- একজন আবৃত্তিকার আবৃত্তির সংজ্ঞা, তাৎপর্যগত উপলব্ধি, শিল্পমূল্য, স্বর, স্বরায়ন, স্বরের প্রক্ষেপণ, শুদ্ধ উচ্চারণ, ছন্দ ও রস সম্পর্কে অবহিত হলেও মূল বিষয় কিন্তু কবিতার সঠিক নির্মাণে। এখন প্রশ্ন হলো কবিতা নির্মাণ কী? কবিতা নির্মাণ হলো একটি কবিতাকে কিভাবে আবৃত্তি করা হবে তার চিন্তন অর্থাৎ কবিতার অর্থ সঠিকভাবে প্রকাশের জন্য একজন আবৃত্তিকার পঙক্তির কোন জায়গায় থামবে, কোনো জায়গায় থামবে না, ভাব কিভাবে ফুটিয়ে তুলবে, ভাব ফুটিয়ে তোলার জন্য স্বরের প্রক্ষেপণ কিভাবে করবে, কবিতার ছন্দ ও রসবোধ কিভাবে দর্শক শ্রোতার কাছে ব্যক্ত করবে তা নিয়ে তাঁর নিজস্ব পরিকল্পনাই কবিতা নির্মাণ। এই নির্মাণের ওপরই নির্ভর করে একটি কবিতার প্রাণ। একটি কবিতার সফল নির্মাণ করতে হলে একজন আবৃত্তিকারকে কতগুলো বিষয়ে সচেতন হতে হয় এবং অন্তরে ঐ বিষয়গুলোকে ধারণ করার মত যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। কবিতার সঠিক নির্মাণ করতে হলে যে বিষয়গুলো জানতেই হবে, তা হলো-
হ কবিতা নির্বাচন
হ বোধ ও কাব্যবোধ এবং কবির জীবনী
হ শুদ্ধ উচ্চারণ
হ চিত্রকল্প ও কবিতা মুখস্থকরণ
হ ঝোঁক
হ ছন্দ
হ রস
হ পঙক্তির সঠিক বিভাজন
হ স্বর স্বরায়ন ও স্বরের প্রক্ষেপণকবিতা নির্বাচনÑ কবিতা নির্মাণের প্রথম ধাপ হলো কবিতা নির্বাচন। কোন ধরনের কবিতা আবৃত্তির জন্য নির্বাচন করা তা আবৃত্তিকারের মননের ওপর নির্ভর করবে। এ জন্য আবৃত্তিকারের মনন শিক্ষিত ও শিল্পিত হতে হবে। আপনি যদি কোন অনুষ্ঠানের জন্য কবিতা নির্বাচন করতে চান তাহলে আপনাকে ঐ অনুষ্ঠানের বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে কবিতা নির্বাচন করতে হবে। যেমন আপনি যদি স্বাধীনতা অথবা বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করতে চান তাহলে আপনার জন্য উদ্দীপনামূলক বা উৎসাহমূলক কবিতা নির্বাচন করাই ভালো। আবার আপনি যদি ভাষাদিবস বা কোন শোকদিবসের অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করতে চান তবে আপনার জন্য করুণ রসকে প্রাধান্য দিয়ে কবিতা নির্বাচন করাই শ্রেয়। তবে কিছুটা উৎসাহের আভাস আছে এমন কবিতাও নির্বাচন করতে পারেন। যদি অনুষ্ঠানটি হয় আবৃত্তি উৎসব তাহলে আপনি যে কোন রসের যে কোন ধরনের কবিতা নির্বাচন করতে পারেন। তবে সকল ক্ষেত্রে আপনাকে একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে তা হলো; আপনার নির্বাচিত কবিতাটি যেন অর্থপূর্ণ কবিতা হয়। কারণ অর্থহীন কবিতা আপনি ভালো আবৃত্তি করে শ্রোতার কাছে তাৎক্ষণিক বাহবা পেলেও তা শ্রোতার মনে দীর্ঘদিন স্থান করে নিতে পারে না। আপনি এমন কবিতা নির্বাচন করবেন, যে কবিতা আপনার কণ্ঠের উপযোগী, কারণ সব কবিতা সবার কণ্ঠের জন্য উপযোগী নাও হতে পারে। যেমন আপনার কণ্ঠ যদি দরাজ না হয় তবে বীর রসের কবিতা নির্বাচন না করাই শ্রেয়। মনে রাখতে হবে আপনি যে কবিতা নির্বাচন করবেন তা যেন আপনার বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে যায়, যদি আপনার বিশ্বাসের সঙ্গে কবিতাটি মিলে যায় তাহলে আপনার নির্বাচিত কবিতাটি আবৃত্তি করলে দর্শকের কাছে ভালো লাগবেই; কারণ মানুষের বিশ্বাস সব সময়ই সুন্দর এবং মোহনীয় ভাবে প্রকাশিত হয়, এটাই সফল আবৃত্তির কাম্য। আর মানুষের বিশ্বাস মানুষের কাছে ভালো লাগবেই যদি তিনি সত্যিকারের রক্তে মাংসে গড়া মানুষ হয়ে থাকেন। যতোটা সম্ভব সহজ ভাষায় চিত্রকল্পপ্রধান কবিতা নির্বাচন করাই ভালো। কবিতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে দর্শকের অভিরুচি বোঝাও প্রয়োজন। যে অনুষ্ঠানের দর্শকরা ক্ষুধার তাড়নায় অস্থির অথবা নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য উন্মুখ সেখানে যদি রবীন্দ্রনাথের ‘নৈবেদ্য’ বা ‘গীতাঞ্জলি’র কবিতাগুলো আবৃত্তি করা হয় তাহলে আবৃত্তি যতো ভালোই হোক স্বাভাবিকভাবেই শ্রোতা সেটা গ্রহণ করবে না। এক্ষেত্রে যদি রুদ্র মহম্মদ শহীদুল্লার ‘মুখোমুখি’র মতো কবিতাগুলো আবৃত্তি করা হয় তাহলে শ্রোতার হৃদয় ভরে যাবে। আবৃত্তিশিল্পীকে মনে রাখতে হবে সাধারণ দর্শককে আবৃত্তিমুখী করে তোলাও তার কাজ।
বোধ ও কাব্যবোধ এবং কবির জীবনীÑ বোধ বলতে অনুধাবন করার ক্ষমতাকে বুঝায়। আপনি একটি কবিতা পড়লেন, কবিতাটি বুঝলেন, কবিতাটির অর্থ বা ভাব আপনার বিশ্বাসের সাথে মিলে গেল। কবিতাটির ভাষার ব্যবহার ও ছন্দের দোলাও চমৎকার। অথচ কবিতাটি পড়ার পর আপনার হৃদয় আবেগের দোলায় দোলায়িত হলো না তাহলে আপনাকে বুঝতে হবে আপনার বোধশক্তি সমৃদ্ধ নয়। এ জন্য একজন আবৃত্তিকারকে অনেক কিছু হৃদয়ে ধারণ করতে হয়। কিছু কষ্ট, কিছু প্রেম, কিছু ভালোবাসা, কিছু ঘৃণা, কিছু অবহেলা, কিছু সুখের স্মৃতি, কিছু উদাসীনতা, কিছু উদ্দামতা, কিছু উচ্ছলতা একজন আবৃত্তিকারকে তীব্রভাবে হৃদয়ে ধারণ করতে হয়। বাস্তবজীবন ও কল্পনার জীবন সম্পর্কে সচেতন হতে হয়। আবৃত্তিকারকে মনের তিনটি অবস্থা-চেতন, অবচেতন ও অচেতন সত্তাকে লালন করতে হয়। সুখের বিষয়ে সুখানুভূতি, বেদনার বিষয়ে বেদনার্ত অনুভূতি, কষ্টের বিষয়ে কষ্টের অনুভূতি, ভালোবাসার বিষয়ে ভালোবাসার অনুভূতি, ভালোলাগার বিষয়ে ভালোলাগার অনুভূতি, ঘৃণার বিষয়ে ঘৃণার অনুভূতি তথা প্রত্যেক বিষয়ের সাথে একাত্ম হয়ে অনুভূতির রঙে হৃদয়কে রাঙিয়ে চেতনার দোলায় হৃদয়কে দোলায়িত করার মত মানস তৈরি করতে হবে। আর এটাই হচ্ছে বোধ। যদি আপনার সামনে অন্যায়ভাবে দুর্বল মানুষকে অত্যাচার করা হয় আর আপনি সেটা দেখলেও আপনার অন্তর ক্রোধে জ্বলে না ওঠে তাহলে বুঝতে হবে আপনি হৃদয়বান নন। পত্রিকায় ধর্ষণের খবর পড়ার পর অথবা আপনার এলাকায় কোনো ধর্ষণের ঘটনা শোনার পর যদি আপনার অন্তর ঘৃণায় রি রি করে না ওঠে তাহলে আপনি অনুভূতি শৈল্পিকও নয় জাগ্রতও নয়। দেশের দুর্দশায় বা ক্রান্তিলগ্নে আপনি যদি ব্যাকুল না হয়ে ওঠেন তাহলেও আপনি বোধশক্তিসম্পন্ন নন। অসহায়ের পাশে আপনি যদি বল হয়ে না দাঁড়ান, অত্যাচারিত এবং নিগৃহীত মানুষের জন্য কিছু করার তীব্র তৃষ্ণা যদি না থাকে তাহলে আপনার হৃদয় সুন্দর নয়। একজন আবৃত্তিশিল্পীকে জগতের সুন্দর সুন্দর দিকগুলো ফুটিয়ে তুলতে হবে তার কণ্ঠে। আবার অসুন্দর বা কুৎসিত দিকগুলোও তাকে ফুটিয়ে তুলতে হবে। একজন ব্যক্তি যদি প্রথমবারের মতো একটি আবৃত্তি অনুষ্ঠানে আসে তাহলে দ্বিতীয়বার তাকে ঐ রকম অনুষ্ঠানে আসার মত অন্তরাত্মা তৈরি করে দেয়া আবৃত্তিকারের কাজ। যে কবিতাগুলি অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করা হবে সেগুলো যেন দর্শক- শ্রোতার মনে ঝংকার তোলে। শ্রোতারা বাসায় ফিরে যেন ঐ অনুষ্ঠান নিয়ে গল্প করতে পারে, গর্ব করতে পারে, আনন্দ প্রকাশ করতে পারে, পুনরায় ঐ ধরনের অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হতে পারে, অনুষ্ঠান নিয়ে ভাবতে পারে এ ধরনের মানসিকতা তৈরি করে দিতে হবে। তারা যেন বুঝতে পারে আজ তারা একটি চমৎকার জগতের সন্ধান পেয়েছে, যে জগৎ সত্য ও সুন্দরের মোহনায় সম্মিলিত। এই পৃথিবীর নানা জঞ্জালের মাঝেও মানুষ সুন্দরের তপস্যা করতে পারে এই বোধটুকু দর্শক-শ্রোতার মাঝে তৈরি করার মতো মনন এবং প্রচেষ্টা আবৃত্তিশিল্পীর থাকতে হবে। দেশীয় চেতনায় বৈশ্বিক ভাবনাবলয় আবৃত্তিকারের অন্তর্গত চেতনায় খেলা করতে হবে।
কাব্যবোধ হচ্ছে বোধের বিষয়গুলো যখন কবিতায় প্রয়োগ হবে তখন তাকে হৃদয়ে ধারণ করে চিন্তার বিমোক্ষণ ঘটানো। আবৃত্তিকারের বোধ ও কাব্যবোধ অত্যন্ত সমৃদ্ধ হওয়া দরকার নতুবা তার পক্ষে কবিতার বিষয়, ভাব, ছন্দ ও রসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কবিতা নির্মাণ ও প্রকাশ করা সম্ভব হবে না। বোধ ও কাব্যবোধের জগৎ সমৃদ্ধ করতে হলে প্রচুর পরিমাণে কবিতা পড়ার পাশাপাশি কবির জীবনীও জানতে হবে কারণ কবিতা হচ্ছে কবির কল্পনা এবং জীবন ও বিশ্বাসের শিল্পিত প্রকাশ। কবি যা দেখেন তাই তিনি লেখেন। যা তিনি দেখেন না তা তিনি লেখেন না। কবির দেখা আর সাধারণের দেখা এক নয়। কবির ব্যক্তি অভিজ্ঞতার শাব্দিক যোজনা কবিতা হয়ে ওঠে। কবি দেখার জগৎকে অলৌকিকভাবে উপস্থাপন করতে পারেন। কবির জীবন যেমন জানতে হবে তেমনি জানতে হবে কবিতাটি লেখার প্রেক্ষাপট। প্রেক্ষাপট জানা থাকলে আবৃত্তিকার অনায়াসে নিজেকে সেই ঘটনার সঙ্গে একাত্ম করে নিতে পারেন।শুদ্ধ উচ্চারণ
আমরা অধিকাংশ সময়ই আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলি। আঞ্চলিক ভাষা মায়ের আঁচলের ভাষা, অনেকটা শিশুর ভাষা বলা যায়। একজন মানুষ আজীবনই শিশু থাকবে এ হতে পারে না। প্রমিত ভাষা বা শুদ্ধ উচ্চারণের ভাষা হলো যৌবনের ভাষা। যারা শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলতে পারে না, তাদের জীবনে সত্যিকারের যৌবন এসে ধরা দেয় না। তারা জানে না পরিপূর্ণ প্রেমের অনন্ত দাবি মেটাবার ক্ষমতা আছে একমাত্র অবিলম্বিত, অনপচয়িত সুস্থ ও শুদ্ধ যৌবনের। শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বললে কণ্ঠে একটা দীপ্তি আসে, যা একজন মানুষকে বাচনিক দিক দিয়ে সৌন্দর্যমন্ডিত করে তোলে। একজন মানুষ যখন শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলে তখন সে প্রত্যেকটা শব্দ প্রক্ষেপণে যথাযথ আবেগ দেয়ার চেষ্টা করে এতে তার কথাগুলো মধুর এবং বলিষ্ঠ আকারে উচ্চারিত হয়। ফলে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে তিনি সম্মত হন। মাঝে মাঝে আমরা এমন কিছু মানুষের সন্ধান পাই যাদের কথা শোনার জন্য আমরা উদগ্রীব হয়ে উঠি। নজর দিলে দেখা যাবে ঐ ব্যক্তি যথাযথ উচ্চারণে কথা বলেন। যথার্থ উচ্চারণে কথা বললে মানুষের ভেতরে একটি শুদ্ধতাবোধ জাগ্রত হয় যা তাকে অন্যায় বা অনৈতিক কাজ করতে দেয় না। শুদ্ধ উচ্চারণ মানুষের ভেতরের সৌন্দর্যচেতনাকে শানিত করে তোলে। মানুষ সুন্দরের প্রতি আকুলতা অনুভব করে। যারা শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলেন, তাদের ব্যক্তিজীবনেও একটা অভিজ্ঞতাবোধ ফুটে ওঠে। শুদ্ধতা মানুষের পূর্ণতার দিকে নিয়ে যায়, সঙ্গে সঙ্গে নিজস্ব ভাষাপ্রেমকে জোরদার করে দেয়; মানুষ আপনভাষা নিয়ে গর্ববোধ করতে শেখে। একটা নির্দিষ্ট ভাষার উচ্চারণের শুদ্ধ রূপ যদি ঐ ভাষাভাষী লোকজন না জানে তাহলে ঐ ভাষার মধুর রূপটি তার কাছে অধরাই থেকে যায়। আঞ্চলিক ভাষাকে ভাষা বিজ্ঞানে বলা হয় ‘উপভাষা’। মানুষ শুধু উপভাষাতে কথা বলবে মূল ভাষায় কথা বলবে না, এমন ঘটনা যদি ঘটে তাহলে ঐ জাতির স্বপ্ন দেখা স্তিমিত হয়ে যাবে। জাতি হিসেবে তারা স্বাতন্ত্র্য দাবি করবে না। পরনির্ভরশীল হয়ে পড়বে। ভিনদেশি ভাষা ও সংস্কৃতি তাদের মননে চেপে বসবে। অস্তিত্বসঙ্কটে ভুগতে থাকবে তারা। আমরা এখন ভিনদেশি চ্যানেলমুখী হয়ে পড়েছি এর কারণও এটাই যে, আমরা আমাদের ভাষাকে আমাদের করে নিতে পারিনি। আমাদের সংস্কৃতিকে আমাদের বলে ভাবতে পারিনি কারণ আমরা আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির শুদ্ধ রূপটি জানার-চেনার এবং ব্যক্তিজীবনে প্রয়োগ করার চেষ্টা করিনি। নিজের ভাষাকে অবজ্ঞা করে জাতিসত্তাকে চেনা যায় না, জানা যায় না, অনুভব করা যায় না। বাংলাভাষা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি থেকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষাগুলোর মধ্যে প্রধানতম। আমরাই একমাত্র জাতি যারা ভাষার জন্য অকাতরে গুলির মুখে বুক পেতে দিয়েছি, একজন দেশপ্রেমিক মানুষ হিসেবে আমরা যদি আমাদের ভাষাকে শুদ্ধরূপে বলতে না পারি তাহলে একজন অপূর্ণ মানুষ হিসেবে আমরা সারাজীবন ধুঁকে ধুঁকে মরব। সুন্দর ও মহৎ জীবনের সাধনা আমাদেরকে শুদ্ধতার দিকে ধাবিত করে। শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বললে আমাদের ভেতরে শৈল্পিক রুচিবোধ তৈরি হয়, যা আমাদেরকে অসংস্কৃত জীবন থেকে আলাদা করে দেয়। আমরা যদি আমাদের প্রাণের প্রিয় বাংলাভাষাকে যথাযথ উচ্চারণে না বলি তাহলে ভাষাশহীদদের রক্তের সঙ্গে প্রতারণা করা হবে, অসংখ্য আত্মত্যাগ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। সচেতন এবং শিক্ষিত জাতি হিসেবে আমরা তা হতে দিতে পারি না।
শুদ্ধ উচ্চারণ বলতে বুঝায় যথার্থ উচ্চারণ অর্থাৎ যে শব্দটি যেভাবে উচ্চারণ করলে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে, সব আঞ্চলিক ভাষাভাষী বুঝতে পারবে এবং শব্দটির মূল ভাব বাঙ্ময় হবে তাই শুদ্ধ উচ্চারণ। তবে শুদ্ধ উচ্চারণের শুদ্ধতা নিয়েও এখন অনেকে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে শুদ্ধ উচ্চারণের চর্চা করছেন, দীর্ঘ সাধনার ফলে যাঁরা অনেক কঠিন শব্দকেও সাবলীলভাবে উচ্চারণ করে অর্থ বুঝানোর মতো কণ্ঠ তৈরি করেছেন অর্থাৎ যাঁরা প্রকৃত শিল্পী তাঁরা উচ্চারণের বিষয়ে সবাই একই রকম সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন। সেই হিসেবে আমরা শুদ্ধ উচ্চারণের কিছু সূত্র পাই। সেগুলো আলোচনার আগে আমরা জেনে নেবো শুদ্ধ উচ্চারণ হতে হলে কী কী গুণ থাকতে হবে বা কী কী বৈশিষ্ট্য থাকলে আমরা উচ্চারণটিকে শুদ্ধ বলব। গবেষকরা গবেষণা করে দেখেছেন কমপক্ষে পাঁচটি বৈশিষ্ট্য থাকলে যে কোন শব্দের উচ্চারণকে শুদ্ধ বা যথার্থ উচ্চারণ বলা যেতে পারে। এগুলো হলো-
হ সুস্পষ্ট উচ্চারণ
হ বিশুদ্ধ উচ্চারণ
হ শ্রোতার কর্ণগোচর করার মত উচ্চারণ
হ অর্থ, ভাব ও সৌন্দর্য উপভোগে সাহায্য করা উচ্চারণ এবং
হ আবেগ সঞ্চারিত উচ্চারণ
সুস্পষ্ট উচ্চারণ বলতে বুঝায় যা আমি বলব তা যেন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অন্যে বুঝতে পারে অর্থাৎ আমার বলার মধ্যে কোন অস্পষ্টতা থাকবে না। উচ্চারণ এমনভাবে করতে হবে যেন শব্দের মাত্রা পর্যন্ত গণনা করা যায়।
বিশুদ্ধ উচ্চারণ হচ্ছে একেবারই প্রমিত উচ্চারণ; যেটা উচ্চারণের সূত্রগুলো মেনে চলে সেইটা অর্থাৎ যে বর্ণ কণ্ঠের যেখান থেকে উচ্চারণ করা দরকার সেখান থেকে উচ্চারণ করাই বিশুদ্ধ উচ্চারণ।
শুধু সুস্পষ্ট ও বিশুদ্ধ উচ্চারণ করলেই হবে না আপন বক্তব্য যেন শ্রোতা শুনতে পারে অর্থাৎ শ্রোতার কর্ণগোচর হয় বা শ্রোতার কান জাগরিত হয় এরকম উচ্চারণ করতে হবে।
শ্রোতার কর্ণগোচর করেই শেষ নয় শ্রোতাকে আমি যা বলতে চাই তার অর্থ বুঝার মত এবং আমার মনে আমার বক্তব্য বিষয়ে যে দর্শন বা ভাব লুকিয়ে আছে তা তাকে চমৎকারভাবে বুঝানোর মত এবং উপলব্ধি করানোর মত উচ্চারণ করতে হবে। সর্বোপরি আমার বক্তব্যের বিষয়কে নিজস্ব বিশ্বাসের সঙ্গে মিল ঘটিয়ে আবেগতাড়িত উচ্চারণ করতে হবে যাতে শ্রোতার হৃদয়কে নাড়া দেয় এবং দীর্ঘদিন স্থান করে নেয় আমার বক্তব্য।চিত্রকল্প ও কবিতা মুখস্থকরণÑ চিত্রকল্প মানে চিত্রের মাধ্যমে কল্পনা করা। আমি যে কবিতাটি আবৃত্তির জন্য নির্মাণ করব তার যে বিষয়, সে বিষয়টার একটা চিত্র যেন আমার মানসপটে ভেসে ওঠে এমনভাবে কবিতাটি নির্মাণ করতে হবে। এক্ষেত্রে আবৃত্তিকারকে পরিশ্রম একটু বেশিই করতে হবে। চিত্রকল্প মূলত দৃশ্যপট যা দিয়ে একটি ভাবকে শ্রোতার হৃদয়ে ছবির মতো করে দেখানো যায়। যেমন কেউ যদি রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন; তাহলে ঐ কবিতাটি আবৃত্তির সময় তার হৃদয়ে ভেসে উঠতে হবে- বর্ষাকাল, মেঘের গর্জন, কৃষক ও তার ধান কাটার দৃশ্য, নৌকাতে ধান বোঝাই, বর্ষার ভরা যৌবনা নদী এবং নদীতে ধান নিয়ে নৌকার বয়ে চলা ইত্যাদি। আর এসবের অন্তরালে তাকে ফুটিয়ে তুলতে হবে কবিতার দর্শন। মহাকাল এবং মহাকালের সাথে মানুষের অবস্থান, কবির সৃষ্টিকর্ম থাকে কিন্তু কবি থাকে না, এই বিষয়গুলো আবৃত্তিকারকে কণ্ঠে ধারণ করে শ্রোতার হৃদয়ের ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে বিষয় হচ্ছে আবৃত্তিকার যদি সঠিকভাবে চিত্রকল্পকে ফুটিয়ে তুলতে চান তাহলে অবশ্যই কবিতাটি মুখস্থ করতে হবে। যদি আপনি মুখস্থ না করে আবৃত্তি করতে যান তাহলে আপনি সঠিকভাবে চিত্রকল্প ফুটিয়ে তুলতে পারবেন না কারণ আপনি নিচের দিকে দেখবেন না কবিতার ভাবালোকে ডুব দিবেন! কোনটা করবেন? দুইটা একসাথে করতে গেলে যে কোনো একটা ভুল করবেন। তাই কবিতা মুখস্থ করার কোনো বিকল্প নেই; যদি আপনি চিত্রকল্পকে শ্রোতার হৃদয়ের ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলতে চান। এক্ষেত্রে একটু বাড়িয়ে বলা যেতে পারে কবিতা মুখস্থ না করে ঠোঁটস্থ করতে হবে। স্মৃতি ভুল করলেও ঠোঁট যেন ভুল না করে এমনভাবে কবিতাটি আয়ত্তে আনতে হবে।
ঝোঁক- ঝোঁক বলতে প্রস¦র বা শ্বাসাঘাত বা চাপ দেয়াকে বুঝায়। আবৃত্তির ক্ষেত্রে দেখা যায় কবিতাকে অর্থপূর্ণ করার জন্য কিছু শব্দের ওপর জোর চাপ দিতে হয় আবার কিছু শব্দকে খাদে নামিয়ে বলতে হয়, কিছু শব্দে কম্পন সৃষ্টি করতে হয়। একেই বলে ঝোঁক। এই ঝোঁকের ওপর নির্ভর করে শব্দের অর্থবহতা। যেমনÑ
আমি প্রাণভরে চিরকাল তোমাকে ভালোবাসব।
আমি প্রাণভরে চিরকাল তোমাকে ভালোবাসব।
আমি প্রাণভরে চিরকাল তোমাকে ভালোবাসব।
আমি প্রাণভরে চিরকাল তোমাকে ভালোবাসব।
আমি প্রাণভরে চিরকাল তোমাকে ভালোবাসব।
এখানে ‘আমি’ তে ঝোঁক দিলে ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে আবার ‘প্রাণভরে’তে ঝোঁক দিলে ভালোবাসার অবস্থাটা প্রাধান্য পায় যদি ‘চিরকাল’ এ ঝোঁক দেয়া হয় তাহলে সময় বা বহমান কালকে বুঝানো হয়, যদি ‘তোমাকে’ তে প্রস্বর বা ঝোঁক দেয়া হয় তাহলে ভালোবাসার মানুষকে বুঝানো হয় আর যদি ‘ভালোবাসব’তে প্রস্বর বা ঝোঁক দেয়া হয় তাহলে ভালোবাসাটাই প্রবল হয়ে ওঠে।
এই প্রস্বর বা ঝোঁক দেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের সব সময় স্বরের পাশাপাশি সুরের দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে আবৃত্তির ক্ষেত্রে স্বর হবে স্বাভাবিক আর সুর হবে ভাবানুগ। প্রস্বর যেন অতিরিক্ত না হয় সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। যদি মাইক্রোফোনে আবৃত্তি করা হয় তাহলে প্রস্বর দেয়ার সময় অতিরিক্ত সচেতন হতে হয় কারণ প্রয়োজনের চেয়ে একটু বেশি প্রস্বর পড়লেই মাইক্রোফোনে গুম্ গুম্ শব্দ হতে পারে। সেটা কবিতার সৌন্দর্যকে ম্লান করে দিতে পারে। প্রস্বর পরিমিত এবং সুনিয়ন্ত্রিত হতে হবে।ছন্দ
ধ্বনির সঙ্গে সময়ের সামঞ্জস্য বিধান করাকেই ছন্দ বলা যায়। চলার গতিই ছন্দ। এই গতি পরিমিত এবং শৃঙ্খলিত। মানুষের কথা বলা, হেঁটে চলা, পাখির উড়ে যাওয়া বা গান করা, নদীর বয়ে চলা, সমুদ্রের ঊর্মিমুখরতা, গাছ বা তরুলতার বেড়ে ওঠা, বাতাসের বয়ে যাওয়া, জীবন ক্ষয়ে যাওয়া তথা সমস্ত বিশ্বের প্রকৃতির বেগের আবেগ বা গতিশীলতার সঙ্গে ছন্দের যোগ অবিচ্ছেদ্য। সুপরিকল্পিত ধ্বনিবিন্যাসের কারণে যে তরঙ্গভঙ্গি বা স্পন্দন বা ঝোঁক সৃষ্টি হয় তাকেই বলা যায় ছন্দের প্রাণ। বাক্য-পরম্পরায় ভাষাগত ধ্বনি প্রবাহের সুসমঞ্জস, সঙ্গীতমধুর ও তরঙ্গ-ঝঙ্কৃত ভঙ্গি রচনা করা হয় যে পরিমিত পদবিন্যাস রীতিতে, তাকে ছন্দ বলে। পর্বই ছন্দের প্রধান উপাদান। সে জন্য বলা যায়, ধ্বনির সঙ্গে তার উচ্চারণগত সময়ের সামঞ্জস্য বিধানের নাম ছন্দ। ছন্দ চক্ষুগ্রাহ্য নয়, এটি শ্র“তিগ্রাহ্য। এ জন্য ছন্দ ধরা পড়ে তখনই, যখন কবিতা আবৃত্তি করা হয়। কবিতা আবৃত্তি করার সময় তার ধ্বনি প্রবাহে যে সুললিত ও সুনিয়ন্ত্রিত দোলার সৃষ্টি হয় তারই নাম ছন্দ। প্রাথমিক পর্যায়ে পৃথিবীর সব ভাষার ছন্দই নাচের তাল এবং গানের সুরের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল; বাংলা ছন্দও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলা ছন্দ যতি এবং তালের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বলা যায় বাংলা ছন্দের গঠন ও গতি আর তালের গঠন ও গতি একই রকম।বাংলা ভাষার বিভিন্ন প্রবীণ ছন্দ বিশারদ ছন্দের নানা রকম সংজ্ঞা দিয়েছেন-
প্রবোধচন্দ্র সেন বলেছেন- “শিল্পিত বাকরীতির নামই ছন্দ”।
অমূল্যধন মুখোপাধ্যায়ের মতে- “যেভাবে পদবিন্যাস করলে বাক্য শ্রুতিমধুর হয় এবং মনে রসের সঞ্চার হয়, তাকে ছন্দ বলে।”
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন- “বাক্যস্থিত পদগুলিকে যেভাবে সাজালে বাক্যটি শ্রুতিমধুর হয় এবং তার মধ্যে কালগত ও ধ্বনিগত সুষমা উপলব্ধ হয়, পদ সাজাবার সেই পদ্ধতিকে ছন্দ বলে।”
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ভাষায়- “ছন্দ হল কবিতার শরীরে দোলা লাগাবার কায়দা।”
ছন্দবিজ্ঞানী আবদুল কাদিরের মতে- “শব্দের সুমিত ও সুনিয়মিত বিন্যাসকে বলা হয় ছন্দ।”
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছন্দকে সেতারের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন- “সেতারের তার বাঁধা থাকে বটে, কিন্তু তার থেকে সুর ছাড়া পায়। ছন্দ হচ্ছে সেই তার বাঁধা সেতার, তার অন্তরের সুরকে সে তাড়া দিতে থাকে।”
ভাষায় প্রাণ সঞ্চার করার জন্য, তরঙ্গ সৃষ্টির মাধ্যমে কথাকে ব্যঞ্জনাময় করার জন্য ছন্দের বিকল্প নেই। ছন্দ হলো কবিতার রক্তপ্রবাহ। এই যে ছন্দ, এটি কবিতায় কিন্তু আপনাতেই জেগে ওঠে না। কবিকে রীতিমত সাধনা করে ছন্দ নির্মাণ করতে হয়। কাব্যরসধর্মী সুষম শব্দ চয়নের মধ্য দিয়ে কবি কবিতায় ছন্দ নির্মাণ করেন। এই নির্মাণকৌশল যেমন গাণিতিক তেমনি আবার বৈজ্ঞানিক। সে কারণে ছন্দ এখন পেয়েছে বিজ্ঞানের মর্যাদা। বাংলা ছন্দ তিন প্রকার।
হ স্বরবৃত্ত
হ মাত্রাবৃত্ত এবং
হ অক্ষরবৃত্ত
এই তিন রকমের ছন্দের গতিও তিন রকম। তবে এর বাইরেও এখন গদ্য ছন্দকে আলাদা করার চেষ্টা চলছে। তা ছাড়া পয়ার, মহাপয়ার, একাবলি, ত্রিপদী, চৌপদী, গৈরিশ, অমিত্রাক্ষরসহ যেসব ছন্দ প্রচলিত রয়েছে সেগুলো কোনো না কোনোভাবে তিন প্রকার ছন্দের মধ্যে পড়ে যায়।
কবিতায় ছন্দের বিশেষ রূপকল্প থাকলেও সেটা চক্ষুগ্রাহ্য নয় বরং শ্রুতিগ্রাহ্য। ছন্দ কানের মাধ্যমে হৃদয়ে প্রবেশ করে পাঠক বা শ্রোতার অন্তরে ঝংকার সৃষ্টি করে তাকে বিমুগ্ধ করে তোলে। ছন্দ হচ্ছে বোধের এবং বিশেষত কানের বিষয় তাই একজন আবৃত্তিকারকে অবশ্যই সচেতন কান তৈরি করতে হবে। ছন্দ নিয়ে একদম ভীত হয়ে যাওয়ার দরকার নেই। তবে ছন্দ আপনাকে জানতেই হবে; এক্ষেত্রে কোন ছাড় নেই। তাই একজন বিশুদ্ধ আবৃত্তিকারের জন্য ছন্দ শেখা ছাড়া কোন বিকল্প নেই। ছন্দের ক্ষেত্রে সর্বশেষ যে কথাটি বলব তাহল কান আর কণ্ঠের মিলন না ঘটিয়ে ছন্দ শিখতে যাওয়া আর বর্ণনার মাধ্যমে সমুদ্রের স্বাদ উপভোগ করার মাঝে কোন পার্থক্য নেই। তাই একজন আবৃত্তিকারকে সচেতন কান তৈরি করতে হবে।রস
‘রস’ শব্দটির সাধারণ অর্থ ‘স্বাদ’। সংস্কৃত কাব্যশিল্পে ‘রস’ শব্দটির ব্যবহার ইক্ষুরস, সার, স্বর্ণ, বীর্য, দুগ্ধ, দ্রব পদার্থ, জল, অমৃত, মধু, পারদ, মদ এমনকি বিষ অর্থেও ব্যবহার হয়েছে। ‘রস’ শব্দের আরেক অর্থ ‘আস্বাদন করা’। রস মূলত আবেগের বিভিন্ন অবস্থা। মানুষের মনে যে অজস্র আবেগ বা ভাব থাকে তা থেকেই রসের উৎপত্তি। শিল্পের যে কোন কৌশলেরই লক্ষ্য রস সৃষ্টি। যা আস্বাদিত হয় তাই রস। যেমন : আমরা কোনো কিছু খাওয়ার বা পান করার পর আমাদের জিহবা আমাদের জানান দেয় কোনটি ঝাল, কোনটি টক, কোনটি মিষ্টি, কোনটি নোনতা ঠিক একইভাবে কবিতা পড়ার পরও আমাদের মনে এমন কিছু স্বাদ তৈরি হয় যার কোনোটা সুখের, কোনোটা দুঃখের, কোনোটা দ্রোহের, কোনোটা উৎসাহের, কোনোটা ভয়ের, কোনোটা বিস্ময়ের, কোনোটা প্রেমের, কোনোটা বেদনার তফাৎ হল একটার স্বাদ পাওয়া যায় জিহবা দিয়ে অন্যটা হৃদয় দিয়ে। সাহিত্য অঙ্গনে রস আস্বাদন বলতে বাহ্য ইন্দ্রিয়জ নয়, অন্তরগ্রাহ্য ব্যাপার অর্থাৎ সাহিত্যে রস স্বাদ গ্রহণ করা (ঃড় ঃধংঃব) নয়; অনুভব করা (ঃড় ভববষ) অর্থে প্রযোজ্য। মানুষের হৃদয়ের ইমোশন বা ভাবের পরিণতিই রস। আলঙ্কারিকদের ভাষায় ‘রস’ হচ্ছে ‘সহৃদয়হৃদয়সংবাদী’। বিভিন্ন রসতত্ত্ববিদ বিভিন্নভাবে রসের সংজ্ঞা দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের সংজ্ঞা এরূপ :আচার্য ভরত- ‘নহি রসাদৃতে কশ্চিদর্থ : প্রবর্ততে অর্থাৎ রস ব্যতীত কোন বিষয়েরই প্রবর্তনা হয় না’।
ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর- ‘যে হোক সে হোক ভাষা কাব্য রস লয়ে’।
অভিনব গুপ্ত- ‘রস হচ্ছে নিজের আনন্দময় সস্বি^তের আস্বাদরূপ একটি ব্যাপার’।
শ্রীশচন্দ্র দাস- দিব্য অনুভূতি সঞ্জাত নির্মল আনন্দময় মানসিক অবস্থাই রস।
ড. সুধীর কুমার দাস গুপ্ত- শব্দার্থজাত ভাবতন্ময় চিত্তে আনন্দ স্বরূপের প্রকাশই রস।
অতুল চন্দ্র গুপ্ত- সহৃদয় লোকের অর্থাৎ কাব্যানুশীলনের অভ্যাসবশে যাদের দর্পণের মতো নির্মল মন কাব্যের বর্ণনীয় বস্তুর যেন তন্ময়তা প্রাপ্ত হয়, এমন দরদি লোকের সুকাব্যজনিত চিত্তের অনুভূতি শেষের নামই রস। সুতরাং বলা যেতে পারে কাব্যরসের আধার কাব্যও নয় কবিও নয়- সহৃদয় কাব্য পাঠকের মন।
আনন্দবর্ধন মনে করেন, রসোদ্রেকেই কবির একমাত্র উদ্দেশ্য। অন্যতম আলঙ্কারিক জগন্নাথ রসকে কাব্যের রমণীয়ত্ব পর্যায়ে এনে এর ব্যাখ্যা করেন এভাবে : ‘অলৌকিক আনন্দের জ্ঞানগোচরতাই রমণীয়তা।’পঙক্তির সঠিক বিভাজন- আবৃত্তির সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে পঙক্তির সঠিক বিভাজনের ওপর। পঙক্তির বিভাজনের সময় অর্থ-ভাব ও আবেগ সঞ্চারণের দিকে নজর রাখতে হয়। স্বরের মাধুর্য বাড়ানোর জন্য, ছন্দের ঝংকার সঠিকভাবে দেয়ার জন্য, রসবোধ জাগ্রত করার জন্য কবিতার অন্তর্নিহিত ভাবকে চিত্রময় করে তোলার জন্য, কবিতার বিষয়ব¯র সঙ্গে নিজের বিশ্বাসের সমন্বয় ঘটানোর জন্য পঙক্তির সঠিক বিভাজন প্রয়োজন। পঙক্তির সঠিক বিভাজন করতে না পারলে কবিতাটিকে সফলভাবে উপস্থাপন করা যাবে না। কোথায় কোথায় থামতে হবে, কোথায় কণ্ঠকে একটু চাপ দিতে হবে, আর কোথায় কণ্ঠকে খাদে নামাতে হবে এবং কোথায় স্বস্তর নিচুতে নামাতে হবে আর ওঠাতে হবে এসবও নির্ভর করে পঙক্তি বিভাজনের ওপর। পঙক্তির সঙ্গে পঙক্তির সামঞ্জস্য বিধান করতে হবে। একটি পঙক্তি আবৃত্তি করার পর অন্য পঙক্তি কখন শুরু করবে সেটা ঠিক করে নিতে হবে। এমনভাবে পঙক্তি বিভাজন করা যাবে না যাতে কবিতাটি তার মূল বক্তব্য থেকে সরে যায়। আবেগের বিন্যাসও ওভাবেই করতে হবে যাতে অতিরঞ্জন না হয়।
স্বর, স্বরায়ন ও স্বরের প্রক্ষেপণ
স্বর
মানুষের মুখে উচ্চারিত ধ্বনিই স্বর। শ্বাস ছাড়ার সময় স্বরতন্ত্রীতে কম্পন সৃষ্টির মাধ্যমে স্বর উৎপন্ন হয়। যেহেতু স্বর আসে শ্বাস থেকে তাই আমরা স্বরের আলোচনার আগে সংক্ষেপে জেনে নেবো শ্বাস কী? আমাদের নিঃশ্বাস প্রশ্বাসকে শ্বাস বলে। কথা বলার সময় শ্বাস নেয়ার জন্য আমরা মাঝে মাঝে থেমে যাই কারণ শ্বাস ফুরিয়ে যায়। একজন সুস্থ মানুষ সাধারণত মিনিটে ১৫-১৮ বার শ্বাস গ্রহণ-বর্জন করে। শরীরতত্ত্ববিদদের মতে এই শ্বাস তিন প্রকার :
হ প্রবাহমূলক শ্বাস (ঞরফধষ নৎবধঃযরহম)
হ অবশিষ্ট শ্বাস (জবংরফঁধষ নৎবধঃযরহম)
হ অনুপূরক শ্বাস (ঝঁঢ়ঢ়ষরসবহঃধষ নৎবধঃযরহম)প্রবাহমূলক শ্বাস : জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমরা নাক দিয়ে নিরন্তর শ্বাস গ্রহণ বর্জন করেই চলছি। সাধারণত আমরা নাক দিয়ে যে শ্বাস গ্রহণ বর্জন করি তাকে প্রবাহমূলক শ্বাস বলে।
অবশিষ্ট শ্বাস : আমাদের দেহ যন্ত্র এমনভাবে তৈরি যে, সে সব সময় প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত কিছু বাতাস ভবিষ্যৎ অভাব পূরণের জন্য ধরে রাখে। ফলে দেখা যায় আমরা যতটা বাতাস নিঃশ্বাসের সময় গ্রহণ করি- ছাড়ি তার চেয়ে কম শ্বাস ছেড়ে দেয়ার পর ফুসফুসে অতিরিক্ত যে বাতাস থাকে তাকে অবশিষ্ট শ্বাস বলে।
অনুপূরক শ্বাস : আবৃত্তিশিল্পী, গানের শিল্পী, অভিনয়শিল্পী তথা যে কোন বাচিক শিল্পীকে কোন কোন ক্ষেত্রে এক নিঃশ্বাসেই দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলতে হয় বা শ্বাস ধরে রাখতে হয়। ফলে দেখা যায় তাদের জন্য অবশিষ্ট শ্বাসের চেয়েও অতিরিক্ত কিছু শ্বাস প্রয়োজন হয়। এই অতিরিক্ত শ্বাসচর্চার মাধ্যমে তৈরি করে নিতে হয়। এই অতিরিক্ত শ্বাসই হচ্ছে অনুপূরক শ্বাস। সাধারণত বেশি পরিমাণ শ্বাস নিয়ে তা অনেকক্ষণ ধরে রেখে ধীরে ধীরে ছাড়ার মাধ্যমে অনুপূরক শ্বাস সৃষ্টি করা যায়।
আবৃত্তির জন্য ‘স্বর’ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আমাদের গলার উত্থান পতনের ওপর স্বরের বিভিন্নতা নির্ভর করে। আমরা যখন শ্বাস নিই তখন আমাদের ফুসফুস ফুলে ওঠে। ফুসফুস থেকে বাতাস ত্যাগ করার সময় শ্বাসবায়ু স্বরতন্ত্রী ও মুখবিবরের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ও কম্পন সৃষ্টি করে। এই কম্পনের স্থান পরিমাণ অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন ধ্বনি সৃষ্টি হয়। এই ধ্বনিই আমাদের স্বর বা কণ্ঠস্বর।
স্বর মূলত তিন প্রকার। তবে ইদানীং আরও দুটি স্বরকে স্বীকার করে নেয়া হচ্ছে যদিও এই দুটি স্বর মূল তিনটি স্বরের যে কোনটিতে প্রয়োগ করা যেতে পারে।
মূল তিনটি স্বর
# উদাত্ত স্বর
# স্বরিত স্বর
# অনুদাত্ত স্বও
অন্য দু’টি স্বর
# কম্পিত স্বর
# ফিসফিস স্বর
উদাত্ত স্বর
মাঝে মাঝে আমরা স্বাভাবিক স্বরের চেয়ে উঁচু স্বরে কথা বলি। এই উঁচু স্বরই উদাত্ত স্বর। উদাত্ত স্বর হারমোনিয়ামের তারাতে অবিস্থত। সাধারণত বিপ্লব-বিদ্রোহ, ঘৃণা, অবজ্ঞা, উৎসাহমূলক কবিতা আবৃত্তিতে এই স্বর ব্যবহৃত হয়। যেমন-
আজ আবার হৃদয়ে কেবল যুদ্ধের দামামা
মনে হয় রক্তেই ফয়সালা।
বারুদই বিচারক। আর
স্বপ্নের ভেতর জেহাদ জেহাদ বলে জেগে ওঠা।
(বখতিয়ারের ঘোড়া- আল মাহমুদ)
স্বরিত স্বর- স্বরিত স্বর মানে মধ্যম প্রকৃতির স্বর। আমরা আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় যে স্বরে কথা বলি তাই স্বরিত স্বর। হারমোনিয়ামের মুদারাতে এই স্বর অবস্থিত। যেমন-
আমি ভালো নেই বলে তুমি ভালো আছো
আমার ভালো না থাকবার বিনিময়ে
তুমি অনন্তকাল ধরে ভালো থাকবে।
(নববর্ষে অমিতাভের প্রতি- নীলাঞ্জন বিদ্যুৎ)
অনুদাত্ত স্বর : মাঝে মাঝে আমরা স্বাভাবিক স্বরের চেয়ে নিচু স্বরে কথা বলি এবং কণ্ঠকে খাদে নামিয়ে ফেলি অর্থাৎ স্বাভাবিক স্বরের চেয়ে নিচু স্বরকেই অনুদাত্ত স্বর বলে। অনুদাত্ত স্বর হারমোনিয়ামের ‘উদারা’তে অবস্থিত। সাধারণত ভয়, বীভৎস বা করুণ কোন বিষয় নিয়ে কথা বলার সময় অথবা এরকম বিষয়ের কবিতা আবৃত্তি করার সময় আমরা আমাদের স্বরস্তরকে নিচে নামিয়ে আনি। যেমন-
ভন্ ভন্ ভন্ জমাট বেঁধেছে বুনো মশকের গান,
এঁদো ডোবা হতে বহিছে কঠোর পচান পাতার ঘ্রাণ।
ছোট কুঁড়েঘর বেড়ার ফাঁকেতে আসিছে শীতের বায়ু,
শিয়রে বসিয়া মনে মনে মাতা গনিছে ছেলের আয়ু।
(পল্লী জননী-জসীম উদ্দীন)
কম্পিত স্বর : স্বর যখন কম্পিতভাবে বেরিয়ে আসে তখন এ স্বরের সৃষ্টি হয়। উত্তেজনা এবং আবেগ প্রকাশের সময় অথবা মাঝে মাঝে শব্দকে শ্র“তি মধুর করার জন্য আমরা এ স্বর ব্যবহার করি। যেমনÑ
আমি উত্তর-বায়ু, মলয়-অনিল, উদাস পূরবী হাওয়া,
আমি পথিক কবির গভীর রাগিণী, বেণু-বীণে গান গাওয়া।
আমি আকুল নিদাঘ-তিয়াষা, আমি রৌদ্র-রুদ্র রবি,
আমি মরু-নির্ঝর ঝরঝর, আমি শ্যামলিমা ছায়া ছবি।
(বিদ্রোহী-কাজী নজরুল ইসলাম)
ফিসফিস স্বর- আমরা আমাদের গোপন কথা বলার সময় মাঝে মাঝে নিচু স্বরে কথা বলি, এই কথা কিছুটা বুঝা যায় কিছুটা বুঝা যায় না অর্থাৎ অস্পষ্ট থাকে। এই রকম কথা বলার সময় দেখা যায় শিস ধ্বনির মতো আওয়াজ হয় তাই একে ফিসফিস স্বর বলে। এ জাতীয় স্বর উৎপাদনে স্বরতন্ত্রীতে কিছু বেশি ফাঁকের দরকার হয়। যেমনÑ
খুব ভোর করে উঠিতে হইবে, সূর্যি উঠারও আগে,
কারেও কবি না, দেখিস, পায়ের শব্দে কেহ না জাগে।
রেল সড়কের ছোট খাদ ভরে
ডানকিনে মাছ কিলবিল করে;
কাদার বাঁধাল গাঁথি মাঝামাঝি জল সেঁচে আগে ভাগে,
সব মাছগুলো কুড়ায়ে আনিব কাহারো জানার আগে।
(নিমন্ত্রণ-জসীম উদ্দীন)স্বরায়ন
অভিব্যক্তির সুন্দর প্রকাশের জন্য কবিতা বা কোন বিষয়ের অন্তর্গত শব্দের ওঠানামা কেমন হবে, কোন শব্দের অধোপ্রকাশ হবে, কোনটির তীব্র প্রকাশ হবে, কোনটি অপ্রকাশ্য থাকবে, কোনটিকে চাপ দিয়ে বা বিলম্বিত বিস্তার ঘটিয়ে অর্থবহ করা উচিত তা একজন আবৃত্তিকারকে যথার্থ স্বর প্রয়োগ করে ঠিক করে নিতে হয়, এক্ষেত্রে বিষয়টি যদি কবিতা হয় তাহলে খেয়াল করতে হয় কবিতাটি কোন ছন্দে রচিত, এতে কোন রস প্রাধান্য পেয়েছে, কবিতাটির দর্শন কি, কবিতাটির চিত্রকল্প কেমন, কবিতাটির সাথে বাস্তব জীবনের মিল কতটুকু আছে। এরপর কবিতার বিষয়, ভাব ও অর্থের দিকে নজর রেখে কবিতাটির পঙক্তি বিভাজন করতে হয়। অর্থাৎ কবিতাটি আবৃত্তি করার পূর্বে কবিতাটিকে ভেঙেচুরে কিভাবে কোন স্বরে প্রকাশ করবে এই নিয়ে আবৃত্তিকারের যেই চিন্তন বা যেই নির্মাণ সেই চিন্তন বা নির্মাণকে বলে স্বরায়ন।স্বরের প্রক্ষেপণ
স্বরায়ন তৈরি হয়ে গেলে সেই স্বরায়নের প্রয়োগই হচ্ছে স্বরের প্রক্ষেপণ। এই প্রক্ষেপণ যথার্থ হওয়া চাই। আপনি একটা অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেন, অন্যরা তা শুনে বলবেন সেটা কী প্রকাশ হলো- ক্রোধ না বেদনা, লজ্জা না ব্যঙ্গ, হতাশা না উদ্দীপনা, আবেগ না উৎসাহ, বিপ্লব না বিদ্রোহ, ভালোলাগা না ভালোবাসা, প্রেম না প্রণয় ইত্যাদি। যদি অন্যরা আপনার প্রকাশিত অভিব্যক্তি বুঝতে পারে ও সবার মনে রসবোধ জাগ্রত হয় এবং বিষয় সম্পর্কে কোন অস্পষ্টতা না থাকে তাহলে বুঝতে হবে আপনার স্বরের প্রক্ষেপণ সঠিক হয়েছে। যদি অন্যরা আপনার প্রকাশিত বক্তব্য বুঝতে না পারে তাহলে আপনার স্বরের প্রক্ষেপণে ভুল ছিল। আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে কোন শব্দ কিভাবে উচ্চারিত হয় সেই দিকে; আবার একই শব্দ একাধিক ঢঙে উচ্চারিত হয়- সেদিকেও। যেমন- ‘আচ্ছা’ শব্দটি কখনো ব্যঙ্গ, কখনো বিস্ময়, কখনো সম্মতি, কখনো উৎসাহ, কখনো অনিচ্ছা, কখনো হুমকি, কখনো ক্রোধ আকারে ব্যবহার হতে পারে। অনুরূপ ভাবে ‘যাই’ শব্দটি ব্যস্ততা, আলস্য, বিষণœতা, উদ্দীপনা, বিরক্তি, প্রভৃতি অর্থে ব্যবহার হতে পারে। একইভাবে ‘হায়’ শব্দটি কখনো শোক, কখনো বিষণœতা, কখনো আনন্দ, কখনো নিন্দা, কখনো মুগ্ধতা, কখনো হতাশার ভাব বহন করতে পারে। এইক্ষেত্রে আবৃত্তিকারকে তার শিক্ষিত মনন দিয়ে শব্দের সঠিক প্রক্ষেপণ নিশ্চিত করতে হবে।কবিতা নির্মাণের একটি উদাহরণ:
কোরাস:
দুর্গম গিরি / কান্তার মরু / # দুস্তর পারা / বার #
লঙ্ঘিতে হবে / রাত্রি-নিশিথে, / # যাত্রীরা হুঁশি / য়ার #
দুলিতেছে তরী,/ ফুলিতেছে জল, / # ভুলিতেছে মাঝি/ পথ
ছিঁড়িয়াছে পাল, / কে ধরিবে হাল, / # আছে কার হিম্মত? # কে আছ জোয়ান, / # হও আগুয়ান, / # হাঁকিছে ভবিষ্যৎ। # এ তুফান ভারী,/ # দিতে হবে পাড়ি,/ # নিতে হবে তরী / পার ॥ # তিমিররাত্রি, / মাতৃমন্ত্রী / সান্ত্রীরা সাব/ধান! # যুগযুগান্ত / সঞ্চিত ব্যথা / # ঘোষিয়াছে অভি / যান। # ফেনাইয়া উঠে / বঞ্চিত বুকে / # পুঞ্জিত অভি / মান, # ইহাদের পথে, / # নিতে হবে সাথে, / # দিতে হবে অধিকার ॥ # অসহায় জাতি / মরিছে ডুবিয়া / # জানে না সন্ত / রণ, # কান্ডারী! # আজ / দেখিব তোমার / # মাতৃমুক্তি- / পণ! # ‘হিন্দু না ওরা / মুসলিম?’ # ওই / জিজ্ঞাসে কোন্ / জন ? # কান্ডারী ! # বলো, / ডুবিছে মানুষ, / # সন্তান মোর / মা’র !# গিরি-সঙ্কট, / ভীরু যাত্রীরা, / গুরু গরজায় / বাজ, # পশ্চাৎ-পথ/ যাত্রীর মনে / # সন্দেহ জাগে / আজ। # কান্ডারী! # তুমি / ভুলিবে কি পথ ? / # ত্যাজিবে কি পথ / মাঝ? # করে হানাহানি / # তবু চল টানি /# নিয়াছ যে মহা / ভার ॥ # কান্ডারী ! # তব / সম্মুখে ঐ / পলাশীর প্রান্তর, # বাঙালির খুনে / # লাল হ’ল যেথা / ক্লাইভের খঞ্জর! # ওই গঙ্গায় / ডুবিয়াছে হায় / # ভারতের দিবা / কর # উদিবে যে রবি / # আমাদেরি খুনে / # রাঙিয়া পুনর্বার ॥ # ফাঁসির মঞ্চে / গেয়ে গেল যারা / # জীবনের জয় / গান, # আসি’ অলক্ষে / দাঁড়ায়েছে তারা / # দেবে কোন বলি / দান? # আজি পরীক্ষা, / জাতির # অথবা / জাতেরে করিবে / ত্রাণ? # দুলিতেছে তরী / # ফুলিতেছে জল, / # কান্ডারী হুঁশি / য়ার ॥
(কান্ডারী হুঁশিয়ার- কাজী নজরুল ইসলাম )/- চিহ্ন/প্রতীক দ্বারা ছন্দের বিভাজন এবং
# – চিহ্ন/প্রতীক দ্বারা আবৃত্তির জন্য পঙক্তির বিভাজন বা নির্মাণ বুঝানো হয়েছে।
যেসব শব্দে মোটা দাগ দেয়া হয়েছে অর্থাৎ যেসব শব্দকে বোল্ড করে দেখানো হয়েছে সেগুলোতে ঝোঁক দিতে হবে এবং বলিষ্ঠ ও দৃপ্ত স্বর প্রয়োগ করতে হবে। তবে সবগুলোতে একই পরিমাণ বলিষ্ঠতা স্বর প্রয়োগ না করে কিছু শব্দে মৃদু বলিষ্ঠতা প্রয়াগ করতে হবে।বিষয়বস্তু : নজরুল যখন এই কবিতা লেখেন তখন হিন্দু-মুসলিম বিরোধ তুঙ্গে। এক সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার জন্য উদ্বেল। ১৯২৬ সালের দাঙ্গা কবিকে বিচলিত করেছিল। কৃষ্ণনগরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে পরিবেশন করার জন্য এই কবিতাটি তিনি রচনা করেন। এটি তিনি গান আকারে পরিবেশন করেছিলেন। হিন্দু এবং মুসলিম পুরাণের যুগপৎ প্রয়োগ করে তিনি উভয়ের মাঝে সেতুবন্ধ করতে চেয়েছেন। উভয়ের মিলন কামনা করেছেন। সাম্যের পথে, শান্তির পথে, মুক্তির পথে সবাইকে এক কাতারে নিয়ে আসতে চেয়েছেন। একদিকে ব্রিটিশদের অত্যাচার অন্যদিকে নিজেদের মধ্যে অন্তঃকলহ জাতিকে তার নিজস্বতা থেকে সরিয়ে দিচ্ছিল। তখন নজরুল এই কবিতা লিখে সবাইকে এক আসনে অধিষ্ঠিত করতে চাইলেন। এই কবিতায় আমাদের জাতীয় জীবনের যে দুর্যোগ দেখা দিয়েছিল সেখান থেকে মুক্তির পথ দেখানো হয়েছে। কবি দুর্যোগের ফাঁকেও নূতন দিনের উদীয়মান সূর্য দেখতে পাচ্ছেন। তাই তিনি সবাইকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন নিজেদের সমস্যাগুলো। এবং বাতলে দিয়েছেন সেখান থেকে উত্তরণের উপায়। নিজেদের অভ্যন্তরীণ ছোটখাটো বিভেদগুলোকে ভুলে বড় বিজয়ের জন্য ছুটে চলার প্রতি তিনি সবাইকে উদাত্ত আহবান করেছেন এই কবিতায়। আমরা যেন ভাইয়ে ভাইয়ে যুদ্ধ না করি এবং সবাই এক হয়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ি সেই স্বপ্ন তিনি আমাদের দেখিয়েছেন। এ দেশ হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সবার। সবাই মিলে এ দেশকে গড়ে তুলতে হবে। সব বিভেদের প্রাচীর ভেঙে ফেলতে হবে। সাম্যবাদের ঝান্ডা ওড়াতে হবে। নব দিগন্তের সূচনা করতে হবে। এ জন্য কবি কান্ডারী বা নকিব কে অনুরোধ করেছেন তিনি যেন নিজেদের মধ্যে দাঙ্গার দিকে না গিয়ে বরং এ দেশে যারা অবৈধভাবে অবস্থান করছে এবং এ দেশকে শোষণ করছে তাদের তাড়ানোর মন্ত্রে জাতিকে উজ্জীবিত করেন। এ কবিতায় দেখানো হয়েছে আমরা যদি এক হতে পারি তাহলে আমাদের বিজয় বেশি দূরে নয়। নিজেদের মধ্যে ঐক্যের সুরই এই কবিতার মূল ভাব।
কবি পরিচিতি এবং বোধ ও কাব্যবোধ : কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) সাম্যবাদী ভাবধারার এবং বিপ্লবী ভাবাপন্ন ছিলেন। তিনি আমাদের জাতীয় কবি। তিনি তার জীবনে ও সাহিত্যে আমাদের জাতির প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে কোন অন্যায় পারতপক্ষে করেননি তাই তিনি অন্যায়কে সহ্যও করতে পারেন না। তিনি আজীবন নতুন সৃষ্টিস্বপ্নে বিভোর ছিলেন। তাঁর চলার পথে তিনি কোন বাধাকেই পরোয়া করেননি বরং ঝর্ণাধারার মত নতুন পথ আবিষ্কার করে নিজের গন্তব্যে ছুটেছেন।
এই কবিতার বোধ হচ্ছে দুর্যোগ থেকে মুক্তির জন্য নিজের ভেতরে একটা অস্থিরতার ভাব জাগানো, সকল বাধাকে তুচ্ছ করে নতুন বিজয় ছিনিয়ে আনার জন্য নিজের ভেতরের সত্তাকে বিপ্লবের মন্ত্রে উজ্জীবিত করা। অর্থাৎ স্থিতি নয় গতিই জীবন, পরাজয় নয় বিজয়েই জীবনের আরাধ্য। সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে হিন্দু-মুসলিম মিলন কামনা এবং ব্রিটিশ তাড়ানোই এই কবিতার বোধ অর্থাৎ জাতীয় চেতনা জাগ্রত করাই এই কবিতার আলোচ্য।ছন্দ- কবিতাটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত। তাই এটি আবৃত্তি করার সময় বিশ্লিষ্ট ভঙ্গিতে প্রত্যেক শব্দের উচ্চারণ করতে হবে যাতে আবৃত্তি শুনেই সকল মাত্রা গণনা করা যায়। যদিও মাত্রাবৃত্ত ছন্দের কবিতা ধীর লয়ে আবৃত্তি করতে হয় কিন্তু এই কবিতা দ্রুত লয়ে আবৃত্তি করতে হবে। তবে খুব দ্রুতই এক পঙক্তির পর অপর পঙক্তি শুরু করে দিতে হবে। কোনোভাবেই এক পঙক্তি থেকে অপর পঙক্তির দূরত্ব তৈরি করা যাবে না। এ ছাড়া ছন্দ অধ্যায়ে মাত্রাবৃত্ত ছন্দের যে বৈশিষ্ট্য দেয়া আছে সেদিকেও কিছুটা খেয়াল রাখতে হবে।
রস এবং স্বর, স্বরায়ন ও স্বরের প্রক্ষেপণ : কবিতাটির মূলভাব হচ্ছে ‘উৎসাহ’ তাই এটি বীর রসের কবিতা। এই কবিতা আবৃত্তি করার সময় বিবেক বুদ্ধির উজ্জ্বল প্রকাশ ঘটবে। নতুন সৃষ্টির উন্মাদনায় মুখর থাকতে হবে। মনুষ্যসত্তার গভীরতর মহান চেতনার পরিপূর্ণ প্রকাশ ঘটার মতো ভাবাবেগ নিয়ে আসতে হবে। উৎসাহ, বীর্য, গর্ব, পরাক্রম ও সাম্য চেতনা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে। মাত্রাবৃত্ত ছন্দের কবিতার লয় বিলম্বিত হলেও এই কবিতায় লয় তুলনামূলকভাবে দ্রুত হবে। উদাত্ত স্বরে বা দরাজ কণ্ঠে কবিতাটি আবৃত্তি করতে হবে, বজ্র কঠিন বা দীপ্ত স্বর প্রয়োগ করতে হবে যাতে শ্রোতা বুঝতে পারে বিজয় খুব বেশি দূরে নয় এবং শ্রোতার মনে নতুন স্বপ্নের বীজ বুনে দিতে হবে স্বরের প্রক্ষেপণে। প্রতিটি শব্দ যেন কাঁটার ফলার মত বিদ্ধ করে শ্রোতার অন্তরকে, আবৃত্তিকারকে স্বরায়ন তৈরির সময় সেই দিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখতে হবে। আবৃত্তি করার সময় নিজের ভেতরে একটা উৎসাহ বা বীর্য বা গর্বের ভাব ধারণ করতে হবে, তাহলেই কবিতাটির রসবোধ শ্রোতার কাছে প্রস্ফুটিত হবে।
চিত্রকল্প : কবিতাটি আবৃত্তি করার সময় আবৃত্তিকারের হৃদয়ের ক্যানভাসে ফুটে উঠতে হবে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা, মানুষের রক্তক্ষরণ, আর সেই উত্তালতার মাঝে আলো ঝলমল নাবিক বা কান্ডারী; যিনি সকল সংশয়-বাধা-ধাঁধা-ভয়কে তুচ্ছ করে মিলনের লক্ষ্যে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে বলীয়ান।
ঝোঁক : এখানে ঝোঁক বলতে কোথাও কণ্ঠ খাদে নামিয়ে ভরাট করা, কোথাও প্রস্বর দেয়া এবং কোথাও কণ্ঠস্বর- উদাত্ত স্বরে তোলাকে বুঝতে হবে। যেসব শব্দ মোটা অর্থাৎ বোল্ড করে দেয়া হয়েছে সেই সব শব্দে ঝোঁক দিতে হবে প্রয়োজন অনুযায়ী।
পঙক্তির সঠিক বিভাজন : এখানে পঙক্তির একটা বিভাজন দেখিয়ে দেয়া হয়েছে। এই নির্মাণে কবিতাটি আবৃত্তি করলে অর্থ ও ভাব ফুটে উঠবে অথবা কেউ চাইলে এর কিছু ব্যতিক্রম নির্মাণ করেও কবিতাটির ভাব ও বিষয়বস্তু ফুটিয়ে তুলতে পারেন।
মুখস্থ করা : নজরুলের ‘কান্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতাটি মুখস্থ করে ফেলতে হবে কারণ মুখস্থ করলে পঙক্তির পর পঙক্তি যথাযথ আবেগে চিত্রকল্প সহকারে উপস্থাপন করা যায়। মুখস্থ না করলে কবিতাটি যে আবেগ দাবি করে তা যথার্থভাবে পূরণ করা প্রায় অসাধ্য; আবৃত্তির সময় মনোযোগ নষ্ট হয় এবং কবিতার বিশ্বাসের সাথে নিজের বিশ্বাসের মিল ঘটানো যায় না। তাই কবিতাটি মঞ্চে আবৃত্তি করার আগে মুখস্থ করে যাওয়া উচিত প্রত্যেক সচেতন আবৃত্তিকারের।
এই পর্যন্ত নির্মাণের যে বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো মেনে যদি কবিতা নির্মাণ করা হয় তাহলে অবশ্যই যে কোন আবৃত্তি উপযোগী কবিতা শ্রোতার মনে রসবোধ জাগ্রত করবেই। যদি এ বিষয়গুলো না মানা হয় তাহলে আবৃত্তি ভালোও হতে পারে, খারাপও হতে পারে এবং খারাপ হওয়ার দিকেই পাল্লা ভারী থাকবে। আমরা যদি কবিতা আবৃত্তিতে প্রাণ সঞ্চার করতে চাই তাহলে অবশ্যই নির্মাণপদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। এ জন্য আমাদের মনে সব সময় সজাগ থাকতে হবে সফল আবৃত্তির প্রাণ কবিতার সঠিক নির্মাণ।