ে আছে চষা জমি, কেউবা বীজ বোনে, কেউ ধান কাটার অপেক্ষায়। কোন মুসলমান তাঁতি হয়তো কেবল চরকায় সুতো জুড়েছে। অথবা চাষি খোলানে ধানের পালা দেওয়া শুরু করেছে। হঠাৎ করে যদি কোন হুকুম আসে তাহলে সবকিছু যাদুমন্ত্রের মতো, থমকে যাবে। তখন মানুষ বিহ্বল হয়ে যাবে। আর তাই কি হবে, কি হবে এমন রব উঠলো।
এরই মধ্যে পদ্মাপাড়ের ওপারে কেউ কেউ সম্পর্কের সূত্র তৈরি করে রেখেছিল, যদি হঠাৎ করে যেতে হয়। তাই জমি জিরাত বাড়ি ঘরের বিনিময়ের কথা বার্তাও হয়ে থাকে। যাতে হঠাৎ করে গেলে একটা ঠায়ে দাঁড়াতে পারে।
আড়ল পাড়ার হিন্দুদের মধ্যে অপমানটা রাগের আর অভিমানের শেকড় গজিয়ে তুললো এবং তা ছড়াতে শুরু করলো এ পাড়া ওপাাড়াতে। অধীর বাগচি ক্ষেপে গিয়ে গালাগালি দিয়ে লোক জড়ো করে ফেললো। অধীরের ভাই সুধীর বিষয়টা এভাবে না দেখে একটা মিটমাটের কথা তুললো এবং সবাইকে বিষয়টা হালকা করে নিতে তৎপর হলেও কাজ হলো না। অধীর জানিয়ে দিলো হয় যাবে না হয় কাসর ঘণ্টা বাজিয়ে দেয়া হবে। অধীর বাগচির ষন্ডা অনিল, সুনিলের দল মনে মনে তৈরি হলো- এবার দাদারা ছাড়। যা মোড়লগিরি করেছো করেছো, ওই হয়্যাছে। আপনি শুধু বুল্যা দেখেন, দু’চারড্যা ফেল্যা দিছি। অধীর অনিলের দিকে চোখ পাকিয়ে তাকালো- আমার কথার বাইরে কিছু করবিনে। আমি আগে শুধু জানবো তারা যাবে না থাকবে তারপর ব্যবস্থা হবে।
ঠাহর হয় না রাত না সুবহে সাদেকের দিকে। এমন একটা সময় গোবিন্দপুরের মসজিদে আমিন খালি গলায় আজান দিচ্ছে, আজানে মন নেই যেন। শুধু চোখ মাঠের দিকে চলে যায়। রাত থেকে একটা ভেজা বাতাস- মাঠের পাকা ধানের সাথে খেলা করছে না ধস্তাধস্তি করছে বুঝতে পারে না। রাতের অন্ধকার ফিকে করার জন্য আকাশের আলো কালোটাকে নীল করে দিচ্ছে। সময় সকালের দিকে গড়াচ্ছে- আজকের সকালটা যেন অন্য কোন সকাল। পাড়াটা পর পর হয়ে যাচ্ছে, যেখানে তার শেকড় পোতা। বড় হওয়া, কৈশোর যৌবন কাটানো। তার সে পাড়া আজ পর মনে হলো। ফজরের নামাজ শেষে জহির পঞ্চায়েত বললো। তোমরা ধীরে ধীরে আয়োজন কর। সম্পর্ক কর, চর এলাকার মুসা সরকারের সাথে যোগাযোগ কর, আতঙ্কের দরকার নাই। আমি অধীরের কাছে লোক পাঠিয়েছি। আমরা যাবো, তোমরা থাম, হুজ্জুতির দরকার নাই। মারামারি করে কার কত লাভ? সময় নিয়ে যাও, আমিও আসছি। মুসা সরকার তো আগে থেকেই আমাকে বলে আসছে, যেতে চাইলে বলেন সব বন্দোবস্ত কর্যা দিবো। মসজিদের মধ্যে হাউমাউ, উহু উহু, ফঁসফঁসানির রোল উঠলো। জহির বললো, যাবা না যাবা তোমাদের উপর ছেড়ে দিলাম। শুধু রাগটা আমার উপর। আমি চলে গেলেই সব ঝামেলা মিটে যাবে। তোমাদের প্রতি কারো কোন রাগ নেই। এই মোড়লগিরি ছেড়ে দিলেই সব ঠান্ডা। রায়টের গুজবে এ কথাটাও হয়তো ঠিক নয়। কথা হতে হতে সূর্যের ফ্যাকাসে আলোটা স্পষ্ট দগদগে রোদ হতে লাগলো। আমিন উদ্দীন, রিয়াজ সবাই বললো- আপনার উপর উছিলা করে তো আছি, আপনি না থাকলে আমরা কার উপর ভরসা করবো বুলেন- মিয়ারা আল্লাহর উপর ভরসা কর। যাবা না যাবা তোমাদের ইচ্ছা। আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। এইটা অধীর জানলেই সব ঠান্ডা হয়ে যাবে।
বেলা হতে না হতেই চারিদিকে রাষ্ট্র হয়ে গেল গোবিন্দপুরের মুসলমানেরা পাকিস্তান চলে যাচ্ছে। দলে দলে লোক কান্নার প্রস্তুতি নিয়েই যেন এসে পড়তে লাগলো। পাড়ার বিশ্বাস, কুমার, হাড়ি, ভাড় চাঁইয়েরা বিশাল উঠোন জুড়ে রোদের মধ্যে, কেউ ছাতা মাথায় শুয়ে বসে পড়লো। জহির দাদা যাবাতো যাবা আমাদের গায়ের উপর পা ফেলে যাবা। বলে হাও-মাও করে কেঁদে উঠলো। যে যা পারে চ্যাঁচায় বিলাপ করে, চোখে ছলছলে জল নিয়ে গল্প করে। জহির উদ্দীন সকলের উদ্দেশ্যে কথা বলে। এখনই যাচ্ছি না। তবে, কখন যাবো, কিভাবে যাবো সব জানতে পারবা। আমরা গেলে যদি এখানে কারো থাকতে অসুবিধা হয়, তাহলে সে আগেই চলে যাবা। নিজ দায়িত্বে যাবা। যা হয়েছে হয়েছে বিপদ আর নাই। তোমরা এখন যার যার বাড়িতে যাও। কান্না আর কথায় ভরে যাচ্ছিলো উঠোনটা, এখন সবাই এক এক করে বাইরের বৈঠক খানায় জড়ো হয়। কিজানি কি মনে করে আমিন উদ্দীন বৈঠক খানায় সবার সামনে শুয়ে পড়ে হা হা করে কান্নার রোল তুললো। সেই সাথে সাথে সবাই। যেন আমিনউদ্দীন মরে গেছে। গ্রামবাসী কাঁদছে। ডুকরে ডুকরে, কেউ কেউ বিলাপ করা শুরু করলো।
অধীর বাগচি খবর পাওয়ার পর প্রায় লাফিয়ে উঠেছিলো, গায়ের মধ্যে একটা উচ্ছ্বাস। চোখ মুখে সুধীর ঘৃণা ভরে প্রতিবারের সুরে গালি পাড়তে পাড়তে বলে- শালারা মুসলমানরা গেলে তাদের জমিগুলো দখল নিবি না কি? লাভের টাকা পকেটে পুরবিনে? সুধীরের সাথে অনেক যুবকই চাইলো না। ঘটনাটা ঠিক হলো না দাদা। অধীর প্রথমে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেও ভাই সুধীরের কথায় ধীরে ধীরে তার মধ্যেও একটা শূন্যতা কাজ করতে লাগলো। সুবলের চায়ের দোকানে দুঃখ আনন্দ দুটোই ছিল। তর্ক-বিতর্ক চলছিল সমানে। এসব কথা গল্পের মধ্যে অধীর একাই উঠে কোনদিকে যেন চলে গেল। দোকানের কেউ খেয়াল করলো না।
বৈঠক খানার সাথে লাগোয়া বৈঠক ঘরে বসে আছে অধীর, জহির উদ্দীন, আর মনির মাস্টার। আশাপাশে দু’একজন অধীরের আগমন লক্ষ্য করলেও জহিরের চোখ পাকানিতে আশাপাশে কেউ ভিড়লো না। দূরে কোন এক আঙিনায় দাঁড়িয়ে দলাপাকানো জটলা হতে লাগলো- ফিসির ফাসুর গুজ গাজ। জহির উদ্দীন ঝিম মেরে বসে ছিলো। অধীরের কথার পর মাথা তুললো- তোমরাতো দাদা তাই চেয়েছিলে তাই সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেললাম- জি দাদা, চেয়েছিলাম কথাটা মিথ্যা না- কিন্তুক সব কিছু বিবেচনা করে মনে হচ্ছে, কাজডা ভালো হলো না। জমিগুলো নিষ্ফলা পড়ে থাকবে, মানুষ হারায়ে যাবে। ঝগড়া করার লোকও থাকবে না- তাইলে বুঝো- কিন্তুক তোমারও করার কিছু নাই আমার ও নাই- বাতাসে বিষ। এই বিষ দিন দিন ছড়াবে, বিষাক্ত হয়ে রক্ত পড়বে সমালাবে কে? এই যে ধরো, আমি যাবার সিদ্ধান্ত নেবার আগে কি তুমি এমন কথা বুলেছ। আর সিদ্ধান্ত না নিলে তুমি কি আসতা? অথবা ধরো গোফরানের দল লাঠিও ফেলতো না। তোমার সুনিল অনিল ডঙ্কা বাজিয়ে দিতো। থামাতে পারতে সেই খুনোখুনি। ওইডা থামাতে আমাকে এইডা করতে হলো। অধীর শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
হ্যাঁ তবে ধীরে ধীরে যাই, তোমরা ধৈর্য রাখো। কিছু জমি না হয় তোমরা পাবা। শুনে অধীর জিভ কাটে- ছ্যা ছ্যা ছ্যা এইসব কি বুলেন। তবে দেখেন আরেকবার ভাবেন। আজ আর দেরি করবো না মনির মাস্টারের মতো- আমারে খুঁজতে আসলে আবার আরেক কেলেঙ্কারি। অধীর বাগচি ধুলাবালি মাখা পথ দিয়ে, ছায়াগুলো মাড়িয়ে, রাস্তা পাড়ের দিঘীতে মুখ দেখে দেখে, বিষণতাকে গালি দিয়ে, নিজেকে দোষী সাব্যস্ত করে, গাঁয়ে ফিরে গেল। পরদিন থেকে মানুষ মানুষের দিকে তাকায়, কাঁদে যাদের ধান কাটা হয়েছিল- তারা ধান বেচে দেয়। একজন দু’জন করে পদ্মার এ পাশটা দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে অজানা গন্তব্যে হাঁটা ধরে। গরু ছাগল, ছেলে-পুলে, ঘোড়ায় গাড়িতে মাল তুলে নদীর ধারে যেতে থাকে, পদ্মা পার হলেই তো অন্যদেশ অন্য মানুষ অন্য জমিন।
তারপর বাতাসের মধ্যে একটা ছেঁড়া ছেঁড়া ভালোবাসা ভাসতে লাগলো। ঘর ভাঙলো। ধানের গোলা, গরুর গোয়ালে শূন্য হলো। বাতাসে করুণ নীলচে অণু অণু কষ্ট, বিচ্ছেদ, ছিঁড়ে দুমড়ে ফেললো হৃদয়গুলো। ধান কাটা মাঠের মধ্যে দিয়ে বাতাস দৌড়ে এসে দুদ্দাড়ে ধাক্কা দিলো রায়ট রায়ট। পশ্চিম সীমান্তে যুদ্ধের সাজ সাজ রব। আগে পালিয়ে বাঁচ, তারপর দাঁড়ানো। কেউ দাঁড়াচ্ছে না- চোখের পানিতে পদ্মা ভরে না শুকায়। মনির উদ্দীন মাস্টার স্কুলে ইস্তফা দিয়েছে। সেখানে তার বিদায় সংবর্ধনা হয়ে গেছে। হ