জোহরা ভিজছে, মাথার ওপর তুলে ধরা ছাতাটা ঝমঝমিয়ে নামা দাপুটে বৃষ্টির কাছে হেরে গিয়ে এখন ভিজে চুপসে ফোঁটা ফোঁটা পানি ফেলছে নিচে। বৃষ্টির সেই পানি জোহরার মাথায় চুলের মধ্যে পড়ে ছড়িয়ে পড়ছে ধীরে। আকাশ থেকে কলস উপুড় করে দেওয়ার মতো অবিরল ধারার বৃষ্টি সালোয়ার নিমিষেই ভেজানোর পর কামিজের নিচে থেকে শরীরের ওপরে কামুক পুরুষের ক্ষুধার্ত হাতের মতো উঠে আসছে ক্রমে। শরীরের সঙ্গে ভেজা কাপড় সেঁটে গিয়ে ঠাণ্ডা ছড়ানোর সঙ্গে কাঁপুনির ভাব জাগিয়ে তুলছে হঠাৎ আসা জ্বরের মতো। বৃষ্টির ঘন ছাটের মধ্যেও কিছু পথচারীর তীক্ষ তীর-দৃষ্টি এসে বিঁধছে শরীরের খাঁজে খাঁজে, জোহরা বেশ টের পায়। সে নিজেকে আড়াল করার জন্য ছাতাটা আরো নিচু করে ধরলো দু’হাতে। ছাতা নিচে নামানোর জন্য তার দৃষ্টি এখন বেশি দূর যেতে পারছে না যার জন্য অসভ্য দৃষ্টিগুলো আর চোখে পড়ছে না। ভাঙাচোরা ফুটপাথ দিয়ে পথচারীদের পাশ কাটিয়ে সে যতটুকু পারা যায় সতর্ক হয়ে পা ফেলে এগুচ্ছে সামনে। জুতো জোড়া এরই মধ্যে ভিজে ভারী হয়ে এসেছে, জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে পড়ে ছপ ছপ শব্দ তুলছে যেন একটা কোলা ব্যাঙ লাফিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছে। রাস্তা দিয়ে ছুটে যাওয়া গাড়ি, অটো রিকশার চাকা থেকে পানি ছিটকে এসে মোবিলের মতো কালো ময়লা পানি ছিটকে এসে কাপড় নোংরা করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে একটু পর পর। জোহরা অ্যাথলেটের মতো প্রায় লাফিয়ে উঠে ময়লা পানির ছোবল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কসরত করে যাচ্ছে। সে একবার ভাবলো কলেজে ফিরে যাবে, তারপর অ্যাপয়েন্টমেন্টের কথা ভেবে মরিয়া হয়ে এগিয়ে চললো বৃষ্টির তোয়াক্কা না করে। তার এই অ্যাপয়েন্টমেন্টটা খুব জরুরি, বৃষ্টির জন্য সে মিস তো নয়ই, লেটও হতে চায় না। ঠিক সময়ে উপস্থিত হওয়া যে একজনের ব্যক্তিত্ব সম্বন্ধে অনেক কিছু বলে তা সে জানে। একধরনের সুপিরিওরিটি দেয়, বিশিষ্ট করে তোলে অন্যের চোখে। তার ইমেজ নিয়ে সে বেশ সচেতন, একটু বেশিই বলা যায়। কোনো কিছুর জন্য এটা ম্লান হোক, তা হতে দেবে না সে। ব্যক্তিত্ব, হ্যাঁ, ব্যক্তিত্বের জন্যই অল্প সময়ে এতো দূর আসতে পেরেছে সে, অনেক প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে। বাধা এখনো আছে, এবড়ো-খেবড়ো রাস্তায় খাদের মতো কিন্তু সে সব শুধু তাকে সতর্ক করে রাখেনি, আরো দৃঢ় হতে সাহায্য করেছে। এই মুহূর্তে বৃষ্টিও একটা প্রতিকূলতা, কিন্তু একে তার বেপরোয়া ভাব আর মনের দৃঢ়তা একটুও দমেনি। তার ছাতার রঙ লাল, বৃষ্টিতে ভিজে এখন আরো গাঢ় দেখাচ্ছে। শুধু ফ্যাশন স্টেটমেন্ট নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু বলছে এই রঙ।
জোহরা কফি শপে ঢুকে ভেজা ছাতা প্রবেশপথেই মেঝেতে রাখে। ছাতা থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি পড়তে শুরু করে মেঝেটা ভিজিয়ে দিতে থাকে। একজন ওয়েটার ছেলে দৌড়ে আসে তার দিকে, সে কিছু বলার আগেই জোহরা কর্তৃত্বের স্বরে বলে, শুকনো কিছু দিন তাড়াতাড়ি। ফেস টাওয়েল, টিসু পেপার, যা কিছু আছে। দেখছেন না, আপাদমস্তক বৃষ্টিতে ভিজে গিয়েছি। যা একটা এলাহি কারবার হচ্ছে বাইরে। ভেতরে থেকে কিছুই টের পাচ্ছেন না। ওয়েটার ছেলেটা হকচকিয়ে গিয়ে বলে, ভিজে ছাতাটা …। তাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই জোহরা বলে, হ্যাঁ, ছাতাটা ভিজে গিয়েছে। কিন্তু এই এয়ার কন্ডিশন্ড ঘরের ভেতর শুকিয়ে যাবে একটু পর। মেঝেটাও তখন ভেজা থাকবে না। ওয়েটার বলে, ছাতাটা দরজার বাইরে রাখা যায় না? শুনে জোহরা চোখ কপালে তোলে, অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে বলে, তা কি করে হয়? আমি থাকবো ঘরের ভেতর, আর আমার প্রিয় ছাতা পড়ে থাকবে বাইরে? ইট ইজ এ পার্ট অফ মি। ভিজেছে বলেই বাইরে ফেলে রাখতে পারি না। কিছু ভাববেন না, সব শুকিয়ে যাবে, এয়ার কন্ডিশনিংয়ের কাছে হেরে যাবে বৃষ্টির পানি। কিন্তু ছাতা নয়, এখন আমার কথা ভাবুন। আমার মাথার চুল ছাতার মতো একই ভাবে শুকিয়ে গেলে চলবে না, ঠাণ্ডা জমে যাবে মাথায়। সর্দি-কাশি হবে, এমন কি জ্বরও আসতে পারে। তাই কি চান? যান, একটা কিছু নিয়ে আসুন। ফেস টাওয়েল, টিসু পেপার, যা কিছু পান।
ওয়েটার ছেলেটি নিরুপায় ভঙ্গিতে একটু পর কিচেন টাওয়েলের রোল নিয়ে আসে। দেখে খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে জোহরার মুখ। ক্ষিপ্র হাতে রোলটা নিয়ে মাথার চুল থেকে বৃষ্টির পানি শুষে নিতে ব্যবহার করে সাদা অমসৃণ কাগজ। ঘষার জন্য মাথার চুলে ভেজা কাগজের অংশ এখানে সেখানে লেগে থাকে, দেখে মনে হয় বেলি কিংবা বকুল ফুলের পাপড়ি। এক হাতে খসখসে কাগজ দিয়ে মাথার চুল, মুখ আর গলায় জমে থাকা বৃষ্টির পানি মুছতে থাকে জোহরা, অন্য হাতে কাগজের রোল ঘুরতে ঘুরতে ছোট হয়ে আসে। হঠাৎ দেখলে মনে হবে সে বুঝি চড়কা থেকে মোটা সুতো টেনে টেনে নিচ্ছে। কিছুক্ষণ এইভাবে চলার পর মাথা আর শরীর থেকে বৃষ্টির পানি কাগজে মোটামুটি শুষে নেওয়া শেষ হলে সে ওয়েটার ছেলেটির দিকে তাকায়। সে অবাক হয়ে জোহরাকে দেখছে, যেন কোনো জাদুকর খেলা দেখাচ্ছে আর সে সম্মোহিত তার সহকারীর মতো সামনে দাঁড়িয়ে। এখনি হাতের আঙুলের নির্দেশে জোহরা তাকে মেঝে থেকে শূন্যে তুলে দেবে, সে ভাসতে থাকবে ভূমির সঙ্গে সমান্তরাল কিন্তু নির্ভার হয়ে।
বৃষ্টির জন্যই মনে হয় কফি শপে এই দুপুরে কয়েকজন ওয়েটার ছেলে আর এক টেবিলে আামি ছাড়া আর কোন কাস্টমার নেই। জোহরা আসার পর আমাদের সংখ্যা দু’জন হলো। ততক্ষণে অন্য ওয়েটার ছেলেরা হাতে কোনো কাজ না থাকায় জোহরার সামনে এসে অর্ধচন্দ্রাকারে দাঁড়িয়েছে। জোহরা তাদের দিকে তাকিয়ে হেসে বললো, চিনতে পেরেছেন মনে হয়। হ্যাঁ, আমিই জোহরা, স্টার সাবান সুন্দরী, বর্তমানে মডেল এবং টিভি নাটকের অভিনেত্রী। এর পর সে চারিদিক তাকিয়ে দেখে বলল, ভালোই হয়েছে বৃষ্টি নেমে। কফিশপে ভিড় নেই। আমার অ্যাপয়েন্টমেন্টটা নিরিবিলিতেই শেষ করা যাবে। আপনারা এখন যেতে পারেন যার যার কাজে। আপনাদের অনেক ধন্যবাদ। আমার চুল, মুখ, গলা আর কাপড় থেকে আগের মতো বৃষ্টির পানি গড়িয়ে পড়ছে না। কিচেন টাওয়েল চমৎকার কাজে দিয়েছে। আপনাদের কাস্টমার সার্ভিসের কথা বলবো সবাইকে, আর দেখুন, আমার লাল ছাতা, ওটাও শুকিয়ে এসেছে প্রায়। মেঝেটা অবশ্য ভিজে দেখাচ্ছে, ছাতা থেকে পড়ে পানির রেখা এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একটু পর এসব কিছুই থাকবে না। একটা অনুরোধ, অ্যাপয়েন্টমেন্ট রাখার সময় আপনারা কাছে থাকবেন না। আমার প্রাইভেসি দরকার। বুঝতেই পারছেন কেমন জীবন আমাদের। ঝড়-বৃষ্টিতেও থেমে থাকে না। রোদ হোক অথবা বৃষ্টি, হেল অর হাই ওয়াটার, গোপনীয়তা যতটা পারা যায় রক্ষা করতে হয়। একজন স্টারের সব কিছু পাবলিক জেনে গেলে তার অ্যাট্রাকশন কমে যায়।
আমি অদূরে বসে জোহরার সব কথাই শুনতে পাচ্ছি। তার লাল ছাতার এক পাশে এমব্রয়েডারি করা নামটা লেখা : জোহরা। আমার সামনে টেবিলের ওপর নোট প্যাডের সাদা পাতা তাকিয়ে আছে। আমি হাতের কলম দিয়ে টেবিলে আস্তে করে ঠুক ঠুক শব্দ করছি। আমার অধৈর্য প্রকাশ পেয়ে গিয়েছে। আমাকে জোহরার সব কথা জানতে হবে, সব মানে যতটুকু জানতে পারা যায়। বোঝাই যাচ্ছে, সে বেশ সতর্ক আর বুদ্ধিমতী। নতি স্বীকার করার মতো কেউ নয়, নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অন্যকে খুশি করতেও চাইবে না। সি উইল গিভ নো কোয়ার্টার টু এনি ওয়ান। আমার মতো জাঁদরেল সাংবাদিককেও সে বোকা বানাতে পারে অনায়াসে। আমি তার লাল ছাতাটার দিকে তাকিয়ে থাকি। বৃষ্টির পানি শুকিয়ে আসছে আস্তে আস্তে, লাল রঙ আরো গাঢ়, উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। ছাতাটার সঙ্গে জোহরার কোথায় যেন একটা মিল আছে, আমার মনে হয়।
ওয়েটাররা চলে গেল একে একে। জোহরা সোফায় বসে তার হাত ব্যাগ থেকে একটা ছোট আয়না আর চিরুনি বের করলো। মাথার চুলে চিরুনি বুলিয়ে নিলো কয়েকবার আয়নায় দেখে নিয়ে। তারপর মেকআপের ছোট বক্স থেকে পাফ বের করে গালে আর গলায় বুলিয়ে নিলো গোলাপি রং পাউডার। জোহরার গায়ের রং ফর্সা, মুখে লাল রুজের হালকা প্রলেপ পড়ে গোলাপি দেখাচ্ছে এখন। রুজ লাগানো শেষ হয়ে গেলে চোখের নিচে হালকা কালো রংয়ের মাসকারা দিলো সে। তার তন্ময় ভাব দেখে মনেই হচ্ছে না সে নিজের বাড়ির বাইরে আছে। দারুণ স্বচ্ছন্দ ভাব চোখে মুখে আর শরীরের নড়া-চড়ায়। মেক-আপ শেষ হয়ে গেলে সে আমার দিকে তাকিয়েই অল্প একটু হাসলো, কিছু দেখে মজা পেলে যেমন করে হাসে কেউ। সে জানে আমি অধৈর্য হয়ে অপেক্ষা করছি। সি ইজ টেকিং হার টাইম। বোঝাই যায়, সে সব কিছুই নিজের মর্জি অনুযায়ী করে। কেউ তাকে ডিক্টেট করতে পারে, এমন মনে হচ্ছে না আমার কাছে। এতক্ষণ যা দেখলাম, শুনলাম, তার ভিত্তিতে জোহরা সম্বন্ধে একটা ধারণা হয়ে গিয়েছে। আমার ধারণা খুব একটা ভুল হয় না, সাংবাদিকতার জগতে এসে আমার ইন্দ্রিয়গুলো খুব সজাগ আর প্রায় সবকিছুই ঠিক ঠিক আঁচ করে নিতে পারি।
জোহরা সোফায় দুই পা তুলে বসলো, যেন কফি শপ নয়, নিজের বাড়ির ড্রইংরুমে বসে আছে, যা খুশি তাই করতে পারে অন্যের তোয়াক্কা না করে। ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে টাচস্ক্রিনে আঙুল বুলিয়ে মুখ আর কানের কাছে নিয়ে আস্তে করে কথা বললো সে, শুনলো ওপাশে থাকা মানুষের কথা। আস্তে করে বললেও তার কথাগুলো আমি শুনতে পেলাম। সে প্রথমেই বললো, হ্যাঁ, আমি এসে গিয়েছি। ঠিক অ্যাপয়েনটেড টাইমে। আপনারা কোথায়? তাড়াতাড়ি আসুন আমার হাতে বেশি সময় নেই। দুপুরের পর কলেজের ক্লাস শুরু হবে আবার। হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমি অবশ্যই পড়াশুনা করছি। বেশ সিরিয়াসলিই করছি। কয়েক মাস পর এ-লেভেল পরীক্ষা দেবো। কি বললেন? অবাক হচ্ছেন শুনে? হবেন না। আপনারা কি ভেবেছেন মডেলিং আর অভিনয় করেই জীবন কাটিয়ে দেবো? কি বললেন, অনেকে দেয়? তা দিতে পারে। কিন্তু আমি অনেকের দলে নই। আই অ্যাম ডিফারেন্ট। হ্যাঁ, কথাটা মনে রাখবেন। আই অ্যাম ডিফারেন্ট। আই ডোন্ট ওয়েস্ট মাই টাইম। আমার পছন্দ নয় সময় নষ্ট করা।
জোহরা আমার সামনে বসে আছে। আমি তাকে প্রশ্ন করি, কিভাবে এলেন এই লাইনে?
এই লাইনে? বলে হো হো করে হেসে উঠলো জোহরা। তারপর বললো, খুব ক্লিশে হয়ে গিয়েছে এই ‘লাইন’ কথাটা। কিছুটা ভালগারও বটে। ওটা আমার সামনে ব্যবহার করবেন না। তারপর হেসে বললো, আমার ক্ষেত্রে ইউনিক কিছু হয়নি। অন্যেরা যেভাবে মডেলের জগতে এসেছে, অভিনেতা হয়েছে, আমিও সেভাবেই। টেলিভিশনে শিশুশিল্পী, কৈশোর পেরিয়ে সাবানের সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা, সেরা সুন্দরীর পুরস্কার আর খেতাব। এর পর ঐ যে বলে, পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
আমি নোট প্যাডে দ্রুত লিখতে লিখতে বলি, এই জগতে, লাইন বলছি না, জগৎ। বলে একটু হাসি পরিবেশ হালকা করার জন্য। তারপর বলি, এই জগতে খ্যাতি আছে, অর্থও আছে। সবাই তো এই দুটোর পেছনেই ছুটছে। আপনি ব্যতিক্রম হতে চান কেন?
বিকজ আই অ্যাম ডিফারেন্ট। আমি ফর্মুলায় পড়ি না। জীবনে কি চাই, তা আমার ঠিক করা আছে। অর্থ আর খ্যাতি সেই লক্ষ্য থেকে সরাতে পারবে না আমাকে। জোহরার স্বরে দৃঢ়তা।
কি সেই লক্ষ্য? আমি দ্রুত নোট-প্যাডে লিখতে থাকি।
ইন্ডিপেনডেন্স। ফ্রিডম। জোহরা উত্তর দেয়।
অর্থ ছাড়া কি ইন্ডিপেনডেন্স আসে? কিংবা ফ্রিডম। আমি বুঝতে পারছি না। খুলে বলুন।
আসতে পারে। তার জন্য চাই নিজের পছন্দ-মাফিক জীবন যাপন।
ভদ্রলোক দু’জন স্যুট পরে এসেছেন। দু’জনের হাতে এলিগেটার লেদারের ব্যাগ। অমসৃণ, চকচকে। বেশ একটা ভারিক্কি আর কর্তৃত্বের ভাব তাদের চোখে মুখে। দেখেই বুঝতে পারি তারা ওয়ান-আপ-ম্যানশিপ প্র্যাকটিস করছে। ব্যক্তিত্বের জোরে জোহরাকে কাবু করে ডোমিনেন্ট রোল নিতে চায়। প্যাট্রিআর্কির সনাতন ট্র্যাডিশন এবং প্র্যাকটিস।
জোহরা জোর দিয়ে বলছে, দেখুন আমি প্রথমেই একটা বিষয় স্পষ্ট করে দিতে চাই। আমার পড়াশুনার ব্যাঘাত ঘটে এমন কোনো শুটিং শিডিউল একসেপ্ট করতে পারবো না।
ভদ্রলোকদের মধ্যে একজন বলেন, কিন্তু অনিবার্য কারণে শিডিউল চেঞ্জ করতে হতে পারে। শুটিংয়ের জন্য ফরেন লোকেশনে গেলে সময়ের ওপর নিজেদের কন্ট্রোলে থাকে না সব সময়।
নট একসেপটেব্ল। সবার আগে আমার পড়াশুনার শিডিউল তারপর অন্য সব। জোহরা জেদের সঙ্গে বলে।
অন্য ভদ্রলোক বলেন, আমরা আপনার ওপর ইনভেস্ট করতে যাচ্ছি। পাবলিসিটি ব্লিজ শুরু হয়ে যাবে। আপনি তখন আমাদের সিস্টেমের অংশ হয়ে যাবেন। আমাদের প্রডাক্ট আর আপনার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না।
জোহরা অবাক হয়ে বলে, তার মানে আমিও একটা কমোডিটি হয়ে যাবো, মানে প্রডাক্ট? যা বাজারে কেনা বেচা যায়?
ভদ্রলোক বলেন, আমি অতো কঠোরভাবে কথাটা বলতে চাই নি। কিন্তু আপনি ভুলে যাচ্ছেন, ইউ আর অলরেডি এ প্রডাক্ট, এ ব্র্যান্ড নেম। যেদিন সাবান সেরা সুন্দরী হলেন তার পর থেকেই।
জোহরা বিরক্ত হয়ে বললো, খুবই পুরনো কথা। আমাকে শোনাবেন না।
দু’জনের মধ্যে এক ভদ্রলোক তার ব্রিফ কেস খুলে কয়েকটা কাগজ বার করে জোহরার সামনে দিয়ে বললো, আপনি প্রথমে খসড়া চুক্তিটা পড়–ন। এভাবে কথা বলে সব কিছু পরিষ্কার করা যাবে না। দেখুন, কন্ট্রাক্টে আপত্তিকর কিছু আছে কি না।
দিন। আমার ল-ইয়ারকে দেখাতে হবে।
ল-ইয়ার? মানে আপনার হাজব্যান্ড? তাকে দেখাবেন? যিনি ব্রিফকেস খুলে কাগজপত্র বের করেছিলেন তিনি প্রশ্ন করেন।
নো। মাই হাজব্যান্ড হ্যাজ গট নাথিং টু ডু উইথ ইট। আমার প্রফেশনাল ল-ইয়ার আছে।
অন্য ভদ্রলোক বলেন, শোনা যায়, আপনার হাজব্যান্ড না কি চান না আপনি মডেলিং করুন, অথবা অভিনয়?
জোহরা রুষ্ট চোখে তাকিয়ে বলে, রাবিশ। হি হ্যাজ গট নাথিং টু ডু উইথ মাই প্রাইভেট লাইফ।
ভদ্রলোক নাছোড়বান্দার মতো বলেন, শুনেছি তিনি খুবই কনজারভেটিভ। এক প্রডিউসারকে টেলিফোনে খুব ধমকি দিয়েছিলেন, গুন্ডা দিয়ে মার দেয়ার কথাও বলেছিলেন। এসব কি সত্যি?
জোহরা রাগ চেপে ঠান্ডা স্বরে বললো, এই যে আমি এখানে আপনাদের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট রাখতে এসেছি, মডেলিংয়ের শিডিউল নিয়ে কথা বলছি, এ থেকে কি মনে হয় আমি হাজব্যান্ডের হাতের মুঠোয় বন্দি? নো। নো ওয়ে। আই হ্যাভ মাই ওউন লাইফ টু লিভ। নো ওয়ান ক্যান ইন্টারফেয়ার উইথ দ্যাট। নট মাই হাজব্যান্ড, নট ইউ। নট এনি ওয়ান আন্ডার দ্য সান।
আমি জোহরার ইন্টারভিউ নিতে থাকি। তাকে বলি, আপনার বেশ কম বয়সে বিয়ে হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এটা কি করে হলো? আপনাকে খুব মডার্ন মনে হয়। খুব ইন্ডিপেন্ডেন্ট মাইন্ডেড।
জোহরা মাথা দুলিয়ে বললো, আনফরচুনেটলি যখন বয়স কম ছিল সেই সময় ইন্ডিপেন্ডেন্ট মাইন্ডেড হতে পারিনি। কেউই পারে না। এখনো আমার বয়স কম, কিন্তু ধাক্কা খেয়ে শিখেছি। শক্ত হতে পেরেছি।
আপনার বিয়েটা? আমি কথা বের করতে চাই। জানতে চাই তার বিয়ের পেছনের বৃত্তান্ত। হিউম্যান স্টোরি যা না থাকলে ইন্টারভিউ নীরস, একঘেয়ে হয়ে যায়।
জোহরা বলল, রিড মাই নেম। হোয়াট ইজ মাই নেম?
আমি বলি, কেন, জোহরা। এ থেকে কিছু বোঝা যায় না।
যায়, যায়। একটু মাথা খাটালেই বোঝা যায়। জোহরা নাম কোন্ মেয়ের হয় আজকাল? কোন্ ধরনের ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এলে? বুঝতে পারছেন না? আশ্চর্য! এমন ঝানু সাংবাদিক আপনি।
লোকটা দেখতে গুন্ডার মতো। চোখে মুখে হিংস্রতা জ্বল জ্বল করছে, যেন শ্বাপদ কোনো জন্তু শিকার পেয়েছে সামনে।
প্রথমে আগন্তুক লোকটি অকথ্য ভাষায় গালাগালি দেয় জোহরাকে। তারপর প্রায় ছুটে আসে মারার জন্য। হইচই শুনে ওয়েটাররা দৌড়ে আসে। জোহরার পেছনে অর্ধচন্দ্রাকারে দাঁড়ায় যেন তার সুরক্ষার জন্য। একজন ওয়েটার পাশে কাউন্টারের ওপর ঝোলানো সাইনবোর্ডটা খুলে এনে মারকুটে লোকটার সামনে তুলে ধরে। সেখানে লেখা : রাইটস অফ অ্যাডমিশন ইজ রিজার্ভড। লোকটা সামনে অগ্রসর হয় না। আবার অকথ্য ভাষায় জোহরার উদ্দেশে গালিগালাজ করে। তারপর ওয়েটার ছেলেদের দিকে ক্রুদ্ধ চোখে তাকিয়ে জোরে জোরে পা ফেলে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। বের হবার আগে এক পা দিয়ে মেঝেতে শুকোতে দেয়া লাল ছাতিটাকে সজোরে লাথি মারে। ছাতাটা লাফিয়ে একটু ওপরে উঠে আবার আগের মতো মেঝেতে হেলান দিয়ে পড়ে থাকে। তার রঙ এখন আরো লাল দেখায়।
যে দু’জন ভদ্রলোক জোহরার সঙ্গে কন্ট্রাক্ট নিয়ে কথা বলছিল তারা গলার টাই খুলে আলগা করে নিয়েছে, শার্টের ওপরের বোতাম খুলে দিয়েছে সেই সঙ্গে। শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত এই ঘরেও তারা এখন ঘেমে উঠেছে, থতমত খেয়ে যাচ্ছে জোহরার সঙ্গে কথা বলতে বলতে। জোহরাই এখন ডোমিনেট করছে ডিসকাশন। তার দুই পা শুয়ে থাকা বেড়ালের মতো কাডলি হবার ভঙ্গিতে সোফার ওপর এলিয়ে দেয়া। সে ঘন ঘন ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে, মনে হচ্ছে তার যাবার সময় হয়ে এলো। আসার সময় হেঁটে এসেছে, না হলে এমন কাকভেজা হতো না। যাবার সময় একটা অটো কি রিকশা পেলে নিশ্চয়ই নিয়ে নেবে। তার কাছে সময়ের অনেক দাম, সে কয়েক বারই জানিয়েছে ভদ্রলোক দু’জনকে যারা তার সঙ্গে কন্ট্রাক্ট নিয়ে কথা বলতে এসেছেন। ভদ্রলোক দু’জন নিশ্চয়ই গাড়ি করে এসেছেন, হয়তো জোহরাকে একটা লিফট দেয়ার অফার দিতে পারেন। কিন্তু আমি জানি জোহরা ধন্যবাদ দিয়ে সেই অফার প্রত্যাখ্যান করবে।
ওয়েটার এসে তাদের তিনজনকে স্যান্ডউইচ আর কফি দিল। জোহরা স্যান্ডউইচ হাতে নিয়ে বললো, কফি শেষ করুন। আমাকে এখুনি যেতে হবে।
একজন ভদ্রলোক কাচের দেয়ালের বাইরে তাকিয়ে বললেন, এখনো বৃষ্টি হচ্ছে। আপনার কি গাড়ি আছে?
না। আমি বৃষ্টির ভেতরই হেঁটে হেঁটে এসেছি। যানবাহন পাইনি। তবু আপনাদের আগে এসে পৌঁছেছি। তার মুখে তৃপ্তির হাসি।
ভদ্রলোকদের একজন কাগজগুলো হাতে নিয়ে বললেন, আপনাকে আমরা লিফট দিতে পারি। তার কথা শুনে আমি মনে মনে যা ভেবেছিলাম জোহরা সেই রকমই উত্তর দিলো। আমি অবাক হলাম না।
ভদ্রলোক হাতের কাগজগুলো জোহরাকে দিয়ে বললো, আপনি নিয়ে যান। আপনার ল-ইয়ারকে দেখান। হ্যাঁ, একটা ক্লজ রেখেছি আমরা। কোনো কারণে আপনি অ্যাগ্রিড শিডিউল রাখতে না পারলে তার জন্য আপনার ফি থেকে নির্দিষ্ট হারে কেটে রাখা হবে।
অসুখে পড়লেও? জোহরা চোখ বড়ো বড়ো করে তাকায়। তার দৃষ্টিতে কৌতুক।
হ্যাঁ। এটা স্ট্যান্ডার্ড কন্ট্রাক্ট প্রভিশন। সব কন্ট্রাক্টেই থাকে।
জোহরা স্যান্ডউইচ চিবিয়ে খাওয়ার পর বলে, আপনারা দাতব্য প্রতিষ্ঠান নন, সেটা জানি। তাই বলে এতোটা কোল্ড ব্লাডেড? হার্ড হেডেড?
অন্য ভদ্রলোক গলার টাই আরো আলগা করে বলেন, বিজনেস ইজ বিজনেস। এখানে ইমোশনের জায়গা নেই।
হ্যাঁ। তাইতো দেখছি। জোহরার স্বরে শ্লেষ।
ভদ্রলোকদের একজন বলেন, আপনার হাজব্যান্ড যদি শুটিংয়ের সময় গন্ডগোল করতে আসেন, তার জন্য কন্ট্রাক্ট সই হবার পরই থানায় একটা জিডি করে রাখলে ভালো হবে।
শুনে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে জোহরা। যেন যা শুনছে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে চিবিয়ে চিবিয়ে দৃঢ়স্বরে বলে, নেভার। আমি থানা-পুলিশ করবো না। এ ছাড়াই তাকে কিভাবে হ্যান্ডেল করতে হয়, তা আমার জানা আছে। আই নো মাই রাইটস। শুধু দেখছি, মদ্যপটা কত দূর যেতে পারে, কত নিচে নামতে চায়!
তবু। ভদ্রলোক জোর দিতে চান থানায় জিডি করার ব্যাপারে।
দেয়ার ইজ নো ইফস অ্যান্ড বাটস। বললাম না, আই নো মাই রাইটস। যা করতে হয় ঠিক সময়েই করবো। আমার লাইফ আমার ওপর ছেড়ে দিন। জোহরার স্বরে দৃঢ়তা। যেন সে ভদ্রলোক দু’জনকে নয়, অদৃশ্য কাউকে দেখে বলছে কথাগুলো।
কিছুক্ষণ কেউ কোন কথা বলে না। একটু পর জোহরা উঠে তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে তার লাল ছাতা হাতে তুলে বেরিয়ে যাওয়ার আগে বলে, থ্যাংকস ফর কফি অ্যান্ড স্যান্ডউইচ। তারপর ওয়েটার ছেলেদের দিকে তাকিয়ে ছাতাটা দেখিয়ে বলে, দেখছেন একদম শুকিয়ে গিয়েছে। ছাতাটার স্বভাব আমার জানা। আমারই তো।
জোহরা চলে যায়, হাতে খোলা লাল ছাতা। বাইরে তখনো ঝির ঝির বৃষ্টি পড়ছে। কাচের দেয়াল ঘেমে উঠেছে ভেতরে আর বাইরে তাপমাত্রার পার্থক্যের জন্য। ভদ্রলোক দু’জন একটু পর বেরিয়ে গেলেন ব্রিফকেস হাতে নিয়ে, গলার টাই আগের মতো বেঁধে। তারা দু’জন যেমন ভারিক্কি ভঙ্গিতে ঢুকেছিলেন, এখন তা দেখা যাচ্ছে না। বৃষ্টিভেজা কাপড়ের মতো চুপসে গিয়েছেন যেন। ঘরের মধ্যে এখন কফি অ্যারাবিকার কড়া গন্ধ। জিভে পানি টেনে চকোলেটের মিষ্টি সৌরভ।
মডেল মেয়েটি যখন কফি শপে ঢুকলো, আমি দ্বিতীয়বারের মতো কফি খাচ্ছি। মেয়েটি ব্যস্ত হয়ে এসে আমার সামনে বসে বললো, দেরি হয়ে গেল। বৃষ্টি হচ্ছিল জোরে জোরে। অটো-রিকশা সামনে এগুতেই পারছিল না রাস্তায় জমে থাকা পানির জন্য। তারপর সে রুমাল বের করে ভেজা মুখ মুছতে মুছতে বললো, আপনাকে কি অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখেছি?
আমি কফিতে চুমুক দেওয়া শেষ করে কাপটা টেবিলে রেখে বললাম, কিছুক্ষণ। কিন্তু আমার খুব সুন্দর সময় কেটেছে। একটুও বোরড হইনি। বলে আমি টেবিলে রাখা আমার নোট-প্যাড খুলি। সবগুলো পাতা সাদা। কিছুই লেখা হয়নি। কলমের কালো দাগে ভরে উঠবার জন্য অপেক্ষা করছে পাতাগুলো। আমি বলি, তাহলে শুরু করা যাক ইন্টারভিউ। এর মধ্যে আপনার জন্য কফি এসে যাবে। সঙ্গে কি খাবেন? চকোলেট কেক, না স্যান্ডউইচ?
মডেল মেয়েটি বললো, চকোলেট কেক।
আমি কলম হাতে নিয়ে বললাম, এ লাইনে কিভাবে এলেন? মানে মডেলিং, অভিনয়?
অদূরে কাউন্টারের ওপাশে কফির মেশিন হু-উ-উ-শ শব্দ করে উঠলো। কাপুচিনো কফি তৈরি হচ্ছে। চকোলেটের গন্ধ এসে গেল নাকের খুব কাছে। বাইরে এখনো ঝির ঝির বৃষ্টি হচ্ছে। মেয়েটির হাতে কোনো ছাতা নেই। হ