রফিক আজাদ চলে গেলেন। তার মৃত্যুর পরই শুরু হয়েছে তার সাহিত্য নিয়ে আলোচনা। জীবন নিয়েও। রফিক আজাদের গদ্য ও পদ্য নিয়েও কথা হচ্ছে। রফিক আজাদ নিজের কবিতাকে নাকি পদ্য পরিচয় দিতেই বেশি ভালো বাসতেন। তার গদ্যের হাত ভালো ছিল না- বলছেন কেউ কেউ। নানা কথা।
ষাটের দশকে আবির্ভূত বাংলাভাষার কবিদের মধ্যে রফিক আজাদ অগ্রগণ্য। অনেক অকবিও এই দশকীয় তালিকায় আছেন যথারীতি। তারা থাকবেন। রফিক আজাদের সমসাময়িক কবিদের মধ্যে অনেকে শুধু মিডিয়ার কবি। সরকারি কবি- বেসরকারি কবিও আছেন। কিন্তু রফিক আজাদ একজন কবি। কোনো বিশেষণ ছাড়াই তিনি কবি।
রফিক আজাদ শুরুতে উচ্চকণ্ঠ নিয়ে পাঠকের কাছে উপস্থিত হন। পরে উচ্চগ্রামের কণ্ঠ নিচু হতে হতে মাটি ও মানুষের কাছে চলে আসে। এটাই তার কবিজীবনের প্রথম ও প্রধান বাঁক।
রফিক আজাদের কবিতা ধারাবাহিকভাবে পড়ে গেলে এমন কয়েকটা বাঁক চোখে পড়ে। প্রথমেই তার কবিতায় দেখি একজন প্রেমিক পুরুষের নারীর প্রেম-পিপাসা। এখানে ব্যক্তিগত প্রেম নিয়েই কবি কাতর। এর পর দেখি তার রাজনৈতিক ধারার কবিতাগুলো। এ পর্বেই তিনি লেখেন ‘ভাত দে হারামজাদা’। এখানে কবি দেশ ও জাতির পক্ষে তার কণ্ঠ জনতার মাইক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এর পরের পর্বে দেখা যায় কবি জাতীয়তার বৃত্ত ভেঙে বাইরে বেরিয়ে পড়েছেন। আন্তর্জাতিকতার দিকে তার গতি। কেন্দ্রাতিগ এই অভিগমন কবিকে একটি বিশাল উচ্চতায় নিয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ যেমন হিন্দুমেলার ‘শিবাজি-উৎসব’ পেরিয়ে ‘সভ্যতার সঙ্কটে’র লেখক ও বিশ্বকবি হয়েছেন।
রফিক আজাদের এই বিশালতা অবশ্য বাংলাসাহিত্যের আদি-মধ্যযুগের বড়– চন্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যের কৃষ্ণচরিত্রকে যেন অনুসরণ করেছে। কৃষ্ণলীলা বা কীর্তনে রাধার বিরহের কারণ কৃষ্ণের প্রত্যাখ্যানে। কিন্তু কৃষ্ণ কেন রাধাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন? রাধার দেহদুর্গ জয় করার পরে কৃষ্ণের মনে বিরাট এক ধরনের পরিবর্তন চলে আসে। কৈশোর পেরিয়ে যেন তিনি বড় হয়ে ওঠেন। ব্যক্তিপ্রেমের যেখানে শেষ সেখান থেকেই তো কৃষ্ণের দেশপ্রেম শুরু। তিনি ভোলেননি যে, ঊর্ধ্বজগতে দেবতারা পরামর্শ করে তাকে পৃথিবীতে অবতীর্ণ করেছেন অত্যাচারী রাজা কংসকে বধ করার জন্যই। কাজেই কৃষ্ণ প্রবৃত্তির বন্দিদশা থেকে মুক্ত হওয়ার পর ব্যক্তিপ্রেম ত্যাগ করেন-এটা ত্যাগ নাকি তিতিক্ষা! এর পর হৃদয়ে দেশপ্রেম জেগে ওঠার পরে জনগণের কথা ভাবতে শুরু করেন। তাই তিনি রাধাকে ত্যাগ করে, বৃন্দাবন ছেড়ে মথুরার উদ্দেশে অভিযাত্রা করেন। সেদিন থেকেই রাধার বিরহের শুরু হয়। আরাকান রাজ্য থেকে শুরু করে আফগানিস্তানের সীমা পর্যন্ত প্রায় সব কটি ভাষায় লাখ লাখ গান ও কবিতা রচিত হয়েছে রাধার এই বিরহকে কেন্দ্র করেই।
রফিক আজাদ কিন্তু জাত-জাতি আর জাতীয়তার সীমারেখা মেনে নিয়ে বড়– চন্ডীদাসের উঠানেই আটকে থাকেননি। তিনি সেই উঠান পেরিয়ে বহির্বাটির দিকে হেঁটেছেন। আর সেই যাত্রাপথের গন্তব্যকে রূপক অর্থে প্রকাশ করেছেন ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’।
প্লাতোর গণরাজ্য ছিল দার্শনিকশাসিত একটি অভিজাততান্ত্রিক দেশ। সেখানে কবিদের স্থান ছিল না। মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর ‘চন্ডীমঙ্গলকাব্যে’ কালকেতুর গুজরাট রাজ্যেও বাউল-বৈষ্ণব বা কবিয়ালের স্থান দেখা যায় না। বাংলাসাহিত্যের ইতিহাস অনুসরণ করলে অবশ্য মুকুন্দরামের অভিজ্ঞতার সময়টা বাউল-কবিয়ালদের উদ্ভবের আগের বলেই মনে হয়। কিন্তু বৈষ্ণবদের তো সেখানে উঁচু স্থান দেখা যায় না। চন্ডীভক্ত মুকুন্দরাম কি বৈষ্ণবদের সচেতনভাবেই এড়িয়ে গেছেন? তবে তার গুজরাট রাজ্যটি কিন্তু প্রচলিত অর্থে মানবিক না। যদিও সেখানে হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মের শক্ত অবস্থান চোখে পড়ে। গুজরাট রাজ্য ধর্মনিরপেক্ষ না; অসাম্প্রদায়িকও না। কিন্তু ধর্মসহিষ্ণু। মুকুন্দরাম কিংবা তার সৃষ্ট চরিত্র কালকেতু কেউ ধর্মনিরপেক্ষ বা অসাম্প্রদায়িক ছিলেন না; ছিলেন পরধর্ম ও মতে সহিষ্ণু। কালকেতু গুজরাট রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন যদিও মধ্যযুগের ধর্মবিশ্বাস অনুসারে এবং নিজস্ব সময়ে ধর্মাদর্শের পরিধির ভেতরে থেকেই। চার শ’ বছর পরের পাঠে আজ দেখি এ কারণে সাধারণ দৃষ্টিতে মনে হয় দেবী চন্ডীর আদেশে দেবীর আরাধনা প্রচলন এবং বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করাই ছিল রাজ্যপ্রতিষ্ঠার মুখ্য কারণ। কিন্তু ভেতরে দেখা যায় দেবীর কাছে নিষাদ কালকেতু ও তার স্ত্রী ফুল্লরার ব্যাপক হারে পশু-প্রাণী নিধন, চামড়া খুলে চামড়া-মাংস ইত্যাদি বিক্রি শুরু করলে বনের প্রাণীরা দেবীর কাছে প্রতিকারের জন্য নালিশ জানায়। দেবী চন্ডী সেসব প্রাণীর আর্তনাদ শুনে প্রাণীদের বাঁচার অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য গুজরাট রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার আদেশ দেন।
প্লাতোর গণরাজ্য, ফরাসি সমাজতান্ত্রিকদের ইউটোপিয়া সমাজ, মার্কসের সাম্যবাদী সমাজ, লেনিন-স্তালিনের সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক দেশ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ময়নাদ্বীপ সবগুলোই মানবিক। মানুষের সুখ ও আনন্দ, আরাম ও আয়েশের দিক লক্ষ্য করে এসব জনপদের কল্পনা ও পরিকল্পনা। কিন্তু মুকুন্দরামের গুজরাট সে অর্থে মানবিক না; এটা সর্বপ্রাণিক। রফিক আজাদের চুনিয়া গ্রামটি তো একটি গ্রামমাত্র। এ গ্রামটি আন্তর্জাতিক চিন্তাচর্চার আলোচ্য বিষয়ও না। কারণ তিনি কবি; কবির পাগলামিকেই বড় করে দেখতে অভ্যস্ত আমরা। কিন্তু চুনিয়া গ্রামটি-
চুনিয়া একটি গ্রাম, ছোট কিন্তু ভেতরে- ভেতরে
খুব শক্তিশালী মারণাস্ত্রময় সভ্যতার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে।
দুই
রফিক আজাদের মধ্যে দেখতে পাই ব্যক্তিগত প্রেম পর্ব শেষ হলে জাত-জাতি-জাতীয়তার পর্ব, এর পরে বিশ্বমানবিকতা এবং তারপরে সর্বপ্রাণবাদী ভাবনা। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ছিল তিরিশের কবিদের রচিত পথ। রফিক আজাদ সে পথে কিছু দূর হেঁটে দেখেন এ পথ একটা বয়সের আবেগ ও ব্যক্তিস্বার্থ সর্বস্বতাকে ধারণ করে বেড়ে ওঠে। এ পথে বেশি দূর যাওয়া ঠিক হবে না। তাই তিনি গেলেন চল্লিশের কবিদের রাজনৈতিক পথে। এই পথে হাঁটলেন স্বাধীনতার পরের সময়ও। এটা তিরিশি কবিদের উল্টাপথ। কিছুদিন পরে দেখলেন তিনি এ পথও কাক্সিক্ষত পথ না। স্বাধীনতার আগে এবং পরে এর মূল্যায়ন ভিন্ন রকমের হয়। তিনি গেলেন মানবতাবাদী পথে। সে পথ থেকে আন্তর্জাতিক পথে। এর পরে শুধু বাঙালির না, শুধু মানুষের না; সকল প্রাণীর কবি হয়ে উঠলেন।
রফিক আজাদের মনে কিন্তু শুরু থেকেই মনুষ্যত্বের প্রাণীর প্রতি একটা টান দেখা গেছে। প্রথম দিকে যখন তিনি প্রেমের কবিতা লিখছেন, ‘ভালোবাসার সংজ্ঞা’, ‘যদি ভালোবাসা পাই’, ‘আমাকে প্রশ্রয় দাও’, ‘জেগে ওঠো নারী’, ‘ভালোবাসা পেলে কোন বোকা পড়ে থাকে নষ্ট জলে’ প্রভৃতি কবিতার যুগেও ‘আমাকে প্রশ্রয় দাও’ কবিতায় লিখেছেন,
তোমার প্রশ্রয় পেলে
কুকুরেরও পায়ের কাঁটা খুব যত্নে
খুলে দেবো;
রফিক আজাদের কাব্য জগতের এই মহাপথপরিক্রমা স্মরণে না রাখলে মনে হতে পারে কবি উঠতি বয়সে তারুণ্যের আবেগে প্রিয়তমার হৃদয়ে আশ্রয় পাওয়ার জন্য তার পোষা কুকুরকেও সমাদর করবেন বলে প্রলোভন দেখাচ্ছেন। কিন্তু বিষয়টা তা না। মধ্যবিত্তের রুচিতে আঘাত করেই তিনি বড়লোকের পোষা কুকুর না; যে কোনো কুকুরের পায়ের কাঁটা খুলে দেয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। পরবর্তী কালে যখন লেখেন, ‘ক্ষমা করো হে বহমান উদার অমেয় বাতাস’-এর মতো কবিতা তখন বোঝা যায় তার হৃদয়ের এ পরিচয়টা আগে লুকানো ছিল।
একটি ঘাসফড়িংয়ের জন্যে আজ বুকের বাঁ পাশে
ব্যথা হয়: সুদূর শৈশবে একদিন পায়ে পিষে
মেরে ফেলে আজ খুব অনুতপ্ত, শ্বাসকষ্ট হয়;-
হৃদরোগে আক্রান্ত মানুষ, নিঃশ্বাস নেয়ার জন্যে
অসংখ্য সবুজ চারা কেন আমি করিনি রোপণ?
স্বচ্ছ জলে কেলিপরায়ণ চারিপলার ঝাঁক কেন
দেখিনি নয়ন ভরে হাঁটুজল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে
যখন আমার দৃষ্টি খুব স্বচ্ছ ছিলো সে সময়
দু’টি চোখ মেলে অপরাহ্ণে অতিথি পাখির ওড়া
যদি খুব ক’রে দেখে যাওয়া যেতো কী যে ভালো হতো!
অথচ মাঝখানে তিনি লিখেছেন সেই যে ‘ভাত দে হারামজাদা’- যা দিয়ে তিনি একশ্রেণীর পাঠকের কাছে প্রবলভাবে পরিচিত হন। সেই পরিচয়টাই তার প্রধান না। ভাত দে হারামজাদা না লিখলেও তিনি অনেক কবিতার জন্য কবি হিসেবে অমর হয়ে থাকতেন। কিছু মানুষ কবির কাছে সবরকমের সবকিছু দাবি করেন। এর মধ্যে তার নিজের না বলা স্লোগানটাও থাকে। এ ধরনের পাঠকের কাছে রফিক আজাদ ঐ কবিতাটির জন্য বড় হয়ে আছেন। কিন্তু তিনি আরো বড় মাপের কবি। ঐ চিৎকারটুকু ছাড়াই তিনি কবি। পরে দেখা যায় তিনি এ চিন্তা থেকে অনেক দূরে সরে এসেছেন। কারণ, “চুনিয়া চিৎকার খুব অপছন্দ করে।” এমন আরো একটি কবিতার নাম ‘মায়ের দু’চোখ চাই’। লিখেছেন,
মা ক্যাঙ্গারু যে আদরে পেটের থলিতে ধরে তার
স্নেহের শাবক- সেই আদরের মাপে আমি আজ
তৈরি হয়ে আছি- যে কোনো শিশুকে তুলে নেবো-
একাত্তরে পরাজিত শত্রুর সন্তানে দেবো কোল,
ভালোবেসে নিজের বুকের দুধ খাওয়াবো আদরে:
চারদিক থেকে ঘিরে, আয় বাবা বুকে করি,
মানিক রতন, আয় আঁচলের গিঁটে বেঁধে রাখি।
আমার বিশ্বাস বাংলাদেশের দ্বিতীয় কোনো কবি এমন পঙ্ক্তি রচনা করার যোগ্যতা রাখেন না। সেই হাংরি জেনারেশনের প্রভাবে ভাতের স্লোগান কিংবা কবির ব্যক্তিগত জীবনে মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বব্যঞ্জক স্মৃতি সব এখানে তুচ্ছ হয়ে যায়। উচ্চ থাকে শুধু কবির কাব্যময় আবেগ। হাজার বছরের বাংলা কবিতার এটাই মূল উপকরণ। এর আগের কয়েকটি পঙ্ক্তি :
আমার এ দু’টি চোখ খুলে নিয়ে যাওÑ ‘সন্ধানী’ বা
‘অরবিস’কে দিয়ে দাও উপড়ানো আমার কর্নিয়া;
বিনিময়ে চাই হাম্বারত গাভীর সজল দৃষ্টি;
চোখ ভ’রে চেয়ে দেখি চতুর্দিকে আমার বাছুর।
গাছপালাদের মধ্যে, পশু ও পাখির মধ্যে আজ
প্রাণ ভ’রে দেখতে দাও আমার অগণন সন্তান।
জাতীয়তাবাদী যুগের পরে রফিক আজাদ লিখেছিলেন,
প্রেসিডেন্ট নিকসনের কাছে তুমি আমার ঠিকানা খুঁজতে গিয়েছ বৃথা-
ওয়াশিংটনে নয় যদি এশিয়ার শীতার্ত রাত্রিতে
পথচারী পথিকের কাছে যেতে,
তবে হয়তো কিছুটা খবর পেতে
এখানে কবি জাতীয়তার সীমা পেরিয়ে, দেশীয় সীমা পেরিয়ে মহাদেশীয়তার দিকে গিয়েছেন। নিজেকে একজন এশীয় বলেই ঘোষণা করেছেন।
মানবসভ্যতা, মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের অহঙ্কারী সব উপকরণগুলো কবির মনে প্রথমে সংশয় জাগিয়ে ছিল পরে সরাসরি বিরোধ সৃষ্টি হয়। এ পর্বে তিনি ‘উদ্ভদেরা সহজ সরল নয়’ কবিতায় লেখেন,
স্তর-পর পরাক্রমে-এতোদূর এসেও আমরা
কতোটুকু এগিয়েছি?Ñ প্রকৃতির সঙ্গে অবশেষে
সমস্ত মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে নাকি?Ñ হয়নি তো।
বরং বাড়ছে দ্রুত মানুষে উদ্ভিদে অন্তহীন
ব্যবধান। জটিলতা বেড়ে গ্যাছে স্বভাবে- মেধায়।
এই যে মানুষকে, মানবসভ্যতাকে, মানবতাবাদকে প্রকৃতির আদালতে মামলার আসামি করে তোলা হআে এ কি শুধুই কবির পাগলামি! রবীন্দ্রনাথ যখন মানবসভ্যতার নিজেদের সৃষ্ট মহাসঙ্কটে বলেন, ‘মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ’, রফিক আজাদ সেখানে আরো সাহসী কথাই উচ্চারণ করেন। রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভ্রমণের অভিজ্ঞতা ছিল, ছিল তার নিজস্ব ঐশী বিশ্বাস ও ভাবনা, তবু মানুষের ওপর ভরসা তিনি একেবারে হারাতে চাননি। রফিক আজাদ মানুষকে মামলার আসামি করে ছাড়লেন। কারণ মানুষের সৃজনশীলতার নামে যা-খুশি তা করার অধিকার নেই। এ জগৎটা শুধু মানুষের না। ‘মানবিক অভিজ্ঞতা এইভাবে সম্পন্ন হয়েছে’ কবিতায় তিনি মানবতাবাদী দর্শনের ভেতর দিয়ে বরাবর প্রবেশ করে অন্য প্রান্ত দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাই পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন। ‘পদব্রজে না পায়ে হেঁটে’ কবিতায় দেখা যায় কবি বিশুদ্ধিবাদ থেকে সাধারণ মানুষের সারিতে নেমে এসেছেন। আবার ‘আমরা খুব ছোট হ’য়ে গেছি’ কবিতায় দেখি কিছু বড় বড় মানুষের সম্পর্কে নবমূল্যায়ন।
চারদিকে গিসগিস করে লোক, লোকের দঙ্গল
সকলেই ন্যুব্জপীঠ- কই সেই প্রকৃত পুরুষ?
ঢ্যাঁড়া পিটে পিটে, কাগজেরা যাদের করেছে বড়-
ফাঁপিয়ে চুলের গুচ্ছ যারা আজ ঐ বাড়িয়েছে
সামান্য উচ্চতা- মনোযোগ সহকারে তুমি যদি
মিটারে-লিটারে মাপো, মেপে দ্যাখো তরলে-নিরেটে
দেখবে তারা কতো ছোট- তুচ্ছ, শুষ্ক তৃণেরও অধম!
ইতিহাসের পৃষ্ঠায়, টীকা-টিপ্পনীতে বা সংবাদপত্রের পাতায় যারা অনেকখানি স্পেস জুড়ে আছেন বা থাকেন, তাদের সম্পর্কে কবির এই মন্তব্য। মিটারে লিটারে মেপে দেখলে তারা আসলে কিছুই না। ইতিহাস এবং রাজনীতি সম্পর্কে কবির সব ধারণা যেন এই মন্তব্যে বিস্ফোরিত হয়েছে।
রফিক আজাদ রাগী জাতীয়তাবাদী থেকে হন মানবতাবাদী। মানবতাবাদ থেকে সর্বপ্রাণবাদী। বাংলাদেশে আর মাত্র একজনকে সর্বপ্রাণবাদী হিসেবে বড় মাপে দেখা গেছে; তিনি সেলিম আল দীন। তার ‘প্রাচ্য’ নাটকে সাপের কামড়ে স্ত্রী মারা যাওয়ার পরে শোকে পাগল স্বামী মাটি ফালা ফালা করে খুঁজে পেয়েও সাপকে হত্যা করতে মায়া অনুভব করে। বিশ্বপ্রকৃতির অংশ সাপটি হয়তো তার মতোই শোকগ্রস্ত; তারও জীবন আছে, শোক-তাপ বিরহ আছে। রফিক আজাদও বিশ্বপ্রকৃতির অংশ করে দেখেন নিজেকেই। তাই ‘খুব বেশি দূরে নয়’ কবিতায় লেখেন,
বাবাÑ বলে ডেকে ওঠে কচি কলাপাতা।
রফিক আজাদের এই উত্থান ছাড়িয়ে যায় বাঙালি কবি চন্ডীদাসকে। সবার ওপরে মানুষ নয়। মানুষ অন্য সব প্রাণীর পাশাপাশি বসবাসকারী এবং সহবাসী।
তবে রফিক আজাদ দার্শনিক নন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বা সমাজতাত্ত্বিক নন। তার সব চিন্তা প্রকাশিত হয়েছে কাব্য ভাষায়। তিনি কি তার চিন্তা যুক্তিতর্কের পরে তত্ত্ব আকারে উপস্থাপন করেছেন যে তা নির্দ্বন্দ্ব বলে গ্রহণ করা যাবে? আধুনিক যুগের কোনো কবি কখনো কি নির্দ্বন্দ্ব থাকতে পারেন? তাই রফিক আজাদ ‘বিপরীত জীবন-যাপন’ কবিতায় লিখেছেন,
নানা বৈপরীত্যে বেঁচে-থাকা এই সামান্য জীবন
কেটে যায় দ্বিধাদ্বন্দ্বে। বিপরীত চিন্তা¯্রােতরাশি
সর্বদা সমূহভাবে আমাকেই ব্যতিব্যস্ত রাখে।
এখানেই রফিক আজাদ বড় কবি। হ