পৃথিবীর প্রভাবশালী ভাষাগুলোর প্রভাবশালী কবিগণের দ্বারা অপরাপর ভাষার কবিগণ প্রভাবিত হয়েছেন প্রায়ই। হোমার, গ্যাটে, শেকসপিয়ার, ইমরুল কায়েস, মিলটন, ফেরদৌসি, খৈয়াম, হাফিজ শিরাজী, আল্লামা ইকবাল, রবি ঠাকুরসহ প্রমুখ কবিগণের প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছেন অনেকেই। কাব্যের ভাব, ভাষা ইত্যাদি গ্রহণ করেছেন তাদের কাছ থেকে। শ্যামল বাংলার বংশীবাদক কবি কাজী নজরুল ইসলাম সর্বাধিক উদ্বুদ্ধ অনুপ্রেরিত-আলোড়িত হয়েছিলেন ফারসি কবিদের দ্বারা। তিনজন ফারসি কবির কবিতা নজরুল অনুবাদ করেন : ওমর খৈয়াম, জালালউদ্দীন রুমি এবং শামসুদ্দীন মুহম্মদ হাফিজের। এঁদের মধ্যেও আবার নজরুল সর্বাধিক উজ্জীবিত ছিলেন মহাকবি হাফিজের কবিতায়।
নজরুল আর হাফিজের মধ্যে কালের ব্যবধান অনেক। তবে কী করে নজরুল হাফিজকে পেলেন? আমরা জানি যে, ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খলজির দ্বারা বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই থেকে এদেশে ফারসির প্রচলন শুরু হয়। পরে মোগল আমলে ফারসি হলো রাজভাষা। এ ছাড়াও ফারসি ও মহাকবি হাফিজের সঙ্গে এই শ্যামল বাংলার আর একটি নিবিড়তম সম্পর্কের ঘটনা হলো, বাংলার সুলতান গিয়াস উদ্দিন আযম শাহ ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের উন্নয়নে সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেন। সুলতান গিয়াস এসময় ফারসি সাহিত্যের অমর প্রতিভা ইরানের মহাকবি হাফিজকে বাংলা ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানান। জবাবে হাফিজ নিম্নের বিখ্যাত গজলটি রচনা করেন-
সাকী! সার্ভ, গুল ও লাল ফুলের আলোচনা চলছে,
তিন ধৌতকারিণীসহ এ আলোচনা চলছে।
ফাররিস এ মিছ্রিখন্ড যা বাংলায় যাচ্ছে- তা নিয়ে
ভারতের তোতা পাখিরা (কবিরা) সবাই মিষ্টিমুখ হবে।
কথিত আছে যে, গিয়াস উদ্দিন আযম শাহের আমন্ত্রণ পেয়ে মহাকবি হাফিজ বাংলায় আগমনের জন্য যাত্রা করেন, কিন্তু জাহাজে ওঠার আগে সমুদ্রে প্রবল ঝড় উঠলে একে দৈবের অশনিসংকেত ভেবে হাফিজ ফিরে যান। জীবৎকালে তাঁর আর বাংলা-ভারত সফর করা সম্ভব হয়নি। ইংরেজরা এদেশ দখলের পরেও বেশকিছু দিন ছিল। কিন্তু ইংরেজরা ফারসির পরিবর্তে ইংলিশকে রাজভাষা করলে ফারসির গুরুত্ব কমে যায়। তবে মাদ্রাসা-মক্তবগুলোতে এর চর্চা চলতে থাকে। বড় বড় ধর্মীয় কিতাবগুলো ফারসিতে ছিলো। তাই নজরুলের বাবা মাজারের খাদেম থাকার ফলে পারিবারিকভাবে ও বাবার কর্মস্থলের জন্যও ছোটবেলায় ফারসির সাথে নজরুলের পরিচয় হয়েছিল।
নজরুল কিভাবে মহাকবি হাফিজ শিরাজী ও তাঁর ‘রুবাইয়াত-ই হাফিজ’-এর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে নিজের ভেতরে হাফিজকে ধারণ করেছেন তা নজরুলের ফারসি শেখা ও ফারসি প্রীতি দেখলে বোধগম্য হবে। শৈশবে বেনেপাড়ার বিনোদ চাটুজ্জের পাঠশালায় কিছুদিন পড়ে নজরুল গ্রামের মক্তবে লেখাপড়া শুরু করেন। এখানে তিনি কোরআন পাঠ আয়ত্ত করেন। মক্তবে তিনি আরবি ও ফারসি ভাষার প্রথম পাঠ লাভ করেছিলেন মৌলবি কাজী ফজলে আলীর কাছে। পরে বিশেষ করে ফারসি শেখেন তাঁর চাচা কাজী বজলে করিমের (নজরুলের পিতামহ কাজী আমিনুল্লাহর কনিষ্ঠ ভ্রাতা কাজী নাজিবুল্লাহর পুত্র) কাছে।
তাঁর ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি আগ্রহের কথা তিনি নিজেই ‘রুবাইয়াত-ই হাফিজ’-এর ভূমিকায় লিখেছেন, ‘আমি তখন স্কুল পালিয়ে যুদ্ধে গেছি। সে আজ ইংরেজি ১৯১৭ সালের কথা। সেইখানে প্রথম আমার হাফিজের সাথে পরিচয় হয়। আমাদের বাঙালি পল্টনে একজন পাঞ্জাবি মৌলবি সাহেব থাকতেন। একদিন তিনি দীওয়ান-ই-হাফিজ থেকে কতকগুলি কবিতা আবৃত্তি করে শোনান। শুনে আমি এমনই মুগ্ধ হয়ে যাই যে, সেইদিন থেকেই তাঁর কাছে ফারসি ভাষা শিখতে আরম্ভ করি। তাঁরই কাছে ক্রমে ফার্সি কবিদের প্রায় সমস্ত বিখ্যাত কাব্যই পড়ে ফেলি।
তখন থেকেই আমার হাফিজের ‘দীওয়ান’ অনুবাদের ইচ্ছা হয়। কিন্তু তখনো কবিতা লিখবার মত যথেষ্ট সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারিনি। এর বছর কয়েক পরে হাফিজের দীওয়ান অনুবাদ আরম্ভ করি। অবশ্য তাঁর রুবাইয়াৎ নয়-গজল। বিভিন্ন মাসিক পত্রিকায় তা প্রকাশিত হয়েছিলে। ত্রিশ-পঁয়ত্রিশটি গজল অনুবাদের পর আর আমার ধৈর্যে কুলোল না, এবং ঐখানেই ওর ইতি হয়ে গেল।
তারপর এসসি চক্রবর্তী এন্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী মহাশয়ের জোর তাগিদে এর অনুবাদ শেষ করি। যে দিন অনুবাদ শেষ হল, সেদিন আমার খোকা বুলবুল চলে গেছে।
আমার জীবনের যে ছিল প্রিয়তম, যা ছিল শ্রেয়তম তারই নজরানা দিয়ে শিরাজের বুলবুল কবিকে বাঙলায় আমন্ত্রণ করে আনলাম। …. আমার আহ্বান উপেক্ষিত হয়নি। যে পথ দিয়ে আমার পুত্রের ‘জানাযা’ (শবযান) চলে গেল, সেই পথ দিয়ে আমার বন্ধু, আমার প্রিয়তম ইরানী কবি আমার দ্বারে এলেন। আমার চোখের জলে তাঁর চরণ অভিষিক্ত হল’…।
দ্রোহ ও সাম্যের কবি নজরুল খুব দুঃসময়ে পুত্রের মৃত্যুশয্যায় বসে ‘রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ’-এর অনুবাদ সম্পন্ন করেন। কতটা শিষ্যত্ব অর্জন করলে এরকম একটি চরম মুহূর্তে পুত্রের সেবা-শুশ্রষায় ন্যস্ত না হয়ে ইরানের বুলবুলকে অনুবাদ করে চলেছেন। তাই কবি যথার্থই বলেন, ‘যেপথ দিয়ে আমার পুত্রের শবযান চলে গেল, সেপথ দিয়েই এলেন তাঁর প্রিয়তম ইরানী কবি হাফিজ।’
‘রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ’ অনুবাদ কাব্যের উৎসর্গপত্রে কবি লিখেছেন-
বাবা বুলবুল!
তোমার মৃত্যু-শিয়রে বসে ‘বুলবুল-ই-শিরাজ’
হাফিজের রুবাইয়াতের অনুবাদ আরম্ভ করি। যেদিন
অনুবাদ শেষ করে উঠলাম, সেদিন তুমি আমার
কাননের বুলবুলি উড়ে গেছ। যে দেশে গেছ তুমি,
সে কি বুলবুলিস্তান ইরানের চেয়েও সুন্দর?
জানি না তুমি কোথায়! যে লোকেই থাক, তোমার
শোক-সন্তপ্ত পিতার এই শেষ দান শেষ চুম্বন বলে গ্রহণ করো।
তোমার চার বছরের কচি গলায় যে সুর শিখে গেলে,
তা ইরানের বুলবুলিকেও বিস্ময়ান্বিত করে তুলবে।
শিরাজের বুলবুল কবি হাফিজের কথাতেই
তোমাকে স্মরণ করি,
‘সোনার তাবিজ রূপার সেলেট
মানাত না বুকে রে যার,
পাথর চাপা দিল বিধি
হায়, কবরের শিয়রে তার।
এছাড়াও নজরুলের আরবি ও ফারসি বিষয়ে পান্ডিত্য সম্পর্কে সদালাপ ডট অর্গ এ বর্ণনা করা হয়েছে, “একাধিক আরবি-ছন্দ নিয়ে নজরুলের অসংখ্য কবিতা আছে, বাংলা ভাষার আরও এক প্রতিভাবান কবি ফররুখ আহমদ এ বিষয়ে কারিশমা দেখাতে পারেননি।
ইরানের কবি হাফিজ আর ওমর খৈয়ামের যতজন ‘কবি’ অনুবাদক আছেন তার মধ্যে নজরুল একমাত্র মূল ফারসি থেকে অনুবাদ করেছেন, বাকি সবাই ইংরেজি থেকে।
“ফারসি” এবং “আরবি”তে নজরুল এর জ্ঞান ছিল পান্ডিত্যের পর্যায়ে।”
বাংলার বিদ্রোহী কবি হাফিজকে কতোটা আত্মস্থ করেছিলেন তা তার অনূদিত ‘রুবাইয়াৎ-ই হাফিজ’-এর প্রারম্ভে হাফিজের পরিচয় প্রদানে তাঁর কলমের লেখা থেকে অনুমেয়। পারস্যের কবি সম্পর্কে বাংলার কবি লিখছেন-
“শিরাজ ইরানের মদিনা, পারস্যের তীর্থভূমি। শিরাজেরই মোসল্লা নামক স্থানে বিশ্ববিশ্রুত কবি হাফিজ চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে জন্মগ্রহণ করেন।
ইরানের এক নিশাপুর (ওমর খৈয়ামের জন্মভূমি) ছাড়া আর কোনো নগরই শিরাজের মত বিশ্বজোড়া খ্যাতি লাভ করে নাই। ইরানের প্রায় সমস্ত শ্রেষ্ঠ কবিরই লীলা নিকেতন এই শিরাজ।
ইরানিরা হাফিজকে আদর করিয়া ‘বুলবুল-ই-শিরাজ’ বা শিরাজের বুলবুলি বলিয়া সম্ভাষণ করে।
হাফিজকে তাহারা শুধু কবি বলিয়াই ভালোবাসে না। তাহারা হাফিজকে ‘লিসান-উল্-গায়েব (অজ্ঞাতের বাণী), ‘তর্জমান্-উল-আস্রার’ (রহস্যের মর্মসন্ধানী) বলিয়াই অধিকতর শ্রদ্ধা করে। হাফিজের কবর আজ ইরানের শুধু জ্ঞানী-গুণীজনের শ্রদ্ধার স্থান নয়, সর্বসাধারণের কাছে ‘দরগা’, পীরের আস্তানা।”…
“হাফিজের আসল নাম শামসুদ্দিন মোহাম্মদ। ‘হাফিজ’ তাঁহার ‘তখল্লুস’, অর্থাৎ কবিতার ভণিতায় ব্যবহৃত উপনাম। যাঁহারা সম্পূর্ণ কোরআন কণ্ঠস্থ করিতে পারেন, তাঁহাদিগকে মুসলমানেরা ‘হাফিজ’ বলেন। তাঁহার জীবনী লেখকগণও বলেন, হাফিজ তাঁহার পাঠ্যাবস্থায় কোরআন কণ্ঠস্থ করিয়া ছিলেন।”…
“হাফিজের গান অতল গভীর সমুদ্রের মত। কূলের পথিক যেমন তাহার বিশালতা, তরঙ্গ লীলা দেখিয়া অবাক বিস্ময়ে চাহিয়া থাকে, অতল-তলের সন্ধানী ডুবুরি তেমনি তাহার তলদেশে অজস্র মণিমুক্তার সন্ধান পায়। তাহার উপরে যেমন ছন্দ-নর্তন, বিপুল বিশালতা; নিম্নে তেমনি অতল গভীর প্রশান্তি, মহিমা।”…
“হাফিজের সমস্ত কাব্য ‘শাখ্-ই-নবাত্’ নামক কোনো ইরানি সুন্দরীর স্তবগানে মুখরিত। অনেকে বলেন, ‘শাখ্-ই-নবাত্’ হাফিজের দেয়া আদরের নাম। উহার আসল নাম হাফিজ গোপন করিয়া গিয়াছেন। কোন ভাগ্যবতী এই কবির প্রিয়া ছিলেন, কোথায় ছিল তাঁর কুটির, ইহা লইয়া অনেকে অনেক জল্পনা-কল্পনা করিয়াছেন। রহস্য-সন্ধানীদের কাছে এই হরিণ-আঁখি সুন্দরী আজো রহস্যের অন্তরালেই রহিয়া গিয়াছেন।”
“তাঁহার মৃত্যু সম্বন্ধে একটি বিস্ময়কর গল্প শুনা যায়। শিবলী নোমানি, ব্রাউন সাহেব প্রভৃতি পারস্য-সাহিত্যের সকল অভিজ্ঞ সমালোচকই এই ঘটনার উল্লেখ করিয়াছেন।
হাফিজের মৃত্যুর পর একদল লোক তাঁহার ‘জানাজা’ পড়িতে (মুসলমানি মতে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করিতে) ও কবর দিতে অসম্মত হয়। হাফিজের ভক্তদলের সহিত ইহা লইয়া বিসংবাদের সৃষ্টি হইলে কয়েক জনের মধ্যস্থতায় উভয় দলের মধ্যে এই শর্তে রফা হয় যে, হাফিজের সমস্ত কবিতা একত্র করিয়া একজন লোক তাহার যে কোনো স্থান খুলিয়া দিবে; সেই পৃষ্ঠার প্রথম দুই লাইন কবিতা পড়িয়া হাফিজের কি ধর্ম ছিল তাহা ধরিয়া লওয়া হইবে।
আশ্চর্যের বিষয়, এইরূপে নিম্নলিখিত দুই লাইন কবিতা পাওয়া গিয়াছিল। –
কদমে দরিগ মদার আজ জানাজায়ে হাফিজ,
কে গর্চে গর কে গোনাহস্ত মি রওদ বেহেস্ত।”
হাফিজের এই শব হ’তে গো তু’লো না কো চরণ প্রভু
যদিও সে মগ্ন পাপে বেহেশতে সে যাবে তবু।
ইহার পর উভয় দল মিলিয়া মহাসমারোহে হাফিজকে এক আঙ্গুর-বাগানে সমাহিত করেন। সে স্থান আজিও ‘হাফিজিয়া’ নামে প্রসিদ্ধ। দেশ বিদেশ হইতে লোক আসিয়া আজও কবির কবরে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করে।’
নজরুলও তাঁর কবিতায় হাফিজের প্রভাব প্রসঙ্গে আলোচনায় আরেকটি দিক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নজরুল গবেষক শাহাবুদ্দীন আহমদ লিখেছেন, ‘নজরুলের কবিতায় ফারসি কবিতার প্রভাবের কথা বলতে গেলে প্রথমেই যে বিষয়টির উল্লেখ করতে হবে, সেটি ফারসি কবিতার কালার্ড ইমেজ বা রঙিন চিত্রকল্পের কথা। নজরুলের কবিতায় এই রঙিন চিত্রকল্পের রূপ দেখা যায়।’ যেমন-
নীল সিয়া আসমান লালে লাল দুনিয়া!
আম্মা লাল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া। (মোহররম)
অথবা
লাটে তোমার ভাস্বর টীকা
বস্রাগুলের বহ্নিতে লিখা;
এ যে বসোরার খুন-খারাবি গো রক্ত গোলাপ মঞ্জুরীর।
(শাত-ইল-আরব)
নজরুল তাঁর এই রঙিন চিত্রকল্পের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছেন তাঁর গানে বা গীতিকবিতায়। হাফিজ বা ওমর খৈয়ামের চিত্রকল্পময় রুবাইয়াতের সঙ্গে মিলিয়ে পড়লেই নজরুলের চিত্রকল্পের অনন্য বৈশিষ্ট্য সহজে বোধগম্য হয়ে ওঠে।
মুজতাহিদ ফারুকী নজরুলের ওপর হাফিজের প্রভাব সম্পর্কে লিখেছেন,
‘নজরুল গীতিকা’তে তো ‘ওমর খৈয়াম-গীতি’ ও ‘দীওয়ান-ই-হাফিজ-গীতি’ নামে আটটি করে কবিতা গান অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ থেকেই প্রতীয়মান হয় যে, ফারসি সাহিত্য তথা পারস্যের মহাকবি হাফিজ দ্বারা নজরুল কতটা অনুপ্রাণিত ছিলেন!
নজরুলের কাব্যপ্রতিভা ও সাহিত্যের মূল্যায়ন করে ঢাবি ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক আবু মুসা মোহাম্মদ আরিফ বিল্লাহ্ বলেন, ‘নজরুলের কাব্য-মানস বিকাশে হাফিজের লক্ষণীয় প্রভাব রয়েছে। হাফিজের গজলের অনুসরণে নজরুলই প্রথম বাংলা সাহিত্যে গজলের ধারার প্রবর্তন করেন।’
‘দৈনিক জনকণ্ঠে’ প্রকাশিত ‘নজরুল শব্দের মহফিলে’ প্রবন্ধে নজরুলের ওপর হাফিজের প্রভাবের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। ‘বাংলা সাহিত্যের ভাব বৈচিত্র্যের জন্যই বুঝি নজরুল হাবিলদার কবি থাকাকালীন পারস্যের কবি হাফিজের কবিতা অনুবাদে মনপ্রাণ ঢেলে দিয়েছিলেন। এ যেন ‘বাংলার শ্যামকোয়েলার কণ্ঠে ইরানের গুলবাগিচার বুলবুলির বুলি’ তিনিই দেন। নজরুল বাংলার শাপলা-শালুক পদ্মের সঙ্গে বসরাই গোলাপ-জুঁই-নার্গিস একাকার করে দিয়েছেন।
মহাকবি হাফিজ ছিলেন প্রেমরসে ভরপুর একজন কবি। তিনি প্রেমের জন্য কতইনা অমিতব্যয়ী ছিলেন! যেমনটি তিনি প্রিয়ার ঠোঁটের কালো তিলের বিনিময়ে সমরকান্দ ও বোখারা নগরী বিলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। সেই কবিতার অনুবাদ করেছেন কাজী নজরুল এভাবে,
প্রাণ যদি মোর ফিরে দেয় সেই তুর্কী চাওয়ার মনচোরা,
একটি কালো তিলের লাগি বিলিয়ে দেব সমরকান্দ ও বোখারা।
অনুরূপ আমাদের প্রেমের কবির অসংখ্য কবিতা আছে প্রেমিকার জন্য। চিরঞ্জীব এরকম একটি প্রেমের নমুনা হলো,
মোর প্রিয়া হবে এস রানী
দেব খোঁপায় তারার ফুল
কর্ণে দোলাবো তৃতীয়া তিথি
চৈতী চাঁদের দুল॥’
সৈয়দ মুজতবা আলীর মতে, ‘নজরুল মোল্লা-মৌলবীদের মতো ভালো আরবি-ফার্সি না জানলেও কাব্যের রস আস্বাদন করতে পেরেছিলেন।’
‘রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ’ নজরুল ইসলাম অনূদিত বাংলা ভাষায় বহুল প্রচারিত ও পঠিত একমাত্র সফল অনুবাদ কাব্য। পারস্যের মরমি কবি হাফিজকে জানতে হলে বাংলা ভাষাভাষী পাঠককের জন্য ‘রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ’ অবশ্যই পড়া দরকার যা একটি সংক্ষিপ্তাকারের পরিপূর্ণ গ্রন্থ।
‘তারিখে আদাবিয়্যাতে ফারসি’ গ্রন্থে হাফিজের দিওয়ান সম্পর্কে মন্তব্য করা হয়েছে যে, হাফিজ তাঁর কবিতায় ও গজলে সঙ্গীত কাঠামো প্রয়োগ করেছেন যার সামষ্টিক উদ্দেশ্য হলো সৃষ্টিকর্তা ও ধর্ম সম্পর্কিত। আর আমাদের অনেকের কাছে নজরুল তাঁর সঙ্গীতের কারণেই পরিচিত। তাঁর অনেক সঙ্গীতই ধর্মীয়। যেমনটি ‘ও মন রমজানেরই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।’
হাফিজের প্রাথমিক জীবনে পিতৃহীনতা, দরিদ্রতার মধ্যে দিনাতিপাত, রুটির দোকানে কাজ নেয়া, নিজ উদ্যোগে পড়াশুনা করা সবই হুবহু বিদ্রোহী কবির সঙ্গে মিলে যায়।
‘ফার্সি সাহিত্যের ইতিহাস’ নামক গ্রন্থের ১৯১ নং পৃষ্ঠায় হাফিজের গজল সম্পর্কে আরো বলা হয়েছে, ‘ভন্ড-তাপস ও জালিম বাদশাহদের বিরুদ্ধে কবিতার খড়গ চালিয়েছেন।’
আর ঠিক একই খড়গ চালিয়েছেন বাংলার সাম্যবাদী কবি নজরুল তাঁর বিদ্রোহী কবিতায়। যেমন তাঁর কবিতা,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না-
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভিম রণ-ভূমে রণিবে না-
বিদ্রোহী রণক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত!
২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের রাজধানী তেহরানে ‘ফারসি ভাষা ও সাহিত্য সম্প্রচার কেন্দ্র’ মিলনায়তনে ‘নজরুল সেমিনার’ অনুষ্ঠিত হয়; সেখানে হাফিজ ও নজরুলের ছবি পাশাপাশি ছিল। অনুষ্ঠান শুভ সূচনা হয়েছিলো হাফিজ ও নজরুলের কবিতার পঙ্ক্তি দিয়ে। সেখানে ফারসি ভাষায় নজরুলের কবিতার অনুবাদ পাঠ করা হয়েছিল। ফারসি ভাষায় নজরুল গবেষণা হচ্ছে। ইমতিয়াজ আহমদ ফারসি ভাষায় বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রবন্ধ পাঠ করেন, তার প্রবন্ধের বিষয়বস্তু ছিল, ‘নজরুলের কাব্যে ইসলামী ঐতিহ্য’। কামাল হোসাইন বলেন, ‘ফারসি ভাষায় পঠিত এ প্রবন্ধ শুনে ইরইনরা থ হয়ে রইলো অনেকক্ষণ। অনেক গবেষক, অধ্যাপক বললেন- নজরুল এতো সুন্দর সাহিত্য রচনা করেছেন অথচ আমরা এতোদিন এর কিছুই জানতাম না।’
কাজী নজরুল ইসলাম যা লিখেছেন তা শুধু বাংলা সাহিত্যেরই সম্পদ নয়, বিশ্ব সাহিত্যেরও অমূল্য সম্পদ। ইরানিদের আবেগ-অনুভূতি উপলব্ধি দেখে তা অনুভব করা গেছে। উক্ত অনুষ্ঠানে মুমিত আল রশিদ ফারসি ভাষায় যে প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন, সেটি ছিলো, ‘নজরুল কাব্যে হাফিজের প্রভাব’। তিনি হাফিজ আর নজরুলকে উপস্থাপন করেছিলেন চমৎকারভাবে। ইরানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র থেকে কয়েক বছর পূর্বে নজরুলের কবিতা ও গান ফারসি ভাষায় অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তারা নজরুলের সাহিত্যকর্মের ওপর বছরে একাধিকবার আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে এবং কমপক্ষে একবার আন্তর্জাতিক নজরুল সম্মেলন আয়োজন করে; সে সম্মেলনে যোগদানের জন্য বাংলাদেশের তিনজন গবেষককে আমন্ত্রণ জানায়।
‘রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজে’ মোট ৭৩টি রুবাই মুদ্রিত হয়েছে। গ্রন্থের মুখবন্ধে রয়েছে আরো ২টি রুবাইর অনুবাদ। এই ৭৫টি রুবাইর মধ্যে বিষয় নির্দেশক প্রতিনিধিত্ব করে এরকম মোট ৮টি রুবাই নিচে উপস্থাপন করা হলো। ভাষা ও বিষয়শৈলীর গুণে এসব রুবাইর মর্মকথা মূর্ত হয়ে উঠেছে অত্যন্ত সাবলীলভাবে।
প্রতিনিধিত্বকারী ৮টি রুবাই হলো,
১ নং রুবাই
তোমার ছবির ধ্যানে, প্রিয়
দৃষ্টি আমার পলক-হারা।
তোমার ঘরে যাওয়ার যে-পথ
পা চলে না সে-পথ ছাড়া।
হায়, দুনিয়ায় সবার চোখে
নিদ্রা নামে দিব্য সুখে,
আমার চোখেই নেই কি গো ঘুম,
দ্বগ্ধ হল নয়ন-তারা॥’
৫ নং রুবাই
‘আন্তে বল পেয়ালা শারাব
পার্শ্বে বসে পরান-বধূর।
নিঙাড়ি লও পুষ্প-তনু
তন্বঙ্গীর অধর-আঙুর।
আহত যে-ক্ষত-ব্যথায়
সোয়াস্তি চায়, চায় সে আরাম;
বিষম তোমার হৃদয়-ক্ষত,
ডাকো হাকিম কপট চতুর॥’
১৫ নং রুবাই
‘তোমার পথে মোর চেয়ে কেউ
সর্বহারা নাইকো, প্রিয়!
আমার চেয়ে তোমার কাছে
নাই সখি, কেউ অনাত্মীয়।
তোমার বেণীর শৃঙ্খলে গো
নিত্য আমি বন্দী কেন? –
মোর চেয়ে কেউ হয়নি পাগল
পিয়ে তোমার প্রেম-অমিয়॥’
২২ নং রুবাই
‘সোরাই-ভরা রঙিন্ শারাব
নিয়ে চলো নদীর তটে!
নিরভিমান প্রাণে বসো-
অনুরাগের ছায়া-বটে!
সবারই এই জীবন যখন
সেরেফ্ দুটো দিনের রে ভাই,
লুট করে নাও হাসির মধু,
খুশির শারাব ভরো ঘটে॥’
২৬ নং রুবাই
‘চাঁদের মত রূপ গো তোমার
ভরছে কলঙ্কেরি দাগে।
অহঙ্কারের সোনার বাজার
ডুবছে ক্রমে ক্রান্তি-কাগে।
লজ্জা অনেক দেছ আমায়,
প্রেম নাকি মোর মিথ্যা-ভাষণ!
আজ ত এখন পড়ল ধরা
কলঙ্ক কোন্ মুখে জাগে॥’
৩০ নং রুবাই
‘দাও মোরে ঐ গেঁয়ো মেয়ের
তৈরি খাঁটি মদ পুরানা।
তাই পিয়ে আজ গুটিয়ে ফেলি
জীবনের এই গাল্চে খানা।
যদি ধরার মন্দ ভালো
দাও ভুলিয়ে মস্ত্ করে
জানিয়ে দেবো এই সৃষ্টির
রহস্যময় সব অজানা॥’
৩২ নং রুবাই
‘মদ্ লোভীরে মৌলোভী কন,
পান করে এই শারাব যারা,
যেমন মরে তেমনি করে
গোরের পারে উঠবে তারা।
তাই ত আমি সর্বদা রই
শারাব এবং প্রিয়ার সাথে,
কবর থেকে উঠব-নিয়ে
এই শারাব, এই দিল্-পিয়ারা॥’
৪৬ নং রুবাই
‘প্রিয়া তোমায় দেছে দাগা?
বন্ধু, পীড়ন সহ্য কর!
আমার পরামর্শ শোন,
সকল ভুলে শারাব ধর।
মত্লব্ হাসিল কর তোমার
খুব সুরতী রতির সাথে,
অন্তর দিও না তারে
সে তব অযোগ্যতর॥’
এইসব আলোচনা থেকে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায় যে ইরানের বুলবুল মহাকবি হাফিজকে বাংলার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সর্বান্তকরণে ধারণ করে তাঁর ভাবশিষ্য হয়েছিলেন।
সহায়ক উৎস
১. নজরুল রচনাবলী, তৃতীয় খন্ড, বাংলা একাডেমী, সম্পাদক : আবদুল কাদির।
২. নজরুল কাব্যে আরবি ফারসি শব্দ, আব্দুস সাত্তার, নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা।
৩. মহাকবি হাফিজের জীবন ও কর্ম (প্রবন্ধ)- মো: নূরে আলম।
৪. নজরুল কাব্যে হাফিজের প্রভাব (প্রবন্ধ)- মুমিত আল রশিদ।
৫. বিদ্রোহী কবি নজরুল ও মহাকবি হাফিজ (প্রবন্ধ)- ড. আবুল আজাদ।
৬. বাংলাসাহিত্যের ইতিহাস- মাহবুবুল আলম।
৭. ফার্সি সাহিত্যের ইতিহাস- তারিক জিয়াউর রহমান সিরাজী ও মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী।
৮. তারিখে আদাবিয়্যাতে ইরান- ড. আহমাদ তামীমদারী।