সাযযাদ কাদির ঐতিহ্যবাদী, উত্তরাধিকার প্রাণবন্ত কবি। তিনি বিশ্বাস করেন:
‘আমি হঠাৎ গজাইনি। আমার পূর্বপুরুষদের লেখালেখি থেকে আমার জন্ম, তাদের সৃষ্টির সড়কপথেই আমার উত্থান।’
Yet we have gone are living
Living and partly living. – T.S. Eliot
কবি টি.এস. এলিয়ট ভাবতেন- মানুষ পরিপূর্ণ বেঁচে থাকে না, আংশিক বেঁচে থাকে। শহরের মানুষের এই বাঁচার জন্য বহু সমারোহ, নাগরিক-অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। নানা সংগঠন প্রতিষ্ঠানের বহুবিধ আয়োজন। এগুলো হলো ‘মেট্রোপলিটন শহরের মানুষের partly living- এর মহরত। বিনয় ঘোষের মতে, ‘তাদের শতচ্ছিন্ন মন ও য়ুর ছেঁড়া তারগুলোকে যতদূর সম্ভব উত্তেজনার মোচড় দিয়ে দিয়ে চাঙ্গা করার বিদারুণ প্রয়াস। ঢালু পাহাড়ের গায়ে সিসিফাসের পাথরের বোন্ডার তোলার চেষ্টার মতো- প্রাণপণ ঠেলে খানিকটা তোলা যায়, তারপর আবার গড়িয়ে পড়ে। মনের ছেঁড়া তারগুলো যতো বেসুরো হয়ে যায়, যতো অসাড় ও শব্দহীন হয়। তত নাগরিক উত্তেজনার বৈচিত্র্য বাড়তে থাকে।’
সাযযাদ-এর কবিতার নানা-রূপান্তরের মধ্যে তার ‘মেট্রোপলিটন মনের’ সাক্ষাতের সঞ্চরণ দেখতে পারবো।
সমাজ-ইতিহাস এবং সামাজিক ইতিহাসের অভিজ্ঞতা ছাড়া কেউ সমাজবিৎ হতে পারেন না। সমাজ নিয়ে কথা বলতে চাইলে সমাজের অন্তরঙ্গ এবং বহিরঙ্গ উভয়েরই বিশ্বস্ত পাঠ থাকা প্রয়োজন।
সব শিল্পীর নিজস্ব সত্তার ভেতর একটি কৃষ্ণাগ্নি প্রজ্জ্বল্যমান থাকে। সকল যুগের, সকল সমাজের ভেতর এই দ্রোহচেতনা শিল্পীদের মধ্যে জাগ্রত ছিলো। সাযযাদ কাদিরের সাহিত্যের মধ্যে, শিল্পী স্বভাবের মধ্যে এই ‘কৃষ্ণাগ্নি’ আমি প্রজ্জ্বলিত দেখেছি। ওঁর কবিতার বাক্প্রতিমা এবং শিল্পীশৈলীর ভেতরেও সেই ক্ষোভ ও সরবতা লক্ষ্য করা যায়। শব্দের সংখ্যা ও শৃংখলা কবিতাকে একটি অবস্থান থেকে অন্যতর, নবতর অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। পারে বহুদূরগামী করে তুলতে। কবির সামীপ্য অনুভব ও উপভোগ করতে চাইলে তার কবিতাশরীর স্পর্শে স্পর্শে স্পন্দিত করতে হলে এর ভেতরকার বিরোধ ও বিরোধাভাস অবলোকন করতে তো হবেই নিবিড় চেতনায়।
তনুক পসেদে পসাহনি ভাসলি
পুলক হু তইসন জাগু
চুনি চুনি ভএ কাঁচও ফাটলি
বাহুক বলএ ভাগু ॥
ভন বিদ্যাপতি কম্পিত কর হো
বোলল বোল ন যায়।
দেহের প্রস্বেদে (ঘামে) প্রসাধন ভেসে গেল, এমন পুলক জাগল যে কাঁচুলি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ফেটে গেল, বলয় ভাঙল। বিদ্যাপতি বলছেন, তারপর যা হল তা আর বলা যায় না, হাত কাঁপছে। তখন কবিরও হাত কাঁপত ‘সেই কথা লিখতে। এখন আমাদের হাত কাঁপে না। অটো মবিলের মতো অটোমেটিক লেখায় আধুনিক মানুষের জীবনের কথা অনর্গল বলা যায়। অথচ সেই মানুষের দেহ তো দেহেই আছে, কিন্তু প্রস্বেদ নেই, যা আছে তার নাম দুর্গন্ধ ঘাম। অথচ সেই মানুষের গোনাগুনতি নার্ভগুলো একই আছে, একটিও বাড়েনি বা কমেনি- কিন্তু সেই রোমাঞ্চ নেই, সেই শিহরণ নেই, যার ঝংকারের প্রতিধ্বনিতে একদা কাঁচুলি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ফেটে যেত, একদা বাহুর বলয় খান খান হয়ে ভেঙে যেত। শ্রান্তি আর অবসাদের বেড়া দিয়ে ঘেরা স্বায়ুগলো যেন জীবনের সমস্ত নিবিড় অনুভূতি থেকে বঞ্চিত, এবং মানুষ একটা নির্মম ঔদাস্যের দ্বীপে নির্বাসিত।’
বিনয় ঘোষ ওভাবে মেট্রোপলিটন মনকে (সরহফ) ব্যাখ্যা করলেন। কবি সাযযাদ কাদিরের কবিতা সমগ্রে এই মেট্রোপলিটন মনের উদ্ভাস লক্ষ করবো। তার চোখের সঙ্গে মনের, মনের সঙ্গে আদিম অন্তঃকরণের সংযোগটা ছিন্ন হয়নি। মনের ও অন্তঃকরণের নিবিড় সংযোগ ও বিচ্ছিন্নতা এখানকার কবিদের কাব্যনির্যাস বলা যায়। কবির, বিশেষ করে মেট্রোপলিটন কবির বেলায় নিঃসঙ্গতার সঙ্গে সঙ্গতা, অসংযোগের ছিন্নপত্রে হৃদয়-সংযোগের হরিৎ পত্রলির পল্লব ধ্বনির চাঞ্চল্য চলষ্মান।
সাযযাদ কাদিরের কবিকর্ম ও সাহিত্যের পাঠ-সূচি সম্পর্কে সম্যক ধারণা কিংবা সামান্য অধীত বিষয়, প্রথমত: অবগত হওয়া সমীচীন। সাযযাদ কাদির জন্মেছেন ১৯৪৭ সালে, টাংগাইল জেলার দেলদুয়ার গ্রামে। লেখাপড়া করেছেন টাংগাইলের বিন্দুবাসিনী হাই স্কুলে। ওখান থেকেই ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ১৯৬২ তে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন। অধ্যাপনা করেছেন মওলানা মুহাম্মদ আলী ডিগ্রি কলেজে এবং করটীয়া সাদৎ কলেজেও, ১৯৭২ পর্যন্ত।
এরপর সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ করেন। সাপ্তাহিক বিচিত্রায়-১৯৭৬-এ। ওখান থেকে চীনের রেডিও বেইজিংও যোগদান করেন ১৯৭৬-এ। কথাশিল্পী আরেফিন বাদল প্রতিষ্ঠিত ‘সাপ্তাহিক তারকালোকে’ বেশ কিছুকাল কর্মরত ছিলেন। দৈনিক দিনকাল (১৯৯২), বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউট (১৯৯৫), দৈনিক মানব জমিনে যুগ্ম সম্পাদক হিসাবে কাজ করেছেন (২০০৪)।
সাযযাদ কাদিরের গন্থ তালিকায় রয়েছে ‘যথেচ্ছ ধ্রুপদ’, (কাব্য ১৯৭০), এটাই তার প্রথম বই। ‘চন্দনে মৃগ পদচিহ্ন’ (গল্প ১৯৭৬), বেগম রোকেয়া প্রবন্ধ সমগ্র (সম্পাদনা), ‘অন্তর্জাল’ (উপন্যাস ২০০৮); রবীন্দ্রনাথ: শান্তি নিকেতন (গবেষণা ২০১২), রবীন্দ্রনাথ: মানুষটি (গবেষণা ২০১২); খেই (উপন্যাস ২০১২); বৃষ্টি বিলীন (কাব্য ২০১২)। কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, অনুবাদক ও সাংবাদিক ২০১৭-র ৬ই এপ্রিল পৃথিবীর মায়াবী রৌদ্রছায়া ফেলে রেখে লোকান্তরিত হন।
সাযযাদ কাদিরকে আমি দেখেছি-জেনেছি তাঁর কৈশোর থেকেই। প্রখর মেধার অধিকারী ছিলেন তিনি। তাঁর জীবনের প্রথম লেখাটি সম্পাদনা করে পত্রস্থ করেছিলাম একটি ম্যাগাজিনে। আমার কারাজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তার সঙ্গে চিঠিপত্রে যোগাযোগ ছিল। সাযযাদ কাদিরকে আমি প্রাচ্যবিৎ ও প্রতীচ্যবিৎ পন্ডিত ব্যক্তি হিসেবে অভিহিত করতে পারি নির্দ্বিধায়। এই মুহূর্তে সাযযাদের অধিকাংশ বই আমার হাতে না থাকায় আমাদের সম্পাদিত ম্যাগাজিন ‘নতুন এক মাত্রা’য় প্রকাশিত কতিপয় কবিতার উদ্ধৃতি উপস্থাপিত করে তার কবিকৃতির প্রকৃতি-প্রকরণ এবং বিশিষ্টতা নিয়ে কথা বলবো। এখানে আমার সাংবাদিক দায়টিই বিশেষ করে দ্রষ্টব্য। সাযযাদ এই কবিতাবলী থেকে তার কবি প্রতিভার শক্তি ও প্রকৃতিÑ ব্যক্তিত্ব এবং বৈভব বিধৃত হবে।
ভিড়ে ভিরমি খাও, জনজটে অস্থির?
মনে রেখো, শূন্যতাও চেপে ধরে, চাপ দেয়।
সুখ চাও? কখনও দুঃসহ তো সে-ও।
প্রতীক্ষায় ধৈর্য থাকে না, মনে হয় মৃত্যু।
তবু বিরহ-ও প্রেম। পূর্ণতা।
পরাজয় ভাবছো? দেখবে বিজয় একদিন।
তাহলে জীবন কি এমনই শ্লেষে-শ্লেষে বাঁকা?
চিরদিনই তাই। [সংশ্লেষে ]
ভালবাসো, শান্তি-কল্যাণ পাবে
হাসি দেখবে নারীর চোখেমুখে।
ভালোবাসো, মহান বিজয় পাবে
শুনবে শিশুর কলকলহাসি।
হিংসা করো, ঘৃণা ও আক্রোশ পাবে
দেখবে মানবতার রক্ত¯্রােত
মায়ের কান্না পাবে, শিশুর চোখে জল।
বারুদের ধোঁয়া, আগুন তো কেবলই ছড়ায়
কোন সাগর সেঁচে নেভাবে তাকে?
হৃদয়ে হৃদয়ে পোড়ে দুঃখ
দেখি মৃত্যু অর্থহীন, নিষ্ফল, অকারণ।
ভালবাসো, অস্ত্র নয় পুস্প
হাত বাড়াও বন্ধনে
মুখ ফেরাও সূর্যের দিকে
চলো, আবার হাঁটি সেই সুকঠিন পথে
আনি আরও এক বিজয়।
[মুখ ফেরাও]
সাযযাদ কাদিরের কবিতার সমগ্রতা এবং অন্তর্গত কল্পনা শৃংখলা নিয়ে এখানে, এই ক্ষুদ্র পরিসরে আলোচনায় যাওয়া সম্ভবপর নয়। সামান্য ‘এলিজি’ হিসেবে বিবেচনা করাই শ্রেয় হবে। সাযযাদের কাব্যচর্চার ‘আত্ম-অভিজ্ঞতা’র দিকটিই এখানে প্রাধান্য পাবে। ‘সংশ্লেষে’ কবিতায় কবি বলছেন- তাহলে জীবন কি এমনই শ্লেষে শ্লেষে বাঁকা। চিরদিনই তাই। এই প্রশ্নে কবি পুরো কবিতাটিতে স্মৃতি মেদুরতায় মোহাবিষ্ট।
ডুমুর বন্না খোকসা শ্যাওড়া ঝোপের ওপাশ দিয়ে
আমাদের সেই ফুলে মউ-মউ ছাতিম গাছের তলায়-
[শহর থেকে দূরে]
কোনও দিন সকালের রোদ একটু চড়লে
আবার কোনও দিন বিকাল একটু গড়ালে
রিকশায় উঠে পড়ি, যাই হাতির পুল কি ফকিরের পুল..
[দূর কোনও দেশে ]
ঘরেই থাকতাম, ছিলামও।
একদিন বিছানা ছেড়ে
আসতে হয় বাইরে।
ঘর থেকে বেরোতেই অল্প একটু বারান্দা,
তারপর কয়েক ধাপ সিঁড়ি।
সামনে খোরা আঙিনা
ছোট বেড়া দিয়ে ঘেরা।
যেতে-যেতে ফটক পেরিয়ে থামি-
ফিরে তাকাতে চাই একবার।
কিন্তু না, পিছনে কোনও পদশব্দ নেই।
কেউ আসছে না আমার সঙ্গে।
[যাত্রা ]
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে কবি ও সমালোচক শঙ্খ ঘোষ এমন একটি মন্তব্য করেছিলেনÑ ‘শব্দের ক্ষমতা নির্ভর করে শব্দবন্ধের ওপর। দুই শব্দের সংযোগ-প্রকৃতির মধ্যে নতুনতা সঞ্চারিত, জীবিত হয়ে উঠতে থাকে পুরোনো শব্দ। শব্দবন্ধে শব্দের শক্তি প্রসার পরিব্যাপ্ত হতে থাকে।’ কবি সাযযাদ কাদিরের সেই শব্দাভাস সমুচ্চারিত। এখানে উল্লিখিত ‘শহর থেকে দূর’ ও ‘দূর কোনও দেশে’ কবিতায় সেই আভাস পরিস্ফুট। নিতান্তই সর্বময় সত্তাস্বভাবের প্রতি ইংগিত প্রদান করা হয়েছে এখানে, উপরের ক’টি কবিতায় সেই চিহ্নহ্ন ও দিকলেখ পরিভাসিত হয়েছে বলে আমার বিশ্বাস। ‘যাত্রা’ কবিতায় সাযযাদ কাদির পেছনে কোনও পদশব্দ নেই বলে যে আক্ষেপ করেছেন সেটিও তার ভেতরকার কৃষাগ্নি থেকে উঠে এসেছে আর ‘যাত্রা’য় নিজস্ব একাকীত্ব যেমন রয়েছে; বিপ্রতীপভাবে বিপন্ন ও বিষাদিত কনোটেশন ((Connotation)) রয়েছে। এভাবেই কাব্যের সার্থকতাও স্ফূটিত হয়। কবির জীবন সত্তার আবির্ভাব ঘটে এভাবেই। লক্ষ করুন পঠকবৃন্দ- ‘আসলে এখন’ কবিতায়- কেমন শোনা?/ কেবল কানপেতে রাখা/ তোমার শ^াসধ্বনিতে? তোমার হৃৎস্পন্দনে? এই বিপ্রতীপে- প্রতীপতার আভাস/ প্রতীপতার ইংগিত ধ্বনি উচ্চারিত হয়েছে সাবলীলতায়।
সাসযাদ কাদিরের কবিতায় এক ধরনের ‘রোমান্টিক ফ্যান্টাসিজম’ লক্ষ করা যায়। ‘লালপরী, নীলপরী’ কবিতাটিতে এখানে বক্তব্যের স্বরূপতা এবং সাদৃশ্যময়তা পরিদৃশ্যমান। নিজের মধ্যে একেবারে নেই হয়ে থেকে। ভালোবেসে গেছি এক লাল-নীল পরীকে শুধু। ফ্যান্টাসির ভেতরে জীবনের কঠিন রিয়্যালিটিকে সন্ধান করা।
সবাই আরও ভাল থাকতে চায়, আরও সুন্দর হতে চায়
সবাই্ আরও উপরে উঠতে চায়, আরও ক্ষমতা চায়
আমি অত সব চাই নি কিছু- সারা জীবন থেকেছি আমার মতোই
চেয়েছি শুধু এক লাল-নীল পরীকে। [লাল-নীল পরী]
সাযযাদ কাদির অতীতের অনুসরণ থেকে বর্তমানের অভিসরণ করতে খানিকটা প্রয়াসী। এখানে একটি উদ্ধৃতি থেকে বক্তব্যের সাযুজ্য খুঁজবো। | It seems, as one becomes older, That the past has another pattern, and ceases to be a mere sequence – Or even development: the latter a partial fallacy Encouraged by superficial notions of evolution, Which becomes, in the popular mind, a means of disowning the past. [TS Eliot, Four Quartets- 09 The Dry Salvages II]
সাযযাদের কবিতায় এক ধররের উন্মুক্ত, উচ্ছল, উদ্যামের উৎসারণ লক্ষ করা যায়। তার কবিতার অন্তরালে সশ্রম অন্বেষা জেগে আছে। বোধ-বুদ্ধির বিশ্লেষণ আছে- সেটা হৃদয় বিগলিত। আবেগ এবং মননের সম্মিলনে সমৃদ্ধ। সাযযাদ যখন কবিতা লেখেন সেখানে আনন্দাবেগের সকরুণ কম্পন লক্ষ করি। তার কাজে রয়েছে ছন্দ নির্মাণের সঙ্গে উচ্ছ্বাসের সুমিতি ও পরিমিতিবোধ।
এখানে আসবে তুমি? এই ঘরে?
একটু দাঁড়াও আসবাবগুলো বাইরে রেখে আসি।
নঘর, টাবওগুলোও বাইরে পাঠিয়ে দিই।
তারপর নিয়ে আসি এক শান্ত নীল হ্রদ
ফুলে-ফুলে ছাওয়া ছোট-বড় ক’টি গাছ
বাতাসে বিভোর এই এতটুকু বনতল…
তারপর সন্ধ্যা নেমে এলে
দেখবে পাখিরা ফিরবে ঘরে আকাশের গন্ধ গায়ে মেখে
ঝিঁঝিরা মত্ত হবে ঐকতানে
জোনাকিরা ব্যস্ত রবে আলোকসজ্জায়…
তারপর এসো তুমি- এখানে আমার কাছে।
[তারপর]
এক নিজস্ব নিভৃত অবস্থানে, আবাসভূমে কবি আহবান জানান তার প্রেয়সীকে। পূর্বেই বলেছি- সাযযাদের পরিমিতিবোধের কথা। ছোটো ছোটো শব্দবন্ধ। বাক্যবন্ধে তার কাব্যশৈলী বিন্যস্ত হয়েছে।
সাহিত্য ও শিল্পবিচারে ইদানিং যে ক’টি শব্দ সর্বাধিক ব্যবহৃত হয়, ‘রিয়্যালিজম’ তাদের মধ্যে অন্যতম। উনিশ শতকের গোড়াতে ইয়োরোপে যে আধুনিকতার জন্ম হয়, রিয়্যালিজম তারই বাহক। সতেরো এবং আঠারো শতকের ইয়োরোপীয় সাহিত্যে এবং আর্টে যে-সব নয়া ধ্রুপদী (neo-classical) নিয়ম কানুন প্রত্যক্ষত বাস্তব সত্যের প্রতিফলন হয়ে দাঁড়িয়েছিলো, প্রধানত তারই বিরুদ্ধে প্রতিবাদের হাওয়া ছিল ‘রিয়্যালিজম’। অভিধানগত অর্থে কথাটি ‘রোম্যান্টিমিজ্ম’-এর ঠিক উল্টোটা। কিন্তু একই ঐতিহাসিক পটভূমিকায় এই দুটি শব্দ ভূমিষ্ঠ হয়। উভয়েরই জন্মদাত্রী একদিকে ফরাসী এবং অন্যদিকে শিল্পবিপ্লব।”
[যশোধরা বাগ্চী] [‘এক্ষণ’-১৪ বর্ষ ষষ্ঠ সংখ্যা, ১৩৮৮ বঙ্গাব্দ]
আমরা জানি, আর্ট এবং সাহিত্যতত্ত্বে, রিয়্যালিজ্ম এর আবির্ভাব রোম্যান্টিক বিদ্রোহের পরে। আর্ট কাব্যিক ভাববাদের প্রতিবাদে রেসবান্টের মানবজীবননিষ্ঠতা বোঝাবার জন্য উনিশ শতকের তৃতীয় দশকে ‘রিয়্যালিজ্ম’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়।’
এও আমাদের জ্ঞাতব্য যে, ১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রান্সে ‘রিয়্যালিজ্ম’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকারও জন্ম হয়। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে কঁত এবং ডারউইনের যৌথ প্রভাবে মানুষ এবং তার সামাজিক পরিবেশ বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার সম্মুখীন হয়। এই সময়কার আর্ট এবং সহিত্য বিশেষ করে উপন্যাস সম্পর্কিত তত্ত্বে ‘রিয়্যালিজম’- এর প্রয়োগ এই বৈজ্ঞানিক মনোভাবের সাক্ষ্য বহন করে। এ-প্রসঙ্গে এই সময়কার একটি ছোট উক্তি আমরা উদ্ধৃত করতে পারি। ইংরেজি উপন্যাসিক জর্জ এলিয়টের জীবন সঙ্গী, বৈজ্ঞানিক দর্শনের প্রবর্তক জর্জ হেলরি লুইস বলেন: ‘সাহিত্যে রিয়্যালিজ্মের বিপরীত শব্দ গতানুগতিকতা নয় মিথ্যাচরণ।’
এখনও এবং অনেক সময়-ই ‘রিয়্যালিজম’ শব্দটিকে নি¤বর্গের প্রান্তিক জনের কঠোর বাস্তবের প্রতিফলন স্বরূপে ব্যবহার করা হত। শিল্প-সাহিত্যে এই রিয়্যালিজ্ম অতিব্যবহৃত বলে বাস্তবতার কঠোর খড়গ এর দেহটাকে নানাভাবে ক্ষত-বিক্ষত করেছ্ ে‘রিয়্যালিজ্ম’। এখন শিল্পের সাধারণ সংজ্ঞা রূপান্তরিত হয়েছে। এদিকে আর বেশি অগ্রসর না হয়ে আমাদের বক্ষ্যমান আলোচ্য কবি, সায্যাদ কাদির বাস্তবতার আখরে অংকন করেছেন তার কাব্যের চিত্ররেখ রূপকল্প। তার কবিতা ‘রিয়্যাল’ হতে পেরেছে। তার কবিতায় ভূমিষ্ঠ হয়েছে এই সার্বভৌম বাংলা মৃত্তিকার সন্তানসন্তাদি। সায্যাদ কাদির স্বদেশব্রতীপ্রাণ- এক মুক্তমন কবি। তার জীবন ছিল স্বাধীনতাব্রততির চেতনা-ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধ। এই সম্পৃক্ততা সাযযাদকে স্বাতন্ত্র্যের বৈশিষ্ট্যে উজ্বল করে রেখেছে।
সায্যাদ কাদিরের কাব্যসত্তা ঐতিহ্য ও আধুনিকাতা সম্পন্ন প্রায়। শিল্প বিচারে এই দুইটি ‘অন্বয়’ বিশেষভাবে জরুরি। সাযযাদ কাদির এটা ভালো করেই জানতেন। বুঝতেন। এই ‘উপলব্ধি’টুকু তার স্পষ্ট ছিল।
সায্যাদ কাদির- কবি, অনুবাদক, গবেষক এবং সাহিত্য- সমালোচকও বটেন। আমার বাসায়, ইত্তেফাকের সাহিত্যের টেবিলে এবং নানা ‘বৈঠকী’ আড্ডা আলোচনায় অনেক কথাবার্তা, বলতে গেলে সিরিয়াস ডিসকাশনও হয়েছে- শিল্পে ‘রিয়্যালিজ্ম’ ((Realism), ‘সিম্বলিজ্ম’ (প্রতীকীবাদ), ‘ইমপ্রেশনিজ্ম’ ইত্যাদি ধারা, রীতি, আর্টফর্ম নিয়ে। কোনো কোনো সময়, আমাকে হারিয়ে অনেক দূর চলে গিয়েছেন। সাযযাদ-এর বৈদগ্ধ ও বৈশিষ্ট্য এখানেই। সমাজজীবনে, সামাজিক, সম্প্রসারণবাদে রাজনৈতিক ও ঐতিহ্যবাদী চৈতন্য ও দর্শনে সাযযাদ ও আমার মধ্যে সমদর্শিতা ছিলো। আমার ছাত্র-রাজনীতি আমাকে বারবার কারাগারে নিক্ষিপ্ত করেছে। আমার সারাজীবনের অনেক চিঠিপত্র তার কাছে পৌঁছে। কখনো বেশ সংগোপনে। কখনো ডাক মারফত। তবে আমার চিঠি পত্রে শ্রীঘরের কালো কালো কালির ছাপ থাকত। অনেক সময় আমার চিঠি-চিরকুটে সরকারের জেল কর্তৃপক্ষ কালি লেপ্টে দিতো। চিঠির বুকের অক্ষরগুলোয় আমরা, রাজবন্দীরা কেরোসিন তেল ছিটিয়ে দিয়ে সূর্যের প্রথর রোদ্দুরে ফেলে রেখে- সেখান থেকে চিঠির গোপন-ইংগিত, ‘সিকরেসি’ বের করে নিতাম। সাযযাদ, জেল থেকে মুক্তি পাবার পর, বলতেন, মুজাহিদী ভাই, আপনার মত ডিরেকশন, রাজনৈতিক বৃত্তান্ত জেলে নিতে পারতাম। চিঠিগুলো, সূর্যের আলোয় মেলে ধরে। কবি সাযযাদ কাদির পলিটিক্যাল এ্যাক্টিভিস্ট ছিলেন না। তবে রাজনীতি বুঝতেন সকল অর্থে সঠিক মাত্রায়। সমাজ সচেতন শিল্পীর যে দায়- সে দায়বদ্ধতা তার ছিলো পুরোপুরি। মানুষ সায্যাদ আর কবি-শিল্পী সায্যাদ-এর ভেতর কোনো ফারাক ছিলো না। তার মানবিক সত্তা এবং কাব্যিক সত্তা একাকার হয়ে পড়েছিলো। মননে, চৈতন্যে, মনুষ্যত্বে একজন কবি যখন আত্মস্থ হন তখন কোনো আত্মপ্রবঞ্চনা চির ধরাতে পারেনা- তার শিল্পবোধ ও প্রাতস্বিকতায়। মার্কসীয় দর্শন আলোচনা করতে গিয়ে লুকাচ-এর রেফারেন্স দিতেন সায্যাদ। আমি শিল্প রীতি শিল্পবোধ এবং ভিন্নমতকে ব্যক্তিগত সৃষ্টিতে ‘বিরোধাভাস’ সৃষ্টির প্রয়াস করিনি, কখনো। আমি অপরের ভিন্নমতকে ভিন্নমতই মনে করে থাকি। সায্যাদ কাদির সর্বাচরণে সততই কবি। কাব্যসৃষ্টিতে মননের, চৈতন্যের জাগরণ অপরিহার্য- সেই কাব্য জগতের এক নতুন জাগরি সায্যাদ কাদির।
প্রসঙ্গত, এখানে জীবনানন্দ দাশ-এর কবিতা উল্লেখ্য:
যদিও পথ আছে- তবু কোলাহলে শূন্য আলিঙ্গনে
নায়ক সাধক রাষ্ট্র সমান ক্লান্ত হয়ে পড়ে,
প্রতিটি প্রাণ অন্ধকারে নিজের বোধের আত্মদ্বীপের মতো
কী এক বিরাট অবক্ষয়ের মানবসাগরে।
মেট্রোপলিটন শহরে, নাগরিক জীবনে আলোকাকীর্ণ পথের ধূলি-কণায় অন্ধকার বিদীর্ণ কৃষ্ণচ্ছটা অবক্ষয়ের অবস্থাই বিস্তার করে। মনে হয় মেট্রোপলিটন মহানগরের মানুষেরা যাত্রাপথে বিবসিত, বিলম্বিত হয়।
মেট্রোপলিটন শহরে প্রকৃতির সবুজ নিষ্পত্র, নিষ্প্রভ, নিষ্কপ্র। মানুষের স্বপ্নগুলো প্রস্তর প্রক্ষিপ্ত। চোখে মুখে সজীবতা নেই যেন। এর পরও দেখা যায়, আমরা লক্ষ করি- সাযযাদ কাদির কবিতার বহিরঙ্গে-প্রাঙ্গণে জীবনের সঞ্জীবনী-শক্তির রস সঞ্চার করার প্রবণতা প্রকাশ করেছেন। এই ইতিবাচকতা তার কবিতার প্রাণশক্তি। সাযযাদের কবিতার উৎসমুখ জীবনের এই অন্তস্থলে।
এমন হয়/ রাত শেষের করুণ ঘ্রাণ সোডিয়াম বাতি / মুখোমুখি হয় সূর্যের প্রথম আলোর/ এমন হয়/ ভাঙা সেতুর পাশে গড়ে ওঠে আরেক সেতু/ কোনো কোনো হাসপাতালে প্রতিদিন মৃত্যুর পাশে।/ জাগরণ ঘটে প্রাণের। সাযযাদ-এর কবিতা মেট্রোপলিটন মনের রূপান্তরণ ও জাগরণের প্রতিবিম্বন যেন। হ