আল মাহমুদ বাংলাসাহিত্যের খ্যাতিমান কবি। খ্যাতি শুধু নামে নয়, শিল্প সুষমায়ও। তাঁর রচিত ছোটগল্প ও কবিতা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হলেও উপন্যাসকেন্দ্রিক আলোচনা-গবেষণার পরিসর সীমিত। কবি আল মাহমুদ রচনা করেছেন মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক দু’টি সফল উপন্যাস (উপমহাদেশ, কাবিলের বোন)। আলোচ্য প্রবন্ধে আমরা তাঁর এ দু’টি উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিত উপস্থাপন করব।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে কেন্দ্র করে অনেক উপন্যাস রচিত হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- শহীদ আনোয়ার পাশার রাইফেল রোটি আওরাত (১৯৭১), শওকত ওসমানের জাহান্নাম হইতে বিদায় (১৯৭১), দুই সৈনিক (১৯৭৩), নেকড়ে অরণ্য (১৯৭৩), জলাঙ্গী (১৯৭৪), সৈয়দ শামসুল হকের নীল দংশন (১৯৮১), সেলিনা হোসেনের হাঙর নদী গ্রেনেড (১৯৭৬), শওকত আলীর যাত্রা (১৯৭৬), রশীদ হায়দারের খাঁচায় (১৯৭৫), আমজাদ হোসেনের অবেলায় অসময় (১৯৮৬), মাহমুদুল হকের জীবন আমার বোন (১৯৭৬), রাবেয়া খাতুনের ফেরারী সূর্য (১৯৭৫), হুমায়ুন আহমদের শ্যামল ছায়া, ১৯৭১, সৌরভ, আগুনের পরশমণি, অনীল বাগচীর একদিন, সূর্যের দিন, ইমদাদুল হক মিলনের ঘেরাও, কালো ঘোড়া, বালকের অভিমান, মহাযুদ্ধ, নিরাপত্তা হই, মঈনুল আহসান সাবেরের পাথর সময় (১৯৮৯), পরাজয় (১৯৯০), কেউ জানে না (১৯৯০), সতের বছর পর (১৯৯১) এবং আল মাহমুদের উপমহাদেশ (আগস্ট ১৯৯৩), কাবিলের বোন (ডিসেম্বর ১৯৯৩) প্রভৃতি।
অধিকাংশ মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক উপন্যাসে ঘটনা বিবৃত হয়েছে অনেকটা দর্শকের দৃষ্টিকোণ থেকে। স্বদেশ প্রেমের চেতনা ও গণমানুষের মুক্তির আকাক্সক্ষা তাৎপর্যপূর্ণ করে অনেকেই রূপায়ণ করতে সক্ষম হননি। মধ্যবিত্তসুলভ আত্মরক্ষা অধিকাংশ ঔপন্যাসিকের মানস-মজ্জায় প্রবাহিত। হানাদার বাহিনীর অত্যাচার, নির্যাতন, লুট, হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ-বলাৎকারের দৃশ্যই এসব উপন্যাসে অধিকভাবে রূপায়িত।
শহীদ আনোয়ার পাশার রাইফেল রোটি আওরাত, শওকত ওসমানের জাহান্নাম হইতে বিদায় এবং শওকত আলীর যাত্রা উপন্যাসে কতকগুলো মিল খুঁজে পাওয়া যায়। সেগুলো হচ্ছে বিষয়, পরিবেশ ও চরিত্রগত মিল। তিনটি উপন্যাসই বর্ণনামূলক এবং অনেকটা রোজনামচার মত। তিনটি উপন্যাসেরই কেন্দ্রীয় চরিত্র শিক্ষক, স্মর্তব্য যে উক্ত তিন জন ঔপন্যাসিকই ব্যক্তিগত জীবনে শিক্ষক ছিলেন, ফলে উপন্যাসত্রয়ে লেখকদের আত্মপ্রক্ষেপ ঘটেছে। তিনটি উপন্যাসেই কেন্দ্রীয় চরিত্রের মধ্যে বাঙালি মধ্যবিত্তসুলভ আত্মরক্ষা ও নিজে বেঁচে থাকার জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে পালিয়ে বেড়ানোর প্রবণতা রয়েছে। অথচ মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষশক্তির প্রতি এই তিনটি চরিত্রেরই রয়েছে অসীম মমত্ববোধ, মনে-প্রাণে এরা স্বাধীনকামী হলেও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে না, এমনকি চরম মুহূর্তে যুদ্ধের নেতৃত্বের আহবান (যাত্রা উপন্যাসে) এলেও।
শহীদ আনোয়ার পাশা ঢাকায় অবস্থান করে যেমন হানাদারদের হত্যাযজ্ঞের নারকীয় চিত্র তুলে ধরেন, ঠিক তেমনই পশুশক্তির আক্রমণের মুখে জাহান্নাম-সদৃশ স্বদেশ ত্যাগে শওকত ওসমান লেখেন জাহান্নাম হইতে বিদায় উপন্যাস। স্বদেশ ছেড়ে যাওয়ার পথে তিনি দখলদার বাহিনীর যে তান্ডবলীলা দেখেছেন, তারই বিবরণে সমৃদ্ধ এই উপন্যাস। মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদাররা বাঙালি নারীদের ওপর যে নির্যাতন ও ধর্ষণ চালিয়েছিল তারই প্রামাণ্যচিত্র নেকড়ে অরণ্য। সৈনিক উপন্যাসে মুক্তিসেনার এবং জলাঙ্গী উপন্যাসে মেঘনা নদীতে নির্যাতিতা হাজেরার কথা বর্ণিত হয়েছে।
গ্রামীণ পটভূমিতে রচিত সেলিনা হোসেনের হাঙর নদী গ্রেনেড-এ গ্রামের জনসাধারণের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের চিত্র প্রকাশিত হয়েছে। গ্রামের এক অশীতিপর বৃদ্ধা নিজের বোবা সন্তানকে অস্ত্রসহ ছেড়ে দেন হাঙররূপী হানাদার বাহিনীর সামনে। ফলে একটি গ্রাম ও মুক্তিকামী জনগণ আপতিত বিপদ থেকে রক্ষা পায়। পাড়াগাঁর এক অশিক্ষিতা বৃদ্ধা হয়ে ওঠেন সমগ্র দেশের গণমানুষের প্রতিনিধি। রশীদ হায়দারের খাঁচায় উপন্যাসে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ে অবরুদ্ধ ঢাকা নগরীর শ্বাসরুদ্ধকর মধ্যবিত্ত জীবনের ছবি পরিস্ফুটিত হয়েছে।
সৈয়দ শামসুল হকের নীল দংশন ও নিষিদ্ধ লোবান উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের আখ্যান থাকলেও তা অত্যধিক মাত্রায় যৌনতাড়িত। হানাদার বাহিনীর অত্যাচারের (গ্রাম জ্বালানো, মানুষ হত্যা, লুণ্ঠন, গরু-ছাগল জবাই, ধর্ষণ) চিত্র দেখাতে গিয়ে লেখক মনোবিকলনতত্ত্বের দিকেই বেশি নজর দিয়েছেন। মাহমুদুল হকের জীবন আমার বোন উপন্যাসে মধ্যবিত্তের জীবন-যাত্রা ও আশা-আকাক্সক্ষা প্রতিফলিত। মধ্যবিত্ত যুবকরা চা স্টলে আড্ডা দেয়, রাজনৈতিক সঙ্কট নিয়ে আলোচনা করে, কিন্তু কেউই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে না। এই উপন্যাসেও প্রাধান্য পেয়েছে লিবিডো চেতনা। আমজাদ হোসেনের অবেলায় অসময় উপন্যাসে যুদ্ধকালীন পরিবেশে নদীপথে এক মাঝির নৌকায় ভেসে চলা যাত্রীদের অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত হয়েছে। শওকত আলীর যাত্রা উপন্যাসেও দেখা যায়- সবাই যাচ্ছে ঘরবাড়ি ফেলে দিয়ে, কিন্তু সে পালানোর মধ্যে তাদের প্রতিরোধের মনোবল রয়েছে; যদিও শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধের চেতনা নিঃশেষ হয়ে যায়।
হুমায়ুন আহমদের মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসগুলিতে যুদ্ধকালীন দুর্গত বাংলাদেশের ছবির পাশাপাশি স্বপ্ন ও নতুন মূল্যবোধের সাহসী ও প্রতিবাদী মানুষের মুখচ্ছবিও প্রকাশিত হয়েছে। শ্যামল ছায়ার কাহিনী গড়ে উঠেছে একটি থানা অপারেশনকে কেন্দ্র করে। থানা অপারেশনে যাত্রাকালে মুক্তিযোদ্ধাদের কথোপকথনে দুর্গত বাংলাদেশের জীবন্তচিত্র পরিস্ফুটিত হয়েছে। ১৯৭১ এর কাহিনী নির্মিত হয়েছে বাংলাদেশের একটি হতদরিদ্র গ্রাম নিয়ে। যে গ্রামের অসংখ্য নিরীহ মানুষ অকাতরে প্রাণ দিয়েছে হানাদার বাহিনীর গুলিতে। সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিচেতনা থেকে পাকিস্তানি সৈন্যরা যে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর অকথ্য ও নির্মম অত্যাচার করেছে তার জ্বলন্ত উদাহরণ অনীল বাগচীর একদিন উপন্যাস। একাত্তরের রক্তাক্ত সময়ে বাঙালি শুধু সাহসী ও প্রতিবাদী হয়নি, প্রতিরোধও গড়েছে। রক্তাক্ত সময়ের ওপর দাঁড়িয়েই বাঙালি অংশ নিয়েছে মুক্তিযুদ্ধে, আকাক্সক্ষা করেছে একটি নতুন ভোরের- নতুন সকালের; সে সকাল কখন আসবে তা হয়তো জানা নেই। এরই যথার্থ প্রতিফলন লক্ষণীয় সৌরভ ও আগুনের পরশমণি উপন্যাস দু’টিতে। এই উপন্যাস দু’টি গ্রামকে ছাড়িয়ে অবরুদ্ধ ঢাকা শহরের পরিধি নিয়ে রচিত।
ইমদাদুল হক মিলন তাঁর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসগুলোতে স্বাধীনতা সংগ্রামকে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর উপন্যাসে যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধোত্তর সময়ও চিত্রিত হয়েছে। ঘেরাও উপন্যাসটিতে একদিকে সেক্স-প্রেম, অন্যদিকে যুদ্ধ; প্রেমকে উপেক্ষা করে নায়ক এক পর্যায়ে হানাদারদেরকে ঘেরাও করতে বেরিয়ে পড়ে। মহাযুদ্ধ উপন্যাসের পটভূমি স্বাধীনতা-উত্তর ১৯৭২ সালের ঘটনাকেন্দ্রিক। মুক্তিযোদ্ধাদের সামাজিক অস্থিতিশীলতা লেখক বাস্তবতার আলোকে চিত্রিত করেছেন। নিরাপত্তা হই উপন্যাসে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ পীড়িত সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন কাহিনী বিবৃত হয়েছে। মন্টু নামে নিঃস্ব মুক্তি সেনাকে বাঁচার তাগিদে আবারও অস্ত্র হাতে নিতে হয়েছে। গ্রামীণ পটভূমিতে রচিত কালোঘোড়া উপন্যাসে স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং তার পরবর্তীকালের সামাজিক অবক্ষয়কে চিত্রিত করা হয়েছে। কালেঅঘোড়া এখানে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীকী ব্যঞ্জনায় ব্যবহৃত হয়েছে। একজনা উপন্যাসে ১৯৭১ সালে পথে পাওয়া এক অনাথা বালিকার জীবনচিত্র বর্ণিত হয়েছে। বালকের অভিমান উপন্যাসে যুদ্ধোত্তর সামাজিক অবক্ষয়ের কথা চিত্রিত হয়েছে। মঈনুল আহসান সাবের তাঁর মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক উপন্যাসগুলিতে স্বাধীনতা-উত্তর কালে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্কটকেই রূপায়িত করেছেন।
আল মাহমুদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস খুব বেশি নয়, মাত্র দু’টি; উপমহাদেশ ও কাবিলের বোন। এ দু’টি উপন্যাসে আর মাহমুদ উপর্যুক্ত লেখকদের তুলনায় ভিন্ন দৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধকে রূপায়িত করেছেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত হয় মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি রচনায়, সম্মুখ সমরের শ্বাসরুদ্ধকর বর্ণনায় এবং স্বাধীনতা-উত্তর বাস্তবতার জিজ্ঞাসায়। আল মাহমুদ ব্যতীত অন্য কোন ঔপন্যাসিক স্বাধীনতা আন্দোলনের পটভূমি একই গ্রন্থে সন্নিবেশিত করেননি। ষাটের দশকের উত্তাল গণ-আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং মুক্তিযুদ্ধকে তিনি একটি কার্যকারণসূত্রে বিবৃত করেছেন কাবিলের বোন উপন্যাসে। উপমহাদেশ উপন্যাসে দেখা যায় স্বদেশত্যাগী মানুষের করুণ দুর্দশা, হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ এবং মুক্তিকামী মানুষের সশস্ত্র সংগ্রাম; প্রেম-কাম-রক্ত সবকিছু একাকার হয়ে আছে তাঁর এ উপন্যাসে। মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে লেখকের যে অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছিল, সেই বাস্তব অভিজ্ঞতাই লেখক আলোচ্য উপন্যাস রচনায় ব্যবহার করেছেন। বলা যায়- তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে দু’টি উপন্যাসের প্রতিটি ঘটনা হয়ে উঠেছে জীবন্ত।
কাবিলের বোন উপন্যাসের কাহিনী আবর্তিত হয়েছে সৈয়দ আহমদ কাবিলকে কেন্দ্র করে। নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান কাবিল ঢাকায় এসে ধনী চাচার আদরের দুলাল হয়ে যায়। মেধাবী ছাত্র কাবিল জড়িত হয়ে পড়ে ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলনে; চলে আসে নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে। ডাকসুর সহকারী সম্পাদকও নির্বাচিত হয়। কাবিলের রাজনীতিকে লেখক নিম্নভাবে উদ্ধৃত করেছেন-
উনিশ শ’ ঊনসত্তর সাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রলীগের একটি ক্ষুদ্র মিছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকারের দাবিতে শ্লোগান দিতে দিতে গুলিস্তানের দিকে এগোচ্ছিলো।… মিছিলের একেবারে পুরোভাগে কাবিল ও রোকসানা পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছিল। (পৃ. ৬৮)
ছয়দফা দাবির জনপ্রিয়তা সৃষ্টির পেছনে ১৯৬৭-৬৮-৬৯ সালে ব্যাপক ভূমিকা ছিল ছাত্রলীগের। কম্যুনিস্ট প্রভাবিত ছাত্র সংগঠনগুলো তখনও পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনে ব্যাপকভাবে সাড়া দিতে প্রস্তুত নয়। চীনের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কের কারণেই চীনপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলো ছাত্রলীগের দাবি নিয়ে প্লাটফর্মে আসতে চায়নি। অপর দিকে ছাত্রলীগের নেতৃত্বের যে অংশটা পূর্ববাংলার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন চায়, কাবিল তাদেরই নেতৃস্থানীয়। গণ-আন্দোলনকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে সরকার তাই কাবিলের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। লেখকের ভাষায়-
শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা সাজানোর বিষাক্ত প্রতিক্রিয়াই হলো কাবিলের মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী ছাত্রনেতার উত্থান। এখন এই সব জাতীয়তাবাদীদের আর কিছুতেই জেলের বাইরে রাখবে না বলেই যেন সরকার প্রতিজ্ঞা নিয়েছে। (পৃ.৭৬)
ছাত্র-আন্দোলনের কেন্দ্রীয় চরিত্রে অবস্থানের কারণে এদেশের ছাত্ররাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা-হঠকারিতা কাবিলকে শঙ্কিত করেছে। কাবিল বারবার কারাবরণ করলেও তার আদর্শের সঙ্গে কখনও আপস করেনি। বরং কারাগার থেকে বেরিয়েই তার মহান নেতা শেখ মুজিবের সাথে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সফরে গিয়েছে। পাকিস্তান ভাঙনের পূর্বমুহূর্তে কাবিল তার অবাঙালি চাচী রওনক জাহানের মনোবেদনা জ্ঞাপন করলে শেখ সাহেব বলেছেন-
তোর চাচীকে বলবি, যারা পাকিস্তান তৈরি করেছিল, আমিও তাদেরই একজন। তোর চাচী বা অবাঙালি আত্মীয়দের কোনো ভয় নেই। পাকিস্তান অন্তত বাঙালিদের হাতে ভাঙবে না। তেমন দুর্ভাগ্য কোনদিন যদি দেশের ওপর নেমে আসে তা আনবে পশ্চিম পাকিস্তানের সেনানায়করা। (পৃ.১৯৬)
সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ে ঢাকা মহানগরীতে আনন্দের জোয়ার প্রবাহিত হয়। সবার মুখেই নির্বাচনে জয়ের মুখরোচক আলোচনা। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে এই নির্বাচন ছিল সব দিক দিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। এই নির্বাচনে বিজয়ের পেছনে যেসব ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ছায়াসঙ্গী হয়ে সারা দেশে সফর করেছে, কাবিল তাদের মধ্যে অন্যতম। নির্বাচনে বিজয়ে তাই তার শ্রম সার্থক হয়েছে।
নির্বাচনে বিজয়ের ১৫ দিন পরই কাবিলের সহপাঠিনী ও রাজনৈতিক সহযোদ্ধা আঞ্জুমানের বিয়ে হয়েছে মেধাবী ছাত্র নিসারের সঙ্গে। কাবিল ও রোকসানা তাদের বিয়ের আয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সেই বিয়ের আসরেও আলোচ্য বিষয় হয়েছে সমকালীন রাজনীতি। যেমন-
সবার মুখে একই আলোচনা এবং আশঙ্কা যেন ছড়িয়ে আছে। নির্বাচন ত ভালয় ভালয় হয়ে গেল, এখন ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রসেসটা কি হবে? আদৌ কি শেখ সাহেব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবেন, না ইয়াহিয়া-ভুট্টো তথা পাকিস্তানি পুঁজিপতিও সামরিক চক্র অন্য কোনো মতলব আঁটছে? (পৃ. ২২৬)
সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়ের পর মালিবাগে এক জনসভায় শেখ মুজিবের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী অধ্যাপক গোলাম আযম ইয়াহিয়া খান ও ভুট্টোকে উদ্দেশ করে বলেন-
শেখ সাহেবের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে প্রমাণ করুন আপনারা পাকিস্তানের শুভাকাক্সক্ষী। … অবিলম্বে তার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা জেনারেল ইয়াহিয়ার কর্তব্য। (পৃ. ২৪০)
নির্বাচনের পর শেখ মুজিবের কাছে পাক-সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর না করে, শুধু কালক্ষেপণ করতে থাকেন। প্রশাসনের এই কালক্ষেপণকে দেশের বুদ্ধিজীবীমহল সুদৃষ্টিতে গ্রহণ করেননি। তাদের মনে সংশয় দেখা দিয়েছে। যার ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন ছাত্রসমাজ স্বাধীনতার দাবি তুলে ছোটখাটো মিছিল-মিটিং আরম্ভ করেছে। ইতোমধ্যে পালাক্রমে চলতে থাকে ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর সংলাপের প্রহসন। তখনই ছাত্রসমাজ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির উদ্দেশে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, ইতোমধ্যে তা ক্যাসেটবদ্ধ হয়ে নগরীর মোড়ে মোড়ে বাজতে থাকে। ওই ভাষণ সারাদেশের জনসাধারণের মনে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে। এমনি মুহূর্তে ২৩ ও ২৪ মার্চ ভুট্টো শেখ মুজিবের সঙ্গে আলাপ করে পাকিস্তান ফিরে গেলে জনগণের মধ্যে সংশয় বৃদ্ধি পায়।
একদিকে অজানা আশঙ্কায় অবাঙালি-মোহাজির জনগণ সারাদেশ থেকে ঢাকার মোহাম্মদপুরে এসে জমায়েত হয়, অন্যদিকে চলে সংলাপের নাটক। ২৪ মার্চে কাবিল শেখ সাহেবের সঙ্গে কথা বলে বাসায় ফিরতে রাত ১১টা বেজে যায়। ২৫ মার্চ সকাল থেকে নেতার সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে ক্যাম্পাসে বা মধুর ক্যান্টিনে যাওয়ার গুরুত্ব অনুভব করে সে।
কাবিল পারিবারিক কিছু কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে ক্যাম্পাসে ছুটে যায়। সে ক্যাম্পাসে যাওয়ার পথে বুঝতে পারে আজ ঢাকা যেন এক অপেক্ষার শহর। ঘরে ঘরে গুমোট বেঁধে আছে ক্রোধ, অপেক্ষা আর গুজব। ঢাকাকে মধ্যযুগীয় কোন নগরীর প্রধান ফটক আটকে দেয়া অরক্ষিত দুর্গের মত তার মনে হচ্ছে। যেন হালাকু খাঁর আক্রমণ আশঙ্কায় অপেক্ষমাণ আব্বাসীয়দের অক্ষম বাগদাদ নগরী। কাবিল ক্যাম্পাসে গিয়ে খন্ড খন্ড মিছিল দেখতে পায়, সে অপেক্ষাকৃত একটা বড় মিছিলে শরিক হয়ে যায়।
২৫ মার্চ রাত ১২টায় প্রচন্ড গোলাগুলির শব্দে শহরবাসীর ঘুম ছুটে যায়। শব্দের প্রচন্ডতা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। মেশিনগান, রাইফেল, মর্টারের একটানা সক্রিয় বর্ষণের সাথে আকাশে ফটফট করে আলোর ছত্রাক ফেটে ভয়ার্ত শহরকে ক্ষণস্থায়ী আলোতে ভাসিয়ে মৃত্যুর বিভীষিকা দেখাচ্ছে। হামলা হচ্ছে রামকৃষ্ণ মিশন রোড, টিকাটুলি, শান্তিনগর, লালবাগ, ইসলামপুর, নবাবপুর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সমগ্র ঢাকা মহানগরীতে। সেই ভয়ঙ্কর রাতে হামলার কিছুক্ষণ পূর্বে কাবিল রোকসানাকে টেলিফোনে জানায় যে, সে আঞ্জুমানসহ ঢাকার বাইরে চলে যাচ্ছে। কেননা লিডারের নির্দেশ রয়েছে। আর এই রাতেই আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হানাদার বাহিনীর হামলায় প্রথমেই শহীদ হয় আঞ্জুর প্রাণপ্রিয় স্বামী নিসার।
বিধ্বস্ত মৃত নগরীর ওপর ছাব্বিশে মার্চের সূর্য উদিত হলে প্রথমেই হার্টফেল করে মারা যান কাবিলের চাচি রওনক জাহান। তাঁকে দাফন শেষে জীবন বাঁচানোর তাড়নায় পরদিনই রোকসানা ও আন্দালিব পাকিস্তান পাড়ি জমায়। অন্য দিকে ২৫ মার্চ রাতেই আঞ্জুমান ও কাবিল বুড়িগঙ্গা পেরিয়ে জিনজিরায় গিয়ে প্রাণ বাঁচায়। পরদিন কাবিলদের বহনকারী পলায়নপর নৌকা ভৈরব বাজার পেরিয়ে প্রবল ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে মেঘনা ছেড়ে তিতাসের খাড়িতে আশ্রয় নেয়। তাদের পরিকল্পনা হলো, ঝড়-বৃষ্টি কমলে আগরতলা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে গমন। তারা সেই ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্যেই শুনতে পায় মেজর জিয়া বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। স্বাধীনতার ঘোষণা শুনে কাবিল মহান স্রষ্টার দরবারে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। তার ভাষায়-
আল্লাহর কাছে হাজার শোকর। পঁচিশে মার্চের রাতে আমরা তাহলে শেষ হয়ে যাইনি।
স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হয়েছে। জয় বাংলা আঞ্জু, জয় বাংলা।
(পৃ. ৩২৯)
আঞ্জুও শপথ নিয়েছে যুদ্ধের।
আমি আমার স্বামীর মৃত্যুর প্রতিশোধ চাই কাবিল ভাই। এই যুদ্ধে যেভাবেই হোক আমাকে থাকতে হবে। (পৃ. ৩২৯)
কাবিলের অনিশ্চিত যাত্রার মধ্য দিয়েই উপন্যাসের ৩৭ পরিচ্ছেদ এবং চতুর্থ পর্বের সমাপ্তি ঘটেছে। এরপর শুরু হয়েছে বিজয়কালীন মূল্যায়ন ও ঘটনাপ্রবাহ। দীর্ঘ নয় মাসব্যাপী যে মুক্তি সংগ্রাম হয়েছে তার প্রত্যক্ষ বিবরণ রয়েছে উপমহাদেশ উপন্যাসে। এজন্যই লেখক এখানে (কাবিলের বোন উপন্যাসে) যুদ্ধকালীন ঘটনা বিবৃত করেননি।
সুদীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ শেষে ১৫ ডিসেম্বর কাবিল, আঞ্জুমান ও তার সহযোদ্ধারা ঢাকার ডেমরায় এসে হাজির হয়। এসেই দেখতে পায় মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়োল্লাস। কাবিলের দলে যারা যুদ্ধ করে দেশে ফিরে এসেছে, তারা অধিকাংশই তরুণ; বিশ-বাইশ বছরের ছেলে। পাক-হানাদারদের নির্বিচার জুলুমের প্রতিবাদে এরা দেশত্যাগ করে ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে নাম লিখিয়েছে। এরাই ছিল প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। এদের কোন মোটিভেশনের প্রয়োজন ছিল না। ভাটি বাংলার কিষাণ, মাঝি, দিনমজুর, ঘরামি, কুমার, জেলে, তাঁতির ছেলেরা পল্লী মায়ের লুণ্ঠিত ইজ্জত-আবরু ছিন্নভিন্ন হওয়ার চাক্ষুষ দৃশ্য দেখে আর এক মুহূর্তও স্থির থাকতে পারেনি। তারা হানাদার প্রতিরোধের যুগোপযোগী অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল এবং এশিয়ার প্রতাপশালী নিষ্ঠুরতম সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত করে স্বাধীনতার পতাকা সমুন্নত করতে যাচ্ছে। ১৬ ডিসেম্বরে হানাদার বাহিনীর স্যারেন্ডার দেখার জন্য সবাই তাই ব্যাকুল। অপরদিকে হানাদার বাহিনীর স্যারেন্ডার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক মেজর আতাউল গনি ওসমানীর কাছে না হয়ে মিত্রবাহিনীর কাছে হওয়ায় কাবিল ও তার দলের সদস্যরা তা পছন্দ করতে না পেরে যার যার মত বাড়ির দিকে পা বাড়ায়।
১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জিত হওয়ার পর কাবিল তার বাসায় গিয়ে দেখে সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। চাচী মৃত্যুবরণ করেছেন। ঘরবাড়ি লুট হয়েছে। রোকসানা ও আন্দালিব জীবন বাঁচানোর তাড়নায় পাকিস্তান গিয়েছে এবং তারা সেখানেই ঘর বাঁধার কথাও জানিয়ে গেছে। আর কাবিলের প্রতি অনুরক্তা মোমেনাকে বিয়ে করার অনুরোধ করে চিঠিও লিখে রেখে গিয়েছে। কিন্তু মোমেনা যখন কাবিলকে প্রত্যাখ্যান করলো, তখন তার আর কিছু রইলো না একমাত্র মক্তিযুদ্ধ ছাড়া। এজন্য সেই সময়ে আঞ্জুমান বারবার বলেছে- কাবিল ভাই, তুমি আমাকে গ্রহণ কর, নইলে মুক্তিযুদ্ধের যেটুকু তোমার মধ্যে আছে, তা বরবাদ হয়ে যাবে। দুই মুক্তিযোদ্ধার মিলন দেখিয়ে লেখক মুক্তিযুদ্ধকে গৌরবময় করতে চেয়েছেন। উপন্যাসের শেষাংশে লেখক চরম বিপর্যয়ের মধ্যেও চরম সফলতার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছেন। কেননা, বীর মুক্তিযোদ্ধারা স্বজন হারানোর বেদনায় যখন মুহ্যমান, ভবিষ্যৎ জীবন সম্পর্কে সন্দিহান; ঠিক সেই মুহূর্তে দুই সর্বস্বহারা সহযোদ্ধার মিলনে নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছেন। যে দুই সহযোদ্ধা একসঙ্গে ছাত্ররাজনীতি করেছে, নয় মাসব্যাপী সংগ্রাম করেছে এবং হারিয়েছে স্বজনদেরকে; তাদেরই মিলিত প্রয়াসে যাত্রা শুরু করেছে স্বনির্ভর স্বাধীন বাংলাদেশ।
কাবিলের বোন উপন্যাসে বেশ কিছু জাতীয় নেতৃবৃন্দের অপ্রত্যক্ষ চরিত্র উপস্থিত হয়েছে, যেমন- মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ, হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তবে নেতৃবৃন্দের মধ্যে গ্রন্থে সর্বাধিকভাবে পরিস্ফুটিত চরিত্র হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠায় যেখানে কাবিল আছে, সেখানে শেখ মুজিব আছেন। কাবিলের কথাবার্তায়, তার শ্রদ্ধা-ভক্তিতে তিনি চিত্রিত হয়েছেন। শেখ মুজিব তখনকার সময়ে একটি ক্ষুদ্রতম দেশে সবচেয়ে আন্তর্জাতিক চরিত্র হিসেবে প্রস্ফুটিত হচ্ছিলেন। যদিও তিনি জাতীয়তাবাদী নেতা। সমগ্র বইয়ে অপ্রত্যক্ষভাবে এমন একজন জাতীয় নেতাকে চিত্রিত করা খুবই কষ্টসাধ্য। আল মাহমুদ সেই কষ্টকর পথ পাড়ি দিয়েছেন। তাঁর রচনায় শেখ মুজিবকে গৌরবান্বিত করেছেন। কেননা, তিনিই হচ্ছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার রূপকার।
উপমহাদেশ উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সুদীর্ঘ নয় মাসব্যাপী সশস্ত্র সংগ্রামের বাস্তবচিত্র। এই উপন্যাসের শুরু হয়েছে এভাবে, ‘অন্ধকারে হঠাৎ গুলির শব্দে নৌকাটা দুলে উঠল।’-সহায়-সম্পদহীন একদল মানুষের স্বদেশ ত্যাগের বর্ণনা দিয়ে শুরু হয়েছে এ আখ্যান। ৩৪ জন মানুষের একটি দল ভৈরব বাজারের নিকটবর্তী নারায়ণপুর এলাকা থেকে নৌকায় করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মুকুন্দপুর নদীর ঘাটে এসে অবতরণ করে। তাদের যাওয়ার লক্ষ্য আগরতলা। কিন্তু নৌকা থেকে অবতরণের পরই সিরাজ সিকদারের বাহিনীর হাতে গতিরুদ্ধ হয়। তারপর সেখান থেকে মুক্তি পেয়ে কিছুদূর যেতে না যেতেই রাজাকারদের কবলে পড়ে। রাজাকাররা তাদের সর্বস্ব লুণ্ঠন করে নেয়। ৩১ জনকে ছেড়ে দিয়ে কবি হাদী মীর, নন্দিনী ও সীমাকে নিয়ে যায় এক বাড়িতে। সেখানে সীমা ও নন্দিনীকে তারা ধর্ষণ করে, আর হাদী মীরকে শারীরিকভাবে প্রহার করে। পরদিন সকালে মুক্তিযোদ্ধারা এলে রাজাকারবাহিনী পরাস্ত হয় এবং তারা মুক্তি পায়।
মুক্তিবাহিনীর লিডার আনিস সারা গ্রাম চার্চ করে রাজাকার দলনেতার মেয়েকে ধরে নিয়ে আসে। আনিসও তাকে বলাৎকার করতে চাইলে কবি হাদী মীর তাকে বাধা দেন, কিন্তু কবির বাধার প্রত্যুত্তরে সে বলে- গতরাত আপনার সঙ্গিনীদের সাথে রাজাকাররা যা করেছে, আমরাও এর ওপর এখন তাই করব। ভয় নেই, এর বেশি কিছু করব না। … সরে যা শুয়োরের বাচ্চা। এটা অ্যাকশনের সময়। এখন আমার সামনে যেই দাঁড়াবে তাকেই ব্রাশ মেরে দেবো। এটা লড়াইয়ের স্পট, কবিতা ফবিতার জায়গা নয়। (পৃ. ৩৬)
ঔপন্যাসিক উক্ত কথোপকথনে বুঝাতে চেয়েছেন যে, যে কোন যুদ্ধে উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারীরা। তারা আকস্মিক দুর্ঘটনার প্রতিরোধ করতে পারে না বলেই তাদের ওপর নেমে আসে পাশবিক নির্যাতন, তাই সে হিন্দু হোক বা মুসলিম হোক; সাম্প্রতিক কালে বসনিয়ার নারীদের ওপর বর্বর সার্বদের নির্যাতন পাঠককে সে কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
আনিসের গালমন্দ শুনে ও লাঞ্ছিত হয়ে কবি হাদী মীর তার সঙ্গিনীদের নিয়ে ভারত যাওয়ার পথেই শত্রুর আকস্মিক গুলিতে সীমা নিহত হয়। নন্দিনী ও হাদী মীর অনেক কষ্টে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতের আগরতলায় গিয়ে উপনীত হন। সেখানে তাদের সাথে সাক্ষাৎ হয় কবির ভগ্নিপতি তৌফিক হাসান ইমামসহ ক্যাপ্টেন খালেদ মোশাররফের। ঢাকার কবি হাদী মীর ও নন্দিনী হাসান ইমামের সাথে কলকাতায় গিয়ে হাজির হয়। বিমানপথে কলকাতায় যাওয়ার প্রাক্কালে প্রায় দৈবভাবেই নন্দিনী তিন লক্ষ ভারতীয় রুপির একটা ব্রিফকেস পেয়ে যায়। বাসায় নিয়ে খুলে দেখে যে, চুয়াডাঙ্গার দর্শনা এলাকার আলী রেজা নামের এক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের কাছে পৌঁছানোর ব্যাপারে উক্ত ব্রিফকেসে একটা চিঠি রয়েছে, যা তাকে ভাবিয়ে তোলে।
অন্যদিকে কলকাতা যাওয়ার পর কবি হাদী মীর তার লেখকবন্ধু (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, আসাদ চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ, বেলাল মোহাম্মদ) দের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে আবেগে আপ্লুত হন। তারা এই বিপর্যয়কালীন পরিবেশে তার আপনজনের মতোই সহানুভূতি প্রকাশ করেন এবং লেখার জন্য অনুপ্রেরণা দেন। স্বীয় পতœী বীরাঙ্গনা হামিদা বানুর সঙ্গেও তার সাক্ষাৎ হয়। কিন্তু হামিদা চলে যায় রণাঙ্গনে। নন্দিনী তখন প্রাপ্ত টাকাগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের পৌঁছিয়ে দেয়ার ব্যাপারে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। কবির ভগ্নিপতির সহায়তায় তারা দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। ক্ষুদ্র একটি মুক্তিযোদ্ধা দল তাদেরকে দর্শনায় পৌঁছে দেয়।
দর্শনায় পৌঁছে তারা নাসরিন নাম্নী এক সশস্ত্র মহিলা ক্যাডারের বাসায় উপনীত হয়। সেখানেই সাক্ষাৎ ঘটে দলনেতা কমরেড আলী রেজার সাথে। কমরেড আলী রেজা কমরেড তোহার অনুসারী। তারাও দেশমুক্তির জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম করছে, তবে তাদের নেতা ভিন্ন। নন্দিনীরা দর্শনায় পৌঁছানোর পর কমরেড আলী রেজার নামে অজ্ঞাত ব্যক্তির পাঠানো টাকাগুলো হস্তান্তর করে এবং তারাও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের অভিপ্রায় ব্যক্ত করে। কমরেড রেজা তাদেরকে নিজের দলে অন্তর্ভুক্ত করেন এবং দু’ জনকেই দুই সমরক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেন। নন্দিনী আবার ফিরে যায় ভারতে ট্রেনিং নিতে, আর কবি হাদী মীর থেকে যান কমরেড রেজার সঙ্গে।
বিনা ট্রেনিংয়েই কবিকে সময়ের প্রয়োজনে ছুটে যেতে হয় রণাঙ্গনে। প্রথমেই তাকে পাঠানো হয় চুয়াডাঙ্গায় এক অসুস্থ মুক্তিসেনার চিকিৎসার্থে ডাক্তার আনতে। সেখানে গিয়ে ড্রাইভার আমিনের সঙ্গে তিনি ওঠেন কমরেড আদিনাথ মজুমদার ও কমরেড সবিতা মজুমদারের ভাঙা কুঁড়েঘরে। যারা নিজেদেরকে রাজাকার পরিচয় দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে খানসেনাদের সংবাদ আদান-প্রদানে সর্বদা নিয়োজিত। কমরেড আদিনাথের সঙ্গে কবি হাদী মীরের সংলাপে চীনপন্থী কম্যুনিস্ট পার্টির মনোভাব পরিস্ফুটিত হয়েছে। সেখানে কমরেড আদিনাথ জানিয়েছেন, নানা দল-উপদল থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধটা চালিয়ে যাওয়াই এখন প্রধান কর্তব্য।
যুদ্ধ চলাকালে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ ছিল দেশের মুক্তিকামী জনসাধারণের কণ্ঠস্বর। তাই দেখা যায় যে, কবি হাদী মীর চুয়াডাঙ্গায় কমরেড আদিনাথের বাড়িতে পৌঁছে এক ফাঁকে রেডিও নিয়ে সংবাদ শুনতে বসেছেন। খবরের কিছু অংশ নিম্নরূপ :
গতরাতে সিদ্ধিরগঞ্জ স্টেশনের কাছে এক আক্রমণে আমাদের বীর মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা ঢাকার সাথে বিদ্যুৎ সংযোগ ছিন্ন করে দিলে ঢাকা শহর অন্ধকারে ডুবে যায়।…
টাঙ্গাইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ ও ভৈরব মুক্তিবাহিনীর তৎপরতার মুখে দিশেহারা ঘাতক বাহিনী গাঁয়ের সাধারণ চাষি পরিবারগুলোর ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালাচ্ছে। যুবতী মেয়েদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে…।
সংবাদ শেষ হলে রেডিওতে গান শুরু হলো, একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি…। (পৃ. ১৫১)
চুয়াডাঙ্গা থেকে কবি হাদী মীর ডাক্তার নিয়ে ভিন্ন পথে দর্শনায় এসে উপস্থিত হন। এসেই জানতে পারেন হানাদার বাহিনী নাসরিনকে অপহরণ করেছে। নাসরিনকে উদ্ধারের সশস্ত্র সম্মুখ সমরে কবিও অংশগ্রহণ করেন। মুজিববাদী গ্রুপ, মোজাফ্ফর গ্রুপ ও কমরেড রেজার গ্রুপের সর্বমোট ৭১ জন মুক্তিযোদ্ধা সব মতপার্থক্য ভুলে নাসরিনকে উদ্ধারের জন্য এগিয়ে আসেন। কবি হাদী মীর যদিও অস্ত্র চালাতে জানতেন না, তথাপি কমরেড রেজা দ্রুত তাকে পিস্তল চালানো শিখিয়ে দিয়েছেন। শত্রুপক্ষে ছিল ৩৫ জন সৈন্য, যারা একটি স্কুলে আশ্রয় নিয়ে নাসরিনের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালাচ্ছিল। সম্মুখ সমরের বর্ণনায় লেখক বলেন-
রাত সাড়ে তিনটার দিকে আমরা দর্শনা হল্ট প্রাথমিক বিদ্যালয়টিকে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেললাম। … প্রচন্ড শব্দে ব্যাটারি কার্যকর হয়ে উঠলে আমি আচমকা মাটি থেকে মাথা ওপরে তুললাম। কোথায় সে সার্চ লাইট আর কোথায় সেই স্কুল ঘর কিছুই বুঝতে পারছি না। শুধু মাঠটার চারদিক থেকে আচমকা শুরু হয়েছে ধারাবাহিক এলএমজির ফটাফট শব্দ। এর মধ্যে কামান একটু বিরাম দেয়া মাত্রই শুনতে পেলাম স্থান বদলের ইঙ্গিত।… এবার মাঠের মধ্য থেকে একঝাঁক গুলি আমাদের দেহের ওপর দিয়ে শিস্ তুলে চলে গেল।… মাঠের চারদিক থেকেই লাইট মেশিনগান ও চাইনিজ রাইফেলের গুলির শব্দ উঠছে। এর মধ্যেই আলী রেজা আমার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললেন, ‘এনিমি প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।’ (পৃ. ১৫৬-১৫৯)
এই লড়াইয়ে আলী রেজার ৬ জন দক্ষ সৈনিক শাহাদাৎ বরণ করেন। শত্রু বাহিনীর ৩ জন ব্যতীত বাকি ৩২ জন নিহত হয়। হানাদার বাহিনী কর্তৃক ধর্ষিত নাসরিনকে তারা সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় উদ্ধার করে। তারপর তাকে সুস্থ করার জন্য কবি হাদী মীরের সঙ্গে তাকে কলকাতায় প্রেরণ করা হয়। নন্দিনীকেও ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে তলব করা হয় কলকাতায়। নন্দিনী ট্রেনিং ক্যাম্পের কদর্য পরিবেশে তিক্ত হয়ে গিয়েছিল; তাছাড়া ক্যাম্পে এক নিরপরাধ মসজিদের ইমাম হত্যার ঘটনা তাকে ব্যথিত করে তোলে। সে জন্যই সে ক্যাম্প থেকে ফিরে এসে সেখানে আর না যাওয়ার ব্যাপারে তার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। কমরেড আলী রেজা তাকে সান্ত¡না দিয়ে বলেছেন-
এসব নিয়ে দুঃখ করে, নালিশ করে কোন লাভ নেই বোন। এটা হলো একটা আনঅর্গানাইজড ওয়ারফেয়ার। এ সুযোগে অনেক বাজে লোক এখানে ঢুকে পড়েছে। এদের উদ্দেশ্য স্বাধীনতাযুদ্ধ নয়। এদের আচরণে বিরক্ত হয়ে পুরো আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধটাকেই অর্থহীন ভাববেন না। (প. ১৮০)
কলকাতায় কবি হাদী মীর তার ভগ্নিপতি হাসান ইমামের সহায়তায় নাসরিনের চিকিৎসার ব্যবস্থা করার পর আলী রেজা সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। সেখানে হাদী মীরের সঙ্গে রেজার যে সংলাপ হয়েছে, তার মধ্যে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত প্রকাশিত হয়েছে। যেমন-
এই স্বাধীনতা লড়াইয়ের প্রকৃতি এবং আদর্শগত দিকগুলো নিয়ে আমাদের সাথে আওয়ামী লীগের গুরুতর মতপার্থক্য রয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার মুহূর্তকাল পূর্ব পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে পাকিস্তানের অস্তিত্ব, ছয়দফা ইত্যাদি বিষয়ে আমাদের মতপার্থক্য ছিল কম। কিন্তু এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দেয়ার ক্ষমতা শেখ সাহেবের নেই। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের জেলে আটক আছেন। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দিক-নির্দেশনা দেয়ার ক্ষমতা এখন কার হাতে তা আমাদের জানা নেই। (পৃ. ১৭৫)
সেজন্যই কলকাতায় গিয়ে রেজা নিজেকে নিরাপদ মনে করতে পারেনি, হাসান ইমামের সহযোগিতা কামনা করেছে। রেজা জানিয়েছে যে, মেজর জলিলের সাথে আওয়ামী লীগের মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তাকে যে সুযোগ সুবিধা প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার দিচ্ছেন, তাদের গ্রুপকেও যদি তদ্রুপ সহযোগিতা করা হয়; তাহলে তারাও চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া অঞ্চলে মুক্তিসেনাদের শক্তঘাঁটি গড়তে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিজয় মুহূর্তে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠেছে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং কবি হাদী মীরের ভগ্নিপতি তৌফিক হাসান ইমামের উক্তিতে-
ভারত ভাবছে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে এভাবে প্রতিরোধ চালিয়ে গেলে তাদের আসাম- মেঘালয় এমনকি পশ্চিমবঙ্গেও এ যুদ্ধ ছড়িয়ে যাবে। পরিণামে ভারতের সমগ্র পূর্বাঞ্চলে নকশালপন্থীরা প্রভাব বিস্তার করবে। আর পরাজিত পাকিস্তানিরা তাদের সমস্ত আর্মস তুলে দেবে নকশালদের হাতে। তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ পরিণত হবে পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের লড়াইয়ে।
…ভারত চায় না বাংলাদেশের মাটিকে চীনপন্থীদের গেরিলা তৎপরতার উর্বর ক্ষেত্র বানাতে। শেখ সাহেব যদি পাকিস্তানের কারাগার থেকে জ্যান্ত ফিরতে না পারেন তবে এ যুদ্ধ, এ আন্দোলনের নেতৃত্ব চলে যাবে মওলানা ভাসানীর হাতে। তখন ভারত যা আশঙ্কা করছে তাই ঘটবে। (পৃ. ১৪৮)
উপমহাদেশ উপন্যাসে স্বাধীনতাযুদ্ধের যে খন্ড চিত্র অঙ্কিত হয়েছে, সেখানে বিভিন্ন মতাদর্শের মুক্তিযোদ্ধা দলের কথা থাকলেও চীনপন্থী কমরেড তোহার অনুসারী দলের চিন্তাচেতনাই প্রকটিত। আর বাস্তবেও দেখা গিয়েছে যে, তাদের চিন্তার সঙ্গে সমকালীন রাজনীতির গতি-প্রকৃতি সামঞ্জস্যপূর্ণ। দীর্ঘ নয় মাসব্যাপী সশস্ত্র সংগ্রামের ফলে দেশ স্বাধীন হয়েছে বটে, তবে ভারত মিত্র সেজে বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে অলিখিত আনুগত্যের নির্দেশ। এ জন্য শোষিত নির্যাতিতদের পক্ষে সংগ্রাম করার জন্য কমরেড রেজার গ্রুপ মুক্তিযুদ্ধ শেষে আবার পথে পা বাড়িয়েছে। হ