আল মাহমুদ
আবার কবিতা
কবিতা তো নেই
কবিতা কোথায়
কবিতা খুঁজছি
বাজারে-হাটে
হঠাৎ দেখি
তোমার আঁচল
বাতাসে উড়ছে
হাওয়ার দাপটে।
আমি ছুঁতে চাই
তোমার স্কন্ধ
অন্ধ বধির
মানুষের মতো,
কোথায় খুঁজবো-
মন্দ মন্দ
বাতাসে ছন্দ
উড়ায় আঁচল
তোমার কাজল
চোখের দৃষ্টি
দেখতে কি পায়
আমাকে এখন?
ছন্দ যেমন
মিল খোঁজে মিল
তেমন তো দিল
তোমার নিখিল
হাসি দিয়ে ভরা
যেন আলো করা
খুলে দিলো কারা
দরজার খিল?
অসীম সাহা
সোনালি ঘুঙুর
আমার কবিতাগুলো খোলা পায়ে হেঁটে গেলে
দিগন্তের মেঘগুলো কথা বলে প্রেমিকার মতো;
আর মেঘনাদ যজ্ঞাগার পার হয়ে
মেঘের আড়াল থেকে সমবায়ী যুদ্ধে দাঁড়ায়।
এ কেমন যুদ্ধ আজ?
বাতাসের দেখা নেই, ন্যাটোবাহিনীর সৈন্য
যুদ্ধের মাঠ থেকে ফিরে যাচ্ছে মৌলিক ফুলের বাগানে।
জলপাই পোশাক থেকে উড়ে যাচ্ছে সুগন্ধী কর্পূর।
নদী থেকে রুপালি মাছের দল মার্চ পাস্ট করতে করতে
চলে যাচ্ছে যার যার প্রেমিকার অন্দরমহলে।
আজ থেকে প্রেমহীন পৃথিবী নিয়ে কোনোদিন
আর কোনো সৈনিক অস্ত্র হাতে ঢুকবে না
রক্তাক্ত মগজের কোষে।
কাঁটার ভেতর থেকে আজ রাতে
জন্ম নেবে মানুষের সোনালি ঘুঙুর।
জাহাঙ্গীর ফিরোজ
তোমার নির্মাণ
একটি অপূর্ণ জগৎ আমি কল্পনায় পূর্ণ করে নেই
মর্ত বিলাসে যারা শিশ্নোদর
অহংকার ভোগ করে
যাপিত জীবনে হু হু মরুভূমি দেখে চারিদিকে
তাদের নয়নে রঙ ঢেলে দাও এই ফাল্গুনে
প্রভু, তুমিও তো অনন্তের মাঝে মর্ত বিলাস উদযাপনে অতি মর্তের দ্বার খুলে বসে আছ
নিজেরই ইচ্ছা পূরণের অভিলাষে নিমগ্ন একাকী।
প্রভু, তোমার ইচ্ছার ভুবনে দেখি কাম আর কামনার ছবি
অফুরান যৌন মিলন দিয়ে সুশোভিত তরুলতা বৃক্ষরাজি,
ফুল ফল নর নারী বিচিত্র প্রাণিকুল গড়িতেছ
প্রভু, তুমি কেন জ্বেলে দিলে আমার অন্তরে
তোমারই ইচ্ছার ক্ষুধা?
এই পড়ন্ত বিকেলে এত কাম আর কামনার রঙে
আমি কী ভাবে তোমার ইচ্ছার ছবি আঁকি!
খালেদ হোসাইন
একলা মনে তবুও বিসংবাদ?
তুমি থাকো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে
তুমি থাকো দৃশ্য-পরপারে
তোমার বাড়ি রোজ অতিথি আসে
কত ব্যস্ত! ফুল ফোটে তা-ও ঘাসে।
সকল প্রান্তে ভাসে তোমার মুখ
চোখের কাজল মুখের চোরা হাসি।
চুল শুকাতে আর যাও না রোদে
নিহত এক লোকের অনুরোধে।
তোমার নাই শোক করবার ক্ষণ
তোমার নাই পেছন ফিরে চাওয়া
চৈত্রমাসেও আকাশে ওঠে চাঁদ
একলা মনে তবুও বিসংবাদ?
হাসান হাফিজ
জীবনের তৃষ্ণাধক
ঝাঁপ দিয়েছি উথাল পাতাল জীবনগাঙে
বালক যেমন উৎসাহে দেয় ঝাঁপ
ধার ধারে না বিপদসীমার ধরন ধারণ
ছন্দ প্রথার ভাঙচুরে তাই নিযুক্তি পায় মন
অবিমৃষ্য হুটোপাটির অনিবার্য তাপ
ঝাঁপ দিয়েছি ঠিক তেমনি করে
বুকটা কাঁপে ভয় তরাসে উৎকণ্ঠায় ডরে
এই তান্ডব ওলটপালট ঝড়ে
সুস্থ সহি ফিরবো কী ফের ঘরে?
ভুল তাহলে করেছি একলাই?
পারবো কি না ওপার যেতে
গন্ধম বা মোক্ষ পেতে
কিচ্ছু জানা নাই
ঢের হয়েছে, আর দিয়ো না লাই
এক জনমে মিটবে না লো পোড়া মনের
উলুকঝুলুক জ্বর-কামনার খাঁই
সংশয়ে বুক এফোঁড় ওফোঁড়
এইটুকুনি জীবন তবে তৃষ্ণাধকে
একলা একা পুড়–ক পুড়ে সব ধোঁয়াশা শূন্যমুঠি ছাই…
গোলাম কিবরিয়া পিনু
তপস্যা
তুমুল ঝগড়ার মধ্যে
জামা-কাপড়ের রং চটে গেল-
নদী ও ঝরনার কলধ্বনি আর থাকল না
মাংসপেশির মধ্যে পড়ল টান
গান হয়ে উঠল গাধার কর্কশ শব্দ
এভাবে কাটাতে পারি কি অব্দ?
আমাদের প্রশস্ততা
আমাদের বিশ্বস্ততা
কোন্ মাংসে জারিত হলো
এই অমাবস্যায়!
দিন কাটবে এখন কোন্ তপস্যায়?
সোহরাব পাশা
ছেঁড়া পাতার গল্প
তুমি ছেঁড়া পাতার দীর্ঘ এক অসমাপ্ত গল্প
একটি বিরাম চিহ্নও নেই বড়ো দুরূহ পঙক্তির পাঠ
নিজের সঙ্গেই কথা বলে সময় ফুরিয়ে গেলো
তোমার তো দেখা মেলা ভার,
শুধু আমি ছাড়া তোমার ব্যস্ততা থাকে অন্য কাজে
কোনো পরিভাষা নেই তোমার বিশুদ্ধ অনুবাদে
দীর্ঘশ্বাসের সৌন্দর্য নেই, স্তব্ধতা বিবর্ণ হয়,
তোমার কোমল গহিন ছায়ায় আলো পড়ে দ্রুত নিভে যায়,
বাসনার দরোজায় ধু ধু ঝুলে থাকে হারানো চাবির তালা;
এই জীবন অদ্ভুত এক ব্যস্ততার নির্বাসন, কাঁটাতারে
ঘেরা স্মৃতিময় ছায়াবাড়ি কেউ আসে, কেউ যায়
ভালোবাসার সার্কাসে ব্যস্ত, ক্লান্ত, স্বপ্নহীন প্রাণ,
ব্যবহৃত স্বপ্নগুলি পায় না পূর্ণতা, শুধু তার হাহাকার
বিষন্ন অস্থিরতার ঈর্ষা, টানাটানি, কানাকানি,
সংসারে;
কী যে এক বেদনায় বিহ্বল পৃথিবী গহিনের অন্ধ-বন্ধ
অপরূপ আকাক্সক্ষার জলভরা নদী খুঁজে খুঁজে
দিন যায়, রাত্রি যায়, নদী ছিঁড়ে যায়।
পুলক হাসান
স্বর্ণলতা
মাটি, এই শব্দেই মিশে আছে মমতা
তার বুকেই বেড়ে ওঠে স্বর্ণলতা।
তোমরা বলো তাকে পরাশ্রয়ী উদ্ভিদ
কিন্তু সেও তো বহে গ্রীষ্ম বহে শীত।
যদি না থাকে স্রোতের বিপরীত
অর্থহীন হবে জীবন সঙ্গীত।
নির্ভরতা মানে তাই পারস্পরিক বর
ঋতুতে ঋতুতে পৃথিবী জাগর, নবতর।
জাফরুল আহসান
বাতি ঘর
অদেখার ছলে কেটে গেছে দেখো কতটা সময়
ছিলে না তো তুমি প্রণয়ের রাখি করেছে জয়,
কবিতার ঘরে বসন্ত আসে মৃদু হাওয়ায়,
চিরচেনা তবু অচেনা কোকিল আমাকে কাঁদায়।
তোমার জমিনে চাষ-বাস নেই সেই কতো দিন
দীর্ঘ খরায় রোদে ভিজে আজ এতোটা মলিন।
হয়েছো মলিন, ক্ষতি নেই তাতে কবিতার নদী
ভাসাবে তোমারে ঢেউ খেলা চোখে রহ নিরবধি।
ফাগুনে আগুন জ্বেলেছিলে কবে হৃদয়ের কাছে,
সেই সে প্রদীপ বাতিঘর হয়ে আজো জেগে আছে।
শাহানারা ঝরনা
অনুভব
ক. একটা গাছে সবুজ পাতা অন্যটা যে খালি
তারই পাশে নেশার ঘোরে ঘুমোয় বনমালী
ভাল্লাগে না আর,
বোধ হারালে কেউ ফিরে তা পায় কি পুনর্বার?
খ. বন দেবিকার পায়ের নিচে পিষ্ট হোল ফুল
একবারও সে দেখল না তা, নয় কি এ তার ভুল?
হয়তো সেই ই ঠিক
তাইতো এমন অসংগতি চলছে চারিদিক !
গ. মন আকাশে নিত্য জ্বলে স্বপ্নেরই শুকতারা
ওসব দেখার পাইনে সময় চলছি দিশেহারা
পুড়ছে মেধার ঘর
নষ্ট বোধের ক্ষরণ নিয়েই ছুটছি নিরন্তর।
ঘ. হৃদয় পাড়ার পাঠশালাতে কে পাঠাল চিঠি?
চিঠির পাতায় একখানি মুখ হাসছে মিটি মিটি
বলি তারে শোন,
তুই কি আমার বিবেক, নাকি গণতন্ত্রের বোন?
ঙ. একটা জীবন চলছে কেমন সবই কি আর বুঝি?
বুঝতে গিয়েই হাজার রকম মোহরদানা খুঁজি
খুঁজেও কি সব পাই?
পেলেও দেখি হারিয়ে গেছে, আমার কাছে নাই!
আবদুল হাই শিকদার
কাউন্ট ডাউন
সবার আগে খবরটা সংগ্রহ করেছিল কর্ণ,
সঙ্গে সঙ্গে রাডার স্টেশনগুলিকে সচল করেছিল নাসিকা।
তারপর আলোর গতিতে তা পৌঁছে গেলো মস্তিষ্কের ল্যাবে,
ডাটা বিশ্লেষণ শেষ করার আগেই জেগে ওঠে হৃদয়,
প্রচারণা, ঝড়, টাইফুন, তান্ডব, তোলপাড়-
তুমি আসছো!
তুমি আসছো তিনশত পয়ষট্টি প্রকারের বসন্ত হাতে নিয়ে।
তিনশত পয়ষট্টি প্রকারের বর্ষার সচ্ছলতা নিয়ে তুমি আসছো।
তুমি আসছো তিনশত পয়ষট্টি প্রকারের নারঙ্গী বনের কম্পন,
তুমি আসছো তিনশত পয়ষট্টি প্রকারের সামুদ্রিক ঢেউ।
নির্ঘুম হৃদয়ের সময় নেই দাঁড়াবার।
তুমি আসছো-
পুরো তল্লাট জুড়ে পুষ্পিত হলো পল্লবের প্যান্ডেল,
এখানে ওখানে দাঁড় করিয়ে ফেললো তিনশত পয়ষট্টিটি তোরণ।
তিনশত পয়ষট্টি প্রকারের রঙে রঙিন হয়ে উঠলো তোমার আসবার পথ,
তিনশত পয়ষট্টি প্রকারের মেঘ আড়াল করে দাঁড়ালো সূর্যের তাপ
তিনশত পয়ষট্টি প্রকারের জোছনা হাতে মুখ বার করলো পূর্ণিমার চাঁদ।
ডাইনিং টেবিলে এলো তিনশত পয়ষট্টি প্রকারের রেসিপি
শয্যায় শয্যায় ছড়ানো হলো তিনশত পয়ষট্টি প্রকারের চারুকলা।
তিনশত পয়ষট্টি প্রকারের অঙ্গ স্টান্ডবাই,
তিনশত পয়ষট্টি প্রকারের উত্তেজনা,
তারপর কাউন্ট ডাউন।
তুমি আসছো তিনশত পয়ষট্টি প্রকারের সৌরভ ছড়াতে ছড়াতে,
তুমি আসছো তিনশত পয়ষট্টি প্রকারের আলিফ লায়লার বাতি জ¦ালিয়ে
কাউন্ট ডাউন করে হৃদয়-
কাউন্ট ডাউনে নেমে পড়ে ফুসফুস
অক্সিজেনে অক্সিজেনে ভরে ফেলে তিনশত পয়ষট্টি প্রকারের কক্ষ।
কাউন্ট ডাউন শুরু করে হাত, পা, ঠোঁট
কাউন্ট ডাউনে নেমে উৎকণ্ঠায় অধীর চোখ-
সেখানে ভিড় করে তিনশত পয়ষট্টি প্রকারের তৃষ্ণা।
কাউন্ট ডাউনে নেমে
দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অস্থির উত্তেজিত ক্ষুব্ধ ক্রব্ধ শিশ্ন
শুরু করে তিনশত পয়ষট্টি প্রকারের গালাগালি।
সে গালাগালি গিয়ে পদ্মার বুকে লাগে,
কাউন্ট ডাউন শুরু করে দেয় তেরশত নদী
সে গালাগালি গিয়ে পশ্চিমে আঘাত হানে
কাউন্ট ডাউন শুরু করে দেয় পূর্ব দিগন্ত।
সে গালাগালি লাগে বঙ্গোপসাগরে-
ক্ষোভে রোষে পতেঙ্গায় আছড়ে পড়ে বিমান।
তিনশত পয়ষট্টি প্রকারের ক্ষুধায়
বিস্ফারিত হতে থাকে তিনশত পয়ষট্টি প্রকারের অগ্নিগিরি,
কাউন্ট ডাউনে নেমে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায় পাকস্থলীর।
তুমি আসছো কাউন্ট ডাউন-
তুমি আসছো তিনশত পয়ষট্টি প্রকারের কাউন্ট ডাউন,
তুমি আসছো তিনশত পয়ষট্টি প্রকারের অপেক্ষা,
তুমি আসছো তিনশত পয়ষট্টি প্রকারের রক্তপাত,
তুমি আসছো তিনশত পয়ষট্টি প্রকারের রূপকথা।
তিনশত পয়ষট্টি প্রকারের জানালায় উপচে পড়ে কাউন্ট ডাউন
তিনশত পয়ষট্টি প্রকারের দরজা খুলে বসে আছে কাউন্ট ডাউন
কাউন্ট ডাউন কাউন্ট ডাউন
আকুল-ব্যাকুল কাউন্ট ডাউন।
দোহাই তোমার ওগো সেতার গিটার এবং পিয়ানো ভাই,
এবার আমি সত্যি সত্যি দু’হাত ভরে তোমাকে চাই।
মনজু রহমান
প্রতিকাব্য
গৌরী তোমার স্বাধীনচেতা ঘাসের উপর শুয়ে আছি
এই তো আমি
পাহাড় চুঁয়ে যে ঘাস বানাও ঘাম ডুবানো মধ্যপুকুর
সেই পুকুরেই ¯œানে নামি
কী আশ্চর্য; পুকুর যেন ছোট্ট নদী খোসআমুদে উথলে ওঠে
আর আমি সেই পাহাড়চোঁয়া নদীর বুকে
ডুবসাঁতারে মত্ত এখন
ঘাম ঝরানো ওই নদীতে জলভেজা মুখ ডুবে আছি
জানোই তো সব
অন্ধ কূপে অন্ধ কবি ছড়াতে পারি জ্যোৎ¯œা আলো
ঝরাতে পারি ততটা ঘাম; যতটা তুমি ঝরিয়ে দিলে
জানোই তো সব
এ মুহূর্তে আমি কেমন দুঃসাহসিক ডুবসাঁতারু
স্বাধীনতার মাঠে যেমন ভয়ভীতিহীন ছড়িয়ে ছিলাম
স্বাধীনতার পাপড়ি তোমায়
ঠিক সে রকম; ঘোরলাগা এক বৃষ্টিকণা তুমি এখন
এখন আমি
বিন্দু ছেড়ে বৃত্ত আঁকি; বৃত্ত ছেড়ে নদীর বুকে
শিল্প গড়ি
শিল্প ভাঙি ঘামকে ধরে ঘামে ভাসাই মুখ
তখন নদী প্রলয়ে উন্মুখ…
অতনু ভট্টাচার্য
যে বাড়িতে থাকি
যে বাড়িতে থাকি-
একটা ঘর থেকে আরেকটা ঘরে
যাবার আপাত অনায়াস ভঙ্গিমার ভেতর
পোশাক বদলের গন্ধ লেগে থাকে।
যে বাড়িতে থাকি-
তার ভেতর কতরকম আবহাওয়া,
কখনো হলকা মরু তো কখনো বৃষ্টিচ্ছায়
কখনো তুষারে তুষারে সাফেদ।
যে বাড়িতে থাকি-
এক-এক দিন ভীষণ অচেনা
মনে হয় এই বাড়িটা ক্রমপ্রসারিত হতে হতে
দেওয়াল ছাদহীন গোটা পৃথিবী,
এইসূত্রে বাড়িটার ক্রমসংকোচনের কথাও ভাবি,
ভাবি বালুকণাবৎ এবং প্রবল বিস্ফার।
যে বাড়িতে থাকি-
তার কোনো নাম দেবার তাগিদ হয়নি কোনোদিন,
কিন্তু এ কথা তো ঠিক যে বাড়িটার চাকা ও ডানা
বিষয়ক কত কী যে দেখেছি আমি স্বপ্নের কৈশোরে।
যে বাড়িতে থাকি-
যে বাড়িটায় থাকতে থাকতে আমার চুলে পাক ধরে গেল,
এই বাড়িতেই থাকতেন নিশ্চয় কোনো গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী।
জাকির আবু জাফর
প্রেরণার শ্যামল শিখা
কেউ কি দেখেছে এইসব পাতার শরীরে অংকিত কার মুখ
কার রঙে লাবণ্যময় এইসব পল্লব বদন
শরীরময় সবুজ বর্ণের আশ্চর্য যোজন যেনো
জীবনের কর্মময় চাঞ্চল্যের নিশান
কি অদ্ভুত ভঙিমায় দোলে বাতাসের সোহাগ
সর্বত্র প্রাণের দোলা প্রেরণার বহমান শ্যামল শিখা
মাঝে মাঝে মনে হয় পাতার দেহের ভেতর
জমে আছে স্বপ্নের ছটা
জমে আছে কল্পনার অজস্র পৃথিবী
টোকা দিলেই পাতা হবে প্রাণের সেতার
অতঃপর বেজে যাবে হৃদয়ের সুর
যে সুর বর্ষায় জীবন থেকে জীবনের তীরে
কখনো বৃক্ষের আশ্রয় নিলেই দেখি
পাতার চোখ থাকে আমার চোখে
যেনো সবিস্তারে দেখে আমার ভেতর বাহির
যেনো বিবস্ত্র দেখে হৃদয়ের সমস্ত আচ্ছাদন
বাতাসের মতো মনের শিরায় ঢুকে পড়ে পাতার দৃষ্টিরা
ভেতর পৃথিবীর যা কিছু গোপন প্রকাশ্য করে তার সব
পাতার বুকের মতন আমার বুকেও জমা হতে থাকে
পৃথিবীর সমস্ত সবুজ
সবুজ সম্ভ্রমে সম্ভ্রান্ত আমার স্বপ্নরা
পাতার সাথে দুলতে থাকে পৃথিবীর বাতাসে।
আবু ফরহাদ
এসো পাখী, এসো ফুল, এসো নদী
পাখিটাকে ডেকেছিলাম-
বনের পাখি শিষ দাও যাও মনে।
মনটা এখন উড়াল উড়াল করে।
বনের ফুলকে ডেকেছিলাম-
প্রাান্তরে মোর মনটা বিরানভূমি। ফুটতে পারো যত ইচ্ছে তত।
নদীটাকে ডেকেছিলাম-
নুপুরটা যে পড়ে আছে ঘরে। আসলে তুমি পরবে পায়ে পায়।
পাখিটি এলো না।
ফুল এলো না।
নদী এলো না।
কোথায় আমি ভুল করেছি যেনো !
পাখির নাম কি পাখি ?
ফুলের নাম কি ফুল ?
নদীর নাম কি নদী।
মস্ত বড় ভুল। এবার আমি শুধরে নিয়ে বলি।
পাখি মানে স্বাধীনতা। উড়তে যাহার কোথাও নেই মানা।
ফুল মানে সুন্দর। সবার চোখেই সমান মনোহর।
নদী মানে নারী। মায়ায় ভরা অন্তর।
এবার আমি পাখিকে বলি, এসো- স্বাধীনতা,
আমি লিখবো আমার কথা।
ফুলকে বলি এসো সুন্দর আমরা সবাই মিলেমিশে থাকি।
নদীকে বলি এসো নারী তুমি মায়ায় ভরাও অন্তর।
এবার ও এলো না পাখি।
এলো না ফুল।
এলো না নদী।
আমি বড় চিন্তায় পড়ি।
পাখী না এলে শিষ দিবে কে ?
ফুল না এলে সুরভী পাবো কোথায় ?
নদী না এলে মায়া লাগাবে কে ?
পত্রিকা খুলে দেখি স্বাধীনতা
কোথায়ও কোথায়ও বন্ধনীর মধ্যে আছে যেন।
দেশে দেশে বিভক্তির ঢেউ তোলে কারা।
আবার ও বিভক্তিকে দাঁড় করাতে চায়।
মেয়ে ধর্ষিত হয় অভিজাত হোটেলে।
নারীকে করে লাঞ্ছনা ধনাঢ্য শক্তির স্পর্ধা।
প্রার্থনা করি সতত :
স্বাধীনতাকে করে যারা বিপন্ন-
তারা ক্ষয়ে যাক।
বিভক্তির দেয়াল ভেঙ্গে যাক।
সকলখানে মানব প্রেম উঠুক জেগে।
ধর্ষকদের মাথায় পড়ুুক ঠাডা,
বজ্রাহত হয়ে খাক হয়ে যাক তারা।
মিনতি করি,
পাখি তুমি আসো শিষ দিয়ে যাও মনে।
ফুল তুমি ফোটো সুরভিত কর দশদিক।
নদী তুমি আসো কল্লোলিত কর আমাদের পলিভূমি।
ইসাহাক আলী
অনুভূতির বোধ
মাঝে মধ্যেই অযাচিত অথবা অকারণেই
বোধের আকাশে মেঘ জমে বৃষ্টি ঝরে
অথবা শানিত খরায় তৃষ্ণার বান তোলে
এটাই বুঝি অনূভূতির বোধ।
ঠিক আজ যেমন পিচ ঢালা পথ চলন্ত ট্রাকের চাকায়
সবুজ বৃক্ষের বিরহ ঝরে পড়া পাতাগুলো
যেন হুড়োহুড়ির মাদকতায় ফিরে পায় ফেলে আসা শৈশব
প্রাণের উচ্ছ্বাসে মাতোয়ারা হয়ে করছে বিজয় কেতন।
আমিও চলমান চলছি, বাইকের চাকায় সামনে চলার গতি
বসন্তের শীতল বাতাস ছুঁয়ে দিচ্ছে শরীর
মনের প্রেরণায় ঝড় তোলা আমার সেই দুরন্ত কৈশোর
অনুভূতি যেন বারবার ফিরছে পেছন পানেই।
আমার সামনে চলা, ঝরা বসন্ত প্রকৃতি জুড়ে
আকস্মিক একটি ঝরা সবুজ পাতার লুটিয়ে যাওয়া।
শরীরের সান্নিধ্য ছুঁতেই অনুভূতিরা দুরন্ত বিপ্লবে ব্রত
বোধের চেতনায় নাড়া দেয় জাগরণের জাগ্রতা,
এ যে সবুজ পাতার লুটিয়ে যাওয়া নয়
ঝরে গেলো একটি জীবন।
দন্ডায়মান বৃক্ষটি যেন যাপিত পৃথিবী
আর ঝরা পাতাগুলোর বিদায়ী মরণ ব্রত সাধনা।
তখন বুঝলাম ট্রাকের চাকায় পাতার হুড়োহুড়ি
এ যেন মরণ মৃত্যুর মিছিল।
প্রতিনিয়ত আমরা যেমন ধাবিত হচ্ছি
নিশ্চিত সেই গন্তব্য যাত্রায়।
অনুভূতিগুলো নাড়া দেয়মরণ মিশন যাত্রার যাত্রী হয়েও
বেঁচে থাকার ক্ষণিক বাহনে চলতেই আমাদের শত তাড়া।
অথচ অনুভুতিগুলো বলে গেলো
আমি চলছি সামনে ধাবমান সেই সুনিশ্চিত মৃত্যুর দিকেই।
এনাম রাজু
এক কাতারে হাসি-কান্না
প্রেমের মৃত্যুঘুম পেয়েছে আজ
বেহুলার নেই তাই সতীত্ব বড়াই
নিকোটিন বাতাসে পৃথিবী ছেয়েছে
নষ্টরাজ রক্তসরাবে গলা ভিজাতে করছে লড়াই।
তনুর শরীর যেনো ছিলো কারো জিহ্বায়
পেয়ারা স্বাদে ছোঁয়া খাবার কিছু!
ভুলে গেছি আজ তাই তুমি ও আমি,
ভুলে গেছি জিয়াদের রক্তের ঘ্রাণ।
কার জন্য কে আজ করবে শুরু
শ্লোগানে, আস্ফালনে ফাটাবে গলা ?
যার যার তার তার এইতো প্রাণ, এই যেনো সব।
প্রতিদিনি ঘামে ভরে কতো জীবন্তটিস্যু
এগুলো সামনে টেনে কি লাভ বলো
হরতাল, আন্দোলনে রাস্তায় জ্যাম করা ভুল
তার থেকে পেছনে না ফিরে সামনে চলো।
নদীতো বর্ষায় হবেই পোয়াতি
তাতে ভেসে যাবে কিছু মানুষের সুখ
সেও শুকিয়ে যাবে আর্তনাদে
বুঝতে পারবে তখন সবাই- সুসময় দিয়েছে কতটা দুখ।
আবদুর রহমান
শিশির
প্রতিটি পাতার শিশির ফোঁটায়
রয়েছে জমা।
শত বছরের কান্না বেদনা॥
গহিন কালো নিশিতে
জ্বলে বেজা আখিতে।
ক্ষুধার্ত পাখির আর্তনাদের চিৎকার
শুনেনিতো কেউ একবার।
রেল লাইনে কতো চাকার আঘাত
ইটের ভাটায় কাদা মাটির নীরব চিৎকার
ভাবেনিতো কেউ একবার॥
নিশ্চুপ বট বৃক্ষ দাঁড়িয়ে
ক্ষত বিক্ষত ঘোটা শরীরে॥
বেদনার প্রতিটি পুরস্কার
উপকারের প্রতিদান।
আলাউদ্দিন আদর
বসন্তের অভিলাষ
ফুল ফুটেছে ফুল ঝরেছে; এভাবে আমি-
পঁচিশটি বসন্ত প্রতীক্ষায় কাটিয়েছি!
বেশি কিছু পাওয়ার অভিলাষ আমার
কখনো ছিল না; আজো নেই।
উন্নয়ন প্রকল্পের বাজেটের মত সময়ের সাথে চাহিদা বাড়াইনি!
যে বসন্তে প্রথম বিবেক সুখ টের পেয়েছি,
প্রথম তোমায় কল্পনা করতে শিখেছি;
আজো, সেই তোমাকেই কল্পিত রূপে বাস্তবে পেতে চাই শুধু।
হ্যাঁ, তোমার জন্য শুধু তোমার জন্যই-
পঁচিশটি বসন্ত প্রতীক্ষায় কাটিয়েছি!
তুমি বসন্তেও ফুল হাতে খোলা চুলে আলতা পায়ে হেঁটে আসবে
কিংবা শীতে ঝরে পড়া রঙবেরঙের শুকনো পাতা
মরমর শব্দে মাড়িয়ে আসবে
অথবা কৃষ্ণচূড়ার পাপড়ি বিছানো পথে ধীরে লয়ে এগিয়ে আসবে;
আমি মুগ্ধ নয়নে অপলক চেয়ে থাকবো।
বিশ্বাস করো, শুধু এই আশায় আমি,
পঁচিশটি বসন্ত প্রতীক্ষায় কাটিয়েছি!
প্রদীপ প্রোজ্জ্বল
অপদস্থ সময়
ঘড়ির কাঁটা যখন রাত বারোটার দ্বারে থামিয়ে গেল
কবিতার আদল এসে
নিঃশব্দে আঘাত শুরু করে- অপদস্থ সময়
ভেঙে যায় কাব্য ভাষার প্রাসাদের চতুর্দিক-
কলমের কালো দাগ কাগজের বুকজুড়ে যৌবনবর্তী
এঁকেছিল জরাজীর্ণ সময়ের কলঙ্কশব্দ
হঠাৎ মস্তিষ্কে এসে পড়লো অদৃশ্য কর এক বাড়ি
সাথেসাথে টেবিলে নত মাথায় পুঁতে পড়ে জাগ্রত ডাক
ভাষা সৈনিকের অসমাপ্ত সময়ের চেতনার আহল।
ইয়াসিন মাহমুদ
হারিয়ে যাওয়া ডায়েরির খোঁজে
পোস্টারে লেপ্টে থাকা রাত্রি
নির্ঘুম সেসব প্রহর স্মৃতির পাতা থেকে যে মুছে গেছে তা বলবো না
বরং ভুলে যাওয়ার মাঝে এক অনাবিল প্রশান্তি।
নিঃস্তব্ধ পৃথিবীতে কেবল রাত জাগা পাখির ঠুসঠাস শব্দ খেলার সেই অভিযান
কিংবা ভোরের পাখির কলতানে পাড়া জাগানো, সাড়া জাগানো
সে সবই এখন ছেলেবেলার দুরন্তপনা খেয়ালি হয়ে গেলো!
রাত জেগে জেগে ডায়েরির পাতা ভরা সেই কবিতার বাগান
এখন অনেকটা মরুভূমি, সেচ দানে ব্যর্থ মালীর মুখে এখন মাছির রিনিঝিনি শব্দ।
একটি কবিতাকে সাজানোর জন্য ব্যস্তময় পেরেশানির সে কি হাহাকার ছিলো
বুকের মাঝে লুকিয়ে রাখতে হতো কষ্টের গদ্য।
শুধুই তো একটি কবিতার জন্য।
ঠাসা ঠাসা শব্দের সাজানো সে কবিতার ডায়েরিটা হারিয়ে গেলো,
সেই থেকে আজ অবধি অপেক্ষা সেই ডায়েরিটার জন্য।
সেই শুভাকাক্সক্ষীর জন্য কত যে অপেক্ষা আমার।
নাকি সে প্রাপকের দফতর ভুলে গেছে।
রফিক রইচ
ত্যাগ ও সৃষ্টির জাইগোটের জনক
নিষিক্ত জাইগোটের নিবিড় বিস্তারে বেঁচে থাকে উন্নত জীব
জীবের বংশ, বংশের অস্তিত্ব।
তাই মানুষের মাঝে বেঁচে থাকে মানুষ,
মানুষের বংশ ও মানুষের বংশের অস্তিত্ব।
মানুষের মাঝে মিশে যায় মানুষ যমুনার জলের মত।
বাবা-মায়ের মুখের মত পরিচিত কত কাছের মানুষ অদেখা মানুষের মত-
অপরিচিত হয়ে ওঠে সময়ের বিবর্তনে।
কিছু কিছু মানুষ জৈবিক জাইগোটের ব্যাপন ঘটিয়েও-
অহর্নিশি করে যায় মানুষের মাঝে ত্যাগ ও সৃষ্টির জাইগোটের ব্যাপক বিস্তার।
ত্যাগ ও সৃষ্টির প্লাবন প্লাবিত করে ভরা জোসনার আলোর মতন-
দেশ থেকে দেশ মহাদেশ এবং বিশ্বময়।
তাই তারা বেঁচে থাকে মানুষের মাঝে অতিমানুষ হয়ে অতিসাধারণ বেশে।
মানুষেরা অতিমানুষের ত্যাগ ও সৃষ্টির আলোকিত প্লাবনে-
প্লাবিত হয়ে ছোট অতিমানুষ হয়ে বাঁচতে ও টিকতে।
খুঁজে ফেরে দিগি¦দিক ত্যাগ ও সৃষ্টির জাইগোটের জনক কে।
এভাবেই কেউ কেউ যুগ যুগ ধরে অতিমানুষ হয়ে বাঁচে মানুষের মাঝে।
মিশে যায় না বা অপরিচিত হয়ে ওঠে না সে-
শুধু জৈবিক জাইগোট বিস্তারকারী যান্ত্রিক মানুষের মতন।