দীর্ঘদিন যাবৎ লেখকের ‘অলস দিনের হাওয়া’ গ্রন্থটি আমার কাছে ছিল বিশ্বসাহিত্য পাঠের বাইবেল রূপে বিবেচিত একটি গ্রন্থ। অলস দিনের হাওয়ায় তিনি যে কতটা নিরলস ছিলেন তা পাঠকমাত্রই উপলব্ধি করতে পারবেন। আর এবারের বইমেলায় (২০১৬) প্রকাশিত তাঁর লেখাজোখার কারখানাতে যখন হাতে এলো তখন আমিও লেখকের মতো রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে কিছু কথা ধার করে নিয়ে বললাম : আমি পাইলাম, আমি ইহাকে পাইলাম। খুবই বাঞ্ছিত কারণে বইটি পাঠান্তে মনে হলো এটি ঋদ্ধ মননের কারখানাই বটে। এবং বিশ্ববীক্ষার পাঠশালা। একেবারে সরল ভঙ্গিতে তিনি প্রতিটি প্রবন্ধকে এ গ্রন্থে সাজিয়েছেন। গ্রন্থটির ভূমিকা অংশ থেকে লেখকের হিউমার এবং উইট সম্পর্কে একটু ধারণা নেয়া যাক : ‘অনেকদিন পর হাসনাত ভাই আবার একটা অনুরোধ জানালেনÑ ‘অলস দিনের হাওয়া’ থেকে বেছে নিয়ে কয়েকটি লেখা দিয়ে একটি বই সাজাতে। যেহেতু অলস দিনের হাওয়া নামে একটি বই আগেই বেরিয়ে গেছে, এই সঙ্কলনটির নাম কী হতে পারে, তা নিয়ে ভাবতে হয়েছে। এবারো দ্বারস্থ হয়েছি রবীন্দ্রনাথের। গীতবিতান ঘেঁটে পেয়েছি এই নামটি। এটি আমাকে আনন্দ দিয়েছে, যেহেতু লেখাজোখার কারখানা নিয়ে আমার কৌতূহল বরাবরের। আমি নিজেও কারখানার একজন শ্রমিক। বেতন কম, কিন্তু কাজে প্রচুর আনন্দ।”
লেখক এও বলেছেন কোনো অলস দিনে এ বই পড়ে যদি কেউ আনন্দ পান, এটি প্রকাশের আয়োজনটি তাতে পূর্ণতা পাবে। এখানে বলে রাখা আবশ্যক, বইটি অলস দিনের বিনোদনের বই নয় মোটেও। বইটি লেখকের বহুদিনের শ্রম আর বিশ্বসাহিত্য পাঠের প্রবল তৃষ্ণার ফসল। বিচিত্র গ্রন্থপাঠ আর বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের মিশেলে নির্মাণ হয়েছে এ বইখানি। স্বল্পায়ু ব্রিটিশ কবি কিটস দিয়ে শুরু করে আধুনিক রুশ সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি ও ঔপন্যাসিক আলেকজান্ডার পুশকিনকে দিয়ে সমাপ্তি টেনেছেন।
বিশাল বিশ্বসংসারে কত কিছুইতো অজানা থেকে গেলো। এমন আক্ষেপ বিশ্বপরিব্রাজক রবীন্দ্রনাথেরও ছিল। তবু কেউ সেই আক্ষেপ মোচনের দায় নেন নিজের অজান্তেই। কখনোবা ফরমায়েশি চেতনায় কখনো স্বেচ্ছা ভাবনায় নিতান্ত আনন্দ খেয়ালে গড়ে তোলেন পাঠকের কাক্সিক্ষত তাজমহল। পাঠক বিস্ময়াভিভূত হয়ে পাঠ করেন তার সে সৃষ্টিকর্ম। সেখান থেকে অর্জন করেন অসংখ্য অজানা-অচেনা প্রজ্ঞাদীপিত তথ্যাবলি। সেটা হতে পারে চেনা ভূগোলের বাইরে কিংবা চেনা ভূগোলের অন্দরে। মুহূর্তেই উন্মোচিত হয় একটি নতুন দিগন্ত। কী এক সচলতায় পাঠকের মননের চিলেকোঠায় স্থান করে নেয় সে সাহিত্যসৃজন। তাৎপর্যময় হয়ে ওঠে জীবনের এই পাঠসমূহ। মনে হয়, হ্যাঁÑ এমনইতো একটি গ্রন্থের অপেক্ষায় অপেক্ষমাণ ছিলাম আমরা। কখনো কখনো পাঠ যেখানে থমকে দাঁড়ায় সেখানে তৈরি হয় ভিন্ন এক পাঠতৃষ্ণা। তখন ভিন্ন কিছু তালাশ করে যথার্থ পাঠক। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো গন্ডিকে অতিক্রম করে নিরবচ্ছিন্ন একটি গ্লোবাল সাহিত্য পাঠের আকাক্সক্ষা তীব্রতর হলেই কেবল এমন একটি গ্রন্থের প্রতি তৈরি হয় মোহ। অন্তর্গত সত্যের সরণিতে দাঁড়িয়ে, সৃজনের আরাম কেদারায় বসে একটু ঝিমুনি আসার আগে বোধইন্দ্রিয়গুলো যখন খুঁজে-ফিরে তথ্য-উপাত্তে ঠাসা অন্য এক স্বাদ-গন্ধের কিছু, তেমন কোনো গ্রন্থ কি এটি? এর উত্তর খোঁজার জন্যই বস্তুত এ গ্রন্থটি আমাদের পাঠতালিকায় রাখতে হবে বলে মনে করি। আমরা এ গ্রন্থ থেকে কয়েকটি প্রবন্ধের পর্যায়ক্রমিক চুম্বক অংশ তুলে ধরবো এ আলোচনায়। অকাল প্রয়াত কবি বা লেখকদের প্রতি আমাদের সহজাত দুর্বলতাকে স্মরণ করে তিনি জন কিটসকে দিয়ে প্রবন্ধ শুরু করেছেন। স্বল্পায়ু এ কবির প্রতি লেখকের অনুরাগ, মোহ, কষ্ট সবকিছু অসাধারণ বাকবিন্যাসে বিন্যস্ত হয়েছে এ গ্রন্থের সূচনা প্রবন্ধে। প্রবন্ধের শেষাংশে এসে লেখক তাঁর বেদনাবোধকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন তখন পাঠকের অন্তরেও কিটসের জন্য তৈরি হয় অন্য এক ভালোবাসা, অন্য এক ভালো লাগা এবং অদ্ভুত এক জিজ্ঞাসা দিয়ে পাঠকমনকে আলোড়িত করে তোলেন লেখক। যেমন লেখক বলেন :
তবে অনেক বিষয়বস্তুর মধ্যে তিনটি প্রধান বিষয় আমাদের বিশেষভাবে স্পর্শ করে : তাঁর মৃত্যুচিন্তা, বাস্তব ও স্বপ্ন-কল্পনার বৈপরীত্য এবং জগতের জন্য, নিসর্গের জন্য, প্রেম ও ভালোবাসার জন্য তাঁর ভগ্ন হৃদয়ের ব্যাকুলতা, কিন্তু একই সঙ্গে অপ্রাপ্তির অন্ধকার আভাস। কবি তাঁর অন্তর দিয়ে পৃথিবীর সত্যসমূহকে অনুধাবন করেছিলেন; স্বপ্ন যে সময়ের করুণা মাত্র, অথবা নিজের ও পৃথিবীর মধ্যে টাঙানো একটি রঙিন কাচ, মুহূর্তে যা ভেঙে যেতে পারেÑ এ বোধ তাঁর যত তীব্র হয়েছে, বাস্তবতার গুরুভার তত তাঁকে পিষ্ট করেছে। কবি মৃত্যুতে সমাধান চেয়েছেন, কিন্তু মৃত্যু কি সমাধান? (কবি তীর্থে : জন কিটসের হ্যাম্পস্টেডে)
নোবেল লরিয়েট ব্রিটিশ কথাসাহিত্যিক, কবি ও নাট্যকার উইলিয়াম গোল্ডিং (১৯১১-১৯৯৩) সম্পর্কে লেখক তাঁর স্বকীয় ভাবনাকে চমৎকার সারল্যে আর যুক্তিময়তায় উপস্থাপন করেছেন তাঁর ‘উইলিয়াম গোল্ডিং : পুনরাবৃত্তির বিপদ’ প্রবন্ধে। যিনি তাঁর প্রথম উপন্যাস লর্ড অফ দি ফ্লাইজ (১৯৫৪) লিখেই সারা বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তোলেন। লেখকের মতে গোল্ডিং পরবর্তীতে তাঁর সৃজন পরম্পরায় সে শিল্পশক্তিকে ধরে রাখতে পারেননি। গোল্ডিং বিষয়ে তাই সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সোজাসাপ্টা বক্তব্য :
গোল্ডিং সম্পর্কে একসময় লোকের খুব আশাবাদ ছিল। কিন্তু প্রথম উপন্যাসেই এতটা সফল হলে বিপদ বাড়ে লেখকের। গোল্ডিং অতঃপর লর্ড অফ দি ফ্লাইজ-এর মান ধরে রাখতে অথবা ছাড়িয়ে যেতে পারেননি। এই উল্টোরথের আয়োজনে তিনি নিজেই কিন্তু প্রধান পুরোহিত। রূপক গল্প একবার সফলতা লাভ করলে, একটি অনর্জনীয় মান অর্জন করে ফেললে, বারবার ওই একই রাস্তায় যাওয়া একটু বিপদসঙ্কুল। আমরা মেনে নিই যে, গোল্ডিংয়ের প্রতিভা রূপক বিশ্লেষক, তাঁর কল্পনা রূপকাশ্রয়ী; কিন্তু প্রায় প্রতিটি উপন্যাসে এইভাবে একটি গূঢ় অন্তর্কাঠামো বজায় রাখা কি সম্ভব, যেখানে ধষষবমড়ৎু-কে বলা হয় একটু সমঝে চলার মতো ফধৎশ ংঃৎঁপঃঁৎব। অন্ধকারে উল বোনেন যে পিতামহী, তার বিন্যাসে বৈচিত্র্য থাকলে বুনোট আলগা হবে, ঘর পিছলে পড়ে যাবে, তিনি টের পাবেন না। অতি পরিচিত বিন্যাস হলে অভ্যাসবশত তিনি বুনে যেতে পারেন; গোল্ডিং যখনই বৈচিত্র্য আনতে গেলেন কনরাডকে অনুসরণ করে, তার বুনুনিতে শৈথিল্য এলো। তিনি এলিয়ে পড়লেন। (পৃষ্ঠা-২২)
সাহিত্য পরিমন্ডলের বিশ্বভ্রমণ তাঁর শিল্পমেজাজকে স্বসমাজের প্রতি উদাসীন কিংবা উন্নাসিক করেনি বরং আরো বেশি সন্নিহিত করেছে। তাই দেখা যায় বিশ্বখ্যাত লেখকদের সঙ্গে কথোপকথনে আমাদের প্রতিনিধিত্বকারী লেখকদের কথাও প্রসঙ্গক্রমে টেনে এনেছেন। স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন সেই সঙ্গে আমাদের ভাষাগত সীমাবদ্ধতার প্রসঙ্গ। তাতে উন্মোচিত হয়েছে লেখকের মৃদু আক্ষেপ, কিছু বাধা, যা ডিঙাতে পারলে হয়তো আমাদের সাহিত্যের রস আস্বাদ করা অবাংলাভাষী সাহিত্যানুরাগী মানুষের জন্য সহজতর হতো। লেখিকা মার্গারেট ড্র্যাবলের সঙ্গে তাঁর আলাপচারিতায় তা-ই যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে :
মার্গারেট ড্র্যাবল ভারতীয় ঔপন্যাসিকদের নাম শুনেছেন। কর্নাটকের সন্তান রাজা রাওয়ের লেখার প্রশংসা করলেন, অনিতা দেশাইয়ের বিশেষ ভক্ত বোঝা গেল। আর কে নারায়ণের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা ছিল তাঁর, আমারও; কিন্তু শুনলাম তিনি মাদ্রাজে গেছেন। বাংলাসাহিত্য সম্পর্কে আগ্রহ দেখালেন। ভারতীয় পেঙ্গুইন থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অর্জুন উপন্যাসটির অনুবাদ বেরিয়েছে, পড়বেন বলে কিনে নিলেন। আমি মুখে মুখে সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ূন আহমেদ এবং শওকত আলীর কথা কিছু শুনিয়ে দিলাম, দু-একটা বই সম্পর্কে মোটামুটি বলতে হলো তাঁর আগ্রহ দেখে। কিন্তু ভাষার ব্যবধানটি দুরতিক্রম্য- তিনি কোনোদিন বাংলায় এঁদের পড়তে পারবেন না : আমাদের সাহিত্য তাই দেশের বাইরে অপরিচয়ের বিষয়। বিষয়টি নিয়ে এবং অনুবাদ কেন প্রয়োজন এ নিয়ে আলোচনা ছিল আমাদের শেষ দিবসের শেষ কর্মসূচি (মাহফুজ এবং মার্গারেট ড্র্যাবলের কথা, পৃষ্ঠা-৫৪)
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম নানা অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ একজন সাহিত্য বোদ্ধা। তিনি শুধু পড়ে জেনেছেন সব এমন নয়। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোয় যে তিনি আলোকিত হয়েছেন তার স্বাক্ষর রয়েছে এ গ্রন্থের পরতে পরতে। কোনো অক্ষমতা যেন লেখককে স্পর্শ করে না। সতত ঊর্ধ্বমুখী পথিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম হেঁটে চলেন সাহিত্যরুচির সর্বোত্তম শিখরকে স্পর্শ করার অভিপ্রায়ে। আমরাতো জানি আমাদের সাহিত্য জনপদে বেঁচে থাকা কয়েকজন অভিভাবকতুল্য সাহিত্যিকের মধ্যে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম অন্যতম একজন। তিনি আমাদের অনেকেরই একাডেমিক জীবনে স্যারের স্যার। প্রাতিষ্ঠানিক পরিশীলনে তিনি অদ্বিতীয়। বাংলাসাহিত্যে তাঁর রয়েছে একটি আসন-গরিমা। সেখানে তিনি একা আবার বহুজনবেষ্টিত। গল্প আর প্রবন্ধ সাহিত্যে তিনি যে প্রবহমানতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন সেখানে নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে তাঁর আরাধ্য শীর্ষবিন্দুটি ঠিক কোনটি। গল্প পাঠান্তে মনে হয় এখানেই তিনি সিদ্ধহস্ত কিন্তু আবার ভ্রম কাটে তাঁর প্রবন্ধের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে। হয়তো এটাই প্রকৃত লেখকের পরিচয় পরিধি।
সবশেষে বলবÑ লেখক মূলত পাঠক হিসেবে কখনো শ্রোতা হিসেবে কখনো বক্তা হিসেবে তাঁর পর্যবেক্ষণী দৃষ্টি দিয়ে বিশ্বসাহিত্যের নানা জনকে নিয়ে এ গ্রন্থে আলোচনা করেছেন। কখনো ইউরোপ, কখনো লাতিন আমেরিকা, কখনো আফ্রিকা, কখনো এশিয়ায় এসে তিনি স্থিতু হয়েছেন এ গ্রন্থে। সমালোচনায় তিনি নির্ভার, নির্মোহ। কিটস, লর্ড অফ দি ফ্লাইজ খ্যাত ঔপন্যাসিক, কবি, নাট্যকার উইলিয়াম গোল্ডিং, ইয়েটস, কোয়েৎজি, গ্রেয়াম গ্রিন, নাগিব মাহফুজ, চিত্রী জ্যাকসন পলোক, আমাদের চেনা পরিধির এ উপমহাদেশের জাতক কবি ও ঔপন্যাসিক জুলফিকার গৌস, নিসর্গ প্রেমিক আইরিশ কবি শেমাস হিনিসহ প্রত্যেককেই তিনি অসাধারণ প্রজ্ঞা আর শৈলীতে উপস্থাপন করেছেন এ গ্রন্থে। গ্রন্থটির বৈচিত্র্য ও চমৎকারিত্বের স্থানটি হচ্ছে পাঠক ছোট্ট বৃত্তের মাঝে পরিভ্রমণ করেই বিশ্ব পরিভ্রমণের স্বাদ নিতে পারবেন অনায়াসেই। আজকাল একটি ভিনদেশি লেখা ও লেখকের কর্মপরিধি এবং তাঁর সৃষ্টিশৈলীসহ বিবিধ বিষয়ে ধারণা লাভ করা খুব জটিল নয়, কিন্তু নিজের ভাষায় এক মলাটে সে সম্পর্কে জ্ঞান লাভ আজও জটিল বৈকি। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম সে কাজটিই করেছেন অতি সহজভাবে নিবিড় পাঠ ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে।
লেখাজোখার কারখানাতে
প্রচ্ছদ : রফিকুন নবী ॥ মূল্য : ৩৫০ ॥ প্রথম প্রকাশ : জুলাই ২০১৫ ॥ প্রকাশনা : বেঙ্গল পাবলিকেশন্স।