আমি আফ্রিকার ছোট্ট রাজ্য সোয়াজিল্যান্ডের পার্বত্য অঞ্চলের একটি প্রাইভেট অভয়ারণ্যে বুশক্যাম্প করতে এসে এ মুহূর্তে যেখানে বসে আছি- তাকে ঠিক ট্রি-হাউস বলা চলে না। মাটি থেকে ফুট বিশেক উপরে একটি মস্ত বড় গাছের তিন তিনটি ডালে তক্তা বিছিয়ে তৈরি ঠিক শিকারের নয়- পর্যবেক্ষণের মাচা। আমার চারপাশে বেশ কয়েকটি সসেজ ট্রি। তাদের ঝুলন্ত ফলকে দেখাচ্ছে দৈত্যাকৃতির তেঁতুলের মতো। আমি মাচায় বসে শর্টওয়েভ ট্রানজিসটারের নভ ঘোরাই। সাউথ আফ্রিকার একটি রেডিও স্টেশন থেকে ভেসে আসে জার্মানির ডিসকো গ্রুপ বনি এম এর কণ্ঠস্বরে ‘বাই দ্য রিভার্স অব বেবিলন/ দেয়ার উই সেট ডাউন..।’ সত্তর দশকের এ স্মৃতিবিধুর অত্যন্ত জনপ্রিয় লিরিকের ভেতর দিয়ে অনুভব করি, শিমুলের তুলার মতো আমার মনে হালকা ভাবে উড়ছে নতুন কিছু ভাবনা; এবং গতকালকের দিনযাপনের কয়েকটি মনোগ্রাহী ইমেজ। ভ্রমণসংক্রান্ত অনিশ্চয়তায় ভুগছিলাম সকাল থেকে, দুপুরের দিকে ফ্লাইট মিস করা যাত্রীর মতো ভার হয়েছিলো মন। অতঃপর নোপেপ্ট বলে একটি মুড এনহানসিং ড্রাগ নিলাম। তাতে টেনশনে টানটান হয়ে থাকা শিমুলের শুকনা ফলটি যেন ভেতরে বিস্ফোরিত হলো। এখন মৃদু হাওয়ায় রীতিমতো উড়ছে গত দিনের যাপিত দৃশ্যপট। মাচার নিচে একটি শুকা নদী, তাতে জল খুবই সামান্য, পড়ে আছে প্রাকৃতিকভাবে অবহেলায় অসংখ্য ধূসর পাথর, খটখটে শুকনা সাদাটে বেশুমার নুড়ি। তীরেও ছড়ানো কতগুলো ডলারাইট রকের ভারী বোল্ডার।
শর্টওয়েভ ট্রানজিসটার ছাড়াও আমার পাশে অন করে রাখা আছে একটি ওয়াকিটকি। এ ধরনের ওয়াকিটকিকে বলা হয় রেডিও মনিটর, এর একটি জোড়ও আছে। এবং এ মহূর্তে তা পড়ে আছে ইয়োরগান ও ব্রিজিতের কন্যা কার্লার দোলনার পাশে। ছোট্ট এ মেয়েটি শুয়ে আছে সেমি-ওপেন স্টোন কটেজ বলে খোলামেলা একটি পাথরে তৈরি শনে ছাওয়া কুটিরে। বাচ্চাটি দোলনায় ঘুমাচ্ছে একাকী। মা ব্রিজিত তাকে দুধের সাথে ব্র্যান্ডি মিশিয়ে খাইয়েছে। এতে তার নিদ্রা দীর্ঘমেয়াদি হবে। সহসা ঘুম ভাঙার কোন কারণ নেই। তবে শিশুদের বিষয়-আশয় অতো নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। যদি তার ঘুম ভেঙে যায়, যদি কেঁদে ওঠে কার্লা; ওয়াকিটকির রেডিও ওয়েভের মাধ্যমে আমি তা শুনতে পাবো। তখন মাচা থেকে নেমে স্টোন কটেজে ছুটে যেতে আমার সময় লাগবে মিনিট দুয়েকের মতো। আতকা ঘুম টুটে গেলে কার্লাকে শান্ত করার জন্য ব্রিজিত পাশে একটি খেলনা গিটার রেখে গেছে। তার বাদন শুনতে কার্লা খুব পছন্দ করে। আমি বেবি সিটার নই, গিটার বাজানোর দক্ষতাও আমার সহজাত নয়। কিন্তু একটি ঘুমন্ত শিশুর দায়িত্ব আমার ঘাড়ে আজ অনিচ্ছায় চেপেছে। তাতে সৃষ্টি হয়েছে কিছু স্নায়ুবিক উত্তেজনা ও মানসিক উদ্বেগ।
তবে নোপেপ্ট ট্যাবলেটটি সেবন করায় আমি খানিকটা স্থিরতা ফিরে পাচ্ছি। মন একাগ্র হয়ে উঠতেই ভাবি জার্নালে লিখে ফেলতে হয় গেল দেড় দিনে যা যা ঘটেছে। আমি এ মুহূর্তে সোয়াজিল্যান্ডের একটি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন অভয়ারণ্য- মখাইয়া গেম রিজার্ভের গাছের ডালে ছড়ানো যে মাচায় বসে আছি, ওখানে আছে গোটা দুই বেতের চেয়ার ও ছোট্ট একটি টেবিল। তাতে নোটবুক মেলে ধরে কিছুক্ষণ আগে স্মৃতি হয়ে ওঠা দৃশ্যপট ও ভাবনাকে গোছাতে শুরু করি।
আফ্রিকার নানা দেশে ঘুরে বেড়ানো দম্পতি ইয়োরগান ও ব্রিজিত এবং তাদের শিশুকন্যা কার্লার সাথে আমার দেখা হয়েছে সোয়াজিল্যান্ডের রাজধানী শহর মবুবানের প্রান্তিকে সন্ডঝেলা ব্যাকপ্যাকার্স লজে বসবাসের সুবাদে। কাছাকাছি দু’টি কটেজে আমরা কয়েকদিন বসবাস করেছি, এবং হরেক রকমের মিথস্ক্রিয়ার ভেতর দিয়ে আমাদের মধ্যে গড়ে উঠেছে খানিকটা অন্তরঙ্গতা। কথা ছিলো- গতকাল আমি ইয়োরগান ও ব্রিজিতের ল্যান্ডরবারে লিফ্ট নিয়ে লামাহাসা-নামসা বর্ডার ক্রসিং দিয়ে মোজাম্বিকে ঢুকে ভিয়েরা শহর অব্দি যাবো। সে অনুযায়ী সন্ডঝেলা ব্যাকপ্যাকার্স লজ থেকে চেকআউট করেছি সাতসকালে। কিন্তু বেরিয়ে পড়ার প্রস্তুতি না নিয়ে ভোরবেলা অনেকক্ষণ মেকাপ করে কাটায় ব্রিজিত। তারপর লাউঞ্জে হাইহিল পরে আমার কাছে এসে খিলখিল হেসে জানতে চায়, তাকে কেমন দেখাচ্ছে? তখনই কী কারণে জানি ইয়োরগানের সাথে জার্মান ভাষায় তার খিটিমিটি বাধে। ইয়োরগান লাউঞ্জের ফ্লোরে কার্পেটের উপর ছড়িয়ে বসে নানা মডেলের তিন-চারটি ক্যামেরা, অনেকগুলো ল্যান্স, ট্রাইপড ও ফ্লাশলাইট ইত্যাদি গোছাচ্ছিল। কিছু ভালো করে বোঝার আগেই কোথা থেকে কি হয়ে গেলো! ব্রিজিত হ্যাজাক বাতির চিমনি খুলে নিয়ে ইয়োরগানের দিকে তা ছুড়ে মারে। ইয়োরগান গালিগালাজের পাল্টি না তুলে ফ্লোর থেকে ভাঙা কাচ কুড়াতে কুড়াতে গরমে মজবুর বিলাতি কুত্তার মতো হাঁপায়। এ ধরনের ঝামেলা তাদের প্রাইভেটলি ঘাঁটাতে দেয়া উচিত ভেবে আমি লাউঞ্জ থেকে সরে আসি নীরবে। বাইরে আসতেই দেখি একটু আগে আমি সন্ডঝেলা ব্যাকপ্যাকার্সের যে কটেজ থেকে চেকআউট করেছি- তাতে ব্যাগ, বস্তনি, বেডরোল ও ব্যাকপ্যাক নিয়ে চেক-ইন করছে ইউক্রেন থেকে আসা এক পর্যটক দম্পতি।
ঘণ্টা খানেক পর আমি আবার খোঁজ নেই, আন্দাজ করি ততোক্ষণে তাদের উত্তেজনা কমে এসেছে, এবং তারা মোজাম্বিক বর্ডারের দিকে বেরিয়ে পড়ার জন্য তৈরি হয়ে উঠছে। না, তাদের কটেজে সামানাদি তেমন একটা গোছগাছ হয়নি। দু’জনকে পাওয়া যায় লাউঞ্জে। ব্রিজিত হাসি মুখে কার্লাকে কিভাবে বালা-মসিবতে বুকে আঙুল দিয়ে ক্রুশ চিহ্ন আঁকতে হয় তা শেখাচ্ছে। আমার দিকে সে ফিরে তাকানোর কোন প্রয়োজনবোধ করে না। তার পুরুষ ইয়োরগান রকিং চেয়ারে বসে মুখখানা শামুকের মতো করে তুর্কি লেখক পামুক ওরহ্যানের একটি বই পড়ছে। জানতে চাই, ‘তোমরা বেরোবে কখন?’ ইয়োরগান মৃদু স্বরে বলে, ‘অতো তাড়া কিসের?’ আমি কী বলবো তা নিয়ে ভেবে খানিক ইতিউতি করে বলি, ‘মোজাম্বিকের সীমান্ত অব্দি পৌঁছতে হলে, ইউ নিড টু হিট দ্য রোড নাউ’, বলে তার উত্তরের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকলে সে বিরক্ত হয়ে বলে, ‘অত চটজলদি রেডি হওয়া যাবে না, তোমার অসুবিধা হলে আমাদের সাথে মোজাম্বিক গিয়ে কাজ নেই, পড়ে থাকো সন্ডঝেলা ব্যাকপ্যাকার্সে।’ একটু আগে এ দম্পতির লিফ্ট দেয়ার প্রতিশ্রুতির ওপর ভরসা করে কটেজ থেকে চেকআউট করেছি। আমার ঘরে কিছুক্ষণ পর ইউক্রেনের এক দম্পতি ঢুকে পড়েছে। অন্য কোন কামরা খালিও নেই। এখন সন্ডঝেলাতে থাকতে চাইলে গাছের ডালে চড়ে বসে রাত কাটাতে হয়।
আমি দাঁড়িয়ে আছি দেখে ইয়োরগান বইখানা নেড়ে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গি করে। দেখি প্রচ্ছদে তুর্কি লেখকের নামের পাশে বইটির টাইটেল লেখা ‘হোয়াইট ক্যাসোল’, আমার হাত চুলবুল করে ওঠে ইয়োরগানকে একটি জুতসই চটকনা কষানোর জন্য। আমার নীরব ক্রোধ বন্য হয়ে উঠলেও তা সামলাতে হয়, উপায় নেই, এদের ল্যান্ডরবারে যে লিফ্ট নিতেই হচ্ছে। এছাড়া সোয়াজিল্যান্ড থেকে পয়সা খরচ না করে বেরোনো মুশকিল।
দুপুর গড়িয়ে বিকাল হতে চললে ব্রিজিত এসে হাসিমুখে আমাকে ডেকে নেয় তাদের ল্যান্ডরবারে। সব কিছু গোছগাছ করে ড্রাইভিং সিটে বসে আছে ইয়োরগান। তাদের জলপাই রঙের ল্যান্ডরবারখানা আফ্রিকান সাফারির জন্য একেবারে লাগসই। পেছনে দু’ চাকার আলগা ট্রেলারে করে তারা বয়ে নিয়ে চলেছে শিশুতোষ সাইকেল, কার্লার জন্য পাম্প দিয়ে ফুলানো যায় এ রকমের ছোট্ট সুইমিং পুল; আর কুলার ভর্তি শিকার করা হরিণের মাংস ও বিস্তর খাবার দাবার।
হঠাৎ খেয়াল হয় ইয়োরগান গাড়ি ছোটাচ্ছে মবুবান শহর থেকে উত্তর দিকে। মোজাম্বিক যাওয়ার লামাহাসা-নামচা বর্ডারপোস্ট ঠিক উল্টা দিকে। বিষয় কি? জানতে চাইলে ব্রিজিত ঠোঁটে লিপগ্লস ঘষতে ঘষতে জবাব দেয়, ‘সন্ধ্যাবেলা আমরা মোজাম্বিকে ঢুকতে চাচ্ছি না। আর সোয়াজিল্যান্ডের অভয়ারণ্য মখাইয়া গেম রিজার্ভ আমাদের দেখা হয়নি এখনো। সাত শত পঞ্চাশ একরের এ ফরেস্টে আছে অজস্র আকাশিকা নিগ্রেসেনস্ ট্রি, এ গাছগুলোকে সিসওয়াতি ভাষায় বলা হয় মখাইয়া গাছ। দিস ইজ জাস্ট অ্যা পিস অব অনস্পয়েল্ট উইলডারনেস। তো চলো আমাদের সাথে, ভাবছি আমরা মখাইয়া রিজার্ভে রাত কাটিয়ে দেবো।’
যাত্রায় ডিরেকশন পরিবর্তনের বিষয়টি আমি মেনে নিতে পারি না, একটু রিঅ্যাকশন হয়, বলি, ‘আমার যে মোজাম্বিকের দিকেই যাওয়া প্রয়োজন।’ ইয়োরগান ল্যান্ডরবারের গতি স্লো করতে করতে বলে, ‘অসুবিধা কিছু নেই, তোমাকে আমরা এখানে ড্রপ করে দিচ্ছি, রাজপথে ঘন্টা দেড়েক দাঁড়িয়ে থাকলে তুমি কম্বি জাতীয় মাইক্রোবাস পেয়ে যাবে। তা ধরে চলে যাও লামাহাসা-নামচা বর্ডারে।’ আমার মস্তিষ্কে রোদেলা দিনে অপ্রত্যাশিত বৃষ্টির মতো অনিশ্চয়তার ঝাপটা লাগে। উদ্বিগ্ন হই যদি বর্ডারের দিকে যাওয়ার জন্য কম্বি না পাই, আর তা পাওয়া গেলে বহনটি পথে পথে নামাবে যাত্রী, লেট করে সীমান্তে পৌঁছলে যদি ততোক্ষণে ক্রসিং বন্ধ হয়ে যায়- তাহলে পথচলার সম্বল বোঁচকা, ব্যাকপ্যাক, লোটাকম্বল নিয়ে উঠবো কোথায়? আমাকে দ্বিধাগ্রস্তভাবে স্নায়ুতে টেনশন নিয়ে বেশিক্ষণ বসে থাকতে হয় না। ব্রিজিত পেছনের সিটে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘হি ইজ গোয়িং উইথ আস। দিন দুই মখাইয়া রিজারভেশনের ফরেস্টে আমাদের সাথে কাটালে তার ক্ষতি কিছু হবে না।’ ইয়োরগান তার বক্তব্যের কোন জবাব না দিয়ে আবার জোরে ল্যান্ডরবার ছোটায়। পেছন দিকে বাড়িয়ে দেয়া ব্রিজিতের হাত আমি স্পর্শ করি। আমার হাতের তালুতে তার আঙুল কাঁকড়ার পদচিহ্নের মতো হিজিবিজি রেখা আঁকে।
অভয়ারণ্য মখাইয়া রিজারভেশনে আমরা এসে পৌঁছি বিকাল গড়িয়ে পড়ার সময়। বাদামি ঘাসে ভরা ভূভাগে কিছুটা দূরে দূরে দাঁড়িয়ে মখাইয়া বৃক্ষগুলো অভিনেত্রীরা যে রকম মঞ্চে যাওয়ার আগে মেকাপ নেয় সে রকম পত্রালিতে মেখে নিচ্ছে বেলাশেষের বর্ণাঢ্য আলোছায়া। আমরা চলে আসি একটি গাছপালায় ছাওয়া মেঠোপথের কাছে। সোয়াজি সম্প্রদায়ের কয়েকটি মেয়ে লোহিত রঙের বর্ণাঢ্য পোশাক পরে মাথায় চা এর সরঞ্জাম নিয়ে অলস ভঙ্গিতে হেঁটে যাচ্ছে। আন্দাজ করিÑ এরা পর্যটকদের তাঁবু বা কটেজে বিক্রি করছে চা বা কফি। ল্যান্ডরবারের গতি গড়িয়ে চলার মতো স্লো হলে উইন্ডো দিয়ে মৃদু হাওয়ায় ভেতরে ঢুকে পড়ে নির্লিপ্ত এ ল্যান্ডস্কেপের কিছু কাকলি ও পতঙ্গের বুনো শব্দ। মাঠে অন্যমনস্কভাবে চরছে কয়েকটি জেব্রা। তাদের জাবরকাটা দেখলে মনে হয় কোন কিছুতেই এ প্রাণীদের বিশেষ কোন আগ্রহ নেই। এখানে বাস করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে তাদের ঘাড় ধরে চিড়িয়াখানায় চালান দিলেও তারা বোধ করি মনে কিছু করবে না। আমাদের ল্যান্ডরবার মোরাম বিছানো পথে গড়গড়ানো আওয়াজ তুলে গড়িয়ে যায় এক মজা পুকুরের কাছ দিয়ে। দেখি তার পাড়ে বসে আরামসে ঝিমাচ্ছে দু’টি গন্ডার।
রেঞ্জারদের কাছ থেকে সেমি-ওপেন স্টোন কটেজ বা পাথরের অর্ধেক দেয়াল দেয়া, খোলামেলা শনে ছাওয়া কটেজ ভাড়া করে আমরা মৃত গন্ডারের মাথার খুলি দেখার জন্য রিজারভেশন অফিসের পেছন দিকে আসি। এ অভয়ারণ্যে পোচিং বা অবৈধভাবে গন্ডারের শিকার চলছে হামেশা। পাহারা দিয়েও রেঞ্জাররা এ সমস্যার কোন কূলকিনারা করতে পারছে না। কারণ চীনদেশে রাইনো হর্ন বা গন্ডারের শুকনা খড়গের চূর্ণ নানাবিধ রোগের উপশম এবং যৌন ক্ষমতা বৃদ্ধিকারক বটিকা হিসাবে বাজারে দেদার বিক্রি হচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে মাফিয়া নিয়ন্ত্রিত ব্ল্যাকমার্কেটে এক কিলো খগড় চূর্ণের দাম হচ্ছে ষাট হাজার মার্কিন ডলার। এ বিপুল ডিমান্ডের খতরা স্বরূপ প্রতিদিন অপঘাতে মারা যাচ্ছে একাধিক গন্ডার। রিজারভেশনের কর্তৃপক্ষ কিছু গন্ডারের মাথার খুলি সারি দিয়ে সাজিয়ে রেখেছেন একটি চালাঘরে।
খুলি দেখা মাত্র ব্রিজিতের ভিমরতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। সে টপের ওপর একটি হান্টিং ভেস্ট চড়িয়ে চুলে ইস্পাতের কাঁটাঅলা হ্যাট মাথায় দিয়ে সটান শুয়ে পড়ে ঘাসে। তার আহ্লাদিপনাকে উৎসাহিত করার জন্য ইয়োরগান ফরেস্ট গার্ডকে উৎকোচ হিসেবে ভেট দেয় এক বোতল কনইয়াগি জিন। গার্ড মহা-উৎসাহে ব্রিজিতের মাথা, দু’কান, বাহু, তলপেট ও পায়ের পাতায় স্থাপন করে আটটি গন্ডারের করোটি। ইয়োরগান করোটিতে কণ্টকিত নারীর ছবি তুলতে তুলতে ফুর্তিতে গুনগুনিয়ে গায় বনি এম এর, ‘আফ্রিকান মুন/ রোলিং উইথ দ্য মাইটি উয়েভস/ উই উইল বি দেয়ার সুন।’
ফরেস্ট গার্ডের নাম মি. ককোসোর। সন্ধ্যা লাগার মুখে তিনি আমাদের নিয়ে আসেন স্টোন কটেজে। বুশক্যাম্প এরিয়ায় এ কটেজ ছাড়াও আছে দূরে দূরে ছড়ানো আরো কয়েকটি কটেজ ও দু’তিনটি তাঁবু। পুরা এলাকা ইলেকট্রিক তারের তিন প্রস্থ বেড়া দিয়ে ঘেরা। সুতরাং খিদা লাগলে চিতাবাঘ বা সিংহ এখানে ঢুকে পড়ে মানব দেহ দিয়ে ভোজন সারতে পারবে না। তবে তাদের চিৎকার, হট্টগোল ও তৃণভোজী প্রাণীর মাংস নিয়ে খকরাখাকরি শোনা যাবে সারা রাত। স্টোন কটেজের দেয়াল সম্পূর্ণ খোলা, কোন দরোজা জানালার বালাই নেই। মি. ককোসোর বিছানার উপর মস্তবড় মশারি খাটিয়ে দেন। এ কুটিরে বাস করলে খোলামেলা হাওয়ায়, পাতা-লতা-ফুলের গন্ধে বনের ভেতর মহলে শুয়ে আছিÑ এ রকমের অনুভূতি হবে বটে; কিন্তু এগুলো দামে অত্যন্ত এক্সপেনসিভ, আমার বাজেটে কুলাবে না বলে আস্ত একটি কটেজ ভাড়া নিতে দ্বিধা করি। ইয়োরগান ক্যাম্পফায়ারের আগুন জ্বালানোর জন্য মি. ককোসোরের সাথে একটু দূর থেকে লাকড়ি আনতে গেলে ব্রিজিত আবার আমার হাত স্পর্শ করে। খুব আন্তরিকভাবে বলে, ‘কটেজ ভাড়া করতে যাবে কেন? আমাদের ট্রেলারে আছে এক্সট্রা তাঁবু। খুঁজে দিচ্ছি একটি এখনই।’
ইয়োরগান ক্যাম্পফায়ারে পুরানো পত্রিকায় ম্যাচকাঠি ঘষে আগুন জ্বালানোর উদ্যোগ নেয়। মি. ককোসোর গাছের ডালে ডালে কয়েকটি প্যারাফিন তেলের লণ্ঠন ঝুলিয়ে দিলে মৃদু আলোয় জায়গাটি রহস্যময় হয়ে ওঠে। ট্রেলারে একটি ফ্যামিলি সাইজ টেন্ট ছাড়াও পাওয়া যায় কার্লার জন্য শিশুতোষ একটি তাঁবু; এবং জিনিসপত্র রাখা, রান্নাবান্না এবং ডাইনিংরুম হিসেবে ব্যবহার করার জন্য আরেকটি মাঝারি মাপের তাঁবু। খাবারের তাঁবুটির দেয়াল সিল্কের নেটে জালি জালি। প্রচুর আলোবাতাস ঢুকে বলে তা আমার পছন্দ হয়। কিন্তু শুকা নদীর তীরে তা খাটাতে গিয়ে দড়িদড়ায় আমি তালগোল পাকিয়ে ফেলি। একটু পর ফ্লাশলাইট নিয়ে আমার উদ্ধারে ব্রিজিত এগিয়ে আসে। সে হাতে করে নিয়ে এসেছে উইনচেস্টার রাইফেলটি। তা ডলারাইট রকের বোল্ডালের উপর রেখে ফ্লাশলাইট দেখিয়ে বলে, ‘আমি তাঁবু খাটিয়ে দিচ্ছি, তুমি ততোক্ষণে এ আলোতে নল সলতে দিয়ে ক্লিন করে তাতে টোটা ভরে ফেলোতো। আমি বিছানার পাশে লোডেড রাইফেল রেডি রেখে ঘুমাতে পছন্দ করি। দিস ইজ বুশক্যাম্প, যতই ইলেকট্রিক তার দিয়ে ঘেরা হোক, রাতের বেলা বন্যজন্তুর আক্রমণের কথা ভেবে প্রস্তুত হয়ে ঘুমাতে হয়।’ এ ধরনের কাজ আমি ইহজন্মে কখনো করিনি, তাই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি রাইফেলের দিকে। বিষয়টি লক্ষ করে তাঁবুর দড়িদড়া রেখে ব্রিজিত ফিক করে হেসে কাছে এসে আমার চুল মুঠি করে বলে, ‘ইউ আর অ্যা ট্যোটাল স্টুপিড, কিভাবে বন্দুক পরিষ্কার করতে হয়, এ ঘোড়ার ডিমও জানো না, আবার এসেছো আফ্রিকান জংগলে বুশক্যাম্পে রাত কাটাতে। অ্যা ট্যোটাল.. ট্যোটাল স্টুপিড।’ না, চুলে সে ঠিক বিলি কাটে না, তবে আঙুল দিয়ে আমার কপালে হিজিবিজি কি যেন লিখে। ভাষাটি আমি ঠিক ধরতে পারি না, তবে অনুমান করি, আমাকে তার বলার কিছু একটা আছে। মাথায় এ ভাবনা আসতেই আমার মেরুদন্ড দিয়ে শিহরণ খেলে যায়।
এদের ট্রেলারে ভাঁজ করে রাখা যায় এরকমের কিছু ফার্নিচারও আছে। ইয়োরগান ক্যাম্পফায়ারের পাশে ক্যানভাসের চেয়ার পেতে বসলে ব্রিজিত খুব আহ্লাদি ভঙ্গিতে তার কোলে বসে। তারপর সে পিছলে দু’ পায়ের ফাঁক গলে চেয়ারে পিঠ ঠেকিয়ে চোখ মুদে বসলে ইয়োরগান তার খোলা কাঁধ ম্যাসেজ করে দেয়। তারা কনইয়াগি জিন পান করতে করতে দৈহিক অন্তরঙ্গতায় ক্রমাগত নিবিড় হয়ে ওঠে। এ জার্মান যুগল রাতের বেলা আহারাদির বিষয় সম্পূর্ণ ভুলে গেছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, খাওয়া দাওয়ার চেয়েও শরীরী শৃঙ্গার তাদের কাছে অধিক কাম্য। আমি বাঙালি, অনাহারে থাকা আমার জন্য আত্মহননের চেয়েও কঠিন। কিছুদিন ধরে আমি স্বপাকে খাচ্ছি বলে আমার ব্যাগে খাবারদাবারের খানিকটা সরবরাহ আছে। তো আমি হাঁড়িতে চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজের সাথে অলিভ ওয়েল, কারি পাউডার ও গরম মশলা দিয়ে খিচুড়ি রান্না করি। দু’জনে তা উৎসাহের সাথে খেয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে যেন উল্কা কিংবা নক্ষত্র খোঁজে। ব্রিজিত কনিইয়াগি জিন কুলকুচা করে আগুনের দিকে ছুড়ে দিলে উসকে ওঠে নীল শিখা। আর ঠিক তখন সাসেজ বৃক্ষের ঝুপসি ডালপালার ভেতর দিয়ে কামানের গোলার মতো বেরিয়ে আসে লালচে রঙের চাঁদ।
ব্রিজিত ইয়োরগানের গলা জড়িয়ে ধরে আমাকে দেখিয়ে বলে, ‘হানি, নাউ শো হিম ইউ লাভ মি সিরিয়াসলি। ডু সামথিং স্ট্রেঞ্জ এন্ড টেরিবোল।’ ইয়োরগান চেয়ার ছেড়ে আগুনের কুন্ডের কাছে এসে সত্যিই একটি স্ট্রেঞ্জ আচরণ করে। সে পোড়ামোড়া লাকড়ি থেকে এক টুকরা জ্বলন্ত অঙ্গার ভেঙে নিয়ে তা রাখে তার হাতের তালুতে। ‘দিস ইজ ট্রুলি টেরিবোল!’ বলে ব্রিজিত খিলখিলিয়ে উঠলে ইয়োরগান এলসেশিয়ান কুত্তার মতো মৃদু মৃদু হাঁপায়। তার হাতের তালু পুড়ে যাচ্ছে কিন্তু সে তা ঝেড়ে ফেলে দেয় না। ব্রিজিত এবার তার হাতে ঝটকা মেরে অঙ্গার ফেলে দিয়ে ‘দিস ইজ এনাফ হানি’, বলে তাকে টেনে নিয়ে যায় স্টোন কটেজে। নদীর ওপারে কয়েকটি হায়েনা রক্তাক্ত চাঁদের দিকে তাকিয়ে হেসে ওঠে খিকখিকিয়ে। আর আমি বুনো জ্যোৎস্নায় ক্যাম্পফায়ারের পাশে বসে ভাবিÑ স্রেফ কপালগুণে ব্রিজিতের প্রেমিক হইনি। সে সম্ভবত তার পুরুষকে এখন মশারির ভেতর শুইয়ে হাতের তালুতে মলম মাখিয়ে দিতে দিতে সহমরণে পুড়ে মরার প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিচ্ছে।
বেশ খানিকক্ষণ একটানা গতকালকের ঘটনা লিখে আমি একটু ব্রেক নেই। ঠিক তখনই ওয়াকিটকিকে ক্রেকলিং সাউন্ড হয়। আমি সতর্ক হয়ে উঠে দাঁড়াই। ইয়োরগান ও ব্রিজিত এখনো ফিরে আসেনি। কার্লার দেখভালের দায়িত্ব আমার উপর। ঘুম ভেঙে কেঁদে উঠলে খেলনা গিটার বাজিয়ে শিশুটিকে এন্টারটেইন করতে হবে আমাকে। কিন্তু না, মেয়েটি কেঁদে ওঠে না। সে স্বপ্নের ঘোরে জার্মান ভাষায় দু’ তিনটি শব্দ উচ্চারণ করে সশব্দে হেসে উঠে ঘুমিয়ে পড়ে পুনরায়।
আমি আবার ফিরে যাই নোটবুকে জার্নাল লেখায়। মনোযোগ দেই আজ সকালের ঘটনাবলির দিকে। ব্র্যাকফার্স্টের বন্দোবস্ত করেন মি. ককোসোর। তিনি আগুন জ্বালিয়ে হাঁড়িতে কর্ন পরিজ রেঁধে তৈরি করেন তপ্ত কফি। মি. ককোসোর ওঠে যেতেই কী কারণে জানি ঘোরতর বসচা বাধে ব্রিজিত ও ইয়োরগানের মধ্যে। তর্কাতর্কি করতে গিয়ে ক্যাম্পফায়ার ছেড়ে দু’জনে ওঠে কার্লাকে নিয়ে চলে যায় স্টোন কটেজে। ওখানে বিষয়টি হাতাহাতিতে গড়ায়। এসব দেখার আমার কোন আগ্রহ না থাকলেও স্টোন কটেজে দেয়াল না থাকার ফলে তাদের পক্ষে পারিবারিকভাবে আব্রু রক্ষা করে সংঘাত চালিয়ে যাওয়া মুশকিল হয়ে পড়ে। এ বাবদে তাদের প্রাইভেসি নিশ্চিত করা কর্তব্য বিবেচনা করে আমি চলে আসি বুশক্যাম্পের ইলেকট্রিক তার দিয়ে ঘেরা ফেন্সের বাইরে। খানিক হাঁটাচলা করে সময় কাটাতে গিয়ে দেখি সড়কের পাশে মাঠের বাদামি ঘাসে চরছে চারটি বুনো মোষ। তাদের পিটে ও কানের কাছে বসে এঁটেল খুটে খাচ্ছে রঙচঙে কটি পাখি। যেন টাকাপয়সা পাবে এ রকম পাওনাদারের মতো তাকিয়ে তাকিয়ে একটি মোষ আমার দিকে অগ্রসর হলে আমি দৌড়ে অন্য দিকে পিঠটান দেই। কিন্তু মখাইয়া গাছগুলোর তলা দিয়ে বেশি দূর যেতে পারি না। রেগে যাওয়া উলা-বিলাইয়ের মতো গরগর করে ওঠে আরেকটি জানোয়ার। দেখি করচোরাস বুবাতি ঝাড়ের ঘন পাতার নিচে বসে শিকার করা হরিণের রান ছিঁড়ে রক্ত দিয়ে আচমন করছে বৃদ্ধ থুরথুরে গোছের এক সিংহ। সাহসের খামতি আছে বলে আমার খানিকটা দুর্নাম আছে, এ সুযোগে দুঃসাহস প্রদর্শন করে তা মোচনের কোন প্রয়োজন বোধ করি না। তো চোরের মতো চোঁ চোঁ দৌড়ে ফিরে আসি বুশক্যাম্পে।
স্টোন কটেজের কাছাকাছি আমি ফিরে এসেছি দেখে ক্যাম্পফায়ারে বালতি ভরা ময়লা পানি ছুড়ে দেয়ার মতো ছ্যাৎ করে তাদের ঝগড়াঝাটি আতকা নিভে যায়। ব্রিজিত ও ইয়োরগান অর্থবোধক দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে তাকায়। ঘন্টাখানেক পর দুধে ব্র্যান্ডি মিশিয়ে তারা কার্লাকে ঘুম পাড়িয়ে আমার হাতে রেডিও মনিটরের ওয়াকিটাকি ধরিয়ে দিয়ে দু’জনে ল্যান্ডরবার হাঁকিয়ে বেরিয়ে যায়। মাচার উপর বসে রেডিওতে বনি এম এর গান শুনতে শুনতে দেখি তারা শুকানদীর ওপারের সড়কে খুব ধীরে ধীরে ড্রাইভ করে এগিয়ে যাচ্ছে। সবুজ ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে নিরাসক্তভাবে চলমান গাড়িটির দিকে তাকায় বোকাসোকা গোছের এক জেব্রা। সড়কের পাশে বাঁকে ল্যান্ডরাবার করোচোরাস বুবাতি ঝোপের আড়ালে চলে গেলে ভাবি, আমার উপস্থিতিতে বোধ করি জুতমতো ঝাগড়াঝাঁটি কনটিনিউ করতে তাদের অসুবিধা হচ্ছিলো। এবার ল্যান্ডরবারের প্রাইভেসিতে দ্বন্দ্বযুদ্ধ ইচ্ছা-মাফিক বিস্তারিত হবে।
আমি কেবল মাত্র নোটবুকে আঁকিবুঁকি করছি। দেখি সড়কের কাছে বেরিয়ে এসেছে বয়সে খুবই তরুণ চ্যাংড়া গোছের দু’টি সিংহ। তারা পরস্পরের সাথে খুনসুটিতে মেতে উঠলে তাদের দেখায় স্কুল পালিয়ে নির্জন মাঠের প্রান্তে গাছতলায় অন্তরঙ্গ হওয়া কিশোর কিশোরীর মতো। খানিকপর ল্যান্ডরবারটি সড়কে সার্কোল কেটে ফিরে আসে আগের জায়গায়। স্কুলশিক্ষকের নজরে পড়লে যে রকম বালক বালিকারা অন্তরঙ্গতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয় দ্রুত, সে রকম গাড়ির আওয়াজে সিংহ দু’টি আলাদা হয়ে ইনোসেন্ট মুখে এসে সড়কে দাঁড়ায়। ল্যান্ডরবারে ব্রিজিত ও ইয়োরগানের সাথে গার্ড মি. ককোসোরকে বসে থাকতে দেখে একটু অবাকও হই। তাকে বোধ করি এরা ড্রাইভ করতে করতে পথে গাড়িতে পিক করেছে। উঠতি বয়সের যুগল সিংহ সড়ক ধরে আস্তে-ধীরে হাঁটে। তাদের পেছন পেছন গড়িয়ে গড়িয়ে মোরামের উপর দিয়ে মচমচিয়ে পথ ভাঙে জলপাই রঙের ল্যান্ডরবার।
খানিক পর ল্যান্ডরবারটি বুশক্যাম্পে ফিরে আসতেই আমি নোটবুক গুটিয়ে ফেলি। স্টোন কটেজের দিকে যেতে যেতে দু’জনে হাত নেড়ে আমাকে ওয়েভ করে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হয় দ্বন্দ্বযুদ্ধের অবসান হয়েছে, ব্রিজিতকে চনমনে দেখায়, বুঝতে পারি বিজয় তার হয়েছে, এখন চলছে সাময়িক সন্ধি, আর ইয়োরগানকে গৃহবন্দীর মতো বিধ্বস্ত দেখায়।
কার্লা জেগে ওঠে। আমি রেডিও মনিটরে তাদের কথাবার্তা ও শিশুটির আধো আধো বোল পরিষ্কার শুনতে পাই। ইয়োরগান গিটারে টুংটাং ধ্বনি তুললে নুড়িপাথরে বয়ে যাওয়া ঝর্ণার মতো খলখলিয়ে হাসে কার্লা। কটেজের বাইরে এসে ব্রিজিত সসেজ গাছের কান্ডে বেঁধে ঝুলিয়ে দেয় হ্যামোক বা দড়ির দোলনা। তাতে বসে দোল খেয়ে সে পরীক্ষা করে নেয় বাঁধন শক্তপোক্ত হয়েছে কি না?
হঠাৎ আমার ভেতরে নেমে আসে অবসাদ। বুঝতে পারি কেটে যাচ্ছে নোপেপ্ট ট্যাবলেটের ঘোর। এসব ড্রাগের সমস্যা এটা, মেয়াদ শেষ হলে ক্লান্তিতে ছেয়ে যায় শরীর। দেখি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আসছে ব্রিজিত। সে টুলে বসে নভ ঘুরিয়ে রেডিও মনিটর অফ করে আমাকে খুঁটিয়ে দেখে। জিন্সের ওপর কোমরে সে ফিতা দিয়ে অ্যাপ্রোনের মতো করে জড়িয়েছে ছোট্ট একটি হরিণের চামড়া। ওয়াকিটকি হাতে কার্লার দেখভালের দায়িত্বে থাকার জন্য সে আমাকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানায়। মনে হয় তার আরো কিছু বলার আছে। তবে আমি এনগেইজ হতে চাই না। তাই হাই ছেড়ে হাতে তুলে নেই সোয়াজিল্যান্ড নিয়ে লেখা একটি পর্যটন-পুস্তক। ব্রিজিত বেল্টে আটকানো পাউচ থেকে ধারালো কাঁচি বের করে হরিণের চামড়ার অ্যাপ্রোন থেকে কেটে নেয় একটি টুকরা। কাটাকুটি করে সে তাতে ক্রিসমাস ট্রির শেইপ দিয়ে আমার হাতে তুলে দিতে দিতে বলে, ‘ইউ লাভ বুকস্, পাতা মুড়ে রেখেছো কেন? দিস ইজ অ্যা ব্যাড হেবিট, তোমার বুকমার্কার ব্যবহার করা উচিত। টেক দিস অ্যাজ অ্যা বুকমার্কার।’ আমি হরিণের চামড়ায় সদ্য তৈরি বুকমার্কারের মসৃণ পশমে আঙুল বোলাতে বোলাতে ভাবি- মায়াময় চোখের প্রাণীটিকে ব্রিজিত কতদিন আগে রাইফেল দিয়ে শুট করেছে? তবে মুখে কিছু বলি না। আমার নীরবতায় একটু অবাক হয়ে সে বলে, ‘ইউ আর টায়ার্ড, আনচু?..ভেরি টায়ার্ড, আই ক্যান সি দ্যাট।’ আমি ঘাড়ে হাত বুলাতে বুলাতে বলি, ‘বালিশ হারিয়ে গেছে তো, তাই কাল রাতে তাঁবুতে শুধু বেডরোল পেতে ঘুমাতে গিয়ে মনে হয় ঘাড় বাঁকা হয়ে গেছে।’
আমার হাত ধরে মৃদু টানতেই আমি তার সাথে নেমে আসি মাচা থেকে। সে ট্রেলার থেকে খুঁজে পেতে একটি বাতাস ভরা এয়ার-পিলো বের করে তা ফোলাতে ফোলাতে বলে, ‘হ্যাভ অ্যা নেপ, হ্যামোকে শুয়ে ঘুমিয়ে নাও একটু।’
গোধূলি গাঢ় হয়ে ওঠার মুখে আমার ঘুম ভাঙে। হ্যামোকে বসে দুলতে দুলতে আমি পর্যটন-পুস্তক থেকে বের করে আনি বুকমার্কারটি। আর তীব্রভাবে স্বপ্নে দেখা দৃশ্যের কথা ভাবি সাথে সাথে। কাজল চোখের শিশু হরিণের ইমেজটি স্বপ্নে এতই স্পষ্ট ছিলো যে- তাকে বাস্তব বলে বিভ্রম হয়। মায়ামৃগটি হ্যামোকের কাছে এসে ছলছল দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো তার চামড়ায় তৈরি বুকমার্কারের দিকে। হ