মাই জিয়াদাহ একজন বিখ্যাত ফিলিস্তিনি-লেবাননি নারীবাদী লেখক, বহুভাষাবিদ। প্রখ্যাত কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। তিনি প্রধানত আরবি পত্রিকা ও সাময়িকপত্রে লিখতেন। তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর পূর্বভাগের একজন ঝড়তোলা লেখক। আরবি সাহিত্যে রেনেসাঁর পথিকৃৎ। আরবি সাহিত্যে নারীবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে তারই হাতে। তাকেই নারীবাদী সাহিত্যের অগ্রদূত বিবেচনা করা হয়।
মাই জিয়াদাহ ১৮৮৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ফিলিস্তিনের নাছেরা এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রকৃত নাম ছিলো মেরি ইলিয়াস জিয়াদাহ। মাই নামটি তার নিজের পছন্দ করা। তার বাবা ছিলেন লেবাননি এবং মা ছিলেন ফিলিস্তিনি। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তার মা ছিলেন অর্থোডক্স খ্রিষ্টান শ্রেণীভুক্ত। ফিলিস্তিন ও লেবাননের মিশ্র আরবীয় রক্তধারা ছিলো তার ঐতিহ্যসূত্রে পাওয়া। অবশ্য তার মা ছিলেন সুরীয় বংশোদ্ভূত। তার বাবা ছিলেন পত্রিকা সম্পাদক। মাই জিয়াদাহ ছিলেন বাবা-মার একমাত্র সন্তান।
তার বাল্যশিক্ষার হাতেখড়ি মাতৃক্রোড়ে। মায়ের কাছেই প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা এবং জন্মভূমি নাছেরায় প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। এরপর চলে যান বাবার কাছে। লেবাননের আইনতুরায়। সেখানে ফ্রেঞ্চ মিশনারি বালিকা বিদ্যালয়ে সম্পন্ন করেন মাধ্যমিকের পাঠ। ফরাসি সাহিত্যের সাথে তার পরিচিতি ঘটে এখানেই। লেবাননের বেশকিছু রোমান ক্যাথলিক স্কুলে যাতায়াত করেন। ১৯০৪ সালে নিজভূমে ফিরে আসেন। ১৯০২ সালে তার প্রথম প্রবন্ধ ছাপা হয়। তখন তার বয়স মাত্র ষোলো। ১৯০৭ সালে পাড়ি জমান কায়রোতে। ভর্তি হোন কলেজে। ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। ইতালি ও জার্মান ভাষাও রপ্ত করেন। তবে ফরাসি ভাষায় তার দক্ষতা ছিলো অতিমাত্রিক। তিনি ফরাসি ভাষায় কবিতা লিখতেন। পাশাপাশি আরবি সাহিত্যের প্রতিও মনোযোগী হোন। কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠকালীন তিনি আরবি সাহিত্য, ইসলামের ইতিহাস, দর্শন প্রভৃতি বিষয়ে ব্যাপক অধ্যয়ন করেন। ক্রমাগত সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ-নিবন্ধ, সমালোচনা প্রবন্ধ ইত্যাদি লিখতে ও পত্রিকায় প্রকাশ করতে থাকেন। তার প্রাবন্ধিক খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে মিসরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। এসময়েই তিনি গড়ে তোলেন সাহিত্যগোষ্ঠী। তিনি কায়রোভিত্তিক সাহিত্যগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় তার আগ্রহ ও মনোযোগের সবটুকু নিবেদিত ছিলো সাহিত্যের প্রতি। তার সকল ভালোবাসার লক্ষ্যস্থল ছিলো মিশরীয় সাহিত্যিকবৃন্দ।
সপ্তাহের প্রতি মঙ্গলবার হতো তাদের সাহিত্য আড্ডা। মঙ্গলবারের আসর নামে এটি মিসরজুড়ে খ্যাতি পায়। সাহিত্য আড্ডায় উপস্থাপিত বাছাইকৃত লেখাসমূহ মিসরের বহুল প্রচারিত ও জনপ্রিয় পত্রিকাসমূহে প্রকাশিত হতে থাকে। যৌবনের প্রারম্ভে তার প্রবন্ধ সংকলন ও কাব্য সংকলন প্রকাশ হয়।
১৯০৮ সালে মাই জিয়াদাহ তার পরিবারের সাথে মিসর যান। এ সময় তার বাবা ইলিয়াস আল মাহরুসা নামক একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। এ পত্রিকায় মাই জিয়াদাহ নিয়মিত কলাম লিখতেন।
সংসার জীবনে মাই জিয়াদাহ ছিলেন চিরকুমারী। তবে বিংশ শতাব্দীর এক সুবিখ্যাত সাহিত্যপুরুষের সাথে তার সখ্য গড়ে ওঠে। তিনি ছিলেন জুবরান খলিল জুবরান। জুবরান খলিল লেবানন-আমেরিকা তথা আরবি প্রবাস সাহিত্যের প্রাণপুরুষ ও অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তাদের যোগাযোগ ছিলো সম্পাদকীয় রচনায়, সাংবাদিকতায়, লেখালেখির প্রেরণায়। কিন্তু কখনই তাদের সখ্য সাক্ষাতে রূপ পায়নি।
মিসরে অবস্থান কালীন মাই জিয়াদাহ জুবরান খলিল জুবরানের বেশ কিছু লেখা পাঠ করেন। জুবরানের অসাধারণ লেখনীতে মাই জিয়াদাহ বিমুগ্ধ হোন। তার আধ্যাত্মিক শিষ্য হয়ে যান। প্রাচ্যবাদী এ লেখকের পাশ্চাত্যমুখী চেতনা ও কৌশলের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন। তাদের দু’জনের মধ্যে লেখক প্রীতি গড়ে ওঠে। তাদের মাঝে পত্র যোগাযোগ শুরু হয়। তাদের এ যোগোযোগ বন্ধুত্ব ও সখ্যকে ছাড়িয়ে প্রেমে রূপ নিতে থাকে।
জুবরান খলিল জুবরানের সাথে তার সখ্য ছিলো অতিমাত্রায়। মাই জিয়াদাহ’র সাহিত্যকর্মে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব লক্ষ করা যায়। ১৯১১ সাল থেকে জুবরানের মৃত্যু অবধি তাদের ঐকমত্য সাহিত্যের পথচলা, জুবরান সাহিত্যের নিবিড় অধ্যয়ন, সাহিত্যদর্শনে মতৈক্য এ ক্ষেত্রে বড়ো ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে করা যায়।
জুবরানের সাথে মাই জিয়াদাহ’র সখ্য ছিলো অনুপম, দীর্ঘদিনের। এতে কোনো ক্লেশ বা খাদ ছিলো না। তাদের মাঝে ভালোবাসার সম্পর্কও ছিলো হয়তোবা। তবে তা ছিলো নিরেট আধ্যাত্মিক ও নিষ্কলুষ। মাই জিয়াদাহ’র প্রতি দুর্বলতা অনেকেরই ছিলো। কিন্তু তিনি তাদের কাউকেই বিয়ে করেননি।
১৯২৯ এবং ১৯৩২ তার বাবা-মার মৃত্যুর পর তিনি ভেঙে পড়েন। দুরারোগ্য বক্ষব্যাধিতে আক্রান্ত হোন। মারাত্মক বিষন্নতা ও মানসিক পীড়া পেয়ে বসে। এ সময় একাকী জীবন যাপন তার প্রিয় হয়। কার্ডিয়াক হাসপাতালে ভর্তি হোন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে লেবানন সেন্ট্রাল হাসপাতালে রেফার্ড করে। হয়তো সেখানে পরিচিত স্বজনদের সাহচর্যে পরিস্থিতির উন্নয়ন হতে পারে। এরপর তাকে বৈরুতের বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এবার কিছুটা সুস্থতা বোধ করেন মাই জিয়াদাহ। এ সময় সাহিত্যিক আমিন আল-রাইহানি তাকে সহচার্য দান করেন। তারা একসাথে কয়েক মাস অতিবাহিত করেন। এরপর তিনি আবারো চলে যান মিসরে।
পরপর তার মা, জুবরান এবং বাবার মৃত্যু সর্বোপরি তার নিজের অসুস্থতা তাকে দুর্বল ও অসহায় করে তোলে। ১৯২৮-১৯৩২ সাল সময়কাল ছিলো তার সিরিজ দুঃখের বছর। দুঃখ ঢাকতে তিনি আবারও লেখালেখিতে মনোযোগ দেন। কিন্তু তাও বেশি ফলপ্রদ হয় না। যাহোক অসুস্থতা কমাতে এবং আবহাওয়া পরিবর্তনের মানসে ১৯৩২ সালে তিনি ব্রিটেন গমন করেন। তার ইচ্ছা ছিলো ব্রিটেনের কোমল আবহাওয়া তার শারীরিক অবস্থায় প্রভাব ফেলবে। তাকে সুস্থ হতে সাহায্য করবে। কিন্তু ব্রিটেন যাত্রায় তার সে আশায় গুড়ে বালি হয়। আবারও মিসর ফিরে আসেন। সুস্থতা-অসুস্থতায় তার দিন কাটতে থাকে। এরপর অল্পকিছু সময়ের জন্য ব্রুজিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতে ইতালি এবং রুমা যান। কিছুদিন পর মিসর ফিরে আসেন। এবারে তার অসুস্থতা স্থায়ী রূপ নেয়। কায়রো জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হোন। এ সময় (১৯৩৫ সালে) তাকে পাগল বলে অপবাদ দেয়া হয়। তিনি ভীষণ মনোকষ্ট পান। খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দেন। সবাই তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেছিলেন-
আমি অনশন করছি। কারণ আমি মৃত্যুকাক্সক্ষী।
যাহোক ৫৫ বছর বয়সে ১৯৪১ সালের ১৭ অক্টোবর হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মাই জিয়াদাহ নিজেই তার সম্পর্কে বলেন-
আমি এক নারী। আমি আমার জীবন কাটিয়েছি আমার কলম, দোয়াত, বই-পুস্তক এবং পড়াশুনার মাঝে।
মাই জিয়াদাহ’র ভাষিক দক্ষতা ও ব্যুৎপত্তি ছিলো অসাধারণ। তিনি কমপক্ষে নয়টি ভাষার পন্ডিত ছিলেন। এসব ভাষায় কথা বলা, লেখা, সাহিত্য অধ্যয়ন ও অনুধাবনে ছিলেন অতিমাত্রায় পারঙ্গম। তিনি আরবি, ফরাসি, ইংরেজি, জার্মানি, ইতালি, স্পেনীয়, ল্যাটিন, আধুনিক ইউনানি, সুরিয়ানি প্রভৃতি ভাষায় পান্ডিত্য অর্জন করেন।
মাই জিয়াদাহ’র সুখ্যাতি এবং পরিচিতির সবটুকু ঘিরে রয়েছে তার সাহিত্য সংগঠন। এটির নাম ছালুন মাই জিয়াদাহ। এটি তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ১৯১২-১৩ সালে। প্রতি মঙ্গলবারে এ সংগঠনের উদ্যোগে সাপ্তাহিক সাহিত্য আড্ডা বসতো আদালি রোডের তারই বাড়িতে। ১৯২১ সালে আহরাম পত্রিকা অফিসে তার বাসা স্থানান্তরিত হওয়া যাবৎ এখানের সাহিত্য আড্ডা ছিলো মাই জিয়াদাহ’র নৈমিত্তিকতা। এ সাহিত্য আড্ডা বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকের প্রায় শেষ পর্যন্ত স্থায়ী থাকে।
মিসরের বিখ্যাত কলম সৈনিক, চিন্তাবিদ, রাজনীতিক, কূটনীতিক এমনকি ধর্মীয়, ব্যক্তিত্ব ও সুশীলসমাজের সভ্যবৃন্দ নিয়মিত এ আড্ডায় উপস্থিত হয়ে আড্ডাকে প্রাণবন্ত করে তুলতেন। যারা নিয়মিত এ সাহিত্য আড্ডায় হাজিরা দিতেন এমন কিছু বিশেষ ব্যক্তিরা হলেন- আব্বাস মাহমুদ আক্কাদ, ত্বহা হুসাইন, আহমদ লুৎফি সাইয়েদ, ইসমাইল সবরি পাশা, মুস্তফা আব্দুর রাজেক, শিবলি শামিল, আহমদ শাওকি, আহমদ জাকি আবু শাদি, হাফিজ ইবরাহিম, খলিল মুতরান, ওলিউদ্দিন ইয়াকুন, মুস্তফা সাদিক রাফিই, ইনতুআন জামিল, ড. মানসুর ফাহমি, ইয়াকুর ছাররুফ প্রমুখ সাহিত্যিক নক্ষত্র ও রাজনীতির জ্যোতিষ্ক ব্যক্তিবর্গ।
মাই জিয়াদাহর জীবনব্যাপ্তি ৫৫ বছরের হলেও তার লেখক জীবন ছিলো অল্প সময়ের। তার জীবনের শেষ দশ বছর কাটে দুরারোগ্য বক্ষব্যাধিতে। তিনি অল্পসময়ের মধ্যেই সাহিত্য সমালোচনামূলক প্রবন্ধ-নিবন্ধ, আত্মজীবনী, অসংখ্য কবিতা এবং একগাদা কলাম লেখেন। আরবিতে উপন্যাস রচনা করেন বেশ ক’টি। তিনি বেশ কয়েকজন প্রথিতযশা পাশ্চাত্য সাহিত্যিকের লেখা আরবিতে সফল অনুবাদ করেন। তিনি ইংরেজি সাহিত্যের আর্থার কোনান দুইলি, ফরাসি সাহিত্যিক ব্রাডা, জার্মানির ম্যাক্স মুলার প্রমুখের সাহিত্য আরবিতে অনুবাদ করে আরবি সাহিত্যসম্ভারকে সমৃদ্ধ করেন। তার অনূদিত সাহিত্য একদিকে আরবিকে করেছে সমৃদ্ধ অন্যদিকে দিয়েছে নবতর সাহিত্যের ভিন্নতর স্বাদ। মাই জিয়াদাহকে দিয়েছে জগৎ জোড়া সুনাম, যশ ও খ্যাতি।
তার লিখিত ও প্রকাশিত প্রসিদ্ধ বইসমূহের মধ্যে রয়েছে-
ক. ইজিস কুবিয়া- ফরাসি ভাষায় রচিত কাব্য সংকলন- ১৯১১
খ. বাহিছাতুল বাদিয়া- ১৯২০
গ. কালিমাত ওয়া ইশারাত- ১৯২২
ঘ. জুলমাত ওয়া আশিয়্যা- ১৯২৩
ঙ. সাওয়ানিহু ফুতাত।
চ. বাইনাল মুদ্দওয়াল জাযার- ১৯২৪
ছ. আল-ছাহাইফ ওয়া আল-রাসাইল- ১৯২৪
জ. ওয়ারদাতু আল-ইয়াজিসি
ঝ. আয়েশা তাইমুর
ঞ. আল-হুববু ফি আল-আজাব
ট. রুজুউল মাওয়াজ্জাহ
ঠ. ইবতিসামাত ওয়া দুমু
ড. গায়াত আল-হায়াত
ঢ. দিওয়ান আল-হুব্ব
ণ. মাওতু কিনারি প্রভৃতি।
আরব বিশ্বের সাংস্কৃতিক রাজধানী বৈরুতের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় পরিচালিত এক সমীক্ষায় তাকে বর্ষসেরা ব্যক্তিত্ব খেতাবে ভূষিত করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে মাই জিয়াদাহ ছিলেন সমকালীন সাহিত্যজগতের জ্যোতিষ্মান তারকা। যিনি ছিলেন গতিতে অদম্য, সৌন্দর্যে অতুলনীয়, শৈল্পিকতায় অনবদ্য। তার সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে-
সর্বদা বিখ্যাত সাহিত্যিকদের একটা অংশ তার পাশে ঘুরঘুর করতো। যেমন গ্রহরাজি দিনমণির চারপাশে যথানিয়মে প্রতিনিয়ত প্রদক্ষিণ করে। যেই তার কাছে ঘনিষ্ঠ হয় সেই তার প্রেমে ঝলসে যায়। আর যে পারে না সে চরম হতাশা ও ব্যর্থতার শারাব পান করে।
বিখ্যাত কবি ইসমাঈল সাবরি পাশা বলেন-
আল্লাহ তার সৌন্দর্যছটা থেকে হেফাজত করুন। আমি এতো সুন্দরী আর কাউকে দেখিনি।
হাফিজ ইব্রাহিম বলেন-
মাই জিয়াদাহ সৌন্দর্যে অনন্যা। তার সাথে আলাপচারিতা বা তার কথা শোনার চেয়ে তাকে দেখাই ভালো।
আহমদ শাওকি কাব্য করে বলতেন-
তার সাথে কথা বললেই
পিলে যায় চমকে।
তার হাসিতেই
পরাণ যায় থমকে।
হুদা শা’রাবি বলেন-
মাই জিয়াদাহ ছিলেন প্রাচ্যের শিক্ষিতা নারীদের প্রতিভূ।
মাই জিয়াদাহ লেবাননের আইনতুরায় মাধ্যমিকে পাঠ গ্রহণ কালেই কবিতা লেখেন। তিনি আরবি ও ফরাসি উভয় ভাষায় কবিতা লিখতেন। তবে তার প্রথম কাব্য সংকলন প্রকাশিত হয় ফরাসি ভাষায়। তার প্রথম কাব্য সংকলন আজাহিরে হুলম বা স্বপ্নগোলাপ তার অত্যন্ত জনপ্রিয় কবিতার বই। লেবাননের প্রাকৃতিক নৈসর্গ, উপত্যকা আর সমুদ্রের নিঃসীম সৌন্দর্য, সমতটের অনাবিল সৌকর্য ইত্যাদির মনোমুগ্ধকর প্রাণস্পর্শী রচনায় সমৃদ্ধ ছিলো এ কাব্যগ্রন্থের কবিতাসমূহ। ছন্দমুক্ত মাত্রায় রচিত হায় ইলাহ নামক গদ্য কবিতায় কবির উচ্চারণ-
হায় ইলাহ!
মানুষ কেনো এমন হয়?
কেনো??
সেতো কোনো কিছুর মালিক নয়
হে আনন্দময়ী! হাসি-কান্নার মালিক
আপনি শক্তিমান আর আমরা দুর্বল
আপনি মহান আমরা অসহায়
আমরা নিকৃষ্ট আপনিই কল্যাণীয়
তবুও কি আমরা পাবো না আপনার ক্ষমা।।
আমরা কি বঞ্চিত হবো আপনার রহমত থেকে
আপনি কখনই আমাদের বঞ্চিত করবেন না
যদিও আমরা হতাশ
আজাবই আমাদের উপযুক্ত প্রাপ্তি।।
বসন্তকে নিয়ে কোনো এক কবিতায় কবির চিত্রায়ন –
বসন্ত! বসন্ত!! এই তো বসন্ত
প্রভাতের চন্দ্রালোকে, ঊষার আলোতে
পাখির কুঞ্জনে, গোলাপের স্ফুরণে
দিবসের আবর্তনে, সকালের আগমনে!!
কবিতার পাশাপাশি তিনি প্রবন্ধও রচনা করেছেন। তিনি আর্থ-সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নারীর সামাজিক অবস্থানকে ভিত্তি করে অধিকাংশ প্রবন্ধ রচনা করতেন। জীবন, মানবতা ও সমাজই ছিলো তার লেখার মূল উপজীব্য। বিবেচনা ও মনন তার অনবদ্য একটি প্রবন্ধ। এ প্রবন্ধের মূলসুর হলো সুস্থ বিবেচনাবোধ একজন পরিশীলিত মানুষের প্রকৃত পথ নিদের্শক। কোনো মানুষের বিবেচনাবোধ পরিশুদ্ধ হলেই সাধিত হয় নানাবিধ কল্যাণ। উপকৃত হয় জগৎসংসার। কল্যাণে কল্যাণে সমৃদ্ধ হয় পৃথিবীর অনুষঙ্গাদি।
আর বিবেচনাবোধ অপরিশীলিত হলেই যাবতীয় অকল্যাণ ও অশুচিতা স্পর্শ করে আমাদের। ভয়াবহ ক্ষতির মুখোমুখি হয় জগৎ। মাই জিয়াদাহ মনে করতেন ২য় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম কারণ হলো মানবসমাজের অচৈতন্য ও বিবেচনা বোধের অভাব। তিনি সর্বদা মার্জিত ও পরিশীলিত বোধ ও বিবেচনার আকাক্সক্ষী ছিলেন।
মাই জিয়াদাহ ছিলেন একজন শান্তিপ্রিয়, সহমর্মী ও জনদরদি লেখিকা। তিনি আল-কুরআন এর চিন্তা-চেতনা দ্বারা ছিলেন অতিমাত্রায় প্রভাবিত। যদিও তিনি খ্রিষ্টাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। অবশ্য তার লেখায় লা-মার্টিন, বায়রন, শেলির প্রতিচ্ছায়া প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। আর সমসাময়িক লেখকদের মধ্যে জুবরানের প্রত্যক্ষ প্রভাব তার প্রতিটি লেখায় লক্ষ করা যায়।
মাই জিয়াদাহ ছিলেন একজন অসাধারণ বাগ্মী। তিনি সাধারণত সামাজিক ও উন্নয়ন বিষয়ক সেমিনারে উপস্থিত থাকতেন। কখনো বক্তা, কখনো সভাপতি আবার কখনো প্রবন্ধ উপস্থাপক হিসেবে। এসব সেমিনারে তিনি নারীর উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, শিল্প-সাহিত্য ও দেশ উন্নয়ন ইত্যাদিতে নারীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আবশ্যকতা নিয়ে যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য উপস্থাপন করতেন। বক্তব্য প্রদানে তিনি ছিলেন সাহসী, উচ্চারণে স্পষ্টবাদী, শব্দচয়নে সদাসতর্ক, দাবি উপস্থাপনে নির্ভীক। তার এসকল বক্তব্যেও ছিলো সাহিত্যখোরাক। তার বক্তব্যনামা আজও আরবি সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।
কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, সমালোচনা কিংবা বক্তব্য সকল ক্ষেত্রেই মাই জিয়াদাহ’র স্টাইল ছিলো ঝরঝরে, প্রাণবন্ত। সহজেই অনুধ্যেয়। সচরাচর তিনি অপ্রচলিত ও দুর্বোধ্য শব্দের ব্যবহার এড়িয়ে চলতেন। গদ্য রচনায়ও তার ছান্দসিকতা বজায় থাকতো। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক উস্তাদ হান্না ফাখুরি বলেন-
মাই জিয়াদাহ’র সাহিত্যকলা ছিলো প্রাণবন্ত, ঝরঝরে, অদুর্বোধ্য। কঠিন, অপ্রচলিত, অবোধ্য শব্দমুক্ত। তার ব্যবহৃত সহিত্য রীতি জনকাক্সিক্ষত, জননন্দিত। যা সহজেই পাঠক ও শ্রোতৃ অন্তরে রেখাপাত করতে সক্ষম হতো। এখানেই ছিলো তার সাহিত্য স্বাতন্ত্র্যের মূল রহস্য।
মাই জিয়াদাহ অনুপম চেহারা ও ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। তিনি একাধারে বিদুষী নারী ও সমাজ সংস্কারক ছিলেন। তিনি ছিলেন নারীমুক্তি আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। বিশেষত আরব নারী জাগরণ ছিলো তার সকল কর্মপ্রচেষ্টার উৎসভূমি। এ আন্দোলনকে সফল করে তুলতে তিনি সব থেকে বেশি গুরুত্ব দেন নারীর অশিক্ষা ও অজ্ঞতার প্রতি। তারপরই সনাতন আচরি ধর্মকে চিহ্নিত করেন। মনে করেন এ দুই অপশক্তিই সর্বদা বাধাগ্রস্ত করেছে নারীকে। তিনি মনে করেন নারী হবে মানব সমাজের সকল প্রসঙ্গের মৌল অনুষঙ্গ। তিনি লেখার মধ্যে একথা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে উপস্থাপন করেন-
যে নারী দাস, যে নারী অবরুদ্ধ তার কোনো মানুষকে দুধপান করানো উচিত নয়। কারণ তার দুধ থেকে দাসত্বের গন্ধ বেরোয়। অর্থাৎ নারীর দাসত্ব কোনোভাবেই কাম্য নয়।
তিনি জোর গলায় বলতেন-
নারীত্বের মূল্যে কোনো সমতা নয়। তবে নারীরও থাকবে অসমধিকার। নারী করুণার পাত্র নয়।
এ বিষয়ক তার অসংখ্য সেমিনার, সিম্পোজিয়াম রয়েছে। তিনি আরব নারীদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলতেন-
পাশ্চাত্যমুখী হও তবে প্রাচ্যমুখিনতাকে বাদ দিয়ে নয়।
আমৃত্যু তিনি এ বাণী প্রচার করেছেন নির্দ্বিধায়-সর্বব্যাপী। তাকেই লেবাননের নারী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ও পথিকৃৎ বিবেচনা করা হয়। তার সকল গল্প, কবিতা, উপন্যাস, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, বক্তৃতা, অনুবাদকর্ম ইত্যাদির সবই ছিলো নারী জাগরণে নিবেদিত, নারী উন্নয়নে উৎসর্গিত। মাই জিয়াদাহ বিশ্বাস করতেন সুশিক্ষা, ভোটের অধিকার ও নারীর ক্ষমতায়ন বৈ নারী অধিকার নিশ্চিত হতে পারে না। দেশ ও জাতির সমন্বিত উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নারী জাগরণই উত্তরণের একমাত্র উপায়। হ