কবিরা অমর। সৃষ্টিকর্মের দ্বারাই তারা অমরত্ব লাভ করেন। কিন্তু সকলে নয়। নিভৃত কাননে জনমানবের অলক্ষ্যে প্রতিদিন অসংখ্য ফুল ফুটে ঝরে যায়, কেউ তার কোন খবর রাখে না। কিন্তু এমন অনেক ফুল আছে, যার সৌরভ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। অসংখ্য ভ্রমর গুঞ্জন করতে করতে সে ফুলের মধুপান করে। মলয়-প্রবাহ সে ফুলের সৌরভ বহন করে চারদিক আমোদিত করে রাখে।
কবিরাও এমন। অসংখ্য কবি হয়তো নীরবে-নিভৃতে লোকচক্ষুর অন্তরালেই থেকে যায়। তাদের প্রতিভার আলোকছটা সেভাবে বিচ্ছূরিত হয় না। কেউ কেউ পরিপার্শ্ব স্বল্পসংখ্যক লোকের দৃষ্টি কিছুদিনের জন্য আকৃষ্ট করতে পারলেও সকলে সবসময়ের জন্য তা মনে রাখে না। কাল-প্রবাহে তারা একসময় হারিয়ে যায়। কিন্তু এমন অনেক কবি আছেন, যাদের প্রতিভার দ্যূতি জনপদে ছড়িয়ে পড়ে। কাল থেকে কালান্তরে, অনেক সময় দেশ থেকে বিশ্বপরিমন্ডলে তাদের খ্যাতি বিস্তৃত হয়। তাই দেখা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের অনেক প্রাচীন কবিরা এখনো অমর হয়ে আছেন। দেশ-কাল-ভাষা নির্বিশেষে তাঁরা মানবজাতির নিকট স্মরণীয়, বরণীয়। মহাকবি বাল্মিকী, ব্যাস, হোমার, সেক্সপিয়র, মিল্টন, কার্লাইল, ইমরুল কায়েস, ফেরদৌসী, শেখ সাদী, জালালউদ্দিন রুমী, হাফিজ, ওমর খৈয়াম, ইকবাল, কালিদাস, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ বিশ্বব্যাপী সকল মানুষের প্রিয় কবি হিসাবে চিরস্মরণীয় ও বরণীয়। দেশ-কাল-ভাষা-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলে তাঁদেরকে শ্রদ্ধার আসনে সমাসীন করে রেখেছে।
বিশ্বের স্মরণীয়, বরণীয় কবি হিসাবে ফররুখ আহমদের অবস্থান কোথায় কতটুকু, এখানে সেটাই আলোচ্য বিষয়। কবি ফররুখ আহমদের জন্ম ১০ জুন ১৯১৮। এ বছর ৯ জুন তাঁর ৯৯তম জন্মদিবস। ১০ জুন ২০১৭ তারিখে তাঁর জন্মশতবর্ষ শুরু। শতবর্ষে ফররুখ আহমদের প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে এখানে কিঞ্চিৎ আলোচনার প্রয়াস পাব।
কবিরা মূলত শিল্পী। অনেকে বলেন, তারা শব্দের শিল্পী। অর্থাৎ শব্দ দিয়ে তারা শিল্প তৈরি করেন। কিন্তু শুধু শব্দ দিয়ে কি শিল্প তৈরি করা সম্ভব? যেমন শুধু চাল বা গম দিয়ে খাদ্য তৈরি করা যায় না। তার সাথে ব্যঞ্জন ও আরো অনেক ধরনের মশলা-পাতি, উপকরণাদি প্রয়োজন হয়। কবিরা সৃজনশীলতার অধিকারী। তারা শব্দ দিয়ে সৃজনিশক্তির মাধ্যমে মনোমুগ্ধকর শিল্প সৃষ্টি করেন। এজন্য শব্দকে নানাভাবে নানা অনুষঙ্গে ব্যবহার করেন। শব্দচয়ন, শব্দবিন্যাস, শব্দের সাথে শব্দের সমন্বয় সাধন, শব্দ দিয়ে ধ্বনি-ব্যঞ্জনা সৃষ্টি, শব্দ দিয়ে ভাব-সঙ্গতি রক্ষা ইত্যাদি নানা সূক্ষ্ম কারুকর্মের মাধ্যমে কবিরা শব্দকে শিল্পসম্মত করে তোলার প্রয়াস পান। শব্দ দিয়ে সুর-তাল-ঝংকার সৃষ্টির জন্য ছন্দ অপরিহার্য উপাদান হিসাবে গণ্য হয়। এছাড়া, চারুতা ও নান্দনিকতা সৃষ্টির জন্য উপমা, রূপক, প্রতীক, শব্দালংকার, রূপকল্প ইত্যাদির প্রয়োজন হয়। সর্বোপরি, এসব অপরিহার্য উপাদানের সাথে ভাব ও বিষয়ের সুস্মিত বিন্যাসে কবিতার সৃষ্টি হয়।
তাই কবিতা শুধু শব্দের সাথে শব্দের সংযোগ ঘটানো নয়। শব্দ-ছন্দ-রূপক-অলংকার, ভাব ও বিষয়ের সমন্বিত নিখুঁত নান্দনিক সৃষ্টিকর্মই সার্থক কবিতা পদবাচ্য হয়। তাই যারা কবিতা রচনা করেন, তারা যে সকলেই কবি, তা নয়। তবে তাদের মধ্যে কেউ কেউ কবি। কবি জীবনানন্দের ভাষায়Ñ ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’।
কবিদের মধ্যে প্রকারভেদ আছে। সকলে একধরনের কবি নন, এক পাল্লায় সকলকে মাপা যায় না। প্রত্যেকের ধরণ, স্বভাব, প্রকার ও বৈশিষ্ট্য আলাদা। প্রত্যেকের ওজনও আলাদা। প্রতিভা, নির্মাণকৌশল, ভাব-বিষয় ও যোগ্যতার বলে কবিদের মূল্যায়ন করা হয়। কেউ ছোট, কেউ বড়, কারো জনপ্রিয়তা বিশেষ দেশ-কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ, কারো খ্যাতি বিশ্বব্যাপী, মহাকালব্যাপী। এসব পরিমাপ করার উপায় কী?
সাহিত্যের মূল্যায়ন কিংবা ছোট-বড় প্রতিভা পরিমাপের যেসব মানদন্ড প্রচলিত রয়েছে, তার মধ্যে সৃষ্টিকর্মের পরিমাণগত দিক, শিল্প-সৌকর্য, আবেদন বিষয়-বৈভব, স্বতন্ত্র প্রকাশভঙ্গি, নিজস্ব শিল্প-নৈপুণ্য ও মৌলিকত্ব ইত্যাদি প্রধান।
পরিমাণগত দিক সম্পর্কেই প্রথমে আলোচনা করা যাক। ফররুখ আহমদ অজ¯্র ধারায় বিভিন্ন রূপ-রীতিতে তাঁর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ প্রকাশভঙ্গিতে সাহিত্যের এক অনিন্দ্য ভুবন রচনা করেছেন। তাঁর রচনার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও মৌলিকত্ব সহজেই সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি একাধারে গীতিকবিতা, সনেট, ব্যঙ্গকবিতা, শিশুতোষ ছড়া-কবিতা-গল্প, গান, মহাকাব্য, কাব্যনাট্য, গীতিনাট্য, ব্যঙ্গনাটক, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ইত্যাদি রচনা করেছেন। তাঁর প্রকাশিত-অপ্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা মোট একষট্টি (দ্রষ্টব্য: মুহম্মদ মতিউর রহমান : ফররুখ প্রতিভা, দ্বিতীয় প্রকাশ, জুন ২০০৮, পৃ. ৬৯-৭৩)। তবে শুধু সংখ্যা ও কলেবর দিয়ে কোন কবির প্রতিভার মূল্যায়ন হয় না। কোন কবির শুধু একটি বিশেষ রচনাও তাঁকে অমর করতে পারে। অনেকের ধারণা, মধুসূদনের ‘বঙ্গভাষা’, কায়কোবাদের ‘আযান’, রবীন্দ্রনাথের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’, নজরুলের ‘বিদ্রোহী’, জীবনান্দের ‘রূপসী বাংলা’, জসীমউদ্দিনের ‘কবর’, ফররুখ আহমদের ‘সাত সাগরের মাঝি’ ইত্যাদি একক কবি-কর্মই তাঁদের অমরত্ব লাভের জন্য যথেষ্ট। একথার সারবত্তা অস্বীকার না করেও বলা যায়, সৃষ্টিবৈচিত্র্য ও বিশালত্ব বড় কবির মর্যাদাকে অধিক সমুন্নত করে। তাই ফররুখের সৃষ্টিবৈচিত্র্য ও বিশালত্ব তাঁকে বাংলা সাহিত্যে এক মহিমান্বিত আসনে সমাসীন করেছে।
বড় কবি হিসাবে বিবেচিত হওয়ার জন্য মৌলিকত্ব এক অপরিহার্য গুণ। মৌলিকত্বের প্রকাশ ঘটে, কবির নিজস্ব কাব্যভাষা নির্মাণের সক্ষমতা, স্বতন্ত্র প্রকাশভঙ্গি ও অভিনব শিল্পনৈপুণ্য প্রদর্শনের উপর। ফররুখ আহমদ এক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে সফল। নিজস্ব কাব্যভাষা নির্মাণে স্বতন্ত্র প্রকাশভঙ্গি ও অভিনব নির্মাণ কৌশলে ফররুখ অনন্য সাধারণ। নিজস্ব বাক্প্রতিমা নির্মাণ, উপমা-রূপক-প্রতীক-রূপকল্পের অভিনব ব্যবহার স্বতন্ত্র ঐতিহ্যিক ও ভাবপরিমন্ডল নির্মাণে তিনি অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
কবিতায় হৃদয়ানুভুতির প্রকাশ ঘটে। মনের নিগূঢ় অনুভুতি যখন শব্দ, ধ্বনি, সুর-তাল-লয়, ছন্দ সহকারে ললিত মধুর ব্যঞ্জনায় অন্যের মনে ঝংকার তোলে, রস-পিপাসু মনের রসাস্বাদনে সহায়ক হয়, তখন সেটাকেই বলে কবিতা। অনুভূতির প্রকাশে যে কবি যত বেশি পারঙ্গম এবং অনুভূতির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পুষ্পিত কোরক রস-পিপাসু পাঠক-চিত্তে যতোবেশি স্পর্শকাতরতা সৃষ্টি করতে পারে, সে কবি ততটা সার্থক। এজন্য যথার্থ কবিকে বলা হয়, শিল্পী কবি। তারা শুধু কবি নন, কবিতার আকারে ¯িœগ্ধ রসঘন হৃদয়সম্মোহনী অনিন্দ্য নান্দনিক শিল্পকর্ম সৃষ্টিই তাদের একমাত্র অন্বিষ্ট। এ অর্থে ফররুখ আহমদকে অনেকে ‘শিল্পী কবি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। বিশিষ্ট সাহিত্য-সমালোচক মুজীবুর রহমান খাঁর ভাষায়-
“ফররুখ আহমদের আসল পরিচয় হল, তিনি শিল্পী-কবি। রং ও রূপের, বর্ণ এবং তার সাথে গন্ধের আলো ছায়া এবং মোহের আবিষ্টতা নিয়ে যে সব খেলার চাতুরী দেখান, তারাই শিল্পী-কবি। তাঁদের কবিতা চিত্রধর্মী এবং তাঁরা আরো কিছু। ফররুখ আহমদের কবিতা পড়তে পাঠক-মন অলক্ষ্যে ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক ও তার পরবর্তী প্রি-র্যাফেলাইট (চৎব-জধঢ়যধষরঃব) কবিদের রাজ্যে চলে যায়। রোমান্টিক কবিদের মধ্যে কীট্সের কবিতার রঙ্গ-প্রাচুর্য্যের তুলনা নাই। প্রি-র্যাফেলইটদের মধ্যে মরিস, সুইনবার্ন এবং দেহাতিসারী স্বপ্নাতুরতা আনতেন, তার সাথে ফররুখ আহমদের গভীর সাদৃশ্য আছে।”
বাংলা কাব্যে ফররুখ আহমদ এ রং, রূপ, আলো ও সুগন্ধির মোহনীয় অপরূপ সৌন্দর্যলোক নির্মাণে কতটা সফল হয়েছেন, উদ্ধৃত পংক্তিমালা থেকে তা উপলব্ধি করা যাক-
কত যে আাঁধার পর্দা পারায়ে ভোর হল জানি না তা’
নারঙ্গি বনে কাঁপছে সবুজ পাতা।
— — —
নীল দরিয়ার যেন সে পূর্ণ চাঁদ,
মেঘ তরঙ্গ কেটে কেটে চলে ভেঙ্গে চলে সব বাঁধ।
— — —
তুমি কি ভুলেছ লবঙ্গ ফুল, এলাচের মৌসুমী,
যেখানে ধূলিতে, কাকরে দিনের জাফরান খোলে কলি,
যেখানে মুগ্ধ ইয়াস্মিনের শুভ্র ললাট চুমি
পরীর দেশের স্বপ্ন-সেহেলি জাগে গুলে বকাওলী।
— — —
এ নয় জোছনা-নারিকেল শাখে স্বপ্নের মর্মর,
এ নয় পরীর দেশের ঝরোকা নারঙ্গী বন্দর
এবার তোমার রুদ্ধ কপাটে মানুষের হাহাকার
ক্ষুধিত শিশুর কান্নায়, শেষ সেতারের ঝংকার।
— — —
এখানে এখন রাত্রি এসেছে নেমে,
তবু দেখা যায় দূরে বহুদুরে হেরার রাজ-তোরণ,
এখানে প্রবল ক্ষুধায় মানুষ উঠছে কেঁপে
এখানে এখন অজস্র ধারা উঠছে দু’চোখ ছেপে
তবু দেখা যায় দূরে বহু দূরে হেরার রাজ-তোরণ…
[সাত সাগরের মাঝি: সাত সাগরের মাঝি]
নল বনে জোস্নার বাঁশি
ছড়ায় সুরের আস্তরণ
ঝিম হয়ে আসে সেই সুরে সকল আকাশ
নদী বন।
[মধুমতীর তীরে: হে বন্য স্বপ্নেরা]
ফররুখ আহমদের কাব্যে ভাব-কল্পনা ও অনুভূতির কোরক পুষ্পিত হয়েছে নানা বর্ণ, সুষমা, রং ও আলোর অসাধারণ দীপ্তি ও কোমল স্নিগ্ধতায় যথাযোগ্য ও বৈশিষ্ট্যময় শব্দচয়ণে, ছন্দ ও সুরের মোহনীয় ব্যঞ্জনায়। কবি যে বর্ণ, চিত্র ও অভিনব দ্যোতনা সৃষ্টি করেছেন তা অনবদ্য ও শিল্প-সৌকর্যে অপরূপ। কবির বর্ণনায় যে দীপ্তি ও স্নিগ্ধতা ফুটে উঠেছে সেটাকে নানা বর্ণাঢ্যতায় মাধুর্য্যময় করে তুলেছে উপমা-রূপক-প্রতীক-রূপকল্পের নৈপুণ্যময় অনন্য সাধারণ ব্যবহারে।
উপমা-রূপক-প্রতীক সাধারণত তিন প্রকার-প্রকৃতিজাত, বুদ্ধিজাত ও ইতিহাস-ঐতিহ্যসম্পৃক্ত। ফররুখ আহমদ সবধরনের রূপক-উপমা-প্রতীক-রূপকল্প ব্যবহার করলেও তাতে ঐতিহ্য-সম্পৃক্ততা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এসব ক্ষেত্রে তাঁর নিজস্বতা ও নৈপুণ্য সহজেই সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এ প্রসঙ্গে আরো কিছু উদ্ধৃতি দিচ্ছি-
আর্ল্বুজের চূড়া যেন এক উড়ে আসে কালো দেউ
বজ্রের বেগে পাটাতনে ভাঙ্গে পাহাড়ের মত ঢেউ,
দিনের আকাশে একী জুলমাত মাঝি!
[বা’র দরিয়ায়: সাত সাগরের মাঝি]
রাত্রিভর ডাহুকের ডাক…
এখানে ঘুমের পাড়া, স্তদ্ধ দীঘি অতল সুপ্তির।
দীর্ঘ রাত্রি একা জেগে আছি।
[ডাহুক: সাত সাগরের মাঝি]
গোধূলী-তরল সেই হরিণের তনিমা পাটল
অস্থির বিদ্যুৎ, তার বাঁকা শিঙে ভেসে এল চাঁদ
[বন্দরে সন্ধ্যা: সাত সাগরের মাঝি]
আল-বোরজের চূড়া পার হ’ল যে স্বর্ণ-ঈগল
গতির বিদ্যুৎ নিয়ে, উদ্দাম ঝড়ের পাখা মেলে,
… এই অজগর রাত্রি গ্রাসিয়াছে সকল আলোক,
সোহরাবের লাশ নিয়ে জেগে আছে নিঃসঙ্গ রস্তম।
[স্বর্ণ ঈগল: সাত সাগরের মাঝি]
কে আসে, কে আসে সাড়া পড়ে যায়,
কে আসে কে আসে নতুন সাড়া।
জাগে সুষপ্ত মৃত জনপদ, জাগে শতাব্দী ঘুমের পাড়া।
হারা সম্বিত ফিরে দিতে বুকে আনো আলো প্রিয় আবহায়াত,
জানি সিরাজাম মুনীরা তোমার রশ্মিতে জাগে কোটি প্রভাত,
[সিরাজাম মুনীরা হযরত মুহম্মদ স.: সিরাজাম মুনীরা]
প্রত্যেক কবির প্রকাশ-ভঙ্গী তাঁর নিজস্ব। প্রকাশের ক্ষেত্রে কবির স্বাতন্ত্র্য ও নিজস্বতা যত সুস্পষ্ট হয়, কবিকে সনাক্ত করা ততটা সহজ এবং সেটা তাঁর বৈশিষ্ট্য হিসাবে পরিগণিত হয়। এ স্বাতন্ত্র্য ও নিজস্বতা সৃষ্টির ক্ষেত্রে শব্দ-নির্বাচন একটি গুরত্বপূর্ণ বিষয়। সুনির্বাচিত, সুসংঙ্গত, সুপরিমিত ও শব্দের ব্যবহারে যে কবি তাঁর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্ট করে তুলতে সক্ষম, প্রকৃতপক্ষে তিনিই বড় কবি। নিজস্ব কাব্য-ভাষা নির্মাণের মাধ্যমে কবি তাঁর মৌলিকত্ব প্রকাশ করে থাকেন। মৌলিকত্ব বড় কবির অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য।
মহৎ শিল্পের মুখ্য উদ্দেশ্য মানবকল্যাণ। বিশ্ববিখ্যাত রুশ মনীষী টলস্টয়ের মতে-“কোনকিছুকে যথার্থ শিল্প হতে হলে তা হতে হবে এমন কিছু, যা গুরুত্বপূর্ণ, মানুষের জন্য প্রয়োজনীয়, কল্যাণকর, নৈতিক বিচারে শুভফলদায়ক ও শিক্ষাপদ।” প্রকৃতপক্ষে, যে শিল্প মনুষ্যত্ব বিকাশ, মানবকল্যাণ ও মানুষের মনে নৈতিকবোধ ও উৎকর্ষিক চেতনা জাগ্রত না করে, তা শিল্প নয়। এ নিরীখে ফররুখ আহমদের কাব্য-কবিতা অবশ্যই সার্থক, সন্দেহ নেই। তাঁর সমগ্র কাব্যকর্মে মানবতা, মানবকল্যাণ, মানবমুক্তি ও চিত্তপ্রকর্ষের কথা ব্যক্ত হয়েছে। তাঁর কাব্যের আবেদন সর্বজনীন ও সর্বকালীন। ফররুখ আহমদ অধঃপতিত মুসলিম জাতির প্রাণে নবজাগরণের উদগ্র চেতনা জাগ্রত করেছেন। মানুষের কল্যাণে ও মানবতার বিকাশে তাঁর কাব্য সর্বদা অনুপ্রাণিত করে। তিনি ঐতিহ্য-সচেতন, কাল-সচেতন, তীক্ষ্ম শিল্পদৃষ্টিসম্পন্ন এক অসাধারণ কবি। তাই তাঁর সৃষ্টিকর্ম শুধু সমকালে নয়, তাঁর জন্মের শতবর্ষ পরে বর্তমান বিবর্তিত সমাজ ও জীবন-পরিবেশে এখনো সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিক ও অপরিহার্য বিবেচিত হয়, উন্নত জীবনবোধ ও মানবিক মহত্তম আদর্শে তাঁর কাব্য এখনো সকলকে অনুপ্রাণিত, উজ্জীবিত করে। তাই ফররুখ আহমদ একজন কালোত্তীর্ণ অমর কবি। শতবর্ষ পরেও তিনি স্মরণীয় বরণীয় মহৎ কবি-প্রতিভা হিসাবে সমাদৃত।
মহৎ প্রতিভার মৃত্যু নেই। তারা কালঞ্জয়ী। কবি ফররুখ আহমদও এক কালঞ্জয়ী অমর প্রতিভা। তাঁর প্রতি বিন¤্র শ্রদ্ধা জানাই। হ