তহমিনার অবদমিত ভাবটি যখন পরিবারের অন্যদের আক্রান্ত করলো, সবাই তার দিকে ঢলে পড়লো। কখনো ভর্ৎসনা, কখনো আশ্বাস। কখনো খবরদারি। সারাক্ষণ তাকে নজরের ভেতর রাখার প্রয়াস ঘরের পরিবেশ অস্বাভাবিকভাবে কাতর করে তুলছিলো। কিন্তু এসবের কিছুই যে তহমিনাকে স্পর্শ করছে না। এটা ঠিক কেউ ওকে বুঝে উঠতে পারছিলো না। অনেকদিন ধরে বিষয়টি চাপা পড়ে ছিলো। আবার নতুন উপসর্গে শুরু হয়েছে জীবনের এই ক্রান্তিকাল। মন থেকে ছবিটি ঘষে তোলার অবিরাম চেষ্টায় নিজেকে শুধু ক্লান্ত করছে সে। কিন্তু ভুলতে পারছে না। কুন্ডলী থেকে ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার মতো কতবার গা ঝাড়া দিয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ওই ছবিই যেন আবার তাকে আকণ্ঠ গিলে খায়। যে ছবিটি সে নিজে একটু একটু করে গড়ে তুলেছিলো।
শহরতলির সেমিপাকা বিশাল বাড়িটিতে তহমিনাদের জীবনযাপনের ধারা আজো একেবারে সাদামাটা। একগুঁয়ে, রক্ষণশীল জীবনযাপনে অভ্যস্ত সবার শাসন-বারণ টপকে সে কলেজ পার হয়ে ভার্সিটিতে উঠলো যখন, তখনো তার অগ্রগতির মূল্যায়ন সময়ক্ষেপণ ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারছিলো না বাড়ির কর্তাব্যক্তিরা। এমএ পাস করলে একটা সাধারণ চাকরি। তার চেয়ে স্কুলজীবন শেষ হতে না হতে বড়লোকের বাড়ির বউ হওয়া অনেক বেশি লাভজনক। বংশের গায়ে কোনো ধরনের কালির আঁচড়ও পড়লো না। অনায়াসে মেয়েদের সুযোগ আছে বিলাসী জীবনযাপনের। অন্তত ওদের বাড়ির মেয়েরা তাই পেরেছে। দু’টি যমজ মেয়ের বিয়ে প্রায় একসঙ্গে হবে সেটাই তো স্বাভাবিক! কিন্তু একটির বিয়ে হয়ে ছেলের মা হয়ে গেলো। আর একটি চোখের কাঁটা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে! অনূঢ়া তহমিনার প্রতি সবাই ক্ষুব্ধ। আর বিতিকিচ্ছি এমন সময় ঘটলো আরেক বিপর্যয়। সাবরিনা দ্বিতীয় বাচ্চাটি জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেলো।
এই শোক সবার প্রাণেই সমান বেজে চলছে। দু’টি অবুঝ শিশু মা’হারা হলো। তার ওপর ওয়াহিদ পাত্র হিসেবে খারাপ নয়। সিএ পড়তে পড়তে অকারণে পড়াটা ছেড়ে দিয়েছিলো। কিন্তু বাবার ব্যবসায়িক প্রসারতার চূড়ান্ত অবস্থাটি তার হাতেই খুলেছে। তাই শ্বশুরবাড়ির মানুষ তাকে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট বলে জাহির করতে কার্পণ্য করে না। তহমিনার বাবা রিয়াজ উদ্দিন সাহেব বাড়ি-গাড়ি, স্ট্যাটাস-এর সব হিসেব কষে তবেই তহমিনাকে সাবরিনার স্থানে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন। তিনি সেধেই বলতে লাগলেন, তহমিনাকে সাবরিনার বাচ্চা দু’টির মুখ চেয়ে ওয়াহিদের সঙ্গে বিয়েতে রাজি হতে হবে। যমজের জন্য তহমিনার টান কখনো কম ছিলো না। নিজের শিক্ষা-দীক্ষা নিয়েও হয়তো এ ক্ষেত্রে গৌরব করতো না। কিন্তু তার চোখের কোটরে যে গেঁথে আছে আরেকজন। তাই সে খেদোক্তি ঝরে-হয়তো শেষ পর্যন্ত জাফরের সঙ্গেও আমার বিয়ে হবে না। তবে আর কারো সঙ্গেও আমার বিয়ে হবে না। এটাও তোমরা জেনে রেখো।
তহমিনার ধনুক-পণ যখন টেনে ভাঙার চেষ্টা চলছিলো, তখনি বিষয়টি বেরিয়ে গিয়েছিলো তহমিনাকে জাফরকে পছন্দ করে।’ সবার জন্য অবশ্যই এটা ভালো খবর। কারো আপত্তি নেই। বিয়ের আয়োজন চলুক… আবার বেঁকে বসেছিলো তহমিনা। বলেছিলো- এখনি নয় ও লেখাপড়া শেষ করে বিয়ে করতে চায় এবং আমাকেও ভালো করে লেখাপড়া করতে হবে। কিন্তু এ বিষয়ে দীর্ঘসূত্রতা কেউ মানতে চায় না। শেষে একটা কেলেঙ্কারি…। জাফর রাজি হলে গার্জিয়ানদের আপত্তি ছিলো না। কিন্তু হঠাৎ একদিন জাফর ঘোষণা দিলো, কানাডা যাচ্ছি। সুযোগটা যখন এসে গেছে, তার ব্যবহার করি। এখানে যে চাকরি করছি, প্রমোশন পেতে পেতে শেষ সময় একটা পজিশনে যাওয়া যায়। কিন্তু কানাডার অফারটা ভালো। চাকরির সঙ্গে হায়ার এডুকেশন হয়ে যাবে।
পাড়া-প্রতিবেশীর কপালে ওঠা চোখের সামনে দিয়ে জাফর প্রায়ই আসতো। মামাবাড়ি আসতে তো কারো বাধা থাকার কথা নয়। তার ওপর যে ভাগ্নে জামাই হতে যাচ্ছে। কিন্তু না, জাফরকে ক্রমশ কেউ ভালো চোখে দেখছিলো না। কী বাধা থাকতে পারে তার এখনি বিয়েতে? সে তো গরিবের ছেলে নয়!’ কিন্তু তহমিনা টলে না। জাফর প্রায়ই আসে। এই আসার বাইরেও বিভিন্ন স্থানে দেখা হয় জাফরের সঙ্গে তহমিনার। তবে সে দেখা যোগসাজশের নয়। হঠাৎ কখনো কোথাও।
জাফরের চেহারায় বুদ্ধিমত্তার ছাপ। চোখে অনেক বড় হওয়ার স্বপ্ন। ব্যক্তিত্বে পরিমিত গাম্ভীর্য। ভরাট কণ্ঠস্বর। তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই কারো। আর এইসব আবেশ আর স্বপ্নকে তহমিনা স্পর্শ করতে চায় নিজের মধ্যে। আর তারই কসরত তাকে তার নিজেরই অচেনা মানুষে পরিণত করে। প্রতিদিন। তহমিনার বড় দু’ভাই। জাফর ওদেরও কিছুটা বড়। বয়সের এই দূরত্বটুকু কখনো সমীহভাবটি ফিকে করতে পারেনি। দূরে গেলে কি এক টান। কাছে এলে ভয়। উচ্ছ্বাস কখনো বন্ডা হারাতে পারেনি জাফরের কাছে। নামা হয়নি আপনি থেকে তুমিতেও। জাফরও বলে ‘তুই’। ‘ভালোবাসি’ শব্দটি শুনতে কেমন, তা ওরা দু’জন কেউ কারো মুখ থেকে শোনেনি। দু’ভাইয়ের থেকে তহমিনা লেখাপড়ায় ভালো ছিলো। সাবরিনার চেয়েও। তাতেই জাফরের মনোযোগ ওর ওপর পড়ে। আর সেটুকুই পুষিয়ে দিতে ও একনিষ্ঠ হয়েছে ভক্তিতে। শুধু একটু কাছে গিয়ে দাঁড়াতে পারাটাও কখন আরাধ্য হয়ে গেছে তহমিনার। কিন্তু তারও উপায় কি অতো সহজ ছিলো?
তহমিনা যখন বিএ পাস করলো, বিষয়টি বাড়ির কারো প্রাণে এতটুকুও চাঞ্চল্য সৃষ্টি করলো না আনন্দ প্রকাশ করা দূরে থাক। যেন এই একটা পাসের চেয়ে কতগুলো ছেলেমেয়ে আর ভরা সংসার অনেক ভালো ছিলো। আরেকজন যেমন এরই মধ্যে ফুটফুটে চাঁদের মতো ছেলের মা হয়ে গেছে। কি হাসি-আনন্দে সে এসে এসে কলরবে বাড়ি মাতিয়ে রেখে যেত। আর সেই মাতন-এর স্মৃতি বাড়ির সবার প্রাণ এখন ছারখার করছে শূন্যতায়। বেয়াড়া আগুন আরো উসকে ওঠে শুধু অনূঢ়া তহমিনার দিকে চেয়ে। কিন্তু বাইরের পরিমন্ডল অবারিত হতে হতে ঘরের একপেশে আচরণটা ওকে আর আগের মতো পীড়া দেয় না। বরং কারো জন্য এই তিতিক্ষা তার মনে একধরনের প্রশান্তি তৈরি করে। তপস্যার সমান শক্তি জোগায় প্রাণে।
কানাডা যাওয়ার আগে জাফর ওকে কাছে ডেকে বলেছিল, আমি কানাডা যাচ্ছি। দু’বছর পরে ফিরবো। তুই কিন্তু ভালো করে লেখাপড়া করিস। আমি চিঠি লিখলে দীর্ঘ করে উত্তর লিখবি। আর মাঝে মাঝে ফোনে তো কথা হবেই।
আবার দীর্ঘ অপেক্ষা? কিসের অপেক্ষা? বাড়ির সবার দোষ কি, সে নিজেও উৎকণ্ঠিত হয়ে ওঠে এবার। এই অনির্ধারিত অপেক্ষা কোথাও গিয়ে ঠেকবে তো! কিন্তু দু’জনের কোনোদিন তো এমন কথা হয়নি, যাতে ভর করে কেউ কাউকে কৈফিয়ৎ তলব করতে পারে। এ যেন শুধু এক চৌম্বক আকর্ষণ। সে আকর্ষণ তাদের কার জন্য কার কতটুকু। তাও কেউ যাচাই করতে যায়নি। কিন্তু জীবনে একজন যার প্রভার টের পায় তহমিনা, সে ওই জাফর! মোহাম্মদ জাফরুল্লাহ চৌধুরী। প্রকৃতি যেন সূর্যের প্রভাবে আলোকিত ও উত্তপ্ত হয়। নদী যেমন চাঁদের টানে ভাসে-ডোবে জোয়ার ভাটায়, তেমনি তহমিনা একটা আলো, একটা অননুভবনীয় বোধে ঝলকে ওঠে। কিন্তু সাহস হয়নি বা সুযোগ আসেনি অভিমানের। বা কোনো রফায় পৌঁছুনোর। বা ডাগর চোখ করে তাকায়। কিন্তু আজ সে ব্যাকুল চোখে শুধু ওইটুকুতে ভর করে দ্রুত বলে ফেললো-কবে ফিরবেন?
-বছর দুই পর! তারপর তোকে নিয়ে যাবো। ভালো রেজাল্ট করতে হবে। ইংরেজিটা ভালো করে শিখিস…।’
এমএ পাস করতে করতে, জাফরের কানাডা যাওয়ার প্রথম দিকে যোগাযোগটা ঠিক থাকলেও পরে যেন শিথিল হয়ে আসে। আর এদিকে ব্যাকুল হয় তহমিনা। কিন্তু প্রচন্ড এই ঝড়কে সে একা কতদিন পুষে রাখবে? বিকল্প সিদ্ধান্তে টলতে থাকে। অন্তত মাথাটি যেন নিচু না হয়ে যায়। বাড়ির মানুষগুলো অবশ্য থিতিয়ে গেছে ওর ব্যক্তিত্বের কাছে। একটা অসহনীয় যন্ত্রণার মধ্যেও নিজের এ অর্জনটুকু তার ভালো লাগে। অনেকদিন পার হয়ে যায়, দু’বছর গড়িয়ে গেছে আরো দু’বছর আগে। তহমিনা একটা অপেক্ষার ভেতর দিয়ে শুধু তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসা, লেখাপড়া, সেই সূত্রে কিছু মেয়েবন্ধুর সঙ্গে সম্পর্ক। যোগাযোগ। তারপর লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে একরকম ঝিম ধরে বসে আছে। মাঝে মাঝে নামকা ওয়াস্তে দু-একটা চাকরির ইন্টারভিউ। সময়ের অনির্দিষ্ট স্রোতে ভেলার মতো ভেসে যেতে মন্দ লাগতো না, যদি না মা-বাবা ভাই দু’টি মনে করিয়ে দিতÑওয়াহিদ পাত্র হিসেবে খারাপ নয়। বয়সেও জাফরের চেয়ে অনেক ছোট। এখনো টগবগে যুবক। আর ও বাচ্চা তো তোরই যমজের। মনে কর, তোরই!
প্রতিবার এটুকু বলে ক্ষান্ত হলে কথা ছিলো, কিন্তু এটুকুর সঙ্গে আবার এটুকুর সমান আরেকটা লেজ থাকে প্রতিবার ‘তোর জন্য কি ছেলের অভাব হতো? কিন্তু চতুর্দিক চাউর হয়ে আছে, জাফরের বিষয়টি…। এটা যেন তাড়িয়ে অনুভব করে তহমিনা। যাকে জীবনে পেলাম না, তার খবর যদি হাওয়ায় ভাসে তবু তো পাচ্ছি তাকে। হাওয়ার পরশে যেভাবে পাওয়া যায় ফুলের সৌরভ। শুধু একজনের আবিররঙে রঙিন হয়ে থাকা। নিজেকে যেন টলমল জলের ঢেউ খেলানো নদী মনে হয় এসময়ে।
সবার নয়, কাউকে কাউকে দেখে সে নিজের মতো বাঁচার একটা চেষ্টা চালাচ্ছে। একটা চাকরির এই জোড়াতালির প্রয়াসের ভেতর জাফরের দেশে ফেরার খবর রটে যায়। বিয়ে করেছে সে। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়েই ফিরেছে। নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টাটুকু টলিয়ে দিচ্ছে ওর প্রতি বাড়ির সবার মনোযোগ। যা করুণা ছাড়া কিচ্ছু নয়। তহমিনা যেখানে সরে লুকিয়ে থাকতে চায়, সেখানেই ওর মা গিয়ে হানা দেয়। ভাইয়েরা শঙ্কিত চোখে তাকায়। বাবা তার ভাগ্নের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে গালিগালাজ করে। বাবা তার বড় বোনকে আর আগের মতো সমীহ করে না ছেলের দোষে। কিন্তু বেচারি ফুপু তো পারলে তখনি তহমিনাকে নিয়ে চলে যায়। ভাইকে প্রতিবার আশ্বাস দিয়ে যেত। ‘ভালোই তো লেখাপড়া শিখুক না। আসুক জাফর, বিয়ে আস্তে ধীরে হোক।’ ইদানীং আত্মীয়স্বজন মুখটিপে হাসছে। তহমিনা বহুদূরের একা কোনো প্রান্তর ধরে হাঁটছে যেন। কাউকে তার ভালো লাগে না। কারো কথা ভাবতে ভালো লাগে না। শুধু বিরামহীন পথ চলছেই। এই চলাও যেন কারো পথ আগলে দাঁড়াবার স্বপ্নের। আবার পথ বেঁকে যায় পথের ভেতর। মুক্তির উপায় খুঁজতে দলামুচড়ো থেকে নিজেকে সে এভাবেই ছাড়িয়ে রাখতে ছবিটা ঝাপসা করে আনে।
শরতের গাঢ়, উজ্জ্বল রোদের এক সকালে হঠাৎ জাফর ওর বিদেশিনী স্ত্রীকে নিয়ে এলো তহমিনাদের বাড়িতে। সবার মুখ থমথম্ কেউ এগোচ্ছে না দেখে তহমিনাই গেলো ওদের দিকে। যেন ঘুম ভেঙে কাউকে দেখছে, তাকানোর ধরন এমন। পাথরের চাঁই হয়ে ওঠা মেঘ আপ্রাণ চেষ্টায় সরিয়ে আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে উঠলো সে। জাফরকে অবাক করে দিয়ে মুখর হয়ে উঠলো বউটির সাথে। কোণঠাসা হয়ে পড়া জাফর একটার পর একটা সিগারেট ধরাচ্ছে আর আড়চোখে তহমিনাকে দেখছে। এ দেখা অন্যরকম। ভয়ঙ্কর। জাফরের চোখের কোথায় যেন লুকানো অন্ধকার ভেসে উঠে- শিউরে উঠছে তহমিনা। আর দেখা না হলেই ভালো ছিলো।
লরা কানাডার একটা কলেজে পড়ায়। অনেক শখের ভেতর ভ্রমণ তার শখ। বহু দেশ ঘুরেছে সে। বাংলাদেশে আসার ইচ্ছেই তাকে জাফরের কাছাকাছি আনে। জাফর ছাড়াও বহু বাঙালি ছেলেমেয়ে তার বন্ধু। এখানে অনেক কিছুই তার ভালো লেগেছে। তালের ডিঙিতে করে নদী পার হওয়া এর মধ্যে সবচেয়ে আনন্দের। এতে সে একটুও ভয় পায়নি। কারণ সে ভালো সাঁতার জানে। প্রথম পরিচিত হয়েই অনেকে কানাডা যাওয়ার সুযোগ চায়। এদেরকে খুব খারাপ লাগে। এরা অনেকটা জাফরের মতো স্বার্থপর বলেই লরা চোখ টিপে হেসে ওঠে। লরার বর্ণনার ধরন এবং রসিকতা ভালো লাগে তহমিনার। কিন্তু ও লরার সব কথা বুঝে উঠতে পারছিলো না। দ্রুত বলা ইংরেজি ভাষার অনেকটাই ওর অপরিচিত ঠেকে। তবু ওর ভাবভঙ্গি এবং কথার যেটুকু বোঝে আত্মস্থ করার চেষ্টা করে।
– আমি খুব স্বার্থপর তাই না? লরার উচ্ছ্বসিত গল্পের ছেদ পড়ে তহমিনার প্রতি জাফরের প্রশ্নবাণে। স্বার্থপর শব্দটি শুনতে খারাপ লাগে না। শব্দটি শুনতে অভিজাত মনে হয়। ‘তাই ওই অভিধাটি আমি আপনাকে কোনোদিন দিতে পারবো না। আপনি আমাকে অমানবিক কষ্ট দিয়েছেন। বেহিসেবি কষ্ট দিয়েছেন। কখনো ভাবেননি আপনার অবহেলা আমাকে কতটা কষ্ট দিতে পারে। এটুকু যদি ভাবতে না-ই পারলেন, কেন আমার দিকে এতটা মনোযোগ দিতে গেলেন। সেই ছোটবেলা থেকে যখন তখন আমাকেই ডেকে বিভোর করেছেন। আপনার যা কিছু প্রয়োজন তার সবই যেন আমার কাছে রাখা ছিলো। এই আকুলতাকে আমি যদি ভালোবাসাই মনে করে থাকি, সে আমার ভুল? না, অভিযোগ করার মতো কোনো উপায় আপনি রাখেননি। তা-ই আপনি যথার্থই চতুর, তঞ্চকও বলা যায়। এটাই আপনাকে মানায়।’ একটানা কথাগুলো বলে গেলো নিজের সঙ্গে তহমিনা। দু-একবার শুধু এরই মধ্যে শুষ্ক চোখ দু’টি তুলে তাকিয়েছিলো জাফরের দিকে।
-আসলে তোকে আমার স্ত্রী হিসেবে পাওয়ার কথা কখনো ভাবতে ভালো লাগেনি। তবে ভালোবেসেছি এটা ঠিক। আমাকে নিয়ে তোর ভাবনাটুকুও বুঝতে পেরে প্রতিহত করতে পারিনি। চেয়েছি তুই লেখাপড়া শিখে বড় হবি। বংশের ভেতর একটা মেয়েও শিক্ষিত থাকবে না? আমি শিওর, ওই ঘোরটুকু ভেঙে দিলে তোর এটুকু পথ আসা হতো না। তবে এখন মনে হচ্ছে, তুই চাইলে আমি তোকে বিয়ে করতে পারি। এখন তোর চাওয়া-পাওয়ার মূল্য হিসেবে নিজেকে ব্যবহার করা যায়।’ তহমিনা আঁতকে ওঠে জাফরের কথায়। ঠোঁটে হাসি লেগে থাকা লরার দিকে তাকিয়ে বলে-ও শুনছে না আপনার এ জঘন্য কথাগুলো?
-ও বাংলা বোঝে না!
-তাতে কী, আমাকে আপনার ভয় হলো না? জাফরের দিকে তাকাতে গিয়ে প্রচন্ড কম্পনে ধসে যায় তহমিনার পৃথিবী। এই মানুষটি এত ধড়িবাজ। ওর কল্পনা উবে গেলে আসল মুখ বেরিয়ে আসে। শেষপর্যন্ত এতটা ঘৃণা সে করেনি। কিন্তু ওই এক কথায় বিচূর্ণ হয়ে গেলো তার নিজের ওপর থেকে আস্থাটুকু।
জাফর আবার শুরু করে। তুই রাজি হলে আমি লরাকে একা পাঠিয়ে দেবো। আমি আর কোথাও যাবো না…। জাফরের কথা শেষ না হতে লরাকে নিয়ে উঠে পড়লো তহমিনা। বাড়ির ভেতর মহলে গিয়ে শুনলো লরার গল্পের বাকিটা। ‘বিয়ের পর শুনেছি ও তোমাকে ভালোবাসে, কিন্তু ঠিক কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছিলো না। এই দ্বন্দ্বটি নাকি বরাবর ছিলো। আমার খুব কৌতূহল হলো, কেউ কারো জন্য অপেক্ষা করে থাকে…।’ তহমিনার শরীর অবশ হয়ে আসে। নিজেকে খুব খেলো মনে হয়। সে একা হওয়ার জন্য ছটফট করতে থাকে।
জাফর চলে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ একা বসেছিলো তহমিনা। কিন্তু একাকিত্বটা ভরে ওঠে ধ্যানের মতো মগ্ন ছবিতে। একেবারেই নিখুঁত সে ছবি। যার দোষগুণে কিচ্ছু আসে যায় না। ইচ্ছে করে ছুটে গিয়ে ওকে বলেÑ হ্যাঁ আমি তোমাকে চাই! যার যত সর্বনাশ হয় হোক। তোমাকে আমি চাই! আমার সমস্ত কষ্টের মূল্য, অপেক্ষার মূল্য হিসেবে তোমাকে আমার সবটুকু অধিকার! আমি তোমাকে ভালোবেসেছি! তুমি আমাকে বাধ্য করেছো…। জানালার পর্দা সরিয়ে আলোতে মুখ বাড়ায় তহমিনা। বাতাস ভারী ঠেকে। উন্মুক্ত আকাশের মতো দিগন্তে নেমে পড়ে সে। বাড়ির সামনে মাঠ পেরিয়ে বড় রাস্তা। শাঁ শাঁ করে ছুটছে যানবাহন পতঙ্গের মতো তারই একটির মধ্যে ঢুকে পড়ে সে।
অনেকদিন পর সাবরিনার বাসায় এলো তহমিনা। বাড়িতে ওয়াহিদ একা। দেয়ালে ওয়াহিদের সঙ্গে সাবরিনার ছবিটা তাকে হঠাৎই আচ্ছন্ন করলো। এত তার নিজেরই ছবি! দ্বিতীয় বাচ্চার জন্মের সময় মারা গেছে সাবরিনা। সেই দু’বছরের একটি আর চার বছরের মোট দু’টি ছেলে ওর। মাঝে মাঝে ওরা তহমিনাদের বাড়ি গিয়ে থাকে। তবে এখানে দাদির কাছেই ভালো থাকে বলে ওরা নিশ্চিন্ত। এই বাচ্চা দু’টির জন্য কখনো তহমিনার মাতৃত্ব জেগে ওঠেনি। কে কোথায়। ভেতর থেকে রাজ্যের কথার ফুলঝুরি নিয়ে আজ কেউ হামলে পড়ছে না দেখে তহমিনা ওয়াহিদের কাছে জানতে চায় না তার মার কথা।
বরং নিজেকে সে এই প্রথম কলসের জলের মতো ঢেলে দিলো ওয়াহিদের কাছে। ওয়াহিদ তো ওদের সবটুকুই জানে। কিন্তু ব্যক্তিগত এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলার অবকাশ কখনো হয়নি। কিছু বলতে হয় তাই বলা। কিন্তু প্রসঙ্গ সেই জাফরের। একেবারে শেষেরটুকু দিয়ে শুরু করলো তহমিনা। জাফরের নীতিহীনতা তাকে গুলিয়ে ফেলেছে। ‘এই মানুষটিকে জীবনে পাওয়ার জন্য আমি তপস্যা করেছি? এখন ওর ঘোর আমি কাটাতে পারছি না। ওর ছবি মন থেকে মুছতে পারছি না। আজ ওর যে রূপ প্রকাশিত হলো, তবুও না।
-তার নিজস্ব রূপ তো তুমি আঁকোনি। তুমি তো এঁকেছো তোমার মতো করে! অনেকটাই তোমার কল্পনা। তাকে তোমার নিজস্ব লাবণ্য মিশিয়ে দেখো বলে ও তোমার কাছে অতো সুন্দর। না হলে সবার কাছেই একইরকম মনে হতো।
-আমি এই যন্ত্রণার শেষ চাই!
-তুমি বিয়ে কর। তোমার জন্য পাত্রের অভাব হবে না। আমি পাত্র দেখি?
-চারপাশে যে জীবন দেখি তাতে তো কোনো মাধুর্য দেখি না! তোমরা কি সেই জীবনে ঢুকতে বলো, ইট-কাঠের ঘর-সংসার আর অন্যের সেবার নিচে আমি জীবনের এইসব রঙ নিয়ে চাপা পড়ে থাকবো। আমার সব দায়ভার গ্রহণের জন্য একজনের সঙ্গে চুক্তি হবে, আর তারই ওপর ভর করে সেই অচেনা মানুষটি আমার স্বামী হবে…।
– নিশ্চয় তাই। তবে তাও তো মানুষ আনন্দের সঙ্গে করছে। কারণ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সেটাই প্রথম দরকার। কিন্তু এভাবে থাকাটাও একসময় আত্মহননের দিকে ঠেলে দেবে তোমাকে। তুমি কোথায় কোথায় চাকরির ইন্টারভিউ দিয়েছিলে, আপাতত সেদিকে মনোযোগ দাও।
– তুমি আমাকে বিয়ে করবে?
– লোভ দেখাচ্ছো?
– পরিত্রাণ চাইছি!
– উদ্ধারকর্তা হিসেবে আমি তোমার যোগ্য কিনা ভেবেছো?
– যে ঘরে আমার বোন ছিলো, যার সঙ্গে আমি একসঙ্গে ভূমিষ্ঠ হয়েছি… বাড়ির সবাই তো তাই চেয়েছিলোও।
– তোমার বোনের সঙ্গে কখনো তোমার তুলনা হয় না। আগেও হতো না। মা তো বলতোই যমজের একটা দুর্বল হয়। আর দুর্বল মেয়েটিই ওরা তোকে গছিয়েছে। বিয়ের পর আমি চেয়েছিলাম ওকে কলেজে ভর্তি করে দিতে। কিন্তু বিদ্যে ওর মাথায় ঢুকত না। যেটা সে ভালো পারতো সেটা বাপের বাড়ির বিষয়-সম্পত্তির সঙ্গে শ্বশুর বাড়ির তুলনা। তুমি আরো ভেবে দেখো তহমিনা! আমি অন্য কারো মতের কথা বলছি না। আমি তোমার কথাই ভাবছি।
– আমি আর ভাবতে পারছি না, পাগল হয়ে যাচ্ছি মনে হচ্ছে। ও কেন এসেছিলো?
– তহমিনা শত বিপর্যয়ের মধ্যেও একটা কথা মনে রেখো, তাতে কষ্টটা কমবে। জাফর ভাই কেন তোমাকে বিয়ে করেননি, জানি না। তবে আজকের এই তুমি, এই যে অন্য তুমি, সেটুকুর ভূমিকা কিন্তু তারই। তিনি তোমার সামনে না থাকলে তোমার যা থাকত না সেখানে নিয়ে একবার নিজেকে ভাবো? বাড়ির অন্য মেয়েগুলো দেখো। সব কালের পুতুল।
তহমিনা কিছুই বলে না। সে ওয়াহিদের কথাগুলো শুনছে বলেও মনে হলো না। ‘আমার বহুদূর চলে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সে পথেও যেন একটা সময় ওকে চাই…। এখন আমার অন্য পথে হাঁটতে হবে। আমাকে তুমি বিয়ে করো ওয়াহিদ!’
– তহমিনা, পাত্র হিসেবে আমি হয়তো জাফরের মতো অতোটা যোগ্য নই। কিন্তু তুমি যে সঙ্কটে পড়ে এসেছো, এই সঙ্কটে ডুবে আরেকটা জীবনে ঢোকা ঠিক হবে না। তুমি একটি ঘোর ভাঙতে চেয়ে আরেকটা ঘোর চাইছো। কিন্তু আমি?
– এই অনুকম্পাটুকু পাবো বলেই বলছি। না হলে আমি জানি এও একধরনের পাপ। একধরনের বিকৃতি।
– তোমার মতো মেয়ের আমার মতো একটা সাধারণ মানুষের অনুকম্পা মাথায় করে বেঁচে থাকার চেষ্টা তোমার কাছে খুব বেশি সুখের হবে না। আমি না হয় জেনে শুনেই বিষ পান করলাম।
– চলো আজই আমরা বিয়ে করি!
– মাথা খারাপ হয়েছে তোমার? আরো ভাবো, বাড়িতে সবার মত নাও। আমার মা-বাবা অবশ্য খুশিই হবেন…।
– চলো ওয়াহিদ! আমরা বাইরে কোথাও যাই!
– চেনা মানুষেরা দেখলে কী ভাববে? তুমি তো আমার সঙ্গে বের হওনি কোনোদিন।
– এই রাতের বেলা কেউ দেখবে কি? এত সময় কার আছে চেনার জন্য। তা ছাড়া যখন ফিরবো তোমার স্ত্রী হয়ে ফিরবো।
– তোমার জন্য সবাই চিন্তা করছে বাড়িতে।
– আমি বলে এসেছি এখানে আসার কথা। চলো ওয়াহিদ, আমার নিঃশ্বাস আটকে আসছে।
– সত্যি করে একটা কথা বলো তো তহমিনা?
– বলো!
– এই যে আমার কাছ থেকে তোমার বোনের স্থানটি তুমি দখল করতে চাইছো, খারাপ লাগছে না?
– জীবনের দাবিই একমাত্র সত্য। মৃতের তো কোনো দাবি নেই। কিছু সঙ্কট যথাসময়ে তাই প্রমাণ করে দেয়…। কথা বলতে বলতে ওরা বের হয়ে যায়। বাড়িটি শূন্য। তহমিনা জানতেও চায় না কে কোথায়। আগবাড়িয়ে বলাও হয়নি দু’দিন হলো মা বড় আপার বাসায় বেড়াতে গেছেন। ক’দিন থাকবেন, বলেছেন।
দু’জনের ফিরতে দেরি হলো না। কিন্তু ফিরে এসে দু’জনে অযথাই গম্ভীর হয়ে গেলো। একটু আগেই যেন সব কথা বলে ফুরিয়ে এসেছে। ওয়াহিদ এমনি বেশ গম্ভীর প্রকৃতির। বুদ্ধির সঙ্গে বরাবর তার ভারটি বেশি। আর সেই ভারেই কম ধারটি পুষিয়ে যায়। বিশাল এই বাড়িটি তার দাদার আমলের। বাবার প্রসারতাও অনেক। তার প্রতাপও দোর্দন্ড। বাড়ির ওপর মহল সম্পূর্ণ তার দখলে। সাবরিনা মারা যাওয়ার পরপরই এ বাড়ির থেকেই প্রথম গুঞ্জন উঠেছিলো তহমিনার জন্য। কিন্তু জাফরের বিষয়টি মাথাচাড়া দিয়ে গুঞ্জনটি গুঞ্জরিতই হতে থাকে।
রাত জাগার অভ্যেস ওয়াহিদের নেই। সে বিনাবাক্যে শুয়ে পড়লো। ভয় বা লজ্জা নয়। দ্বিধায় ভুগছে। যা একটু আগেও ছিলো না। এবং ওভাবেই সে ঘুমের মধ্যে তলিয়ে গেলো। সকালে উঠে দেখলো তহমিনা তেমনি বসে আছে। জানালা দিয়ে আকাশ দেখছে। ওয়াহিদের দিকে আর মুখ তুলে তাকায়ওনি। কিছুক্ষণ অনর্থক ঘোরাঘুরির পর নিজের বিব্রত অবস্থা কাটাতে সে অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছিলো। এই ফাঁকে উঠে তহমিনা অন্য ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লো। হয়তো আর বসে থাকার শক্তি ছিলো না। কাজের লোকেরা কিছু বুঝে উঠতে পারেনি তখনো। বাবা নিচের তলায় না নামলে বুঝতেই পারেন না কে এলো। কে এলো না।
ওয়াহিদ ঘরে ফিরে দেখলো তহমিনা তেমনি ঘুমোচ্ছে। ওকে ওদের বাড়ি থেকে ফোন করেও ডেকে তুলতে পারেনি শুনে নিজে ওকে জাগিয়ে তুললো। একসঙ্গে খেতে বসেও মৌনতা কাটাতে পারলো না কেউ। আরো একটি রাত গভীর হতে থাকে। ওয়াহিদ গতরাতের মতো বিছানায়। আজ তার ঘুম অতোটা গাঢ়ো নয়। কিন্তু চোখের পাতা উন্মুক্ত করে রাখে এতটা অকপট সে হতে পারে না। তহমিনা গতরাতের মতো জানালায় জেগে আছে। চোখ দু’টোয় পলক পড়ছে না। ওয়াহিদ আড় চোখে ক’বার তাকিয়ে আর পারে না। ওভাবেই ভোররাতে তন্দ্রায় চোখ জড়িয়ে আসে তার। ‘…চোখ তারে চেনে নাকো মন তার জানে না প্রমাণ, চেতনার অন্য পিঠে শুধু আজীবন ব’য়ে ফিরি সুগোপন এক অভিজ্ঞান। অগণন মানুষের ভিড়ে কখন সে অভিজ্ঞান হলো বিনিময়, আনমনা জানে না হৃদয়। তারপর নগরের দু’টি বাতায়নে, একটি অতল রাত্রি বয় দু’টি মন থেকে মনে।’ না, সব মিথ্যে!
তহমিনার বিড় বিড় শব্দ শুনে তন্দ্রা ভেঙে ছুটে আসে ওয়াহিদ। হাত ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে জিজ্ঞেস করে একা একা কথা বলছো কেন? কী হয়েছে?
খুব মৃদুুস্বরে তহমিনা উত্তর দিলো-ভয় পেয়ো না পাগল হইনি। আমার প্রিয় কবিতাটি আবৃত্তি করছিলাম। প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতা এটি।
মুখ ফ্যাকাসে হয়ে উঠছে ওয়াহিদের। সে ভয় তাড়াতে পারছে না। তহমিনার একখানা হাত তখনো তার হাতে। আরেক হাত জানালার গ্রিলে। ওয়াহিদ একঝাপটায় দু’হাতে তাকে নিজের দিকে ফেরালে তড়িৎ-এর মতো ছিটকে সরে গেলো তহমিনা। এই প্রথম কোনো পুরুষের স্পর্শ তার শরীরে। তাও অধিকার বোধের। বুক ধুকপুক করতে থাকে তহমিনার। হাত জোড় করে করুণ আর্তস্বরে সে বলতে লাগলো, আমি আরেকটা ভুল করলাম ওয়াহিদ। একজনের জন্য অপেক্ষা করতে করতে শরীরটা এখন মন্দিরের মতো মনে হয়। নৈমিত্তিক জীবনযাপনের জন্য একে রক্তমাংসের মতো ব্যবহার আর করতে পারবো না। পারলে হয়তো বেঁচে যেতাম। আর তেমন বাঁচার চেষ্টা থেকে তোমার স্পর্শকেও বাঁচিয়ে গেলাম। সে জন্য আমাকে ক্ষমা করো। আমি আজই ডিভোর্স লেটার পাঠানোর চেষ্টা করবো।
– তুমি কি জাফরের কাছে ফিরে যেতে চাও? অস্থির প্রশ্ন ওয়াহিদের।
– দু’রাত সে কথাও ভেবেছি। এখন ওকেও আমার ভালো লাগছে না। দূরেই থাকুক সেও। কাছে এলে তার যে কোনো ক্ষুদ্রতা আমাকে আহত করবে। সংসার আর প্রেমবোধ একসঙ্গে হয় না। না হলে জাফরই-বা সংসার, সাফল্য, স্ত্রী ফেলে ফিরতে চাইবে কেন? অনেকখানি না-ই বা দাবি করলাম, তার কিছুটা তো আমার চেনা আছে।
ওয়াহিদ দু’হাতে কপাল রগড়ে পাশের রুমে ঢুকতে গিয়ে আবার থমকে দাঁড়ালো যখন অন্ধকার তখন মন্দীভূত। তিরতিরে বাতাসের ¯্রােত পর্দা গলিয়ে নরম আলোতে দু’জনকে দু’জনের কাছে বিনর শিখার মতো করে তুলছে। যার আলো ভীষণ কাঁপা কাঁপা। জড়ানো কণ্ঠে ওয়াহিদ বললো, তোমার এইসব খামখেয়ালিপনা আমি অধিকারবলেই শেষ করে দিতে পারতাম। বন্ধ করে দিতে পারতাম তোমার ফেরার পথও। কিন্তু আমি তা করবো না। তুমি এখন ধনুর্ধর তাই তোমার ধনুকের ছিলা আমি হবো না। যেন আসন্ন বৃষ্টির থমথমে মেঘ নিয়ে ওয়াহিদ পাশের ঘরে ঢুকে পড়লো।
তহমিনা বাড়িতে এসে কারো কোনো কথার উত্তর দিলো না। সবার চোখের সামনে নিজের ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিলো। বিছানায় উপুড় হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে এই প্রথম ডুকরে উঠলো সে-কেন ভালোবাসোনি আমাকে? হ