তরুর নিমীলিত দু’চোখ থেকে আমি কিছুতেই চোখ সরাতে পারি না। মানুষের চোখের সঙ্গে উপমিত হবার মতো কী যে বিশেষ যোগ্যতা আছে পাখির নীড়ের, সে কথা বুঝে উঠতে আমার ঢের সময় লেগে যায়। এতদিন পর সত্য স্বীকারে আজ আর আমায় কোনো দ্বিধা নেই- প্রকৃতপক্ষে তরুকে নিয়ে ঘর বাঁধার পরই জীবনানন্দীয় ওই উপমার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য উপলব্ধি করেছি দিনে দিনে একটু একটু করে। আহা, এতদিনে জেনেছি, মানব-মানবীর যৌথজীবনে সামান্য খড়কুটোও এমন অসামান্য ভূমিকা থাকতে পারে। এখন আমি একান্তে নিভৃতে নিজের সঙ্গে নিজে নিজে তামাশা করি- কাকে তুমি খড়কুটো বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছ অর্বাচীন! ঠাকুরের বাণী কি তোমার কানের ভেতর দিয়ে মরমে প্রবেশ করেনি- ধরণীর ধন কিছুই যাবে না ফেলা!
কখনোবা নিজের সঙ্গে তর্ক করেছি, তাই বলে খড়কুটোর ও এমন অমূল্য সম্মান!
পাখির নীড় মানে তখনো আমার কাছে তুচ্ছতৃণলতা কিংবা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কুড়িয়ে আনা খড়কুটোর অধিক কিছু হয়ে ওঠেনি। চারপাশের নানা রকম মানুষের চোখের মধ্যে খুঁজে ফিরেছি জীবনানন্দের পাখির নীড়। কোথায় সাদৃশ্য! কোথায় সাধারণ ধর্মের ঐক্য! মনে মনে ভাবি- এ এক সৃষ্টিছাড়া উপমা বটে।
সেই তুলনায় কতই না সহজ এবং সাবলীল উপমা- পটোলচেরা চোখ। পটোল চিরে অর্ধেক করলে তো চোখের আকৃতিই লাভ করে। আকৃতিগত এই সাদৃশ্য কার না চোখে পড়বে! চোখে পড়ার জন্য তো এ রকম আকৃতিগত সাদৃশ্যই জরুরি। কিন্তু এই ‘চোখে পড়া’ শব্দবন্ধের কাছে এসে চেতনা থম্কে দাঁড়ায়, ভেতরে ভেতরে প্রশ্নজাগে- মানুষ কিভাবে চোখেই দ্যাখে সবকিছু? চোখের আড়ালে আর কোনো রহস্য নেই তো! এই চোখ তাহলে মনের আয়না হয় কখন, কেমন করে হয়।
ভাবনার এই স্তরে এসে আমি কবে যেন আবিষ্কার করে বসি- চারপাশের নানা-রকম মানুষের মধ্যে আবার নারীর চোখে আছে আলাদা গভীরতা। আছে অন্যরকম মেঘছায়া! আছে রোদের সঙ্গে ছায়ার লুকোচুরি। একাকী নিভৃতে কাটাছেঁড়া করি, আবার একাকী চমকে উঠি, সাদৃশ্য কেবল আকৃতি নয় প্রকৃতিতেও প্রতিফলিত হতে পারে! সেই তখন থেকে উন্মোচিত হয় অবগুণ্ঠন; ফলে তরুর দু’চোখ মুগ্ধ চোখ ফেলে কত সহজেই খুঁজে পাই নাটোরের বনলতা সেনকে। আমি তখন দিব্যি দেখতে পাই- মুখ তার শ্রাবন্তীর কারুকার্য, আমার বুকের ভেতরে উদঘাটিত হয়- চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা। দারুচিনি দ্বীপের ভেতরে আমি কেমন অনায়াসে আবিষ্কার করি সবুজ ঘাসের দেশ।
আর সেই সবুজ ঘাসের দেশের রাণী হচ্ছে আমার তরু।
এমনিতে ভারি সাদামাটা মানুষ। সাদা কথার সরল মানেটুকু সহজে বুঝতে পারে কিনা, ওকে দেখে সেটুকু নিঃসংশয়ে বলা মুশকিল। কিন্তু বাইরের, এই দেখাই তরু সম্পর্কে শেষ কথা নয়। ওর ভেতরে ভারি এক দার্শনিক দার্শনিক ভাব আছে। কিন্তু সেটা আবার কাউকে ধরতে দেয় না। অথচ আমি ওই তরুর কাছ থেকেই শিখেছি- বস্তুর শরীর থেকে কীভাবে রূপরসগন্ধ- ঐশ্বর্য- অলংকার সব কিছু সরিয়ে নিয়ে বস্তুনিরপেক্ষ করে তোলা যায়। ব্যক্তি কীভাবে নৈর্ব্যক্তিক হয়ে ওঠে সেই সব তত্ত্ব। তরু যখন বুঝিয়ে বলে তখন মোটেই তত্ত্বভারাক্রান্ত মনে হয় না। কেমন অবলীলায় পাখির মতো ডানা মেলে গাইতে পারে- কেউ নয়ন মুছে দেখে আলো, কেউ দেখে আঁধার…।
মোটেই সন্তর্পণে নয়, তরুর চোখে আমি নির্ভয়ে চোখ রাখতেই দেখতে পাই দিগন্তছোঁয়া নীল আকাশ নুয়ে আছে তার চোখের তটিনিজুড়ে। তখন প্রকৃতি নিমগ্ন কবি জীবনানন্দ দাশ হাত বাড়িয়ে দেন, অবাক বিস্ময়ে আমি আবিষ্কার করি- কবির হাতে সেই রৌদ্রের গন্ধ, আমি টের পাই- সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে; ‘সব পাখি ঘরে আসে’- কেবল এইটুকু বাক্যাংশ আমার চৈতন্যের ক্যানভাসে এঁকে দেয় মহামূল্য পাখির নীড়। কই, খড়কুটো কিংবা তৃণগুল্ম কিছুই আমার চোখে পড়ে না; ঘরে ফেরা পাখির কাছে নীড় মানে আরো অনেক কিছু। আমি উল্টেপাল্টে নানাভাবে প্রশ্ন তুলেছি- কেন ওরা নীড়ে ফেরে? আকাশজোড়া কোথাও কোনো সীমারেখা নেই, আকাশের ওপারে কেবলই আকাশ, ডানা মেলবার এমন অফুরন্ত সুযোগ ছেড়ে পাখিরা কেন ফিরে আসেন নীড়ে, কোন ভরসায়। তরুকে শুধিয়েও জবাব পাইনি। অথচ তার চোখের পাতায় মুদ্রিত জলছাপ থেকে পেয়ে যাই যথা-উত্তর।
তরু ঘুমিয়ে।
বলক ওঠা দুধের উপরে যেমন পাতলা সর পড়ে, সেই রকমই ¯িœগ্ধ এবং কমনীয় আলোর প্রলেপ পড়েছে ওর চোখেমুখে। ঘরের সববাতি নেভানো। তবু ঘরের ভেতরে অসহনীয় অন্ধকার নয় মোটেই। বিছানার ডান দিকে প্রশস্ত জানালা। এই জানালা কিছুতেই বন্ধ করতে রাজি নয় তরু। এ ঘরে জানালা আরো দুটো আছে। সে দুটো বন্ধ অথবা খোলা রাখা নিয়ে ওর বিশেষ কোনও বক্তব্য নেই। খোলা রাখা চাই বিছানার পাশের এই ঢাউস জানালাটি। এটা বন্ধ করলে নাকি ঘুমই আসবে না, দম আটকে যাবে ওর! কী সাংঘাতিক কথা। মাথার উপরে সিলিংফ্যান ঘুরছে বোঁ বোঁ করে। তাতে আশা মেটে না, শ্বাস ভরে না; জানালা খোলা রাখতেই হবে।
সত্যি বলতে কি বিশালায়তনের এই জানালা এবং আড়াই হাজার স্কয়ার ফিটের খোলাছাদের জন্যেই চারতলার উপরে চিলেকোঠা মার্কা এই সামান্য বাসাটি তরুর পছন্দ। এই নাকি তার কাছে অসামান্য। আমি তো ভেবে অবাক হই- মহুয়ে এই মেয়েটির বুকের জমিনে এত সবুজের সমারোহ কখন কীভাবে ঘটল। আমাদের এই নতুন বাসার প্রশস্ত খোলা ছাদকে নাকি তার সবুজ ধানক্ষেত্র ভাবতে ভালো লাগে। রীতিমত ইট-সিমেন্ট- লোহার তৈরি কংক্রিটের ছাদ, সেখানে ধানক্ষেত আসবে কো থেকে? বললেই হলো! তরু কেমন মনের জোরে দাবি করে,
হয়, হয়। চোখ বন্ধ করে ভাবলেই হয়। ধানক্ষেত হয়। ফুল বাগান হয়।
ওর কথা শুনে আমার হাসি পায়। কী অদ্ভুত যুক্তির ধারা! চোখ বন্ধ করে ভাবলে তো অনেক অসম্ভবকেই সম্ভব ভাবা যায়। কিন্তু চোখ মেললে? আমি জিগ্যেস করি, চোখ মেলে ভাবলে কী হয়?
দূর! চোখে মেলে কিছু ভাবা যায় নাকি! শুধু দেখা যায়। যা তুমি দেখতে চাও না চাও দেখতে হয়। ঠা ঠা রোদ্দুর, চোখ খোলা থাকলে না দেখে উপায় আছে! ওর চেয়ে চাঁদের আলোয় দেখা- ব্যাপারটা বেশ। খানিক দেখা যায়, বাকিটা পুরিয়ে নিতে হয় কল্পনাতে। বেশ ভালো- নিজের মত ভাবা যায়।
তরু! চিরদিনই তুমি ভয়ানক কল্পনাপ্রবণ রয়ে গেলো!
মানুষ মাত্রই কল্পনাপ্রবণ। হাতি ঘোড়া, গরু-ছাগল কোথায় পাবে এই হিরণ¥য় হাতিয়ার! কোথায় পাবে এই অমূল্য সম্পদ!
আমি অপলকে তাকিয়ে থাকি ওর মুখের দিকে। একটু খানি দম দিয়ে তরু এবার সোজাসুজি আমাকে আক্রমণ করে,
কেন, তুমি কল্পনাপ্রবণ নও?
একদা ছিলাম। এখন নই। এখন আমি বাস্তবতার পাথরে আঘাত খেয়ে খেয়ে, জীবনের নতুন পাঠ নিই। সেই করেই তো আমি বাস্তবতার পাথরে আঘাত খেয়ে খেয়ে জীবনের নতুন পাঠ নিই। সেই কবেই তো আমি কবিতাকে বিদায় দিয়েছি, তোমার মনে নেই!
উহ! কী যে সব খট্মটে কথা বল না!
হ্যাঁ, জীবনটা এমনই খট্মটে, এমনটাই নির্মেদ গদ্যময়।
এভাবে যে বলতে পারে, সে কল্পনাপ্রবণ না হয়ে পারে!
বললাম তো তরু-একদা ছিলাম!
তার মানে একদা তুমি মানুষ ছিলে। আর এখন…
এখন অমানুষ হয়ে গেছি, এই তো বলতে চাও?
তরুর মুখে আষাঢ়ের কালো মেঘ থমকে দাঁড়ায়। কী কথায় কী কথা এসে কথা বলার আনন্দটুকুই ম্লান করে দেয়। ও চুপ করে থাকে। কিন্তু আমার কিছুতেই চুপ করতে ইচ্ছে হয় না। তরুর ডান হাতে ঝাঁকুনি দিয়ে বলি, থামলে কেন! বল, অমানুষ হয়ে গেছি।
সহসা তরু আমার মুখে হাত দিয়ে থামায়।
প্লিজ তুমি শান্ত হও।
আমি শান্ত থাকি, আর তুমি একতরফা বলে যাও- বেশ আবদার বটে! আমি আর কথা বলতে পারি না। ভেতরে কে যেন দুর্বিনীত ফণা নামিয়ে নেয়। তারপর কণ্ঠলগ্ন হয়েই বলে, আজ তোমার কী হয়েছে সোনামণি?
এবার আমি শান্ত।
বল কী হয়েছে?
তবু নীরব।
সোনামণি!
এতক্ষণে আমার বুকের ভেতরে কেঁপে ওঠে। দৃশ্যমান নাই হোক, তবু আমার বুকের ভেতরে যে নিজস্ব বাগান আছে, সেই বাগানের সবকটা গাছগাছালি ডাল-পালাসমেত নুয়ে পড়ে ‘সোনামনি’ ডাকে। পাহাড়চূড়ার বরফগলে যায়। ঠিকরে পড়ে সকালবেলার সোনঝরা রোদ্দুর। আমি তখন কী করি? কী যে করি আমি নিজেই জানি না। এদিকে কখন কীভাবে যেন আমার চোখে অশ্রু আবিষ্কার করেছে তরু, ওর তপ্ত ঠোঁটে শুষে নেয় আমার অশ্রুরেখা, তবু কানের কাছে মুখ এনে অস্ফুটে শুধায়-কী হয়েছে সোনামণি?
আমি একটা কিছু বলতেই চাই তরুকে। ঠিক কোন কথাটা যে বলতে চাই সেটা গুছিয়ে উঠতে পারি না॥ কণ্ঠ ভার হয়ে আসে। বাগযন্ত্রের দুয়ার আগলে দাঁড়ায় অচেনা কাঁটা। ঢোক গিলতে গিয়ে টের পাই, সে কাঁটা আবার বাষ্পীয় হয়ে জমাট বেঁধে আছে। কিছুতেই গিলতেও পারছি না, গলায় কথাও ফুটছে না। কিন্তু তরু সেটা জানবে কী করে! অবোধ কলিজার মত আদুরে গলায় ডাকে,
সোনামণি!
সোনামণি আমার নাম নয়। আমার পিতৃদত্ত নাম মনিরুল ইসলাম। বন্ধুদের অনেকেই সংক্ষেপিত উচ্চরণে ‘মনি’ বলে ডাকে। দু’চার জন মনিরুলও বলে। কী ভেবে জানি না আমাদের ডিপার্টমেন্টের নাজমা আপা ডাকতেন মনির বলে। আমার আপত্তি নেই কিছুতেই। কিন্তু তরুর সঙ্গে আমার পরিচয় খানিকটা ঘনিষ্ঠ হয়ে এলে একদিন এক চিঠির মধ্যে আবিষ্কার করি-আমার নামের আরো এক দফা রূপান্তর ঘটেছে। তরু আমাকে সোনামণি বলে সম্বোধন করছে। দু-পৃষ্ঠার চিঠিতে কী লেখা আছে, তখন তার চেয়ে ঢের বড় হয়ে ওঠে ওই নতুন সম্মোধনটুকু। তখন তরু আমার কাছে নেই, হাতের মুঠোয় ধরা আবেগমাখা অসাধারণ চিঠি; সেই চিঠির পাতায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে তরুর মুখচ্ছবি। প্রথমে হালকা জলছাপ-এই আছে, এই নেই; তারপর ধীরে ধীরে পরিস্ফুট হয় স্বচ্ছ ছবি, লজ্জারাঙা তরুর হাসি-মাখা মুখ। আমি চিঠির পাতায় তাকিয়ে থাকতে থাকতে এক সময় দিব্যি দেখতে পাই-তরুর পাতলা দু’টি ঠোঁট কেঁপে উঠছে, নড়ে উঠছে, উচ্চারিত হচ্ছে, সোনামণি! আমি তো প্রথমে চমকে উঠি। এদিকে সেদিকে তাকিয়ে দেখি- কেউ শুনে ফেলল না তো! নাহ্! চারপাশে কেউ নেই তো কে শুনবে! আমি শ্রবণেন্দ্রিয়ে প্রাখর্য ঢেলে আবার কান খাড়া করি, আবার বেজে ওঠে সুরের নিক্কন, সোনমণি!
সেই থেকে সকাল দুপুর সাঁঝ, দিবস রজনী ওই এক ঘোরের মধ্যে কাটে; আমি যেন কান পাতলেই তরুকণ্ঠের মিষ্টি সুবাস ছড়ানো সম্মোধন শুনতে পাই-
সোনামণি!
বল না-কী হয়েছে?
কিছুই হয়নি।
কিছু না?
না।
আচ্ছা থাক। এখন তোমার বলতে ইচ্ছে করছে না, আমি বুঝেছি! থাক, তুমি অন্য সময় বলো।
কী করে টের পাও তুমি? কিছু আড়াল থাকতে নেই?
আড়াল! মানে?
আজ তোমাকে মিথ্যে বলেছি তরু।
তরু নীরব।
মিথ্যে বলাও এত কঠিন, জানতাম না।
তরুর মুখে কথা নেই। সাড়া শব্দহীন নিরেট পাথর। ওর প্রতিক্রিয়াহীনতা আমাকে ভেতরে ভেতরে ক্ষুব্ধ করে। শেষে রেগে মেগে দুম করে বলেই ফেলি- আজকের ইন্টারভিউ আমি দিইনি তরু।
আমার হাতের বাঁধন থেকে তরু খুব ধীরে ধীরে নিজেকে মুক্ত করে নেয়। মুখে কিছুই বলে না। আমার মুখের দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকে। মানুষের দৃষ্টি কি এতই শক্তিশালী! ঘরভর্তি আবছা অন্ধকারেও আমার খুব মনে হয়-তরু সব দেখতে পাচ্ছে। ভীষণ অন্তর্ভেদী ওই দৃষ্টি। মনে মনে ভাবি-বেশ তো! চাকরির ইন্টারভিউ দেবার নাম করে আমি বাসা থেকে বেরিয়ে যাই, দিনশেষে ফিরে এসে বলি-চমৎকার হয়েছে ইন্টারভিউ। কেন বলি? বিবাহিতা স্ত্রীর কাছে এতদিন পর কেন আমাকে মিথ্যে বলতে হলো, তরুর ওই সুচাগ্র দৃষ্টি কি পারে সেই দুর্বোধ্য কারণ উদ্ধার করতে?
আমি মিথ্যে বলেছি জেনেও তরু আমাকে কিছুই বলে না। কোনও প্রশ্ন করে না। আমার চোখের দিকে বেশ কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার পর নিজেই এক সময় দৃষ্টি নামিয়ে নেয়। আমাকে বলার মত কিংবা প্রশ্ন করার মত কোনও কথা যেন খুঁজে পায় না। অকারণেই নিজের দু’হাতে মুখ ঢাকে চোখ ঢাকে, আবছা অন্ধকারেও আমি টের পাই ওর শরীর ফুলে ফুলে উঠছে। খানিক পরে মৃদু ফোঁপানিও শুনতে পাই। ভয়ানক বিব্রত বোধ হয়। স্ত্রীর কাছে সত্য স্বীকারের পর আমি ভারমুক্ত হতে পারবো ভেবেছিলাম, কিন্তু তেমন কেন হচ্ছে না! এত কাছে তরু, তবু এমন নিঃসঙ্গ কেন বোধ হচ্ছে! আমি কোথাও কোনও কূলকিনারা না দেখে শেষ পর্যন্ত তরুর দিকেই হাত বাড়াই। ওর কাঁধে হাত রেখে আমি জানাই, ওই চাকরি আমার হতো না তরু।
কাঁধ থেকে আমায় হাত নামিয়ে দিয়ে তরু মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে পড়ে। আমার কণ্ঠে তখন অসহায় আর্তনাদ স্ফুট হয়ে ওঠে,
তরু।
রাত অনেক হয়েছে। শুয়ে পড়।
তরু! প্লিজ, আমার কথা শোনো। আমি খুব ভালো করে খোঁজ নিয়ে জেনেছি-ওই অফিসে যাদের নেয়া হবে, আগে থেকেই তাদের ঠিক করা আছে। ইন্টারভিউয়ের নামে শুধু সাজানো নাটক। আমি জেনেশুনে সে নাটকে নামতে যাবো কেন? এ রকম একটা ব্যাখ্যা যে আমি দিতে পারি সে কথা যেন জানা ছিল তরুর। তাই এ নিয়ে আমার কোনো কথা জানার বা শোনার বিন্দু মাত্র আগ্রহ বুঝি ওর নেই। কী যে শীতল, নিস্পৃহ, নির্বিকার! আমার অসহ্য লাগে। তবু আমি একা একাই ব্যাখ্যা দিই, আজকের এই একটা ইন্টারভিউয়ের কথা না হয় ছেড়েই দাও, এ নাগাদ ইন্টারভিউ তো কম দিলাম না তরু! ফলাফল তো সেই যথা পূর্বং তথা পরং। চাকরি আমার হবে না, বুঝে গেছি।
দুই.
কথাটা যে ঠিক হলো না, বলে ফেলার পরই তা টের পাই। চাকরির বাজার খুবই চড়া বটে, তবু তো মাস ছয়েক আগে চাকরি একটি পেয়েছিলাম। হোক এনজিওর চাকরি, তবু সেটা চাকরি তো বটে! অভিজ্ঞতা ছাড়া যেখানে দরখাস্তই করা যায় না, কী ভেবে যেন এই প্রতিষ্ঠান অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখই করেনি। সোজা ইন্টারভিউ। অপ্রাসঙ্গিক আবোল তাবোল কোনও প্রশ্নের আস্ফালন নেই, ওদের নির্দিষ্ট কর্মসূচিভিত্তিক কিছু আলোচনা। সেখানে আমার অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত সপ্রতিভ। চাকরিটা হয়ে গেল একেবারে হুট করে। পদের নাম কর্মসূচি সংগঠক। শুরুতে বেতন এমন আহামরি কিছু নয়। ছ’মাস পর চাকরি কনফার্ম হলে নতুন স্কেলে বেতনও বাড়বে এক সপ্তার ট্রেনিং শেষে কর্মস্থলে যোগ দিতে হবে। গোল বাধ্ল এইখানে এসে। আমার পোস্টিং যশোরের অভয়নগরে। ঢাকা ছেড়ে, সর্বোপরি তরুকে ছেড়ে আমি যাব কী করে।
তখন চাকরি প্রাপ্তির এই সুসংবাদে দু’জনের কেউই আমরা আনন্দিত হতে পারিনি। হাতে সময় অত্যন্ত কম, যাহোক একটা কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতে হবে। সময় বলতে ট্রেনিংয়ের সাতদিন। উহ্! কী যে টেনশনে কেটেছে সেই সাতটা দিন। সকালে উঠে যে যার মত বাসা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি বটে, অফিস শেষে বাসায় এসেই শুরু হয় ওই এক প্রসঙ্গের গাওনা। আমি এই চাকরিতে গেলে কী কী সুবিধা, আর অসুবিধাই বা কত রকম তাই নিয়ে আলোচনা। সে আলোচনা অনেকটাই একপাক্ষিক। তরু সেই প্রথম দিনেই তার অভিমত জানিয়ে দিয়েছেÑ এই চাকরি করতে হবে না। যেভাবে চলছে চলুক।
চলছে মানে তো শুধু ওই তরুর একার চাকরির মাইনে আর আমার গোটা দুই টিউশনির উপার্জনÑ এতেই সংসার চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। এ অবস্থায় আমার একটা চাকরির খুবই প্রয়োজন। কিন্তু তাই বলে চাকরির বদলে তরুকে ছাড়তে হবে! এ হিসেব মেলাতেই পারি না। গভীর রাতে তরু স্পষ্ট জানিয়ে দেয়Ñ না, আমি কোথাও যেতে দেব না।
তরুর চাকরিতে ট্রান্সফার নেই। শুনেছি আমারটায় সে সুযোগ আছে। কিন্তু ছ’মাস পেরুনোর আগে সে কথা মুখেও আনা যাবে না। তাহলে আমি কী করব? ইউনিভার্সিটি থেকে বেরুনোর পর সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে চাকরির ইন্টারভিউ তো এ নাগাদ কম দিলাম না। সাফল্য বলতে এতদিনে এই এনজিওর চাকরি লাভ। তরুকে আপাতত ছাড়তে হবে বলে সেই চাকরি আমি করব না? একা একা বাসায় থাকা অসম্ভব মনে হলে তরু না হয় এই ক’মাসের জন্যে বাবা-মায়ের কাছে গিয়ে থাকবে। মোহাম্মদপুরে বাবার বাড়ি। মোহাম্মদপুর টু মতিঝিল এখন নানান রকম বাস চলাচল করে। ওর অফিস করারও কোনো অসুবিধা নেই। না, সে ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে নিজের ইচ্ছেমত, এখন আর মাথা নিচু করে সেখানে ঢুকতে পারবে না। এই তার সাফ কথা। অথচ ওই বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ যে মোটেই নেই, তা কিন্তু নয়। বিয়ের পর এক রকম গিটবাঁধা গুমোট পরিবেশ বিরাজ করেছে বেশ ক’মাস। তারপর ওর ছোটবোন তৃণা এসেছে, এসেছে মানে ইউনিভার্সিটি থেকে এখনো চলে আসে মাঝে মধ্যে, দীর্ঘ সময় ধরে তরুর সঙ্গে গল্পগুজব করে; শুনেছি একদিন নাকি ওদের বড় ভাবীও এসেছিলেন তরুকে দেখতে। কেবল তরুকেই দেখতে এসেছিলেন। আমি তখন বাসায় ছিলাম না। আমার জন্য অপেক্ষাও করেননি। তৃণা এবং বড়ভাবী দু’জনেই জানিয়েছে- তরুকে দেখার খুব সাধ মায়ের; কিন্তু রাশভারি প্রকৃতির মানুষ হচ্ছেন ওদের বাবা, তাঁর অনুমতি নেই বলেই মায়ের আসা হয় না। তবে একদিন ঠিকই চলে আসবেন, এসে মেয়ের হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে বাড়ি নিয়ে যাবেন।
আর জামাই?
তরু এই জায়গাতে সাংঘাতিক অনড়। আমার এতটুকু অসম্মান হয় এমন কাজ করবেই না, এমন জায়গায় যাবেই না।
কাজেই আমার পক্ষে যশোরের অভয়নগরে চাকরি করতে যাওয়া সম্ভব হবে না, এটা একরকম নিশ্চিত হয়েই যায়। তাহলে আর এই এক সপ্তার ট্রেনিং নিয়ে কী কাজ! সকালে উঠে সেই মহাখালী যাওয়া কি সোজা কথা? চাকরি না করলে এই টানাহেঁচড়া করে লাভ কী! এ বেলায় তরু আবার বেশ ঠেলে পাঠায়- যাও না যাও, প্রশিক্ষণ ভালো কাজ। প্রশিক্ষণ মানুষের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, দক্ষতা বাড়ায়। বলা যায় না, কোন দক্ষতা যে কখন কোথায় কাজে লেগে যায়।
এভাবেই আমার সাতদিনের প্রশিক্ষণ শেষ হয়। অবাক কান্ড হচ্ছে- প্রশিক্ষণ শেষে কেমন করে জানি না- আমার সিদ্ধান্তই পাল্টে যায়।
প্রশিক্ষণ শেষ হয় বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটায়। শুক্রবার ছুটি। কর্মস্থলে যোগ দিতে হবে শনিবারে। সহপ্রশিক্ষণার্থীদের অনেকের সঙ্গেই ঠিকানা বিনিময় হয়, চাকরি প্রাপ্তির আনন্দে হা হা হাসাহাসি হয়, ঝিনাইদহের কলিগ তো জোর দাবিই জানিয়েছেন আমি যেন অভয়নগর যাবার পথে আগের দিন তার ওখানে নেমে পড়ি; রাতভর জম্পেশ আড্ডা হবে, তারপর সকালের বাস ধরিয়ে দেবেন। ঝিনাইদহ থেকে অভয়নগর ঘণ্টা দেড়েকের পথ। অসুবিধা কিছু নেই। প্রশিক্ষণ শেষে কর্তৃপক্ষ সবার হাতে হাজার দেড়েক টাকা তুলে দিয়েছে; মাত্র এক হাজার পাঁচশ’ টাকা- সেটুকুই কে কিভাবে খরচ করবে তাই নিয়ে মহাপরিকল্পনা শুনতে পাই। বাসায় ফিরে এইসব সাতকাহনের কেচ্ছা মেলে ধরি তরুর সামনে। শুনতে শুনতে তরুর কখনো হাসি পায়, হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে; কখনো স্প্রিঙের পুতুলের মত উত্তেজনায় লাফিয়ে ওঠে- তার মানে তুমি অভয়নগরে যাচ্ছ?
আমি তার চোখ ছুঁয়ে দিব্যি দিই,
নাহ! তোমাকে ছেড়ে যাব কী করে?
তার মানে যেতে ইচ্ছে করছে ঠিকই, আমিই তোমার বাধা, তাই তো!
কী মুশকিল, আমি কি তাই বলেছি?
তার মানে, অর্থ করলে তাই দাঁড়ায়।
এ রকম বাঁকা পথে তো কথার অর্থ তুমি করতে না তরু?
আমার মত দশা হলে তুমিও তাই করতে।
তোমার মত দশাথমানে?
তরুর চোখ ছলছল করে ওঠে। আমার দিকে পিঠঘুরিয়ে বসে। শাড়ির আঁচল খানিক সরে যাওয়ায় পিঠের অনেকটাই উন্মোচিত হয়ে পড়ে। আহ্! যেনবা মেঘ সরে যাওয়া শরৎ আকাশ। ইচ্ছে হয়থআমি ওই আকাশের পাখি হই। ডানা মেলে উড়ি। আমি উঠে গিয়ে বলি,কই বললে না, কী তোমার দশা?
তরু হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে বলে,
আমার হয়েছে মরণ দশা। মরণ দশা বোঝো?
নাতো!
বোঝো নাথমরণ দশা?
কী আশ্চর্য! আমি জীবিত মানুষ। রক্তে মাংসে গড়া প্রাণসমৃদ্ধ মানুষ। তোমার ওই মরণদশা আমি বুঝব কী করে!
এই যে তোমার গলায় লটকে পড়ে আমি নিজে মরেছি, আবার তোমাকেও মেরেছি।
তুমি মরেছ সে আমি অনেক আগেই জেনেছি, কিন্তু আমাকেও মেরেছ?
নয় তো কী! ছোট বড় যা-ই হোক, চাকরি বলে কথা! আমারই জন্য তুমি সেই চাকরিতে যেতে পারছ না- এই কেউ তো বলে মরণ দশা!
তখন আমার খুব হাসতে ইচ্ছে করে। প্রাণ খুলে হেসে উঠি হো হো করে- আমি তো সেই কবেই মরেছি। কলাভবনের করিডোর আলো করে তুমি হাঁটছ। কী আশ্চর্য! হাতে পায়ে কানে নাকে কোথাও কোনও গয়না নেই, কেবল কপালে সূর্যরাঙা টিপ। সামান্য এইটুকু অলংকার, এত আলো ছড়ায়? বাব্বা! আমার তো দু’চোখ ধাঁধিয়ে অন্ধ হবার জোগাড়।
অন্ধই তো হয়েছিলে, নইলে আমার সাধ্য কী তোমাকে বেঁধে রাখি। কী আছে আমার, বল!
বিশ্বাস কর তরু, তোমার কপালের ওই গোল টিপের মধ্যে আমি আমাকে দেখি, আমার একান্ত নিজস্ব পৃথিবী দেখি।
থামলে কেন, বল বলথআর কী দেখ!
ঠাট্টা করছ তরু?
কী মুশকিল! ঠাট্টা হবে কেন! আমার টিপপরা নিয়ে তুমি তো কখনো ঠাট্টা করোনি!
তবে যে…
তবে যে আবার কী?
সত্যি বলছি তরু, তোমার কপালের টিপ, আমার কাছে জগত দেখার আয়না।
আচ্ছা, খুব হয়েছে। কাব্যচর্চা তো ছেড়েই দিয়েছ শুনি, তাহলে এত উপমা টুপমা আসে কোত্থেকে?
আবার আমার হাসি পায়। কিন্তু সেই ইচ্ছেটুকু হজম করে ভাবি- বলে কী মেয়েটা! ‘তুমি যে আমার কবিতা…’ বলে কি এখন গান ধরতে হবে আমাকে! না, আমি গান ধরি না; বরং তরুকেই ধরি। তরু কৃত্রিম ভয়ে চোখ গোল করে চেঁচিয়ে ওঠেথএ্যাই! এ কী হচ্ছে!
আমার কানের লতিতে তরু কুটুশ করে কামড়ে দিয়ে ফিস্ফিসিয়ে বলে,ওই নামে আর ডাকো না কেন সোনামণি!
আমারও বেশ মনে পড়ে, কতদিন যেন ডাকা হযনি ‘তরুমণি’ নামে। সোনামণি নামকরণের পরপরই, সেই ছাত্রবেলাতেই ওর নাম হয়ে যায় তরুমণি। তরু বেশ মেনেও নেয়। নিজে থেকেই বিশ্লেষণ করে- বেশ হয়েছে। স্ত্রীর নামের সঙ্গে অনেকেই তো স্বামীর নামের লেজ লাগিয়ে চালিয়ে দেয়। আমারটা সেদিক থেকেও যথার্থ। কিন্তু তরুকে আমি ওই নামে ডেকেছি খুব কমসময় কম সংখ্যায়। কেবল ওকে আদর করতে গেলেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে আসে ওই নাম ‘তরুমণি’।
আমি যখনই কোথাও চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাই, বাসা থেকে বেরুনোর সময় তরুমণি কত যে নিষ্কাম পবিত্রতা নিয়ে আমাকে বলে- দেখো, এবার ঠিকই হবে; ওর সেই ভবিষ্যদ্বাণী সার্থক হতে চায় না কিছুতেই (সে হয়তো আমারই দোষে), তরু ইন্টারভিউ কার্ড হাতে এলেই আমার ভেতরে লোভ হয় তরুর হাতের ওই আদর পাবার, অপেক্ষায় থাকি নির্দিষ্ট দিনের সকালবেলাটির জন্য। এ সবের তাহলে মানে কী?
তরুকে আমি কি বলে যে বুঝায়!
নিজেকেই যখন বুঝাতে পারি না আমি তরুকে কী ব্যাখ্যা দিয়ে বুঝাতে যাব। নিজের দুর্বলতা ঢাকতেই আমি বলে উঠি,
‘তরুমণি’ কি খুব ভালো নাম হলো! ওর চেয়ে তরুলতাই তো ঢের ভালো!
তাই নাকি?
তরুলতা ভালো না- বল?
মানছি ভালো, কিন্তু তাতে কি তরুমণিকে পাওয়া যাবে?
তুমি সাড়া দিলেই হলো!
তুমি তো ডাকোইনি, তার কি সাড়া দেব!
এই যে ডাকলাম।
মনে আছে- এক সন্ধ্যায় তুমি আমাকে সন্ধ্যামণি বলে ডেকেছিলে!
হ্যাঁ। সেই সন্ধ্যার আরো অনেক স্মৃতিই মনে আছে!
তরু আমার বুকে মুখ ঘষতে ঘষতে বলে,
অনেক স্মৃতি না ছাই। সেদিনের সন্ধ্যেটাই মাটি।
কথাটা কি খাঁটি?
পুরো পরিপাটি।
আহ্! মাটি হয়ে যাওয়া সেই সন্ধ্যা কি আর কখনো ফিরে আসবে!
তিন.
সেদিন সন্ধ্যায় আমাদের দু’জনের বেইলী রোডে নাটক দেখতে যাবার কথা। না, কথাটা সোজাসুজি এরকম ছিল না। এ ঘটনার দু’দিন কি তিনদিন আগে তরু অফিস থেকে ফিরে প্রস্তাব করে,
এ্যাই! নাটক দেখতে যাবে?
নাটকের কথায় বুকের ভেতরটা খা খা করে ওঠে। সিনেমা টিনেমা নয়, নাটক দেখার তৃষ্ণা আমার প্রবল। বিয়ের আগে আমরা দু’জন বেশ ক’বার বেইলী রোডে গিয়ে মহিলা সমিতি মঞ্চে নাটক দেখেছি। বিয়ের পর আর হয়ে ওঠেনি। এতদিন পর তরুর মুখে নাটক দেখার প্রস্তাব শুনে আমার প্রাণটা জুড়িয়ে যায়। আমি এক লাফে তরুর মুখোমুখি এসে বলি,
দাঁড়াও দাঁড়াও, তোমার মুখটা একটু ভালো করে দেখি!
তরু কাপড় বদ্লাতে বদ্লাতে কপট মুখ ঝামটা দেয়,
ঢঙ!
সাজতে রাজি সঙ! কিন্তু হঠাৎ নাটকের কথা এলো কোত্থেকে?
ঢঙ এবং সঙ শব্দের অনুপ্রাস শুনে তরু খিলখিল করে হাসে। কাচের চুড়ির মত ঝনঝন করে বাজে সেই হাসির শব্দ। উনুনের তপ্ত বালুতে খই ফোটার মত খল্বলানো সেই হাসি। হাসি থামলে তরু জিগ্যেস করে,
দেবুদাকে মনে আছে তোমার?
নাটকের মধ্যে দেবুদাকে ঢুকতে দেখে আমার মোটেই ভালো লাগে না। তবু তরু যখন তার প্রসঙ্গ তুলেছে, নিশ্চয় কোনও কারণ আছে। কিন্তু আমি সহসা নিঃসংশয় হতে পারি না,
কোন দেবুদা?
আরে দেবাশীষ রায়। আমাদের ডিপার্টমেন্টের স্কলার। ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট। মনে পড়ছে এবার?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, ডিপার্টমেন্টের চাকরি হবে হবে করেও হলো না।
হবে কী করে! মালাউন যে!
আবার সাহস কত- চেয়ারম্যানের মেয়ের সঙ্গে প্রেম!
এই তো, চিনেছ তাহলে! সেই দেবুদা কিন্তু নীরু, মানে চেয়ারম্যানের মেয়েকেই বিয়ে করেছে। তবে চাপ ছিল নীরুর দিক থেকেই।
তা হঠাৎ ওদের এত খবর পেলে কোথায়? নীরুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল?
আরে নাহ্! দেখা হলো দেবুদার সঙ্গে।
আমার বুকের মধ্যে গোপন বীণার সূক্ষ্ম কোন তারে যেন টুং করে একটুখানি আওয়াজ হয়। আমি ওসব টুংটাং উপেক্ষা করে চোখ গোল করে তাকিয়ে থাকি তরুর মুখের দিকে। তরুদের ডিপার্টমেন্টের এক বছরের সিনিয়র বড় ভাই হচ্ছে দেবাশীষ রায়, আর তরুর চেয়ে এক বছরের জুনিয়র ছোটবোন নীরু, চেয়ারম্যান স্যারের একমাত্র মেয়ে। বাপের মুখের দিকে না তাকিয়ে সে ঝুলে পড়ল দেবুদার গলায়। তরু বেশ গর্বের সঙ্গে দেবাশীষ রায়ের গল্প শোনায়,
দেবুদার কি চাকরির অভাব? এ্যাদ্দিন পর জানা গেল আমাদের কোম্পানিতে তিনি আমার বস্ হয়ে বসে আছেন।
তাই নাকি!
তবে আর বলছি কী! আজ অফিসে গিয়ে দেখি হেড অফিস থেকে টিম এসেছে ইন্সপেক্শনে। ও বাবা, সে টিম না ঘোড়ার ডিম; হেডেড বাই দেবাশীষ রায়। দেবুদাও আমাকে দেখে অবাক- তুমি এখানে! আমারও খুব আশ্চর্য মনে হয়- নানান কাজে আমিও তো অনেক দিন হেড অফিসে গেছি; কই, দেবুদার কথা তো শুনিনি! এদিকে ইন্সপেকশন মাথায় উঠল। দেবুদার গল্পের শেষ হয় না। তার বউ নীরুকে সে ডাকে ভীরু বলে। তরু আবার হাসিতে গড়িয়ে পড়ে। আমি কমপ্লিমেন্ট দিই,
বাহ্! মুসলমানের মেয়ে হয়েও গন্ডি ভেঙে বেরিয়ে এলো, মা-বাবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করল, তবু সেই নীরুই হলো ভীরু।
সত্যিই যা বলেছ! নীরুকে দেখে কে বলবে- এই মেয়ে এত কান্ড ঘটাতে পারে, দেবুদাকে আমিও বলেছিথতাই বলে ওকে ভীরু বলাটা আপনার ঠিক নয়। শুনে দেবুদা কী বলে জানো?
আমি ঘাড় তুলে তাকাই।
বলে কিনা- তুমি জানো না তরু, নীরু সত্যিই ভয়ানক ভীরু। খরগোশের মত কোমল তুলতুলে শরীরটুকু নিয়ে তার ভয়ের অন্ত নেই। সব কিছুতেই গা-বাঁচানো স্বভাব। তো সে যা-ই হোক, দেবুদা এবং তার স্ত্রীর দাম্পত্য জীবনের খুঁটিনাটি খবরাদি পরিবেশন শেষ হলে তরু জানায়,
দেবুদা অবশ্য তোমার কথাও খুব বলছিলেন। নাটক দেখার প্রস্তাব তারই। শান্তিনগরে বাসা। শুক্রবার বিকেলে আমাদের যেতে বলেছেন। তারপর সন্ধ্যায় চারজন মিলে যাব নাটকে। সম্ভাব্য সেই নাট্যসন্ধ্যা নিয়ে আরো কতরকম পরিকল্পনা ফাঁদা হয়েছে, তরু একে একে সবই বলতে থাকে, আমিও শুনতে থাকি, কিন্তু কেন যেন আমারই মনে হয় আমি কিছুই শুনছি না।
আমাদের সেই নাটক দেখার সন্ধ্যা।
দিনে দিনে দিন ঘনিয়ে আসে ঠিকই, অথচ আমি তরুর উচ্ছ্বাসের সামনে কিছুতেই বলতে পারি না- নাটকে যেতে আমার আর ইচ্ছে করছে না। অফিস থেকে ফিরেই তরু খলবলিয়ে জানায়- দেবুদার সঙ্গে আজ ফোনে অনেক কথা হয়েছে। আমরা যাব শুনে নীরুও নাকি খুব খুশি। আমাদের সবার টিকেটও কনফার্ম করা হয়ে গেছে। এখন শুধু গেলেই হলো।
আমার সেই যাবার ইচ্ছেটাই ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায়, গুটিয়ে যায়। কেন, আমার নাটকপ্রিয় স্বভাবটা গেল কোথায়? কতদিন নাটক দেখতে যাইনি! তরুর মুখে নাটকে যাবার প্রস্তাব শুনে তো প্রথমে সারা অন্তর চনমন করে লাফিয়েই উঠেছিল অথচ মাত্র এই দু’তিনটি দিন যেতে না যেতে সেই ইচ্ছেজোয়ার নেমে গেল! বেলাভূমিতে তাহলে কী পড়ে আছে! ভয়ে ভয়ে গোপনে গোপনে তাকিয়ে দেখি- বেলাভূমি জুড়ে ঈর্ষার নুড়ি চকচক করছে। নিজের কাছেই নিজেকে ভীষণ ছোট মনে হয়, গোপনে তরুর চোখমুখ জরিপ করিথএই ঈর্ষানুড়িগুলো ও নজরে পড়েনি তো!
সেই শুক্রবারের দিনটা আমার ছিল উৎকণ্ঠার দিন।
কিন্তু বিকেল গড়িয়ে আসতে আসতে আমার উদ্বেগ উৎকণ্ঠা, দ্বিধা-সংকোচ, লজ্জা-ঈর্ষা-সব কিছুর অবসান হয়ে যায়, সর্বংসহা প্রকৃতি পরম ঔদার্যে সবকিছু ঢেকে দেয়। প্রথমে আকাশজুড়ে ঘনকালো মেঘের দাপাদাপি। গুমোট আবহাওয়া। খানিক পরে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি। আমার মনে তখন ময়ূরের পেখম মেলার আনন্দ, তবু চোখে মুখে দুঃখ এবং দুশ্চিন্তার রেখা ফুটিয়ে তুলে বলি,
এখন কী হবে তরু?
তরুর তো বেজায় মন খারাপ! দৌড়ে বারান্দায় গিয়ে একবার আকাশ দেখে এসে আমার গায়ে একটা আদুরে ধাক্কা দিয়ে বলে,
সত্যি কী হবে বল তো! দেবুদারা কিন্তু খুব অপেক্ষা করবে।
আমি তখন পালে হাওয়া দিই,
দাঁড়াও দাঁড়াও! এই বৃষ্টি ছেড়েও যেতে পারে!
সত্যি বলছ?
আচ্ছা মুশকিল! আমি কি গণক ঠাকুর নাকি? তবে এক-আধ ঘন্টার মধ্যে বৃষ্টি ছেড়ে যেতেও পারে। এমন তো হয়ই।
হ্যাঁ, তা হয়। তাহলে ওদের বাসায় বিশেষ একটা সময় দেয়া হবে না হয়তো।
তবু তুমি রেডি হয়ে থাক, বৃষ্টি একটু ধরে এলেই…
আর তুমি রেডি হবে না?
আমার আবার সময় লাগে নাকি?
তার মানে সময় লাগে আমার?
মোটেই না! তোমার তো পরনে ঢাকাই শাড়ি কপালে সিঁদুর, তোমার আবার দেরি হয়! তবু মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকা, এই আর কী!
এদিকে দিনের আলো ফুরিয়ে আসছে। কিন্তু বৃষ্টি ছাড়ার কোনও লক্ষণ নেই। তরু একবার ঘর একবার বারান্দা দাপাদাপি করে, আমার কাছে এসে আস্ফালন করে, আবার এক সময় আমার কাঁধে দু’হাতের ভর দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করে- যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে… কী যেন আবৃত্তি করতে তুমি…
এর মধ্যে আবার কবিতা আসে কোত্থেকে? আমি কৃত্রিম ক্ষোভ প্রকাশ করি।
কী করব বল! বাইরে বেরুনোর উপায় আছে?
তবুও অন্ধ, বন্ধ ক’রো না পাখা।
তরু হেসে ওঠে ফিক করে,
সেই তো তোমার কবিতা আবৃত্তিই হলো!
না না, কবিতা হবে কেন, এই বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় আমরা তো নাটক করব!
নাটক দেখার বদলে নাটক করতে হবে!
অগত্যা কী আর করা! নাটকই জমবে ভালো। আমরাই অভিনেতা, আমরাই দর্শক। আবার আমরা দু’জনই হব নাট্য সমালোচক, মন্দ কী!
কী যা-তা বলছ!
যাতা নয় যাতা নয়, নাটকের কথা হচ্ছে। তুমি হবে রানী, আমি হব রাজা।
তরু আবার অর্গল ভাঙা হাসি ছড়িয়ে দেয়, আমি বলি,
তুমি হবে লাইলী, আমি মজনু। তুমি হবে শিরি…
হাসির গমকে তরুর সারা শরীর উথ্লে ওঠে।
তুমি হবে মমতাজ, আমি শাজাহান, তুমি হবে মধুমালা, আমি…
তরুর মুখ থেকে হাসির মুক্তো গড়িয়ে পড়ে মেঝেয়। সেই মুক্তো কুড়াবার ছলে আমরা দু’জনে সারা মেঝে জুড়ে লুটোপুটি খাই। আমি ওকে শুধাই- আলোমতির নাম শুনেছ?
ঢাকা নগরীতে যে মেয়ের জন্ম- বেড়ে ওঠা, সে কী করে আলোমতির নাম জানবে? সেই শৈশবে প্রাণের গভীর থেকে আলোমতিকে চিনেছি, আমরা গ্রামের ছেলেরা, প্রেমকুমারকে দেখে সম্ভ্রমে মাথা নুইয়েছি। এখন এই বাদল সন্ধ্যায় আমি তরুকে প্রস্তাব দিই- তুমি হও আলোমতি, আমি প্রেম কুমার…।
বাইরে তখন ঝাঁপিয়ে বৃষ্টি নেমেছে। সন্ধ্যা নেমেছে বৃষ্টির ডানায় চেপে, অন্ধকার অবগুণ্ঠনে তার মুখ ঢাকা। এরই মাঝে বৃষ্টিবন্দি আমরা দু’জন মেতে আছি নাটক নিয়ে। নাটক দেখতে যাওয়া তো হলো না, একে বলে- আটকপড়া নাটক করা। এখানে অভিনয় নেই। যা আছে জীবন্ত। অভিনয়ের কিছুই জানে না তরু, তবু কী অসাধারণ নাটুকে ভঙ্গিমায় আমার কাঁধে হাত রেখে বলে ওঠে,
তা জনাব প্রেমকুমার! বিবাহের পর কি আপনার প্রেমনদীর জোয়ার স্তিমিত হইয়া গিয়াছে?
সহসা আমি চমকে উঠি। দৃশ্যমান হোক বা না হোক, পিঠে আমার চাবুকের ঘা অনুভব করি। ভেবে পাই না, এ কেমন অভিযোগ! তরুর মনে এমন প্রশ্নের উদয় হলো কবে, কী ভাবে! ভাবি, কিন্তু এক নিমেষে আবার নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে পরিহাসে মেতে উঠি,
প্রাণেশ্বরী আলোমতি, তুমি কি ওই নদীতে নেমে হাবুডুবু খেয়ে তারপর জোয়ার ভাটা পরখ করেছ?
হাবুডুবু কী বলছেন জনাব! আপনার সঙ্গে পরিচিত হবার পর থেকেই তো আমি ওই নদীতে ডুবে আছি প্রেমকুমার!
তাই নাকি! তাহলে তো বলতে হয়- আমিও ওখানেই আছি, ওই নদীতেই; আরো একটি গভীরে, আরো একটু অতলে ডবু দিলেই আমার দেখা পাবে প্রাণেশ্বরী।
আমায় তাহলে মার্জনা কর প্রাণনাথ। আজ থেকে সেই অতল গভীরেই আমি…
বাক্য শেষ হবার আগেই তরু এসে আমাকে আঁকড়ে ধরে। আমাদের এই সান্ধ্য নাটকের এভাবে যবনিকা পড়বে সে কথা কে জানতো! বাব্বা! অসময়ে সাগরে জলোচ্ছ্বাস কিংবা টর্নেডো হলে যে দশা হয় আমাদের তখন সেই অবস্থা। দু’জনেরই নদীতে কূলউপচানো ঢেউ।
নদী বলে শুধু নদী! নদীর কূল নাই কিনার নাই, নাইরে…।
আমাকে অবাক করে দিয়ে তরু হঠাৎ গেয়ে ওঠে-
ওপারে মেঘের ঘটা, কণকও বিজলি ছটা, মাঝে নদী বহে সাই সাইরে
আমি তো আনন্দে আটখানা। বিছানা ছেড়ে লাফিয়ে উঠি। তরুকে দু’হাতে কাঁধে তুলে ধেই ধেই নাচতে থাকি। আমিও গলা ছেড়ে গাইÑ আমি এই দেখিলাম সোনার ছবি, আবার দেখি নাইরে। বাইরে ঝুম্ বৃষ্টি, ঘরে অনবদ্য সৃষ্টি; এরই মধ্যে কখন হারিয়ে যায় বেইলী রোডের নাটক, দেবুদা এবং নীলুর আমন্ত্রণ সবকিছু অতলে হারিয়ে যায়। আমাদের এই অল্পদিনের সংসার জীবনে ওই ওকম মধুর সন্ধ্যা আর কখনো আসেনি, অথবা বলা যায় আমরাই পারিনি সেদিনের মত আর একটি সন্ধ্যা রচনা করতে। অথচ একদিন, শুধু সেই একটি সন্ধ্যায় তরুকে আমি সন্ধ্যামণি বলে ডেকেছিলাম।
চার.
রাত’ভর আমাদের কথা যা-ই হোক, সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই আমার সিদ্ধান্ত পাল্টে যায়। শুধু চাকরির মোহে আমার সন্ধ্যামণিকে ঢাকায় ফেলে রেখে আমি যাশোরগামী কোচ ধরে চলে যাই অভয়নগরে। নতুন জায়গা। আগে কখনো আসিনি। খুঁজে পেতে আমাদের এনজিওর অফিসটা আবিষ্কারের পরে অবাক হয়ে যাই চারপাশের পরিবেশ দেখে। যেদিকে তাকাই, কেবলই ফুলের চাষ। মাঠের পর মাঠ- হরেক রকমের ফুল আর ফুল। একত্রে এত ফুলের সমারোহ আমি আগে কখনো দেখিনি।
পথিমধ্যে ঝিনাইদহের সহকর্মীর আমন্ত্রণের কথাও মনে হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মনের সমর্থন পাইনি, ফলে ঝিনাইদহে নামিনি। সোজা চলে এসেছি কর্মস্থলে অভয়নগরে। কিন্তু এখানে উঠব কোথায়? থাকব কোথায়? এই অফিসেরই দু’জন সহকর্মী মেস করে থাকে অফিসের বর্ধিত অংশের একটি রুমে। তাদের মধ্যে একজন সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে আরো দুদিনের ছুটি নিয়ে বাড়ি গেছে, অপরজন অত্যন্ত আন্তরিকভাবেই আমন্ত্রণ জানায়- আপাতত এখানেই থাকতে পারেন, তারপর কালপরশু দেখে শুনে একটা ব্যবস্থা করা যাবে। তাদের ঘরের মধ্যে ঢুকে দেখি দুই পাশের দুই চৌকিতে বিছানা পাতা। আমাকে আপাতত শূন্য বিছানাটি দেখিয়ে বসতে বলে। আমি ধপাস করে বসেও পড়ি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে খুব খচখচ করে- এই অচেনা ঘরদোর অচেনা বিছানায় শুয়ে কি আমার রাত কাটবে?
রাতের কথা ভাবতেই আমার তরুর কথা মনে পড়ে যায়।
তরু। আমার তরুলতা। তরুমণি। আমার সন্ধ্যামণি। সারাপথ ওকে মনে পড়েনি, তাতো নয়! খুবই মনে পড়েছে। মনে মনে খুব ঝগড়া করেছি, আবার মীমাংসাও করে নিয়েছি দু’হাত ধরে। ঝগড়ার বিষয় তো অন্যকিছু নয়, এই একটাইÑ অভয়নগরে আসা না-আসা নিয়ে। সকালে উঠেই আমি তরুকে তাতিয়ে তুলি, স্পষ্ট ঘোষণা করি- ছোট বড় যা-ই হোক, জীবনের প্রথম চাকরিপ্রাপ্তি, আমি এই চাকরিতেই জয়েন করব।
সদ্য ঘুমভাঙা চোখের ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকায় তরু, যেন অবিশ্বাস্য কোনও কেচ্ছা শুনে সে হতবাক হয়ে গেছে; পায়ে পায়ে আমার খুব কাছে এগিয়ে এসে ধীরে কিন্তু তীক্ষèস্বরে জিগ্যেস করে- মানে?
মানে অবার কী!
না না, যা বলছ তুমি ভেবে বলছ তো?
বেকারের অত ভাবাভাবি কিসের বল তো! চাকরি পেয়েছি, সেটা করব না?
বাহ্! বেশ সিদ্ধান্ত নিয়েছ যাহোক। তা এই মূল্যবান সিদ্ধান্তটি নিলে কখন?
এই তো! সারারাত ঘুম আসছিল না এই চিন্তায়। সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললাম।
তরু হঠাৎ ভেঙে চুরে নিজেকে বদলে নেয়, খুব চটুল ভঙ্গিতে জানায়,
তোমার এখন ঘুমানো উচিত বন্ধু। প্রয়োজন সাউন্ড স্লিপ।
না না, আমি এক্ষনি বেরিয়ে পড়ব।
তরু তখনো যথেষ্ট ধৈর্যশীল, যথেষ্ট কৌতুকপ্রবণ,
শোনো প্রাণনাথ, ঘুম না আসা রাতে অনেক ভুল সিদ্ধান্ত আসে। ভুল পথে নিয়ে যায়। অনেকের পক্ষে আর ফেরাই হয় না।
তরু, আমি সিরিয়াসলি বলছি- আমি আজই অভয়নগরে যেতে চাই। আগামীকাল সকালে চাকরিতে জয়েন করতে চাই। এই আমার শেষ কথা।
এবার তরুও ফণা ধরে দাঁড়িয়ে যায়,
বেশ। আমার বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছ?
আমার সিদ্ধান্ত, আমার পরামর্শ- সবই তো তোমার কাছে অর্থহীন। তোমার সিদ্ধান্ত এবার তুমিই নাও।
আচ্ছা।
তরু আর কথা বাড়ায় না। কেবল ওর মেঘ থমথমে মুখটা আমার সম্মুখ থেকে সরিয়ে নেয়। আমিও যেন তাতেই স্বস্তি খুঁজে পাই।
কিন্তু এখন আমার ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না।
অফিসসংলগ্ন মেসঘরের বিছানায় আমার সহকর্মী সেই কখন থেকে ঘুমে অচেতন। তার প্রবল নাসিকা গর্জনে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে খান খান, থেকে থেকে কেঁপে উঠছে পলকা কাঠের চৌকি। ঘরের আলো নেভানোর পর অন্ধকার কিছুটা চোখ সওয়া হয়ে এলে সদ্যপরিচিত লোকটির মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবি- কী জানি সে সত্যিই কতটা অসুখী মানুষ! কিছুক্ষণ আগেও আমার সঙ্গে আলাপ জমানোর উদ্যোগ নেয়। বয়সে আমার চেয়ে ঢের বড়, বলা যায় মধ্যবয়স পেরিয়ে গেছে। খুলনার ডুমুরিয়ায় তার স্ত্রী-পুত্র-কন্যা সবই আছে। কন্যাটি ছিল এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী। শেষ পরীক্ষার দিন সেই মেয়ে পরীক্ষার পর আর বাড়ি ফেরেনি। সম্ভাব্য নানান জায়গায় খোঁজখবর নিয়েও তার হদিস মেলেনি। তার ধারণা- মেয়ের মা সবই জানে। মায়ের আশকারা পেয়েই মেয়ের এমন বাড় বেড়েছে; পাখা গজিয়েছে। এই দুঃখে স্ত্রীর উপরে রাগ করেই বাড়ি যেতে আর ইচ্ছে হয় না তার।
একেবারে অচেনা মানুষ। মাত্র এক সন্ধ্যার আলাপেই কেমন অবলীলায় তার বুকের কবাট হাট করে খুলে ধরে, ব্যক্তিগত দীর্ঘশ্বাসের পাঁচালি মেলে ধরে; আমি কিন্তু কিছুতেই ওই রকম সহজ হতে পারি না। আমাকে নানাভাবে সে খুঁচিয়ে দেখেছে। আমি বলেছি- আমার স্ত্রী ঢাকায় চাকরি করে, আমাদের দাম্পত্যজীবনের বয়স এখনো এক বছরও পেরোয়নি, ব্যাস। এই পর্যন্তই। এর বেশি আর কিছুই বলতে পারিনি। আরো কী যে বলার ছিল, তাও গুছিয়ে উঠতে পারিনি। অথচ না বলা সেই সব কথাই সারারাত আমাকে দগ্ধায়। দু’চোখের পাতা এক করতে পারি না। কী আলোয়, কী আঁধারে তরুমণির চোখ ছলছলে মুখচ্ছবি ভেসে ওঠে চোখের পাতায়। আমি তখন কী করি! কী করে সরাই ওই ছবি! আমি তো চোখ বন্ধ করেও দিব্যি দেখতে পাই- পাপড়ি প্রতিরোধ ভেঙে অশ্রুদানা গড়িয়ে পড়ে তরুর চোখ থেকে। অভিমানে ওর কণ্ঠরুদ্ধ। এই চাকরিতে যোগ না দেবার জন্য আর মোটেই পীড়াপীড়ি করবে না আমাকে। কিন্তু আমি কী করব এই হাওয়াশূন্য স্তব্ধ রাতে! ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না একলা জেগে রই। কোথায় আমার তরুমণি সন্ধ্যামণি কই!
মাত্র এক রাতের পীড়নেই আমার চেতনা জাগ্রত হয়।
তরুর সঙ্গে একত্রে জীবনযাপন শুরু করার পর এই প্রথম একটি রাত আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে কাটালাম। তরুবিহীন আমার সে রাত এতই দীর্ঘ, এতই ভারি যে সূর্য ওঠা ভোর পর্যন্ত পাড়ি দেয়াও আমার কাছে ভয়ানক দুর্বহ হয়ে ওঠে। আমার চোখে লেশমাত্র ঘুম নেই, অথচ একই ঘরে পাশের বিছানায় একজন কন্যাহারা দুঃখীপিতা দিব্যি নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে- এ আর কতক্ষণ সহ্য হয়! তাকিয়ে দেখিথওই লোকটিরও কষ্ট কম নয়, নাক দিয়ে সে শ্বাসপ্রশ্বাসের কাজ করতেই পারছে না, মুখগহ্বর হাঁ-করে ঐ ক্রিয়াটি সম্পাদন করতে গিয়ে তারও নাভিশ্বাস ওঠার দশা। তবু আমার মস্তিষ্কের একটি বদ্রাগী কোষ উত্তেজিত হয়ে ওঠে, বিদঘুটে এক বদবুদ্ধি আমাকে প্ররোচিত করে- ঘুমন্ত এই লোকটির হাঁ হয়ে যাওয়া মুখের উপরে বালিশ চাপিয়ে দিয়ে পালিয়ে গেলে কেমন হয়!
না, শেষ পর্যন্ত অতটা খামখেয়ালি কান্ড ঘটানো আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। তাই বলে সুস্থ স্বাভাবিক ভদ্রলোকের মত সকালে ঘুম থেকে উঠে আড়ামোড়া ভেঙে নাহার সম্পন্ন করার পর ঠিক অফিস-আওয়ারে যথানিয়মে জয়েনিং লেটার জমা দিয়ে শান্তমিষ্ট ভঙ্গিতে নিজের চেয়ারে বসার মত মানসিকতা ও আমার অবশিষ্ট ছিল না। অতিপ্রত্যুষে আমার স্বল্পচেনা সহকর্মীর ঘুম ভাঙিয়ে তাকে স্তম্ভিত করে দিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হই।
আমি যখন বাসায় এসে পৌঁছুই, তখন বেলা আড়াইটে। আমার অতিচেনা বাসা। চারতলা পর্যন্ত উঠতে বাহাত্তরটি সিঁড়ির প্রতিটি সিঁড়ি আমার চেনা। গত এপ্রিলে দোতলার মেয়ে বকুলের বিয়ে উপলক্ষে তিনতলার সিঁড়ি পর্যন্ত আল্পনা আঁকা হয়েছিল, সেই আল্পনার লতাপাতার ডিজাইন পর্যন্ত আমার মুখস্থ, প্রত্যেক সিঁড়িতে বকুলের পায়ের পাতার ছাপও আমার চেনা। তবু আমার ভয় করে। সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে আমার পা কাঁপে, বুক ধড়ফড় করে। নিজেকে কেমন অচেনা আগন্তুক মনে হয়। এই তো মোটে গতকাল সকাল থেকে আজ দুপুর পর্যন্ত কতটুকুই বা সময়। ঘড়ি ঘন্টা ধরে হিসেব করলে বড় জোর ঘন্টা তিরিশেকের ব্যবধান। এতেই আমার মনে হয় আমি আসছি বহু যুগের ওপার হতে, মনে হয় হাজার বছর ধরে পৃথিবীর পথ আমি হাঁটিতেছি, তিনতলা থেকে চারতলা পর্যন্ত পা আর উঠতে চায় না; আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন।
চারতলা পেরিয়ে আসার পর এতক্ষণে আমার সম্বিত ফেরে- আমার কাছে তো ঘরে ঢোকার চাবিই নেই। আমাদের বাসার প্রতিটি তালার না হোক, অন্তত ঘরে ঢোকার জন্য যে দু’টি তালা খুলতে হয়, সেই চাবি আমরা দু’ভাগে ভাগ করে রেখেছি তা থাকেও আমাদের দু’জনের কাছে পৃথকভাবে। কিন্তু এখন তো আমার কাছে কোনো চাবিই নেই। ঘরে ঢুকব কী করে! অফিস থেকে তরুর ফিরতে ফিরতে সেই বিকেল চারটে কি পাঁচটা। তাহলে উপায়!
দরজার সামনে এসে আমি অবাক হয়ে যাই- দরজা ঠিকই বন্ধ, কিন্তু তালা নেই একটাও। তার মানে ঘরের মধ্যে মানুষ আছে এবং দরজা ভেতর থেকেই লাগানো। তরু কি তবে অফিসে যায়নি! কই, এমন পরিকল্পনার কথা তো আগে শুনিনি! বন্ধ দরজায় কান লাগিয়ে সিলিং ফ্যানের বোঁ বোঁ শব্দ ছাড়া কিছুই শুনতে পাই না। কেন জানি না এই দিনে দুপুরেও আমার গা ছমছম করে। আমি দরজায় হাত রেখে ব্যাকুল কণ্ঠে ডেকে উঠি- তরু!
সহসা দরজা খুলে যায়।
সামনে দাঁড়িয়ে তরু, আমার তরুমণি, তরুলতা। কিন্তু এ কী চেহারা হয়েছে ওর! গত তিরিশ ঘন্টায় কে যেন ওর শরীর থেকে সমস্ত রক্ত নিংড়ে নিয়েছে। সারা মুখ পাংশু পান্ডুর। মনে হয় যেন বিরাট ঝড়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে বিধ্বস্ত দেহ নিয়ে কোনও রকমে টিকে আছে মাত্র। সাহস সঞ্চয় করে আমি ওর চোখে চোখ রাখতেই সব বাঁধ ভেঙে যায়, তরুলতা দু’বাহু মেলে জড়িয়ে ধরে আমাকে, বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে হু হু করে কান্নায় ভেঙে পড়ে। অবলম্বন পেয়ে ওর অবসন্ন দেহ এলিয়ে পড়তে চায় যেনবা। আমি ওকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে বলে উঠি,
তোমাকে ছেড়ে আমি থাকতে পারব না তরু।
এতক্ষণে তরু সশব্দে কেঁদে ফ্যালে। কেঁপে ওঠে ওর সারা শরীর। আমি ভয়ানক বিব্রত বোধ করি। কী বলে যে ওকে সান্ত্বনা দেব সেই ভাষা খুঁজে পাই না। ধীরে ধীরে দু’হাতের অঞ্জলিতে আমি ওর পান্ডুর মুখটা তুলে ধরি। দু’চোখে শ্রাবণধারা। কপাল টিপশূন্য। সূর্যহীন দিনের আকাশ কিংবা চন্দ্রহীন রাতের আকাশ কি কল্পনা করা যায়! তরুর কপালের টিপ যে আমার জগৎ দেখার আয়না! আজ সেই আয়না নেই। আমার বুকের মধ্যে হাহাকার করে ওঠে। বেদনাসিক্ত আমার দু’ঠোঁট নেমে আসে তরুর কপালের আয়নায়। তখন আমি ভেতরে ভেতরে প্রবল নাড়া খাই, চম্কে উঠি- এই আমি কোন আমি!
পাঁচ.
চাকরিভাগ্য আমার প্রসন্ন নয় সেটা বহুবারের পরীক্ষায় বহুভাবে প্রমাণিত হয়ে