সম্ভবত বিনয় কুমার সরকারই প্রথম ওয়াল্ট হুইটম্যানের সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের সাদৃশ্যের কথা উলেখ করেন। ১৯৪৩ সালের ৮ জুন সুবোধ কৃষ্ণ ঘোষালের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে সরকার বলেন : “বিদ্রোহী দেখামাত্র নজরুলের ভেতর আমি হুইটম্যান আর রবীন্দ্রনাথ দু’জনকে এক সঙ্গেই পাকড়াও করেছিলাম। তবুও বুঝে নিলাম লেখক বাপকা বেটা বটে।” সরকার তার বক্তব্যে নজরুলকে খাটো করে দেখেননি, বরং কোন কোন দিক দিয়ে তিনি হুইটম্যানকে ছাড়িয়ে গেছেন বলে মত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত এক গ্রন্থে সৈয়দ আলী আহসান নজরুলকে হুইটম্যানের পদাঙ্ক অনুসরণকারী হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁর ভাষায় : “Whitman-এর প্রভাব নজরুল ইসলামের উপর অত্যন্ত বেশি স্পষ্ট, দীপ্ত ও প্রত্যক্ষ। বিদ্রোহ, বিপব ও যৌবনের আবেগ যেখানে তাঁর কাব্যের উপপাদ্য হয়েছে, সেখানেই তিনি Whitman-কে অনুসরণ করেছেন নিঃসঙ্কোচে।” আজহার উদ্দীন খান এবং আতাউর রহমানও নজরুল কাব্যে হুইটম্যানের প্রভাব ‘সর্বাধিক’ বলে মনে করেন।
তবে এ ব্যাপারে ভিন্নমতও আছে। মযহারুল ইসলাম বলেন যে, কেউ কেউ নজরুলের বিদ্রোহ বা বিপবাত্মক চিন্তাধারায় হুইটম্যানের প্রভাব দেখলেও তাঁর চোখে ইকবালের প্রভাবই বড় হয়ে ধরা পড়েছে। কাজী আব্দুল মান্নান হুইটম্যানের প্রভাবের ধারণা সম্বন্ধে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর মতে নজরুলের কবিতাটির পটভূমিতে রয়েছে বাংলা কাব্যে সুদীর্ঘকালের বিদ্রোহের ঐতিহ্য এবং যুগধর্ম।
বলা বাহুল্য, যাঁরা প্রভাবের কথা বলেছেন তাঁরা হয় তা শুধু উলেখ করেছেন অথবা উভয় কবির কবিতার কতিপয় চরণের ক্ষীণ ভাবগত সাদৃশ্যের ভিত্তিতে মন্তব্য করেছেন। অপরপক্ষে যাঁরা ভিন্নমত পোষণ করেছেন তাঁরা ঐ ভাবগত সাদৃশ্য অস্বীকার করেছেন মাত্র। সাহিত্যে প্রভাব নিয়ে আলোচনা ফলপ্রসূ হয় না। এতে হয়তো এটা প্রমাণ করা যেতে পারে যে একজন অন্যজনের লেখা পড়েছেন। কিন্তু কোন শিল্পকর্ম শুধু প্রভাবের সমষ্টি নয়-তা একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ সৃষ্টি যার মধ্যে অন্যের কাছ থেকে আহরিত সামগ্রী অপরিবর্তিত বা অজীর্ণ অবস্থায় বিরাজ করে না, প্রতিভার জারক রসে আত্মস্থ হয়ে যায়। তবে যেহেতু হুইটম্যানের সঙ্গে নজরুলের সাদৃশ্যের কথাটা উঠেছে তাই বিষয়টি পর্যালোচনার দাবি রাখে। এই প্রসঙ্গে ‘সঙ অব মাইসেলফ’ ও ‘বিদ্রোহী’ কবিতার একটি তুলনামূলক বিশেষণ ফলপ্রসূ হতে পারে। তা ছাড়া, এ ধরনের লেখা সাহিত্য সমালোচনার সুদীর্ঘকালের একটি স্বীকৃত পদ্ধতি।
দুই
প্রবন্ধের মূল বিষয়বস্তু উপস্থাপন করার আগে হুইটম্যানের কাব্যের সঙ্গে নজরুলের কোন পরিচয় ছিল কি না তা বলে নেয়া ভালো। নজরুলের ‘অগ্রপথিক’ কবিতাটি হুইটম্যানের ‘চরড়হববৎ! ঙ চরড়হববৎ’ কবিতার অনুরণনে রচিত। তাঁর ‘বর্তমান বিশ্বসাহিত্য’ প্রবন্ধে তিনি হুইটম্যানের ‘ঙহব’ং ঝবষভ ও ঝরহম’ কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। একটি চিঠিতে তিনি হুইটম্যানকে ‘পাশ্চাত্য ঋষি’ বলে অভিহিত করেছেন এবং তাঁর ‘ঝড়হম ড়ভ গুংবষভ’ থেকে দু’টি চরণের উদ্ধৃতি দিয়ে চরণ দু’টির বক্তব্যের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। তাই এ কথা মনে করা অযৌক্তিক হবে না যে নজরুল হুইটম্যানের অনুরাগী ছিলেন এবং তাঁর কাব্য মনোযোগের সঙ্গে পড়েছিলেন।
প্রসঙ্গত উলেখ করা যেতে পারে যে ব্যক্তি হুইটম্যানের সঙ্গে ব্যক্তি নজরুলে কিছু মিল লক্ষ্য করা যায়। উভয়ই ছিলেন বলিষ্ঠদেহী, প্রাণচঞ্চল, বোহেমিয়ান। উভয়েরই কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না, তবে এলোমেলোভাবে পড়াশোনা ছিল যথেষ্ট। উভয়ই সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। হুইটম্যানের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ছিল। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে নার্স হিসেবে কাজ করেছিলেন। নজরুল যুদ্ধে যাননি, তবে সৈনিক জীবনযাপন করেছিলেন কিছুদিন। উভয়ই ছিলেন সাধারণ মানুষের কবি।
‘সঙ অব মাইসেলফ’ ও ‘বিদ্রোহী’র উৎপত্তি একই রকম বলে মনে হয়। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই একজন সাংবাদিকের কলম দিয়ে ‘সঙ অব মাইসেলফ’-এর মত কবিতা কিভাবে বেরিয়ে এলো তা নিয়ে সমালোচকরা নানা ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন কিন্তু সেসব অনুমাননির্ভর। হুইটম্যান নিজে কবিতাটিকে তথা তাঁর কাব্যগ্রন্থের প্রথম সংস্করণকে একটা ধভভষধঃঁং বা অতিপ্রাকৃতিক প্রেরণার ফসল বলে মনে করতেন। আশ্চর্যের বিষয়, ‘বিদ্রোহী’র উৎপত্তি সম্বন্ধে অনুরূপ বক্তব্য পাওয়া যায়। কাজী আব্দুল ওদুদ জানাচ্ছেন : ‘বিদ্রোহী’ যে একটি বিশেষ প্রেরণার ফল সে কথা নজরুল ঢাকায় এক সাহিত্য সভায় নিজেই বলেছিলেনÑ বলেছিলেন এই লেখাটি তিনি কেমন করে লিখেছিলেন তা নিজেও ভালো করে জানেন না। তবে বিশেষ প্রেরণার সঙ্গে সঙ্গে দেশ ও কালের গুরুত্বও অস্বীকার করা যায় না। হুইটম্যান নিজেই বলেছেন : ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ ছাড়া অন্যকোন কালে এবং গণতান্ত্রিক আমেরিকা ছাড়া অন্যকোন দেশে তার এই কবিতা তথা সমগ্র কাব্যগ্রন্থ রচনা করা হয়ত সম্ভব হতো না। নজরুল এ ধরনের কোন উক্তি করেননি। তবে অধিকাংশ সমালোচক ‘বিদ্রোহী’র রাজনৈতিক ও সামাজিক পটভূূমির উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। হুইটম্যানের উক্তির প্রতিধ্বনি করে বলা যায় যে অন্যকোন দেশে অন্যকোন যুগে ‘বিদ্রোহী’ লেখা সম্ভব হতো কি না সন্দেহ।
তিন
হুইটম্যানের ‘সঙ অব মাইসেলফ’ তাঁর কাব্যগ্রন্থ লিভস অব গ্রাস (Leaves of Grass) এর প্রধান কবিতা। ৫২টি অসমান স্তবকে বিভক্ত ১৩৪৬ লাইনের দীর্ঘ এই কবিতা আত্মজীবনীমূলক। বস্তুত সমগ্র কাব্যগ্রন্থটিতে তাঁর নিজের আবেগ, অনুভূতি ও ব্যক্তিগত স্বরূপ নিঃসঙ্কোচে, যথাযথভাবে এবং সবিস্তারে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন বলে কবি উলেখ করেছেন : ““Leaves of Grass has mainly been the outcropping of my own emotional and personal nature-an attempt –to put a person, a human being (myself in the latter half of the nineteenth century) freely, fully, truthfully on record.” এই বক্তব্য অবশ্য আক্ষরিক অর্থে সত্য নয়। যদিও ‘সঙ অব মাইসেলফ’-এ ‘ও’ সর্বনামটি অসংখ্যবার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে এ ‘ও’ নিজেকে ৩৭ বছর বয়স্ক ম্যানহাটনের সন্তান ওরাল্ট হুইটম্যান বলে পরিচয় দিয়েছে, তবু তাঁকে ইতিহাসের হুইটম্যানের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে এক করে দেখা যায় না, কারণ প্রথমত, হুইটম্যানের জীবনের সবকিছু এতে নেই, বরং এমন অনেক ঘটনার বিবরণ আছে, এমন অনেক চরিত্র-বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন আছে যার সঙ্গে ব্যক্তি হুইটম্যানের কোনো সম্পর্ক ছিল না। দ্বিতীয়ত, সাহিত্য ব্যক্তিত্বের আত্মপ্রকাশ, লেখকের নিজস্ব আবেগ, অভিজ্ঞতার বাণীচিত্র-এ ধারণা সত্য নয়। কোন শিল্পকর্মে জীবন হুবহু রূপায়িত হয় না। তাতে লেখকের ‘স্বপ্ন’ প্রতিফলিত হতে পারে; তার সধংশ বা anti-self প্রকাশ পেতে পারে। তা ছাড়া যে শিল্পমাধ্যম ব্যবহৃত হয় তাতে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, অবিকল উপস্থাপিত হয় না-রূপান্তরিত হয়। তাই ‘সঙ অব মাইসেলফ’এর ‘‘I’ কে একটি ঢ়বৎংড়হধ- একটি কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে দেখাই যুক্তিসঙ্গত।
এই চরিত্র নিজেকে celebrate করছেন, আপন মহিমা প্রচার করছেন। সুবাসিত, সুসজ্জিত ঘর ছেড়ে প্রচলিত রীতিনীতি, ধ্যান-ধারণা স্থগিত রেখে উলঙ্গ হয়ে সমস্ত ইন্দ্রিয় অবারিত করে বনের ধারে সমুদ্রতীরে অলসভাবে ঘোরাফেরা করতে তিনি ভালোবাসেন। তিনি উচ্ছল, প্রাণচঞ্চল, আত্মতৃপ্ত। তিনি নাচেন, হাসেন, গান গেয়ে ফেরেন। তার ভাষায় তিনি turbulent, fleshy, sensual, eating, drinking, breeding.” তিনি বারবার তার উজ্জ্বল স্বাস্থ্য, দৈহিক শক্তি, প্রখর ইন্দ্রিয় অনুভূতির উলেখ করেছেন। তার দেহ থেকে যে প্রচন্ড জ্যোতি বিচ্ছুরিত হয় তা সূর্যরশ্মিকে প্রতিহত করে দেয়। তিনি সুমহান, অজর, অমর; নিজের ভিতর-বাহিরকে তিনি ঐশ্বরিক (divine) বলে বর্ণনা করেছেন; নিজের সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু বলে চি?িত্রত করেছেন। তাকে অনুসরণ করার জন্য সবাইকে উদাত্ত আহবান জানাচ্ছেন। তার মধ্যে প্রকান্ড অহমিকা (egotism) আছে এবং এই অহমিকা সম্বন্ধে তিনি সচেতন : I know perfectly well my own egotism.”
অহমিকা কোন আকর্ষণীয় গুণ নয়; তা সুরুচির পরিচয় দেয় না। কিন্তু হুইটম্যানের ‘আমি’র অহমিকা আমাদের মনে কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না। এর কয়েকটি কারণ আছে। প্রথমত, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে আমেরিকার মত দেশে দৈহিক শক্তি সামর্থ্যে বলীয়ান, দুর্গম গিরি, নদী, অগম্য গহন অরণ্যানী অধ্যুষিত বিশাল ভূ-খন্ডকে করায়ত্ত করার, তার বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করার দুঃসাহসিক অভিযানে অংশগ্রহণের উদ্যোগ উৎসাহে উজ্জীবিত এক জাতির পটভূমিকায় এই অহমিকা সহজে বোধগম্য। উলেখ্য যে, হুইটম্যান নিজে তার কবিতার ‘অসবৎরপধহ ড়ৎরমরহ’ এর উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। দ্বিতীয়ত, তিনি তার কবিতাকে ‘a song of the great pride of man in himself’ বলে অভিহিত করেছেন। এ থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে ‘আমি’র অহমিকা কোন ব্যক্তি বিশেষের নয়, তা মানুষের আত্মপ্রত্যয় বা আত্মশক্তির চূড়ান্ত প্রকাশ। এটা রোমান্টিক মানসিকতা থেকে উদ্ভূত এবং হুইটম্যানের ক্ষেত্রে এই মানসিকতা আমেরিকান পরিবেশ দ্বারা কিছুটা প্রভাবিত। জনৈক সমালোচকের ভাষায় : “He (Whitman) was a European romanticist modified by the American environment.” তৃতীয়ত, ‘আমি’ যে শুধু একজন ব্যক্তি নন, একজন প্রতিনিধিও তা কবিতার শুরুতেই উলেখ করা হয়েছে : “I celebrate myself, and sing myself/And I assume you shall assume” “I am of old and of young, of the foolish as well as the wise…/Maternal as well as paternal, a child as well as man..” চতুর্থত, তিনি সামাজিক গণতন্ত্র এবং মানবতাবোধেরও প্রতীক। তার কাছে ছোট কেউ নয়, কেউ বড় নয়। সব মানুষের প্রতি আছে তার অপরিসীম দরদ ও ভালোবাসা। সব নিপীড়িত, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত মানুষের আর্তনাদ তার কণ্ঠে ভাষা পায়। দুর্বল, রুগ্ণ, হতাশাগ্রস্ত মানুষকে শক্তি ও সাহস জোগাতে তিনি ত্বরিতে এড়িয়ে আসেন। তিনি শুধু বর্তমানের নন, সকল কালের। সকল যুগের সকল অভিজ্ঞতা তার মধ্যে মিলিত হয়েছে যেমন তিনি John Paul Jones এর সঙ্গে সমুদ্র যাত্রা করেছিলেন, এক আক্রান্ত দুর্র্গের বন্দুকধারী ছিলেন, নিউফাউন্ডল্যান্ডের অদূরে জেলে হিসেবে মাছ ধরেছেন ইত্যাদি। এমনকি তিনি বিবর্তনবাদেরও প্রতীক। তিনি সৃষ্টির আদিকাল থেকে উপস্থিত ছিলেন, যুগ যুগ ধরে কাটিয়েছেন, ডায়নোসরের মুখে মুখে ঘুরেছেন। সৃষ্টিকর্তা সম্বন্ধে সবরকম ধারণা তার মধ্যে বিরাজ করছে : Taking myself the exact dimensions of Jehova/ Thoroughgoing Kronos his son and Hercules his grandson/ Buying crafts of Osiris, Isis, Belus, Brhama, Budha….” কবিতার সমাপ্তিতে তিনি আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মৌলিক প্রাকৃতিক উপাদানে অন্তর্হিত হয়ে যাচ্ছেন এবং সর্বত্র বিরাজমান বলে জানিয়েছেন।
অতএব দেখা যাচ্ছে যে হুইটম্যানের ‘আমি’ আত্মকেন্দ্রিক বা আপন সত্তার কারাগারে বন্দী কোন ব্যক্তি নন; তিনি দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে গঠিত মানুষের সীমাহীন আত্মশক্তির চেতনায় উদ্দীপ্ত এমন এক ব্যক্তি যিনি বিভিন্ন অবলম্বন করে, বিভিন্ন ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে এক ব্যাপক প্রতিনিধিত্বকারী সত্তায় পরিণত হয়েছেন; সকল যুগের, সকল অভিজ্ঞতার, সকল ধ্যান-ধারণার মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছেন এবং এর ফলে তার অহমিকা ঃৎধহংসঁঃবফ হয়েছেÑএকটা উন্নততর পর্যায়ে রূপান্তরিত হয়েছে। আমেরিকার তথা বিশ্বসাহিত্যে এ ধরনের চরিত্র এই প্রথম।
নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাতেও অনুরূপ একটি চরিত্র পাওয়া যায়। তিনিও অসংখ্যবার ‘আমি’ সর্বনামটি ব্যবহার করে নিজের আত্মপরিচয় তুলে ধরেছেন। যে কারণে ‘সঙ অব মাইসেলফ’-এর ‘আমি’ এবং কবি এক ব্যক্তি নন, সেই একই কারণে ‘বিদ্রোহী’র ‘আমি’কেও ব্যক্তি নজরুলের সঙ্গে এক করে দেখা হয় না। হুইটম্যানের ‘আমি’র মত নজরুলের ‘আমি’ও একটি persona-একটি কাল্পনিক চরিত্র।
তিনি নিজেকে বিদ্রোহী হিসেবে চিত্রিত করেছেন। হিমালয়ের চেয়েও উন্নত তার শির। তিনি মহাকাশ ফেড়ে, চন্দ্র সূর্য ছেড়ে, খোদার আরশ ভেদ করে চিরবিস্ময় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি উচ্ছৃঙ্খল, উন্মাদ, স্বেচ্ছাচারী, ত্রাসসঞ্চারকারী। তিনি যখন রোষে উঠে মহাকাশে ছুটে চলেন তখন সব নরক কেঁপে কেঁপে নিভে যায়। তিনি বিধির দর্প চূর্ণ করতে চান; ভগবানের বুকে লাথি মারতে চান। এইসব উক্তির অনেক তাঁর প্রবল অহমিকার স্বাক্ষর বহন করে এবং এদিক দিয়ে ‘সঙ অব মাইসেলফ’-এর ‘আমি’র সঙ্গে তার সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। তার অহমিকারও পটভূমি আছে এবং সে অহমিকাও ব্যক্তিগত সীমানা অতিক্রম করে নতুন মূর্তিতে ভাস্বর হয়ে উঠেছে।
পরাধীনতার অভিশাপে যে হীনমন্যতা, লাঞ্ছনা, বঞ্চনা দীর্ঘকাল ধরে পুঞ্জীভূত হয়েছিল, রাজনৈতিক পরিমন্ডল এবং গতানুগতিকতা যেভাবে মনুষ্যত্বকে খর্ব করেছিল, ‘আমি’র দৃপ্ত অহঙ্কারকে তার বিরুদ্ধে একটা আবেগময় প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করাটা হয়ত কষ্টকল্পিত হবে না। তবে এটা স্পষ্ট যে, ‘আমি’ শুধু একজন ব্যক্তি নন; তিনি এমন একজন প্রতিনিধিত্বশীল সত্তা যিনি মানুষের সীমাহীন আত্মশক্তির উদ্বোধনে, আত্মার অপূর্ব জাগরণে মহানন্দে উচ্চকিত। তিনি নিজেকে ‘বিশ্ব-তোরণে বৈজয়ন্তী মানব-বিজয়- কেতন’ বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি সহসা নিজেকে চিনতে পেরেছেন। তিনি এখন সকল বন্ধনমুক্ত, আপনাকে ছাড়া অন্য কাউকে কুর্নিশ করেন না। তিনি অজর, অমর, ‘জগদীশ্বর-ঈশ্বর পুরুষোত্তম সত্য। এসব উক্তি হুইটম্যানের ভাষায় the great pride of man in himself’ এর বহিঃপ্রকাশ বলা যেতে পারে এবং এসব এমন একটা দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় বহন করে যা রোমান্টিসিজমের সঙ্গে সম্পর্কিত। বস্তুত, নজরুল হুইটম্যানের মতই একজন রোমান্টিসিস্ট। তা ছাড়া, ‘সঙ অব মাইসেলফ’ এর ‘আমি’র মত ‘বিদ্রোহী’র ‘আমি’ও বিভিন্ন ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন, অন্য মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজেকে এক করে দেখেছেন। চিরগৃহহারা পথিকের ব্যথা, অবমানিতের মর্মবেদনা, হতাশ প্রেমিকের লাঞ্ছনা, অভিমানী চির-ক্ষুব্ধ হৃদয়ের কাতরতা, বিধবার ক্রন্দনশ্বাস তিনি অনুভব করেন। তিনি পৃথিবীর সব বিষ পান করে কৃষ্ণের মত নীলকণ্ঠ হতে চান। পরাধীনতার উৎখাত করতে চান; পৃথিবীতে যতদিন অত্যাচার চলবে, উৎপীড়িতের ক্রন্দনরোল ধ্বনিত হবে ততদিন তিনি শান্ত হবেন না। তাই বলা যায় তার প্রতিনিধিত্বশীল ভূমিকা, অন্য মানুষের প্রতি তার সমমর্মিতা, অত্যাচার নিপীড়নের বিরুদ্ধে তার আপসহীন সংগ্রামী মনোভাব তার অহমিকাকে একটা উচ্চতর, মহত্তর পর্যায়ে উন্নীত করেছে।
হুইটম্যানের ‘আমি’র মধ্যে যথেষ্ট স্ববিরোধিতা আছে। একদিকে তিনি নিঃসঙ্কোচে তার দৈহিক সত্তা ও প্রখর ইন্দ্রিয় অনুভূতির কথা বলছেন, অন্য দিকে তিনি তার অতিন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিচ্ছেন; কখনো তিনি ভাবপ্রবণতামুক্ত, আত্মপ্রত্যয়ী, অহঙ্কারী, আবার কখনো বা দ্বিধাগ্রস্ত, লাজনম্র, নারীসুলভ আবেগাপুত। কখনো দেখি তিনি বরকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে তার নববধূকে জড়িয়ে ধরে সারারাত কাটাচ্ছেন, আবার কখনো দেখি তিনি সেজেগুঁজে বসে আছেন অন্যের করুণার প্রতীক্ষায়, কখনো তিনি ভবঘুরে, বিশ্ব-পরিব্রাজকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন, কখনো বা নিষ্ক্রিয়ভাবে দূরে দাঁড়িয়ে বিনম্র দৃষ্টিতে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছেন। হুইটম্যানের ‘আমি’ তার এই স্ববিরোধিতা সম্বন্ধে সচেতন। তিনি বলেন : Do I contradict myself? Very well then I contradict (I am large, I contain multitudes.‘আমি’ যেখানে বিভিন্ন identity অবলম্বন করছেন সেখানে স্ববিরোধিতা অনিবার্য।
‘বিদ্রোহী’তেও স্ববিরোধিতা আছে। এর ‘আমি’ কখনো প্রশান্ত, কখনো অশান্ত। তার এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, অন্য হাতে রণতূর্য। একদিকে তিনি রুদ্র, সব ভেঙে চুরমার করতে চান, অন্যদিকে তিনি আবার গোপন প্রিয়ার চকিতে চাহনিতে বাঁধা পড়েন, তার কাঁকন চুড়ির কন্কন্ তাকে মুগ্ধ করে; এমনকি তিনি যৌবনভিতু পলীবালার কাঁচলি হতে চান। হুইটম্যান, তার স্ববিরোধিতার ব্যাখ্যা দিয়েছেন; নজরুল দেননি। কিন্তু সমালোচকদের কাছ থেকে আমরা বিভিন্ন ব্যাখ্যা পাই। একজন বলেছেন যে “কবিতায় আবেগকে একটানা প্রলম্বিত করা যায় না, আবেগের ওঠানামা প্রয়োজন” তাই মাঝে মাঝে সুর নামানো হয়েছে। আর একজন মনে করেন যে “এই চাপা কণ্ঠস্বর পতন নয়… আঘাতের জন্য শক্তি সঞ্চয়।” আর একটি মত এই যে নজরুল যে একই সুরকে অক্ষুণœ রাখতে পারেননি তার জন্য “তার আত্মগত গীতিপ্রবণ মন” দায়ী। অন্য আর একটি মত “বিদ্রোহীর বক্তব্যে আপাত-স্ববিরোধিতা গভীর জীবনবোধেরই প্রকাশ।” সবশেষে আর একটি মত উলেখ করা যেতে পারে। তাহলো এই যে কবিতাটিতে যা বড় হয়ে দেখা দিয়েছে সেটা কোন ‘বিদ্রোহবাণী’ নয়, ‘অপরিসীম আত্মপ্রত্যয়’। ‘আত্ম-আবিষ্কার ও সিদ্ধির আনন্দ’ যা রোমান্টিসিজমের একটা দিক এবং যার সঙ্গে প্রেমের আর্তি ও মানবতার প্রতি সমমর্মিতার তেমন কোনো দূরত্ব নেই।
সব ব্যাখ্যার মধ্যে কিছু যুক্তি আছে সন্দেহ নেই। কবিতাটিতে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিদ্রোহ যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি অস্বীকার করা যায় না আত্মপ্রত্যয় বা আত্ম-আবিষ্কার, নিপীড়িত মানুষের প্রতি সমমর্মিতা এবং প্রেমের আকুতি। এদের কোনটা কোনটাকে ছাপিয়ে উঠেছে তা নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো সহজ নয়। তবে বিভিন্নমুখী অথবা বিপরীতমুখী ভাব ও আবেগ শিল্পের খাতিরে ব্যবহৃত হয়েছে অথবা একটি বিশেষ মানসিকতা থেকে সেগুলো উৎসারিত অথবা সেগুলোর দূরত্ব সামান্যই বলে ব্যাখ্যা না করে কবিতার ঢ়বৎংড়হধ বিভিন্ন সত্তা অবলম্বন করায়, অন্যের অভিজ্ঞতার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করায় সেগুলো অনিবার্য হয়ে উঠেছে বলে ব্যাখ্যা করা অধিকতর যুক্তিসঙ্গত মনে হয়। তবে ‘সঙ অব মাইসেলফ’-এ বিপরীত ভাব ও আবেগের প্রকাশ কোনো সমস্যা সৃষ্টি করে না কারণ সেখানে জীবনের সমগ্র রূপ তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু ‘বিদ্রোহী’র শিরোনাম থেকে মনে হয় যে জীবনের একটি বিশেষ দিক বা আবেগ প্রকাশই তার লক্ষ্য। বিভিন্নমুখী অথবা বিপরীতমুখী ভাব ও আবেগের সমাবেশ এই লক্ষ্যকে ব্যাহত করে কি না সে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, তবে তার মীমাংসা সম্ভব নয়, কারণ সাহিত্যে শেষ কথা বলে কিছু নেই।
‘সঙ অব মাইসেলফ’-এ যে আঙিক ব্যবহার করা হয়েছে তাকে repetitive structure বলে। অন্য কথায় একে ঃযবসব ওvariation বলা যেতে পারে। এই আঙ্গিকে বক্তব্য ধাপে ধাপে এগোয় না, আবর্তিত হয়। একই বক্তব্য নানাভাবে পুনর্ব্যক্ত করা হয়, সম্প্রসারিত করা হয়। বিভিন্ন চিত্রকল্প একই আবেগ বা মেজাজ প্রকাশ করে; একই চরিত্র বিভিন্ন অবস্থায় নিজের রফবহঃরঃু তুলে ধরে। স্তবকগুলো পরস্পর অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত নয়, তাদের অবস্থান পরিবর্তনযোগ্য। উদাহরণস্বরূপ কবিতাটির প্রথম কয়েকটি চরণ লক্ষ্য করা যাক। প্রথম চরণ :I celebrate myself and sing myself” এতে দুটো পষধঁংব আছে; দুটোই প্রায় সমার্থক অথবা বলা যেতে পারে দ্বিতীয়টিতে প্রথমটির বক্তব্য কিঞ্চিৎ পরিবর্তিত অবস্থায় পুনর্ব্যক্ত হয়েছে। পরবর্তী চরণ দু’টি এইরূপ : What I assume you shall assume. For every atom belonging to me as good belongs to you.”” এখানে ‘আমি’ অন্যান্য সত্তার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন এবং নতুন চিত্রকল্পের মাধ্যমে তার বক্তব্যকে সম্প্রসারিত করেছেন। সমস্ত কবিতাটিতে ‘আমি’র বিভিন্ন রূপের নাটকীয় উপস্থাপনা আছে। তাতে ভাবের, আবেগের, মেজাজের পুনরাবৃত্তি, সংযোজন, সম্প্রসারণ ঘটেছে। কবিতাটির গতি আবর্তনমূলক এবং স্তবকগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্তিসঙ্গতভাবে সম্পর্কিত নয়। উলেখ্য যে, বিষয়বস্তু নির্বাচনে ও প্রকাশভঙ্গিতে সর্বত্র সংযম এবং শিল্পবোধের পরিচয় পাওয়া যায় না।
‘বিদ্রোহী’তেও একই আঙ্গিক লক্ষ্য করা যায়। প্রথমে ‘উন্নত শির’ এই চিত্রকল্পের মাধ্যমে ‘আমি’ তার বিদ্রোহী মূর্তি প্রকাশ করেছেন। পরবর্তী চরণগুলোতে বলা হয়েছে যে, তার শির হিমাদ্রির শিখর ছাড়িয়ে গেছে এবং তিনি মহাকাশ ফেড়ে, চন্দ্র সূর্য গ্রহ ভেদ করে, দোলোক ভূলোক গোলক ছেদ করে, খোদার আরশ অতিক্রম করে ললাটে রুদ্র ভগবানের জয়টিকা নিয়ে বিশ্বের চিরবিস্ময় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। এসব চিত্রকল্প তার মূল বক্তব্যকে জোরদার করেছে, সম্প্রসারিত করেছে। পরবর্তী চারটি স্তবকে নতুন নতুন চিত্রকল্প ব্যবহৃত হয়েছে, কিন্তু সবগুলোতে বিদ্রোহের সুর বা মেজাজ ধ্বনিত, প্রতিধ্বনিত হয়েছে। এরপর ‘আমি’র কোমল-মধুর মূর্তি প্রকাশ পেয়েছে এবং সেখানেও বিভিন্ন চিত্রকল্প একই ভাব বা আবেগ ফুটিয়ে তুলেছে। শেষের দিকে আবার বিদ্রোহের সুর বেজে উঠেছে; কিন্তু প্রকাশ ভঙ্গিতে নতুনত্বের চমক আছে। বস্তুত বক্তব্য, সুর বা মেজাজ বারবার ঘুরে এসেছে। স্তবকগুলোর পূর্বাপর সম্পর্ক সবক্ষেত্রে স্পষ্ট নয়। শব্দপ্রয়োগে সংযমের অভাব আছে। তবে ‘সঙ অব মাইসেল্ফ-এর তুলনায় ‘বিদ্রোহী’ অনেকটা বাহুল্যবর্জিত এবং এর কাঠামো অধিকতর সুডৌল।
উভয় কবিতার সাদৃশ্য যেমন আছে, তেমনি আছে বৈশাদৃশ। ‘সঙ অব মাইসেলফ’ মুক্ত ছন্দের কবিতা (Verse libre)|। সমান্তরালতা (Parallelism) এবং বিভিন্ন রকম পুনরাবৃত্তিমূলক কৌশল (reiterative devices) কবিতাটির ভিত্তি। টি এস এলিয়টের ‘দি ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এর মত ‘সঙ অব মাইসেলফ’-এ অসাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে। এতে গীতি কবিতার বৈশিষ্ট্য আছে, বর্ণনা আছে, কাহিনী আছে, নাটকীয়তা আছে। সর্বোপরি, কবিতাটি বক্তৃতার ভঙ্গিতে লেখা। ‘আমি’ মাঝে মাঝে পাঠকদের সম্বোধন করেছেন এবং তিনি যে অনুপ্রাণিত হয়ে ভাষণ দিচ্ছেন তা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই কারণে ‘সঙ অব মাইসেলফ’কে rhapsodic speech’ বলা হয়। পক্ষান্তরে, ‘বিদ্রোহী’ সমিল মুক্তক মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত। শব্দ-বিন্যাসের চাতুর্যে এই ছন্দ অপূর্ব গতিশীলতা লাভ করেছে। তবে হুইটম্যানের কবিতা যে বৈচিত্র্যের কথা বলা হলো তা ‘বিদ্রোহী’তে নেই। এটি আগাগোড়া গীতিকবিতার বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। এতে চড়া সুর আছে, সুরের ওঠানামা আছে, উন্মাদনা আছে, তবে ‘বিদ্রোহী’ কে ভাষণ না বলে স্বগতোক্তি বললে হয়ত ভুল হবে না।
‘সঙ অব মাইসেলফ-এ দেহ ও আত্মা উভয় দিকের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তবে দৈহিক সত্তার উপর বেশি জোর দেয়া হয়েছে বলে মনে হয়। বিভিন্ন ইন্দ্রিয় অনুভূতির বি¯তৃত ও নিঃসঙ্কোচ বর্ণনা আছে। যৌন সম্পর্কিত চিত্রকল্পে কবিতাটি ভরপুর। এই দিকটায় বলিষ্ঠদেহী কবির ব্যক্তিগত ছাপ পড়েছে বলে কেউ কেউ মনে করেন। অপরপক্ষে, ‘বিদ্রোহী’তে আত্মপ্রত্যয়, আত্মজাগরণ, অমিত তেজ, সংগ্রামী মনোভাব- এসব প্রাধান্য পেয়েছে। এগুলো দৈহিক সত্তাকে নাকচ করে দেয় না, তবে সেই সত্তা কবিতায় সরাসরি বা প্রবলভাবে উপস্থাপিত হয়নি। এখানে আবেগ, আত্ম-আবিষ্কারের আনন্দ মুখ্য, ইন্দ্রিয় অনুভূতি নয়।
হুইটম্যান সমাজ ও সভ্যতাকে প্রত্যাখ্যান করে আদিম জীবনের বন্দনাগান গেয়েছেন। বেক ও ওয়ার্ডসওয়ার্থের মত কবির সঙ্গে তার তুলনা করলে দেখা যায় যে তার ব্যক্তির অনভিজ্ঞতা থেকে অভিজ্ঞতায়, নির্জনতা থেকে সমাজে উত্তরণের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন; কিন্তু হুইটম্যান অভিজ্ঞতা থেকে অনভিজ্ঞতায় ফিরে যেতে চেয়েছেন, সমাজ, সভ্যতাকে পরিত্যাগ করার আহবান জানিয়েছেন। নজরুল এ ধরনের জীবনদর্শনের প্রবক্তা নন। সমাজের অনেক কিছুই তিনি ভাঙতে চেয়েছেন, গতানুগতিকতা, আত্মবিকাশের পথে সর্বপ্রকার প্রতিবন্ধকতা তিনি নির্মূল করার বাসনা প্রকাশ করেছেন, অত্যাচার নিপীড়নের বিরুদ্ধে তিনি সংগ্রামমুখর। কিন্তু তার লক্ষ্য এমন একটা সমাজ, এমন একটা পৃথিবী সৃষ্টি করা যা সংস্কারমুক্ত, শোষণমুক্ত, যেখানে ব্যক্তি বুক উঁচু করে, শির উন্নত করে দাঁড়াতে পারে।
‘সঙ অব মাইসেল্ফ’-এ আমেরিকার প্রকৃতি ও বাস্তবজীবন বিস্তারিতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এর একটি কারণ আছে। সাধারণত কবিরা যে সমাজে মানুষ হন সেই সমাজের ধর্মীয় বিশ্বাস, দার্শনিক মতবাদ বা অন্যান্য ধ্যান-ধারণা তাঁদের মজ্জায় প্রবেশ করে। দান্তে, মিল্টন এবং গ্রিক নাট্যকারদের ক্ষেত্রে এটা লক্ষ্য করা যায়। তবে সমাজে প্রচলিত ধ্যান-ধারণার সঙ্গে তাঁদের ব্যক্তিগত চিন্তাচেতনা বা সংবেদনশীলতার মুখোমুখির ফলে যে স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি হয় তা থেকে সাহিত্যে নতুন ফসল ফলে। যে সমাজে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য কোন বিশ্বাস বা ঐতিহ্য নেই, সেখানে কবিরা আপন সত্তায় ডুব মারেন, ফলে কবিতায় বিষাদময় অন্তর্দশন প্রাধান্য পায় যেটা কোন কোন রোমান্টিক কবির বেলায় সত্য। হুইটম্যান এমন এক দেশে এবং এমন এক সমাজে মানুষ হয়েছিলেন যেখানে পুরনো ঐতিহ্য বা ধ্যান-ধারণা গ্রহণযোগ্য ছিল না। তাই তিনি ইউরোপীয় কবিদের মতো প্রচলিত বিশ্বাস বা পৌরাণিক কাহিনীকে তাঁর কবিতায় ব্যবহার করেননি। কিন্তু তাই বলে তিনি আত্মমগ্ন হননি। তিনি তাঁর সত্তাকে বাইরের জগতের সঙ্গে সম্পর্কিত করার চেষ্টা করেছেন। এই কারণেই বাস্তবজীবন তাঁর কবিতায় প্রবলভাবে উপস্থিত। কিন্তু ‘বিদ্রোহী’তে বাংলাদেশের, বাঙালি জীবনের বাস্তব চিত্র তেমন প্রতিফলিত হয়নি। কবি বিদ্রোহবাণী প্রচার করেছেন কিন্তু তা করতে গিয়ে তিনি ইতিহাস, পুরাণ, হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য ব্যবহার করেছেন। এমনকি তাঁর বিদ্রোহবাণী ভারতীয় ‘সোহ্হাম’ এবং ইসলামী ‘আনাল হক’ তত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত বলে কেউ কেউ মনে করেন। এইসব ঐতিহ্যের মধ্যে তিনি লালিত হয়েছেন, তাই সেটাকে গ্রহণ করে নিয়ে তার আলোকেই তিনি তাঁর আবেগ, অভিজ্ঞতার শিল্পরূপ উপস্থাপিত করেছেন।
‘সঙ অব মাইসেল্ফ’ ও ‘বিদ্রোহী’র এই তুলনামূলক আলোচনার আলোকে নজরুলের কবিতাটির মূল্যায়ন করা যেতে পারে। পরিসর, জীবনবোধের ব্যাপকতা, গভীরতা, ভাব, আঙ্গিক-এসব দিক দিয়ে বিবেচনা করলে ‘সঙ অব মাইসেল্ফ’-এর পাশে ‘বিদ্রোহী’কে কিছুটা নি®প্রভ মনে হতে পারে। কিন্তু স্বীকার করতেই হবে যে হুইটম্যানের কবিতাটির সঙ্গে এর মৌলিক পার্থক্য এবং এর ছন্দ, শব্দ-বিন্যাস, বক্তব্যের ওজস্বিতা ও অপেক্ষাকৃত সুঠাম অবয়ব ‘বিদ্রোহী’কে একটা বিশিষ্টতা দান করেছে। তবে বাংলা কাব্যে ‘বিদ্রোহী’র স্থান যত উচ্চেই হোক না কেন একে অপূর্ব সৃষ্টি বললে অত্যুক্তি হবে। অপরপক্ষে “বিদেশী কবির পদচিহ্ন ধরে অগ্রসর হয়েও শেষ পর্যন্ত সমস্ত বক্তব্য আকুল আক্ষেপে পরিণত হয়েছে”-এই অভিমত ও নিঃসন্দেহে একটি অবমূল্যায়ন। হ