কী গাছ ওটা? বট? পাশেরটা? পাকুড়? তার পাশেরটাই বা কী? একটু একটু করে নামতে থাকা হালকা, ছাইরঙা অন্ধকার আর পাতলা কুয়াশায় মোড়া গাছগুলোর দিকে আনমনে তাকিয়ে থাকে। জানালায় বসে দেখে কি করে ধীরে, খুব ধীরে লুট হয়ে যায় এক পৃথিবী আলো, রাহুগ্রস্ত হয় বিকেলের আশ্চর্য সোনায় মোড়া রোদ। নাম না জানা পাখি বুকের মধ্যে ডানা ঝাপটায়, আঁচড় কাটে হৃদপিন্ডের নরম ভিটেয়।
হঠাৎ ঝাঁকড়া গাছগুলোতে প্রাণের সঞ্চার হয়। ভীষণ ঘন হয়ে লেপ্টে থাকা পাতাগুলোকে দূর থেকে লাগে একটি বড় বৃত্তের মত। বৃত্তটা নড়ে ওঠে সহসা। বড় হতে থাকে। ছড়িয়ে পড়ে আকাশের গায়। কাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে ক্ষয়াটে, জং ধরা শব্দদূষণময় শহর। একটা দীর্ঘশ্বাস নিজের অজান্তেই গড়িয়ে পড়ে যেন। পাখিগুলো শেষ বারের মত উড়ে আবার ফিরে আসে গাছগুলোর কাছে, চক্রাকারে উড়ে, বিচিত্র শব্দ করে ঢুকে যায় নিরাপদ ডেরায়।
হাতে আটকে থাকা মুঠোফোনটা ভূমিকম্প তুলেই স্থির হয়ে যায়। খুদেবার্তা! কে? পড়ে শিমুল। কিছু একটা পোড়ে, কিছু একটা জ্বলে! সেই একই অনুরোধ!
Ñ‘একটু বের হবে? ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে! শুধু একবার! পিজ, এসো!’ চোখ দুটো জ্বালা করে খুব।
এক সময় এই একটা খুদে বার্তার জন্য, এই একটা নম্বরের ফোনের জন্য ছটফট করত সে, শুধু একটা কণ্ঠস্বর শোনার মোহে সে বিকিয়ে দিতে পারত সর্বস্ব। অথচ এখন! না, এখন আর কোন অপেক্ষা নেই, নেই কোন প্রত্যাশার প্রহর গোনাও। তবু বুকটা এমন করে কেঁপে ওঠে কেন! কেন এমন উতলা হয় মন!
এমনি কোন এক মন কেমন করা ক্ষণে বেজে উঠেছিল টেলিফোন। ভীষণ শব্দে চমকে উঠেছিল তার একান্ত অবসর। অভ্যস্ত কণ্ঠে, প্রায় যন্ত্রের মত সে বলেছিল,
‘হ্যালো!’
‘হ্যালো, ¯ামালায়কুম!’
‘জি, কে বলছেন পিজ!’- সালামের উত্তর না পেয়ে আবার সালাম ওপাশ থেকে। আহা! যেন শিমুলকে শান্তির অতল সায়রে ভাসিয়ে তবে ছাড়বে! শান্তির জলে অবগাহন করিয়ে তবে দম নেবে যেন! সালামের উত্তর অতঃপর দিতেই হলো। তারপর আবার,
‘আপনি কে বলছেন, পিজ?’
‘কেন, কণ্ঠটা চেনা মনে হয় না?’- মনে হয়, ভীষণই চেনা মনে হয়, কিন্তু স্বীকার করা যায় না তা, অহং বাধা দেয়, কড়া চোখে শাসায়। শিমুল বলে,
‘না, চেনা লাগছে না! কে বলছেন?’
‘সত্যিই চেনা লাগছে না, শিমুল?’
বুকের মধ্যে ভীষণ স্বরে মেঘ ডেকে ওঠে, ঢাক বেজে যায়! শিমুল আপ্রাণ চেষ্টায় কণ্ঠ স্বাভাবিক রেখে বলে,
‘আপনার সাথে সম্ভবত ফোনে কখনও কথা হয়নি আমার। আর ফোনে সবার কণ্ঠই একটু অন্যরকম শোনায়!’
‘না, ফোনে কখনও কথা হয়নি, শিমুল, আমি নীল।’
নীল! আহ্! নীল! কতদিন পর! কতদিন পর এই কণ্ঠটা শোনে সে! কতদিন পর কেউ বলে তাকে, ‘শিমুল, আমি নীল!’ বুকের মধ্যে ছোট্ট বেলার মিষ্টি অনুভূতিটা কেঁপে উঠে জানিয়ে দেয়, মরেনি সে, ঘুমিয়ে ছিল, ভীষণ সংগোপনে লুকিয়ে ছিল, কিন্তু মরেনি। গলাটা কি কেঁপে যায় তার? কণ্ঠটা কি হঠাৎই উচ্ছল হয়ে ওঠে? জানে না শিমুল। সে প্রাণপণ চেষ্টায় নির্লিপ্তি গলায় ঢেলে বলে,
‘ওমা! নীল! তুই! কেমন আছিস রে? ভাল?’
‘ভাল আছি! তুই কেমন আছিস, শিমুল?’
‘আমি? হ্যাঁরে, ভালো আছি, খুব ভালো আছি।’- টুকটাক কথা, মেকি সৌজন্যের ভড়ং, তারপর নীরব সব। দু’ দিন পর মিসকল শিমুলের ফোনে। অবাক হয় শিমুল। কেন মিসকল দেবে নীল! দরকার কোন? কিন্তু তার কাছে নীলের কি-ইবা দরকার থাকতে পারে আর! সাতপাঁচ ভেবে সে ফোন দেয় নীলকে। দিয়েই থমকায়। তাকে না চেনার অভিনয় করে নীল। কাঁচা অভিনয়!
‘হ্যালো!’
‘হ্যালো!’
শিমুলও এপাশ থেকে উত্তর করে!
‘কাকে চাই?’- নীল সপ্রতিভ হওয়ার চেষ্টা করে।
‘আপনাকে!’- শিমুলের উত্তর।
‘আপনি কে?’
শিমুল থমকায়, তারপর আস্তে বলে, ‘নীল, আমি শিমুল!’
‘ও, শিমুল! তুই! গাধা! আগে বলবি না!’- নীলের কণ্ঠে কৃত্রিমতার ছোঁয়া, মিথ্যের রেশ! শিমুল বিরক্ত হয়। তারপর বলে,
‘তোর নম্বর থেকে মিসকল এসেছিল নীল, তাই ফোন করেছি।’
‘মেয়ের নম্বর দেখে অন্য কেউ দিয়েছিল হয়তো!’
শিমুলের ইচ্ছে হয় বলে, নম্বর দেখে কি করে কেউ টের পেল এটা মেয়ের নম্বর! আর নম্বর যদি সেভ করা ছিল তবে নীল না চেনার ভানটাই বা করল কেন! তাছাড়া তার নামটা ছেলের না মেয়ের সেটা নিয়েও দ্বিধায় ভোগে অনেকেই! না। এসব কিছুই বলে না সে। দু-একটা দায়সারা কথা বলে রেখে দেয় ফোন।
পরদিন ফোন আসে। তার পরদিনও। সাধারণ কথাবার্তা। আটপৌরে দিনের খবর নেয়া বৈ তো নয়। নীল নিজের কথা বলে। সে ভালো আছে। ভালো প্রতিষ্ঠানে মোটা বেতনের চাকুরে। শিমুলও মন্দ নাই তো। সে বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরোবে শিগগিরই। তার বরও মোটা বেতনে চাকরি করে। ঢাকা শহরে বরের টাকায় কেনা ফ্ল্যাটবাড়িতে তার দিন কাটে মন্দ নয়। বর সারাদিন অফিসে। সে মুক্ত বিহঙ্গের মত ওড়ে। বন্ধুদের আড্ডায়, ক্যাম্পাসে, শপিংয়ে দিব্যি সময় কাটে তার।
নীল শোনে, শোনে শিমুলও। আবার সহজ হয়ে আসে সম্পর্ক। আনিস সেই কোন ভোরে অফিসে চলে যায়। শিমুলের ঘুম ভাঙে নীলের ফোনে। কত কথা, কত গল্প ! নীল জানায় তার খুব ইচ্ছে করে বরের পাশে শিমুলকে কেমন দেখায় তা দেখতে, ইচ্ছে করে ঘরকন্নায় ব্যস্ত শিমুলকে দেখতে ঠিক কেমন তা জানতে। শিমুল শিহরিত হয়! শিমুল প্রগলভ হয়! মুখ ফসকে বলে ফেলে,
‘আমি তোর পাশেই থাকতে চেয়েছিলাম নীল! তোর ঘরে!’
পাগলের মত হাসে নীল। তার মতো বাউণ্ডুলেকে বিয়ে না করে খুব ভালো হয়েছে শিমুলের, বলে তা ও। শিমুলের বরের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়। শুনে শিমুল বলে,
‘হ্যাঁ! তুই তো আমার বরের প্রশংসা করবিই! তোকে কত্ত বড় আপদ থেকে বাঁচাল যে!’
শুনে হাসে নীল। ফোনে দীর্ঘশ্বাস ভেসে আসে তার। বলে,
‘তুই আমার আপদ ছিলি না শিমুল! তুই যে কি ছিলি আমার, সে যদি বুঝতিস!’
‘কি ছিলাম রে?’- নির্লজ্জের মত, বেহায়ার মত প্রশ্ন করে শিমুল।
‘ছোটবেলায় স্কুল থেকে যখন নতুন বই পেতাম, বাড়িতে গিয়ে কি যে আনন্দে, কি অসহ্য উত্তেজনায় যে বইয়ের উপরে বড় বড় অক্ষরে নিজের নামটা লিখতাম শিমুল! মনে মনে তোর শরীরেও অমনি করে নাম লিখেছিলাম, তোকে আমার নিজের ভেবে নিয়েছিলাম, তুই কি করে জানবি বল!’
‘তবে কেন হারিয়ে গেলি আমার থেকে? কেন তবে চলে গেলি দূরে?’ কণ্ঠটা অভিমানে বুজে আসতে চায় শিমুলের।
‘তুই সেসব বুঝবি না শিমুল! আমার অনেক ফালতু ঝামেলা ছিল রে! তাতে কি হয়েছে বল! তুই তো ভালোবেসেই বিয়ে করেছিস! ভালোও আছিস!’
‘আমার ভালোবেসে বিয়ে করা নিয়ে, ভালো থাকা নিয়ে তোর কি সমস্যা আছে কোন?’-তীব্র কণ্ঠে প্রশ্ন করে শিমুল।
‘না আমার কেন আপত্তি থাকবে!’- নীলের ত্বরিত উত্তর।
‘তাহলে এ প্রসঙ্গে আর কোন কথা বলবি না।’
চুপ হয়ে যায় নীল। শিমুলও চুপ।
‘তুই বিয়ে করছিস না কেন?’- আচমকা প্রশ্ন করে শিমুল।
‘আমি! আমায় কে বিয়ে করবে?’- হেসে উড়িয়ে দেয় নীল। যেন এর চেয়ে অদ্ভুত কথা এ জীবনে আর শোনেনি সে। কথা গড়ায়। গড়িয়ে চলে। ভেসে চলে মেঘের সারি। ভেসে চলে প্রেমের ভেলা। কখন, ঠিক কোন মুহূর্তে কে জানে, আবার বাঁধ ভাঙে সংযমের, পাল ছেড়ে সংস্কারের। শিমুল চমকে উঠে দেখে তার মনে এই মুহূর্তে নীল ছাড়া আর কেউ নাই। অসহায় লাগে খুব, দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়। আনিসের সাথে সহজ হতে পারে না আর! আনিস প্রশ্ন করে তাকে, কি হয়েছে তার! কেন এত অস্থির সে, কেন এত অমনোযোগী! শিমুল ঝরঝর কাঁদে। আনিসের জন্য কষ্টও হয় তার।
সে আনিসকে খুলে বলে নীলের কথা। নীলের কথা আগেই জানতো আনিস। শিমুল কিছুই লুকোয়নি তাকে। লুকোনোর কিছুতো ছিলও না তার। বাল্যপ্রেম! সবারই থাকে অমন। দু-একটা চিঠি, চোখে চোখ, একটুখানি হাসি, সামান্য দুষ্টুমি। তাতে লুকোনোর আছেই বা কি! শিমুল তাই লুকোয়নি কিছুই। নীলের সাথে কথাও বলিয়ে দিয়েছে আনিসের।
শুধু জানায়নি এ ক দিনেই তারা যে অনেকটা দূরত্ব কমিয়ে ফেলেছে নিজেদের মধ্যে, আবার স্বপ্ন দেখছে আকাশে উড়ার, সে খবরটুকু। সেদিন বলে। বলতেই হয়। মনের মধ্যে নীলকে রেখে শরীরে আনিসকে ধারণ করার যন্ত্রণাটা বড় পীড়াদায়ক লাগে তার, রুচিতেও বাধে খুব। আনিস শান্ত হয়ে শোনে। ঠান্ডা গলায় জানতে চায়,
‘কি করতে চাও এখন?’
‘আমি তোমাকে ডিভোর্স দেবো। আমরা বিয়ে করবো!’- কাঁদতে কাঁদতেই বলে শিমুল।
আনিস যেন ভূত দেখে সামনে! অবাক হয়ে জানতে চায়, ‘কী বললে?’
একই কথা আবার বলে শিমুল। চোয়াল শক্ত হয় আনিসের। অস্ফুটে বলে- ‘ঠিক আছে।’
গুমোট হয়ে ওঠে দিন। গুমোট হয় রাত। ভাল মানুষ আনিস আর কত ভালো থাকে। পিষে ফেলতে চায় সে শিমুলকে। নিঃশেষ করে দিতে চায় তাকে। কেন সে চলে যেতে চায় অন্য কারো বুকে! তার পৌরুষে ঘা লাগে দারুণ। সে ভালোমানুষি দিয়ে চেষ্টা করে শিমুলকে বাধা দিতে। না পেরে হিংস্র হতে চায়। শিমুল সিদ্ধান্তে অটল।
কৌশল পাল্টায় আনিস। বলে বাসা ছেড়ে চলে যেতে। শিমুল তাতেই রাজি। চলে যাবে সে। তার তো নীল আছে! ভালোবাসার বন্যায় তাকে ভাসিয়ে নেবে সে, ডুবিয়ে দেবে তাকে অতল প্রেমের জলে!
মত পাল্টায় আনিস। বাধা দেয় শিমুলকে। বলে, যতদিন বিয়ে না করছে, ততদিন থাকুক শিমুল বরং তার কাছেই! আনিসের এই উদারতায় অবাক হয় শিমুল। মনে মনে একটু খুশিও। এর মধ্যে নীল তার সমস্যার কথা বলে বেশ অনেকগুলো টাকা নেয় শিমুলের থেকে। শিমুল দেয়। আনিসেরই টাকা। তাতে কি! নীল তো ধার নিচ্ছে! দিয়ে দেবে ঠিক। প্রায় সারাক্ষণই ফোনে কথা হয় নীলের সাথে।
খুব ভোরে ফোনটা বাজতেই কানে নিয়ে আদুরে গলায় শিমুল বলে, ‘নী-ল! ব-লো!’
ও প্রান্ত নীরব। শিমুল আবার বলে, ‘কি হলো নী-ল! ক-থা বলো!’
ওপাশে তবু কবরের নীরবতা, মহাকালের নিস্তব্ধতা! শিমুল এবার বলে, ‘হ্যালো নীল! কথা কলছ না কেন? রাগ করেছ?’
এবার ইথারে ভেসে আসে একটা কণ্ঠ। শিমুলের মনে হয় এই কণ্ঠটা সে শুনছে ভয়ানক কোন দুঃস্বপ্নের ঘোরে অথবা কোন আধিভৌতিক জগৎ থেকে ভেসে আসছে তা।
‘আপনি কে?’- প্রশ্নটা করা হয় শিমুলকে। হ্যাঁ, শিমুলকেই! শিমুল ভীষণভাবে চমকে ওঠে। নারী কণ্ঠ! অথচ ফোনটা নীলের। শিমুল যন্ত্রের মত বলে,
‘আমি শিমুল! আপনি কে?’
‘আমি নীলের স্ত্রী। আমাদের একটা বাচ্চা আছে। ওর বয়স তিন বছর। নীল আমাকে আপনার কথা বলেছে।’
পৃথিবীটা হঠাৎ করে স্থানচ্যুত হয় কি? অমন করে দুলে ওঠে কেন সব! শিমুলের কানের মধ্যে গরম সীসা ঢালে কে! নিজেকে তবু শান্ত রাখে শিমুল। শুকনো কণ্ঠে জানতে চায়-
‘কি বলেছে?’
‘বলেছে, আপনি আমার হাজবেন্ডকে খুব ডিস্টার্ব করেন। আর করবেন না। আমরা ভালো আছি। আমাদেরকে শুধু শুধু বিরক্ত করবেন না।’
ফোনটা নীরব হয়ে যায় ভীষণ। শিমুলের চেনা পৃথিবীটা খুব অচেনা হয়, রং হারায় হঠাৎ। অনেকক্ষণ পর আবার ফোন বাজে। নীল।
‘হ্যালো।’- মৃত গলায় বলে শিমুল।
‘স্যরি শিমুল!’- নীলের গলা।
‘আমি তোকে ডিস্টার্ব করি, নীল?’
‘শিমুল স্যরি! আসলে-’
‘কেন আমায় মিথ্যে বলেছিলি নীল? কেন বলেছিলি বিয়ে করিসনি তুই? কেন বলিসনি বাচ্চা আছে তোদের!’
‘বললে কি আমায় আবার ভালোবাসতিস তুই!’- নীলের কণ্ঠে অদ্ভুত এক সুর! আহ্! চিরচেনা মানুষগুলো এতো অচেনা কেন হয় হঠাৎ! বুকের মধ্যে কেন ঢেলে দেয় এমন তরল আগুন! কেন ঢুকিয়ে দেয় ইস্পাতের তীক্ষè ফলা!
আর কোনো কথা বলে না শিমুল। আর কোন শব্দ বের হয় না তার কণ্ঠ থেকে। ফোনটা অফ করে দেয় সে। সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরলে সে আনিসকে বলে তাকে একটা নতুন সিম কার্ড কিনে দিতে।
সাত বছর পর কোত্থেকে এই নম্বরটা পেলো নীল! কেন সে আবার ফোন দেয়। নম্বরটা বক করা তার। ফোন আসে না এখন আর। নীলের নম্বরটা লাল ক্রস চিহ্ন হয়ে ফুটে থাকে স্ক্রিনে। শিমুলের সেটটাতে খুদেবার্তা বক করার অপশন নেই। ফোনটা তাই মাঝে মাঝেই ভূমিকম্পের কাঁপন তুলে জেগে ওঠে। নীল এক কষ্ট হয়ে ফুটে থাকে বুকের মধ্যে। বিঁধে থাকে কাঁটা হয়ে।
পাশের টিনের চালাটায় বিড়ালটা শুয়ে আয়েশ করে পা চাটে। ছায়া ছায়া রাত একটু একটু করে সুতো ছড়ায়। অদূরে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা বিল্ডিংগুলোর ছাদ নির্জনতায় ডুবে যায়। বেকার ছেলেটা শূন্য ছাদের রেলিং ধরে ঝুঁকে লাগোয়া বাড়িটার অন্ধকার জানালার দিকে বুভুক্ষুর মত চেয়ে থাকে। কখন জ্বলবে আলো! অপেক্ষা! অপেক্ষাই জীবন! রাস্তায় গাড়িগুলো ভীষণ শব্দ তুলে চলে। অনেক ব্যস্ত পৃথিবীটা। শুধু একা শিমুলেরই কোন ব্যস্ততা নেই। কোন অপেক্ষা নেই তার! টিনের চালায় শুয়ে থাকা বিড়ালটার মত আলস্যে গা এলিয়ে দেয় সে। বাচ্চাটা দুই দিন হলো গ্রামে বেড়াতে গেছে।
ঝাপসা চোখে আরও ঝাপসা হয়ে আসা আকাশ দেখে শিমুল। কলিংবেলটা মৃদু শব্দে গুঙিয়ে উঠেই থেমে যায়। আনিস অফিস থেকে ফিরলো হয়তো। আকাশটা কালো হয়ে আসে আরো। তারপর হঠাৎই মেঘ সরে যায়। আধখানা চাঁদ উঁকি দেয়। অদ্ভুত জ্যোৎস্নায় ভরে ওঠে পৃথিবীটা। শিমুল ঘোর লাগা চোখে তাকিয়ে থাকে। কলিংবেলটা গুঙিয়ে ওঠে আবার। শিমুল স্বপ্নলাগা চোখে আকাশে চেয়ে থাকে, চেয়েই থাকে। বুকের মধ্যে একটি মুদ্রা তুমুল বেগে নাচে। মুদ্রার দুই পিঠ। ভালোবাসা ও ঘৃণা। মুদ্রাটা উল্টে গেছে তার। অন্ধকার মুদ্রার পিঠটা শিমুলের বুকের মধ্যে ক্রমশ বড় হতে থাকে। পৃথিবী ততক্ষণে রাতের চাদরে মুখ ঢেকে নেয়। ঘোমটার আড়াল থেকে উঁকি দেয় চাঁদ, ছড়িয়ে দেয় অদ্ভুত সোনা সোনা হাসি। হ