বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী কবি কাজী নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেছিলেন ব্রিটিশ-শাসিত পরাধীন ভারতবর্ষের বাংলায়। নানা বিষয়ে তিনি কবিতা ও গান রচনা করেছেন। মানবতার কবিতা যেমন লিখেছেন, স্বদেশপ্রেমের কবিতা যেমন লিখেছেন, তেমনি লিখেছেন সাম্যের কবিতা, মুসলিম পুনর্জাগরণের কবিতা, বিদ্রোহের কবিতা, প্রেমের কবিতা ইত্যাদি। তার রচিত গানেও বিষয় বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। তিনি প্রেমের গান লিখেছেন, শ্যামা সঙ্গীত লিখেছেন, আবার ইসলামি গানও লিখেছেন। মুসলমানদের দুটো ধর্মীয় উৎসব- ঈদুল ফেতর ও ঈদুল আজহা। মুসলিম সংস্কৃতির এই দুটো উৎসবকে কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতা ও গানে অতি সুন্দরভাবে চিত্রিত করেছেন। ‘নজরুলের ঈদের কবিতা’ প্রবন্ধে কবীর চৌধুরী বলেছেন-
‘নজরুলের আগে আর কোনো বাঙালি সাহিত্যিক মুসলমানদের বিভিন্ন ধর্মীয়-সামাজিক অনুষ্ঠানকে এতো আবেদনময় এবং ব্যাপকভাবে কাজে ধারণ করেননি। এক্ষেত্রে নজরুলের পরেও কেউ তাঁর আবেদনের কাছাকাছিও আসতে সক্ষম হননি। শুধু ধর্মীয়-সামাজিক অনুষ্ঠানাদি নয়, দেশ-কাল নির্বিশেষে বিশ্ব মুসলমানদের ধর্মবিশ্বাস, তাদের ধর্মীয় পাঠস্থান মক্কা-মদিনা, তাদের আল্লাহ-রাসূল, তাদের খোলাফায়ে রাশেদীন, তাদের নানা ঐতিহাসিক বীর ব্যক্তিত্ব প্রভৃতিকে নজরুল আকর্ষণীয় উপমা-উৎপ্রেক্ষা-রূপক-প্রতীকের সাহায্যে অপূর্ব ধ্বনিতরঙ্গের মাধ্যমে সাহিত্যের আঙিনায় সগৌরবে স্থান দিয়েছেন। অনুষ্ঠানাদির ক্ষেত্রে আমরা শুধু রোজার ঈদ ও কোরবানির ঈদকেই পাই না, পাই মোহররম, ফাতেহা দোয়াজদহম প্রভৃতিকেও। এইসব কবিতায় একদিকে ফুটে উঠেছে গভীর অধ্যাত্ম সুর, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সচেতনতা, অন্যদিকে হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্যে সেদিনের পরাধীন হতোদ্যম মুসলমানদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য কবির ঐকান্তিক ইচ্ছা। এই কারণেই তিনি চিহ্নিত হয়েছেন বাংলার মুসলিম রেনেসাঁর প্রাণপুরুষ বলে।’
মূলত কাজী নজরুল ইসলামের মতো এত সাবলীলভাবে মুসলিম সংস্কৃতিকে আর কেউ চিত্রিত করেননি। বিশেষ করে তিনি তার কবিতা ও গানে দুই ঈদকে ফুটিয়ে তুলেছেন প্রাণের উদ্ভাসে আবেগে। ঈদের আনন্দ, উৎসবের আনন্দ পরিপূর্ণতা পেয়েছে তাঁর কবিতা ও গানে। কাজী নজরুল ইসলামের ঈদের কবিতা ও গানে উৎসবের আমেজ ফুটে উঠেছে। যেগুলো নজরুলের সমকালে যেমন জনপ্রিয় ছিল, বর্তমানেও তেমনি জনপ্রিয়তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ইসলাম যে সাম্য-ভ্রাতৃত্ব, মানবতা ও মুক্তির ধর্ম যে কথাই ব্যক্ত করেছেন কবি নজরুল তাঁর ‘ঈদ মোবারক’ কবিতায়-
আজি ইসলামী ডঙ্কা গরজে ভরি জাহান
নাই বড় ছোট- সকল মানুষ এক সমান,
রাজা প্রজা নয় কারো কেহ।
কে আমীর তুমি নওয়াব বাদশা বালাখানায়?
সকল কালের কলঙ্ক তুমি; জাগালে হায়
ইসলামে সন্দেহ।
কাজী নজরুল ইসলাম চিরকাল ছিলেন শোষিত নির্যাতিত মানুষের পক্ষে। ‘ঈদের চাঁদ’ কবিতাতেও কবির এই মনোভাব সুস্পষ্ট। ধনীর ধনে যে গরিবের অধিকার আছে- যে কথা ব্যক্ত করেছেন কবি এ কবিতায়-
যার ঘরে ধনরত জমানো আছে,
ঈদ আসিয়াছে, জাকাত আদায় করিব তাদের কাছে।
এসেছি ডাকাত জাকাত লইতে, পেয়েছি তাঁর হুকুম,
কেন মোরা ক্ষুধা তৃষ্ণায় মরিব, সহিব এই জুলুম।
… … …
ডাকাত এসেছে জাকাত লইতে, খোলো
বাক্সের চাবি,
আমাদের নহে, আল্লাহর দেওয়া ইহা
মানুষের দাবি।
সকল প্রকার ভন্ডামি, প্রতারণা, মুনাফেকি ইসলাম সমর্থন করে না। কাজী নজরুল ইসলামের ‘বক্রীদ’ কবিতায় ইসলামের এই অন্তর্নিহিত ভাবটি ফুটে উঠেছে। কবি বলেছেন-
বকরীদি চাঁদ করে ফরয়্যাদ, দাও দাও কোরবানী,
আল্লাহর পাওয়া যায় না, করিয়া তাঁহার না-ফরমানি!
পিছন হইতে বুকে ছুরি মেরে, গলায় গলায় মেলো,
করো না আত্ম প্রতারণা আর, খেল্কা খুলিয়া ফেল।
ঈদ মানে আনন্দ আর সেই আনন্দ সকলের মাঝে বিলিয়ে দিতে হবে। শত্রুকে ভুলে যেতে হবে, শত্রুতে মিত্রতে মিলন হবে- এমন ঈদের কথাই কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন তাঁর ‘ঈদ মোবারক’ কবিতায়-
আজিকে এজিদে হাসানে হোসেনে গলাগলি,
দোজখে ভেশ্তে ফুলে ও আগুনে ঢলাঢলি,
শিরী ফরহাদে জড়াজড়ি।
এই আনন্দ-উল্লাসের মধ্যে কবি ভুলে যাননি ইসলামের সাম্যবাদী-মানবতাবাদী দর্শনের কথা। ‘ঈদ মোবারক’ কবিতায় কবিকণ্ঠে তাই উচ্চারিত হয়েছে ইসলামের শাশ্বত বাণী-
ইসলাম বলে, সকলের তরে মোরা সবাই,
সুখ-দুখ সম-ভাগ করে নেব সকলে ভাই,
নাই অধিকার সঞ্চয়ের।
কারো আঁখি-জলে কারো ঝাড়ে কিরে জ্বলিবে দীপ?
দুজনার হবে বুলুন্দ-নসিব, লাখে লাখে হবে বদনসিব?
এ নহে বিধান ইসলামের ॥
ঈদ বলতে যে আনন্দ-উল্লাস বোঝায়, কৃষক সমাজে যে আনন্দ-উল্লাসকে কবি না দেখতে পেয়ে কৃষকের জীবনে ঈদ আসেনি বলে সমাজকে ধিক্কার দিয়েছেন। মূলত কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন চিরকাল নিপীড়িত-শোষিত মানুষের পক্ষে। তিনি দেখেছেন কৃষক-সমাজ চিরকাল নিপীড়িত-শোষিত-বঞ্চিত-ক্ষুধার্ত। তাদের ‘তীর-খাওয়া বুক’, ঋণে-বাধা-শির, প্রতিদিন তাদের রোজা, কবির প্রশ্ন- তাদের জীবনে কীভাবে ঈদ আসে। ‘কৃষকের ঈদ’ কবিতায় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন-
বেলাল! বেলাল! হেলাল উঠেছে পশ্চিম আসমানে
লুকাইয়া আছে লজ্জায় কোন মরুর গোরস্থানে!
হের ঈদগাহে চলিছে কৃষক যেন প্রেত-কঙ্কাল
কসাইখানায় যাইতে দেখেছ শীর্ণ গরুর পাল?
রোজা এফতার করেছে কৃষক অশ্রু-সলিলে হায়,
বেলাল! তোমার কণ্ঠে বুঝি গো আজান থামিয়া যায়।
থালা, ঘটি, বাটি বাঁধা দিয়ে হের চলিয়াছে ঈদগাহে,
তীর-খাওয়া বুক, ঋণে-বাঁধা-শির, লুটাতে খোদার রাহে।
এইসব সর্বহারা, অনাহারী কৃষকের জীবনে ঈদ আসে না। বরং স্বজন হারানোর বেদনায় এদের ঈদের নামাজ জানাযার নামাজে রূপান্তরিত হয়। কবির ভাষায়-
এক বিন্দু দুধ নাহি পেয়ে যে খোকা মরিল তার
উঠেছে ঈদের চাঁদ হয়ে কি যে শিশু-পাঁজরের হাড়?
আসমান-জোড়া কালো কাফনের আবরণ যেন টুটে
এক ফালি চাঁদ ফুটে আছে, মৃত শিশুর অধর পুটে।
কৃষকের ঈদ। ঈদগাহে চলে জানাজা পড়িতে তার,
যত তক্বির শোনে, বুকে তার তত উঠে হাহাকার।
মরিয়াছে খোকা, কন্যা মরিছে, মৃত্যু-বন্যা আসে
এজিদের সেনা ঘুরিছে মক্কা-মসজিদে আশেপাশে।
ধর্মের অন্তর্নিহিত ভাব বুঝতে না পেরে যারা সমাজে বৈষম্যের সৃষ্টি করেছে, অর্থের পাহাড় গড়ে তুলেছে কবি সেই শোষক-শাসক শ্রেণিকে ধিক্কার দিয়েছেন। ইসলামের বাণীকে তোতাপাখিরা মতো শুধু মুখস্থ না করে এর অন্তর্নিহিত শক্তিতে বলীয়ান হওয়ার জন্য কবি ধর্মীয় নেতাদের আহবান জানিয়েছেন। কবি বলেছেন-
কোথা সে শক্তি-সিদ্ধ ইমাম, প্রতি পদাঘাতে যার
আবে-জমজম শক্তি উৎস বাহিরায় অনিবার?
আপনি শক্তি লভেনি যে জন, হায় সে শক্তিহীন
হয়েছে ইমাম, তাহারি খোতবা শুনিতেছে নিশিদিন!
দীন কাঙালের ঘরে ঘরে আজ দেবে যে নব তাগিদ
কোথা যে মহান শক্তি-সাধক আনিবে যে পুন ঈদ?
ছিনিয়া আনিবে আসমান থেকে ঈদের চাঁদের হাসি
ফুরাবে না কভু যে হাসি জীবনে, কখনো হবে না বাসি!
সমাধির মাঝে গনিতেছি দিন, আসিবেন তিনি কবে?
রোজা এফ্তার করিব সকলে, সেই দিন ঈদ হবে।
‘শহীদী-ঈদ’ কবিতায় কবি কাজী নজরুল ইসলাম চমৎকারভাবে ঈদের তাৎপর্য তুলে ধরেছেন। এই কবিতায় কবি বলেছেন-
শুধু আপনারে বাঁচায় যে
মুসলিম নহে, ভন্ড যে।
ইসলাম বলে- বাঁচো সবাই।
দাও কোরবানি জান ও মাল,
বেহেশত্ তোমার করো হালাল।
স্বার্থপরের বেহেশ্ত্ নাই।
কাজী নজরুল ইসলামের ঈদের কবিতায় যেমন ঈদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব, ইসলামের মমার্থ, ঈদের তাৎপর্য ইত্যাদি ফুটে উঠেছে, তেমনি তাঁর গানেও এগুলো লক্ষ করা যায়। নজরুলের ঈদের গান ছাড়া যেমন ঈদের আনন্দ পূর্ণ হয় না। বিশেষ করে ‘এ মন রমজানের ঐ রোজার শেষে/এল খুশির ঈদ/তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে/ শোন আসমানী তাকিদ ॥’- এই গান ঈদের পরিবেশ যেমন ফুটিয়ে তোলে, তেমনি ঈদের আনন্দ-উচ্ছ্বাসকে পরিপূর্ণতা দান করে। ইসলামে মানবপ্রেমের গুরুত্ব যে অপরিসীম, যে কথা ব্যক্ত করেছেন কবি-
আজ ভুলে গিয়ে দোস্ত-দুশমন
হাত মিলাও হাতে
তোর প্রেম দিয়ে র্ক বিশ্বনিখিল
ইসলামে মুরীদ।
ইসলামে উঁচু-নিচু-ধনী-গরিবে ভেদাভেদ নেই। ইসলামে আছে সাম্য-ভ্রাতৃত্ব এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা। সর্বোপরি ইসলামে প্রেমের অমিয় বাণী উচ্চারিত হয়েছে। কবি বলেছেন-
যারা জীবন ভরে রাখছে রোজা
নিত্-উপবাসী
যেই গরীব এতিম মিস্কিনে দে
যা কিছু মফিদ।
তোরে মারল ছুঁড়ে জীবন জুড়ে
ইট পাথর যারা
সেই পাথর দিয়ে তোলরে গড়ে
প্রেমের মসজিদ।
কাজী নজরুল ইসলামের কিছু গানে রোজার মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে। যেমন- এলো রমজানের এই চাঁদ এবার দুনিয়াদারি ভোল, নতুন করে রেজওয়ান জান্নাত সাজায়- আজ রোজায় ইত্যাদি। কাজী নজরুল ইসলামের ‘ঈদ’ নামক নাটিকায় তিনটি ঈদের গান রয়েছে। প্রথম গানে কবি বলেছেন-
বিদায়-বেলায় সালাম লহ মাহে রমজানে রোজা
(তোমার) ফজিলতে হাল্কা হলো গুনাহের বোঝা
ক্ষুধার বদলে বেহেশ্তি ঈদের সুধা তুমি দিলে,
খোদার সাধনার দুঃখে কি সুখ তুমি শিখাইলে,
(তুমি) ইশরাতে খোদায় পাওয়ার পথ দেখালে সোজা ॥
কাজী নজরুল ইসলামের ঈদের অনুষ্ঠান সর্বস্বতার চেয়ে ঈদের মর্মার্থ ও গভীরতার দিকে বেশি দৃষ্টিপাত করেছেন। ‘ঈদ’ নাটিকার দ্বিতীয় গানটি গভীরতর ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছে এজন্য-
নাই হলো মা বসন ভূষণ এই ঈদে আমার।
আছে আল্লা আমার মাথার মুকুট, রসুল গলার হার॥
নামাজ রোজার ওড়না শাড়ি
ওতেই আমায় মানায় ভারি,
কলমা আমার কপালে টিপ
নাই তুলনা তার॥
এই নাটিকার তৃতীয় গানে ঈদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস পরিপূর্ণভাবে ফুটে উঠেছে-
এলো ইদুল-ফেতর এলো ঈদ ঈদ ঈদ।
সারা বছর যে ঈদের আশায় ছিল না ক’ নিঁদ॥
… … …
(দেখ) হরতের হাসির ছটা ঈদের চাঁদে জাগে,
সেই চাঁদেরই রঙ যেন আজ সবার বুকে লাগে।
(এই) দুনিয়াতেই মিটলো ঈদে বেহেশ্তি উমিদ॥
‘ঈদুল্ ফেতর’ রেকর্ড নাটিকায় ঈদের গানে হৃদয়-উপচানো আনন্দের বন্যা কবি নজরুল তুলে ধরেছেন-
ঈদের খুশির তুফানে আজ ডাকল কোটাল বান।
এই তুফানে ডুবুডুবু জমিন ও আসমান।
ঈদের চাঁদের পানসি ছেড়ে বেহেস্ত হতে
কে পাঠাল এত খুশি দুখের জগতে
(শোন) ঈদগাহ্ হতে ভেসে আসে তাহারি আজান॥
এছাড়া কাজী নজরুল ইসলাম আরো কয়েকটি ঈদের গান লিখেছেন। যেমন, ‘ফিরদৌসের শিরনি এলো ঈদের চাঁদের তশতরিতে। / লুট করে নে বনি আদম ফেরেশতা আর হুরপরীতে॥’, / ওরে ও নতুন ঈদের চাঁদ। তোমায় পেয়ে হৃদয় সাগর আনন্দে উন্মাদ॥’ / এল আবার ঈদ ফিরে এল আবার ঈদ-/ চলো ঈদগাহে।’ ইত্যাদি।
মূলত কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর রচিত ঈদের কবিতা ও গানে মুসলিম সমাজের বড় উৎসব ঈদকে তুলে ধরেছেন বর্ণাঢ্য আঙ্গিকে। তাঁর কবিতা ও গানে ঈদ ফুটে উঠেছে আনন্দ-উল্লাসের উৎসব হিসেবে। উঁচু নিচু ভেদাভেদ ভুলে সকল মানুষকে এক কাতারে দাঁড় করানোর প্রবল অভিপ্রায় এবং শোষণ-বঞ্চনা নিঃশেষ করে সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা হিসেবে কবি ঈদকেই বেছে নিয়েছেন। তাঁর কবিতা ও গানে ঈদ সকল মানুষের মঙ্গলের উৎসবে পরিণত হয়েছে।