আমরা এখন এমন একটা যুগে বাস করছি যখন সাহিত্য আর বিশুদ্ধভাবে জাতীয় নয়, বেশ-কিছুটা আন্তর্জাতিক। যতদূর চোখ যায় ঠিক ততদূর অবধি নয়, তার পরেও সাহিত্যের পরিধি প্রসারিত। এই প্রসারণ ঘটেছে যেমন চিন্তায় ও অনুভবে, তেমনি আঙ্গিকে-বিশেষ করে বাংলাসাহিত্যে, পশ্চিমের প্রভাবে। এটা ঘটাই মঙ্গল, এই উপলব্ধি এবং অভিজ্ঞতা আমাদের। এই সংঘটনে বাঞ্ছনীয় অনেক-কিছু ছিল এবং আছে, শতাধিক বছরে বাংলাভাষায় রচিত সাহিত্যের প্রগতি তার প্রমাণ। বস্তুত পশ্চিমের সংস্পর্শে না এলে এই সাহিত্যের এবং এই ভাষাভাষী শিক্ষিত জন-মানসের এতটা মুক্তি সম্ভব হতো না, এই সাহিত্য এবং সমাজ মধ্যযুগেই থেকে যেত। কিন্তু মাঝে মাঝে এও মনে হয়, এর সীমারেখা কোথাও একটা আছে, থাকা উচিত, কেননা সময় বদলে যাচ্ছে, সেই সঙ্গে পশ্চিমও। এবং জাগতিক ঐশ্বর্য শুধু নয়, মানসিক ঐশ্বর্যও কারো এক রকম থাকে না চিরদিন, এমনকি পশ্চিমেও না।
বিগত শতাধিক বছরের দিকে তাকিয়ে আমরা অবশ্যই স্বীকার করব পশ্চিমের সংস্পর্শে এসে বাংলাভাষা এবং সাহিত্য অনেক উপকৃত হয়েছে, তাই বলে পশ্চিমের যা-কিছু উল্লেখযোগ্য অথবা বিখ্যাত তার সবকিছুরই দৃষ্টান্ত অনুসরণে উপকার হবে, অথবা সবকিছু অনুসরণের দরকার আছে এরূপ ধারণা খুব সঙ্গত মনে হয় না। এ-কথা আমি ভাবছি ভাববস্তু এবং আঙ্গিক উভয় সম্বন্ধেই। এ-প্রসঙ্গে বিশেষভাবে যা বিবেচনা করবার তা হচ্ছে, অন্যান্য সমাজ ও সংস্কৃতির বিশেষ পরিস্থিতিতে যা স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয় তা আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির পরিস্থিতি ও প্রয়োজন অন্য রকম হয়। সাহিত্য যদি সমাজ ও সংস্কৃতির ফসল হয়, তাহলে ভূমির প্রকৃতি এবং মৌসুমের আয়োজন এক রকম না হলে ঠিক একই রকম ফসল প্রত্যাশা করা অসঙ্গত। সেরূপ প্রত্যাশা এবং যথেষ্ট অধ্যবসায়ের ফলে কিছু ফসল উৎপন্ন হওয়া খুবই সম্ভব; কিন্তু সাফল্যে তারতম্যও অবশ্যম্ভাবী। সেই সঙ্গে আরও একটি ফসল ঘরে তুলতে হয়, তার নাম অস্বাভাবিকতা। পরিস্থিতির প্রশ্নটি অবাস্তব নয়; যদি অবাস্তব হতো তাহলে ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডের কাব্যে আধুনিকতার আরম্ভ হতো প্রায় একই সময়ে, কেননা এই দু’দেশের মাঝখানে একটা প্রণালী মাত্র, যা অধুনা তরুণীরাও সাঁতার কেটে পার হতে পারে। কিন্তু ইংরেজি কাব্যে আধুনিকতার আরম্ভ ফরাসি কাব্যের প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে।
আমি বিশেষভাবে কোনো রীতির কথা-রোমান্টিক অথবা ক্লাসিক্যাল রীতির কথা ভাবছি না। এই দু’টি রীতি নির্ভরশীল যেমন ব্যক্তি-প্রতিভার স্বরূপের ওপর, তেমনি যুগ-প্রকৃতির ওপর: বরং দেখা যায় যুগ-প্রকৃতির ওপরই বেশি, কেননা রোমান্টিক যুগে ক্লাসিক্যাল মেজাজের লেখক এবং ক্লাসিক্যাল যুগে রোমান্টিক মেজাজের লেখক তাঁর প্রতিভা স্ফুরণের পূর্ণ সুযোগ পান না, এবং এই কারণে তাঁর প্রতিভাকে ম্লান হতে দেখা যায়। তা সত্ত্বেও আমার মনে হয়, প্রত্যেক লেখকের জন্য সঙ্গত নিজের প্রতিভার প্রতি বিশ্বস্ত থাকা: পরিবেষ্টনের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা, দাস হিসাবে নয়, ইতিহাসের প্রয়োজন হিসাবে: স্বাভাবিকভাবে সাহিত্য-সাধনা করা, এবং যুগের রেওয়াজের দাসত্ব বরণ না করা। লেখক যে-সমাজ ও সংস্কৃতির মধ্যে অবস্থান করেন তার স্বরূপ ও প্রয়োজনটি চিনে নিয়ে, এবং নিজের প্রতিভার প্রতি বিশ্বস্ত থেকে স্বাভাবিকভাবে নিজেকে ব্যক্ত করাই তাঁর কাজ। নিজেকে ব্যক্ত করার মধ্যে বিশুদ্ধভাবে নিজেকে ব্যক্ত করা কিছুটা থাকতে পারে: আমি এখানে বিশেষভাবে যে-কথার ওপর জোর দিতে চাই তা হচ্ছে লেখক শুধু ব্যক্তি নন, সামাজিক ব্যক্তি এবং সমাজ-মানসের অন্তত একাংশের প্রতিনিধি। নিজের সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতিও তাঁর একটা দায়িত্ব আছে, অবশ্য উত্তর লেখকের অনুরূপ দায়িত্ব, অবিকল সমাজকল্যাণীর অনুরূপ নয়। এই দায়িত্ব-সচেতনতা ব্যতীত কোনো লেখক বৃহৎ অর্থে মহৎ হতে পারেন এবং মহৎ সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারেন বলে মনে হয় না।
এই পর্যায়ে, মনে হয়, এই আলোচনায় ব্যবহৃত কয়েকটি শব্দের প্রয়োগ সম্বন্ধে কিছু বলা দরকার, যদিও তা ঠিক প্রাসঙ্গিক নয়। আমাদের সমালোচনামূলক রচনাপুঞ্জে ‘কাব্য’ এবং ‘সাহিত্য’ শব্দ দু’টি কখনো কখনো স্বতন্ত্র অর্থে ব্যবহৃত হয়, এবং এরূপ ব্যবহার বাড়ছে বলে মনে হয় যখনই কেউ বলেন ‘কাব্য ও সাহিত্য’, যদিও কাব্য সাহিত্যেরই অন্তর্গত এবং সাহিত্যের আধুনিক কালে প্রচলিত হয়েছে, ‘কাব্য’ তার একটি শাখা হিসাবে। (সংস্কৃত নন্দন-তত্ত্বে কাব্য ছিল সাহিত্যের প্রায় সমার্থক, ঐ ব্যাপক অর্থে। নাটক ছিল ‘দৃশ্যকাব্য’।) এখন শব্দ দু’টির স্বতন্ত্র অর্থীকরণ সঙ্গত বলে মনে হয় না। তেমনি অসঙ্গত মনে হয় স্বতন্ত্র অর্থে ‘কবি’ ও ‘সাহিত্যিক’ (অথবা ‘লেখক’) শব্দ দু’টির ব্যবহার। বস্তুত কবি ‘সাহিত্যিক’-এর অন্তর্গত এবং ‘লেখক’-এরও। শব্দগুলি ঐ রকম পরস্পর-বিচ্ছিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হতে থাকলে শিগগিরই আধুনিক যুগের বাংলা সমালোচনা-সাহিত্য দুর্বোধ্য হয়ে উঠবে এবং ইংরেজি সমালোচনা-সাহিত্যও, কেননা ঐ সাহিত্যের অন্তর্গত কাব্য এবং লেখকের অন্তর্গত কবি। আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা এই যে, ইংরেজি সমালোচনায় ‘সাহিত্য’ কথাটা ব্যবহৃত হয় না। (হলেও তা ব্যতিক্রম মাত্র): ঐ সাহিত্যে সাহিত্যিক বলতে ব্যবহৃত হয় ‘লেখক’। আমি এ-আলোচনায় সাহিত্য বলতে কবিতাসহ সৃষ্টিধর্মী সব রকম সাহিত্যই বোঝাচ্ছি এবং সাহিত্যিক ও লেখক বলতে কবিকেও।
আমি বলেছিলাম আমাদের সাহিত্যে পশ্চিমের প্রভাবের কথা। চিন্তা ও প্রকরণ উভয়ের ব্যাপারে পশ্চিমী, এবং ব্যাপকভাবে বলতে গেলে বিদেশী, সাহিত্যের দৃষ্টান্ত অনুসরণ বাংলা সাহিত্যে নতুন কিছু নয়: কিন্তু আধুনিক বাংলা কাব্য বলতে যে রবীন্দ্রপ্রভাবমুক্ত অথবা মুক্তি-প্রয়াসী বাংলা কাব্য বোঝায় (একে অতি-আধুনিক কাব্য বলাই বোধ হয় সঙ্গত), তার মধ্যে, ঐ অনুসরণের ব্যাপারে কিছু চিন্তাহীন নির্বিচারে প্রয়াস আছে কি না তা সাহিত্যের স্বাস্থ্যের জন্য মাঝে মাঝে ভেবে দেখা দরকার। এখানকার আধুনিক কবিতাবৃত্তে পাশ্চাত্যের (এবং পশ্চিমবঙ্গেরও) আধুনিক কবিতার ভক্তের অভাব নেই: কবিতার শুধু নয়, সাহিত্যের অন্যান্য শাখাও কিছু পরিমাণে, তবে বিশেষ করে কবিতার। সময় সময় মনে হয়, ঐ ভক্তিময়তার মধ্যে কিছু বিহ্বলতা আছে। গোটা সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে-এবং বিশেষ ধরনের ব্যক্তি-বৈশিষ্ট্যেরও প্রেক্ষিতে- অবশ্য সংক্ষেপে- কথাটা আমরা বুঝাবার চেষ্টা করব। আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতির পরিস্থিতি কি উনিশ শতকের ফ্রান্স অথবা বিশ শতকের যুক্তরাষ্ট্র-ইংল্যান্ড-পশ্চিম-ইউরোপের সমাজ ও সংস্কৃতির হুবহু অনুরূপ: ঐসব ভূভাগ শিল্পের যুগে প্রবেশ করেছে বহুকাল আগে: ওরা সা¤্রাজ্য জয় করেছে, দু’টি মহাদেশের আদি অধিবাসীদের প্রায় নিশ্চিহ্ন করেছে, পৃথিবী লুণ্ঠন করে সম্পদশালী হয়েছে, এবং স্পার্টার যুগ থেকে নারী-পুরুষের সম্পর্কের বিশেষ প্যাটার্নের মধ্যে বিলাসিতার মদ্য পান করে এসেছে। অবশ্যই ওদের ভাল দিকও অনেক ছিল এবং আছে: উন্নত সভ্যতা ও সাহিত্য, মধ্যযুগের পর থেকে: বিজ্ঞান, দর্শন, উদার-মানবিকতা ও গণতন্ত্রের আদর্শ (তবে সেই সঙ্গে হৃদয়হীন বস্তুতান্ত্রিকতাও)। এখনও রেনেসাঁ বলতে ইউরোপীয় রেনেসাঁই বোঝায়।
বিশেষ করে রেনেসাঁ, বিজ্ঞানচর্চা, যন্ত্রবিদ্যা এবং শিল্পবিপ্লবের সংযোগ (এবং পৃথিবী লুণ্ঠন করে) পশ্চিমী দেশগুলি সে-সভ্যতার সৃষ্টি করেছিল তা এখন ক্ষয়িষ্ণু, প্রথম মহাযুদ্ধের আগে থেকেই; বস্তুত প্রথম মহাযুদ্ধ তারই প্রথম বড় লক্ষণ। ঐ সব দেশের বিভিন্ন প্রকার আধুনিক সাহিত্যের এবং বিশেষ করে কবিতার এই একটা প্রধান বক্তব্য। আর একথাও ঠিক যে, পশ্চিমের বিখ্যাত প্রাণোচ্ছলতা, উন্নত মূল্যবোধ ঠিক আগের মতো আর নেই; ওরা এখন মনস্থির করতে পারছে না ভবিষ্যৎ নিয়তি সম্বন্ধে। এসব ব্যাপারে পশ্চিম নিজেই এখন নিঃস্ব হয়ে আসছে এবং এমনকি তাকাচ্ছে প্রাচ্যের দিকে। পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতিও এখন বিশেষ ধারায় বিকশিত হওয়ার পর বর্তমানে ক্ষীয়মাণ। ওখানকার সমাজ-ছাড়া কাব্যাংশ তার একটা প্রমাণ। ওখানকার সমালোচকরাও বলছেন সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের অতি আধুনিক কাব্য বিবর্ণ, পান্ডুর, এবং আপাতত সম্ভাবনাহীন।
বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতি ঐসব ভূখণ্ডে সমাজ ও সংস্কৃতির অনুরূপ নয়, এবং বিকাশের ঠিক সমস্তরে নেই। এদের সমস্যাবলিও এক রকম নয়। কিন্তু জ্ঞাতসারে কিনা বলা কঠিন, আমাদের এখানকার সাম্প্রতিক কিছু রচনার পেছনে এই চিন্তা যেন অনুভব করা যায় যে, আমরাও ঐসব ভূভাগের অনুরূপ সমাজ ও সংস্কৃতির মধ্যে অবস্থান করছি: অথবা আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতি ওদের সমস্তরে: অতএব ওদের সমস্যা এবং আমাদের সমস্যা, ওদের বক্তব্য এবং আমাদের বক্তব্য এক: ওরা যেমনটি করছে আমরাও তেমনটি করব, আমরা ওদের মতো করে চিন্তা ও অনুভব করব এবং ওদের মতো করেই তা প্রকাশ করব। ওদের সমাজ যেমন ক্ষয়িষ্ণু আমাদের সমাজও ঠিক তেমনি: অথবা ওদের ক্ষয়িষ্ণুতা এবং আমাদের ক্ষয়িষ্ণুতার প্রকৃতি এক। ঠিক এতটা স্পষ্ট নয় কিন্তু কারো কারো চিন্তা যেন এই রকম।
আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতি ঐসবের কোনোটির মতোই অতোটা ক্ষয়িষ্ণু নয়, এই অর্থে যে ঐসব সমাজ যতটা বিকশিত রাষ্ট্রীয় ও অর্থনীতিক পর্যায়ে, এবং ব্যাপক অর্থে সংস্কৃতিতে ও সামাজিক বিন্যাসের, আমাদের সমাজ ততটা নয় এখানো। আমাদের সমাজের অগ্রগতির সম্ভাবনা এখনো অফুরন্ত, যদি অনুকূল সুযোগ সৃষ্টি সম্ভব করে তোলা যায়। এমন হতে পারে যে পশ্চিমের মানুষের না হলেও তাদের বিশেষ সামাজিক ভাবধারা এবং মূল্যবোধের ভূমিকা প্রায় সমাপ্ত, এবং এই কারণে ওরা এখন অনেকটা লক্ষ্যহীন। অন্তত ঐ সভ্যতা প্রবীণ নক্ষত্রের মতো তার দীপ্তির উৎস প্রায় ফুরিয়ে এনেছে এবং এখন একটা সঙ্কটের সম্মুখীন। তার অনেক লক্ষণও পরিস্ফুট-দুটি বিশ্বযুদ্ধে এবং সর্বশেষ বিশ্বযুদ্ধের আয়োজনে; সামাজিক জীবনে, মূল্যবোধের, এবং সাহিত্যে। কিন্তু আমরা স্বাধীন হয়েছি বেশি দিন নয়, আমাদের স্বাধীনতার সর্বাঙ্গীণ সার্থকতা এখনও অনাগত। আমরা দীর্ঘকাল পরাধীন থেকেছি, নিপীড়িত হয়েছি, শোষিত হয়েছি, প্রতারিত হয়েছি, তারই ধকল সামলে নেয়ার চেষ্টা করছি এবং নতুন জীবন লাভের চেষ্টা করছি মাত্র। ঐসব ভূভাগের সমাজ এবং আমাদের সমাজকে তাই সমান্তরাল এবং প্রগতির সমবিন্দুতে অবস্থিত বিবেচনা করা যায় না: যদি পশ্চিমী সমাজের প্রগতিকে সত্যি প্রগতি বলা সঙ্গত হয়।
পশ্চিমের ক্ষয়িষ্ণুতার প্রসঙ্গে একটি কথা পরিষ্কার করা মনে হয় দরকার। আমার বক্তব্য এই নয় যে, পশ্চিমী সমাজ বিকাশের কোনো একটা স্তরে এসে পৌঁছেছে বলে ওর ক্ষয়িষ্ণুতাই সঙ্গত; আমি বলছিলাম ঐ সমাজে ক্ষয়িষ্ণুতা এসেছে কোনো না কোনো কারণে, এই হিসাবে তা স্বাভাবিক, এই অর্থে যে কারণ ব্যতীত কার্য অসম্ভব। আর যা স্বাভাবিক তার সবই যে সঙ্গত তা নয়। আর শুধু ক্ষয়িষ্ণুতা নয়, আরও কিছু জিনিস ঐ সমাজের নিজস্ব বলে এবং সে-সবের নিজস্ব কারণ আছে বলে অনুরূপ কারণ এবং সঙ্গত কারণ ব্যতীত আমাদের সমাজে সে-সবের আবির্ভাব অস্বাভাবিক।
ঐ সমাজ কী কী ভ্রান্তি এবং অবিবেচনাবশে তাদের সম্ভাবনার শেষ স্তরে এসে পৌঁছালো সে-সম্বন্ধেও আমরা অন্ধ থাকতে পারি না – ঐসব সমাজের মনীষীরাই এ বিষয়ে সমালোচনা-মুখর: আমাদের তাই ভাববার আছে কোনো কোনো ব্যাপারে আলেয়াকেই আমরা আলোকমালা মনে করছি কি না।
আমরা জানি, আমরা অনুভব করি, আমাদের সম্ভাবনা এখনো অনেক-কেননা সুদীর্ঘ বৈদেশিক আমলে আমরা আমাদের নিয়তি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পাইনি। আমাদের সম্ভাবনা অনেক-যদি আমরা সঠিকভাবে বুঝে নিতে পারি সে-সম্ভাবনা কী, সে-সম্ভাবনা কোন নিয়তির মধ্যে সুপ্ত, কোন জাগরণের জন্য তার প্রতীক্ষা। যদি আমরা বুঝে নিতে পারি তাহলে আমরা এ-ও বুঝবো, আমাদের (এবং বস্তুত সমগ্র মানব-সমাজেরই) ইতিহাসের এমন একটা থর-থর মুহূর্তে আমরা পৌঁছেছি যখন ক্ষয়িষ্ণুতার ভান আত্ম-অপচয় মাত্র।
আমি যে-সব ভূভাগের উল্লেখ করেছি, সম্ভাবনা ঐসব ভূভাগেরও আছে (মানুষের সম্ভাবনা বস্তুত এখনও অফুরন্ত, তৃতীয় এবং সর্বশেষ মহাযুদ্ধ যদি না ঘটে, যদি ঐতিহাসিক সমাজ-বিবর্তনের কথা ধরা যায়, অর্থনীতিক এবং সকল প্রকাশ মানবিক অর্থে); কিন্তু আমাদের যাত্রা যেহেতু অনেক পরে, অংশত সুসুপ্তির জন্য এবং অংশত দীর্ঘকালের পরাধীনতার জন্য, এই কারণে আমাদের সম্ভাবনা অপেক্ষাকৃত অধিক। বস্তুত বাংলাদেশের যাত্রাপথের এখনও অনেক বাকি পশ্চিমাজগতের তুলনায়। ঐসব দেশীয় এবং বাংলাদেশী সমাজের প্রয়োজনাবলি, দৃষ্টিকোণ, মনোভঙ্গি এবং জীবনদর্শন, অতএব সাহিত্যে প্রকরণ এবং সাহিত্য-প্রকরণ, তাই ঠিক এক রকম হতে পারে না।
আমাদের সমাজে ক্ষয়িষ্ণুতা যে কখনো কিছুই ছিল না (অথবা নেই) তা আমি বলছি না; ছিল : নইলে ইতিহাসের আদিগন্ত এমন দুর্গতি আমাদের হতো না, কিন্তু সে ক্ষয়িষ্ণুতা পশ্চিমের ক্ষয়িষ্ণুতার থেকে স্বতন্ত্র ঘটনা। গত কয়েক শতাব্দীর যাবৎ আমাদের যে জিনিসটার অভাব ছিল তা হচ্ছে বাঞ্ছনীয় জাতীয়বোধ (অথবা অন্তত গোষ্ঠী চেতনা, কেননা জাতীয়বোধ অপেক্ষাকৃত আধুনিক জিনিস), সংহতি সংগঠন। এবং আমাদের ছিল, এখনও আছে, বহুবিধ সংস্কার, কুসংস্কার, সর্বপ্রকার জাগতিক এবং মানসিক কূপমন্ডূকতা (মাত্র কয়েকটি লক্ষণ উল্লেখ করছি): আমাদের সমাজের লক্ষণগুলি অনুন্নত সমাজের লক্ষণ, অধঃপতিত সমাজের ঠিক নয়। কিন্তু পশ্চিমী সমাজের যে ক্ষয়িষ্ণুতা তা ধনিকের অনাচার-অর্জিত ব্যাধির মতো। আমাদের ব্যাধি মূলত পুষ্টিহীনতার, ওদের ব্যাধি মূলত অনাচারের। অধুনা আমাদের সমাজে ওদেরই মতো অনাচারের ব্যাধি ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে না তা নয়: করছে ক্লাবে, আধুনিক হোটেলে এবং জীবাণু-সংক্রমিত ফিল্ম ও মুদ্রার সংস্পর্শে; তবে প্রধানত পশ্চিমের অনুকরণে- ‘আধুনিকতার’ মোহে। পশ্চিমের দৃষ্টান্তে আমাদের কিছু সাহিত্যে, বিশেষত কাব্য সব নয়, একাংশ- মনে হয় বিশেষ বিশেষ ধরনের ‘আধুনিক’ হওয়ার প্রয়াস পায় যেহেতু পশ্চিম ঐ ধরনের আধুনিক হয়েছে বলে, ঠিক কি প্রকার পরিস্থিতিতে আধুনিক হয়েছে, অথবা ঐ ধরনের আধুনিকতা আদৌ মূল্যবান কি না, অথবা ঐ ধরনের আধুনিক হওয়ার দরকার এ-দেশে আছে কি না এসব কথা চিন্তা না করেই। ঐ সাহিত্য আধুনিকত্বের কয়েকটি বিখ্যাত লক্ষণকে বরণ করেছে প্রাণের কোনো অনিবার্য তাগিদে নয়, কোনো দৃঢ় প্রত্যয়ের জন্য নয়, সম্প্রতি পশ্চিমের কাছে নেওয়াটাই একটা প্রথা বলে নেয় অবশ্য পশ্চিমও, এমনকি প্রাচ্যের কাছেও, কিন্তু পশ্চিম নেয় সাধারণত জ্ঞানের জন্য, আনন্দের, জন্য, অথবা নিজের পুষ্টির জন্য। আমরা নেই ঐসব কারণে সাধারণত নয়, আর সবাই নিচ্ছে বলে, এবং না নিলে লোকে প্রাচীন বলবে এই আতঙ্কে। এই আধুনিকতার কোনো কোনো প্রথা-সঠিকভাবে বলতে গেলে হুজুগ- প্রায়শ যুক্তি মানে না। এই রকম আধুনিকতার উদাহরণ আমরা দেখি (সামাজিক উদাহরণ নিলে) যখন গ্রীষ্মকালে সুসজ্জিত ভদ্রলোক ভোজসভায় অপরাপর নিমন্ত্রিতদেরসহ প্লেট হাতে দাঁড়িয়ে ঘর্মাক্ত কলেবরে মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে পলান্ন আহার করেন, তাঁরই পতœী শীতের শিহরণেও আঙ্কন্ধ বাহু এবং পেট ও পিছের কিয়দংশ উন্মুক্ত রাখেন, এবং শীতে গ্রীষ্মে তাঁদের বংশধর ড্রেনপাইপ ট্রাউজার ও তাঁদের দুহিতা স্কিনটাইট পোশাক পরে, যেহেতু ঐ সুখী পরিবারটি মনে করে এইসবই আধুনিকতার লক্ষণ, এবং এসব না হলে লোকে সেকেলে বা দেশী বলবে।
সামাজিক পরিস্থিতি ছাড়াও সাহিত্যের এমন কিছু ব্যাপার আছে যা ব্যক্তি-বৈশিষ্ট্যের দিক থেকেও বিবেচ্য। একজন সমগ্র ব্যক্তি যতোটা সমাজের সৃষ্টি, ততোটা কিংবা হয়তো তার চাইতে বেশি, এবং প্রত্যক্ষতরভাবে, তিনি তাঁর পরিবারের এবং আপন স্বভাবেরও সৃষ্ট। অনন্ত তিনি (পরিবারসহ) সমাজের যেমন সদস্য, তেমনি একজন ব্যক্তি। একজন কারো বিধবা মাতা তাঁকে পরিত্যাগ করে দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্বামী গ্রহণ করায় তিনি মাতৃ¯েœহে বঞ্চিত হলেন, বয়স্ক জীবনে অনাচারের নর্দমায় অবগাহন করলেন এবং কুৎসিত কোনো ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে উন্মাদ হলেন; দ্বিতীয় জনও স্বভাববশে অনেক অনাচার করলেন, সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে কবিতা লিখলেন আবার কবিতা ছাড়লেন, এমনকি চার্চের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন, এবং তাঁর কবিতার অভিজ্ঞতা এমনই যেন তা নরকে এক ঋতু : তৃতীয় ব্যক্তি বিশেষ পরিবেশ থেকে এই ধারণা পেলেন যে আদি রিপুর যে-কোনো প্রকার চর্চাতেই মানবজীবনের মহত্তম সার্থকতা: চতুর্থ ব্যক্তি স্বভাবত এবং আদর্শগতভাবে এ্যাংলো-ক্যাথলিক, রাজতন্ত্রী ইত্যাদি: পঞ্চম ব্যক্তি কিন্তু উদাহরণ আমি আর বাড়াব না। ব্যক্তি হিসাবে এবং কবি ও ঔপন্যাসিক হিসাবে এঁরা কিরূপ পরিস্থিতির মধ্যে বাস করছিলেন, এবং ঐ পরিস্থিতির প্রতি তাঁদের বিশেষ বিশেষ মনোভঙ্গি ছিল কি না? আমার বলবার কথা সেই যে এসব কারণে এবং এসব কারণ সত্ত্বেও এঁরা প্রতিভাবলে উত্তম কিছু সৃষ্টি করতে পারলেন বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে, বিশেষ জীবনবোধ অথবা দর্শন থেকে, বিশেষ আঙ্গিকে, সমাজের একজন সদস্য হিসাবে নয় শুধু, ব্যক্তি হিসাবেও, বিশেষ ধরনের অভিজ্ঞতা তাঁদের হয়েছিল এবং তাঁদের প্রকৃতি বিশেষ ধরনের ছিল বলে; তাই বলে এদেশের একজন ব্যক্তির অভিজ্ঞতা তাঁদের কারো মতো না হওয়া সত্ত্বেও, তিনি ভিন্ন পরিবেশে মানুষ হওয়া সত্ত্বেও এবং ভিন্ন প্রকারের ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও যদি তাঁদের কারো এদেশী সংস্করণ হওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে সেটা অন্তত কিয়ৎ পরিমাণে অস্বাভাবিক।
সনেট গ্রামোফোন জেট-বিমান ইত্যাদি মূলত এদেশের নয়, অতএব আমাদের এসব জিনিস নেওয়া অসঙ্গত এ-রকম উদ্ভট কথা আমি বলছি না, কিন্তু প্রশ্ন যেখানে ব্যক্তি-প্রতিভার বৈশিষ্ট্যের সেখানে, সূক্ষ্মতর অর্থে, প্রকরণের প্রশ্নও অবাস্তর নয়। প্রতিভাধর লেখক একটা কিছু বলেন না শুধু, বলার জন্য অনেক সময় বিশেষ একটা স্বকীয় প্রকরণও উদ্ভাবন করেন। এরূপ ক্ষেত্রে ঐ বিশেষ প্রকরণের এখানে সার্বজনীন নয়, ব্যক্তিক। এবং প্রতিটি মৌলিক লেখক যেহেতু চিন্তায় ও অনুভবে স্বতন্ত্র, এই কারণে এক লেখকের উদ্ভাবিত প্রকরণ অপর লেখকের অনুপযোগী, অপর দেশের লেখকের তো বটেই।
ঐতিহ্যের দিক থেকেও ব্যাপারটি আমরা নিরীক্ষণ করতে পারি। যে-পশ্চিমের আমরা অনুসরণ করি সেই পশ্চিমের কবি-সমালোচকই কি ঐতিহ্য ও ব্যক্তি-প্রতিভার প্রসঙ্গে বলেননি যে, ঐতিহাসিক বোধ লেখককে লিখতে বাধ্য করে শুধু তাঁর সমকালীন মানুষের তাঁর অস্থির অভ্যন্তরে সংস্থিত রেখে নয়, এই অনুভব নিয়েও তিনি লেখেন যে হোমার থেকে শুরু করে ইউরোপের সমগ্র সাহিত্যের এবং সেই সাহিত্যের অন্তর্গত তাঁর স্বদেশের সমগ্র সাহিত্যের যুগপৎ অস্তিত্ব সচেতন করে তোলে। অন্যত্র তিনি বলেছেন ঐতিহ্য-বোধের কাম্য লক্ষ্য দেশচেতনা। আরও এক স্থানে জীবনের শেষ পর্যায়ে-তিনি বলেছেন স্থানীয় না হয়ে সার্বজনীন হওয়া দুঃসাধ্য। ঐতিহ্যবোধের মধ্যে অবশ্য বাছাবাছির প্রশ্ন আছে : এবং তার উপরেও তিনি জোর দিয়েছেন। এবং বাছাবাছি বোধ হয় আমাদের ঐতিহ্যের বেশি বাঞ্ছনীয়। তথাপি এখানে আমরা যে-প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছি তা হচ্ছে পশ্চিমের লেখক-সম্প্রদায় যদি নিজেদের প্রয়োজনে পশ্চিমের ঐতিহ্যকে অস্থিমজ্জায় অনুভব করেন, তবে আমাদের নিজস্ব প্রয়োজনে ঐ লেখক-সম্প্রদায়কে অনুভব এবং তাঁদের মধ্যে দিয়ে তাঁদের ঐতিহ্যকে অনুভব কি পরিমাণে সঙ্গত এবং স্বাভাবিক? সাহিত্য ব্যক্তিরই সৃষ্টি, কিন্তু সমাজের এবং ঐতিহ্যের সংঘাতেও সৃষ্টি, এই হিসাবে বহুল পরিমাণে সমাজের এবং ঐতিহ্যেরও সৃষ্টি: সমাজ ও ঐতিহ্য যদি স্বতন্ত্র হয়, তবে বিভিন্ন দেশের সাহিত্যে কতটা স্বতন্ত্র এবং কতটা সদৃশ্য হওয়া সঙ্গত?
এসব প্রশ্নের সমাধান আপাতত আমার পক্ষে সম্ভব নয়; কিন্তু প্রশ্নগুলি অনিবার্য, এবং অনুপেক্ষণীয়, এই আমার ধারণা। তবে এই বলা চলে যে অন্যান্য সমাজের নিয়তি-সচেতন লেখকদের সম্বন্ধে চেতনা, এবং স্ব-সমাজ-নিয়তি-চেতনা এবং জিনিস নয়: এবং দ্বিতীয়োক্ত চেতনা ব্যতীত কোনো লেখককে প্রকৃত সচেতন লেখক বলা যায় বল মনে হয় না।
কতকগুলি সাধারণ সূত্রের কথা বাদ দিলে প্রতিটি ব্যক্তি, সমাজ ও সংস্কৃতির সমস্যা ও প্রয়োজন তার নিজস্ব; যে-সমস্যার বিরুদ্ধে সংগ্রামের কেউ কাউকে সাহায্য করে না: সংগ্রাম করতে হয় নিজস্ব পদ্ধতিতে। এ জন্য দরকার নিজস্ব কৌশলের, নিজস্ব মূল্যবোধের। এক দেশের প্রয়োজনে অন্য দেশ অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সাহায্য করতে পারে; কিন্তু সংস্কৃতি অথবা সাহিত্য জিনিসটা নির্দিষ্ট ছকে কোনো কারখানায় তৈরি নয়, এ আরও জটিল এবং সমাজের দৃশ্য-অদৃশ্য নানা স্তরে তার শিকড় অনুপ্রবিষ্ট। উনিশ শতকের ফ্রান্সের অথবা বিশ শতকের ইংল্যান্ডের (অথবা পশ্চিমবঙ্গের) পরিস্থিতি এবং আমাদের পরিস্থিতি-সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক-এবং বিবিধ প্রয়োজন যদি ঠিক এক রকম না হয়, তবে ঐসব দেশের সাহিত্য-লক্ষ্য এবং মূল্যবোধের প্রতি নির্বিচার গদগদ-তার খুব বাস্তববোধের পরিচায়ক নয়। ব্যক্তিগত না যে, ঐসব দেশের কাছে (বা ঐসব দেশের ব্যক্তির কাছে) জানবার এসব ঐসব দেশ থেকে নেয়ার আমাদের কিছু নেই; বস্তুত অনেক আছে: না জানলে আমরা অজ্ঞ থাকব এবং না নিলে দরিদ্র; কিন্তু বিচার-বিবেচনা করে না নিলে আমরা উপর্যুক্ত আধুনিক পরিবারটির মতো আধুনিক হবো মাত্র।
এদেশে একটা সত্য বিশেষভাবে পরিষ্কার যে এখনো আমাদের মৌলিক সমস্যাটা হচ্ছে আমরা যে স্বাধীনতা পেয়েছি তাকে আরও সার্থক করা, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অর্থে; আমাদের অস্তিত্বকে আরও অর্থময় করা, আত্মপ্রতিষ্ঠা হওয়া; আমাদের যে একটা বিশেষ সত্তা আছে তাকে তীক্ষè, প্রোজ্জ্বল, প্রবল, সুপ্রতিষ্ঠিত করা। এ পরিস্থিতিতে এমন মূল্যবোধ এবং চিন্তার প্রশ্রয় অযৌক্তিক বা মূলত ক্ষয়িষ্ণু, যা ক্ষীয়মাণ সংস্কৃতি ও সভ্যতার লক্ষণ; যেমন (অনেক লক্ষণের মধ্যে কয়েকটি) যৌনমনস্কতা, প্রকরণসর্বস্বতা, প্রত্যয়হীনতা, জীবনবিমুখতা, নিñিদ্র হতাশা। এসবের সঙ্গে এদেশে সংযুক্ত হয়েছে পশ্চিমী বিহ্বলতা এবং চিন্তার দাসত্ব। চিন্তা বলতে আমি এখানে চিন্তা ব্যতীত অনুভব এবং মানস-প্রবণতাও বোঝাচ্ছি।
আমাদের নব্য-শিক্ষিত এবং উঠতি ধনিক সমাজে এমন কতকগুলো লক্ষণ এখনই দৃশ্যমান যা মূলত এবং ঐতিহ্যগতভাবে এ-দেশের সমাজের নয়, এবং এদেশের সমাজ থেকে উদ্ভূতও নয়; এ সমাজের ধারাবাহিক বিকাশের প্রয়োজনের ব্যাপার নয়, মূলত ব্যাধির লক্ষণ নয়, প্রধানত অনুকরণ মাত্র-উল্লিখিত সুখী পরিবারটি মতো-বস্তুত আলো এবং চক্ষুর অন্তরালে তার চাইতেও বেশি-পাশ্চাত্যবিহ্বলতা থেকে। কিন্তু তাই বলে এগুলো কালক্রমে রোগলক্ষণে দাঁড়িয়ে যেতে বাধা থাকে না, বাধা হচ্ছে না, সুস্থ শরীরের অর্জিত ব্যাধির মতো। (আমাদের সমাজ সর্বদা; অথবা কোনো সময়, সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল কি? আমি সে কথা বলছি না। আমি বলছি আমাদের সমাজে এসব-সব ব্যাধির প্রবেশ ঘটছে যা আগে ছিল না) এই লক্ষণগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ হলেও, আমার বিবেচনায় মূল ব্যাধি যেটি তা হচ্ছে আত্মবিস্মৃতি এবং চিন্তাহীনতা; ইতিহাসের বিভিন্ন লগ্নে একটি বিশেষ মানবগোষ্ঠী হিসাবে কোন ভূমিকা এবং কোন নিয়তি আমাদের জন্য প্রতীক্ষমাণ তা চিনে নিতে এবং উপলব্ধি করতে অক্ষমতা-অথবা অনিচ্ছা।
নীরো, হতাশাবাদী, অতীতমুখী, সুযোগোপজীবী ইত্যাদি নানা রকমের লোক সকল সমাজে হয়তো সব সময়েই থাকবে। কিন্তু সমাজের প্রত্যাশা দায়িত্ব-সচেতনদের নিকট। স্বীকার করা যাক সমাজ ক্ষয়িষ্ণু-কোনো ব্যক্তির মতো ক্ষয়রোগাক্রান্ত: কিন্তু তাই বলে তার প্রতিকার চেষ্টা না করে সমাজের মানুষদের গত্যন্তর আছে বলে মনে হয় না। ক্ষয়রোগের জন্য হাহুতাশ করে, ক্ষয়রোগের চমৎকার চিত্রমাত্র অঙ্কন করেই নিষ্কৃতি পাওয়া সম্ভব কি? আমি এমন বলছি না যে ক্ষয়িষ্ণুতা সাহিত্যের বিষয়ীভূত হওয়া অসঙ্গত; বরং না হওয়াই অবাস্তব এবং অসঙ্গত, সমাজে যখন ক্ষয়িষ্ণুতা বর্তমান। কোনো কোনো বিশ্বাসের মতো অবাস্তব রোমান্টিকতাও এক ধরনের অহিফেন। মূল প্রশ্নটা হচ্ছে কিসের জন্য অঙ্গীকার-মৃত্যুর অথবা জীবনের জন্য। পশ্চিম-ইউরোপের ক্ষয়িষ্ণু সমাজের মতো লক্ষ্যহীন আমরা নই-একটা বিশেষ মানবগোষ্ঠী হিসাবে এখনও এমন অনেক-কিছু আমাদের দরকার যা ওদের জন্য অবাস্তব। আমাদের ইতিহাসের অন্তত বর্তমান পর্যায়ে যা দরকার, এবং স্বাভাবিক, তা হচ্ছে প্রত্যয়ের সাহিত্য এবং আত্মপ্রত্যয়ের সাহিত্য-কেননা বাঁচবার আকাক্সক্ষা স্বাভাবিক।
অন্ধ বিশ্বাস আমি সমর্থন করছি না, স্বীকেন্দ্রিকতার কথাও বলছি না, কিন্তু আত্মপ্রত্যয় ব্যতীত প্রকৃত মানবজীবন ধারণা এবং মূল্যবান কিছু করা সম্ভব হয়। লেখক স্বদেশী অথবা বিদেশী রেওয়াজের প্রতিধ্বনি মাত্র নন: তিনি ব্যক্তি, কিন্তু শুধু ব্যক্তিও নন: তিনি তাঁর সমাজের এবং তাঁর কালের কণ্ঠস্বর, এবং কখনো কখনো ইতিহাস-নায়ক; সমাজের অন্তর্নিহিত বাসনা রূপ প্রার্থনা করে তাঁরই মধ্য দিয়ে। প্রকৃত সচেতন এবং সুস্থ লেখক এই ভূমিকার মধ্যেই নিজের সার্থকতা সন্ধান করেন। সাহিত্য দেশ ও কালকে অতিক্রম করে, সার্বজনীন এবং সর্বকালীন হয়, দেশ ও কালকে বরণ করেন।
[লেখাটি লেখকের ‘সাহিত্য ঐতিহ্য মূল্যবোধ’
গ্রন্থ থেকে সঙ্কলিত]