রবীন্দ্রনাথ আমাদের অস্তিত্বের উজ্জ্বল উচ্চারণ। আমাদের সংকটে ও বিপর্যয়ে রবীন্দ্রনাথ আমাদের নির্ভরতম আশ্রয়। আধুনিক বাঙালি সংস্কৃতির তিনি নির্মাতা ও মুকুটমণি। বাঙালিকে তিনি বিশ্বের দুয়ারে গর্ব ও গৌরবের আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। আমাদের প্রাণের স্তরে স্তরে তাঁর দানের মাটি সোনার ফসল তুলে ধরে তিনি আমাদের দিয়েছেন গর্ব, গৌরব ও ঐশ্বর্য। আমাদের ভাষা ও সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং আমাদের জাতিসত্তার প্রাণস্পন্দন তার মধ্যে অনুভূত হয় বলেই তিনি আমাদের মহাকবি।
রবীন্দ্রসাহিত্য যতবার পড়ি ততবারই আমাদের কাছে নতুন বলে মনে হয়। ভাবের গভীরতা, অনুভূতি, তীক্ষèতা, বাণীবিন্যাস ও শিল্পসৌকর্যের ঔজ্জ্বল্যে এবং বৈশ্বিক অভিব্যক্তি ও চিরন্তন আবেদনে তাঁর সৃষ্টি মহিমার আমরা বিস্মিত হই।
রবীন্দ্রনাথ বলেছেন-
১. আমি পৃথিবীর কবি
২. আজ আমার প্রণতি গ্রহণ করো, পৃথিবী
এ রবীন্দ্রনাথকে আমরা যদি অসীম অনন্তলোকে, নক্ষত্রলোকে উড়িয়ে দিয়ে তৃপ্তি লাভ করি তবে তার প্রতি যেমন অবিচার করা হবে, তেমনি আমাদেরও ক্ষতি হবে। কারণ আজকাল একদল রবীন্দ্রনাথকে শুধু অধ্যাত্মতত্ত্বের কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছে।
আমাদের সাহিত্যে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারা চলে আসছে, তা হলো ‘রজকিনী প্রেম নিকষিত হেম, কামগন্ধ নাহি তায়’ এবং ‘কাণুবিনে গীত নাই’। এ ছাড়াও কোথাও ‘তুমি-আমি’ থাকলেই একে জীবাত্মা ও পরমাত্মা এবং ঐশ্বরিক সত্তায় ভরপুর করে তুলতে হবে। শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন কাব্যের কোথায় কী ঐশ্বরিক সত্তা এবং জীবাত্মা ও পরমাত্মার প্রবল প্রচন্ড আকর্ষণ রয়েছে তা আমি খুঁজে পাইনি। বরং এর মধ্যে রয়েছে গ্রাম্য বর্বরতা, অমার্জিত আচরণ ও সন্ত্রাসী দেহ সম্ভোগ। কাব্যটি থেকে রাধাকৃষ্ণের নাম বাতিল করে দিলে দেহসর্বস্বতা এবং গ্রাম্য স্থূলতাই প্রকাশ পেয়েছে। একই কথা বলা যায় ভারতচন্দ্রের ‘বিদ্যাসুন্দর কাব্য’ প্রসঙ্গে। এ কাব্যে আদিরসের ফোয়ারা ও উৎকট স্থূল দেহসম্ভোগ ছাড়া আধ্যত্মিক বা ঐশ্বরিক সত্তার কোনো নামগন্ধও নেই। তবে এ সমস্ত কাব্যে যেহেতু দেব-দেবীদের নাম ও বন্দনা আছে এবং রাধাকৃষ্ণের লীলাকীর্তন আছে তাই এগুলো জীবাত্মা ও পরমাত্মার আধার ঐশ্বরিক অভিধার মর্যাদায় উন্নীত বলে গণ্য করা হয়।
ভক্তিরসে নিমজ্জিত ভক্তেরা শৃঙ্গার রসকে মধুর রস বা শান্ত রস বলেছে। এবং তারা আরো বলেছে যে, এই শৃঙ্গার রস আস্বাদনের মাধ্যমেই ঈশ্বরের সান্নিধ্য পাওয়া যায়। কিন্তু আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে কোনো নর-নারী যখন শৃঙ্গারের চরমে ওঠে তখন তাদের মধ্যে ভক্তিরস থাকে কি-না সন্দেহ।
আমার বাসায় মাঝে মাঝে একজন রবীন্দ্রভক্ত আসেন। তিনি এতই রবীন্দ্রভক্ত যে, রবীন্দ্রনাথের কোন সমালোচনাই তিনি সহ্য করতে পারেন না। রবীন্দ্রকাব্যের যেখানেই ‘তুমি আমি’ আছে সেখানেই তিনি জীবাত্মা ও পরমাত্মা এবং অলৌকিক সত্তার আভাস খুঁজে পান।
তিনি রবীন্দ্রসাহিত্য কোথাও মানবিক প্রেম বা দৈহিক প্রেমে আবেগ ও উষ্ণ পরশ খুঁজে পান না। রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন, ‘আমাকে তোমরা ফুল ও ধূপ দিয়ে আচ্ছাদিত করে রেখো না’। কবি নিজেকে বলেছেন-‘আমি পৃথিবীর কবি’। এবং আরো বলেছেন- ‘আমি ভালোবেসেছি এই জগৎকে, আমি প্রণাম করেছি মহৎকে, আমি কামনা করেছি মুক্তিকে, যে মুক্তি পরম পুরুষের কাছে আত্মনিবদনের, আমি বিশ্বাস করেছি মানুষের সত্য সেই মহামানবের মধ্যে যিনি সদা হৃদয়ে সন্নিবিষ্ট।…আমি এসেছি এই ধরণীর মহাতীর্থে- এখানে সর্বদেশ, সর্বজাতি ও সর্বকালের ইতিহাসের মহাকেন্দ্রে আছেন নরদেবতা- তারই বেদিমূলে নিভৃতে বসে আমার অহংকার আমার বেদবুদ্ধি ক্ষালন করবার দুঃসাধ্য চেষ্টায় আজও প্রবৃত্ত আছি’।
এই রবীন্দ্রনাথকে এই অন্ধভক্তেরা মাটি ও মানুষের এবং পৃথিবী থেকে আড়াল করেই শুধু তৃপ্ত নন, তাকে আকাশে তুলে দেবতা বানিয়ে, স্বর্গে তুলে ছেড়েছেন। সারা জীবন রবীন্দ্রনাথ স্বর্গের কথা নয়, পৃথিবীর কথাই বেশি বলেছেন।
এ বিশ্বের ভালোবাসিয়াছি
এ ভালোবাসাই সত্য, এ জন্মের দান।
বিদায়কালে
এ সত্য অম্লান হয়ে মৃত্যুর করিবে অস্বীকার।
‘প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর’ এখানে প্রচন্ড আবেগভরে মিলনের চেয়ে নিষ্কাম প্রেম ও আধ্যাত্মা চিন্তা কোথা! ‘সাহিত্য ভাবের বিষয়’ এই সার্টিফিকেট পেয়ে ব্যাখ্যাকর্তারা মুহূর্তে সবকিছুই প্রয়োজনে উজানে ও ভাটিতে ভাসিয়ে দিতে পারে। কোনো কবি কাউকে ভালোবেসে যখন বলে-
তোমার ছবি ধ্যানে প্রিয় দৃষ্টি আমার পলক হারা
তোমার ঘরে যাবার যে পথ পা চলে না সে পথ ছাড়া
হায় দুনিয়ার সবার চোখে, নিদ্রা নামে দিব্যি সুখে
ঘুম কি গো নাই আমার চোখে দগ্ধ হলো নয়ন তারা।
এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণেও বলা হবে যে, এ আধ্যাত্মিক তত্ত্বের কথা। স্রষ্টাপ্রেমের শারাব পানে মত্ত হয়ে এই ভাব প্রকাশ পেয়েছে। তারা বলে সৃষ্টিকর্তা নিরাকার, তার ছবি কল্পনা করা মহাপাপ কিন্তু এখানে সৃষ্টিকর্তার ছবি ধ্যান মেনে নিতেও তাদের আপত্তি নেই। নজরুলের একটি রাগপ্রধান গান এখানে উল্লেখ করছি।
অঞ্জলি লহ মোর সংগীতে
প্রদীপ শিখা সম কাঁপিছে প্রাণ মম
তোমারে সুন্দর বন্দিতে সঙ্গীতে।
তোমার দেবালয়ে কি সুখে কি জানি
দু’লে দু’লে ওঠ আমার দেহখানি
আরতি নৃত্যের ভঙ্গিতে সঙ্গীত সঙ্গীতে।
পুলকে বিকশিল প্রেমের শতদল
গন্ধেরূপে রসে টলিছে টলমল
তোমার মুখে চাহি আমার বাণী যত
লুটাইয়া পড়ে ঝরা ফুলের মত
তোমার পদতল রঞ্জিতে সঙ্গীতে সঙ্গীতে।
এ গানটি অভিব্যক্তি ও চিত্রকল্পে দৈহিক আবেদনের উষ্ণ আবেগ উচ্চকিত হয়ে কামনায় সিক্ত। গানটি কবির পূজারিণী, অনামিকা ও মাধবী প্রলাপের আমেজের গন্ধে বিভোর। কিন্তু কেউ কেউ এ গানটিকে আধ্যাত্মিক তথা তুরীয় মার্গের উত্তুঙ্গে উড়িয়ে দিয়ে গর্ব বোধ করেছেন। আমার জিজ্ঞাসা কোনো এক বিস্ফোরক দুরন্ত দেহলিকে নিয়ে এ গানের আবেদন আমাদের মনকে সংস্পর্শ করবে না কেন? রবীন্দ্রনাথের বাল্যজীবন, যৌবন, মধ্যাহ্ন এমনকি প্রান্তিক জীবনও দৈহিক ভালোবাসার উষ্ণ আবেগের অভিব্যক্তিতে রসসিক্ত। এ রবীন্দ্রনাথ যখনই তার কাব্যে ‘তুমি আমি’ বলেছেন তখনই রবীন্দ্রভক্তেরা বলেছেন, এ তুমি-আমি’ হচ্ছে ‘রাধা-কৃষ্ণ’, ‘জীবাত্ম ও পরমাত্মা’, ‘ঈশ্বর ও মানুষ’। কিশোর বয়সে লেখা কবির ‘ভগ্নহৃদয়’ কাব্যের একটি কবিতা এখানে উপস্থাপন করছি-
উপহার
শ্রীমতী হে…
১
হৃদয়ের বনে বনে সূর্যমুখী শত শত
ওই মুখপানি চেয়ে ফুটিয়ে উঠেছে যত।
বেঁচে থাকে বেঁচে থাক শুকায় শুকায় যাক,
ওই মুখপানে তারা চাহিয়া থাকিতে চায়।
বেলা বসান হবে, মুদিয়া আসিবে যবে
ওই মুখ চেয়ে যেন নীরবে ঝরিয়া যায়।
২
জীবন সমুদ্রে তব জীবন তটিনী মোর
মিশায়েছি একেবারে আনন্দে হইয়ে ভোর।
সন্ধ্যার বাতাস লাগি ঊর্মি যত উঠে জাগি
অথবা তরঙ্গ উঠে ঝটিকায় আকুলিয়া
জানে বা না জানে কেউ জীবনের প্রতি ঢেউ
মিশিবে- বিরাম পাবে- তোমার চরণে গিয়া।
৩
হয়তো জানো না, দেবি অদৃশ্য বাঁধন দিয়া
নিয়মিত পথে এক ফিরাইছ মোর হিয়া।
গেছি দূরে, গেছি কাছে, সেই আকর্ষণ আছে,
পথভ্রষ্ট হই না’ক তাহারি অটল বলে।
নহিলে হৃদয় মম ছিন্ন ধূমকেতু-সম
দিশাহারা হইত সে অনন্ত আকাশতলে!
৪
স্নেœহের অরুণালোকে খুলিয়া হৃদয় প্রাণ
এ পাড়ে দাঁড়ায়ে, দেবী, গাহিনু যে শেষ গান
তোমারি মনের ছায় সে গান আশ্রয় চায়-
একটি নয়ন জল তাহারে করিও দান।
আজিকে বিদায় তবে আবার কি দেখা হবে-
পাইয়া স্নেহের আলো হৃদয় গাহিবে গান?
এবার আসা যাক ‘শ্রীমতি হে…’ প্রসঙ্গে। নাম উল্লেখ নেই, তবে এই ‘শ্রীমতি হে’- কে? প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় আমাদের জানিয়েছেন-
‘আমি ইন্দ্রিরা দেবীর নিকট শুনিয়াছি, ‘কাদম্বরী দেবীর কোনো ছদ্মনামের আদ্যক্ষর। তাহার ডাকনাম ছিল ‘হেকেটি’। ইনি প্রাচীন গ্রিকদের ত্রিমুখী দেবী। অন্তরঙ্গেরা রহস্যাচ্ছলে এই নামটিতে ডাকতেন। কাদম্বরী দেবীর নারীহৃদয় ত্রিদেবীসংগমক্ষেত্র ছিল। কবি বিরাহীলালকে প্রদ্ধা, স্বামী জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে পতি ও দেবর রবীন্দ্রনাথকে ¯েœহ দ্বারা তিনি আপনার করিয়া রাখিয়াছিলেন। সেই জন্য অন্তরঙ্গ আত্মীয়রা বলিতেন ত্রিমুন্ডী ‘হেকেটি’। এই নারীর স্নেহ ও শাসন রবীন্দ্রনাথের যৌবনকে সুন্দরের পথে চালিত করিয়াছিল এবং পরবর্তীকালে তাহারই পবিত্র স্মৃতি ছিল তাহার জীবনের ধ্রুবতারা’। (রবীন্দ্রজীবনী, ২ম খন্ড, পৃ.১১২)
রবীন্দ্রনাথ নিজেও বলেছেন: ‘ভগ্নহৃদয় লিখতে আরম্ভ করেছিলেম তখন আমার বয়স আঠারো। বাল্যও নয়, যৌবনও নয়। বয়সটা এমন একটা সন্ধিস্থলে যেখান থেকে সত্যের আলো স্পষ্ট পবার সুবিধা নেই। একটু একটু আভাস পাওয়া যায় এবং খানিকটা ছায়া। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ভক্তেরা তা মানবেন ক্যানো- তিনি রবীন্দ্রনাথ- তিনি যে কবিগুরু। তাঁর পক্ষে কি ঈশ্বরকে বাদ দিয়ে মানুষকে ভালোবাসা সম্ভব! তাই রবীন্দ্রনাথ কাউকে ভালোবাসার কথা বললেই ব্যাখ্যাকর্তারা বুঝিয়ে দেন এ ঐশ্বরিক ভালোবাসা। তোমার আমার মিলন হলে অথবা ‘তুমি আমি’ থাকলেই বুঝতে হবে এ মানবিক নয়, ঐশ্বরিক অথবা জীবাত্মা ও পরমাত্মর লীলা। কিশোর রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন-
তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা।
এ সমুদ্রে আর কভু হব নাম পথহারা!
যেথা আমি যাইনাকো, তুমি প্রকাশিত থাকো।
আকুল এ আঁখি ‘পরে ঢাল’ গো আলোকধারা।
ও মু’খানি সদা মনে জাগিতেছে সঙ্গোপনে
আঁধার হৃদয় মাঝে দেবীর প্রতিমা পারা।
কখনো বিজথে যদি ভ্রমিতে চায় এ হৃদি
অমনি ও মুখ হেরি শরমে সে হয় সারা।
চরণে দিনুগো আজি- এ ভগ্ন হৃদয় খানি
চরণ বহিবে তব এ হৃদি শোণিত-ধারা।
(উপহার : ভগ্নহৃদয়)
গীতবিতানে একে উল্লেখ করা হয়েছে ব্রহ্মসঙ্গীত হিসেবে। ভগ্নহৃদয়ের উপহার পর্বের এই অংশটুকুকে ব্রহ্মসংগীত নয়, মানবিক প্রেমের আকার হিসেবে ধরে নিতে আপত্তি কোথা? ভগ্নহৃদয়ের এ উপহার আসলে কাদম্বরী দেবীকে। ‘ভগ্নহৃদয়ে’র এ গানটির ওলট-পালট ব্যাখ্যা দিয়ে মুহূর্তে সব তছনছ করে যতোই ঐশ্বরিক সত্তা আরোপ করা হোক না, আসলে এ গানটিতে মানবিক সত্তার ঔজ্জ্বল্যই প্রকাশ পেয়েছে। আঠারো বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ ভগবৎ প্রেমে নিবেদিত হবার চেয়ে মানবিক প্রেমের আসক্তিতে উচ্চকিত থাকারই কথা এবং এখানে তার মনে প্রাণে ও চোখের সামনে কাদম্বরী দেবীর উপস্থিতিটাই বেশি বাস্তব ও উজ্জ্বল।
এক শ্রেণি রবীন্দ্রনাথকে কোনমতেই মানবিক প্রেমের কেন্দ্রানুগ রাখতে নারাজ। তবে তারা রবীন্দ্রনাথকে যতো আকাশে উড়িয়ে দিতে লাফালাফি করুন না কেন- এই দেবী কাদম্বরী। ঠাকুরবাড়ির অনেক কিছুই এখনো আমাদের কাছে অজানা এবং রহস্যময়। তবু ঠাকুরবাড়ির দুর্ভেদ্য ও দুর্বোধ্য প্রাচীরের রন্ধ্র দিয়ে কিছু কিছু অজানা সংবাদ আমাদের কানে এসে যায়। এ বিষয়ে দুঃসাহসী ভূমিকা পালন করেছেন অধ্যাপক জগদীশ ভট্টাচার্য।
কাদম্বরী দেবী ও রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কটি যতই শারীরিক গন্ধবিহীন বলা হোক না এবং কাদম্বরীকে যতই দেবী স্থানীয়া, মাতৃআসনে অধিষ্ঠিত করা হোক না কেন, রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন কবিতার ঘ্রাণেই মৌ মৌ করে যে দেবী বা মাতৃমূর্তির মৃত্তিকার রং ফিকে; বরং প্রেমে উন্মত্ত রবীন্দ্রনাথের আকুতিই প্রকাশ পেয়েছে তাঁর বিভিন্ন কবিতা ও স্মৃতিলেখায়। চৌদ্দ বছরের বালক রবীন্দ্রনাথ আর ষোড়শী কাদম্বরীর মধ্যে শারীরিক গন্ধবিহীন ঈশ্বর ঈশ্বর যে খেলা চলেছিল তা নেহায়েত নিরেট বাস্তবজগৎ বহির্ভূত বোকা ছাড়া কে বিশ্বাস করবে? কী প্রলাপ প্রবচন: মাতৃহীন রবীন্দ্রনাথের মাতৃস্থান দখল করেছিল কাদম্বরী! রবীন্দ্রনাথ যখন ‘সন্ধ্যাসঙ্গীত’ লিখেন তখন তার বয়সটা পাঠকের অজানা নয়। এ কাব্যের ‘উপহার’ কবিতাটি প্রেমপিপাসু এক বালকের আত্মমন্থন। কবিতার কিছু অংশ এখানে উপস্থাপন করছি-
একবার শুধু চেয়েছিলে,
স্তরে স্তরে হৃদয় হয়ে গেল অনাবৃত,
হৃদয়ের দিশি দিশি হয়ে গেল উদঘাটিত,
একে একে শত শত ফুটিতে লাগিল তারা,
… …
আগে কে জানিত বল কত কি লুকান’ ছিল
হৃদয়-নিভৃতে,
তোমার নয়ন দিয়া আমার নিজের হিয়া
পাইনু দেখিতে।
বালক রবীন্দ্রনাথ সব সময়ই ঈশ্বরকে নিয়েই ভাবতেন এমন কথা বলা যায় না- এ বয়সে একজন তরুণীর কথা ভাবাই স্বাভাবিক কিন্তু ভক্তেরা তা মানবেন কেন?
আমাদের জীবনে পরাজয় বেশি। শুধু তাই নয়- রুদ্র ও ভয়ঙ্করের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার প্রবণতাও আমাদের কম। সুতরাং পরাজয় ও ব্যর্থতার কাছে আত্মসমর্পণ করে, অলৌকিক সত্তার কাছে নিজকে নিমজ্জিত করে দেয়ার মধ্যেই আমাদের প্রশান্তি। হয়তো ভক্তরা মনে করে অলৌকিক সত্তা ছাড়া অন্য কারো ধ্যানে মগ্ন হওয়াও মহাপাপ। কাজেই ‘তোমার ছবি ধ্যানে প্রিয়..।
এখানে প্রেমিক-প্রেমিকার ধ্যানে মগ্ন- তাই স্বাভাবিক কিন্তু না একে মরমিতত্ত্বের বৃত্তে বন্দি না করলে স্বস্তি কোথায়? তাই তাত্ত্বিকদের ব্যাখ্যায় এখানে প্রকাশ পেয়েছে সৃষ্টি ও স্রষ্টার আকুতি। ‘নৃত্যনাট্য মায়ার খেলায়’ শান্তর বেদনার্ত হৃদয়ের আর্তনাদ-
আমার পরান যাহা চায়, তুমি তাই, তুমি তাইগো।
তোমা ছাড়া আর এ জগতে মোর কেহ নাই, কিছু নাই গো।
তুমি সুখ যদি নাহি পাও
যাও সুখের সন্ধানে যাও-
আমি তোমারে পেয়েছি হৃদয় মাঝে
আর কিছু নাহি চাই গো।
আমি তোমার বিরহে রহিব বিলীন
তোমাতে করিব বাস
দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী, দীর্ঘ বরষ মাস।
যদি আর- কারে ভালোবাস,
যদি আর ফিরে নাহি আস,
তবে তুমি যাহা চাও তাই যেন পাও-
আমি যতো দুঃখ পাইগো।
এখানে কোথায় ভক্তিরস ও ভগবৎ প্রেম প্রকাশ পেয়েছে তা আমার অনুভব ও উপলব্ধির সীমানার বাইরে। জীবনের শেষপ্রান্ত পর্যন্ত কাদম্বরী রবীন্দ্রনাথের চোখ ও হৃদয়ের বাইরে অনুস্থিত ছিলো একথাও বলা যায় না। বরং এই কাদম্বরীর উজ্জ্বল উপস্থিতি রয়েছে বহু নামে, বহু বেশে রবীন্দ্ররচনায়। ‘মানস সুন্দরী’ কবিতায় কোথায় যে কিভাবে অতন্দ্রিগ্রাহ্যতা তা বুঝা যায় না অন্তত পক্ষে সমস্ত কবিতাটি তাই প্রমাণ করে। সমস্ত কবিতাটিই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যের ঘ্রাণে ও স্পর্শে সিক্ত। আমি কবিতাটি হতে কিছু উদ্ধৃতি উপস্থাপন করছি:
১. আজ শুধু কুঞ্জন গুঞ্জন
তোমাতে আমাতে, শুধু নীরবে ভুঞ্জন
এই সন্ধ্যা কিরণের সুবর্ণমদিরা-
যতক্ষণ অন্দরের শিরা উপশিরা
লাবণ্য প্রবাহভরে ভরি নারছি উঠে,
যতক্ষণ মহানন্দে নাহি যায় টুটে
চেতনা বেদনাবদ্ধ, ভুলে যাই সব
কী আশা মিটেনি প্রাণে, কী সঙ্গীত রব
গিয়েছে নীরব হয়ে, কী আনন্দসুধা
অধরের প্রান্তে এসে অন্তরের ক্ষুধা
না মিটিয়ে গিয়েছে শুকায়ে।
রবীন্দ্রভক্ত আর ব্যাখ্যাকর্তারা ‘মানস সুন্দরী’কে তুরীয় মার্গে নিয়ে গেছেন। অথচ এ কবিতায়ই আছে-
অন্তর কেবল
অঙ্গের সীমান্ত প্রান্তে উদ্ভাসিয়া উঠে
এখনি ইন্দ্রিয়বন্ধ বুঝি টুটি টুটি।
চুম্বন মাগিব যবে ঈষৎ হাসিয়া
বাকায়োনা গ্রীবাখানি, ফিরায়োনা মুখ,
উজ্জ্বল রক্তিম বর্ণ সুধাপূর্ণ সুখ
রেখো ওষ্ঠাধর পুটে ভক্তভৃঙ্গ তার
সম্পূর্ণ চুম্বন এক হাসি স্তরে
সরস সুন্দর।
রবীন্দ্রনাথ বলেছেন-
‘আকাশভরা তারার মাঝে আমার তারা কই?’
এই তারা ও ধ্রুবতারা সবই কাদম্বনী। ছায়ার মতো এই তারা রবীন্দ্রমানসকে আলোড়িত করেছে। আর রবীন্দ্রনাথ ‘তুমি-আমি’র বেশি অংশই কাদম্বরী। এখানে আমি সন্ধ্যাসঙ্গীতের তারকার আত্মহত্যা কবিতাটি উল্লেখ করবো। রবীন্দ্রনাথ বিলেত যাবার জন্য ব্যারিস্টারি পড়ার সব প্রস্তÍুত। এ সময় কাদম্বরী দেবী আত্মহত্যার চেষ্টা করে। বিলেত যাত্রা স্থগিত করা হলো। এবার বেঁচে গেলেন তিনি। এ সময় জ্যোতিরিন্দ্রনাথ স্ত্রীকে মানসিকভাবে সুস্থ করার জন্য কোলকাতা হতে দূরে অন্যত্র কোথাও বেড়াতে গেলেন। এ সময় রবীন্দ্রনাথ তারকার আত্মহত্যা কবিতাটি রচনা করেন। পুরো কবিতাটি এখানে উপস্থাপন করছি-
জ্যোতির্ময় তীর হত আঁধার সাগরে
ঝাঁপায়ে পড়িল এক তারা,
একবারে উন্মাদের পারা।
… … …
যদি কেহ শুধাইত
আমি জানি কী যে সে কহিত
যতদিন বেঁচে ছিল
আমি জানি কী তারে দহিত।
জ্যোতির্ময় তারাপূর্ণ বিজন তেয়াগি
তাই আজ ছুটেছে সে নিতান্ত মনে ক্লেশে
আঁধারের তারাহীন বিজনের লাগি।
নিজের প্রাণের জ্বালা
আঁধারে সে ডুবাতে গিয়েছে।
নিজের মুখের জ্যোতি
আঁধারে সে নিভায়ে গিয়াছে।
ঠাকুরবাড়ির এমনকি রবীন্দ্রভক্তেরাও বিষয়টি রুদ্ধদ্বারে গোপন রেখেছেন- কিন্তু উন্মোচন করে দিয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। কবিতায়, গানে, গল্পে নাটকে এই প্রকাশ উজ্জ্বলতা পেয়েছে- শেষ পর্যন্ত অনেক দ্বিধা জড়িমায় একটি ছবি তুলে ধরেছিলো। মৃত্যুর বেশ আগে ১৩২১ সালের ৫ কার্তিক এলাহাবাদে কবি তার নাতনি শান্তর বাসায় অবস্থানকালে বৈঠকঘরে কাদম্বরী দেবীর একটি ছবি দেখে প্রথমে বেশ কিছুক্ষণ অপলকে তাকিয়ে থাকেন, এরপরই তিনি রচনা করেন ‘বলাকার’ অবিনাশী কবিতা ‘ছবি’। কবিতার কিছু অংশ-
এ জীবনে
আমার ভুবনে
কত সত্য ছিলে।
মোর চক্ষে এ নিখিলে
দিকে দিকে তুমিই লিখিলে
রূপের তুলিকা ধরি সে-র মুরতি।
সে-প্রভাতে তুমিই তো ছিলে
এ-বিশ্বের বাণী মূর্তিমতী।
তোমায় কি গিয়েছিনু ভুলে।
তুমি যে নিয়েছ বাসা জীবনের মূলে
ভুলে থাকা নয় সে তো ভোলা;
বিস্মৃতির মর্মে বসি রক্তে মোর দিয়েছ যে দোলা।
নয়ন সম্মুখে তুমি নাই,
নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই;
আজি তাই
শ্যামলে শ্যামল তুমি নীলিমায় নীল।
আমার নিখিল
তোমাতে পেয়েছে তার অন্তরের মিল।
নাহি জানি, কেহ নাহি জানে
তবু সুর বাজে মোর গানে;
কবির অন্তরে তুমি কবি,
নও ছবি, নও ছবি, নও শুধু ছবি।
তোমারে পেয়েছি কোন প্রাতে,
তার পরে হারায়েছি রাতে।
তারপর অন্ধকারে অগোচরে তোমারই লভি।
নও ছবি, নও তুমি ছবি।
রবীন্দ্রনাথের বিয়ে হলো- আর আত্মহত্যায় জীবনের ঋণ শোধ করলেন কাদম্বরী। রবীন্দ্রনাথ বললেন,
‘আমি জানি, আত্মহত্যার কারণ জিজ্ঞেস করলে কী সে কহিত,
কী তাকে দহিত’।
অন্তরতম কবিতায় রবীন্দ্রনাথ লিখলেন-
আমি যে তোমা জানি, সে তো কেউ
জানে না।
তুমি মোর পানে চাও, সে তো কেউ
মানে না।
মোর মুখে পেলে তোমার আভাস
কত জনে কত করে পরিহাস,
পাছে সে না পারি সহিতে
নানা ছলে তাই ডাক যে তোমায়,
কেহ কিছু নারে কহিতে।
কবিতার শেষে অন্তরতমকে কবি বলছেন-
বলি নে তো কারে, সকালে বিকালে
তোমার পথের মাঝেতে,
বাঁশি বুকে লয়ে বিনা কাজে আসি
বড়াই ছদ্ম-সাজেতে।
যাহা মুখে আসে গাই সেই গান,
নানা রাগিনীতে দিয়ে নানা তান,
এক গান রাখি গোপনে।
নানা মুখ পানে আঁখি মেলি চাহি
তোমা পানে চাই স্বপনে।
এরপর সবশেষ। চারিদিকে শূন্যতা, রিক্ততা, একটা বিষাদ হাহাকার। একাকিত্বের বেদনায় ক্ষত-বিক্ষত রবীন্দ্রনাথ। কবির ভাষায়-
পথে যতদিন ছিনু ততদিন
অনেকের সনে দেখা।
সব শেষ হল যেখানে সেথায়
তুমি আর আমি একা।
রবীন্দ্রনাথ বলেছেন: ‘আমার কাব্যের একটি মাত্র পালা, সে পালার নাম দেয়া যেতে পারে ‘সীমার সাথে অসীমের মিলন সাধনের পালা’। তবে সীমাটা দেহ হলেও রবীন্দ্রভক্তেরা দেহকে বাতিল করে পরমাত্মাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। কিন্তু ‘কড়ি ও কোমল’ এর ‘স্তন’ ও চুম্বনে’র মাদকতা আবেশ শেষ জীবনে বিজয়াকে ঘনিষ্ঠ আলিঙ্গনাবদ্ধতায়ও এ মাদকতা একটুও কমেনি। আমি এখানে ‘কড়ি ও কোমল’ কাব্য হতে কিছু উদ্ধৃতি উপস্থাপন করছি।
নারীর প্রাণের প্রেম মধুর কোমল,
বিকশিত যৌবনের বসন্ত-সমীরে
কসুমিত হয়ে ওই ফুটেছে বাহিরে।
সৌরভ সুধায় করে পরান পাগল।
দেহ সম্ভোগ, দৈহিক মিলন এবং পূর্ণমিলনে যে পরিপূর্ণ প্রশান্তি রবীন্দ্রনাথ বারবারই একথা বলেছেন:
প্রতি অঙ্গ কাঁদে তব প্রতি অঙ্গ তরে।
প্রাণের মিলন মাগে দেহের মিলন।…
সর্বাঙ্গ ঢালিয়া আমি আকুল অন্তরে
দেহের রহস্য মাঝে হইব মগন।
বিজন বিশ্বের মাঝে মিলন শ্মশানে
নির্বাপিত সূর্যোলোক লুপ্ত চরাচর,
লাজমুক্ত বাসমুক্ত দু’টি নগ্ন প্রাণে
তোমাতে আমাতে হই অসীম সুন্দর।
এই দৈহিক সম্ভোগকেই রবীন্দ্রভক্তেরা নিয়ে গেছেন তুরীয় মার্গে। তুলনা করেছেন জ্ঞানদাসের উচ্চারণের সাথে। যেমন-
রূপলগি আঁখি ঝুরে শুনে মন ভোর।
প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর।
এখানে ‘প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর’ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই জৈবিক ও দৈহিক আবেদনের ইঙ্গিত বহন করে। কিন্তু একে বেঁকে চুরে, জটিলতার বৃত্তে নিয়ে নিয়ে ব্যাখ্যাকর্তারা দেহাতীতে প্রেমের রাজ্যে নিয়ে গেছেন।
রবীন্দ্রনাথের এই অন্ধভক্তেরা কোনোদিন রবীন্দ্রকাব্য পড়েনি- রবীন্দ্র-মানব সম্বন্ধেও তাদের কোনো ধারণা নেই। জোর করে একটি কল্পিত ধারণা থেকেই তারা রবীন্দ্রনাথকে আকাশে তুলেছেন এবং ‘তুমি-আমি’ প্রসঙ্গে এলেই সীমা ও অসীম এবং জীবাত্মা ও পরমাত্মাার আর ঐশ্বরিক সত্তার আরোপ করেছেন। অথচ রবীন্দ্র পাঠে আমরা জানি-
এ দ্যুলোক মধুময়, মধুময় পৃথিবীর ধূলি
অন্তরে নিয়েছি আমি তুলি
এই মহামন্ত্র
জীবনের চরিতার্থ বাণী।
….. ….
শেষস্পর্শ নিয়ে যাব ধরণীর বলে যাব তোমার ধূলির
তিলক পরেছি ভালে
দেখেছি নিজের ত্যোতি দুর্যোগের মায়ার আড়ালে
সত্যের আনন্দরূপ এ ধূলিতে নিয়েছে মূরতি
এই জেনে এ ধুলায় রাখিনু প্রণতি।
জীবনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বহু নারীর সাথে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় হয়েছে বহু ঘটনাও ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথ মহৎ কবি, কবি ও বিশ্বকবি এ সত্যটি অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের দৈহিক চাহিদা ছিলো না এ বলা যায় না। রবীন্দ্র-ভক্তরা মাটির পৃথিবীর রবীন্দ্রনাথ ও রক্তমাংসের রবীন্দ্রনাথকে মাটির পৃথিবী হতে উড়িয়ে দিয়ে অশরীরী রবীন্দ্রনাথ করে অধ্যাত্মলোকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। নারীর প্রেম ও ভালোবাসাকে ভগবৎ প্রেমের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এ ধরনের ব্যাখ্যায় ভগবানের সংখ্যা যেমন বেড়ে যাবে তেমনি রবীন্দ্রসাহিত্যেরও অবমূল্যায়ন হবে। হ